Tuesday, February 20, 2018

এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছার চেয়ে জীবনের চূড়ায় পৌঁছানো কঠিন! by জুয়েল রানা

কবে যাব পাহাড়ে আহারে, আহারে! গানটি যেন পাহাড়ে যেতে না পারার আমার আকুতিই প্রকাশ করে। শৈশব থেকে আমৃত্যু জীবন-যুদ্ধে কত পাহাড়ই আমরা ডিঙাই। নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কারণে খুব কম মানুষেরই প্রকৃতির পাহাড় বা পর্বত দেখা কিংবা ডিঙানো সম্ভব হয়। যেমন গ্রামের স্কুল-কলেজ থেকে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আমার মতো মজুর, কুলি, কৃষক ও মেহনতি মানুষের সন্তানদের যুগ যুগ ধরেই টিকে থাকার সংগ্রাম করে যেতে হয়।
মানুষের বাসায় প্রাইভেট পড়িয়ে, কোচিংয়ে ক্লাস নিয়ে, বিক্রয়কর্মীর কাজ করে যুদ্ধ করতে হয় হলের গণরুমে একটি আসন, দুবেলা হলের তৈলাক্ত খাবার, ডাল ও পানির অভিনব মিশ্রণ, আজিজ সুপার বা নিউমার্কেটের ১৫০ টাকার একটি গেঞ্জি বা শার্ট, ১২০ টাকার স্যান্ডেল এবং পড়ালেখার খরচ জুগিয়ে পরিবারের জন্য কিছু পাঠানোর। সেই সাথে অসম সমাজ, ক্লাসের পড়াশুনা, পিতা-মাতার স্বপ্ন, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, শ্রেণিকক্ষে  বা সহপাঠীদের সাথে পোশাক-পরিচ্ছদ ও  জীবন-ধারনে খাপ খাওয়ানোর  প্রতিবন্ধকতা সর্বোপরি সামাজিক বঞ্চনা তাদের কুরে কুরে খায়।
সবাই নিত্যদিনের এই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পেরে উঠে না, যেমন পেরে ওঠেনি আমাদের হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হোসেন কিছুদিন আগেই আত্মহত্যা করেছে, যার মূল কারণ হলো আমাদের অসম সমাজের যাতাকল, নির্যাতন, অত্যাচার ও অবজ্ঞা। এভাবেই সংগ্রামী মানুষগুলো এক সময় নিজের ওপর বিশ্বাসটাও হারিয়ে ফেলে। কোনো কোনো সময় জীবন দিয়ে ধিক্কার জানাতে চায় আমাদের মতো তথাকথিত শিক্ষিত, সুশীল, শহুরে, স্মার্ট, উচ্চ বংশীয় ও পয়সাওয়ালা অমানুষদের। যদিও আত্মহত্যা কখনোই সমাধান নয়। আমাদের বেঁচে থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই অন্ধ সমাজকে প্রতিনিয়ত চপেটাঘাত করতে হবে এবং উপড়ে ফেলতে হবে কলুষিত এই সমাজের শিকড়।
তাইতো বেঁচে থাকার এ জীবন সংগ্রামে তিন বেলা ভোগ করাটাই হয়ে ওঠে মুখ্য; সেখানে জীবন উপভোগ যেন এক আকাশ- কুসুম কল্পনা।  বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষাসফরে অংশগ্রহণ, সহপাঠীদের সাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, প্রিয়ার ভালোবাসা  কিংবা নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্য কিছু চিন্তা যেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পূর্ণিমার চাঁদের মত একখানা ঝলসানো রুটি। এভাবেই একদিন মরে যায় পিপাসু সেই মন, ভালোবাসাপূর্ণ সেই কোমল হৃদয় এবং আমরা ধীরে ধীরে হয়ে উঠি এক একটা দানব; যে দানব গিলে ফেলে মনুষ্যত্ব, বিবেকবোধ, মানবতা এমন কি পুরো জগৎটাকে।
বিভাগীয় শিক্ষক জামাল স্যারের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম সেমিস্টারে ৫০০টাকা চাঁদা দিয়ে কুমিল্লা বার্ডে  একবার শিক্ষাসফরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এরপর আর কখনোই সহপাঠীদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি নয়নাভিরাম সাজেক ভ্যালি, নীলগিরি, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণা কিংবা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে। মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে বিভাগ থেকে তিন দিনের জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সে সময় বন্ধুদের সাথে সমুদ্র বিলাস আমার জন্য বিলাসিতাই ছিল। আজ যুক্তরাজ্যে বিশ্বের প্রথম সারির ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতে এরাসমাস স্কলার হিসেবে পড়ালেখা করছি। এখানে ছুটির দিনে সবাই প্রকৃতি ভ্রমণে বের হয়। প্রতি সপ্তাহে না পারলেও মাসে অন্তত দু-একদিন আমিও অংশগ্রহণ করার দুঃসাহস করি।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সহপাঠীদের অনুরোধ ও উৎসাহে ওয়েলস-এর সর্বোচ্চ মাউন্টেন স্নোডেন চূড়ায় ওঠার মনস্থির করি।  ৩৫৬০ ফুট উচূ এই মাউন্টেনের চূড়ায় পৌঁছাতে স্বাভাবিক আবহাওয়ায় ৪-৫ ঘন্টা সময় লাগে। উল্লেখ্য,  প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী স্যার এডমুন্ড হিলারি  'স্নোডেন' মাউন্টেনেই অনুশীলন করেছিলেন। যাহোক আমাদের ৫ জনের  দল সকাল ১০টায় 'স্নোডেন' মাউন্টেনে ওঠা শুরু করে। সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে আমরা মাত্র তিনজন ২৯৫০ ফুট পর্যন্ত উঠতে পেরেছিলাম। প্রচুর তুষারপাত, মেঘ ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে ১৭ ফেব্রুয়ারি ৮২০ ফুট উচ্চতা থেকে বরফে পিছলে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তাই চূড়ায় যেতে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। চূড়ায় যেতে না পারলেও প্রথমবারের মতো পর্বতারোহণের অসাধারণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। মেঘের সাথে মিতালি, পাথর, তুষারপাত, বাতাস ও বৃষ্টির সাথে যুদ্ধ। এ যেন সত্যি সত্যি বেঁচে থাকার লড়াই, একটু বিচ্যুত হলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। নামতে নামতে আমি ভাবছিলাম, কত সহজে এত উঁচুতে উঠে গেলাম! অথচ আজকের এই মাউন্টেন দেখতে আসার পেছনে কত সময় ও পরিশ্রম লেগেছে! এ পর্যন্ত কতগুলো পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিয়ে বর্তমানে পৌঁছেছি। জীবনের সংগ্রামটা পর্বতে বেঁচে থাকার সংগ্রামের চেয়ে ঢের। তেমনিভাবে উপলব্ধি করলাম, পর্বতের চূড়ার চেয়ে জীবনের চূড়ায় পৌঁছানো অনেক কঠিন। এই উপলব্ধির জন্য ধন্যবাদ জানাই আমার বন্ধু হারিন, নন্দিতা, টেইলর ও প্যাট্রিসিয়াকে।
লেখক: এরাসমাস মুন্ডুস স্কলার, শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য

খালিস্তান ইস্যু: ভারতে শীতল অভ্যর্থনা পেলেন জাস্টিন ট্রুডো

সপ্তাহব্যাপী সফরে ভারতে অবস্থান করছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। কিন্তু দু’দিন পার হয়ে গেলেও উষ্ণ অভ্যর্থনার বদলে ভারতের পক্ষ থেকে শীতলতাই জুটেছে তার কপালে। সোমবার তিনি তাজমহল সফর করেছেন। দেখেছেন আগ্রায় হাতির অভয়ারণ্য। দিল্লি বিমানবন্দরে তিনি যখন পৌঁছলেন তখন তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং ও কানাডায় ভারতের রাষ্ট্রদূত বিকাশ স্বরুপ। অথচ, সাম্প্রতিককালে কোনো সফররত সরকার প্রধানকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই উপস্থিত থেকেছেন।
ক’দিন আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ভারত সফরে এলে মোদি বিমানবন্দরে তো উপস্থিত ছিলেনই, তার সঙ্গে কোলাকুলিও করেছেন। অথচ, ট্রুডো যখন তাজমহল দেখতে আগ্রা যান, তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন না মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও। বরং জেলা প্রশাসক গৌরব দয়াল ও কমিশনার কে রামমোহন রাও ছিলেন তার সঙ্গে! ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান টুডে এক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর প্রতি ভারতের এমন নিষ্প্রভ আতিথেয়তার বিশেষ কারণও থাকতে পারে। ভারত মনে করে, শিখ খালিস্তান ঘরানার প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন করছে ট্রুডোর সরকার। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। উল্লেখ্য, খালিস্তান নামে শিখ ধর্মাবলম্বীদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একাধিক সশস্ত্র আন্দোলন একসময় বেশ শক্তিশালী ছিল।
ভারতের আপত্তির জায়গা হলো, টরেন্টতে খালসা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন ট্রুডো। ওই অনুষ্ঠানে খালিস্তানের পতাকা উড়ানো হয়। প্রদর্শিত হয় সাবেক খালিস্তানি সশস্ত্র আন্দোলনের নেতা জার্নাল সিং ভিন্দ্রনওয়ালের ছবি।
কানাডায় বহু শিখ ধর্মাবলম্বীর বসবাস। অপরদিকে ভারতের পাঞ্জাব অঙ্গরাজ্যে শিখদের বসবাস বেশি। কিন্তু এই সফরে ট্রুডো পাঞ্জাব সফরে গেলেও, সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না। ভারতের একমাত্র শিখ অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্য পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর শিং সাবেক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা। তিনি নিজে একজন শিখ হলেও, খালিস্তান আন্দোলনকারীরা তাকে শত্রু হিসেবে দেখেন। পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া কানাডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হরিজত সাজ্জান কয়েকদিন আগে পাঞ্জাব সফরে গেলে তার সঙ্গে সাক্ষাতে সম্মত হননি অমরিন্দর সিং। হরিজত সাজ্জানকে ‘খালিস্তানি ও ভারত-বিরোধী’ হিসেবেও আখ্যা দেন তিনি। পরে এই মন্তব্যকে আপত্তিকর বলে অভিহিত করেন হরিজত। এবার অবশ্য ট্রুডোর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন অমরিন্দর সিং। কিন্তু ট্রুডোর দল জানিয়ে দেয়, পাঞ্জাবে প্রধানমন্ত্রী গেলেও, সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করবেন না।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ট্রুডোর প্রতি ভারতের এই আচরণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। কলামিস্ট ও অর্থনীতিবিদ বিবেক দেহেজিয়া বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা বেশ বড় ধরণের তিরস্কারই বটে। ট্রুডো ও তার পরিবারকে স্বাগত জানাতে একজন কনিষ্ঠ মন্ত্রী পাঠানো হয়েছে বিমানবন্দরে। এর মাধ্যমে অবশ্যই ট্রুডোকে তিরস্কার করা হচ্ছে।’ দেহেজিয়া বলেন, এর কারণ হলো ট্রুডো সরকারের কয়েকজন সদস্য একসময় খালিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ট্রুডোর উদারপন্থী দলটি শিখ-কানাডিয়ান ভোট ব্যাংকের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। তার সরকারের কয়েকজন শিখ সদস্য খালিস্তানিদের সঙ্গে ছিলেন। ট্রুডোর মন্ত্রীসভায় চারজন শিখ সদস্য রয়েছেন।
তবে কানাডায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বিষ্ণু প্রকাশ এই ধরণের দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। বলছেন, ট্রুডোকে মোটেই খাটো করা হচ্ছে না। তার দাবি, ট্রুডোর বেলায় ঠিকভাবে প্রটৌকল মেনে চলছে ভারত। নিয়ম হলো, একজন বিদেশী সরকার প্রধানকে স্বাগত জানাবেন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। সেটাই হয়েছে। অন্যবার প্রধানমন্ত্রী মোদি উপস্থিত থেকে এই নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটিয়েছেন। প্রত্যেক বিদেশী সরকার প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানাবেন, এমনটা আশা করা উচিত নয় বলে তার মন্তব্য।
সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবাল অবশ্য ট্রুডোর প্রতি ভারতের আচরণ নিয়ে অসন্তুষ্ট। তিনি বলেন, খালিস্তান নিয়ে পূর্বধারণা থেকে প্রভাবিত হয়ে ভারতের উচিত হয়নি ট্রুডোর সফরের শুরুটা এভাবে করা। বরং, ভারতের উচিত ছিল এই সফরকে ব্যবহার করে খালিস্তান নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা কানাডাকে অবহিত করা। তবে তিনিও মনে করেন না, ভারত ট্রুডোকে তিরস্কার বা খাটো করছে। তিনি বলেন, ভারত প্রটৌকলের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মই মেনেছে।
এই সপ্তাহে মুম্বইয়ে ব্যবসায়ীদের একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেবেন ট্রুডো। কথা বলবেন চলচ্চিত্র শিল্পের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও। ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ট্রুডো। তাদের আলোচনায় বাণিজ্য ও ব্যবসা ছাড়া বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা, বিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও শিক্ষা সংক্রান্ত ইস্যু প্রাধান্য পাবে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট শেষ হয়ে যায়নি, এখনও আসছে তারা by কেট নোলান

