Monday, December 21, 2015

পৌর নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করুন : খালেদা জিয়া

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সোমবার বিকেলে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সরকারের কাছে তিনি এই দাবি জানান। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে হলে সেনা মোতায়েন করতে হবে।’ এ সময় দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠানকে সরকারের ষড়যন্ত্র বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের ঘরে মুক্তিযোদ্ধার নামে রাজাকার পুষছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করেছে। তাই তাদেরও বিচার করতে হবে বলে আমরা দাবি জানিয়েছি।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ইশতিয়াক আজীজ উলফাতের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি নেতারা।
দুপুর দুইটায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এই আলোচনাসভা হয়। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে ‘নির্বাসিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সাহসী মানুষের ঐক্য ও আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল।
মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক এস এম শফিউজ্জামান খোকন, জয়নুল আবেদিন, সিনিয়র সহসভাপতি আবুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুর রহমান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমদ খান, মিজানুর রহমান খান (বীর প্রতিক) মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম খান, চৌধুরী আবু তালেব, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের সভাপতি শামা ওবায়েদ সহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধা নেতারা আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- ফজলুল হক মিলন, জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলা, নূরে আরা সাফা প্রমুখ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর অতিবাহিত হলেও আজো গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন দেশে রক্ত দিতে হচ্ছে। আজকে ক্ষমতাসীনরা বলে তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে? কিন্তু দুঃখজনক হলো তাদের হাতেই গণতন্ত্র নিহত, সাম্য এবং ন্যায় বিচার তিরোহিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। সামনে কঠিন অন্ধকার। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো আসেনি। কথা বলা এবং লেখার স্বাধীনতা নেই। একদলীয় শাসন চলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বদলে স্বৈরতন্ত্র চলছে। এমতাবস্থায় দেশবাসীকে আবারো জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আমাদেরকে অধিকার আদায়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন, নির্বাচন এবং সংগঠন এই তিনের সমন্বয়ে ঐক্য গড়তে হবে।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে মেজর জেনারেল (অব:) মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে বঙ্গভবনে ঢুকতে না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রপতি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি স্বভাবতই তিনি বঙ্গভবনে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিশেষ দিবসে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। শুধু রাষ্ট্রপতির সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিজয় দিবসের দিন মুক্তিযোদ্ধা ইবরাহিম বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে প্রবেশ করতে না দিয়ে অসম্মান করা হয়েছে। এসময় মিলনায়তনে উপস্থিত লোকজনকে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে সরকারের এই কর্মের জন্য ধিক্কার জানান তিনি।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরো বলেন, সরকার নয়, যারা পেছন থেকে দেশ চালাচ্ছে তারা এই কাজ করেছে। এ জন্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে জাতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আমরা কী ভারতের অঙ্গ রাজ্যে পরিণত হচ্ছি? প্রশ্ন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে যে ঘটনা ঘটেছিল তার অবসান করুন। বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীনভাবে চলতে দিন। খালেদা জিয়ার সাজা দিলে দেশের জনগণ বসে থাকবেনা। তাই আর নতুন করে কান্নার সৃষ্টি করবেন না। আপনার বাবা (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বর্তমান সরকার যেন সহস্র বছরের কুলাঙ্গার না হয়।
সৈয়দ মহুাম্মদ ইবরাহিম বলেন, অনেকের মতো আমাকেও বিজয় দিবসের দিন বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ৩৫ বছর ধরে যে নিয়মে সেখানে যাতায়াত করি সেদিনও একই নিয়মে গেছি। কিন্তু আমাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এরমাধ্যমে আমি শুধু নয় পুরো মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান জানানো হয়েছে। এ ধরণের কাজের জন্য বিজয় দিবসের দিনটিকে বিবেচনায় নেয়াটা ঠিক হয়নি।

কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধে জেটলির মানহানির মামলা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আদালতে টেনে নিয়ে গেলেন ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। দিল্লি ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিডিসিএ) সভাপতি থাকার সময় অরুণ জেটলির বিরুদ্ধে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী দুর্নীতির যে অভিযোগ এনেছেন, মামলা তা নিয়েই।
জেটলি আজ সোমবার পাটিয়ালা হাউস কোর্টে গিয়ে কেজরিওয়ালসহ মোট ৬ জনের বিরুদ্ধে ১০ কোটি রুপির মানহানির মামলা করেছেন। পৃথক একটি মামহানির মামলা করেছেন দিল্লি হাইকোর্টে। জেটলি বলেন, ডিডিসিএ থেকে তিনি একটা পয়সাও কখনো নেননি। কেজরিওয়াল ও তাঁর দলের সদস্যরা ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে তাঁর (জেটলি) ও পরিবারের মানহানি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল ছাড়া আর যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তাঁরা হলেন: কুমার বিশ্বাস, আশুতোষ, সঞ্জয় সিং, রাঘব চাড্ডা ও দীপক বাজপেয়ি। জেটলির আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুথরা আদালতে বলেন, ভিত্তিহীন অভিযোগের ফলে তাঁর মক্কেলের সুনামের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
জেটলি যখন মামলা দায়ের করছেন, প্রায় একই সময় দিল্লির মন্ত্রিসভা ডিডিসিএর দুর্নীতির তদন্ত করতে এক সদস্যের কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। সাবেক সলিসিটর জেনারেল গোপাল সুব্রক্ষ্মণ্যমকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। ডিডিসিএর দুর্নীতি ও রাজ্য সরকারের প্রধান সচিবের অফিসে তল্লাশি নিয়ে আলোচনার জন্য কাল মঙ্গলবার দিল্লি বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সব মিলিয়ে রেষারেষি চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছেছে।
কেজরিওয়াল এবং তাঁর দলের অন্য নেতাদের অভিযোগ জেটলিকে এতটাই ক্ষুব্ধ করেছে যে, তিনি তাঁদের উকিলের চিঠি পর্যন্ত পাঠাননি। সাধারণভাবে উকিলের চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের একটা সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জেটলি সেই সুযোগ না দিয়ে সরাসরি ১০ কোটির মানহানি মামলা ঠুকে দেন।

প্রতিবাদে ঠেকানো গেল না নির্ভয়ার ধর্ষকের মুক্তি

প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আর আদালতের দ্বারস্থ হয়েও ঠেকানো গেল না ‘নির্ভয়া’র ধর্ষককে। রোববার ভারতের কিশোর সংশোধনাগার থেকে সে মুক্তি পায় বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। তার মুক্তি নিয়ে ভারতজুড়ে আরও বড় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ওই ঘটনার সময় এ আসামি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। তাকে তিন বছরের জন্য সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছিল। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে দিল্লিতে বাড়ি ফেরার পথে মেডিকেল কলেজের এক তরুণী বাসচালক ও কর্মীদের নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় শিক্ষার্থী ও তার বন্ধুকে রাস্তায় ফেলে দেয়ার পর হাসপাতালে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার সময় অভিযুক্তের বয়স ১৮ বছরের কম থাকায় কিশোর আইনে তার বিচার হয়। ভারতে কিশোর আইনে সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড। ফলে তিন বছর কারাভোগের পর সে এখন মুক্তি পেল। ২০১৩ সালের অগাস্টে ওই কিশোরকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাকে গ্রেফতারের সময় থেকে সাজার মেয়াদ ধরে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর তার মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা সুব্রামানিয়াম স্বামী দিল্লি হাইকোর্টে আসামির সাজার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেও কোনো ফল হয়নি। শুক্রবার ওই আবেদন খারিজ করে সাজার মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেন দিল্লি হাইকোর্ট। বিচারকরা বলেন, “এ বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে আমাদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আইন অনুযায়ী ওই কিশোরকে ২০ ডিসেম্বরের পর সংশোধনাগারে রাখা সম্ভব না।” নিহত শিক্ষার্থীর বাবা-মাসহ অনেক মানুষ আদালতের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। তারা রোববার সকালে দিল্লিতে একটি প্রতিবাদ মিছিল করতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশি বাধার মুখে তা পণ্ড হয়ে যায়। এর আগে শনিবার বিকালে দিল্লির নারী কমিশনের প্রধান স্বাতী মালিওয়াল আসামির মুক্তি আটকাতে সুপ্রিমকোর্টে একটি আবদেন করেন। সোমবার ওই আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্বদরবার এবং ‘উন্নয়ন’-সন্ত্রাস by আনু মুহাম্মদ