২০১৭ সালের ২৫ শে আগস্ট। এ সময় থেকে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে এসেছেন। এর আগের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া আরো বেশ কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন তারা। আমি এক্ষেত্রে সবচেয়ে যে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিয়েছি তা হলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা। কি বিপুল পরিমাণ মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে অল্প সময়ে। তা প্রায় ছয় মাসে।
প্রকৃতপক্ষে এখনও তারা আসছেন।
এখন যারা আসছেন তাদের সংখ্যা বিশাল নয়, যেমনটা দেখা গেছে সঙ্কট শুরুর সময়ে। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখনও নাফ নদী পাড়ি দিয়ে প্রতি সপ্তাহে দু’একশত রোহিঙ্গা আসছেন। নতুন আসা উদ্বাস্তুরা বলছেন, তারা মিয়ানমারে অনিরাপদ। তাদেরকে হুমকি দেয়া হয়েছে। বাড়িতে, গ্রামে তাদেরকে হয়রান করা হয়েছে। তাদের গ্রামগুলো এখন পরিত্যক্ত। তাই তাদের যেসব সম্পদ বা পণ্য ছিল তা যেকোনো দামে বিক্রি করে দিয়েছেন বা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যাতে তারা নৌকার ভাড়া মিটাতে পারেন। সেই নৌকায় চড়ে চলে আসতে পারেন বাংলাদেশে, যেখানে তাদেরকে থাকার জন্য বিশাল ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং তা অব্যাহত আছে। তারা এসে আশ্রয় নিচ্ছেন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারে তৈরি করা অস্থায়ী আবাসনে। এগুলো অত্যন্ত জনবহুল। গাদাগাদি করে সেখানে থাকতে হয় তাদেরকে। তাদের এসব আবাসন তৈরি করা হয়েছে বেশির ভাগই প্লাস্টিক, বাঁশ দিয়ে। একটি ঘরের সঙ্গে আরেকটি ঘর লেগে আছে। এখানে রয়েছে অপর্যাপ্ত পানি। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নাজুক।
সব বসতিতে আমাদের মেডিকেল কনসালটেশনদের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি, রোহিঙ্গারা এরই মধ্যে মিয়ানমারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নেই বা নেই বললেই চলে। সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে তাদেরকে টিকা দেয়া হয় না নিয়মিত। তাই তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত নি¤œ।
আমাদের চিকিৎসকরা অনেক মানুষকে ডায়রিয়া ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসা দিয়েছেন। এসব রোগ উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাসের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা তাদের শরীরে ক্ষত দেখেছি। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে সেগুলো মারাত্মক সংক্রণে রূপ নিয়েছে। দেখা দিয়েছে জটিল রোগ হিসেবে। তাদের এসব রোগের বিষয় কখনো যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয় নি।
আমরা এমন অনেক পরিবার দেখেছি। যেসব পরিবারের শিশু বা বিকলাঙ্গ মানুষকে দেখাশোনা করতে হয় অন্যদের। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দিতে হয় অথবা তাদের আশ্রয় তাদেরকেই নির্মাণ করতে হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ, অত্যধিক গাদাগাদি হরে বসবাস, অপর্যাপ্ত আবাস, দৃশ্যত অত্যন্ত কম মাত্রার টিকা ব্যবস্থা- এসব ফ্যাক্টর মিলে জনস্বাস্থ্যে একটি প্রকৃত ঝড়ো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এটা একটা অত্যন্ত ভঙ্গুর পরিস্থিতি। এ বিষয়ে আমাদের স্টাফ ও অন্য যেসব সংগঠন মাঠপর্যায়ে কাজ করছে তাদের সবার অব্যাহতভাবে দৃষ্টি দেয়া দরকার।
আসন্ন চ্যালেঞ্জ
বর্তমান অবস্থার মধ্যে নতুন করে এক জরুরি অবস্থা এগিয়ে আসছে। এটা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও মৌসুমী ঘূর্ণিঝড় হয়। আর এসব উদ্বাস্তু শিবির যে এলাকায় অবস্থিত তা প্রচ- ঘূর্ণিঝড় প্রবণ। সেখানে ডায়রিয়অ সহ পানিবাহিত রোগের বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
আমরা এরই মধ্যে দেখেচি, কিভাবে মানুষের বিপদ দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে আমরা হাম ও ডিপথেরিয়অর চিকিৎসা দিচ্ছি। সব সময়ই এমন সব রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ প্রস্তুত নন ত্রাণকর্মী ও স্বাস্থ্য বিভাগ। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সব পক্ষের এ সঙ্কটে সাড়া দেয়ার একটি সুযোগ রয়েছে। তা হলো টার্গেটেড মানুষদেরকে টিকার আওতায় আনা। উদ্বাস্তু শিবিরে যানবাহন প্রবেশের সুযোগ আছে, এমন শিবির বা ঘর নেই বললেই চলে। তাই অসুস্থ কাউকে স্থানান্তর করতে হয় পায়ে হেঁটে। আশ্রয় শিবিরের ধরনের বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, এসব আশ্রয়শিবির ভারি বর্ষণে টিকে থাকতে পারবে কিনা। 
আমরা সম্ভাব্য ভূমিধসের আশঙ্কা করছি। অথবা এমনও হতে পারে বৃষ্টির কারণে পথগুলো অত্যন্ত কর্দমাক্ত হয়ে পড়বে। এতে অধিক সংখ্যক মানুষ পড়ে গিয়ে আহত বা হাতপা ভেঙে যেতে পারে। বর্তমানে আমরা আমাদের জরুরি সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। আমরা স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের অবকাঠামোর ক্ষতি ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছি।
চিকিৎসা সেবা চলছে
কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ মানুষের ঢলের পরে এখন আমাদের অগ্রাধিকার হলো মেডিকেল সেবা সংহত করা। সেকেন্ডারি স্বাস্থ্য সার্ভিসের দিকে দৃষ্টি দেয়া। যদি ইে সঙ্কটের কথা ভুলে যাওয়া হয় তাহলে কিভাবে সাড়া দিতে হবে সে জন্য আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ের দিনগুলোতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ছিল আমাদের জন্য অগ্রাধিকার। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের লোকজন এসব কাজ করছেন। তবে হাসপাতাল সার্ভিসগুলোতে এখনও ফারাক রয়ে গেছে।
উপরন্তু, যেসব মানুষ ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছেন তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যখন আমরা জরুরি বিষয়ে সাড়া দিই তখন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার মাধ্যমে তা করি। এর মধ্য দিয়ে আমাদের কাজকে গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্ব নিশ্চিত করা হয়। মানবিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিষয়ে বোধোদয় হয়।
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় গ্রহণের স্থানগুলোতে মানুষের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা ও দেশের ওপর বড় একটি চাপ পড়ছে।
(কেট নোলান, বাংলাদেশে মেডিসিন সান ফ্রন্টিয়ের্স-এর ইমর্জেন্সি কোঅর্ডিনেটর। সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

বিএনপি কি নেতৃত্ব সংকট কাটাতে পারবে? by শ্রুতি এস. পত্নায়েক

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশ ও গ্রেপ্তার অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে এনেছে। সেটা কেবলই দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, প্রশ্ন উঠেছে ২০১৮ সালের শেষাশেষি অনুষ্ঠেয় পরবর্তী সংসদীয় নির্বাচন নিয়েও।
৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ৫ বছর কারাদণ্ড দিয়েছে। তারেক রহমান, যিনি রাজনৈতিক উত্তরসূরি, দলটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়াম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁকে দুই লাখ ৫২ হাজার মার্কিন ডলার তছরুপের দায়ে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দোষী সাব্যস্ত করার ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে একটি শক্ত দাগ ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ও অন্যুন দুই বছর দণ্ডিত হওয়া এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। যে কোনো গণতন্ত্রে দুর্নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই রায়টি উচ্চ আদালতে সমুন্নত হলে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পরিবর্তন এনে দেবে।
বিএনপি এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মাইনাস টু ফর্মুলার অংশ হিসেবে মঈন ইউ আহমেদের নেতৃত্বাধীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দায়ের  করেছিল। ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার একই ধরনের মামলা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও দায়ের করছিল। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বাতিল করে দেওয়া হলেও মিসেস জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকে। এই মামলা ছাড়াও মিসেস জিয়া অন্যান্য ফৌজদারি মামলায়ও অভিযুক্ত হয়েছেন, যা দেশের বিভিন্ন আদালতে এখন বিচারাধীন রয়েছে।
বিএনপি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে দুর্বলতম অবস্থায় রয়েছে। ২০১৫ সালের শুরুর  মাসগুলোতে সহিংস প্রতিবাদে অংশগ্রহণের অভিযোগে দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই সহিংসতায় একশ জনের বেশি লোকের মৃত্যু ঘটে। যাদের অধিকাংশই পেট্রলবোমা হামলায় জীবন্ত দগ্ধ হয়েছে। খালেদা জিয়ার দোষী সাব্যস্ত হওয়া বিএনপির রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের উপর একটি ভয়ানক হুমকি সৃষ্টি করেছে। যদিও এ ধরনের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়ে দলের প্রস্তুতি ছিল। দলটি অনতিবিলম্বে তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত করছে যে, খালেদা জিয়া কিভাবে তারেক রহমান, যিনি একই মামলায় দশ বছর দন্ডিত, তা সত্ত্বেও দলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছে শীর্ষ পদ হস্তান্তরে শিথিল মনোভাব পোষণ করেছিলেন।
বিএনপি এখন এমন একটি দল দ্বারা পরিচালিত হতে হবে, যার নেতা ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন এবং যার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। এবং সে কারণে তিনি তৃণমূলের কর্মীদের সংগঠিত করার অবস্থায়ও নেই। তারেক রহমানের দুর্বল নেতৃত্ব এর আগে খুবই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল, যখন ২০১৪ ও ২০১৫ সালে তাঁর নির্দেশনায় সহিংস প্রতিবাদ দেখা গিয়েছিল। ওই প্রতিবাদ উল্টো ফল বয়ে এনেছিল এবং দলটির রাজনৈতিক ভাগ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। বহু দেশ বিএনপির সহিংস প্রতিবাদের নিন্দা করেছিল এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে তারা চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই জামায়াতের ক্যাডাররাই ওই সহিংস প্রতিবাদের পেছনে ছিল বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়।
এসব জিনিস মনে রেখে দলটি একটি বিজ্ঞচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া তার দণ্ডাদেশের পরে দলীয় কর্মীদের সহিংস পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিএনপি কয়েক মাস ধরে ভোটারদের সমর্থন কুড়িয়ে চলছিল। এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল গত বছরের অক্টোবরে। কয়েক মাস লন্ডনে কাটিয়ে  দেশে ফিরে এলে জনতা তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছিল। একই মাসে বিপুল সংখ্যক জনগণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। ওই সময় তিনি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন।
বিএনপি অব্যাহতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরুজ্জীবনের দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের কথা দলটি ঘোষণা করেছে। অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি শেখ হাসিনার সরকার পূরণ না করার ক্ষেত্রে, দলটি ভোটারদের কাছে এই ধারণা দিয়ে আসছে যে, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসে নি। এই দাবি পূরণ না হওয়ার কারণে ২০১৪ সালে নির্বাচন তারা বয়কট করেছিল। বিএনপি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না। ওই ভুলের কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাদের সম্ভাব্য বিজয় ডাকাতি হয়ে গিয়েছিল। যদিও বিএনপির মহাসচিব, বেগম খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার অঙ্গীকার করছেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ও তাঁর ছেলেকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে যে নির্বাচন হবে, তাতে বিএনপিকে অংশ নিতে দিতে রাজি হবেন কি না? বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ পাঁচ বছর পরে আবারও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনার সুযোগ হাতছাড়া করবেন কি না? বেগম জিয়া এবং তারেক রহমান নির্বাচনে অযোগ্য হলে দলটি উপদলীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচতে পারবে কি না? আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ কিভাবে অনুমান করা হতে পারে? যদিও এসব প্রশ্ন হাইপোথেটিক্যাল। কিন্তু এসব বিষয়ই আগামী নির্বাচনের জন্য কৌশল নির্ধারণ করতে গিয়ে দলটিকে বিবেচনায় নিতে হবে।
যখন নির্বাচন আবারও বয়কট করা একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প নয়, তেমনি কারাগার এবং লন্ডন থেকে দল নিয়ন্ত্রণ করা সমানভাবে চ্যালেঞ্জিং বলেই প্রমাণিত হবে। দলের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তাদের উপরে দল পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণে দলের আস্থাহীনতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের আগস্টে মীর্জা ফখরুলকে দলের মহাসচিব করা হয়েছিল, এর আগে তাকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে পাঁচ বছর থাকতে হয়েছিল।
উপরন্তু দলটির প্রধান মিত্র জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনহীন হয়ে পড়েছে। তাদের অনেক ক্যাডার কারাবন্দী। কিংবা অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ফৌজদারী মামলায় লড়ছেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছাড়াই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, বিএনপি রাজপথের শক্তি প্রদর্শনে যেমন, তেমনি রাজনৈতিক সংকল্প দেখাতেও ঘাটতি দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগের এটা বেশ ভালই জানা আছে যে, যখন দলটি বিশেষ করে তার ক্যাডাররা বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা মোকাবেলা করছে, তখন একটি হতদ্যম বিএনপির পক্ষে লড়াকু মনোভাব দেখানোর শক্তি দেখানো সম্ভব নয়।
২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি তার রাজপথের শক্তি প্রদর্শন তীব্র করেছিল। তখন পর্যন্ত তাদের চার লাখ তিন হাজার ৮৭৮ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৬৮০ টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে দলীয় চেয়ারপারসন বেগাম খালেদা জিয়সহ ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধে চার হাজার তিন শ একত্রিশটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দলটির ১২ জন স্থায়ী কমিটির সদস্য ২৮৮টি মামলা মোকাবেলা করছেন। বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন কারাগারে ১৭ হাজার ৮৫৮ জন বিএনপি নেতাকর্মী বন্দি রয়েছেন। উপরন্তু দলীয় নেতৃবৃন্দ যখন সংসদের সদস্য নন, কিংবা তারা বিভিন্ন ধরণের  রাজনৈতিক প্রিভিলেজ বা সুবিধা ভোগ করেন না, তখন দলীয় ক্যাডারদের মনোবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ দলীয় নেতারা ওই ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন বলেই একটি পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক টিকে থাকে।
সে কারণে বিএনপির অভ্যন্তরে যে বিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে সুবিধা উসুলে চেষ্টা করতে পারে আওয়ামী লীগ।  গত বছরে দলটি তার কাউন্সিল অধিবেশনের আয়োজন করলে বিএনপির অভ্যন্তরে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল। দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা কোণঠাসা হয়েছিলেন এবং কেবলমাত্র নেতৃত্বের প্রতি অনুগতরাই দলের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করেছিল।
যদি প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশ এবং এই অঞ্চলের জন্য অনুকূল নয়। সাত শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভালই সাফল্য দেখিয়ে চলছে। দেশটি এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানীকারক দেশ। বিএনপি কিভাবে তার ক্ষয় হতে থাকা রাজনৈতিক পুঁজি থেকে নিজকে বাঁচিয়ে পথ চলতে পারে এবং আগামী সাধারণ নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।  
(শ্রুতি এস. পত্নায়েক: দিল্লি ভিত্তিক বেসরকারি থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ এন্ড অ্যানালাইসিস (আইডিএসএ)-এর রিসার্চ ফেলো। ১৫ ই ফেব্রুয়ারি আইডিএসএ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

বঙ্গোপসাগরে সামরিক সম্পদের উপস্থিতির বিষয়ে ভারতীয় বিশেষজ্ঞের সতকর্তা

সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের মতো কৌশলগত সামরিক সম্পদে (বা অস্ত্রে) সমৃদ্ধ হচ্ছে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হলে তা থেকে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহতা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এতে বলা হয়, এরই মধ্যে চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কিনেছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার কাছ থেকে তা কেনার দিকে ঝুঁকেছে মিয়ানমার। এক্ষেত্রে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন ভারতের অবসরপ্রাপ্ত ভাইস এডমিরাল পি কে চট্টোপাধ্যায়।
সোমবার কলকাতায় ‘ইন্ডিয়াস মেরিটাইম কানেক্টিভিটি: ইমপর্টেন্স অব দ্য বে অব বেঙ্গাল’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তিনি। এর আয়োজক ছিল অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এ সম্মেলনে পিকে চট্টোপাধ্যায় বলেন, এসব অস্ত্রের বিষয়ে আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। যেহেতু এমন সব নৌযানের উপস্থিতি বাড়ছে (বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে), তাই ভুল বোঝাবুঝির ফলে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর মধ্যে সংঘাত বেধে যাওয়ার খুব বেশি আশঙ্কা রয়েছে। সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে সাবমেরিনের মালিক হতে যাচ্ছে মিয়ানমার। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, সরবরাহকারী যদি একই হয়। এখানে উল্লেখ্য, রাশিয়ায় তৈরি সাবমেরিন পরিচালনা করে ভারত। তা ছাড়া নৌবাহিনীর বিমান ও যুদ্ধজাহাজ অব্যাহতভাবে ভারতের জলসীমায় কোনো চীনা জাহাজ বা সমরাস্ত্র প্রবেশ করেছে কিনা তার ওপর নরজরদারি করছে। এক্ষেত্রে বন্ধু দেশগুলোর নৌবাহিনী যদি সেই একই চীনে তৈরি সাবমেরিন পরিচালনা করে তাহলে ভারতীয় গবেষকরা বা অনুসন্ধানকারীরা দ্বিধায় পড়তে পারেন। এ বিষয়ে পিকে চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমরা মনে হয় না, চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ ধারণার বিষয়ে মানুষের অতো নজর দেয়া উচিত। উল্লেখ্য, পিকে চট্টোপাধ্যায় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কমান্ডের সাবেক কমান্ডার ইন চিফও। তিনি বলেছেন, ভারতকে ঘিরে ফেলা হয়েছে এটা ভাবা উচিত বলে আমার মনে হয় না। চীন শুধু সমুদ্রভাগে তার উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে। একই কাজ করতে ভারতকে কেউ বাধা দিচ্ছে না। তিনি পরে কৌশলগতভাবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে অর্থনৈতিক ও সামরিকীকরণে ভারতের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আন্দামান দ্বীপের ভূমির আয়তন প্রায় ৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে শতকরা মাত্র ৬ ভাগ হলো রাজস্ব সংক্রান্ত। শতকরা মাত্র ০.৬ ভাগ ভূমি ব্যবহার করে সেনাবাহিনী। আমাদের মনকে উদার করতে হবে। সেখানে আমাদেরকে পরিবেশগত ক্লিয়ারেন্স বিষয়ক নীতি গ্রহণে নতুন করে ভাবতে হবে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে উল্লেখযোগ্য সম্পদ (সামরিক) রাখার কোনো বিকল্প হতে পারে না। আমাদের গবেষণা করে দেখা দরকার যে, নৌবাহিনীর ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড থেকে কি পরিমাণ সম্পদ সেখানে স্থাপন করা যায়।
ওই সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ভারতে জাপানের কনসুল জেনারেল মাসায়ুুকি তাগা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর তাকেনোরি হোরিমোতা, সিনিয়র গবেষক হিদেহারু তানাকা ও যাদবপুর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অনিন্দ্য জ্যোতি মজুমদার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার কেনা নিয়ে ভারত-চীন কূটনৈতিক লড়াই

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার কেনা নিয়ে তীব্র এক কূটনৈতিক লড়াই চলছে ভারত ও চীনের মধ্যে। উভয় দেশই ওই শেয়ার কিনতে ব্যাপক চেষ্টা তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় তদ্বির করতে উড়ে এসেছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিক্রম লিয়ামে। তাদের থেকে শতকরা ৪৫ ভাগ বেশি দাম হাঁকিয়েছে চীন। নিয়ম অনুযায়ী, ওই শেয়ার পাওয়ার কথা চীনের। তা সত্ত্বেও ভারত দু’দেশের শক্তিশালী সম্পর্কের দোহাই দিয়ে ওই শেয়ার পাওয়ার জন্য তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছে।
কারণ, চীন এ অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এটা নয়া দিল্লির মাথা ব্যথার কারণ। এসব কথা লিখেছে ভারতের অনলাইন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। এতে আরো বলা হয়েছে, চীনা স্টক এক্সচেঞ্জের এক কনসোর্টিয়াম ওই শেয়ারের মূল্য ভারতের চেয়ে শতকরা ৪৫ ভাগেরও বেশি দাম হাঁকিয়েছে। তা সত্ত্বেও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নেতৃত্বাধীন ভারতীয় একটি কনসোর্টিয়াম ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের যে মূল্য হাঁকিয়েছে, তাতেই তারা ওই শেয়ার পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে লবিং করছে। চীনের সাংহাই ও শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জের সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওই শেয়ারের প্রতিটির মূল্য দিতে চেয়েছে ২২ টাকা। সব মিলে শেয়ারের মূল্য দাঁড়াবে ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অন্যদিকে ভারতের এনএসই কনসোর্টিয়াম প্রতিটি শেয়ারের দাম বলেছে মাত্র ১৫ টাকা। বিশ্বাস করা হয় যে, চীনা এক্সজেঞ্জ যে প্রস্তাব বা দাম বলেছে, তা গ্রহণ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। তবে এই দর অনুমোদিত হতে হবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে। এছাড়াও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আরো ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রস্তাব করেছে। এক্ষেত্রে ভারতের এনএসই কনসোর্টিয়াম শুধু প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তার অর্থমূল্য কি হবে তা জানায় নি।
এ অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারকে ঠেকানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এ জন্য বিএসইসি’র সঙ্গে তদ্বির করতে উড়ে বাংলাদেশে এসেছেন এনএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিক্রম লিমায়ে। যে কনসোর্টিয়াম শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার কেনার অনুমতি পাবে তারা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পরিষদে বড় একটি আসন পাবে। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। এর আগে পাকিস্তান, নেপাল ও মিয়ানমারের শেয়ার বাজারের স্টক কিনেছে চীনা কনসোর্টিয়ামগুলো। ফলে এ অঞ্চলে চীন এক্ষেত্রে ক্রমশ তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বলা যায়, তার আধিপত্য বিস্তার করছে। এটাই নয়া দিল্লির উদ্বেগের কারণ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে ঢাকার একটি পত্রিকা লিখেছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া থেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে কিনা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে এনএসই। তারপরও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আশায় বুক বেঁধে আছেন। তারা মনে করছেন, তাদের অনুরোধ গ্রহণ করবে বাংলাদেশ সরকার। কারণ, দেশ দুটির মধ্যে বন্ধন রয়েছে শক্তিশালী। শুক্রবার ব্লুমবার্গকে বিক্রম লিয়ামে বলেছেন, এখনও আমরা আশাবাদী। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আমরা আশা করছি, শেয়ার বাজারের উন্নয়নে আমাদের অবদানের বিষয়ে তারা সহায়তা করবে। আমাদের অভিজ্ঞতা ও ট্র্যাক রেকর্ডকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার ও এক্সচেঞ্জকে উন্নত করার মতো ভালো অবস্থানে আছি আমরা। ওদিকে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বিএসইসির একজন মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেছেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের জন্য অপেক্ষায় আছি আমরা। তারপরই সিদ্ধান্ত নেবো। আমাদেরকে বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থকে, সর্বোপরি আমাদের দেশের স্বার্থ বড় করে দেখতে হবে।
ওই রিপোর্টে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের অন্যতম পরিচালক শাকিল রিজভির বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি বলেছেন, পরিচালনা পরিষদ চীনা দরপত্রটি গ্রহণ করেছে। এর কারণ, চীনের দরটিই সর্বোচ্চ। এখন এটা বিএসইসি থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। তারা যদি অনুমোদন করতে চান, করতে পারেন। কিন্তু তারা করছেন না।
উল্লেখ্য, পুঁজিবাজারকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ তার শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে বিদেশী কোনো অংশীদার খুঁজে পেতে মুখিয়ে আছে এই এক্সচেঞ্জ।

বড় অঙ্কের চেক ফিরিয়ে দিচ্ছে ব্যাংক

সাম্প্রতিক সময় দেশের ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের সংকটে বড় অঙ্কের চেক ফিরিয়ে দেয়ার পরিমাণ বেড়েছে। আমানতকারীরা চেক দিয়েও সময়মতো টাকা পাচ্ছেন না। তহবিলের অভাবে চেক বাউন্সও হচ্ছে। বিশেষ করে বড় বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এ রকম হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের ঋণের অর্থ ছাড় করতেও সময়মতো দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া বেশকিছু ব্যাংকে আমানতকারীর সংখ্যাও কমছে।
এফডিআর ভাঙানোর হিড়িক পড়েছে এসব ব্যাংকে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ব্যাংকাররা। গতকাল ব্যাংকপাড়া নামে খ্যাত মতিঝিলের বিভিন্ন নতুন ও পুরাতন ব্যাংকের শাখায় সরজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। রাজধানীর বাইরের শাখারও একই চিত্র বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ব্যাংক কর্মকর্তারা আমানত ফেরত দিতে গড়িমসি করছে। সঠিকভাবে লেনদেন করা যাচ্ছে না। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, এ্যাকাউন্ট ক্লোজ আর ওপেনিংয়ের মধ্যেই তাদের সময় কাটছে। তারা স্বীকার করেছেন, সংকুচিত হয়ে আসছে লেনদেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, গণমাধ্যমে যতটুকু আসছে, বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। শেয়ার মার্কেটের মতো বিপর্যয় আসতে পারে। ফলে ব্যাংক থেকে ব্যাপকভাবে টাকা উত্তোলনের হিড়িক পড়তে পারে। এ ছাড়া গত কয়েক মাস ধরে ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ কমাসহ খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে এই অর্থ সংকট বলে মনে করেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা। মাস ছয়েক আগেও দেশের ব্যাংকগুলোতে দেখা  গেছে অতিরিক্ত তারল্য। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে গেছে।
জানা গেছে, আস্থার সংকট শুরু হয় বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক  কেলেঙ্কারির ঘটনা দিয়ে। এই ব্যাংকে রাখা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। জলবায়ু তহবিল ৫০৮ কোটি টাকা ফেরত না পাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানায় টিআইবি। এরপরই বেসরকারি ব্যাংক থেকে তহবিল সরিয়ে ফেলতে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান।
ব্যাংকাররা জানান, আরো বেশ কয়েকটি ব্যাংকে এমন পরিস্থিতি ঘটেছে। বিশেষ করে নতুন ব্যাংকগুলোতে। নতুন কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নিরাপদ বোধ করছে না। পুরনো বেসরকারি ব্যাংক থেকেও কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এতে তারল্যসংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো। যার প্রভাব পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে।
এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবার একটি অনুষ্ঠানে গভর্নর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এতে গভর্নর বলেন, একটি বেসরকারি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে নিতে চাইছে। একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
গতকাল মতিঝিলে চেক ফেরতের বিষয়ে কথা হয় একটি বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কাজী সাজেদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল কিনতে আরেক প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেয়ার জন্য চেক দিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার লেনদেনকারী ব্যাংক ওই ব্যবসায়ী বন্ধুকে টাকা দিতে পারেনি। চেক ফিরিয়ে দিয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে আমরা অন্য মাধ্যমে ওই ব্যবসায়ীকে টাকা দিয়েছি। ব্যাংকাররা বলেন, শুধু সাজেদুর রহমান নন। সাম্প্রতিক সময়ে চেক ফেরতের ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সরজমিন দেখা গেছে, গতকাল মতিঝিলের একটি ব্যাংকের শাখায় ৫০ লাখ টাকার চেক নিয়ে বসে আছেন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তারা বারবার তাকে অপেক্ষা করতে বলছেন। দুপুর পার হয়ে গেলেও তিনি টাকা হাতে পাননি। এর আগেও দুইদিন তিনি টাকা তুলতে ব্যাংকে এসে ফিরে যান বলে জানান। তবে পরে পরিমাণের চেয়ে কিছু কম টাকা পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া কোনো কোনো শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো গ্রাহককে হাতজোড় করে পরে আসতে বলছেন। ফলে এ্যাকাউন্টে টাকা থাকলেও চেক দিয়ে টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বারবার চেক বাউন্স হচ্ছে। এতে বেকায়দায় পড়েছেন গ্রাহকরা। এটা শুধু ঘটছে বড় বড় গ্রাহকের ক্ষেত্রে। তবে ছোট আকারের এ্যাকাউন্টের গ্রাহকরা সহজেই টাকা তুলতে পারছেন। গতকাল মতিঝিলের বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় সরজমিন পরিদর্শনে এসব তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের সমস্যা নয়, এটি ব্যাংকের সামগ্রিক চিত্র। নগদ টাকার সংকট চলছে। এ জন্য চেক দিয়ে নিজের জমানো টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা।
মতিঝিলের একটি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দেখা যায়, একদিকে ১০ থেকে ১২ জন লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিচ্ছেন। অন্যপাশে দুটি লাইনে ৭ থেকে ৮ জন চেক হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। এর মধ্যে যারা বড় এ্যাকাউন্টের টাকা তুলতে এসেছেন তাদের বেশ খানিকটা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কোনো কোনো কর্মকর্তারা তাদের আলাদা ডেকে নিচ্ছেন। বোঝানোর চেষ্টা করছেন, টাকা আপনি পাবেন। কিন্তু সময় লাগবে। এখন ফান্ড ক্রাইসিস। পরে আসেন। এত টাকা এক সঙ্গে দেয়া যাবে না। ওই গ্রাহকের নাম আমিনুল ইসলাম। পেশায় ব্যবসায়ী। ব্যবসার পাওনা পরিশোধে টাকা নেয়ার জন্য আগেই নোটিশ করে চেক পাঠান। ওই দিন চেকটি বাউন্স করে। সে ৫ লাখ টাকার একটি চেক দিয়েছিল।
একটি ব্যাংকের ম্যানেজারের কক্ষে প্রবেশ করে দেখা যায়, হাতে চেক নিয়ে দুই গ্রাহক বসে আছেন। তাদের দু-একদিন পরে আসার জন্য অনুরোধ করছেন ম্যানেজার। এফডিআর মেয়াদপূর্তির আগে ভেঙে ফেলতে চান। কিন্তু ম্যানেজার বলছেন, এখন মেয়াদপূর্তির আগে কারো এফডিআর ভাঙা হচ্ছে না। আপনি পরে আসেন।
একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংকিং জীবনে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কখনো পড়িনি। গ্রাহকরা টাকা নিতে আসছেন; কিন্তু তাদের টাকা দিতে পারছি না। হাতজোড় করে তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন বলেন, অপারেশন খরচ কমাতে হবে। ডিফল্ট ঋণ, বন্ধ ঋণগুলো আদায় করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি চলমান এই সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই সব থেকে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই সরকারি প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে নেয়ায় এর প্রভাব অন্য প্রতিষ্ঠানেও পড়ছে।
এদিকে ঢাকা চেম্বারের একটি প্রতিনিধি দল গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি বৈঠক করে। সংগঠনটির সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, গভর্নর আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন  যে ব্যাংকে তারল্যসংকট সাময়িক। এটা কিছু ব্যাংকের জন্য হচ্ছে, পুরো খাতের চিত্র নয়। তবে আমরা যখন ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন ঠিকই তারা তারল্যসংকটের কথা বলছেন।
পুরাতন একটি ব্যাংকের পরিচালক আবদুল আজিজ বলেন, এখানে হঠাৎ করেই শেষ ছয় মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি বেড়ে গেছে। ডিফল্ট  লোনগুলো যথাসময়ে রিকভার হচ্ছে না। ফলে একটা খারাপ সময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রিটেনের রাস্তায় মুসলিম নারীরা অহরহ বর্ণবাদী আচরণের শিকার হন : করবিন

যুক্তরাজ্যের রাস্তায় মুসলিম নারীদের অহরহ বর্ণবাদী আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। দেশব্যাপী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করার অংশ হিসেবে রোববার লন্ডনের ফিন্সবুরি পার্ক মসজিদে ভিজিট মাই মসক ডে নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। করবিন ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন। এ ছাড়া দেশটির আরও দুশটি মসজিদ এ আয়োজন করে। ফিন্সবুরি পার্ক মসজিদ পরিদর্শনে গিয়ে লেবার নেতা বলেন, আমাদের সমাজে ইসলামবিদ্বেষ একটি মৌলিক সমস্যা। ইহুদি কিংবা আফ্রো-ক্যারেবীয় লোকদের প্রতি যে বিদ্বেষ সমাজে প্রচলিত আছে, তার চেয়ে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার বিস্তার কম নয়। তিনি বলেন, আমি যেসব মুসলিম নারীদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমার কাছে এমন অভিযোগ করেছেন। নারীরা হিজাব পরলে তাদের হেনস্তা হতে হয়। এটি তাদের প্রতি অন্যায়, এটি আমাদের সবার প্রতি অন্যায়। মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেন এ কর্মসূচির আয়োজন করে। ইসলাম নিয়ে ভীতি দূর করতে ভিজিট আওয়ার মকস ডেতে বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের লোকদের মুসলমানদের নামাজ দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ সময়ে অন্য ধর্মের লোকেরা যাতে ইসলাম নিয়ে তাদের প্রশ্ন করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হয়। কোরআন পড়া ও হিজাব পরার এই অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন ছিল। গত বছরের জুনে ফিন্সবুরি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর এই প্রথম এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। সেদিন ড্যারেন অসবর্ণ নামে এক ব্যক্তি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়া মুসল্লিদের ওপর ভ্যান উঠিয়ে দিলে একজন নিহত ও ১২ জন আহত হন। এ ঘটনায় মামলার বিচারক বলেন, মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার আদর্শ থেকেই এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