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে প্যারিসে এখন বিশাল সম্মেলন চলছে। এর দুই মাস আগে গত ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক লক্ষ্য স্থির করার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাছাকাছি সময়ে দুটো বৈশ্বিক দরবারের কেন্দ্রীয় বিষয়ে অভিন্নতা আছে। মর্মকথা হলো, বিদ্যমান উন্নয়ন ধরন (উৎপাদন, আহরণ, প্রবৃদ্ধি, ভোগ) দিয়ে বিশ্ব এক মহাবিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে রক্ষা পেতে গেলে উন্নয়নের ধারার মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। সেই পরিবর্তন নিয়েই দরবার, দর-কষাকষি, বোঝাপড়া ও ক্ষেত্রবিশেষে চুক্তি।
দুটো বিশ্বদরবারেই বাংলাদেশ সরকারকে অনেক উৎসাহী ও সক্রিয় দেখা গেছে। দেশ থেকে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অনেক প্রতিনিধি গেছেন সেখানে। বর্তমান উন্নয়নের ধারায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ, তবে যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই লক্ষ্যে আসল কারণ দূর না করে জলবায়ু বিষয়ে বিশাল তহবিলের আয়োজন চলছে। তার দিকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার ও দেশি-বিদেশি বহু নতুন-পুরোনো এনজিও কনসালট্যান্টের নজর। ক্ষতিপূরণের নামে তহবিলের ভাগ পাওয়ার বিষয়ে যত আগ্রহ, নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তনে ততটাই অনাগ্রহ। নিজেদের অপরাধ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই, ভূমিকা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেই।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে হট্টগোলের সুযোগে দেশের ভেতরে ‘উন্নয়ন’ নামে যে সর্বনাশা সব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আড়াল করার চেষ্টাই বরং জোরদার। বাংলাদেশে নদী-বন খুন হচ্ছে সরকারি ভুল প্রকল্প বা দখলদারির জন্য। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বিশ্ব ঐতিহ্য কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বাঁধ সুন্দরবনের বিনাশ ঘটতে যাচ্ছে রামপাল ও ওরিয়ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ ভূমি ও বনগ্রাসী বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের জন্য। অপরিমেয় দায়িত্বহীনতায় বিশাল ঋণ আর বিপদের বোঝা তৈরি করে পারমাণবিক বিদ্যুতের ঢোল পেটানো হচ্ছে। দেশে পাহাড় চলে যাচ্ছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে। বাতাস, পানি ও খাদ্য বিষাক্ত হচ্ছে মুনাফার উন্মাদনায়। এর সঙ্গে ভারতের ফারাক্কা, টিপাইমুখ, চীনের বাঁধ যোগ করছে অপূরণীয় ক্ষতি। এসব ঘটনা দেখলে যে কেউ স্বীকার করবেন প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনে যদি দেশের কোনো ক্ষতি না-ও হতো, তাহলেও দেশের বিপর্যয় কমত না। প্রাণ-প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হতোই, যাকে আমরা বলতে পারি ‘উন্নয়ন স্বৈরতন্ত্র’, তার কারণে। বিশেষজ্ঞ বা এনজিও যে-ই হোক, এসব বিষয়ে নীরব থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কথা বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কী? সরকার কী করে, কোন মুখে এই উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে টেকসই প্রকল্প আর পরিবেশ রক্ষার নামে অর্থ ভিক্ষা করতে পারে?
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের দীর্ঘ ঘোষণা প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘আমরা এমন এক বিশ্ব কল্পনা করি, যেখানে প্রতিটি দেশ একটানা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগ করবে এবং সবার জন্য শোভন কাজের নিশ্চয়তা থাকবে। এমন এক বিশ্ব, যেখানে ভোগ ও উৎপাদনের ধরন এবং সব প্রাকৃতিক সম্পদ—বাতাস থেকে জমি, নদী, লেক, ভূগর্ভস্থ পানি থেকে সাগর–মহাসাগর—ব্যবহারের ধরন হবে টেকসই।’ আসলেই বিশ্বনেতারা তা-ই মনে করেন? মনে করলে নিজেদের ভূমিকার কী পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন তাঁরা? তাঁরা আরও বলেছেন, আমরা এমন এক বিশ্ব কল্পনা করি, যেখানে গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসনের সঙ্গে সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য ও ÿক্ষুধার নিরসন ঘটবে। বলছেন, এমন এক বিশ্ব, যেখানে উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার হবে জলবায়ু সংবেদনশীল, যেখানে জীববৈচিত্র্য গুরুত্ব পাবে। এমন এক বিশ্ব, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাঁচবে এবং যেখানে বন্য প্রাণী ও অন্যান্য জীবিত প্রজাতি রক্ষা পাবে। <https://sustainabledevelopment. un. org/post 2015 /transformingourworld> বাংলাদেশ সরকার এই ঘোষণার শরিক হয়ে কীভাবে উপরিউক্ত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হয়?
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল নিয়ে বিশ্বে এ রকম একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদি এভাবেই উন্নয়ন ভোগ চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যঘাটতি বাড়বে। প্রাণ ও প্রকৃতির বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু বিশেষজ্ঞ গিডিয়ন পলিয়া লিখেছেন, ‘প্রতিবছর বিশ্বের ৭০ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের কারণেই মৃত্যুবরণ করে।’ (কাউন্টার কারেন্টস, ২৯ নভেম্বর ২০১৫) তিনি আরও বলেন, বিশ্বকে খুব দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে যেতে হবে। তিনি তথ্য দিয়েছেন উচ্চমাত্রায় ভর্তুকিপ্রাপ্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত ব্যয় চার ভাগের এক ভাগ।
১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যারা আসল অপরাধী, সেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত সর্বোপরি বিশ্ব করপোরেট গোষ্ঠী যথারীতি গা না লাগানোয় কোনো কাজ হয়নি। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে আরেকটি সমঝোতা হয়, ফলাফল একই রকম। এর মধ্যে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে আরও অবনতি হয়েছে, পাশাপাশি যুদ্ধ, সহিংসতা, দখল ও গণহত্যায় বিশ্বের মানবিক পরিবেশ আরও অবনতির শিকার হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, বেড়েছে বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তাও।
আমরা দেশে-বিদেশে পুঁজিপন্থী অনেক বিশেষজ্ঞ পাই, যাঁরা মনে করেন, পরিবেশ বিষয়ে চিন্তা করা একটা বিলাসিতা। গরিব দেশ বা গরিব মানুষের এই বিলাসিতা সাজে না। আগে প্রবৃদ্ধি হোক, পরে পরিবেশ ঠিক করা যাবে। আসলে ঘটনাটা উল্টো। গরিবদের জন্যই নিজেদের সম্পদ রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নদী, বন, আবাদি জমি, বাতাস নষ্ট হয়ে গেলে বিকল্প পাওয়ার উপায় তাদের আরও কম। পানি নষ্ট হলে ধনী কিনে খেতে পারে, বাতাস নষ্ট হলে ধনী এসি লাগিয়ে ঘুরতে পারে, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে ধনী লোকজন অন্য দেশে পাড়ি জমাতে পারে। গরিবের জন্য তার উপায় নেই। তাকে দেশেই থাকতে হবে। তার জন্য উন্নয়ন মানে তার বর্তমানকে আরও সমৃদ্ধ করা, সব সম্ভাবনা নিঃশেষ করা নয়। অর্থনীতিবিদ পার্থ দাশগুপ্ত উন্নয়ন সম্পর্কে অর্থশাস্ত্রের নানা তত্ত্ব ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি-বিষয়ক সমসাময়িক মডেলগুলো প্রকৃতিবিদ্বেষী, তারা প্রকৃতিকে দেখে স্থির অবিনাশী একটি উৎপাদন একক হিসেবে, যা খুবই ভুল। প্রকৃতি হচ্ছে বিনাশযোগ্য অসংখ্য উপাদানের সমষ্টি।’ (দ্য নেচার অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব নেচার, ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি, ডিসেম্বর ২১, ২০১৩)। প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা আছে, কিন্তু তা মানুষের আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই নষ্ট হয়ে যায়।
কার্যত এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনেই প্রধান সমস্যা দুটো। প্রথমত, যে উন্নয়নদর্শন বিশ্বকে এই রকম বিপদগ্রস্ত অবস্থায় নিয়ে গেছে, তার প্রধান অংশীদারদের কর্তৃত্ব বজায় রেখে, তাদের স্বার্থ সমুন্নত রাখার সব ব্যবস্থা অটুট রেখেই ঘোষণা, লক্ষ্য ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ভালো ভালো লক্ষ্য খণ্ড খণ্ড পরিকল্পনার অধীনে তাদের মর্জি দ্বারাই পরিচালিত হয়। এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থরক্ষায় দেখা দেয় গোঁজামিল। দ্বিতীয়ত, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অব্যাহত সন্ত্রাসী তৎপরতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও তার উৎস স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি, সমরাস্ত্র উৎপাদন, দখল ও গণহত্যা নিয়ে কোনো ঘোষণা, প্রতিশ্রুতি, কর্মপরিকল্পনা নেই।
নাওমি ক্লেইনের সঙ্গে আমি একমত যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বর্তমান সংকট বিশ্বের একটি মৌলিক পরিবর্তনের জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। নাওমি এই পরিবর্তনের বিভিন্ন দিকের দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। (দিজ চেঞ্জেস এভরিথিং. ক্যাপিটালিজম ভিএস দ্য ক্লাইমেট, এনওয়াই, ২০১৪)। সেই পরিবর্তনের মূল কথা বিশ্বজুড়ে নিজেদের জীবন, সম্পদ ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধ ও ধ্বংসে অর্থের অপচয়ের ধারা বন্ধ করে সর্বজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ও গৃহায়ণে অর্থ জোগান। জ্বালানি, পানির ওপর সর্বজনের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নির্বিচার অন্ধ প্রবৃদ্ধি ও মুনাফামুখী পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়নের ধাক্কায় বিশ্বের অস্তিত্বই এখন বিপন্ন। সে জন্য দুনিয়াজুড়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ এখন সন্ত্রাসীর মতোই বড় ভয়ের নাম। ‘উন্নয়ন’ নামের এই সন্ত্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে মানুষের বৈশ্বিক সংহতি এবং নতুন রাজনীতির তাগিদই প্রবল হয়ে উঠছে এখন।
প্রকৃত কারণের জায়গায় হাত না দেওয়া পর্যন্ত এসব ব্যয়বহুল সম্মেলন, লক্ষ্য, চুক্তি সবই খণ্ডিত ফল দিতে বাধ্য। মূল করণীয় উন্নয়নদর্শনের পরিবর্তন। তার সারকথা উন্নয়নকে নিছক প্রবৃদ্ধি, যেকোনো ধরনের নির্মাণ দিয়ে পরিমাপ করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসা। যেকোনো প্রকল্পের লাভ-ক্ষতি হিসেবে শুধু বিনিয়োগ-লাভ দিয়ে বিচার করার প্রচলিত চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে এর কারণে সমাজ-নদী-পরিবেশগত ক্ষতি তাতে যোগ করা। ব্যক্তির জন্য যতই লাভ হোক, তা যদি সামষ্টিক মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাকে উন্নয়ন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। নদী, বন, আবাদি জমি নষ্ট হয়—এমন উন্নয়ন প্রকল্প বর্জন করা। সর্বজনের সম্পদ কোনোভাবেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে যেতে না দেওয়া। সব প্রকল্পের নির্বাচন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা, জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্মতিকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নিশ্চিত করা। বিশ্বদরবারে এসব কথাই নানাভাবে আসছে, কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন এখন জীবন-মরণ প্রশ্ন।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ। অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anujuniv@gmail.com