পরলোকগত শিক্ষামন্ত্রীদের গোলটেবিল by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বর্তমান বাংলাদেশে সব পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র শুকনো পাতার মতো ওড়ে মাঠঘাটে। প্রশ্নপত্র পেয়ে বাপ-বেটা একত্রে উত্তর তৈরি করে অথবা মা-বেটি দৌড় দেয় কোচিংয়ের শিক্ষকের বাড়ি। কখনো পরীক্ষার পরে পরীক্ষার খাতা পাওয়া যায় পরীক্ষকের বাড়ির পাশের খালে, নয়তো বাজারের মুদি দোকানে। যার খাতা দিয়ে মুদি দোকানি গুড়ের পোঁটলা বানায় সে ঠিকই উপযুক্ত নম্বর পেয়ে সগৌরবে জিপিএ-৫ পায়। পত্রপত্রিকায় এসব সম্পর্কে এবং শিক্ষাজগতের দুর্নীতি নিয়ে দেদার লেখালেখি হলেও তা থামছে না এবং সম্ভবত থামবেও না। কীভাবে এসব খবর পৃথিবীর ওপার পৌঁছে গেলে কয়েকজন পরলোকগত শিক্ষামন্ত্রী বিচলিত বোধ করেন। তাঁরা আয়োজন করেন একটি গোলটেবিলের। সেই গোলটেবিলের বিবরণ আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। সেটি হুবহু নিচে ছাপা হলো। বাংলার পরলোকগত শিক্ষামন্ত্রীদের ভেতর শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রবীণতম। ১৯২৪ খ্রিষ্টীয় অব্দে লর্ড লিটন তাঁহাকে অবিভক্ত বঙ্গ প্রেসিডেন্সির শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত করেন। তাঁহার পূর্বসূরি চব্বিশ পরগনা নিবাসী বঙ্গসন্তান পিসি মিত্তার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে কৃষিপ্রধান পূর্ববঙ্গের শিক্ষার উন্নতিকল্পে বিশেষ মনোযোগ প্রদান করিবার অবকাশ পান নাই। পূর্ববঙ্গের জেলাগুলি বরাদ্দ কম পাইত। হক মন্ত্রীর আসন গ্রহণ করিবার পর যেসব জেলায় বিদ্যালয় কম সেখানে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে তিনি শিক্ষার সর্বনাশ না ঘটাইয়া তাহার উন্নতি সাধন করিবার প্রয়াস গ্রহণ করেন। সেই কারণে তাঁহাকে পরলোকগত শিক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে পৌরোহিত্য করিবার জন্য প্রস্তাব করা হয়। সর্বসম্মতিক্রমে তাহা গৃহীত হয়। শেষনিশ্বাস ত্যাগ করিবার সময় শেরেবাংলার একটি দন্তও অবশিষ্ট ছিল না। সে কারণে তাঁহার উচ্চারণ অস্পষ্ট ছিল। প্রারম্ভিক বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বলিলেন, কোনো জাতির জীবিতেরা যখন পচিয়া যায়, জাতির জন্য তাহাদের কিছুই করিবার অবশিষ্ট থাকে না, মৃতদের চাইতেও প্রাণহীন হইয়া পড়ে, তখন পরলোকগতদের অন্তত কিছু করিবার থাকে। যে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা দেড় শত বৎসর পূর্বে প্রবর্তিত হইয়াছিল আজিকে তাহা ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে। জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
ইহা অনিচ্ছাকৃত না পরিকল্পিত তাহা অন্তর্যামী ছাড়া আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। যত নিন্দা-প্রতিবাদ ততই বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হইতেছে। পরীক্ষায় নকল ও শিক্ষা বিভাগে দুর্নীতি চলিতেছে দুর্বার গতিতে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্ণকুহরে কেহ হয়তো সিসা ঢালিয়া দিয়াছে। এখন আমাদের কী করণীয় তাহা আপনারা আলোচনা করিয়া নির্ধারণ করুন। একজন অখ্যাত মন্ত্রী পিছনে বসিয়া ছিলেন। তিনি কহিলেন, আমরা তো আর দুনিয়ায় যাইতে পারিতেছি না। সে পথ রুদ্ধ। কী আর করিতে পারি? স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন শেরেবাংলার পার্শ্বেই বসিয়া ছিলেন। তিনি বলিলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস তো ব্যাধি নহে-উপসর্গমাত্র। প্রকৃত ব্যাধি হইল দুর্নীতি। যাহাই হউক, শিক্ষাব্যবস্থায় অরাজকতা সম্পর্কে কী করা যায় সে সম্পর্কে দুইজন বাঙালি কবির মতামত লওয়া যাইতে পারে। শেরেবাংলা বলিলেন, সেলফোনে কবিগুরুকে ধরুন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ফোনে বলিলেন, আমিও আপনাদের মতো অতিশয় অশান্তিতে রহিয়াছি। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে কী রাখিয়া আসিলাম আর কী শুনিতেছি। আমার কুড়ি পঁচিশখানি সংগীত প্রতি প্রহরে গীত হইলেও আমার গদ্য, রচনাগুলি কেহ পাঠ করিবার প্রয়োজন বোধ করে না। তাহাতেই আমার শিক্ষাচিন্তা ব্যক্ত করিয়াছি। নিজে কখনো পরীক্ষা দিয়া পাস করি নাই। কাজেই প্রশ্নপত্র কি তাহা বলিতে পারিব না, সুতরাং ফাঁসের প্রসঙ্গই আসে না। মানুষ যখন নিজেই নকল মানুষে পরিণত হয় তখন পরীক্ষায় নকল হইবে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হইবে, খাতা না দেখিয়া অনুমানে নম্বর প্রদান করা হইবে, এমনকি পরীক্ষার ফিস জমা না দিয়াও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাইবে। ইহার পর ফোন লাগানো হইল বিদ্রোহী কবিকে, যিনি প্রমোশন পাইয়া জাতীয় কবির পদে আসীন হইয়াছেন। শিক্ষামন্ত্রীর ফোন পাইয়া কবি বলিলেন, আমি হইলাম স্কুল-পালানো ছাত্র। বিদ্যালয় হইতে পলায়ন করা পরীক্ষায় নকল করার চাইতে কম অপরাধ নয়। আপনাদের একালের সমমানের এসএসসি পাস করিবার সৌভাগ্য আমার হয় নাই। আমি হইলাম বেপাস মানুষ। তবু তো আপনি আমাদের জাতীয় কবি। বর্তমান অবস্থায় কী করা যায় সে ব্যাপারে আপনার পরামর্শ আবশ্যক। নকল প্রতিরোধ বা প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কী করা যায় বলুন। কবি বলিলেন, প্রশ্ন না করিলেই তাহা আর ফাঁস হইবে না।
ইহার অর্থ বুঝিলাম না।
কবি পরিষ্কার করিলেন তাঁহার বক্তব্য। কোনো প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রয়োজন নাই। সব শ্রেণির পরীক্ষার্থীকে বলা হইবে আমার ‘বিদ্রোহী’ আর জসীমের ‘কবর’ কবিতা দুইটি পরীক্ষার খাতায় লিখিয়া দিয়া আসুক। যাহাদের একটিও বানান ভুল হইবে না, শুধু তাহারাই জিপিএ-৫ পাইয়া উত্তীর্ণ হইবে। তাহাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্ভাবনা থাকিবে না বলিয়াই কবি এমন জোরে অট্টহাসি দিলেন যে যিনি ফোন করিয়াছিলেন তাঁহার বাম দিকের কানের পর্দা ফাটিয়া যাওয়ার উপক্রম হইল। বৈঠকে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চলিল। কোনো সিদ্ধান্ত হইল না। একপর্যায়ে শেরেবাংলা বলিলেন, আমি আর বলিতে পারিতেছি না। কোমর ধরিয়া আসিতেছে। পেটেরও কিঞ্চিৎ গোলযোগ। মোরগের আস্ত দুইটি মোসল্লাম, একটি বড় ইলিশ ভাজা এবং ভীমনাগের দেড় কেজি সন্দেশ খাইয়াছি। আমি উঠিলাম।
খাজা নাজিমুদ্দিন বলিলেন, বাংলাদেশে শিক্ষার এই শোচনীয় অবস্থায় কী করা যায়?
একজন মন্ত্রী বলিলেন, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমরা শুধু সাবেক নহি-স্বর্গবাসী। কিছুই করিবার নাই। কোনো পরামর্শ দিলে তাহা পত্রপাঠ অগ্রাহ্য হইবে। আজ যদি সাবেক না হইতাম, স্বর্গবাসী না হইয়া যদি শিক্ষামন্ত্রী থাকিতাম, তাহা হইলে জাতির সর্বনাশ করার দায় মস্তকে ধারণ করিয়া পদত্যাগ করিতাম।
শেরেবাংলা উঠিয়া দ্রুত বাথরুমের দিকে যাইতে যাইতে বলিলেন, উত্তম প্রস্তাব।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

চীনের দুই প্রতিষ্ঠানকেই চায় ডিএসই

কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের সেনজেন ও সাংহাইয়ের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম বা জোটকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদ। গতকাল সোমবার ডিএসইর মালিকানার শেয়ার কেনার আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপ্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই কেবল এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। ডিএসইর মালিকানার অংশীদার হতে চীনের দুই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভারতে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশের সমন্বয়ে গঠিত জোটও আগ্রহ দেখায়। তবে দরপ্রস্তাবে চীনের দুই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশ পিছিয়ে ছিল ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত জোটটি। দরপ্রস্তাবে পিছিয়ে থেকে এ জোটটি ডিএসইর অংশীদার হতে নানাভাবে চাপ তৈরি করে। তাতে এ নিয়ে একধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ অবস্থায় গতকাল পর্ষদ সভা করে চীনের সেনজেন ও সাংহাইকে বেছে নেওয়ার পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে ডিএসই। ডিএসইর একাধিক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নানা দিক থেকে চীনের প্রস্তাবটিই বেশ আকর্ষণীয়। প্রতিটি শেয়ারের জন্য ২২ টাকা দরপ্রস্তাবের পাশাপাশি ৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বা ৩০৮ কোটি টাকা সমমূল্যের কারিগরি সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিপরীতে শুধু ১৫ টাকা দামে শেয়ার কেনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত জোট। এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায়ও চীনের দুই প্রতিষ্ঠানকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে মালিকানার অংশীদার করতে একমত হয় ডিএসই পর্ষদ। কিন্তু পরে দরপ্রস্তাবে পিছিয়ে থাকা জোটের নানামুখী চাপের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ অবস্থায় গতকাল পুনরায় বৈঠক করে দরপ্রস্তাবের নানা দিক আরও অধিকতর যাচাই-বাছাই করে চীনের দুই প্রতিষ্ঠানকে অংশীদার করার আগের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত করা হয়। জানা গেছে, কৌশলগত বিনিয়োগকারীর জন্য সংরক্ষিত শেয়ার বিক্রির জন্য গত সেপ্টেম্বরে দরপত্র আহ্বান করে ডিএসই। আইন অনুযায়ী, আগামী ৮ মার্চের মধ্যে বেঁধে দেওয়া সময়ের ভেতরে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তিন দফা বাড়িয়ে এ সময়সীমা নির্ধারণ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসির নির্দেশনায় এ সময়সীমা আরও বাড়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী, মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদা করার পর ডিএসইর মোট শেয়ার ২৫০ সদস্যের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হয়। এসব শেয়ারের মধ্যে ৪০ শতাংশ সদস্যদের নিজেদের জন্য আলাদা করা হয়। বাকি ৬০ শতাংশ শেয়ার সদস্যদের বাইরে বিক্রির জন্য আলাদা করে ব্লক হিসেবে রাখা হয়। এ ৬০ শতাংশ শেয়ারের মধ্যে ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির জন্য আইনিভাবে নির্দিষ্ট করা ছিল। বাকি ৩৫ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য আইনিভাবে নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।

মার্কিন–চীন বাণিজ্যযুদ্ধ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইস্পাত আমদানিতে বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপ করেন, তাহলে তা হবে বেইজিংয়ের বুক তাক করে গুলি ছোড়ার মতো। কিন্তু এর প্রভাব যে শুধু চীনের ওপর পড়বে তা নয়, দেশটি ইস্পাত আমদানি সীমিত করলে বা তাতে শুল্ক আরোপ করলে কানাডা, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়া আক্রান্ত হবে। তখন এর প্রভাব পুরো বাণিজ্যব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় ইস্পাতশিল্প চাঙা করতে ট্রাম্পের ডেস্কে বেশ কিছু প্রস্তাব জমা পড়ে আছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রেসিডেন্টের কাছে যে সুপারিশ পাঠিয়েছে, তাতে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের আমদানি পণ্যের ওপর সব রকম শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে তারা। অন্যদিকে কী পরিমাণ ইস্পাত আমদানি করা হবে তার সীমা নির্ধারণেও প্রস্তাব দিয়েছে। এপ্রিলের আগ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এর যেকোনো একটি অথবা মিশ্র ব্যবস্থা বেছে নিতে হবে। অথবা তিনি একদম ভিন্ন কিছুও করতে পারেন। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাপারেও তাঁর দপ্তরে একই প্রস্তাব এসেছে। এর আগে ট্রাম্পের ইস্পাত নিয়ে বাগাড়ম্বরের লক্ষ্য ছিল চীন। ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প চীনের সমালোচনা করেছিলেন এ জন্য যে দেশটি বৈশ্বিক বাজারে সস্তায় অতিরিক্ত ইস্পাত সরবরাহ করে। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। নির্বাচনী প্রচারণা পর্বে ট্রাম্প পিটসবার্গের এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের সব জায়গা সস্তা ইস্পাতে ভরিয়ে দিচ্ছে। আমরা হয়তো একটু সস্তায় ইস্পাত পাচ্ছি, কিন্তু পরিণামে আমাদের বেকারত্ব বাড়ছে।’ এটা ঠিক যে চীন বিশ্বের শীর্ষ ইস্পাত রপ্তানিকারক, বাজারে তাদের কারণেই অতিরিক্ত সরবরাহ আছে, যে কারণে দাম পড়ে গেছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ব্যবসায়ীরা এত দিন ট্রাম্পের সুরেই কথা বলে এসেছেন। তবে ট্রাম্প এত কিছু বললেও চীন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১০ ইস্পাত সরবরাহকারীর তালিকায়ও নেই। ওবামা প্রশাসন চীনা ইস্পাত আমদানির ওপর যে জরিমানা আরোপ করেছিল সে কারণে দেশটিতে চীনা ইস্পাতের রপ্তানি কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ইস্পাত আমদানি করে কানাডা থেকে,
যার পরিমাণ ১৬ শতাংশ। এ ছাড়া সে ব্রাজিল থেকে আনে ১৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ শতাংশ এবং মেক্সিকো ও রাশিয়া থেকে আনে ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ইস্পাত আমদানির ওপর যে ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আছে তা বাস্তবায়িত হলে পৃথিবীর অনেক দেশই আক্রান্ত হবে।বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প যদি এই পথে হাঁটেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যেমন: কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারে। অথবা তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পণ্য নাও কিনতে পারে।জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক মাইকেল মুর বলেছেন, ‘অভ্যন্তরীণ খাতকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশীদারদের বিরক্ত করা—এ দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রাখা উচিত।’এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যদি প্রত্যাশামতো ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্টের ২৩২ ধারা প্রয়োগ করেন, তাহলে বলতে হয় তিনি বিশ্বাস করেন, ইস্পাত আমদানি জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুক্তি ঠুনকো। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপস-মীমাংসায় তা টিকবে না। ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ম্যাট গোল্ড বলেছেন, ‘আমরা যদি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করি তাহলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেবে।’ চীনের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেশি ইস্পাত না কিনলেও ঘুরপথে চীনের অনেক ইস্পাত যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে—তাই যুক্তরাষ্ট্রের এই সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়িত হলে চীনের অনেক ক্ষতি হবে।

আলু এখন গলার ফাঁস

আলু নিয়ে আবার বিপাকে পড়েছেন কৃষক। জেলা পর্যায়ের পাইকারি হাটগুলোতে প্রতি কেজি আলুর দর নেমেছে ৫ থেকে ৮ টাকার মধ্যে, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম। কৃষকেরা বলছেন, এখন আলু বিক্রি করে তাঁদের কোনো লাভ হচ্ছে না। শুধু কৃষক নন, এই আলু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সবার গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। গত মৌসুমে বিপুল উৎপাদনের কারণে আলুর দামে ধস নামে। বছর শেষে দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ও ফড়িয়া হিমাগারে আলু তোলেননি। তাতে লোকসান দিয়ে হিমাগার মালিকদের অনেকে ব্যাংকের অর্থ ফেরত দিতে পারছেন না। এখন ব্যাংক নতুন করে তাঁদের ঋণ দিচ্ছে না। এখন যোগ হয়েছে ব্যাংকের তারল্যসংকটের বিষয়টিও। সম্প্রতি বেশ কিছু ব্যাংক হাতে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ না থাকায় ব্যবসায়ীদের নতুন করে ঋণ দেওয়া কমিয়েছে। এর পাশাপাশি বেড়ে গেছে সুদের হার। হিমাগার মালিকেরা বলছেন, ব্যাংক ঋণ না দেওয়ায় এ মৌসুমে তাঁরা আলু কিনে হিমাগারে রাখার জন্য কৃষক ও ফড়িয়াদের টাকা দিতে পারছেন না। এতে বাজারে নেতিবাচক সংকেত যাচ্ছে। হিমাগার মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর চাহিদা বছরে ৮০ লাখ টনের মতো। উৎপাদিত হয়েছে চাহিদার চেয়ে ২০ লাখ টন বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, পাঁচ বছর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৮৬ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আলু উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টন। আগের বছরের চেয়ে যা প্রায় ৭ লাখ টন বেশি। প্রতিবছর জুন মাসের পর থেকে বাজারে হিমাগারের আলু বিক্রি শুরু হয়। তখন বাজারে দাম কিছুটা বাড়ে। অক্টোবর, নভেম্বরে আলুর দাম আরও কিছু বাড়ে। গত বছর ঘটেছে বিপরীত ঘটনা। বছরের শেষে আলুর দাম তলানিতে নামে। হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আলুতে লাভ হয়নি। তবে মূলধন টিকেছে। গত বছর প্রায় সবাই লোকসান দিয়ে পুঁজি হারিয়েছে। এ কারণে এ বছর আলু কেনায় আগ্রহ কম। যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। তিনি বলেন, হিমাগারে রাখার জন্য আলু কেনার মৌসুম ১ মার্চ থেকে শুরু হবে। কিন্তু অনেক হিমাগার মালিক ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ সমন্বয় করতে পারেননি। রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, হিমাগার মালিকেরা গত বছরও ঋণ সময়মতো ফেরত দিতে পারেননি। এ বছরও একই অবস্থা। তাঁদের ক্ষতির বিষয়টি প্রকাশ্য। হিমাগার মালিকদের ঋণের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
উৎপাদন খরচের চেয়ে দাম কম
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ৭ টাকা ৪০ পয়সা। বাজারে এখন আলুর দর এর চেয়ে কম। বগুড়ার পাইকারি বাজার মহাস্থানহাটে খোঁজ নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিনিধি জানান, সেখানে গত রোববার প্রতি কেজি গ্রানুলা আলু সাড়ে ৫ টাকা, কার্ডিনাল ও স্ট্রিক জাতের আলু সাড়ে ৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মহাস্থানগড় এলাকার চাষি নূর ইসলাম বলেন, এবার আলু চাষ করে লোকসান হয়েছে। খরচই উঠছে না। বাজারের অবস্থা খুব খারাপ। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিক্রমপুর ভান্ডার নামের একটি আড়তে রোববার প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১১ টাকা ও সর্বনিম্ন ৬ টাকায়। এই আলু উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আনতে কেজিতে ৩ টাকার বেশি পরিবহন ও অন্যান্য খরচ হয়। আড়তের ব্যবস্থাপক মো. সবুজ বলেন, কৃষকের খেত থেকে গ্রানুলা জাতের আলু কেনা হয়েছে সোয়া ৫ টাকা দরে। আর ডায়মন্ড জাতের আলুর দর পড়েছে ৭ থেকে ৮ টাকা। ঢাকার খুচরা দোকানে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, এক মাস আগের তুলনায় আলুর দর ২২ শতাংশ কম।
ঋণ পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা
প্রতিবছর মৌসুমের সময় যে আলু হয়, তার ৬০ শতাংশের মতো হিমাগারে রাখেন হিমাগার মালিক, ফড়িয়া ও কৃষকেরা। হিমাগার মালিকেরা তাঁদের হিমাগারে আলু রাখা নিশ্চিত করতে কৃষক ও ফড়িয়াদের ঋণ দেন। আবার নিজেরাও আলু কিনে রাখেন। এই অর্থ আসে ব্যাংক থেকে। উত্তরাঞ্চলে ৯টি হিমাগারের মালিক মোস্তফা আজাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত মৌসুমে প্রতি বস্তা আলুর (৮৫ কেজি) খরচ পড়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা। শেষ দিকে তা ১৫০ টাকায়ও বিক্রি করতে হয়েছে। ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘গত বছর ব্যাংকে আমার ঋণ ছিল ৬৫ কোটি টাকার মতো। আমি ২০ কোটি টাকা ফেরত দিতে পেরেছি। বেশির ভাগ হিমাগার মালিকই টাকা ফেরত দিতে পারেনি। এ জন্য এখন ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে চাচ্ছে না।’
উপযোগী জাত চাষের পরামর্শ
বছর বছর ভালো দাম না পাওয়ার পরও কৃষকেরা কেন আলু আবাদ করেন, জানতে চাইলে মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, আলু একটু উঁচু জমিতে চাষ করা হয়। এ জমিতে কৃষকেরা বোরো ও আমন ধান আবাদ করেন। এক মৌসুমে আলু হয়। যে জমিতে আলু হয়, সেখানে ধান খুব ভালো হয়। তিনি বলেন, আলু না হলে এ জমিগুলো খালি থাকবে। হিমাগার মালিকেরা কৃষকদের রপ্তানি ও শিল্প খাতে ব্যবহার উপযোগী আলু চাষ করার পরামর্শ দেন। তাঁরা বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারেরও উদ্যোগ দরকার। দেশে যে আলু হয়, তাতে পানির পরিমাণ বেশি। এই আলু চিপস বা স্টার্চ তৈরির উপযোগী নয়। হিমাগার মালিকেরা ক্যারেজ, লেডি রোজ ইত্যাদি জাতের আলু চাষের ওপর জোর দেন।

পরিচালক পুরস্কৃত, ব্যাংকার জেলে, ব্যবসায়ী পলাতক by ফখরুল ইসলাম

বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারির সময়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা সব নিরাপদে আছেন। তাঁরা ঘুরছেন-ফিরছেন, স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। পদ-পদোন্নতি দিয়ে সরকার উল্টো তাঁদের পুরস্কৃতও করেছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যেসব ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা সবাই জামিনে। আদালত থেকে জামিন পেয়ে তাঁদের কেউ দেশে আছেন, কেউবা জামিন পাওয়ার দিনই পালিয়ে চলে গেছেন বিদেশে। আর পর্ষদের হুকুম তামিল করা ব্যাংকাররা সবাই জেলে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় যাঁর প্রধান দায় রয়েছে বলে অভিযোগ আছে, সেই আবদুল হাই বাচ্চু রয়েছেন বহালতবিয়তে। এ বিষয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে দুদকের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই।
আদালতের নির্দেশে গত ৪ ও ৬ ডিসেম্বর দুদক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে ডেকেছিল। এরপর সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি দুদক তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকার পাঁচ বছরে (২০০৯-১৪) নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়। ২০০৯ সালের ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ শতাংশ, আর ২০১৪ সাল শেষে তা দাঁড়ায় ৬৮ শতাংশ। ওই পাঁচ বছরে ব্যাংকটির এই অবস্থার জন্য দায়ী মূলত পরিচালনা পর্ষদ। কেলেঙ্কারির পর এখন পর্যন্ত বেসিক ব্যাংককে বাজেট থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। তবে তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি। ব্যাংকটি এখনো ধুঁকছে। দুদক বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে এখন পর্যন্ত ৫৯টি মামলা করেছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত পর্ষদ সদস্যদের কারও নাম নেই। নাম নেই সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাইয়েরও। মামলাগুলোর আসামি ১২০ জন। তাঁদের মধ্যে ব্যবসায়ী ৮২, জরিপকারী ১১ জন এবং ২৭ জন ব্যাংকার। আসামিদের মধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক, যাঁদের মধ্যে ব্যবসায়ী ১০ জন, ব্যাংকার ৫ জন এবং জরিপকারী ১ জন।
পর্ষদ সদস্যরা পুরস্কৃত
আবদুল হাইকে চেয়ারম্যান করে ২০০৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বেসিক ব্যাংকের যে নতুন পর্ষদ গঠন করে সরকার, সেই পর্ষদই ব্যাংকটির পতনের জন্য দায়ী বলে ধরা হয়। ওই দিন বেসিক ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ পান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুই মহাপরিচালক (ডিজি) শুভাশীষ বসু ও নীলুফার আহমেদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রাজিয়া বেগম, বিসিক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বিজয় ভট্টাচার্য। এ ছাড়া বেসরকারি খাত থেকে পরিচালক হন চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম, সাবেক শুল্ক কমিশনার শাখাওয়াত হোসেন, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী আখতার হোসেন এবং এআরএস ল্যুভ বাংলাদেশ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম। বেসিক ব্যাংক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুভাশীষ বসু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) থেকে পদোন্নতি পেয়ে হন রপ্তানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান। কেলেঙ্কারির পুরো সময় তিনি ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও বেসিক ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে তিনি বাণিজ্যসচিব। ব্যাংকটির পরিচালক হওয়ার বছরেই বিজয় ভট্টাচার্যকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা দূতাবাসে ইকোনমিক মিনিস্টার পদে সরকার নিয়োগ দেয়। জেনেভা থেকে দেশে ফিরলে পদোন্নতি পেয়ে তিনি অতিরিক্ত সচিব হন এবং বর্তমানে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান। বিজয় ভট্টাচার্য জেনেভা যাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব কামরুন্নাহার আহমেদ পরিচালক হন। কেলেঙ্কারির পুরো সময়টাতেই তিনি এ ব্যাংকের পরিচালক থাকেন। এই ফাঁকে পদোন্নতি পেয়ে তিনি একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হন এবং বর্তমানেও এই পদে আছেন।
পর্ষদ সদস্য হওয়ার পর রাজিয়া বেগম পদোন্নতি পেয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব হন। ২০১০ সালের ৩১ জুলাই ব্যাংকের টুঙ্গিপাড়া শাখা উদ্বোধন করতে যাওয়ার সময় মানিকগঞ্জে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান সচিব রাজিয়া বেগম ও বিসিক চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান। অতিরিক্ত সচিব ফখরুল ইসলাম নতুন বিসিক চেয়ারম্যান হলে তাঁকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে করা হয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান এবং ব্যাংকের পরিচালক পদটিও তাঁর থেকে যায়।  পরে বিসিক চেয়ারম্যান হন ব্যাংকটির পর্ষদ সদস্য শ্যামসুন্দর সিকদার। পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে করা হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব। বর্তমানে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব। শেখ আবদুল হাইয়ের ৫ বছরের মেয়াদে এ ছাড়া পরিচালক ছিলেন আওয়ামী লীগের মুখপত্র মাসিক উত্তরণ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক আনিস আহমেদ, সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ কামরুল ইসলাম এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব এ কে এম রেজাউর রহমান।  আনিস আহমেদ এখন উত্তরণ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। আর আবদুল হাইয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে রেজাউর রহমান চিঠি পাঠালে তিনি এবং কামরুল ইসলাম বেসিক ব্যাংকে আর যেতেই পারেননি।  সাবেক পরিচালক ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন স্বাভাবিক নিয়মে এবং ব্যাংকের পরিচালক থাকার সময় অনিয়ম হয়নি। এ বিষয়ে বিশদ কথা বলতে তিনি বিব্রত বলেও জানান।  এআরএস লুভের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম বেসিক ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশ যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। আগে তিনি যুবলীগের কোনো পদে ছিলেন না। জানতে চাইলে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এবং তাঁর মতো সব সদস্যই পর্ষদ সভায় অন্ধকারে থাকতেন।
ব্যবসায়ীরা সব জামিনে
ফারসি ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়জুন নবী চৌধুরী বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। দুদকের দুটি মামলায় ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ গ্রেপ্তার হন ফয়জুন নবী চৌধুরী এবং নিম্ন আদালত থেকে তিনি জামিনের আবেদন করলে ২৫ মে তা নামঞ্জুর হয়। এরপর হাইকোর্ট থেকে দুই মামলায় ছয় মাসের জামিন নিয়ে ৩০ মে কারাগার থেকে ছাড়া পান ফয়জুন নবী চৌধুরী। জামিন পেয়ে তিনি বিদেশে চলে গেছেন। এশিয়ান শিপিং বিডির স্বত্বাধিকারী মো. আকবর হোসেনও আছেন জামিনে। একই ঘটনা ঘটে সৈয়দ হাসিবুল গণি ওরফে গালিবের ক্ষেত্রে। এমারেল ড্রেস, এমারেল অটোব্রিকস, এমারেল কোল্ড স্টোরেজ এবং ভয়েস এন্টারপ্রাইজের নামে ঋণ নেন ১৩২ কোটি টাকা। চারটি আলাদা মামলার আসামি সৈয়দ হাসিবুল গণিও দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হন ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ। একই কায়দায় তিনিও হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বিদেশে চলে যান।  এ ছাড়া ৬৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা আত্মসাতের জন্য ভাসাভি ফ্যাশনের ইয়াসির আহমেদ খান, ৫৫ কোটি টাকার জন্য তাহমিনা ডেনিম ও তাহমিনা নিটওয়্যারের এমডি কামাল জামাল মোল্লা, ৮৫ কোটি টাকার জন্য এ আর এস এস ইন্টারন্যাশনালের মো. সাবির হোসেন, ৩০ কোটি টাকার জন্য নাহার গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল ইসলাম হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছেন। তবে তাঁরা দেশে না বিদেশে আছেন তা জানা যায়নি। রূপসা সার্ভেয়ার কোম্পানির প্রধান সার্ভেয়ার (জরিপকারী) শাহজাহান আলী দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২০১৬ সালের আগস্ট। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে তিনিও জামিনে আছেন। শাহজাহান আলীর মামলার শুনানির পর ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের যৌথ বেঞ্চ ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডিসহ পর্ষদ সদস্যদের শুনানি নিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলেন। এরপরই বাধ্য হয়ে আবদুল হাইসহ পর্ষদ সদস্যদের শুনানি নিয়েছে দুদক। তবে বাণিজ্যসচিব শুভাশীষ বসু শুনানির সময় পরিবর্তনের আবেদন করে যাচ্ছেন। তিনি এখনো সময় দেননি বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
জেল খাটছেন ব্যাংকাররা
ব্যাংকার ২৭ জনের মধ্যে আবদুল হাইয়ের সব অনিয়ম-দুর্নীতির প্রধান সহযোগী হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকটির পলাতক এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম। তাঁর আগের এমডি এ কে এম সাজেদুর রহমান ২০১০ সালের শেষ দিকে পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত এমডি হন তৎকালীন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) শেখ মঞ্জুর মোরশেদ। কাজী ফখরুল ইসলাম এরপরই এমডি হয়ে আসেন, যাঁকে ২০১৪ সালের মে মাসে বরখাস্ত করা হয়। আসামিদের মধ্যে এই তিনজনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাংকাররা রয়েছেন। যাঁদের কেউ বরখাস্ত, কেউ চাকরিচ্যুত, কেউবা অপসারিত হয়েছেন। দুদক ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকারদের মধ্যে গ্রেপ্তার করে দুই ডিএমডি মো. ফজলুস সোবহান ও মো. সেলিমকে। একই মাসে গ্রেপ্তার হন গুলশান শাখার প্রধান শিপার আহমেদ। মার্চে সহকারী ব্যবস্থাপক ইকরামুল বারী এবং এপ্রিলে গ্রেপ্তার হন মহাব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীন। দুই বছর পার হলেও তাঁদের কেউ জামিন পাননি। দুদকও চায় তাঁরা জেলে থাকুন। যেমন ডিএমডি মো. সেলিম জামিন পেলেও গত ৭ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের হয়েছে।
গ্রেপ্তার না হওয়া ব্যাংকারদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বরখাস্ত হওয়া আরও দুই ডিএমডি এ মোনায়েম খান ও কনক কুমার পুরকায়স্থ, শান্তিনগর শাখাপ্রধান মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, গুলশান শাখাপ্রধান এস এম ওয়ালিউল্লাহ প্রমুখ। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বেসিক ব্যাংকের মামলা নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, আদালত থেকে ব্যবসায়ীদের জামিন পাওয়া এবং ব্যাংকারদের জামিন না পাওয়ার ব্যাপারে তাঁর কিছু বলার নেই। আর পর্ষদ সদস্যদের শুনানি নেওয়া হচ্ছে। শেষ হওয়ার পর বোঝা যাবে তাঁদের অপরাধের ধরন কতটুকু। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যাংক ও কোম্পানি আইন নিয়ে কাজ করা আইনজীবী তানজীব-উল-আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংক লুট করা হয়েছে। যদি লুটের সঙ্গে জড়িত পর্ষদ সদস্যরা নিরাপদ থাকেন, ব্যবসায়ীরা জামিনে থাকেন আর ব্যাংকাররা জেলে থাকেন; এটাকে একটা টাইরানি, অলিগার্কি বা প্লুটোক্রাসি পরিস্থিতি আখ্যা দেওয়া যায়।’ তিন ইংরেজি শব্দের অর্থ করেছেন তিনি এভাবে-মুষ্টিমেয় লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কারণে দুর্বল লোকদের পিষ্ট হওয়া।  সামগ্রিক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চেয়ারম্যান আবদুল হাইসহ জড়িত পর্ষদ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের করা ব্যাংক খাতের সুস্থতার জন্য জরুরি। নইলে ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে এবং এর মূল্য দিতে হবে গোটা অর্থনীতিকে।