নিয়ন্ত্রিত দূষণের পথেই উন্নয়ন

দুই সপ্তাহজুড়ে টান টান উত্তেজনার স্বস্তিকর অবসান হলো প্যারিসের সফল জলবায়ু সম্মেলনে। অংশগ্রহণকারী ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা সবাই মিলে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের (২০১৫) ঘোষণা সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন নির্ধারিত সময়ের ১৬ ঘণ্টা পর। সংগতভাবেই বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ সময়জুড়ে প্যারিস সম্মেলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আরও দীর্ঘ আলোচনা, বিশ্লেষণ চলবে। উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামর্থ্যের বিভিন্নতা রয়েছে। দেশগুলোর ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটও বিভিন্ন। পরিবেশের বিপন্নতা সবুজ এই পৃথিবীর সব দেশের জন্য বিপন্নতার কারণ; তবে তার মাত্রাগুলো ভিন্ন ভিন্ন। তার ওপরে রয়েছে দেশে দেশে জীবনযাত্রার ধরন এবং মাথাপিছু ভোগ্যপণ্য ও সার্ভিস ব্যবহারের অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা ও সামর্থ্যের বিভিন্নতা। এত কিছুর পরও ১৯৫ দেশের সরকারকে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের অভিন্ন চুক্তিতে একমত করা সম্ভব হয়েছে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি সমঝোতা দলিল তৈরি করার মধ্য দিয়ে। বলা হচ্ছে, সবাইকে খুশি করার মতো একটি চুক্তি করা গেছে। সবাই যে দলিলে সম্মত হয়, তাতে নমনীয়তা ও সমঝোতার বাক্যমালা বেশি হবে, সেটিই তো স্বাভাবিক। তবে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন ২০১৫ তো শেষ কথা নয়; বরং প্যারিস ২০১৫ জলবায়ু চুক্তিতে বর্তমান শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে সীমিত (প্রাক্-শিল্প বিপ্লব সময়ের বিদ্যমান মাত্রার তুলনায়) রাখার সম্মিলিত বৈশ্বিক অঙ্গীকার খুব কম প্রাপ্তি নয়। ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কার্বন-দূষণ সর্বোচ্চ মাত্রায় ওঠার আশঙ্কা যখন তীব্র হয়ে উঠেছে, তখন বিশ্বের বড়-মাঝারি-ছোট দূষণকারী সব দেশের মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের আংশিক আইনি দায়বদ্ধতার চুক্তিতে পৌঁছানো অবশ্যই বড় অর্জন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দূষণের দায়ভার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন।
কিন্তু প্যারিস সম্মেলনে সবাই নিজ নিজ দেশের দূষণ হ্রাস করার দায়িত্ব মেনে নিয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পর বিশ্ব সম্মেলনে সমবেত হয়ে বিশ্বনেতারা দূষণ হ্রাসে তাঁদের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জিত হলো এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করার প্রতিশ্রুতিও নির্ধারণ করেছেন। সেই সঙ্গে এই সম্মেলন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দূষণ হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব মোকাবিলার জন্য সক্ষম হতে সহায়তার লক্ষ্যে বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ধনী দেশগুলো এই তহবিলে অর্থের জোগান দেবে। সম্মেলনে গৃহীত চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২০ সাল থেকে। এ সম্মেলনের অর্জন নিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতি ও দ্বিতীয় বৃহত্তম দূষণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘প্যারিস সম্মেলন পৃথিবীর সবাইকে কার্বন-দূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রশ্নে শক্তিশালী বার্তা জানিয়ে দিয়েছে।’ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও বৃহত্তম দূষণকারী দেশ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি জিন হুয়া প্যারিস চুক্তিকে ‘নিখুঁত না হলেও’ ঐতিহাসিক এই অর্জনকে সামনে এগিয়ে নিতে কোনো বাধা মনে করেন না। তিনি বরং চুক্তিকে ‘পক্ষপাতহীন, ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত চুক্তি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতি ও বড় দূষণকারী দেশ ভারতের পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভেদকার প্যারিস চুক্তিকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও পৃথিবীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার দলিল’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। অপরদিকে পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর সম্মিলিত জোটের চেয়ারম্যান গিজা গ্যাসপার মার্টিনস এই চুক্তিকে বলছেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবং পৃথিবীবাসী—সবার জন্য প্রত্যাশার সম্ভাব্য উত্তম অর্জন।’ এই চুক্তি বাস্তবায়নে আগামী কয়েক দশক ধরে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার নানামুখী জটিল কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এর অনেকগুলো অপ্রিয় এবং জনতুষ্টির বিপরীত কাজ। বিশেষভাবে হ্রাস করতে হবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। উৎপাদন-প্রক্রিয়া সচল রাখার সব আয়োজনকে আরও দক্ষ এবং উৎসে দূষণ হ্রাস করার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য বড় বিনিয়োগ,
যৌক্তিক ভোগ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা-কাঠামো গড়তে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রত্যাশিত আর্থিক সহায়তার সিংহভাগ ঋণ বা অনুগ্রহ নয়, প্রাপ্য হিসেবে পেতে চায়। সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলো ব্যবসার বিষয়টি ভুলছে না; বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বিস্তৃত করার প্রযুক্তি তাদের জন্য বড় ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলোর কাছে কার্বন-দূষণ হ্রাস করতে যে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ চায়, তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সামর্থ্যবান দেশগুলো নিশ্চিত হতে চায় যে তাদের বিনিয়োগ ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে জবাবদিহির সঙ্গে ব্যবহৃত হবে। এর সঙ্গে সামগ্রিক সুশাসনের ইস্যু জড়িত। বিষয়গুলো দুই পক্ষের বিবেচনার মাপকাঠিতে সব ক্ষেত্রে সমার্থক নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কার্বন-দূষণ হ্রাস করার ঘোষণা দেওয়া যত সহজ, কার্যত দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন-প্রক্রিয়ার গতিমুখ ঘোরানো তত সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময়, টেকসই প্রযুক্তির পর্যাপ্ত সমাবেশ এবং তাদের দক্ষ পরিচালন অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সে জন্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। তবে আশার কথা, কার্বন-দূষণ হ্রাস করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে বড় বড় ব্যবসার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোও ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। তারা এ ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ, গবেষণা ও দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছে। সুতরাং বাজারের নিয়মে দূষণ হ্রাসের প্রযুক্তি উন্নয়নে পুঁজির প্রবাহ বাড়বে, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে। ভোক্তা ও বিশ্বের নাগরিক হিসেবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও আমরা সেই অর্জনগুলোর চুইয়ে পড়া সুবিধা পাব। এর সঙ্গে আমরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে বিপন্ন পৃথিবীতে ভালোভাবে টিকে থাকার টেকসই কৌশল যত বেশি প্রয়োগ করতে পারব (বাংলাদেশের এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে অর্জন ফেলনা নয়) তত অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরতা কমবে।
ড. মুশফিকুর রহমান: খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।

সহিষ্ণুতা ছাড়া গণতন্ত্র হয় না

‘আমি মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ’—সোনিয়া গান্ধী কেন এ কথা বললেন, তার মর্ম আমি বুঝতে পারলাম না। ব্যাপারটা ছিল বিলুপ্ত পত্রিকা ন্যাশনাল হেরাল্ড-সংক্রান্ত, যে পত্রিকাটি সরকারের কাছ থেকে ৯০ কোটি রুপি ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেয়নি। ফলে আদালত এই ফেরত না দেওয়ার ঘটনাটিকে ‘অপরাধমূলক’ কাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ওদিকে সোনিয়াপুত্র রাহুল গান্ধীও আদালতের এই রায়কে তাঁদের ও কংগ্রেস পার্টির বিরুদ্ধে মোদির ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, এটা তো আদালতের সিদ্ধান্ত, এর মধ্যে সরকার এল কোত্থেকে? রাহুলের এই কথায় জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে—এই আশঙ্কায় কংগ্রেস ভোল পাল্টেছে। দলটি আদালতের রায় থেকে রাহুলের মন্তব্যকে বিযুক্ত করার চেষ্টা করছে। ওদিকে কংগ্রেসের সাবেক আইনমন্ত্রী কপিল শিবাল রাহুলের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য সমর্থন করে বলেছেন, এটা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের প্রতিশোধ। দেখা যাচ্ছে, সোনিয়া ও রাহুল দুজনেই এই ঋণের প্রসঙ্গটির রাজনীতিকীকরণ করার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা আসলে এই ঋণ পরিশোধ করতে চান না। মা ও ছেলে উভয়ই মোদি ও বিজেপি সরকারকে অযথা এর মধ্যে টেনে এনেছেন। সোনিয়া গান্ধী তাঁর শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর মতোই আচরণ করছেন। সোনিয়া ক্ষমতায় থাকলে হয়তো শাশুড়ির পদাঙ্কই অনুসরণ করতেন। তিনি হয়তো জরুরি অবস্থা জারি করে সংবিধান স্থগিত করতেন, তারপর হয়তো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতেন এবং বিনা বিচারে লাখ খানেক লোককে জেলে পুরতেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের সঙ্গে মামলায় হেরে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, আদালত তাঁকে ক্ষমতার অপব্যবহার করার জন্য ছয় বছরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। তখন তিনি লোকসভা থেকে পদত্যাগ না করে জরুরি অবস্থা জারি করেন আর নিজের অবৈধভাবে নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটি জায়েজ করার জন্য ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে আইন সংশোধন করেন। সংসদও সেটা অনুমোদন করে। ওই সময় সংসদে কোনো বিরোধী দলই ছিল না। কারণ, তিনি বিরোধী দলের সাংসদদের গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা আর সংসদে বাগড়া দিতে না পারেন। কংগ্রেস পার্টি আসলে এটা বুঝতে পারেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি দল যেমন গুরুত্বপূর্ণ,
তেমনি বিরোধী দলও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়। এখন কথা হচ্ছে, মোদি সরকারের যত পাপই থাকুক না কেন, বহুত্ববাদের ধারণা বিনষ্ট করার লক্ষ্যে আগে যেসব আইন হয়েছে, তার জন্য তো বিজেপিকে দায়ী করা যায় না। তবে সামগ্রিকভাবে এর মূল দায় ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি), যার লক্ষ্য হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এটা ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গণতান্ত্রিক ভারত সংবিধানে স্থান দিয়েছে। মোদি সরকারের ওপর আরএসএসের আছর আছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস বিজেপির নেই। যেমন, তারা বহুত্ববাদের গায়ে হাত দিতে চায় না। কারণ তারা জানে, অধিকাংশ ভারতীয়ই ধর্মনিরপেক্ষতার পাল্টা প্রপঞ্চ হিসেবে হিন্দুত্বকে গ্রহণ করবে না। তবে এটা দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে মোদি সরকার ভারতে অসহিষ্ণুতার আবহ তৈরি করেছে, যার কারণে শুধু মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সামগ্রিকভাবে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে দেশে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য আরও আরও বিনিয়োগ দরকার, সে দেশকে ডানপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া কাজের কথা নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে অভিনন্দন জানানো উচিত। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যে অচলাবস্থা ছিল, তিনি সেটা ভেঙেছেন। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না করলে ভারত তার সঙ্গে কথা বলবে না—ভারতকে এমন কট্টর অবস্থান থেকে তিনি সরিয়ে এনেছেন। ভারতের স্বার্থেই তিনি নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তবে এসব পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল, বহু বছর এমনিতেই নষ্ট হলো। সারা দেশেই তাঁর উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। নয়াদিল্লি মানুষের আকাঙ্ক্ষার সম্মান দেয়, যে মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে চায়। সমস্যাটা পাকিস্তানের, সেখানে উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর আধিপত্য আছে। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করার ব্যাপারে ইসলামাবাদের ওপর চাপ রয়েছে। তারপরও এটা বুঝতে হবে যে এই বন্ধুত্বের বিকল্প নেই। সেটা আজ হোক বা কাল, এই দুই দেশের সামনে স্রেফ একটা সুযোগই রয়েছে। অবশ্য উভয় পক্ষেরই কিছু অংশ বিষয়টা বোঝে। কিন্তু তারা কমজোর, মৌলবাদীরা তাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। গত সাত দশক আমরা নিরর্থক অনেক কিছুই করলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সম্পর্কের মধ্যে বৈরিতার বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান এ পর্যন্ত দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ করেছে, তা ছাড়া কারগিলে তারা একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ করেছে। দুই পক্ষেরই হাজার হাজার সেনা মারা গেছে। কাশ্মীর হচ্ছে রোগের লক্ষণ, এটা রোগ নয়। এই রোগটা হচ্ছে আস্থার ঘাটতি। সময় এসেছে, এখন আমাদের এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে এই দেশ দুটি প্রতিবেশীর মতো স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারবে। এই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা দূর করার জন্য পাকিস্তানকে পাঠ্যবই বদলাতে হবে, স্কুলের জন্য জারি করা পরিপত্র বদলাতে হবে। কথা হচ্ছে, হিন্দু মৌলবাদ ও মুসলিম মৌলবাদ একই জিনিস, তাদের মধ্যে পার্থক্য নেই।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