এখনো ভরসা বাঁশের সাঁকো

নড়াইল সদরের মরা চিত্রা খালের ওপর এত দিনেও একটি পাকা সেতু হলো না কেন, তা সত্যিই এক বড় প্রশ্ন। সদরের দুটি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে কাজের প্রয়োজনে এই খালটি পার হতে হয়। প্রতিনিয়ত তারা কী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি নড়বড়ে একটি বাঁশের সাঁকোই তাদের ভরসা। স্বাধীনতার পর ৪৬ বছর ধরে এলাকার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করছে।
সোমবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মরা চিত্রা খালের দুই পারে রয়েছে মাইজপাড়া ইউনিয়নের ছয়টি এবং শাহাবাদ ইউনিয়নের আটটি গ্রাম। এসব গ্রামে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বাস। এ ছাড়া রয়েছে চারটি বাজার, একটি কলেজ, তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। খাল পারাপার করতে গিয়ে ব্যবসায়ী, কৃষক, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীসহ সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বাঁশের সাঁকোর বিকল্প হিসেবে আছে চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরের মাইজপাড়া ও শাহাবাদ বাজারের সেতু। তবে সেই ঘুরপথে যেতে সময় যেমন বেশি লাগে, যাতায়াতের খরচও গুনতে হয় বেশি। আর স্কুলপড়ুয়া শিশুদের প্রতিদিন সাঁকো পার হওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। সাঁকো পার হতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিশুদের পা পিছলে পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এলাকার লোকজন অনেক দিন ধরেই এ খালের ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে, কিন্তু তাদের দাবি পূরণ হয়নি। এই যে দিনের পর দিন এভাবে চলছে, তাতে এই প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক যে স্থানীয় প্রশাসন বলে আদৌ কিছু আছে সেখানে? স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৬ বছরে অনেক সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরাই বা কী করেছেন? এলাকার উন্নয়ন ও লোকজনের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো তাঁদেরই। এলাকাবাসীর প্রয়োজনীয়তা বা চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি যদি শুরু থেকেই প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে গুরুত্ব পেত তবে এখনো তাদের বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল থাকার কথা নয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নড়াইল সদর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহমেদের সূত্রে জানা গেছে, মরা চিত্রা খালের ওপর একটি পায়ে চলার সেতু নির্মাণের জন্য খুলনায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদন পেলেই সেতু তৈরির কাজ শুরু হবে। আমরা আশা করব, সেতু নির্মাণের কাজ যাতে দ্রুত শুরু হয়, সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন তাদের চেষ্টা ও উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।

প্রশ্নফাঁস: একটি জাতীয় শিল্পের আত্মপ্রকাশ by নিশাত সুলতানা



প্রশ্নফাঁস যেহেতু বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে, যেহেতু এর জন্য কেউ দায়ী নয়, সেহেতু একে এখন মেনে নিলেই হয়! মেনে নেওয়ার জন্য প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একে জাতীয় ঐতিহ্য ঘোষণা করা। এই সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় শিল্পের নাম প্রশ্নপত্র ফাঁস শিল্প। এই শিল্প অতি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, জনপ্রিয় ও অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশ সরকার দাবি করে, তারা এ শিল্প বিকাশের বিরোধী। কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় হলো, কোনো গবেষণা এবং সরকারের সদিচ্ছা ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই কোনো শিল্পের এ রকম বিকাশ রীতিমতো ঈর্ষণীয়! অবশ্য সদিচ্ছার অভাবই-বা বলি কী করে, সরকারের অনিচ্ছায় গুমের খবর ফাঁস হয় না, সেখানে প্রশ্নফাঁস হয় কী করে? এত বড় অবদানে সরকারের কৃতিত্ব অস্বীকার করা বড়ই অকৃতজ্ঞতা হয়ে যাবে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত নানা ধরনের গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংখ্যা নেহাত কম নয়। যেমন: প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, রেশম গবেষণা ইনস্টিটিউট, চাল, ধান, ইক্ষু, চা, আম, রেশম, তুলা—এ রকম কতই-না ইনস্টিটিউট! এই গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ তাদের অভিনব গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করার বেলায় কতটা ভূমিকা রেখেছেন, তা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কাছে ততটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু সরকারি সব উদাসীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং কোনো গবেষণালব্ধ জ্ঞান ছাড়াই প্রশ্নফাঁসের যে বিস্ময়কর শিল্প ও সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, তা তাবৎ দুনিয়াকে তাক লাগানোর মতো। প্রশ্নপত্র ফাঁস ইতিমধ্যেই যে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, এ বিষয়ে কারও আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এটা সত্য যে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ইতিহাস বাংলাদেশে বেশ পুরোনো। তবে ২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশে কোনো পাবলিক পরীক্ষা ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে হয় না। এ প্রক্রিয়া এতটাই শৈল্পিক যে তা মানছে না শিক্ষার্থীর বয়স, শ্রেণি, পরীক্ষার ধরন, ঋতুর বৈচিত্র্য ইত্যাদি! এটি এতটাই অনিবার্য যে একে রোধ করতে পারছে না রাস্তার যানজট, কিংবা ইন্টারনেটের স্পিডজট। সরকারি ঘোষণায় ইন্টারনেটের স্পিড হাঁসফাঁস করে; কিন্তু এরপরও প্রশ্নপত্র দায়িত্বের সঙ্গে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায়। সরকারি তৎপরতায় যদিও-বা জেএমবির ভয়ংকর জঙ্গি ধরা পড়ে, কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার পরও ধরা পড়ে না প্রশ্ন ফাঁসকারী অপরাধী। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা শুরু হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষার হলকে মশা-মাছিমুক্ত করতে পারে, কিন্তু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রশ্নফাঁসমুক্ত করতে পারে না পরীক্ষার হলগুলোকে। পরীক্ষার আগে কোচিং সেন্টারের দরজায় তালা ঝোলে কিন্তু সিলগালা করা প্রশ্নপত্র বাইরে বেরিয়ে এসে নির্লজ্জের মতো হাসতে থাকে। পরীক্ষা কেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে মুঠোফোনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হলেও আলাদিনের প্রদীপের জাদুর দৈত্য নাকি ঠিকই পরীক্ষার হলে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র নিয়ে হাজির হয়ে যায়! এবার বাসভর্তি ফাঁস প্রশ্নপত্র নাকি ঢুকে পড়েছে পরীক্ষাকেন্দ্রে। আর কী বাকি রইল! এ বয়সেই একদিকে প্রশ্নফাঁস ব্যবসায় হাতেখড়ি আর অন্যদিকে হাজতবাসের অভিজ্ঞতা তাদের বাস্তব দুনিয়ার ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করার জন্য আরও বেশি যোগ্য করে তুলছে। এটি কি কেউ তলিয়ে দেখেছে! ভীতসন্ত্রস্ত ক্রন্দনরত ১১ জন পরীক্ষার্থীকে আসামিদের জন্য নির্ধারিত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে পর্দার অন্তরালে নিশ্চিন্তে ঘুমান সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা এবং প্রশ্নফাঁসের মূল কুশীলবেরা। সরকারিভাবেই তো প্রশ্নফাঁসের জন্য তাঁদের দায়মুক্তি দিয়ে রাখা যখন হয়েছে, তখন কেন তাঁদের এই মহান অবদান জাতীয়ভাবে স্বীকার করা হবে না? মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বশীল সচিব মহোদয় স্বীকার করে নিয়েছেন যে বর্তমান প্রক্রিয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো বেশ কঠিন; অনেক কর্মকর্তার ভাষায় যা অসম্ভব। এই যখন বাস্তবতা, তখন শুধু শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর জন্য পণ্ডশ্রমের কোনো মানেই হয় না; বরং প্রশ্নপত্র ফাঁস শিল্প বিকাশে এখন প্রয়োজন আরও খোলামেলা সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহযোগিতা ও বিনিয়োগ। তাই বিষয়টিকে অবিলম্বে ক্রমবিকাশমান শিল্পের স্বীকৃতি প্রদান করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। অনতিবিলম্বে ‘প্রশ্নফাঁস বিকাশ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করা জরুরি।
এত দিনের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র উদ্ভাবন ও বিকাশের অভিজ্ঞতাকে এবার প্রশ্নফাঁস শিল্পের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। দ্রুত ও ব্যয়সাশ্রয়ী পন্থায় ফাঁস হওয়া সঠিক প্রশ্নপত্র কীভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরি। আরও একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো যেসব অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে বিবেকের দংশনে ভুগছেন, তাঁদের এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধের বিলুপ্তিবিষয়ক উন্নত প্রশিক্ষণ। ইতিমধ্যে তাঁদের কেউ কেউ চাঁদা দিয়ে ফাঁসকৃত প্রশ্ন কেনার তহবিল গঠন করেছেন। সেসব ফাঁসের প্রশ্নের উত্তর তড়িঘড়ি করে খোঁজার জন্য একদল শিক্ষকও অপেক্ষায় থাকবেন। প্রশ্নফাঁসের বিষয়টিকে শুধু প্রশ্নপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উত্তরপত্রের মধ্যেও কীভাবে বিস্তৃত করা যায়, তার পথ এঁরাই দেখাচ্ছেন। শুধু ফাঁসকৃত আসল প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিলেই চলবে না, তাদের উত্তর লেখার পরিশ্রম থেকেও মুক্তি দিতে হবে। শিক্ষকদের পরীক্ষার হল টহলের ক্লান্তিকর দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে কীভাবে আরও নিবিড়ভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, সে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসবিষয়ক অধিদপ্তর’ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বাইরেও শিল্পটির বাণিজ্যিক বিকাশ, বিপণন আর বাজারজাতকরণে এগিয়ে আসতে হবে দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে। যেহেতু প্রক্রিয়াটির সঙ্গে শুধু শিক্ষার্থীই নয়, সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন তাদের মা-বাবাসহ পরিবার ও সমাজের অনেকেই, তাই তাঁদের কথাও মাথায় রাখতে হবে। প্রশ্নের বাণিজ্যিকীকরণ তাঁরা বিবেচনা করতে পারেন নানান প্যাকেজ, যেমন: পিয়ার প্যাকেজ, প্যারেন্টস প্যাকেজ, ফ্যামিলি প্যাকেজ, কমিউনিটি প্যাকেজ ইত্যাদি। তাঁরা দিতে পারেন ‘প্রশ্নপত্র কিনলে উত্তরপত্র ফ্রি’-জাতীয় অফারগুলো। ইতিমধ্যেই ফাঁস প্রশ্নের আদান-প্রদানের মূল্য পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং রীতিমতো ফুলেফেঁপে উঠেছে। ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোও আনতে পারে আজীবন শিক্ষার্থীদের এমনকি তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ফাঁস প্রশ্ন নিশ্চিতকরণের নানা স্কিম। বাংলা সিনেমার পরিচালকেরা ‘পরীক্ষার্থী কেন আসামি?’ বা এ ধরনের টাইটেলে সিনেমা নির্মাণের কথা ভাবতে পারেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে প্রশ্নপত্র ফাঁস শিল্পের বিকাশে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সমন্বিতভাবে এ বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হলে প্রশ্নফাঁস শিল্পে বিশ্বদরবারে অচিরেই বাংলাদেশ হবে এক নম্বর। আসুন, আমরা প্রশ্নফাঁস শিল্পের বিকাশে যার যার অবস্থান থেকে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করি।
নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক।
purba_du@yahoo.com

আসমার বিস্ময়কর সংগ্রাম by আফ্রাসিয়াব খটক

আসমা জাহাঙ্গীরের আকস্মিক মৃত্যুতে পাকিস্তানে থাকা তাঁর স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও অনুসারীরাই যে শুধু ধাক্কা খেয়েছে তা নয়, ইতিবাচক ভাবমূর্তির একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধিকারকর্মী হওয়ার কারণে তাঁর মৃত্যুতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু মানুষও আঘাত পেয়েছে। দৃঢ় ব্যক্তিত্বের এই সংগ্রামী নারীর সারা জীবনের কথা ও কাজ তাঁর সমর্থক ও নিন্দুক-উভয় পক্ষকেই নাড়া দিয়ে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মৃত্যুর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে মানুষের আবেগপূর্ণ মন্তব্যের জট লেগে গিয়েছিল। দাফন অনুষ্ঠানে সহস্র মানুষের শোক ও সংহতির প্রকাশ দেখে বোঝা গেছে, পাকিস্তানের মানুষের হৃদয়ের কতখানি জুড়ে তিনি বিচরণ করছেন। সেনাশাসনের সমালোচনা করায় তাঁর বাবা মালিক গুলাম জিলানিকে যখন ইয়াহিয়া কারারুদ্ধ করেন, তখন আসমার বয়স মাত্র ১৮ বছর। এই বয়সেই তাঁকে সরকার সংগ্রামের পথে ঠেলে দেয়। তিনি সে সময় জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন জারির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। বাবা শীর্ষ পর্যায়ের একজন রাজনীতিক হওয়ায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো রাজনৈতিক সংকটকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আবদুল ওয়ালি খান ও ঘৌস বকশ বেজিনজোর মতো আরও অনেক গণতন্ত্রপন্থী নেতার সঙ্গে আসমার বাবাও পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল ভোটে জয়লাভ করা জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চালানো সেনা অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন। এই সামরিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ভাগ হয়ে যেতে পারে, এমন হুঁশিয়ারি তাঁরা আগেই দিয়েছিলেন। সেই সময়ে লাহোরে বসে এমন প্রচার চালানো হয়েছিল-পাঞ্জাবিদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ক্রোধকে আমন্ত্রণ জানানো আর অন্ধ ঘৃণার রাজ্যে বাস করার নামান্তর। পারিবারিক পটভূমির কারণে আসমা এবং তাঁর ভাইবোনদের বিদ্বেষের মুখে পড়ার বহু গল্প তাঁর ঝুলিতে ছিল। জীবনের শুরু থেকে মৃত্যু অবধি তাঁকে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরানোর সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। সেই আশির দশকে প্রতিক্রিয়াশীল এক নায়ক জিয়াউল হক যখন পুরো দেশকে পশ্চাদ্গামী করে তুলছিলেন; ঠিক সেই সময় আসমা পাকিস্তানে একটি সংগঠিত আদিবাসী মানবাধিকার আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। ধর্মীয় উগ্রবাদ তখন সমাজে পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শকে আরও গভীরভাবে বসিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু নারীর প্রতি আইনগত ও সামাজিক বৈষম্য যখন পাকিস্তানের নারীদের একটি বড় অংশের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে হলো, তখন তারা, বিশেষ করে শহরের নারীরা আন্দোলন করতে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিল। এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন আসমা।
অসাংবিধানিক ও জনবিরোধী শাসন ধরে রাখতে জেনারেল জিয়া যখন ইসলামি স্লোগান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন পাকিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে গেল। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন গঠনের পর এ বিষয়গুলোকেই কমিশনের সামনে তুলে ধরা হয়। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের মূলধারায় তখন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আসমা। হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) গোড়ার দিকে তিনি তাঁর পাশে পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে পেয়েছিলেন। মানবাধিকার আন্দোলন নিয়ে আসমার সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে তাঁকে কখনো দ্বিধা করতে দেখিনি। এইচআরসিপির আন্দোলনের কারণেই পাকিস্তান থেকে বাঁধা মজুরেরা (বন্ডেড লেবার) আধুনিক ‘দাসপ্রথা’ থেকে মুক্তি পায়। পৃথিবীর যেকোনো ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার এক অনুপম ক্ষমতা ছিল আসমার। সিন্ধুর প্রত্যন্ত থারপারকার ও বাদিন এলাকার নারী চাষিদের এগিয়ে আনতে কিংবা ফাটা প্রদেশের ঘালানি এলাকার নারী শিক্ষকদের উদ্দীপ্ত করতে তাঁর নেওয়া উদ্যোগগুলো ভোলার নয়। আসমা সাহসের সঙ্গে বেলুচিস্তানে সাধারণ মানুষের ওপর কর্তৃপক্ষের উৎপীড়নের প্রতিবাদ করেছিলেন। ২০০৬ সালের আগস্টে ডেরা বুগতি এলাকায় পরিদর্শনের সময় আমি তাঁর সহগামী হয়েছিলাম। সুই ডেরা বুগতি এলাকায় যাওয়ার জন্য আমরা যেই বেলুচিস্তানে ঢুকেছি, তখন আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু হলো। সরকারের লোকজন ভেবেছিল, গুলির ভয়ে আসমা ফিরে আসবেন। কিন্তু দেখা গেল, এতে তাঁর সেখানে যাওয়ার জেদ আরও বেড়ে গেল। পরের দিন আমরা সুই বুগতিতে পৌঁছালাম এবং নওয়াব আকবর বুগতির সঙ্গে দেখা করলাম। আমরা সেখান থেকে আসার পর এক সেনা অভিযানে আকবর বুগতি নিহত হন। ওই এলাকা থেকে ফিরে আসমা বেলুচ নাগরিকদের ওপর সরকারের চালানো নির্যাতনের কথা সংবাদমাধ্যমকে জানান। শান্তি ও গণতন্ত্রের সম্পর্কটিকে নিবিড়ভাবে বুঝতেন আসমা জাহাঙ্গীর। এ কারণেই তিনি সক্রিয়ভাবে শান্তি আন্দোলনে যোগ দিতে পারতেন। এ কারণেই তাঁর মৃত্যু সবাইকে নাড়া দিয়ে গেছে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
আফ্রাসিয়াব খটক: পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর ও আঞ্চলিক বিষয়াদির বিশ্লেষক

বিমানবন্দরের বিঘ্নিত নিরাপত্তা

প্রায় দুই বছর পর গত রোববার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্যে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের নিষেধাজ্ঞা উঠেছে এবং এ জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি আছে—এই কারণ দেখিয়ে যুক্তরাজ্য এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে যেদিন উঠল, তার আগের রাতেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার উদ্বেগজনক ত্রুটি সবার সামনে উন্মোচিত হলো। একজন পুলিশ সদস্য কীভাবে সব নিরাপত্তাব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে কোনো কাগজপত্র ছাড়া একটি বিদেশি বিমান সংস্থার উড়োজাহাজে উঠে পড়লেন এবং তা চলতে শুরু করার পরও রয়ে গেলেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বের যেকোনো দেশে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের নীতি অনুসরণ করা হয়। অথচ আমাদের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আমাদের বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা ঠুনকো এবং কত সহজেই তা উপেক্ষা করা যায়। এটা আরও দুর্ভাগ্যজনক যে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলার মতো অপকর্মটি করেছেন ঢাকা রেঞ্জের একজন পুলিশ সদস্য। এসআই আশিকুর রহমান পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাকে অবলীলায় উপেক্ষা করতে পেরেছেন কার্যত তাঁর পোশাকের কারণে। ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের পোশাকের রঙের সঙ্গে বিমানবন্দরের কর্মরত ইমিগ্রেশন পুলিশের পোশাকের মিল থাকায় এমন হয়েছে বলে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ইমিগ্রেশন পুলিশ কি কোনো কারণ ছাড়া বা তঁার আত্মীয়কে তুলে দিতে উড়োজাহাজে উঠতে পারেন? যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা গুরুতর। থাই এয়ারলাইনসের পাইলট এই ঘটনার পর উড়োজাহাজ চালাতে পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের ঘটনার খারাপ অভিঘাত রয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঘটনাটিকে বিবেচনায় নেবে এবং আমাদের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা রেটিংয়ে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। যুক্তরাজ্য আকাশপথে পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিলেও অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফে নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে।
আমরা যখন এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রত্যাশা করছি, তখন এই ঘটনা নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশের এসআইকে রক্ষা করতে যে তৎপরতা দেখা গেছে ও যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনি যে কাজ করেছেন, তা গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। তিনি স্পষ্টতই তাঁর পদ ও পোশাককে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় করেছেন। এ ধরনের পুলিশ সদস্য বাহিনীর ভাবমূর্তির জন্য বিপজ্জনক। কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কেউ অপকর্ম করলে তার দায় সেই বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের নয়। এ ধরনের সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে রক্ষার চেষ্টা বরং বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। এই প্রবণতা খুবই বিপজ্জনক। এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত জরুরি। অভিযোগ আছে যে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ ওই এসআইকে সহায়তা করেছেন। এসবের সত্যতা খুঁজে বের করা কোনো কঠিন কাজ নয়। যে নিরাপত্তাবলয়গুলো আশিকুর রহমান অতিক্রম করেছেন, তার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কেউ তাঁকে সহযোগিতা করে থাকলে বা কারও গাফিলতি ধরা পড়লে তাঁদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কারা এই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন বা করছেন, তাঁদের চিহ্নিত করেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বিমানবন্দর একটি সংবেদনশীল স্থাপনা, এর সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। এখানে কারও খামখেয়ালি বা মর্জিমাফিক কিছু করার সুযোগ নেই—তা সব মহলকে স্মরণ করিয়ে দিতে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

খালেদা জিয়া কি প্রার্থী হতে পারবেন? by বদিউল আলম মজুমদার

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার দণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না। কারণ, এর ওপর আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া, না নেওয়া বহুলাংশে নির্ভর করবে। নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতিও। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি... (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বত্সরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে।’ প্রসঙ্গত, দুর্নীতি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ। পক্ষান্তরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা-অযোগ্যতা একটি দেওয়ানি বিষয়। খালেদা জিয়ার নির্বাচন করার যোগ্যতা নিরূপণের জন্য প্রয়োজন ‘দোষী সাব্যস্ত হওয়া’ (Conviction) ও ‘দণ্ড স্থগিত’ বা ‘দণ্ডের কার্যকরণ স্থগিতের’ (Sentence) মধ্যে বিভাজন। [ মো. মামুন ওয়ালিদ হাসান বনাম রাষ্ট্র, ক্রিমিনাল মিসিলেনিয়াস কেস ১০০০৯ / ২০০৭) ]। এই বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে বেগম জিয়ার যোগ্যতা নির্ভর করবে: (১) তাঁর ‘সেনটেন্স’ স্থগিত হয়েছে কি না; (২) তাঁর ‘কনভিকশন’-এর ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে কি না; এবং (৩) সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর। প্রসঙ্গত, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর জামিন হলেই কনভিকশন স্থগিত হয়ে যায় না। তবে কনভিকশন স্থগিত হলে দণ্ডও স্থগিত হয়ে যায়। দণ্ডপ্রাপ্তদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি নিয়ে আমাদের উচ্চ আদালতে একাধিক মামলা হয়েছে, যদিও বিচারের রায় অস্পষ্ট, এমনকি পরস্পরবিরোধী।
দণ্ডিত হওয়ার পর খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতে আপিল করার এবং জামিন চাওয়ার সুযোগ পাবেন। চলিত ধারণা হলো, আপিল চলাকালীন তিনি নির্বাচন করতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে দণ্ড স্থগিত করার ওপর। দণ্ড স্থগিত না হলে যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা অর্জন করা যায় না, তার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে। ২০১৫ সালের ঢাকা দক্ষিণের মেয়র নির্বাচনে অন্যূন দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত নাসির উদ্দিন আহমেদ মেয়র পদে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, যা রিটার্নিং অফিসার বাতিল করে দেন। কারণ, নাসির উদ্দিন হাইকোর্টে আপিল আবেদন করলেও আদালত ‘বিচারিক আদালতের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেননি’। (মিজানুর রহমান খান, ‘খালেদা নির্বাচনে যেতে পারবেন?’ , প্রথম আলো, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। তবে মাহমুদুল ইসলামের (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ, পৃ.৪৬১) মতে, যদি দুই বছরের অধিক দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাহলে তাঁকে সেই লক্ষ্যে আদালতের কাছে আবেদন করতে এবং তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ (ক) ও ৪২৬ ধারার আওতায় তাঁর কনভিকশনের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ পেতে হবে। কারণ, আপিল হলেও কনভিকশন বহাল থেকে যায় এবং আপিলকারী দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে গণ্য হন। মাহমুদুল ইসলামের মতে, কনভিকশন ও দণ্ড স্থগিত চাইলেই তা দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর তা প্রাপ্য নয়। এ ক্ষেত্রে আদালতকে অপরাধের ভয়াবহতা এবং বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। সম্প্রতি মো. মামুন ওয়ালিদ হাসান বনাম রাষ্ট্র মামলায় (ক্রিমিনাল মিসিলেনিয়াস কেস ১০০০৯ / ২০০৭) বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি মো. খোরশেদ আলম সরকার রায় দেন যে, হাইকোর্ট বিশেষ বিবেচনায় কনভিকশন স্থগিত করতে পারেন, যা নিম্ন আপিল আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত। এ ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্তকে আবেদন করতে হবে এবং দেখাতে হবে যে কনভিকশন স্থগিত না হলে অবিচার হবে এবং তিনি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। প্রসঙ্গত, উপরিউক্ত মামলায় আদালত বিশেষ বিবেচনায় বাদীকে তাঁর কনভিকশন স্থগিত করে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেন। তবে খালেদা জিয়া নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না, তা শেষ বিচারে নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। আমাদের উচ্চ আদালতের অতীতের দুটি রায় থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতার বিষয়টি ১৯৯৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম এ কে এম মাইদুল ইসলাম (রিট পিটিশন নং ১৭৩২ / ১৯৯৬) মামলার মাধ্যমে একবার আদালতে উত্থাপিত হয়।
সে সময় এরশাদ জনতা টাওয়ার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। মাইদুল ইসলাম তা চ্যালেঞ্জ করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা এরশাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন, যার বিরুদ্ধে মাইদুল ইসলাম আদালতের আশ্রয় নেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাঁর রায়ে [এ কে এম মাইদুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, ৪৮ ডিএলআর (এডি) ১৯৯৬] এরশাদের অযোগ্যতার প্রশ্নটি সুরাহা না করে বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ‘নির্বাচনী বিরোধ’ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত বলে মত দেন। একই সঙ্গে বিচারকের এখতিয়ারহীনতা (coram non judice) কিংবা আইনগত বিদ্বেষের (Malice in Law) অভিযোগ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্বাচনী বিরোধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেন। উল্লেখ্য, নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসার দায়িত্ব নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের, আদালতের নয়। পরবর্তী সময়ে ২৪ আগস্ট ২০০০ তারিখে হাইকোর্ট এরশাদের দণ্ড বহাল রাখেন এবং ৩০ আগস্ট সংসদ সচিবালয় তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরশাদ প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনে দাবি করা হয় যে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার আগে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য নন। মামলার রায়ে [হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম আবদুল মুক্তাদির চৌধুরী ৫৩ ডিএলআর (২০০১) ] বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনটি অবৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু বিচারপতিদ্বয় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে এরশাদের কখন থেকে অযোগ্যতা শুরু হবে, সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। বিচারপতি জয়নুল আবেদীন রায় দেন যে আপিল প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। পক্ষান্তরে বিচারপতি খায়রুল হকের মতে, দণ্ড ঘোষণার দিন থেকেই দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য হবেন। মহীউদ্দীন খান আমলগীর বনাম বাংলাদেশ [৬২ ডিএলআর (এডি) ২০১০] মামলার রায়ও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মহীউদ্দীন খান আলমগীর দুর্নীতির দায়ে ২৬ জুলাই ২০০৭ তারিখে দণ্ডিত হন, যার বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে ৪ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে আপিল করেন। হাইকোর্ট ২২ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে তাঁকে জামিন দেন এবং তাঁর কনভিকশন ও দণ্ড স্থগিত করেন। এরপর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চাঁদপুর-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন, যা তাঁর দণ্ডের কারণে রিটার্নিং অফিসার ৩ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে বাতিল করেন। মহীউদ্দীন খান আলমগীর রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন, যা নির্বাচন কমিশন ৪ ডিসেম্বর ২০০৮ প্রত্যাখ্যান করে। কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মহীউদ্দীন খান আলমগীর হাইকোর্টে রিট করেন (রিট নম্বর ৯৮৬৫ / ২০০৮), যা হাইকোর্ট ১৫ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকেন। এরপর তিনি হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দাখিল করেন এবং চেম্বার জজ মো. জয়নুল আবেদীন হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন এবং রিটার্নিং অফিসারকে মহীউদ্দীন আলমগীরের মনোনয়নপত্র গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগ ১৫ জুলাই ২০১০ তারিখে মহীউদ্দীন আলমগীরের রিট ‘মেইনটেইনেবল’ বা সমর্থনীয় নয় বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন,
তা বহাল রাখেন। লক্ষণীয় যে আপিল বিভাগ দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দণ্ড কখন থেকে কার্যকর হবে, তার ওপর কোনোরূপ আলোকপাত করেননি। এটি সুস্পষ্ট যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো যে নির্বাচন কমিশন ১৯৯৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেও ২০০৮ সালে মহীউদ্দীন আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল করে, যদিও আপিল বিভাগের চেম্বার জজ তা বৈধ করে তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দেন। হাইকোর্টের দুই বিচারপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত দেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দণ্ডপ্রাপ্তদের যোগ্যতার বিষয়টি দুটি মামলার কোনোটিতেই সুরাহা করেননি। তবে উভয় ক্ষেত্রেই আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন যে দণ্ডপ্রাপ্তদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্ত এখতিয়ারবহির্ভূত বা বিদ্বেষমূলক না হলে আদালতের তাতে হস্তক্ষেপ করা সমীচীন নয়। আর কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নির্বাচনের পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে সুরাহা হওয়া আবশ্যক। তাই এটি সুস্পষ্ট যে আগামী নির্বাচনে বেগম জিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না, তা মূলত নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে হাইকোর্ট তাঁর দণ্ড স্থগিত করলে কমিশনের পক্ষে তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য ঘোষণা করা দুরূহ হবে। আর বিশেষ বিবেচনায় দণ্ড স্থগিত করে কোনো ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া গেলে খালেদা জিয়া সেই সুযোগ পাবেন না কেন? তাই দণ্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে বেগম জিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারার কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না। প্রসঙ্গত, এ ব্যাপারে আমাদের ও ভারতীয় আদালতের রায়ের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এমনকি ভারতীয় আদালতের রায়ের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে, যা নির্ভর করে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ সদস্য কি না, তার ওপর। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ সদস্য না হলে তিনি দণ্ডপ্রাপ্তির দিন থেকেই সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হবেন। পক্ষান্তরে তিনি সংসদ সদস্য হলে আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য থাকবেন।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে মিথ্যা অভিযোগ, প্রহসনের বিচার