গণতন্ত্রে এখন ভাটার টান by এ কে এম জাকারিয়া

গণতন্ত্রের জোয়ার-ভাটা বলে একটি বিষয় রয়েছে। কখনো দুনিয়াজুড়ে এর ঢেউ আছড়ে পড়ে, আর সেই পর্ব শেষ হলে গণতন্ত্রে আসে ভাটার টান। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তাঁর দ্য থার্ড ওয়েভ: ডেমোক্রেটাইজেশন ইন দ্য লেট টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি বইয়ে আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের তিনটি জোয়ারের সময়ের কথা বলেছেন। এই জোয়ারগুলোর মাঝে ভাটার পর্ব গেছে। বাংলাদেশও গণতন্ত্রের এসব জোয়ার-ভাটার বাইরে নয়।
আমাদের দেশে এরশাদ বা স্বৈরাচার পতনের ২৫ বছর পূর্তির সময় ‘গণতন্ত্র’ বিষয়টি আবার আলাপ-আলোচনায় এল। স্বৈরাচার পতনের সঙ্গে যে গণতন্ত্রের একটি সম্পর্ক ছিল (গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্র ফিরে পাওয়া বা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করা), সেটা প্রায় ভুলতে বসার দশা হয়েছিল। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরাতে শুধু নয় বছর সময়ই লাগেনি, দিতে হয়েছে অসংখ্য জীবন। এর পরের ২৫ বছরে আমরা কী পেলাম—এসব হিসাব-নিকাশের মধ্যে গণতন্ত্রের বর্তমান দশা নিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে হলেও কিছু হায়-আফসোস এবার আমরা শুনতে পেলাম।
হান্টিংটনের বইয়ে ফিরে আসি। তিনি তাঁর বইটিতে লিখেছেন, আধুনিক গণতন্ত্রের যে যাত্রা, তা তিনটি পর্ব বা ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। গণতন্ত্রের প্রথম ঢেউটি ছিল ১৮২৮ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত। প্রায় ১০০ বছরের দীর্ঘ এই জোয়ারের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিশ্বের ২৯টি দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ভাটার সময় গেছে গণতন্ত্রে। তখন কোথাও ফ্যাসিজমের বিকাশ হয়েছে, কোথাও কোথাও কমিউনিজম। গণতন্ত্রের দ্বিতীয় জোয়ার শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যৌথ বাহিনীর বিজয়ের পর। বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব গণতন্ত্রে আবার চলে ভাটার টান। সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে জোরদার হয়ে ওঠে কর্তৃত্ববাদী শাসন। গণতন্ত্রের শেষ জোয়ারটি বয়ে গেছে ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত, এ সময়ে দক্ষিণ ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও বিভিন্ন কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। ১৯৯৪ সাল নাগাদ বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭২।
হান্টিংটনের এই গণতন্ত্রের জোয়ার-ভাটার হিসাব অনুযায়ী, এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন গণতন্ত্রের জোয়ারের পর্ব চলছিল। সম্ভবত সে কারণেই এরশাদের ক্ষমতা দখলের প্রায় শুরু থেকেই এর বিরোধিতা শুরু হয়। বড় ভুল সময়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন তিনি! কিন্তু এরপরও নয় বছর ক্ষমতা দখল করে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। তবে গণতন্ত্রের জোয়ার থাকতে থাকতেই তাঁকে হটানো গেছে। আরও বছর দু-এক টিকে গেলে হয়তো তাঁকে সরানো কঠিন হতো। কারণ, হান্টিংটনের মত মেনে নিলে গণতন্ত্রের তৃতীয় ও শেষ জোয়ারটি ছিল ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ভাটার শুরুটা তবে হয়েছে এরপর থেকেই। এ ধরনের সময়ে স্বৈরশাসকদের সরানো কঠিন হওয়ারই কথা।
গণতন্ত্রের বর্তমান ভাটার সময়টি আগেরগুলোর চেয়ে ভিন্ন। এই যে প্রায় ২৪ বছর ধরে বিশ্ব গণতন্ত্রে ভাটার পর্ব চলছে, এতে কিন্তু আগের মতো গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা কমেনি। বাংলাদেশের কথা যদি বলি, নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশও কিন্তু তার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচিতি হারায়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৫ সালের পর বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা কমেনি। ২০১৪ সালে বিশ্বে নির্বাচিত গণতন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ১২৫-এ। প্রশ্নটি এখন সংখ্যার নয়, মানের। এই সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সরকারব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রের বদলে ভিন্ন কিছু বেছে নেয়নি। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সরকারগুলো কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে। সমাজের সবকিছুর ওপর সরকারগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ কঠোর থেকে কঠোর করতে যাচ্ছে।
এ বছরের শুরুতে (জানুয়ারি মাসে) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের মান পড়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তারা এ তথ্য দিয়েছে। ফ্রিডম হাউসের হিসাব অনুযায়ী গণতন্ত্রে এই বাজে দশা চলছে সেই ২০০৫ সাল থেকে। আর ২০১৪ সাল ছিল বিশেষ করে সবচেয়ে খারাপ বছর। বিশ্বের ৬১টি দেশে সে বছর গণতন্ত্রের মান পড়েছে। উন্নত হয়েছে মাত্র ৩৩টি দেশে। গত নয় বছরের মধ্যে এই পরিস্থিতি হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ।
দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি কেন খারাপের দিকে যাচ্ছে? এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্কিন থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবার্ট কেগান। ব্রুকিংস জার্নাল অব ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘ইজ ডেমোক্রেসি ইন ডিক্লাইন’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার ব্যাপারে একসময় পশ্চিমারা যে সমর্থন দিয়ে গেছে এবং এর পক্ষে যে জোরালো ভূমিকা (আমাদের অনেকের কাছেই হয়তো তা পশ্চিমের নাক গলানো ও মোড়লিপনা) পালন করেছে, সেই অবস্থান থেকে তারা সরে এসেছে। তাঁর মত হচ্ছে, সে জন্যই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা জোরদার হয়েছে। তিনি লিখেছেন, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো এখন তাদের পুরোনো চর্চা বন্ধ করেছে অথবা নিজেদের সমস্যা সামাল দিতে ব্যস্ত রয়েছে। চীন ও রশিয়ার মতো কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর প্রভাব ও ভূমিকার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের দেশগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে যেমন প্রভাবিত করছে, তেমনি আঞ্চলিকভাবেও প্রভাব সৃষ্টি করছে, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
তবে এই যে কর্তৃত্ববাদী শাসন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জেঁকে বসছে, এর নেতারা কিন্তু আগের স্বৈরশাসকদের মতো নন। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইলিয়াম ডবসন তাঁর দ্য ডিক্টেটরস লার্নিং দ্য কার্ভ (২০১২) বইয়ে বলেছেন, বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা অতীতের স্বৈরশাসকদের কাছ থেকে শিখেছেন। আগের স্বৈরশাসকদের জন্য কাজটি খুব সহজ ছিল। তখন কোনো ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটার ছিল না। তিনি লিখেছেন, আজকের দুনিয়ায় একজন স্বৈরশাসক তাঁর কোনো অপকর্ম গোপন রাখার আশা করতে পারেন না। ‘এমনকি আপনি যদি হিমালয় পর্বতের কোনো গিরিপথেও সহিংস অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন, তারপরও জানবেন যে এটা কোনো না কোনো আইফোনে ধরা পড়বে এবং সারা দুনিয়ায় তা প্রচারিত হবে।’ বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা নির্মমতার দিক থেকে পিছিয়ে না থাকলেও তাঁরা অনেক পরিবর্তনকেই গ্রহণ করেছেন। আগের স্বৈরশাসকদের তুলনায় তাঁরা অনেক বেশি ‘পরিশীলিত, বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন ও চটপটে’। ২০ বছর আগের স্বৈরশাসকেরা জানতেন না এনজিও ব্যাপারটি কী। আজ এনজিওগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসকদের বড় টার্গেটে পরিণত হয়েছে। বলা যায়, কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা পুরোনো স্বৈরশাসকদের চেয়ে অনেক বেশি পটু হয়ে উঠছেন। তাঁদের এই দক্ষতা বৃদ্ধি গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে।
তবে কর্তৃত্ববাদী শাসন বিস্তারের পেছনে আরও অনেক কিছুই রয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও ভেডোমস্তি পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক মারিয়া স্নেগোভায়া মস্কো টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছেন, গণতন্ত্রের বর্তমান কর্তৃত্ববাদী মডেল জনগণের একটি অংশের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘দ্য পিপল হ্যাভ স্পোকেন: নো মোর ডেমোক্রেসি’ শিরোনামের প্রবন্ধে তিনি মার্কিন সাংবাদিক ক্রিস্টিয়ান ক্যারলকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, অধিকাংশ জনগণের কাছে গণতন্ত্রই শেষ কথা নয়। অনেকেই গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার উৎস হিসেবে। মারিয়া লিখেছেন, গণতন্ত্র এসব নিশ্চিত করতে না পারলে কী হতে পারে, তার একটি উদাহরণ হচ্ছে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরাতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে থাই জনগণের রাস্তায় নেমে আসা।
মিসরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বৈধভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থানে এবং সেখানকার জনগণের একটি বড় অংশ তাকে সমর্থন জানিয়েছে। স্যামুয়েল হান্টিংটন এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে বলেছেন, নতুন গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কখনো ‘ওপর’ থেকে চাপিয়ে দেওয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অভিজাতদের চাপেই এমনটা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক দেশই এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধারণ করতে প্রস্তুত নয়।
হান্টিংটন গণতন্ত্রের যে তিনটি জোয়ার পর্বের কথা বলেছেন, তার প্রথমটি প্রায় ১০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। আর পরের দুটির মেয়াদ ছিল প্রায় এক যুগ ও দেড় যুগ। মাঝের দুটি ভাটার সময় গেছে প্রায় ২০ বছর ও ১২ বছর। ’৯১-এর পর যে তৃতীয় ভাটা শুরু হয়েছে, তা কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় ২৪ বছর সময় পার করেছে। বলা যায়, গণতন্ত্রে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভাটা চলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভাটা কাটবে কবে? বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে এ ব্যাপারে খুব আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের জোয়ারগুলোর পেছনে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তির অবস্থান ও নজরদারির যে ভূমিকার (অথবা নাক গলানো) কথা বলা হয়, সে ধরনের কিছু নতুন করে জোরদার হবে, এমন কোনো লক্ষণ আমাদের সামনে পরিষ্কার নয়।
আইএস বা নানা ধরনের সন্ত্রাসী হামলা থেকে নিজের দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে ব্যস্ত পশ্চিমাদের বিশ্ব গণতন্ত্র নিয়ে ভাবার সময় এখন আদৌ আছে কি? সেখানকার গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যেই বরং কর্তৃত্ববাদ জোরালো হয়ে ওঠার লক্ষণ ফুটে উঠছে। তা না হলে রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষস্থানীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করে দাবি করতে পারেন যে মুসলিম সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে সাময়িকভাবে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে! প্যারিসে হামলার পর ফ্রান্সের স্থানীয় নির্বাচনে ডানপন্থীদের বিজয়ও একই ইঙ্গিত দেয়।
গণতন্ত্রের এই দীর্ঘতম ভাটা বিশ্বকে সম্ভবত এক নতুন ইতিহাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের অস্ত্রের মহড়া

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে ক্যাম্পাসে দুদিন ধরে যে সংঘর্ষ ও আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া হয়েছে, তা দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এই অপকর্মের সঙ্গে সরকার–সমর্থক ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ সরাসরি জড়িত হলেও নেপথ্যে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের বিরোধই কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পাসে এ-ও গুঞ্জন রয়েছে যে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপ উপাচার্যের এবং সহসভাপতির গ্রুপ সহ-উপাচার্যের হয়ে কাজ করে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য যে অনেক বিষয়েই একমত হতে পারেন না, তার প্রমাণ সম্প্রতি পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে গঠিত বোর্ড বাতিল হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজের দরপত্র আহ্বান নিয়েও তাঁদের মধ্যে রেষারেষি স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য যদি সত্যি সত্যি ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে গত দুদিনের সংঘর্ষ এবং ছাত্রলীগের আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়ার দায়ও তাঁরা এড়াতে পারেন না। গত পাঁচ বছরে প্রশাসনের দ্বন্দ্ব এবং ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে তিনবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া দুর্ভাগ্যজনক। এবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পক্ষে ‘ছুটি এগিয়ে আনার’ যে যুক্তি কর্তৃপক্ষ দিয়েছে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়।
গতকাল রোববার প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, প্রতিপক্ষকে আক্রমণরত ছাত্রলীগের এক কর্মী পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়ছেন। তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতে লাঠিসোঁটা। এমনিতেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য রয়েছে। তাদের ভয়ে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের অনেকে ক্যাম্পাসছাড়া। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা প্রশাসনের কেউ যদি ছাত্রলীগকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করেন, তার চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে?
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

জঙ্গিদের দায় স্বীকার তবু ফাঁসানো হলো নিরীহ ১৩ জনকে by গোলাম মর্তুজা ও আনোয়ার পারভেজ

১৩ বছর আগে জয়পুরহাটে এক পীরের খানকায় পাঁচজনকে খুন করা হয়েছিল। এর তিন বছর পর জেএমবির আমির শায়খ আবদুর রহমান টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে অন্য অনেক ঘটনার সঙ্গে এই পাঁচ খুনেও জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তারপরও এ মামলায় জঙ্গিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় ছয় নেতা-কর্মী, সাত শ্রমজীবীসহ ১৩ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে এই পাঁচ খুনকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে পুলিশ। তখন এলাকার বেশ কিছু মানুষকে পুলিশ আটক করে এবং দুজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে এই ১৩ জনকে ফাঁসায়। পরবর্তী সময়ে জেএমবির প্রধান এর দায় স্বীকার করলেও পুলিশ আগের তদন্তকে সঠিক প্রমাণ করতে জঙ্গিদের সঙ্গে এসব ব্যক্তিকেও আসামি করে।
সিআইডি ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর ২১ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। এরপর সাত বছর পার হলেও এখনো সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। দীর্ঘদিন কারাভোগ করে এই ১৩ জন জামিনে মুক্ত হলেও এখনো মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।
এঁদের একজন দরজিশ্রমিক নূর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় এক যুগ ধরে আদালতে হাজিরা দিচ্ছি। মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে। বিচারের কোনো লক্ষণ দেখছি না।’ আরেক আসামি সোলেমান আলী বলেন, বছরের পর বছর ধরে মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে তিনি প্রায় নিঃস্ব।
২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি গভীর রাতে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বেগুনগ্রামে আস্তানায়ে চিশতিয়া নামে এক পীরের আস্তানায় পাঁচজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মাজারের খাদেম নূরউদ্দিন, ভক্ত আফাজ উদ্দিন, দুলাল এবং বাবুর্চি সফিউদ্দিন ও মতিউর রহমান। এ ঘটনায় কালাই থানায় হত্যা মামলা হয়।
জয়পুরহাট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্তের নামে প্রথমে কালাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এমদাদুল হকের বড় ভাই শাহজালালসহ ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পুলিশ ২০০৩ সালের ৯ মার্চ শাহজালালের কাছ থেকে একটি জবানবন্দি আদায় করে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া ওই জবানবন্দিতে শাহজালাল এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে তাঁর ভাই এমদাদুল হকসহ স্থানীয় পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার নাম বলেন। অন্যরা হলেন পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সোলায়মান আলী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম, পৌর আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শমসের আলী ও বেলাল হোসেন।
এরপর ২০০৩ সালের ১০ মার্চ মামলাটি সিআইডিতে যায়। তিন বছর পর ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সিআইডি ভটভটিচালক হযরত আলীকে গ্রেপ্তার করে। পাঁচ দিন রিমান্ডে থাকার পর তিনিও ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি জবানবন্দি দেন। তাতে আওয়ামী লীগের ওই পাঁচ নেতা-কর্মীর পাশাপাশি কালাই পৌর বিএনপির সহসভাপতি আনিসুর রহমান, দরজিশ্রমিক নূর মোহাম্মদ, স্থানীয় গ্রামের বাসিন্দা মফছের আলী, মনতাজ ওরফে মমতাজ ও সিরাজউদ্দীনের নাম উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এসব ব্যক্তি খানকায় ঢুকে পাঁচজনকে হত্যা করে সিন্দুকের টাকা লুট করে নিয়ে যান।
এর কিছুদিন পর সিলেটে গ্রেপ্তার হন জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান। তিনি ঢাকায় টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, ওই খানকায় ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ হয় এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির সদস্য ওই হত্যাকাণ্ড চালায়। ২০০৬ সালের ২৫ মার্চ টিএফআই সেল থেকে এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর এ মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির দিনাজপুর ক্যাম্পের পরিদর্শক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) জালাল আহম্মেদ ২১ জনকে আসামি করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেন। তাতে জেএমবির জঙ্গি আছে আটজন। তাঁরা হলেন তরিকুল ওরফে ভাগনে শহীদ, এনামুল হক, আবু হাসান সরকার, রশিদুল, সালাউদ্দীন, তরিকুল ইসলাম ওরফে হাবিল, শফিউল্লা ওরফে তারেক ও রমজান আলী। অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় জেএমবির তিন শীর্ষস্থানীয় নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাই ও আবদুল আউয়ালকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ‘অভিযুক্ত নহে’ বলে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে জেএমবির আরও ছয় সদস্যকে। তাঁদের মধ্যে একজন হারুন অর রশীদ ওরফে মামুন ২০০৬ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হন। তিনি পুলিশ রিমান্ডে ও টিএফআই সেলে দেওয়া জবানবন্দিতে কালাইয়ে পাঁচ খুনে অন্য জঙ্গিদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তারপরও তাঁকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগপত্র দাখিলকারী সিআইডির পরিদর্শক জালালউদ্দীন দাবি করেন, ‘এ রকম হওয়ার কথা নয়।’
নিরীহ ১৩ জনকে আসামি করার কারণ জানতে চাইলে জালালউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর আগে কয়েকজন কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত করেন। তখন স্থানীয় কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সে অনুযায়ী, ওই ১৩ জনকে আসামি করতে হয়েছে। জালালউদ্দীন বলেন, তিনি তদন্তকালে তিনি টিএফআই সেলে জেএমবির নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের নথি হাতে পান, যার পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিদের আসামি করেন।
আওয়ামী লীগের নেতা এমদাদুল হক বলেন, ‘ঢাকায় শীর্ষ জঙ্গিরা এই মামলায় স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর ভাবছিলাম, বোধ হয় খালাস পাব। আমি খুব অসুস্থ। টাকার অভাবে ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। কিন্তু মামলার হাজিরা দিতে হচ্ছে। খরচ করতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জয়পুরহাটের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, এ মামলায় জঙ্গিদের পাশাপাশি কিছু স্থানীয় রাজনীতিক ও শ্রমজীবী মানুষকে জড়ানোর বিষয়টি তিনি জানেন। এখন কে দোষী, কে নির্দোষ তা আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। এখানে আবেগের কোনো স্থান নাই।

মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন এক শতাব্দী by জেফ্রি ডি শ্যাস

জেফ্রি ডি শ্যাস কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন, স্বাস্থ্যনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এবং আর্থ ইনস্টিটিউটের পরিচালক। তিনি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সহস্র্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে, The End of Poverty, Common Wealth এবং অতি সাম্প্রতিক The Age of Sustainable Development। জেফ্রি ডি শ্যাস এর ব্যতিক্রমধর্মী এই লেখাটি ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশ হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে এ লেখাটি বিশেষভাবে কাজে লাগবে। পশ্চিমা উদারপন্থী ভাবনাও এ লেখায় স্পষ্ট হয়, যদিও পেন্টাগনের কর্তারা এতে কতটা প্রভাবিত হন তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাসুমুর রহমান খলিলী
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বব্যাংকের মতো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান বারবারই প্রশ্ন করে- মধ্যপ্রাচ্য কেন নিজেই নিজেকে শাসন করতে পারে না। এই প্রশ্নটি হয়তো তারা সততার সাথে করে থাকে কিন্তু সত্যিকার সচেতনতার সাথে এটি করে বলে মনে হয় না। যে যাই বলুক না কেন, সত্যিকার অর্থে এই অঞ্চলে সুশাসনের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো এখানে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
একটি শতকই কিন্তু যথেষ্ট। এই ২০১৬ সালেই টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নিজস্বতার ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন শতাব্দীর শুরু করা উচিত। ১৯১৪ সালের নভেম্বরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া পক্ষে অটোমান সাম্রাজ্যের অবস্থান নেয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের পরের ১০০ বছরে নিয়তি ঠিক হয়ে যায়। এর ফলে ওসমানীয় সাম্র্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং তুরস্কের বাইরে বাকি অংশ বিজয়ী শক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রভাব বলয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ব্রিটেন ১৮৮২ সাল থেকেই মিসরের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, আর পরে নিয়ন্ত্রণ নেয় আজকের ইরাক, জর্ডান, ইসরাইল-ফিলিস্তিন ও সৌদি আরবের। অন্য দিকে ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকার বেশির ভাগ এবং লেবানন ও সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জ্বালানি তেল, বন্দর, নৌ রাস্তা এবং স্থানীয় নেতাদের বৈদেশিক নীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে জাতিসঙ্ঘের আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট ও আধিপত্যের অন্যান্য উপকরণ। এটি করতে গিয়ে ইবনে সৌদের হাশেমি হেজাজের আরব জাতীয়তাবাদ থেকে সৌদি আরবকে ওয়াহাবি মৌলবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর সমর্থন করে ব্রিটেন।
১৯৪৯ সালে সিরিয়ার সিআইএ মদদপুষ্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৫৩ সালে ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকারকে সিআইএ’র তৎপরতায় পতন ঘটানোর (দেশের তেল নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমের হাতে রাখতে) মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হস্তক্ষেপের ‘আলোকবর্তিকা’ নিজের হাতে তুলে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালে লিবিয়ার মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে উৎখাত, ২০১৩ সালে মিসরের মোহাম্মদ মুরসির পতন ঘটানো এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একই কাজ বর্তমান পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে আমেরিকা। প্রায় সাত দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের কথামতো না চলার কারণে নিজেরা হস্তক্ষেপ করে (অথবা ভেতর থেকে অভ্যুত্থানে ইন্ধন দিয়ে) অনেক সরকারকে বিদায় করেছে।
এ ছাড়াও পশ্চিমারা শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চলকে অস্ত্রসজ্জিত করেছে। পুরো অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেছে আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শত্রুদের হাতে যুদ্ধোপকরণ যাতে না পৌঁছতে পারে তার ব্যবস্থা করতে সিআইএ’র পদক্ষেপ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং এখন পশ্চিমা নেতারা যখন আরব নেতাদের বলছেন তারা কেন নিজেদের শাসন নিজেরা করতে পারেন না তখন তাদের একটি পাল্টা জবাবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই জবাব হলো ‘গোটা এক শতক ধরে তোমরা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে রেখেছো (আলজেরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর এবং অন্যত্র নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে) আর এর প্রভাবে বারবার আঘাত এসেছে স্থিতিশীলতায় এবং এখন যা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিয়েছে; নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সহিংস জিহাদিদের তোমরা সশস্ত্র করেছ; আর আজ বামাকো থেকে কাবুল পর্যন্ত প্রসারিত এক বধ্যভূমি তোমরা তৈরি করেছ।’
তবে একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য গড়তে কী পদক্ষেপ নিতে হবে? আমি এ ব্যাপারে পাঁচটি নীতি গ্রহণের কথা বলব। এর মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের যেকোনো স্থানে প্রতিষ্ঠিত সরকারের পতন ঘটানো বা সরকারকে অস্থির করে তোলার জন্য সিআইএকে তার গোপন অপারেশন বা অভিযানের ইতি ঘটাতে হবে। ১৯৪৭ সালে দু’টি ম্যান্ডেট দিয়ে সিআইএ গঠন করা হয়। এর একটি হলো বৈধ (গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ) আর অন্যটি হলো বিপর্যয়মূলক (মার্কিন স্বার্থের ‘প্রতিকূল’ হিসেবে গণ্য শাসন উৎখাতে গোপন অপারেশন)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পারেন এবং এটি তার করা উচিত যে, সিআইএ’র গোপন অপারেশন বন্ধের জন্য তিনি নির্বাহী আদেশ জারি করবেন। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এখন যে যুদ্ধ ও পাল্টা যুদ্ধ চলছে তার অবসান ঘটবে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হওয়া উচিত তার বৈধ পররাষ্ট্র লক্ষ্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে অর্জনের চেষ্টা করা। আমেরিকার অনুধাবন করা উচিত যে, বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন ‘কোয়ালিশন অব উইলিং’ এ অঞ্চলে শুধু ব্যর্থ হয়নি এমনকি প্রতিপক্ষের ভূ-রেষারেষির কারণে দেশটির আইএসের গতি রোধ করার মতো বৈধ পদক্ষেপও বাধার মুখে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনের জন্য সেটাকে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটের জন্য দিলে বেশি লাভবান হতে পারত। ২০০৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদে ইরাক যুদ্ধ প্রস্তাব যখন প্রত্যাখ্যাত হয় তখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উচিত ছিল এই অভিযান থেকে বিরত হওয়া। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী সদস্য রাশিয়া যখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারের মার্কিন সমর্থিত উৎখাত প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে তখন তাকে বিদায় করতে গোপন অভিযান থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল। আর এখন, সমগ্র নিরাপত্তা পরিষদ ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ এর বিরুদ্ধে লড়তে বৈশ্বিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে (কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তার উদ্যোক্তা নয়)।
তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের এই বাস্তবতা গ্রহণ করে নেয়া উচিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের চর্চার ক্ষেত্রে ভোটে অনেক ইসলামি দল জয়ী হতে পারে। অনেক দুর্বল সরকার যেভাবে ব্যর্থ হয় সেভাবে নির্বাচিত ইসলামি দলের সরকারও ব্যর্থ হতে পারে। তারা পরবর্তী নির্বাচনে অথবা রজপথে আন্দোলনে এমনকি স্থানীয় জেনারেলদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে বিবেচনায় না এনে সব ইসলামি সরকারকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থান নিয়েছে তা এই অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চতুর্থত, উত্তর আফ্রিকা থেকে সাহেল অঞ্চল পর্যন্ত এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত স্থানীয় নেতৃত্বের এই স্বীকৃতি দেয়া উচিত যে, আজ ইসলামি বিশ্বের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার মান। বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শিল্পোদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায় উন্নয়ন এবং (এর মাধ্যমে) কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই অঞ্চল অনেক পিছিয়ে আছে। উচ্চমানের শিক্ষা ছাড়া কোনো স্থানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সামান্য সম্ভাবনাও থাকে না।
অবশেষে, পরিবেশের অবক্ষয়ে এই অঞ্চলের ভঙ্গুরতা এবং বিশেষভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন পর্বে বৈশ্বিক স্থানান্তরের ফলে তেলের ওপর অতি নির্ভরতা যে বিপদ ডেকে আনতে পারে তা কাটানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল বিশ্বের বৃহত্তম জনবহুল শুষ্ক অঞ্চল (৫,০০০ মাইল বা ৮,০০০ কিলোমিটার)। এই এলাকায় ব্যাপক পানির ঘাটতি, মরুকরণ প্রবণতা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। যেগুলো হলো মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব চ্যালেঞ্জ। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, আসাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং মতবাদজনিত বিরোধ এ অঞ্চলের জন্য মানোত্তীর্ণ শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় সন্দেহাতীতভাবে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ইসলামি বিশ্বে অনেক সাহসী এবং প্রগতিশীল চিন্তাবিদ রয়েছেন যাদের এই বাস্তবতার ব্যাপারে তাদের সমাজকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আর সারা বিশ্বের সুবিবেচনাপ্রসূত সব মানুষের উচিত হবে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং সাম্রাজ্য বিস্তার ধরনের যুদ্ধ ও কারসাজির অবসান ঘটানো।

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়ছে by হাসান ফেরদৌস

প্যারিসে ও ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান বার্নাদিনোতে সন্ত্রাসী হামলা এবং মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতিকদের প্রবল মুসলিমবিরোধী অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম-বিদ্বেষী ঘটনা বেড়ে গেছে। সর্বশেষ ঘটনায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ভার্জিনিয়ার একটি শহরে সব স্কুল এক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়।
ওবামা প্রশাসন মুসলিমদের কোনো কোনো ঘটনাকে বিদ্বেষপূর্ণ অপরাধ বা ‘হেইট ক্রাইম’ হিসেবেই বিবেচনা করছে। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে গড়ে ১২ দশমিক ৬টি মুসলিমবিরোধী অপরাধ ঘটে থাকে। কিন্তু প্যারিস ও স্যান বার্নাদিনোর ঘটনার পর এই অপরাধের হার তিনগুণ বেড়েছে। এর মধ্যে ১৮টি ঘটনা ঘটেছে ২ ডিসেম্বর স্যান বার্নাদিনোতে দুই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির হাতে ১৪ জন নিহত হওয়ার পর। এফবিআইয়ের সূত্র উদ্ধৃত করে মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর এমন ব্যাপক মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা দেখা যায়নি।
প্রেসিডেন্ট ওবামা একাধিকবার নিরপরাধ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। এ মাসের গোড়ার দিকে ওভাল অফিস থেকে এক ভাষণে তিনি মুসলিমদের আমেরিকার বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেন ভুলে না যাই যে তারা আমাদের প্রতিবেশী, তাদের অনেকে সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে আমাদের দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত।’
নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও মুসলিমপ্রধান মিশিগান রাজ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে মুসলিমদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু ঘটনা ঘটে চলেছে, যাতে মুসলিমরাও উদ্বিগ্ন।
ঘটনাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে হিজাব পরিহিত একাধিক মুসলিম নারী বিদ্রূপের সম্মুখীন হয়েছেন। এই শহরের ব্রঙ্কসে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীর হিজাব টেনে তাকে ‘আইসিস’ বলে তিরস্কার করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো, আনাহাইম এবং ফ্লোরিডাতেও অনুরূপ ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। পিটসবার্গে একজন মুসলিম ট্যাক্সি ড্রাইভার তারই গাড়ির যাত্রীর গুলিতে সামান্য আহত হয়েছেন। মিশিগানের ডিয়ারবর্নে একজন নারী সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক ও টুইটারে মুসলিমদের আঘাত করার আহ্বান জানালে এফবিআই বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব নেয়। স্যান বার্নাদিনোর ইসলামিক কাউন্সিল জানিয়েছে, সেখানে গাড়ি ধোয়ার দোকানে এক মুসলিম নারীকে চাকু দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। পুলিশ ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ভার্জিনিয়ার আউগুস্তা কাউন্টিতে। সেখানে মাধ্যমিক স্কুলের এক শিক্ষক ছাত্রদের ক্যালিগ্রাফি (হরফ লিখনপদ্ধতি) শিক্ষার ক্লাসে মুসলিমদের কলেমার ক্যালিগ্রাফি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে প্রথমে ছাত্ররা আপত্তি করে, পরে তাদের অভিভাবকেরা সে প্রতিবাদে যুক্ত হন। অবশেষে প্রবল প্রতিবাদের মুখে ওই জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
অন্য আরেক ঘটনায় শিকাগোর হুইটন কলেজের এক শিক্ষক তাঁর ফেসবুক পেজে মুসলিম ও খ্রিষ্টান উভয়ে একই ঈশ্বরের প্রার্থনা করে, এই কথা লেখার অপরাধে সাময়িকভাবে চাকরি থেকে অপসারিত হয়েছেন। লারসিয়াহকিন্স নামের ওই শিক্ষক মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সংহতির অংশ হিসেবে এই মন্তব্য করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
মুসলিম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস ব্যাপক জনসংযোগের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে তাঁরা ফ্লোরিডার ট্যাম্পা ও অরলান্ডোর বিভিন্ন এলাকায় ইসলামের শান্তিপূর্ণ বাণী প্রকাশ করে বিলবোর্ড বসানোর ব্যবস্থা করেছে। আমেরিকার মুসলিমপ্রধান এমন বিভিন্ন শহরে প্রায় ১০০ বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে বলে ইসলামিক কাউন্সিলের পক্ষে একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন।
মুসলিম বিদ্বেষ বাগে আনার জন্য নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও গত সপ্তাহে এই শহরের মুসলিম নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং জ্যামাইকায় বাংলাদেশিদের পরিচালিত একটি মসজিদে নামাজের সময় উপস্থিত হয়েছিলেন।

অবহেলিত শিশুদের পাশে সোনালি স্বপ্ন by এম মাঈন উদ্দিন

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের নিজামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এলাকা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে শাহেরখালী ইউনিয়নের শেষ প্রান্ত গজারিয়া বেড়িবাঁধের বঙ্গোপসাগরের মোহনা। এই বেড়িবাঁধে বসবাস অসহায় দরিদ্র মানুষদের। যারা নিজের বসতভিটা না থাকায় এখানে এসে বসত করছেন। দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা এ পরিবারগুলো জেলে পরিচয়ে বেড়ে ওঠে। সাগরে মাছ ধরাই তাদের পেশা বলে মানুষের মাঝে ওরা অবহেলিত। তাদের সন্তানেরা চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশু। ভাঙা কুটিরে বসবাস তাদের। গায়ের জামাও মলিন। চেহারায় অযতœ অবহেলার চাপ। গাঁয়ের কাদামাটি মেখে ওদের বড় হওয়া, নদীতে মাছ ধরে, বনে কাঠ কেটে ওরা ছোট্ট বয়সেই সাংসারিক দায়িত্বের ভার নেয়, ওদের কারো বাবা নেই, কেউ এতিম আবার কেউ বা প্রতিবন্ধী।
মেয়েরা অল্প বয়সে হয়ে যায় সংসারিনী। ছেলেরা ধরে সংসারের হাল। ওদের জীবন বদলাতে এগিয়ে আসে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের কিছু শিক্ষিত তরুণ। তারা প্রথমে গড়ে তোলে একটি সংগঠন ‘সোনালি স্বপ্ন পাঠশালা’।
সাগরপাড়ে স্বপ্নযাত্রা শুরু হয় ছোট্ট একটি টিনের ঘরে। গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আসে পাঠশালায়। যে গ্রামে আগে কেউ আগে পড়েনি, তাদের কাছে কষ্ট হলেও আনন্দের। মা-বাবাও খুশি, সন্তানেরা অক্ষরজ্ঞান লাভ করে শিক্ষিত হচ্ছে দেখে। খেলাচ্ছলে জীবন গঠনের শিক্ষা নেয় পরম মমতায়। গ্রামে স্কুল না থাকায় ওরা আগে স্কুলে যেত না। প্রাথমিক শিক্ষাও ওদের কপালে জুটত না। পেত না কারো সহানুভূতি। সোনালি স্বপ্ন দুই বছর ধরে তাদের পাশে আছে, ওদের শিক্ষিত করার ভার নিয়েছে, শিশুদের আলোর পথে আনার জন্য ‘সোনালি স্বপ্ন পাঠশালা’ কাজ করে যাচ্ছে অবিরাম। একজন-দু’জন করে এখন প্রায় ৫০ জন শিশু পাঠশালায় পড়তে যায়।
শিশুদের অনেক দিনের চাওয়া ছিল সবাই মিলে একদিন পিকনিক করার। সবাই একসাথে মজা করবে, আনন্দ করবে, খাবার খাবে, গান গাইবে। ওই ইচ্ছাও পূর্ণ হলো গত শনিবার (১২ ডিসেম্বর)। শিশুদের কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে ওঠে জনপদ। ওদের সাথে আমিও একটা দিন কাটালাম, মজা করলাম, দুপুরে একসাথে খেলাম, বনের পাশেই হলো বনভোজন।
শীত হারবে মানবতার কাছেÑ এই স্লোগানে সোনালি স্বপ্ন পাঠশালার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আনন্দটা দ্বিগুণ হলো চট্টগ্রাম শহরের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের সংগঠন ‘রংধনু ফাউন্ডেশন’-এর কল্যাণে। গ্রামকে অন্তরে ধারণ করে, শহর থেকে এসে পাঠশালার শিশুদের প্রতিটি পরিবারের মাঝে তারা তুলে দিলেন শীতবস্ত্র (কম্বল)। পিকনিকের আয়োজন, সাথে নতুন কম্বল আর অতিথিদের আদরযত্নে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চোখেমুখে খুশির অন্ত ছিল না, তৃপ্তির হাসি ছিল সবার মুখে।
সোনালি স্বপ্নের অন্যতম কর্ণধার মমিনুল হোসাইন টিপু জানান, এখন থেকে প্রায় দুই বছর আগে আমরা কয়েকজন বেড়িবাঁধে ঘুরতে আসি। এখানে এসে দেখি, অনেক শিশু রয়েছে তারা কেউ পড়াশোনা করে না। একটু বড় হলেই তারা মাছ ধরা, কাঠ কাটাসহ বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ে। কারণ, তাদের পাশে কোনো স্কুল নেই। বছরের পর বছর শিক্ষার আলো বঞ্চিত হচ্ছে। প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। যে স্কুলে যাওয়া এই ক্ষুদে শিশুদের জন্য কষ্টসাধ্য। সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে আগ্রহ ছিল না অভিভাবকদের। সেই সময় আমরা মনস্থির করলাম, এই অবহেলিত শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হবে।
তাই আমরা ওই এলাকার সব পরিবার থেকে শিশুদের খুঁজে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে পাঠদান শুরু করলাম। প্রথমে অল্প সংখ্যক শিশু থাকলেও পরে ক্রমান্বয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী রয়েছে। এরপর আমরা ওই এলাকায় বসবাসরত সব পরিবারের লোকজনের সাথে আলোচনা করি। শিক্ষার ব্যাপারে তাদের উদ্বুদ্ধ করি। এভাবে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের স্বপ্ন অনেক দূরে। আমরা অবহেলিত শিশুদের অনেক দূরে পৌঁছে দিতে চাই, যেখানে তারা একদিন সমাজের নেতৃত্বে দেবে।
সোনালি স্বপ্ন সংগঠনের উদ্যোক্তা মমিনুল হোসাইন টিপু, সব সদস্যসহ এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন নিজামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রভাষক স্বাগতম বড়ুয়া, আবু মোহাম্মদ কায়সার, নাজনিন কামাল, সাংবাদিক নুরুল আলম, লেখক ও সমাজকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসায়ী এবং সমাজকর্মী কাজী সেলিম, সংগঠক আবু তাহের শিবলু, রংধনু ফাউন্ডেশনের ৩০ জন সদস্যহ আরো অনেকে। সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শাহীদুল ইসলাম চৌধুরীর আগমন অনুষ্ঠানকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। এভাবেই একদিন বদলে যাবে দেশ, শিক্ষার আলো সবার ঘর আলোকিত করবে।

হিটলারের তা হলে একটিই ছিল!

নিছক রটনা কিংবা ব্যঙ্গ-গানের কলি নয়, নাৎসি-নেতা অ্যাডলফ হিটলারের একটাই অণ্ডকোষ ছিল বলে ফের দাবি করলেন এক জার্মান ইতিহাসবিদ। প্রায় একশো বছরের পুরনো একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট ঘেঁটেই এই তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কী সেই রিপোর্ট? ইতিহাস বলছে, ১৯২৩ সালে প্রথম বার ক্ষমতা দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হলে হিটলারকে মিউনিখের ল্যান্ডসবার্গ জেলে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা করেন চিকিৎসক জোসেফ স্টেইনার ব্রিন। পরে মেডিক্যাল রিপোর্টে তিনি লেখেন, ‘‘অ্যাডলফ এমনিতে নীরোগ ও শক্তিশালী হলেও তাঁর ডান দিকের অণ্ডকোষটি অদৃশ্য বা ক্ষতিগ্রস্ত।’’
রিপোর্টটি সম্প্রতি খতিয়ে দেখেন নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার ফ্লিক্সম্যানের। তাঁর দাবি, প্রায় শতাব্দী প্রাচীন হলেও জেলখানার এই রিপোর্ট একশো ভাগ নির্ভুল। কিন্তু এত দিন এর হদিস মেলেনি কেন? ইতিহাসবিদদের একাংশের বক্তব্য, ২০১০-এ নিলামে ওঠার আগে পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই মেডিক্যাল রিপোর্টের অস্তিত্বই জানা ছিল না।
তবে হিটলারের যৌনাঙ্গ যে স্বাভাবিক নয়, বরং অপরিপূর্ণ— এই রটনা দীর্ঘদিনের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পার করে তিনি তখন প্রবল পরাক্রমী জার্মান চ্যান্সেলর। এক দেশে জন্মে অন্য দেশের মাথায়। ছড়ি ঘোরাচ্ছেন বিশ্বের একটা বড় অংশ জুড়ে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায় ফের কাঁপতে শুরু করেছে সারা দুনিয়া। বস্তুত তখন থেকেই ‘একনায়কের’ নামে এই রটনা চাউর হতে থাকে গানে-গানে আর খুচরো ছড়ায়। এই রটনার পিছনের ইতিহাসবিদদের একাংশ দায়ী করছে ব্রিটেন শিবিরকেই। কিন্তু সেই ‘তথ্য’ যে অমূলক নয়, সম্প্রতি হাতে পাওয়া মেডিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে এমনটাই দাবি করছেন জার্মান ইতিহাসবিদ। তবু ধোঁয়াশা কাটছে না। গোল পাকাচ্ছে ১৯৪৩-এর আরও একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট। হিটলার তখনও জীবিত। জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন মার্কিন তদন্তকারীদের কাছে সেই রিপোর্ট পেশ করেন হিটলারের ছেলেবেলার এক চিকিৎসক। হিটলারের যৌনাঙ্গ ‘সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং অক্ষত’ বলেই দাবি করা হয় সেই রিপোর্টে।
তবে কি হিটলারের এই অঙ্গহানি জন্মগত নয়? চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, জন্মের অনেক পরেও অণ্ডকোষ বাদ যেতে পারে। তাই ১৯২৩-এর সেই মেডিক্যাল রিপোর্ট অভ্রান্ত মনে করছেন অনেকেই। পাশাপাশি, সামনে উঠে আসছে আরও একটি তথ্য। যাকে রটনা বলে মানতে নারাজ পোল্যান্ডের এক যাজক ও ইতিহাসবিদ। তাঁর কথায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে বিস্ফোরণের আঘাতেই হিটলারের এই অঙ্গহানি হয়। যে সেনা-চিকিৎসক জখম হিটলারের চিকিৎসা করেন, তিনি নিজেই সেই ইতিহাসবিদকে নাকি এই তথ্য দিয়েছেন।
তাই ইতিহাস থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক নথি ঘিরে ফের ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। হিটলার কেন সন্তানহীন, এত দিনে সেই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া গেল বলে দাবি ইতিহাসবিদদের একাংশের। বান্ধবী ইভা ব্রাউনের সঙ্গে যৌন মিলনের সময় তিনি যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ নিতেন বলে ‘রটনা’। এ বার তাকেও ‘ঘটনা’ বলতে চাইছেন অনেকে।
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

রাশিয়ার আরও সামরিক সক্ষমতা আছে: পুতিন

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি
সিরিয়া-অভিযানে রাশিয়া তার সামরিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম শক্তি ব্যবহার করছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ কথা বলেছেন।
আজ রোববার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সিরিয়া-সংক্রান্ত শান্তি-পরিকল্পনা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অকুণ্ঠ সমর্থন পাওয়ার এক দিন পর এমন কথা বললেন পুতিন। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সব সদস্য দেশ এ বিষয়ে সমর্থন দেয়।
সিরিয়া-অভিযানে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘আমাদের অন্য জিনিসও (সামরিক) আছে। প্রয়োজন হলে তা ব্যবহার করব।’
সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধ পাঁচ বছরে পা রাখছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত আড়াই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ।
এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতৃত্বে ১৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল সিরিয়া সাপোর্ট গ্রুপ (আইএসএসজি) জেনেভা ও ভিয়েনা বৈঠকে গৃহীত পরিকল্পনা নিয়ে গত শুক্রবার নিউইয়র্কে আবার বৈঠক করে। সেখানে সিরিয়ার সরকার এবং বিরোধীদের যত দ্রুত সম্ভব—পারলে জানুয়ারি মাসের মধ্যেই এক টেবিলে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই দিনই আরও পরে নিরাপত্তা পরিষদ এই পরিকল্পনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়।
পরিকল্পনামতো যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সিরিয়ার দুই পক্ষকে আলোচনায় আনা সম্ভব হলে দেশটিতে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলোর একমাত্র লক্ষ্যবস্তু হবে ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠন আইএস সিরিয়া এবং তার প্রতিবেশী ইরাকের একটি বড় অংশ দখল করে আছে।
আলোচনার প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদের সবার সমর্থন লাভের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁরা আশা করছেন, আগামী জানুয়ারিতেই দুই পক্ষকে এক টেবিলে বসানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হবে।

বাকশালকেও ছাড়িয়ে গেছে বর্তমান পরিস্থিতি : ড. মঈন খান

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শ্বাসরুদ্ধকর আখ্যা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, দেশে আজ কথা বলা ও লেখার স্বাধীনতা নেই। সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধেও কেউ কথা বলতে পারছে না। পুরো দেশ যেন আজ কারাগারে পরিণত হয়েছে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অর্জিত গণতন্ত্রকে বিদায় দিয়ে নতুন মোড়কে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ১৯৭২-৭৫ সালের বাকশালকেও ছাড়িয়ে গেছে বর্তমান পরিস্থিতি। রোববার বিকেলে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মঈন খান এসব বলেন।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রোববার বিকেলে আলোচনা সভার আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে এই সভা হয়।
সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র নেতা ড: আব্দুল মঈন খান বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একাত্তর সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও আমরা সেই চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। কণ্ঠের ভাষা, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নতি কেড়ে নেয়া হয়েছে। এখন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে।
তিনি বলেন, দেশের এই ক্রান্তিকালে ঠিকমতো বিজয় দিবস উদযাপন করা যায় না। কারণ বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজ মৃত, মানবাধিকার লুপ্ত, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার নেই। বর্তমান সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই।
ড. মঈন খান বলেন, জনপ্রতিনিধিত্বহীন বর্তমান সরকারের অধীনে মেগা প্রকল্প চলছে আর দুর্নীতির প্রসার হচ্ছে। লাভবান হচ্ছে গুটি কয়েক লোক। আমরা কি এজন্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? প্রশ্ন করেন তিনি।
দেশের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে এবং মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আগামী দিনের আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান মঈন খান।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি মুনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন- বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের দফতর সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রফিক হাওলাদার, সাহাবুদ্দিন ফারুক, উজ্জল প্রমুখ। সভাস্থলে ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিট ও থানা শাখার নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা ইয়াসিন আলী, ওয়াসেক বিল্লাহ-সহ গ্রেফতারকৃত অন্যান্য নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয় সভায়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশে একদলীয় এবং ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থা চলছে। বর্তমান অবৈধ প্রধানমন্ত্রী কথায় কথায় যখন-তখন হুমকি দিচ্ছেন। তিনি সবার গলায় আজ রশি দিয়ে রেখেছেন। দেশে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পৌর নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন রিটার্নিং অফিসাররা। তাহলে কিভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে?

এরদোগানের সাথে হামাস প্রধানের সাক্ষাৎ

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ফিলিস্তিনের গাজার শাসক দল হামাসের প্রধান খালেদ মিশাল। স্থানীয় সময় শনিবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসরায়েল ও তুরস্ক জানায়, পাঁচ বছর ধরে চলা বিরোধ মেটানোর কাছাকাছি পর্যায়ে আছে তারা। এর একদিন পরই এরদোগানের সঙ্গে দেখা করলেন মিশাল।
তুর্কি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে এরদোগানকে মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে অবহিত করেন মিশাল। তবে ঠিক কী নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো যায়নি।
গাজার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তুরস্কের পরোক্ষ ভূমিকা আছে। উপত্যকায় ক্ষমতাসীন হামাসের কিছু নেতা তুরস্কে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন সময়ে গাজা থেকে অবরোধ তুলে নিতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানায় তুরস্ক।
২০১০ সালে তুরস্কের কয়েকজন মানবাধিকারকর্মী কিছু পণ্য নিয়ে মভি মারমারা নামে একটি জাহাজে করে গাজার দিকে যাচ্ছিলেন। পথে ইসরাইলি কমান্ডোদের গুলিতে ১০ মানবাধিকারকর্মী নিহত হন। এর পর থেকেই তুরস্ক-ইসরাইল সম্পর্কের অবনতি হয়।

ছক্কার রাজা আফ্রিদিই

আফ্রিদি, ঝড় তোলাতেই আনন্দ। ফাইল ছবি
ক্রিকেটে গত কদিনে ‘ছক্কা’র রেকর্ড নিয়ে বেশ নাড়াচাড়া হলো। টেস্টে ছক্কার সেঞ্চুরি করলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। ইতিহাসে যে কীর্তি এত দিন ছিল কেবল অ্যাডাম গিলক্রিস্টের। গতকাল টি-টোয়েন্টিতে ‘৬০০’ ছক্কা পূর্ণ করলেন ক্রিস গেইল, সেই হিসাবে অবশ্য ঘরোয়া ম্যাচগুলোও আছে। কিন্তু ছক্কার একটি জায়গায় গেইলকে দুই আর ম্যাককালামকে তিনে ঠেলে দিচ্ছেন শহীদ আ​ফ্রিদি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ছক্কা তাঁরই।
টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ৪৯৮ ইনিংসে ব্যাট করে ৪৬৫টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন আফ্রিদি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চার শর বেশি ছক্কা আর আছে কেবল গেইলের। ৪৮৯ ইনিংসে গেইল মেরেছেন ৪২৩টি ছক্কা। গেইলের চেয়ে আফ্রিদি ৪২টি ছক্কা বেশি মেরেছেন, কিন্তু ব্যাট করেছেন মাত্র নয় ইনিংস বেশি। ৪৬৫ ইনিংসে ম্যাককালামের ছক্কা ৩৮১টি।
৩৫২টি ছক্কা নিয়ে চারে আছেন সনাৎ​ জয়াসুরিয়া। তিনি অবশ্য খেলেছেন ৬৫১টি ইনিংস। ‘মাতারা হারিকেন’ অবশ্য বলতে পারে, ‘ছক্কার খেলা টি-টোয়েন্টি তো পেলামই ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে। সেটিও খুব একটা খেলার সুযোগ পেলাম কই।’ ৪২৭ ইনিংসে ২৯১টি ছক্কা মহেন্দ্র সিং ধোনির। এ সময়ের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স ৪১৬ ইনিংসে ছক্কা মেরেছেন ২৬৭টি। মাত্র কদিন আগে তিনি ছক্কা সংখ্যায় পেছনে ফেলেছেন শচীন টেন্ডুলকারকে (২৬৪টি)।
এই ফাঁকে বলে নেওয়া যায়, বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ছক্কার মালিক তামিম ইকবাল। আর একটি ছক্কা হলেই তামিমের ছক্কার সেঞ্চুরি হয়ে যাবে। ৯২টি ছক্কা নিয়ে দুই আছেন মুশফিকুর রহিম। মজার ব্যাপার হলো, তিনে যাঁর নাম প্রত্যাশা করছেন সেই সাকিব আল হাসান (৭০) কিন্তু আছেন চারে। তিনে তাহলে কে? ৮৯টি ছক্কা নিয়ে সেখানে মাশরাফি বিন মুর্তজা!
আলাদা আলাদা ফরম্যাট ধরলে টেস্টে সর্বোচ্চ ১০০ ছক্কার দুই মালিকের নাম তো আগেই জেনেছেন। ওয়ানডেতেও ছক্কা হাঁকানোর রাজা কিন্তু আফ্রিদি। ৩৫১টি ছক্কা আছে তাঁর। আর কারও তিন শ ছক্কাই নেই। তবে টি-টোয়েন্টিতে ছক্কার রাজা ম্যাককালাম (৯১টি)। ৬২টি ছক্কা নিয়ে আফ্রিদি আছেন এই তালিকার ছয়ে।

বাংলাদেশ-আফগানিস্তানে শক্তি বাড়াতে চায় আইএস : ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ভারতের প্রতিবেশি বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে শক্তি বৃদ্ধি করতে চায় মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। গুজরাটে ভারত পুলিশ বিভাগের মহাপরিচালক ও আইজিদের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। এ খবর দিয়েছে ভারতের বার্তাসংস্থা এএনআই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন ফোরামের মাধ্যমে তরুণদের চরমপন্থায় আকৃষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাজনাথ সিং।
গুজরাটের ভুজের কাছে র‌্যান অব কুচ-এ অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে রাজনাথ বলেন, ভারতেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে আরও ভালো সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি এ সময় বলেন, ভারতের প্রতিবেশি বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে আইএস। ভারতের পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওই সম্মেলন উদ্বোধন করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
নিজের বক্তব্য রাজনাথ আরও বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরে পূর্বের বছরগুলোর চেয়ে এ বছর নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেক ভালো ছিল। সেখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশংসাযোগ্য কাজ করে দেখিয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
তিনি আরও বলেন, বামপন্থী চরমপন্থায় আক্রান্ত রাজ্যগুলোর পরিস্থিতিও দ্রুত ভালোর দিকে যাচ্ছে। তবে এ অবস্থা মোকাবেলায় বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত আগ্রহে এ বছর নাগা সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে।

যখন সরকারের জনসমর্থন থাকে না তখন দেশে অন্তর্ঘাতমূলক হামলা বাড়ে

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদের বলেছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব। কিছু লোক সত্যিকার অর্থে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে আবার কিছু লোক জোর করে স্থিতিশীল করতে চাচ্ছে। এর কোনটাই ঠিক নয়। এ কারণে মসজিদে হামলার ঘটনাসহ দেশে সন্ত্রাসী কর্মকা- বাড়ছে। যখন সরকারের ওপর জনসমর্থন থাকে না তখন দেশে অন্তর্ঘাতমূলক হামলা বাড়ে। সরকার শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগ করে দেশকে স্থিতিশীল রাখতে পারবে না। মানবজমিনকে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সৌদি সামরিক জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের মধ্যে কোন আলোচনা ছাড়াই হুট করে সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। সৌদি আরব বলছে এটি আইএসবিরোধী জোট। কিন্তু তাদের আইএসবিরোধী কর্মকা- কি হবে তাতো সঠিক বুঝা যাচ্ছে না। তারা কি বাংলাদেশ থেকে সৈন্য নিয়ে যাবে কিনা যুদ্ধ করার জন্য সেটাও একটা প্রশ্ন। বাংলাদেশ শান্তি রক্ষায় সৈন্য পাঠালেও কখনও কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সৈন্য পাঠায় না। যদি সৌদি আরব চায় আইএসবিরোধী হামলায় বাংলাদেশের সৈন্যদের অংশগ্রহণ। তখন বাংলাদেশ তার কমিটমেন্ট কতটা রক্ষা করতে পারবে। এ ধরনের জোটে যাওয়ার আগে সরকারকে বুঝে শুনে জাতীয় সংলাপের ভিত্তিতে যাওয়া উচিত ছিল। যদিও বাংলাদেশে জাতীয় সংলাপের চর্চা উঠে গেছে। অতীতে বাংলাদেশ কখনও কোন সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। এ কারণে জোটের বিষয়ে জাতীয় সচেতনতার প্রয়োজন ছিল। এ জোটে যোগ দেয়ার জন্য অনেক মূল্য দিতে হতে পারে। আইএসের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠালে  তারা  যে আমাদের দেশে কোন ক্ষতি করবে কি, করবে নাÑ এ বিষয়গুলো বুঝতে হবে। এ জোটে যোগ দেয়ার ফলে কে আমাদের বন্ধু হবে আর কে আমাদের শত্রু হবে বলা মুশকিল। যারা আইএসবিরোধী কার্যক্রম চালাচ্ছে আইএসও সেসব দেশের ক্ষতি করছে। আমরা শান্তিতে আছি অশান্তিতে হাত ঢোকানো আমাদের জন্য কতটুকু লাভজনক হবে তা বলা মুশকিল বলে মন্তব্য করেন জি এম কাদের।