বিশ্বখ্যাত মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের লিয়েনের হোটেলে এক দুপুরে একজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু লন্ডন থেকে রামাদানকে বহনকারী বিমান ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের আগে লিয়নে পৌঁছায়নি। এ বিষয়ে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছিলেন রামাদান। কিন্তু সেই নথি মামলার ফাইল থেকে হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ফরাসি পুলিশ। এর পর রামাদান নিজে ফরাসি পুলিশের কাছে মামলার বিষয়ে সহযোগিতা করে আসছিলেন। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে তদন্ত না করেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর পর ফরাসি আইন লঙ্ঘন করে তাকে নির্জন কারাবাস দেয়া হয়েছে। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর রামাদানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তা সত্ত্বেও তাকে জামিন দেয়া হয়নি। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকালীন ইসলাম শিক্ষা বিভাগের এ অধ্যাপক তার মুসলিম পরিচয়ের কারণে ফরাসি কর্তৃপক্ষের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন কিনা। ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর এ জাস্ট ওয়ার্ল্ডের প্রেসিডেন্ট ড. চন্দ্র মুজাফফর এক লেখায় অভিযোগ করেছেন, অধ্যাপক তারিক রামাদান ফ্রান্সে প্রহসনের বিচারের শিকার হচ্ছেন। মুজাফফেরের লেখাটি তুলে ধরা হল- ‘তারিক রামাদান ২ ফেব্রুয়ারি থেকে প্যারিসের ফ্লুরি-মেরোগিস কারাগারের অতিরিক্ত নিরাপত্তাসংবলিত একটি শাখার নির্জন কক্ষে আটক আছেন।’ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৯ সালে ফ্রান্সের লিয়নে ও ২০১২ সালে প্যারিসে দুই নারী তার হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে একটি অপরাধ তদন্ত হয়েছে। আটক রামাদানের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি ফোনেও তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না। তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে দুই নারীর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ জন্যই ৩১ জানুয়ারি তিনি স্বেচ্ছায় প্যারিসে পুলিশের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, তার জবাব দিতেই তিনি সেদিন পুলিশের কাছে যান। নিজের অভিযোগের তদন্তে কর্তৃপক্ষকে তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। এর পরও তাকে বিচারবহির্ভূত নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হচ্ছে। কারাগারে তার প্রতি বিদ্রূপাত্মক ও অবমাননাকর মন্তব্য ছোড়া হচ্ছে। লিয়নের ঘটনায় ওই নারী বলেন, ২০০৯ সালের ৯ অক্টোবর দুপুরে একটি হোটেল কক্ষে তিনি রামাদানের ধর্ষণের শিকার হন। কিন্তু লন্ডন থেকে রামাদানকে বহনকারী বিমান সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের আগে লিয়নে পৌঁছায়নি। এর পর কয়েকশ দর্শকের সামনে বক্তৃতা দিতে তিনি রাত ৮টা ৩০ মিনিটে হলরুমে যান। তারিক রামাদানের আইনজীবী এসব তথ্যপ্রমাণ ফরাসি পুলিশকে দিয়েছেন। পুলিশও তা গ্রহণ করার কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু পরে তারা বলেছে- তথ্যপ্রমাণগুলো হারিয়ে গেছে। তাই মামলার নথিতে সেগুলো রাখা হয়নি। বিচারের ক্ষেত্রে এর চেয়ে প্রহসন আর কি হতে পারে! ২০০৯ সালে ফ্রান্সের জ্যেষ্ঠ ম্যাজিস্ট্রেট মাইকেল ডেবাকের সঙ্গে অভিযুক্ত নারীর বৈঠক এ মামলা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে। অধ্যাপক রামাদানের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা করতেই ওই বৈঠক হয়েছিল। ইসলামবিদ্বেষী ক্যারোলাইন ফৌরেস্ট ও অ্যান্টোইন স্ফিয়ার এ মামলায় সহায়তা করেন। ৯ বছর আগে বিচারক ডেবাক অধ্যাপক রামাদানের বিরুদ্ধে মামলা করতে ফৌরেস্ট ও অভিযোগকারী নারী ক্রিস্টেলির সঙ্গে আঁতাত করেছেন। বর্তমানে ক্যাশেইশন আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডেবাক। ধর্ষণের অভিযোগকারী ক্রিস্টেলি কিংবা চলমান মামলার সঙ্গে নিজের যোগসাজশের কথা প্রকাশ করেননি বিচারক ডেবাক। ফরাসি আইন অনুসারে যা একেবারে অবৈধ। প্যারিসের ঘটনা ২০১২ সালে ঘটেছে বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে। কিন্তু তারেকের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী যা বলছেন, তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এ ঘটনায় অভিযোগকারী হিন্দা আয়ারি ২০১৪ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ফেসবুকের মাধ্যমে অধ্যাপক রামাদানকে ২৮০টির বেশি বার্তা পাঠাননি। সম্প্রতি আয়ারি ফরাসি গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন, ফেসবুকে তিনি রামাদানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনলে রামাদান তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেন।
এর পর দ্বিতীয় আরেকটি অ্যাকাউন্ট খুলে তিনি অক্সফোর্ড অধ্যাপককে বার্তা পাঠান। আয়ারির আশা ছিল, এতে করে তিনি রামাদানকে প্রলুব্ধ করে ফাঁদে ফেলতে পারবেন। এ কারণেই গত সপ্তাহে পুলিশ আয়ারির বিরুদ্ধে সমন জারি করলে তাতে তিনি হাজির হননি। অধ্যাপক রামাদানের বিরুদ্ধে ওই দুই নারীর অভিযোগ পুরো দস্তুর ভিত্তিহীন হওয়া সত্ত্বেও আদালতে নিতে তাকে আটক করে রেখেছে পুলিশ। ফ্রান্সের মূলধারার গণমাধ্যম পুলিশের এ অপকর্মে সহায়তা করছে। হাস্যকর অভিযোগকে কেবল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেই না, তারা অধ্যাপক রামাদানের বিরুদ্ধে বারবার একই মিথ্যা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। তাকে অমর্যাদা ও অসম্মান করতেই এমনটি করা হচ্ছে। কিছু গণমাধ্যম প্রতিবেদন ছেপেছে, অধ্যাপক রামাদানের মিসরীয় পাসপোর্ট আছে। তিনি মিসরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু রামাদানের কাছে কোনো মিসরীয় পাসপোর্ট নেই। তিনি কেবল সুইজারল্যান্ডের নাগরিক। ফরাসি গণমাধ্যম তারিক রামাদানের চরিত্রের ওপর কালিমা লেপনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমনকি তার প্রতি দেশটির আইন আদালতের অবজ্ঞাপূর্ণ ও তির্যক আচরণ এ বিচারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা বলে মনে করা হচ্ছে। ইউরোপে ইসলাম ও এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে যে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ আচরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে কেউ সমালোচনা করলে ফরাসি সমাজের প্রভাবশালীরা সহ্য করতে পারেন না। তারা তখন অসহনশীল হয়ে ওঠেন। কিংবা ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন না। অধ্যাপক তারিক রামাদান একই আচরণের শিকার হয়েছেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফরাসি সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক নীতির কড়া সমালোচকদের একজন হলেন রামাদান। সামগ্রিকভাবে ইউরোপে ইসলাম বিদ্বেষ ও দারিদ্র্য অসহায়দের প্রান্তিকীকরণকে মহাদেশটির দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তারিক রামাদান অবশ্য অতি উগ্র কট্টর মুসলমান ও মুসলিম দেশগুলোর কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অন্য কথায় ফ্রান্সে বিভিন্ন গোষ্ঠী তারিক রামাদানকে কোণঠাসা করতে ওঠেপড়ে লেগে আছে। সেক্ষেত্রে যে কেবল ইসলাম ও মুসলিমবিদ্ধেষ থেকে তারিককে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, তা নয়। ফরাসি পূর্ব সংস্থা ও গোঁড়ামিকে জাহির করতে যৌক্তিক কণ্ঠগুলোকে রুদ্ধ করে দেয়ার উদ্যোগেরও অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে। বিভিন্ন মৌলিক ইস্যুতে ভিন্ন মতাবলম্বীদের অধিকারের ক্ষেত্রে ফরাসি ও ইউরোপীয় অভিজাতদের চেতনা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। সেক্ষেত্রে তারিক রামাদানের এই বিচার মুসলিম কর্তৃত্ববাদ ও তাদের নিজেদের সীমানার বাইরে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতারও প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ তারা ফরাসি কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। সব কিছু মিলিয়ে কীভাবে আমরা আশা করতে পারি তারিক রামাদান ন্যায়বিচার পাবেন? এ জন্য ফ্রি তারিক রামাদান ক্যাম্পেন ও অন্যান্য সুশীলসমাজ অতিসত্বর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছে।

হাসপাতালে অবহেলা: লজ্জায় ডাক্তারি ছাড়তে চান চিকিৎসক বাবা

রোববার সকাল সকাল তেহট্ট যাচ্ছিলাম, আমাদের গ্রামের বাড়ি। ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে ফোন পেয়েই গাড়ি ঘোরালাম। ছোট ছেলে সায়ন্তন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এর ২০ মিনিটের মাথায় আবারও ফোন এলো। অবস্থা খুব আশঙ্কাজনক। তখন সত্যিটা আমাকে বলা না হলেও বুঝতে পেরেছিলাম-ছেলে আর নেই। বাড়ি গিয়ে, টাকাপয়সা নিয়ে, স্ত্রীকে আর বড় ছেলে সৌম্যজিৎকে সঙ্গে করে যখন বাইপাসের মেডিকায় পৌঁছলাম, তখন দুপুর হয়ে গেছে। গিয়ে শুনলাম, সত্যিই সব শেষ। প্রথমেই ছেলের সহপাঠী শুভদীপের মুখোমুখি হই আমি। জানতে চাই, ঠিক কী হয়েছিল। ও অনেকটাই সুস্থ তখন। শুভদীপ আমাকে বলে, দুর্ঘটনার পর ওরা সঙ্গে সঙ্গে সকালে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে পৌঁছলেও অনেক ক্ষণ ধরে মেঝেতেই পড়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুর পর আর কিছুই করা হচ্ছিল না। তখনও বেঁচে ছিল আমার ছেলেটা। কেন আর কিছু করা হচ্ছে না জিজ্ঞেস করলে এক চিকিৎসক নাকি শুভদীপকে বলেন, ‘এখানে এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা নেই। চাইলে অন্য কোথাও চলে যেতে পার।’ আমি নিজেও পেশায় চিকিৎসক। হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের এমন আচরণ আমার অচেনা-অজানা। আর সরকারি হাসপাতালে ‘পরিকাঠামো নেই’ মানে কী! রাজ্যের সেরা পরিকাঠামো তো এখানেই থাকার কথা! স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকের মুখে ওই কথা শুনে ঘাবড়ে যায় শুভদীপ, প্রশ্ন করে কোথায় যাবে ওরা। ওদের বলা হয়, বাইপাসেই তো বেশ কিছু ভালো বেসরকারি হাসপাতাল আছে। এর পরেই মেডিকা যায় ওরা। আর সেই যাওয়ার পথেই...।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, এই ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজেই পাঁচ বছর পড়েছি আমি। ইন্টার্নশিপ চলার সময়ে অনেকবার এ রকম ইমার্জেন্সি কেস সামলেছি। কখনও বলিনি, ‘আমাদের পরিকাঠামো নেই’ অথবা ‘আমরা পারব না’। সবসময় সর্বোত্তম চেষ্টা চালিয়ে গেছি, আর সেই আশ্বাসই দিয়েছি রোগী ও রোগীর পরিজনদের। ওদের যে ধরনের কথা বলা হয়েছে, তা তো অন্য জায়গায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য এক রকম জবরদস্তি করা! হাসপাতাল বলছে, শুভদীপের কথায় এবং ওর সই করা রিস্ক বন্ডের ভিত্তিতে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে ছেলেকে। কিন্তু পরিকাঠামো না থাকার কথা শুনে শুভদীপের আর কী ই বা করার ছিল? এটি তো হাসপাতালের দায় এড়ানো মানসিকতার পরিচয়। হাসপাতাল চিকিৎসাও করল না, আবার ‘রেফার’ করার দায়িত্বও নিজের ঘাড়ে রাখল না। এমনকি একটি ভালো অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত দেয়নি হাসপাতাল। রাস্তা থেকে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে শুভদীপরা। তাতে লাইফ সাপোর্ট ছিল না। ওটুকু থাকলেও হয়তো ছেলেটা...। আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, যে মেডিকেল কলেজ থেকে আমি পাস করলাম, সেখানেই আমার ছেলের সঙ্গে এমনটি হল! আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। কিন্তু ঘটনা পরম্পরা শোনার পর তো স্পষ্ট বুঝতে পারছি, ওর সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। গাফিলতিতেই মারা গেল ও। এর তদন্ত হোক, বিচার হোক। এই লজ্জায়, এই যন্ত্রণায় আমার ডাক্তারি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে।