Friday, November 13, 2015

টিপুকে ঘিরে কর্ণাটক উত্তাল

অষ্টাদশ শতকের শাসক টিপু সুলতানের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে অশান্তি শুরু হয়েছে। কংগ্রেসশাসিত এ রাজ্যে ইতিমধ্যেই দুজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যের বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও চিত্রাভিনেতা এবং জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত গিরিশ কারনাডকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন বিজেপির সাংসদ প্রতাপ সিমহাও। এই বিতর্কের মাঝেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আজ শুক্রবার কর্ণাটক বন্ধের ডাক দিয়েছে।
কর্ণাটকের মহিশুর রাজ্যের শাসক ছিলেন টিপু সুলতান। ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর তাঁর জন্ম। টিপু কেমন শাসক ছিলেন তা নিয়ে বিরোধ আছে। কেউ কেউ মনে করেন, টিপু ছিলেন উদার, পরধর্মসহিষ্ণু এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তিনি মাটি কামড়ে লড়াই করেছেন। তিনিই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী। কারও মতে, তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী শাসক। জোর করে তাঁকে ধর্মনিরপেক্ষ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। সেই টিপু সুলতানের জন্ম উদ্যাপন শুরু হয়েছে ১০ নভেম্বর থেকে। জন্মের ২৬৫ বছর পরে হঠাৎ কেন রাজ্যের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া টিপু সুলতানের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন, তাও আবার জন্মের ১০ দিন আগে, বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সেই প্রশ্ন তুলে অনুষ্ঠানের বিরোধিতা শুরু করেছেন। ইতিহাস অনুযায়ী, ১০ নভেম্বর তিনি কর্ণাটকের ৭০০ বাসিন্দাকে ফাঁসিতে লটকেছিলেন। অশান্তি এ নিয়েই।
এই বিতর্কের মাঝেই গিরিশ কারনাডের এক মন্তব্য আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। সরকারি অনুষ্ঠানে গত বুধবার বিশিষ্ট এই নাট্যকার প্রস্তাব দেন, রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরের নাম শহরের প্রতিষ্ঠাতা কেম্পেগৌড়ার বদলে টিপু সুলতানের নামে রাখা হোক। এই মন্তব্যের পরেই টুইটারে তাঁকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয়, যুক্তিবাদী লেখক এম এম কালবুর্গির মতো তাঁকেও মরতে হবে। পরে টুইটারের পোস্টটি তুলে নেওয়া হয়।
প্রায় একই সময়ে হত্যার হুমকি পান রাজ্যের বিজেপি সাংসদ প্রতাপ সিমহা। রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, টিপু সুলতানের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের মাধ্যমে কংগ্রেস রাজ্যে হিংসা ছড়াতে চাইছে। স্থানীয় থানায় গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি অভিযোগ করেন, ফেসবুকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
বিতর্ককে ঘিরে হত্যার হুমকি ও রাজ্যে বন্ধের ডাককে ঘিরে কর্ণাটক উত্তাল। গিরিশ তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তিনি কাউকে আঘাত দিতে চাননি। তবে সেই সঙ্গে তিনি টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভিকে এ কথাও বলেছেন, টিপু সুলতান ইস্যু নন, দেশের রাজনীতি কোন খাতে বইছে, এটা তারই উদাহরণ। গোলমাল বা গুন্ডাগিরি রাস্তার লোকজন করে না, করেন রাজনৈতিক নেতারা। যাঁরা ভাবেন তাঁদের জ্ঞানগম্যি অন্যদের চেয়ে বেশি। হুমকির পর গিরিশের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে বেরিয়ে by মাসউদ আহমাদ

ছুটির দিনের এক বিকেলে নিউমার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনে রিকশা থেকে নামে রূপা। জুলাই মাসের তীব্র গরমের ভেতরেও অন্তর্গত চোখে সে টের পায়, কেউ একজন তার ওপর নজর রাখছে। কিছুক্ষণ দাঁড়ায় ভাড়া মিটিয়ে, মুঠোফোনে সময় দেখে; এরপর তেরছা-চোখে ডানে-বাঁয়ে তাকায় সে। কিন্তু সন্দেহ করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
মানুষের মাথার পেছন দিকে, বিশেষ করে মেয়েদের, একটা লুকানো চোখ থাকে। সেই চোখ দৃষ্টিময় হয় খুব বিরল কিছু মুহূর্তে, যখন শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো সূক্ষ্ম হতে হতে প্রায় দুর্বল বা দেহবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, কেবল তখনই সাড়া দেয় সেই অদৃশ্য চোখ। কিন্তু লোকটা কে হতে পারে? পুলিশ? গোয়েন্দা? নাকি পকেটমার? তবে লোকটা খুব চালাক। মানুষ ও দালানের আড়ালে টুক করে সরে পড়েছে, রূপার দেখে ফেলার আগেই।
সিনেমা হলের সামনে দিয়ে প্রায় স্রোতের মতো মানুষ যাওয়া-আসা করছে। ঢাকা শহরে এখন ছুটির দিন আর অফিস ডে বলে কোনো ব্যাপার নেই। গ্রামের মতো প্রতিদিনই হাট বসে এখানে। রিকশার টুংটাং, জ্যাম ঠেলে বাস, মিনিবাস এগোচ্ছে, ফুটপাতে মনিহারির দোকান, পেয়ারা বা ঝালমুড়ির ভাসমান দোকানে মানুষের ভিড়, কোলাহল—এসবের মধ্য দিয়েই রূপা বুঝতে পারে, একজন মানুষ তীক্ষ্ণ নজর রাখছে তার ওপর। সে ভয় পেয়ে যায় বা বিচলিত হয়, এমন নয়; কিন্তু অনুভব করে পিঠ বেয়ে নামছে একটা শিরশিরে অস্বস্তি। অনুমাননির্ভর বাস্তবতা ঠেলে নীলক্ষেতের দিকে এগিয়ে যায় রূপা।
সিনেমা হল পেরিয়ে ওভারব্রিজ। এরপর বাঁয়ে যে গলি, সেদিকে ঢুকে পড়ে সে। এদিকে খুব একটা আসা হয় না তার। কিংবা বান্ধবীর সঙ্গে দু–একবার এসেও থাকতে পারে, সেটা বেশ আগে।
মাঝে ফুটপাতের চেয়েও চওড়া রাস্তা, দুপাশে বইয়ের দোকান। ভিড় কম দেখে সে একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং কাঙ্ক্ষিত ঠিকানাটি জিজ্ঞেস করে। লোকটি হাত উঁচিয়ে ইঙ্গিত করে একটা সরু গলির দিকে।
সেই সরু গলিতে ঢুকে পড়ে দিশেহারা বোধ করে রূপা। সব দোকানের নামও তো লেখা নেই। সে কাউকে জিজ্ঞেস করবে কী—‘আপা, কী বই লাগবে? এদিকে আসেন, এই যে আপা’—বলে দোকানিরা মাথা গরম করে দিচ্ছে।
‘এই যে শুনুন, মোস্তফা ভাইয়ের দোকানটা কোনদিকে?’ রূপা একজনকে জিজ্ঞেস করে।
একসময় খুব সন্তর্পণে সে মোস্তফা ভাইয়ের পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়।
লোকটাকে দেখে রূপা প্রথমে খুব ভ্যাবাচেকা খায়—লুঙ্গি পরা, দীর্ঘদেহী, কয়েক দিনের বাসি দাড়ি মুখে। তার কাছেই এসেছে, কিংবা কাজের কথা গোপন করে সে দোকানে এলোমেলো করে রাখা নানা রকমের বই দেখতে থাকে। নিজেকে তৈরি করে নেয়।
‘আঙ্কেল, আপনার নাম কি মোস্তফা?’
‘জি। আমি মোস্তফা।’
‘আপনার একটা ছেলে আছে না, সুজন?’
‘হুম। সুজন আমার ছেলে। ক্যান, হেয় কী করছে?’
‘না, কিছু না। ওর সঙ্গে একটু দরকার ছিল।’
‘কিছুক্ষণ খাড়ান। সে আইসা পড়ব।’
কেউ একজন বইয়ের দাম জিজ্ঞেস করে। মোস্তফা সেদিকে মনোযোগ দেয়।
‘এক্সকিউজ মি, আপনি কি রূপা?’
রূপা প্রায় চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকায়। ভদ্র ও শান্ত গোছের এক যুবক। সে একদমই চিনতে পারে না।
‘আপনি?’
‘আমি আসাদ। আপনি যখন রিকশা থেকে নামলেন, আপনাকে দেখেই আমি চিনেছি।’
এবার চোখ সরু করে তাকায় রূপা, ‘আশ্চর্য তো, আমাকে চিনলেন কী করে?’
‘আপনি তো হিমু ভায়ের বান্ধবী। সে আমাদের বাসার পাশের মেসে থাকে।’
ও মাই গড! আমি হিমুর সন্ধানেই যে এখানে এসেছি, এটা এই লোক জানল কীভাবে? প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, হিমুর কোনো খোঁজ নেই। অনেক কষ্টে এই ঠিকানা জোগাড় করেছি। বান্ধবী লীনা বলেছিল, সুজন নামে হিমুর এক বন্ধু আছে এখানে। লীনা একদিন এ এলাকায় দেখেছে তাকে। লীনা বলেছিল, সুজন বোধ হয় হিমুর সন্ধান দিতে পারবে। কিন্তু এ লোকটি কে?
আসাদকে দেখে সালাম দেয় মোস্তফা ভাই। ব্যস্ততার মধ্যেও বেশ গুরুত্ব দিয়ে কথা বলে। এসব লক্ষ করে রূপা। ভদ্রলোক যে তার বহু চেনা বা পাঁড় ক্রেতা, বুঝতে অসুবিধা হয় না মোটেও, বরং তাতে কিছুটা স্বস্তিই বোধ করে সে।
কিছুটা সহজ হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকায় রূপা, ‘আচ্ছা, আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে?’
আসাদ লজ্জিতভাবে হাসে, ‘সত্যি বলতে, আপনাকে যতটা চিনি, জানি তার চেয়ে ঢের বেশি।’
ভ্রু কুঁচকে তাকায় রূপা, ‘কী রকম?’
‘এই ধরুন, হিমু ভায়ের কাছে এমন গল্প তো অনেক শুনেছি যে আপনি বাসায় কোনো কাজে ব্যস্ত, কিংবা ফ্রি বসে আছেন। হঠাৎ হিমু ভাই ফোন করে জানাল, কিছুক্ষণ পর তিনি আপনার বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাবেন। আপনাকে ছাদে যেতে অনুরোধ করল। আর আপনি খুব সুন্দর করে সেজে ছাদে গিয়ে রাস্তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলেন। বেলা গড়ায়। কিন্তু হিমু ভাইয়ের দেখা নেই। একসময় মন খারাপ করে ছাদ থেকে নেমে আসলেন আপনি।’
রূপা এবার সব রকম দ্বিধা কাটিয়ে বলে, ‘চলুন, কোথাও বসে কথা বলি।’
ফুটপাতে এত মানুষ আর ঠেলাঠেলি। তারা ওভারব্রিজ পেরিয়ে নিউমার্কেটে চলে আসে। বসে একটা ফাস্টফুডের দোতলায়। দোকানের ভেতরটা নিরিবিলি। শীতল।
‘আমি নরমাল ফুচকা খাব। আপনি?’—রূপা বলে।
‘আমিও ফুচকা। তবে আমারটা দই ফুচকা।’
ফুচকা দিতে কিছুটা সময় নেয় দোকানি। ইত্যবসরে কথা বলে ওঠে রূপা, ‘জানেন, কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে মনে হয়। হাতে মুঠোফোন আছে, কিন্তু নেটওয়ার্কের অভাবে সংযোগ বন্ধ হয়ে গেলে যেমনটা হয়—দেয়ালের ওপাশের সবকিছু অন্ধকার ও অচেনা ঠেকে, ঠিক তেমন। হুকমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর হিমুর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে আমার।’
‘আচ্ছা।’
ফুচকা খেতে খেতে রূপাকে কেমন বিমর্ষ ও বিষণ্ন দেখায়, মনের অর্গল খুলে এমন কথাও বলে ফেলে যা আসলে বলতেই চায়নি।
আসাদ কোনো কথা বলে না। নরম চোখে, নীরবে রূপার কথা শুনে যায়।
ভিজে আসে রূপার গলা, ‘একসময় ডায়েরি লিখতাম। হিমুর চরিত্র খারাপ না। আমি সয়ে নিয়েছি, মেনে নিয়েছি তার সব রকম নির্লিপ্ত স্বভাব এবং পাগলামিগুলো। কিন্তু সমস্যা হলো, ইচ্ছে হলেই তাকে যেকোনো কথা বলতে পারতাম না। হঠাৎ হঠাৎ সে ডুব দিত, আবার টুক করে হাজির। যখন তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হতো, কোনো কথা বলতে মন চাইত, পেতাম না; তখন ডায়েরিতে কথাগুলো লিখে রাখতাম। রং দিয়ে শিল্পী যেমন ছবি আঁকে, বর্ণিল অর্থময় আল্পনায় ভরিয়ে তোলে ক্যানভাস, আমিও কল্পনা ও স্বপ্ন মিশিয়ে ডায়েরির পাতা ভরিয়ে ফেলতাম। কিন্তু এখন আর ডায়েরি লেখা হয় না।’
‘কেন?’
‘মা মারা যাওয়ার পর, আমাদের বাসায় বিষণ্ন ভুতুড়ে একটা হাওয়া ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিদিন। বাসায় অনেক লোকজন। কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে তেমন কথা বলে না। বাবা আমাকে খুব ভালোবাসেন, কিন্তু তিনিও সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে বসে থাকেন খবরের কাগজ নিয়ে।’
একটা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে আসাদ।
রূপা বলে, ‘ডায়েরি কিন্তু গোপন বাক্সের মতো। যদিও অনেক দিন পর ডায়েরি খুলে ধরলে অক্ষরগুলো কেমন বিষণ্ন দেখায়; কিন্তু ওয়ার্ডরোব থেকে যখন ওটা বের করি, পরিচিত কত মুখ ও দৃশ্য যে ভেসে ওঠে! বিশেষ করে হিমুর সরল সুন্দর চোখ। হলুদ পাঞ্জাবি। পান খাওয়া রক্তিম মুখ। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তগুচ্ছ। বিশেষ কোনো কথা বা পরিকল্পনা। যে সময় একা থাকি, ডায়েরির পাতার পর পাতা উল্টাতে থাকি; মনটা আদ্র৴ হয়ে ওঠে, ভিজে আসে চোখ।’
ফুচকা শেষ করে টিস্যু পেপারে হাতে মুছতে মুছতে আসাদ বলে, ‘ডায়েরি কিন্তু অন্তরালে চর্চার বিষয়...’
রূপার ফোন বেজে ওঠে।
কথা শেষ করে দুঃখিত গলায় সরি বলে সে।
‘আজ আপনি রিকশা করে এখানে এলেন। গাড়ি কোথায়?’
‘আমার গাড়ি আছে, কে বলল?’
‘বাহ রে, আপনি তো সব সময় গাড়িতে করেই চলাফেরা করেন। হিমু ভাই বলেছে, আপনি রাস্তায় তাকে দেখে শাঁ করে তার গা ঘেঁষে গাড়ি ব্রেক কষেন এবং অনবরত হর্ন বাজাতে থাকেন। কিন্তু নাম ধরে না ডাকলে সে একবারও পিছু ফেরে না...’
‘আপনাকে দেখে মনে হয় না, আপনি হিমুর চেয়ে বড়। ওকে হিমু ভাই সম্বোধন করছেন যে?’
আসাদ একটু আরক্ত হয়, ‘বয়সে বড় না হোক, হিমু ভায়ের চরিত্রে সমীহ জাগানো কিছু ব্যাপার আছে, সবার মধ্যে থাকে না। এটা মানি তো, তাই।’
‘হুম!’
‘আচ্ছা রূপা, হিমুকে আপনি কতটুকু পছন্দ করেন?’
‘কেন?’
‘একটা পরীক্ষা নেব আপনার?’
‘নিতে পারেন।’—ফুচকা মুখে পুরে নির্লিপ্তভাবে বলে রূপা।
‘আচ্ছা বলুন তো, হিমু যে হলুদ পাঞ্জাবি পরে, পকেটবিহীন; সাধারণ পাঞ্জাবি থেকে এই পাঞ্জাবির আলাদা বিশেষত্ব কী?’
মুখের ভেতর আস্ত ফুচকা নিয়ে চোখ বড় করে তাকায় রূপা।
‘দেখুন, হিমু হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়ায়, সেই পাঞ্জাবির একটা বিশেষত্ব নিশ্চয়ই আছে। একটা সময়ে পাঞ্জাবির রং এবং পৃথিবীর রং একরকম হয়ে যায়। অদ্ভুত স্বপ্নময় হলুদ আলোয় চারদিক ঝলমল করে ওঠে। এই আলোর আরেক নাম “কনে দেখা আলো”। কারণ এই আলোয় অতিসাধারণ চেহারার মেয়েকেও অদ্ভুত রূপবতী মনে হয়। মনে হয় পৃথিবীর সব রূপ নিয়ে সে পৃথিবীতে এসেছে।’
‘মানুষ হিসেবে হিমু তো আবেগপ্রবণ বা প্রভাবিত হওয়ার মতো নয়। এই রূপ কি সে টের পায়?’
‘আপনাকে যে ব্যাখ্যাটা দিলাম, এটা কিন্তু হুকমায়ূন আহমেদের কথা। কিন্তু আমার প্রায়ই জানতে ইচ্ছা করে, যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়, পৃথিবীর রং ও হিমুর হলুদ পাঞ্জাবির রং যখন এক হয়ে যায়, সেই সময় হিমু কী করে? কী ভাবে? তার চেয়েও বড় কথা, হিমুর কাছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের বিশেষত্ব কী? আমি সত্যি জানি না। আপনি জানেন? জানলে বলুন না, প্লিজ!’
‘হঠাৎ হিমুকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন কেন?’
‘আছে একটু পারসোনাল ব্যাপার।’
‘বলুন না, শুনি। যদি আপনাকে হেল্প করতে পারি!’
‘বাসায় খুব ঝামেলা হচ্ছে। মেয়েরা বড় হলে অনেক সমস্যা থাকে। আপনি বুঝবেন না।’
‘কিন্তু আপনার তো হিমুর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, ছিলও না কখনো।’
‘আপনি কীভাবে বুঝলেন?’
অবলীলায় বলে যায় আসাদ, ‘বছর আটেক আগে হিমুর বিয়ে নিয়ে কাণ্ডটা ঘটে বইমেলায়, সেখানে আপনার মতন দেখতে কেউ দূরের কথা, নামেও কোনো মিল নেই—এমন একজন মেয়েকে নিয়ে বর সেজে হিমু কনের পাশে বসেছিল...’
রূপা চশমাটা নাকের ডগায় এনে ওপর দিয়ে তাকায়। জেরা করার ভঙ্গিতে বলে, ‘আপনি আসলে কে বলুন তো!’
‘কেন?’
‘এত খবর কেমন করে জানেন আপনি?’
‘না, ওই আর কি!’
‘“ওই আর কি” জিনিসটা কী?’
সশব্দে হেসে ওঠে আসাদ।
ফুচকা শেষ করে বেয়ারাকে ডাকে রূপা, ‘ভাই, বিলটা নিয়ে আসো। শুনুন, বাসায় আমার বিয়ের কথা চলছে। এত দিন মাস্টার্স শেষ হয়নি বলে থামিয়ে রাখা গেছে। এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। হিমুকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। আপনি ব্যাপারটা বুঝতেই পারছেন না।’
‘হিমু একটা কাল্পনিক চরিত্র। খামাকা আপনি একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।’
রূপা যন্ত্রচালিতের মতো মুঠোফোনে সময় দেখে, ‘হায় খোদা! সাড়ে আটটা বেজে গেছে। চলুন, ওঠা যাক।’
আসাদ বলে, ‘আমার আরেকটু কথা ছিল...’
‘বলুন।’
‘হিমু বলে কেউ নেই, ছিলও না কখনো।’
‘প্রমাণ কী?’
‘হিমুর বয়সের প্রতিটি নাগরিক তরুণ যখন ক্যারিয়ার আর করপোরেট স্বপ্নে বিহ্বল, সে তখন নেহাতই পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়। খয়ের দিয়ে পান খায়। এসব পাগলামি ছাড়া আর কিছু হতে পারে?’
‘আপনার কি মনে হয় আমি পাগল?’
‘তা ঠিক নন, তবে আপনার বিভ্রম ঘটেছে।’
‘কী রকম?’
‘হিমুর মতো ছেলের সঙ্গে কারও প্রেম হওয়া সম্ভব নয়।’
‘কেন?’
‘কারণ হিমু হওয়ার জন্য অনেক শর্ত পালন করতে হয়। একটা শর্ত এ রকম যে হিমুরা কখনোই কোনো তরুণীর সঙ্গে হৃদয়ঘটিত ঝামেলায় জড়াবে না। একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া, ফাস্টফুড খাওয়া ইত্যাদিও নিষেধ।’
‘দেখুন মিস্টার ফ্যাসাদ সাহেব, প্রেম হতে ফাস্টফুডে যেতে হয় না।’—রূপার গলার ঝাঁজ টের পাওয়া যায়।
‘কী বললেন? আমার নাম ফ্যাসাদ নয়, আসাদ। আর হুটমায়ূন আহমেদের ভাষাতেই বলি, হিমুর কাজকর্ম রহস্যময় জগৎ নিয়ে। সে চলে অ্যান্টি-লজিকে। সে বেশির ভাগ সময়ই বাইরে বাইরে ঘোরে। রাত জেগে পথে পথে হাঁটে, কিন্তু সে-ই সবচেয়ে বেশি অন্তর্মুখী। মিসির আলি চোখ বন্ধ করে পৃথিবী দেখেন। আর হিমু চোখ খোলা রাখে কিন্তু কিছুই দেখে না।’
‘আর কিছু?’
‘হুখমায়ূন নিজেই স্বীকার করেছেন, হিমু দেখতে কেমন তিনি জানেন না। কোনো বইয়ে হিমুর চেহারার বর্ণনা নেই। যা আছে তাও খুব সামান্য। সে বর্ণনা থেকে চরিত্রের ছবি আঁকা যায় না। আমার নিজের মনে যে ছবিটি ভাসে তা হাসিখুশি ধরনের এক যুবকের ছবি। যে যুবকের মুখে আছে কিশোরের সারল্য। শুধু চোখদুটি তীক্ষ্ণ। সেই চোখে কৌতুক ঝিকমিক করে। সবকিছুতেই সে মজা পায়।’
রূপা কথা বলে না। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে।
আসাদ বলে, ‘আপনি কি জানেন, হিমু সিরিজের বই লেখার জন্য হুনমায়ূনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আদালত থেকে তাঁকে তলবও করা হয়েছিল?’
‘না তো! কী বলছেন এসব?’
আসাদের ভঙ্গি পণ্ডিতের মতো, নির্বিকার, ‘দরজার ওপাশে নামে হিমু সিরিজের যে বই আছে, সেই বইয়ের একটি বর্ণনা এমন, “...জজ সাহেবরা ঘুষ খান।” বইটি প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।’
রূপার ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে। বলল, ‘আপনার উদ্দেশ্যটা আসলে কী?’
‘উদ্দেশ্য! না, কোনো উদ্দেশ্য তো নেই।’
‘যথেষ্ট অনর্থক বকেছেন। আপনি হিমুকে চেনেন শুনে এতটা সময় কথা বললাম, একসঙ্গে বসে ফুচকা খেলাম। আর আপনি...’
‘আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন, মিস রূপা!’
‘আপনি যে বললেন, হিমুকে চেনেন? সে আপনার বাসার পাশের মেসে থাকে? এসব কি মিথ্যে বলেছেন?’
আসাদ অন্যমনস্ক হয়ে মাথা চুলকাতে থাকে।
রূপার কণ্ঠ প্রায় গর্জে উঠল, ‘কথা বলছেন না কেন?’
‘এই মিথ্যেটুকু না বললে তো আপনি আমাকে পাত্তা দিতেন না! ধরুন, আমি একটা মিথ্যে চরিত্র। তাই ধরা খেয়ে গেলাম। কিন্তু হিমু নানা রকম সমস্যায় পড়ে এবং প্রায় অলৌকিকভাবে মুক্তি পেয়ে যায়। আপনার কী ধারণা, বাস্তবে এমন সম্ভব?’
মিষ্টি করে হেসে ওঠে রূপা, ‘আরে ধুর, হিমু কখনো জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে না। তবে ছোটখাটো ঝামেলায় সে পড়ে। সেসব ঝামেলা তাকে স্পর্শও করে না। সে অনেকটা হাঁসের মতো। ঝাড়া দিল, গা থেকে ঝামেলা পানির মতো ঝরে পড়ল।’
বিল মিটিয়ে রূপা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামে।
রাত নয়টার মতো বাজে। ওভারব্রিজ পেরিয়ে সে আবার মোস্তফা ভায়ের দোকানে আসে। দেখে, দোকানপাট সব বন্ধ। মোস্তফা ভাই নেই।
আসাদকেও আর দেখতে পাওয়া যায় না রূপার পাশে।
গাঢ় ভঙ্গিতে রাত নামতে থাকে।
তখন, হঠাৎই কবিতার মতো দুটো লাইন মাথায় উঁকি দেয় রূপার, ‘আজ দেখো তোমার পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কে/ এর জন্য এতটা পথ হেঁটে এসেছ তুমি।’
রূপা পাশ ফিরে তাকায়, কোথাও কেউ নেই।

তিনি কি রাজবন্দী, নাকি কেবলই অভিযুক্ত! by গোলাম মাওলা রনি

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বয়স ৬৮ বছর পার হতে চলল। জন্মতারিখের হিসাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় সমবয়স্ক। বাংলাদেশের জাতীয় শোকের মাসের এক তারিখে তিনি যখন জন্মেছিলেন, তখন পাক-ভারতে ব্রিটিশরাজের অন্তিম অবস্থা। তার জন্মের কয়েক দিন পরই পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হয়। ফলে তিনি ব্রিটিশদের অন্যায়-অত্যাচার সম্পর্কে শুনেছেন কিন্তু বাস্তবে দেখেননি। তবে পাকিস্তান জমানার রাষ্ট্রশক্তির তাণ্ডব বেশ কাছে থেকেই দেখেছেন এবং ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের পাদপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণঝরা ইতিহাসে তারও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির একজন নেতা হিসেবে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কারামুক্তির আন্দোলনে তার কতটুকু ভূমিকা, তা সমকালীন ব্যক্তিদের অনেকের জানা। সম্প্রতি ঘোষিত এবং জাতীয়ভাবে উদযাপিত শোকের মাসের এক তারিখে মির্জা সাহেবের জন্মসংক্রান্ত দুর্ভোগের আদিঅন্ত নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করব।
এত দিন পর নতুন করে মির্জা সাহেবের জন্মতারিখ মনে পড়ল একটি কারণে। বিএনপিদলীয় হাতেগোনা যে দু-একজন লোককে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভদ্রলোক বলে জানে, তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল সবার আগে। ক্ষমতাসীন দলের হোমরাচোমরা লোকজন তো বটেই- দলের তৃণমূলপর্যায়ের কট্টর বিএনপিবিরোধী লোকজনও তার ব্যাপারে নমনীয়। তার সৌম্যশান্ত মূর্তি, স্পষ্ট এবং শুদ্ধ-সাবলীল উচ্চারণ, প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা এবং দুর্নীতিমুক্ত ভাবমর্র্যাদার কারণে সব মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত ভালো ইমেজের জন্য তিনি বিএনপির ঘোরতর শত্রু মহলেও সম্মানিত ব্যক্তি। এর বাইরে সরকারি দলের লোকজনের যেসব বিএনপি নেতার প্রতি অ্যালার্জি রয়েছে, সেসব নেতা তাদের ইচ্ছামাফিক যে মির্জা সাহেবকে পরিচালিত করতে পারেন না- এর কিছু অকাট্য দলিলও সরকারের হাতে রয়েছে। কাজেই ‘গণিতের সূত্র মতে’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি রোষানলে পড়বেন না- এটাই ছিল কাম্য ও স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত চার-পাঁচ বছরে তিনি এতবার জেলে গিয়েছেন যে, রাজনীতির গণিতের সব সূত্র উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে। এ কারণেই আমার মনে তার জন্মতারিখটির কুলক্ষণ নিয়ে নানা সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে জেলে রয়েছেন। যেদিন তিনি ঢাকার নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন এবং তার জেল-হাজতের আদেশ হলো, সেদিন তিনি বড়ই বিরস বদনে এবং আনত নয়নে ধীরে ধীরে প্রিজনভ্যানের দিকে এগিয়ে গেলেন। ৬৮ বছরের জরাজীর্ণ দেহটি তুলে দিলেন প্রিজনভ্যানের মধ্যে এবং উদাস দৃষ্টিতে চার দিকে তাকালেন। ভক্ত-সমর্থকদের দিকে হাত নাড়লেন বটে, কিন্তু তার বদনে চিন্তার ভাঁজ এবং অপমানবোধের চিহ্নগুলো গোপন করতে পারলেন না। প্রিজনভ্যানের নোংরা প্রকোষ্ঠে বসে তিনি হয়তো ভাবছিলেন তার ছাত্রজীবনের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির কৃতী ছাত্র হিসেবে সম্মানিত গুরুজনদের কাছ থেকে কত নীতিকথাই তাকে শুনতে হয়েছে। পরে ঢাকা কলেজ এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে তিনিও তো ছাত্র-ছাত্রীদের কম নীতিকথা শোনাননি। তার সেসব নীতিকথার সবচেয়ে বড় শ্রোতা হলেন তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী হওয়ার গৌরব থাকা সত্ত্বেও যিনি সারাটি জীবন শুধু শুনেই গেছেন; কোনো দিন আগবাড়িয়ে লোকারণ্যে চলে এসে একবারও বলেননিÑ মির্জা সাহেব, কোথায় আপনার নীতিকথা! রাজধানী ঢাকার কোলাহল পার হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রিজনভ্যানটি এগিয়ে চলল গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের দিকে। সারা দিনের ক্লান্তি, ক্ষুধা, পিপাসা এবং গাড়ির ভেতরকার মবিল পোড়া গন্ধ তাকে অস্থির করে তুলল। শরীরের রোগবালাই, মনের গভীরের অসংখ্য বেদনা এবং না বলা কথামালা তাকে আরো চেপে ধরল অক্টোপাসের মতো। তিনি বেদনায় নীল হয়ে চোখ বুজে প্রিয়তম কোনো মুখাবয়ব মনে করে কিছুটা প্রশান্তি খুঁজতে লাগলেন। প্রিয় কন্যা সামারুহ ও সাফারুহকে যতœ করে তিনি তার বিষণœ দু’টি চোখের পাতায় বসিয়ে দিলেন এবং ভাবতে লাগলেন বড়টি এখন পিএইচডি করছে অস্ট্রেলিয়ায় আর ছোটটি শিক্ষকতা করছে ঢাকায়। দুটো মেয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী ছিল এবং বড়টি তো সেখানকার শিক্ষক হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিল। তার সারা জীবনের নীতি-আদর্শ তিনি আসলে কতটুকু বিশ্বাস করেছেন, তার বাস্তব নমুনা খোঁজার চেষ্টা করলেন ঔরসজাত কন্যা দু’টির মধ্যে। এরপর তিনি কী মনে করে যেন হাসলেন এবং হালকা তন্দ্রার কবলে পড়ে কী সব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলেন!
সম্মানিত পাঠক! মির্জা সাহেব হয়তো সহসাই তন্দ্রামুক্ত হবেন এবং আরো কিছু সময় পরে জেলগেটে গিয়ে পৌঁছবেন। তারপর ঢুকে পড়বেন জেলের অভ্যন্তরে। আমরা সেদিকে না গিয়ে বরং লোকারণ্যে ফিরে আসি এবং বাস্তব কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করে শিরোনামের বিষয়বস্তুর দিকে এগোতে আরম্ভ করি। নিবন্ধের শুরুতে মির্জা আলমগীর সম্পর্কে সামান্য একটু ধারণা দেয়ার চেষ্টা করলাম এ কারণে যে, অপরাধ বিজ্ঞান এবং রাজনীতির চিরায়ত সূত্রগুলো ২০১৫ সালে বঙ্গদেশে কেমন যেন আলুভর্তা হয়ে গেছে। গত ২০০ বছরের ইতিহাসে রাজনীতিবিদ ও অপরাধীকে একই নিক্তিতে পরিমাপ করতে দেখা যায়নি, যেমনটি আমরা দেখে আসছি গত ২৫ বছরের ইতিহাসে। অপরাধ বিজ্ঞানের সূত্র মতে, ভালো মানুষ মন্দ কাজ করেন না, সম্মানিত মানুষ মন্দ চিন্তা করতে পারেন না এবং শ্রদ্ধেয়জনেরা ভুলেও অন্যের অনিষ্ট করেন না। অন্য দিকে, অপরাধী সম্পর্কে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষ্য হলো- এক শ্রেণীর অপরাধী রয়েছে যাদের বলা হয় By born criminal. অর্থাৎ জন্মগতভাবেই অপরাধী। এই শ্রেণীর লোকেরা ভালো চিন্তা করে না, ভালো কাজের কাছ দিয়েও হাঁটে না। এরা কথাবার্তা, আচার-আচরণ, অঙ্গভঙ্গি, পোশাক-আশাক এমনকি খাদ্য গ্রহণ, নিদ্রা এবং প্রাকৃতিক কর্মেও নিজেদের অপরাধপ্রবণতার স্বাক্ষর রেখে যায়।
কিছু মানুষ রয়েছে যাদের বলা হয় By change criminal. এরা জন্মগত অপরাধীদের মতো সারাক্ষণ অপরাধ করে বেড়ায় না বটে, তবে জীবনযাত্রার কোনো এক বাঁকে এরা যদি সামান্যতম সুযোগ পায় তবে অপরাধ না করে শূন্য হাতে ফেরে না। তৃতীয় ধাপের অপরাধীদের বলা হয় Criminal by opportunity. এরা বিশেষ সুযোগ কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই অর্থাৎ কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া অপরাধ করে বসে। চতুর্থ ধাপে রয়েছে Criminal by post & position. এই শ্রেণীর অপরাধীরা তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সমাজব্যবস্থা, নিজেদের অবস্থান, পদ ও পদবির বদৌলতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পঞ্চম ধাপের অপরাধীদের বলা হয় Criminal by accident. অর্থাৎ ঘটনাক্রমে অপরাধী।
রাজনীতি সম্পর্কে বাংলা ব্যাকরণে বলা হয়েছে- এটি ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ অন্যান্য সামাজিকবিজ্ঞানে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদ সম্পর্কে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। আমরা রাজনীতিবিদদের সাধারণ কতগুলো বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাবো। রাজনীতিবিদ হলেন তারাই যাদের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত নেতৃত্বের সহজাত গুণাবলি থাকে। ফলে কোনো মানুষ ইচ্ছে করলেই নেতা হতে পারেন না। নেতার সহজাত গুণাবলির মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- তিনি কেবল নিজের চিন্তা করবেন না। তিনি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সমাজ ও রাষ্ট্রের কথাও চিন্তা করবেন। নেতা কোনো দিন একা থাকতে পারেন না, একা খেতে পারেন না এবং একাকী ভোগ করতে পারেন না। জনগণই হলো নেতার প্রাণভোমরা। নেতা সব সময়ই ব্যতিক্রমী চিন্তা করেন এবং বিপদে-আপদে সাধারণ মানুষের মতো নিরাশ হয়ে পড়েন না। যে কোনো সমাজের কিংবা রাষ্ট্রের জন্য একজন উত্তম নেতা হলেন বিধাতার পক্ষ থেকে ওই সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য অতি উত্তম নিয়ামত এবং একটি শ্রেষ্ঠ উপহার। আর এ কারণেই সব ধর্ম ও মতাদর্শের সম্মানিত নেতাদের আলাদা মর্যাদার আসনে বসিয়ে বিশেষভাবে ইজ্জত করতে বলা হয়েছে।
পৃথিবীতে রাজ্য-রাজা-রাজধানী নিয়ে বিরোধ বহু পুরনো। রাজনীতির জন্য দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত এবং বিজয়ী পক্ষের দ্বারা পরাজিত পক্ষের ধ্বংস সাধনের বহু নজির রয়েছে। কিন্তু কোনো সম্মানিত নেতা কর্তৃক তার প্রতিপক্ষের সম্মানিত নেতাকে অপমান করার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। যুদ্ধের ময়দানে লক্ষ কোটি মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয়ী সম্রাট একবারের জন্যও প্রতিপক্ষের জীবিত সম্রাটকে অপমান করেননি। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে সম্রাট প্রাণ হারালেও তার মৃতদেহের প্রতি রাজসিক সম্মান প্রদর্শন রীতিমতো আইনে পরিণত হয়েছিল। সম্রাট আলেক্সান্ডার কর্তৃক পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারায়ুসের মৃতদেহের প্রতি সম্মান এবং পরাজিত সম্রাটের অন্তিম ইচ্ছাগুলোকে মর্যাদা দেয়ার কাহিনী আজো সোনার হরফে ইতিহাসে লেখা রয়েছে। পাক-ভারতের মহাবীর টিপু সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হলে তার লাশ রাজকীয় মর্যাদায় দাফন করেছিল ইংরেজরা। অন্য দিকে, যে ইয়াজিদকে ভারতবর্ষের মুসলমানেরা এত ঘৃণা করেন, সেই ইয়াজিদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাথে তার সৌজন্য ও মহানুভবতার কাহিনী শুনলে হাল আমলের দাম্ভিকেরা কিছুটা হলেও লজ্জা অনুভব করবেন, যদি তাদের মধ্যে খুব অল্পস্বল্প মনুষ্যত্বও অবশিষ্ট থেকে থাকে।
ব্রিটিশ জমানায় এবং পাকিস্তান আমলে যাদের রাজনৈতিক কারণে কারাগারে বন্দী অথবা গৃহবন্দী করা হতো, তাদের একমাত্র পরিচয় ছিল রাজবন্দী। রাজনীতির অঙ্গনের জাতীয় নেতা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের কিশোর-যুবক ছাত্র-ছাত্রীরাও যদি রাজনৈতিক কারণে বন্দী হতেন, তাদের সবাইকে রাজবন্দী হিসেবে মর্যাদা দেয়া হতো। আইয়ুব খান, মোনায়েম খান, টিক্কা খান কিংবা ইয়াহিয়ার জমানায় গ্রেফতারকৃত রাজবন্দীদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে অস্ত্র মামলা, প্লেট চুরি, গাড়ি পোড়ানো, হত্যা মামলা ইত্যাদিতে ফাঁসানো হয়েছে, এমন একটি নির্ভরযোগ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্য দিকে, বন্দী অবস্থায় রাজবন্দীদের সাথে জেলহাজত, থানা, কোর্ট-কাচারি ইত্যাদি স্থানগুলোতে অমর্যাদাকর আচরণের কোনো খবর আমরা পাইনি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে যে-কেউ সেই জমানার শাসককুলের দৃষ্টিভঙ্গি সহজে অনুমান করতে পারবেন।
পৃথিবীর চারটি প্রধান ধর্মের চারজন নেতার ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা সহজেই বুঝতে পারব, প্রচলিত রাজনীতির চেয়ে ধর্মীয় রাজনীতি আরো অধিক গৌরব ও মর্যাদার ইতিহাস রচনা করেছে প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে। পৃথিবীর প্রাচীন যুগে হিন্দুদের রাজা রাম যুদ্ধ করেছেন রাবণের বিরুদ্ধে এবং বৌদ্ধদের রাজা অশোক যুদ্ধ করেছিলেন কলিঙ্গে। অন্য দিকে খ্রিষ্টানদের রাজা কনস্টানটাইন দ্য গ্রেট তার নিষ্ঠুর প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে রোম দখল করেছিলেন। আর ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা:-এর মক্কা বিজয়ের ইতিহাস বিশ্বমানবতার এক অনন্য দলিল। এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী পক্ষ কর্তৃক শত্রুপক্ষের সাথে ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে সমঝোতার দলিলই চিরদিন রাজনীতির আদর্শ হিসেবে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে মামলা হয়েছে তা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তবে তিনি রাজনীতিবিদ নন- একজন অপরাধী। রক্তের পরতে পরতে অপরাধের বীজ লুক্কায়িত না থাকলে কোনো মানুষ এতগুলো নিষ্ঠুর অপরাধ করতে পারে না। এ ধরনের অপরাধীরা নাবালক বয়স থেকেই অপরাধ শুরু করে এবং কিশোর বয়সে দক্ষ অপরাধীতে পরিণত হয়। কাজেই মির্জা সাহেবের অতীত জীবনের খতিয়ান যদি অপরাধে পরিপূর্ণ না থাকে তবে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অপরাধবিজ্ঞানের সূত্রের মধ্যে পড়বে না।
সরকার বলছে- তাকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এভাবে যদি হুকুমের আসামি করার রেওয়াজ চালু হয়, তবে বাংলাদেশের সব ডিসি, এসপি, আইজি, সচিব, মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কেয়ামত পর্যন্ত জেলে থাকতে হবে। যদি রাজনৈতিক কারণে তাকে একের পর এক ফৌজদারি মামলার জালে আবদ্ধ করা হয়ে থাকে তাহলে দু’টি মহাবিপদ আগামী দিনে এ দেশের অনেককেই গ্রাস করবে। প্রথমত, একজন সম্মানিত ভদ্রলোককে অভদ্র উপায়ে অসম্মানিত করার কারণে প্রকৃতির আইন লঙ্ঘন করার দায়ে একশ্রেণীর মানুষ প্রকৃতির প্রতিশোধের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, মানুষ সবকিছু ভুলতে পারে কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অপমান ভুলতে পারে না। ফলে অপমানিত মির্জা ফখরুলের দীর্ঘশ্বাস, আত্মীয়স্বজনের অনাগত সুদিন এবং তার রাজনৈতিক দলটির ভবিষ্যৎ সাফল্য ক্ষমতাসীনদের জন্য এক ধরনের আজাব হিসেবে আবির্ভূত হবে।

তবু আলোচনায় বসুন by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শালীনতা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব নিয়ে বহু কথা বলা হয়েছে। এ দেশে যাঁরা শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ আছেন, তাঁদের অনেকে তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা বিভিন্ন সময় প্রতিপক্ষ দলের প্রধানদের চরিত্রহীন, খুনি, অশিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ, চোর-বাটপারসহ নানা বিশেষণে অভিহিত করেছেন। এসব গালাগালিতে আমরা এখন আর তাই চমকে উঠি না।
সমস্যা হচ্ছে, যখন এসব বলে কাউকে বর্জন করার চেষ্টা হয় এবং জাতীয় সংকটের কোনো বিষয়ে আলোচনা-সমঝোতার সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করা হয়। আমাদের মনে করার কারণ রয়েছে যে দেশ বর্তমানে এ ধরনের একটি সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে একের পর এক বিদেশি হত্যা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি অভাবিত বিষয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, এসবের সঙ্গে আইএস জড়িত আছে—এই প্রচারণা চালিয়ে সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো আক্রমণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার যড়যন্ত্র রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক মহলের এতে জড়িত থাকার সন্দেহের কথাও বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা বোঝার মতো যথেষ্ট তথ্য আমাদের কাছে না থাকলেও এটি উদ্বেগজনক।
এ ধরনের আশঙ্কা তিনি বা তাঁর দলের নেতারা বাংলাদেশে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের সফর বর্জনের পর থেকেই প্রকাশ করেছেন। এমন এক সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানানো তাই অনেকের কাছেই স্বস্তিকর মনে হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর যে উত্তর দিয়েছেন, তা বর্জনের রাজনীতির পরিচায়ক। তিনি খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, কোনো ‘খুনির’ সঙ্গে তিনি আলোচনায় বসবেন না। এ ধরনের বক্তব্যে তাঁর শক্তিমত্তা ও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ হতে পারে। দলের কট্টরপন্থীদের তা আরও চাঙা করে তুলতে পারে। কিন্তু কোনো স্বাভাবিক চিন্তার মানুষকে তা আশ্বস্ত করতে পারে না। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদকের কথায়ও। তিনি পরদিনই বলেছেন, রাজনীতিতে আলোচনার দুয়ার কখনো বন্ধ থাকতে পারে না। তিনি খালেদা জিয়াকে গঠনমূলক রাজনীতির পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, এটি করা হলে আলোচনা বা সংলাপের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে।
সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ এবং আশাব্যঞ্জক। আমরা যদি জাতীয় সংকটের চরিত্র, সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের ভূমিকা ও অতীত অভিজ্ঞতার নির্মোহ মূল্যায়ন করি, তাহলে বোঝা যাবে সংলাপ না হোক একটি সহনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি আজ কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
২.
আমাদের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও জনগণের বৃহত্তর একটি অংশ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে ছিটকে পড়েছে। অতীতে ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালেও এ ধরনের সংকট হয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনগুলোর পর নির্বাচন বর্জন করা রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত ছিল। বর্জনকারী রাজনৈতিক দলগুলো সমাবেশ, বাক্স্বাধীনতা চর্চা, হরতালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পেরেছিল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ স্বাধীনভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল এবং দেশের বিচার বিভাগ মোটামুটি স্বাধীনভাবে তার কাজ পরিচালনা করতে পেরেছিল।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বিএনপি দূরের কথা, অন্য কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলই তার স্বাভাবিক কর্মসূচি এখন পরিচালনা করতে পারছে না। মাত্র কিছুদিন আগে বাম মোর্চার কর্মীরা পরিবেশবিনাশী রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ পথযাত্রা কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের বেধড়ক হামলার শিকার হয়েছেন। দেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও আগের তুলনায় বেড়েছে। নিম্ন আদালতে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের জামিনের আবেদন বাতিল হচ্ছে, অন্যদিকে বিনা প্ররোচনায় শিশুর পায়ে গুলিবর্ষণকারী আওয়ামী লীগের সাংসদের জামিন মঞ্জুর হয়েছে।
সংসদ এবং সংসদের বাইরে সরকারের এমন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এ দেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পরে বা সামরিক শাসন ছাড়া আর কখনো ছিল না। বিরোধী রাজনীতির চর্চা ও মুক্তভাবে মতামত প্রকাশ করার সুযোগ এভাবে রুদ্ধ থাকলে যড়যন্ত্রের রাজনীতি ডালপালা মেলতে থাকে, জঙ্গি বা উগ্রপন্থার বিকাশ ঘটে, দেশের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের স্বার্থান্বেষী মহলও এর সুযোগ গ্রহণের পরিবেশ পেয়ে যায়। বাংলাদেশে, দক্ষিণ এশিয়ায়, সারা বিশ্ব এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে, আরও ঘটার আশঙ্কা থাকাও তাই স্বাভাবিক হতে পারে।
সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি (সভা, সমাবেশ, ভিন্নমত ও সমালোচনার অধিকার) করার এবং অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ থাকলে দেশের ভেতরে কোনো মহল নাশকতা বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, এমন নজির পৃথিবীতে খুবই বিরল। এমন পরিস্থিতি থাকলে এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ন্যূনতম ঐক্য থাকলে বিদেশি কোনো মহল দেশের ভেতর কোনো যড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, এমন নজিরও নেই বললে চলে। ইয়েমেন বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাই বিদেশি যড়যন্ত্র যতটা সহজ, ভারত বা ইরানের বিরুদ্ধে তা কখনো সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রীর কথামতো যড়যন্ত্রের তথ্য বা আশঙ্কা সত্যি থাকলে তাই এটি নস্যাৎ করার জন্য হলেও দেশে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ‘লিবিয়া বা সিরিয়া’ বানানোর মতো কোনো আশঙ্কা সত্যি থাকলে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বরং আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে স্বাভাবিক রাজনীতি ও সমাজচিন্তা চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে একমত যে বিরোধী দলকে গঠনমূলক রাজনীতি করতে হবে এবং সব সহিংসতা থেকে দূরে থাকতে হবে। কিন্তু আমরা এও যুক্ত করতে চাই যে গঠনমূলক রাজনীতির চর্চা দেশে অবাধে করা যাবে এবং ভবিষ্যতে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিরা দেশ চালানোর সুযোগ পাবেন—এমন আত্মবিশ্বাস বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকারকেই সৃষ্টি করতে হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে ২০১৪ সালেও বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে অনেকগুলো বড় জনসভা করেছে এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অনেকেই মনে করতে পারেন যে ২০১৫ সালে পেট্রলবোমা-নির্ভর বর্বরোচিত আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে অনেকাংশে দলটির সমাবেশ করার অধিকারকে পুলিশ আর দলীয় মাস্তানের মাধ্যমে ধূলিসাৎ করার মধ্য দিয়ে।
পেট্রলবোমার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই বিচার করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু তাই বলে এ জন্য হুকুমের আসামির নামে বিএনপির সব স্তরের নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার এবং জামিন নাকচ করে কারাবন্দী রাখা এবং বিএনপিসহ সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করা কোনো সুষ্ঠু সমাধান হতে পারে না। দেশে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের পথ একেবারে রুদ্ধ—এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে যড়যন্ত্র, হঠকারিতা ও উগ্র রাজনীতি বরং ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
৩.
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ বা সমঝোতা দেশের সংকটকালে কতটা জরুরি, তার বহু নজির আমাদের আশপাশে রয়েছে। বিহারে সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই সমঝোতার জোরে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উগ্র জোয়ার ঠেকিয়ে দেওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর প্রভাবে ভবিষ্যতে আসাম, উত্তর প্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেও ঐক্যের রাজনীতির বিজয় দেখা যাবে। পাকিস্তানে সামরিক শাসন এবং বৈদেশিক প্রভাব এড়াতে পিপিপি ও মুসলিম লিগ একে অপরকে সমর্থন করেছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের খবরদারি বা এর হুমকির জবাবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন বা তার সঙ্গে একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকলে বাংলাদেশের দুই দলকেও তাই গোপন বা প্রকাশ্যে আলোচনা করতে হবে।
তা ছাড়া, ‘খুনি’ বলে মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করারও কোনো যুক্তি নেই। নরেন্দ্র মোদি একসময় গুজরাটের কসাই, আসিফ আলী জারদারি মিস্টার টেন পার্সেন্ট এবং অং সান সু চি বিদেশি গুপ্তচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নানা অভিযোগ উঠেছিল। এঁদের সবাইকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মহলগুলো অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিতে মেনে নিতে বা তাতে ফিরে আসতে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
‘খুনি’ কেউ হয়ে থাকলে তাঁর বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক সুবিধাবাদী চিন্তা থেকে কাউকে বা কোনো দলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার চেষ্টা হলে এবং বিরোধীদের ওপর অবাধে দমন আর নিপীড়ন চললে দেশ বিভাজিত হয়, দেশের জনগণের অন্তর্নিহিত শক্তির ক্ষয় ঘটে এবং দেশের ভবিষ্যৎ যড়যন্ত্রকারীদের কালো জালে বন্দী হয়ে পড়ে।
আমাদের দুই প্রধান দলকে সৎভাবে চিন্তা করতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর বিনাশের চেয়ে দেশ বাঁচানোর চিন্তা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ত্বকী হত্যার বিচার- এক দেশে দুই দৃষ্টান্ত কেন? by রফিউর রাব্বি

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী
৮ নভেম্বর সিলেটের ১৪ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজন ও খুলনার ১২ বছরের শিশু রাকিব হত্যার বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে। দুটি হত্যাকাণ্ডে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত ৮ জুলাই রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আর ৩ আগস্ট রাকিবকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ১৭ কার্যদিবসে রাজন হত্যার বিচার ও ১০ কার্যদিবসে রাকিব হত্যার বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজনকে হত্যার পরে ঠিক চার মাসের মাথায় বিচার সম্পন্ন করা হলো আর তিন মাস পাঁচ দিনের মাথায় রাকিবের বিচার সম্পন্ন করা হলো। এটি সরকারের একটি নজিরবিহীন কাজ। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে কতগুলো অমীমাংসিত প্রশ্নের যেমন উত্তর তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি নতুন করে কতগুলো প্রশ্নেরও জন্ম হয়েছে।
রাজনের মূল ঘাতক কামরুল ইসলাম সৌদি আরব পালিয়ে গেলেও তাঁকে ফিরিয়ে এনে বিচার সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো সরকার যদি ইচ্ছা করে তাহলে দ্রুততম সময়ে যেকোনো বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব। এখানে মূল বিষয়টি হলো সরকারের সদিচ্ছার বিষয়। সরকার সে বিচারটি সম্পন্ন করতে চায় কি না? গত ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেলের জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিশু নির্যাতন একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এমন অপরাধে জড়িত কেউই রেহাই পাবে না’ (প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০১৫)। এরপরই রাজন ও রাকিবের এ রায়, যা প্রধানমন্ত্রীর কথার বাস্তবায়ন বলেই আমরা মনে করি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় কেন? ত্বকী হত্যার তিন বছর হতে চলল, এখন পর্যন্ত হত্যার অভিযোগপত্র দিয়ে এর বিচার শুরু করা গেল না কেন? সংগত কারণেই প্রশ্নটি এখন সবার মনেই উত্থাপিত। ত্বকী হত্যার বিষয়টি কি এমনই জটিল যে এর রহস্য ভেদ করা যাচ্ছে না বা এর ঘাতকদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না? না, তা নয়। কারণ দুই বছর আগেই ত্বকী হত্যার তদন্তকারী সংস্থা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সংবাদপত্র ও বিভিন্ন টেলিভিশনের মাধ্যমে গোটা দেশবাসীকে জানিয়েছে কারা, কখন, কবে, কোথায়, কেন ও কীভাবে ত্বকীকে হত্যা করেছে। ত্বকীর ঘাতক হিসেবে তারা যাদের নাম উল্লেখ করেছে, তারা সবাই সরকারদলীয় লোক। তাহলে কি এ জন্যই ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে না? রাজন ও রাকিবের ঘাতকেরা যেহেতু তেমন প্রভাবশালী বা সরকারদলীয় নয়, দ্রুত বিচারের জন্য তাই এ দুটো হত্যাকাণ্ডকেই বেছে নিয়ে এক নতুন নজির স্থাপন করা হয়েছে?
ত্বকী হত্যার তিন বছর হতে চলল, এখন পর্যন্ত হত্যার অভিযোগপত্র দিয়ে এর বিচার শুরু করা গেল না কেন? সংগত কারণেই প্রশ্নটি এখন সবার মনেই উত্থাপিত। আমরা চাই না এক দেশে দুই আইন ও নিয়ম চলুক আমাদের দেশের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার মধ্যে যোগ্য ও দক্ষ বহু কর্মকর্তা রয়েছেন। যাঁরা অতি দ্রুতই অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করতে সক্ষম। কিন্তু আমাদের রাজনীতি অনেক সময় তাদের স্বাধীন গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। ত্বকী হত্যার পরে দুজন ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ত্বকী হত্যার এক বছর না যেতেই এ হত্যার তদন্তকারী সংস্থা হত্যার তদন্ত সম্পন্ন করে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। গত বছর ৫ মার্চ তারা সংবাদমাধ্যমে ত্বকী হত্যার খসড়া অভিযোগপত্র প্রদান করে অচিরেই তা আদালতে পেশ করা হবে বলে জানিয়েছিল। অথচ অদ্যাবধি সে অভিযোগপত্র পেশ করা হলো না।
ত্বকীর হত্যার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্তরা সরকারদলীয় হওয়ার কারণেই এ হত্যার অভিযোগপত্র আটকে আছে বলে আজ অনেকেই মনে করছেন। কিন্তু আমরা তো এ প্রশ্নবিদ্ধ বিচারব্যবস্থা চাই না। রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে দেশের প্রতিটি নাগরিক সুবিচার পেতে চায়। এটি তাদের শেষ ভরসার জায়গা। একদিকে আজ রাজনের ঘাতককে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার নজির, অপরদিকে ত্বকী হত্যার মূল ঘাতক হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীর সামনে, নাকের ডগায় প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়ানোর নজির! এখানে প্রশ্ন হচ্ছে সদিচ্ছার। এ বিচারটি সরকার করতে চাইছে কি না।
৯ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন রাকিব ও রাজনের মতো অন্যান্য চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করে বিচারের ব্যবস্থা করতে (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০১৫)। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা যেন বাস্তবে পরিণত হয়। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রী যেন ত্বকীর ঘাতকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। কারণ, আমরা চাই না এক দেশে দুই আইন ও নিয়ম চলুক।
রফিউর রাব্বি: নিহত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর বাবা।

গণতন্ত্র ছাড়া এগোনো যায় না by এম হুমায়ুন কবির

গণতন্ত্রের জয় সব সময়ই আনন্দের, মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। ৫০ বছর পর মিয়ানমারের জনগণ স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দিল, ফলে দিনটি তাদের জাতীয় জীবনের খুবই স্মরণীয় একটি দিন।
মিয়ানমারের এই নির্বাচনের কিন্তু একটা পরিপ্রেক্ষিত আছে, এই নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা চার-পাঁচ বছর ধরেই চলছিল। ২০১১ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন সরকারের উপলব্ধি হয়, অং সান সু চিকে বাইরে রেখে সরকার পরিচালনায় দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। সে কারণে তখন থেকেই তারা সু চির সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ জটিল, সেখানে ১৫টি বিভিন্ন ভাষাভাষী বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে। ফলে সেই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য তাদের একটা চেষ্টা ছিল। সে লক্ষ্যেই মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সরকার কিছুদিন আগে সাতটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে।
ওদিকে দারিদ্র্য আরেকটি বড় ব্যাপার। মিয়ানমারের সরকার বুঝতে পেরেছিল, দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া বেশি দূর এগোনো যাবে না। এসব কারণের সম্মিলিত ফলাফল হিসেবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
আমরা দেখলাম, এই নির্বাচনে মিয়ানমারের ৯০টি দল ও ৬ হাজার প্রার্থী ১ হাজার ৭০০ পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্বাচনে ভোটও দিল। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০ সালের নির্বাচনেও সু চির দল এনএলডি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু সামরিক বাহিনী সেবার নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। তারা সু চিকে গৃহবন্দী করে। তখন থেকেই শুরু হয় সু চির সংগ্রাম।
তবে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। মিয়ানমারের সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। গণতন্ত্রের পথে এটা এক বড় প্রতিবন্ধকতাই বটে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, তারা কীভাবে এই প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে।
আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, নির্বাচনের প্রচারণার সময় মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। কট্টরপন্থী বৌদ্ধদের সংগঠন মাপাথা নির্বাচনের আগে ইয়াঙ্গুনে মিছিল করে সু চির দল এনএলডিকে মুসলিম পার্টি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, সু চির এনএলডি ক্ষমতায় এলে মিয়ানমার মুসলমানে ছেয়ে যাবে। এরপর আমরা দেখলাম, ১০০ মুসলমান প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হলো। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে, নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের ভোটই দিতে দেওয়া হলো না। এটা অত্যন্ত নেতিবাচক। কারণ, আর যা-ই হোক, একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না। ফলে নতুন সরকারকে ভেবে দেখতে হবে, কীভাবে এর সুরাহা করা যায়। মাপাথার মতো কট্টরপন্থী সংগঠন তো আছেই, তারা এনএলডিকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করবে।
মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ, যাকে বলে একদম পাশের বাড়ির প্রতিবেশী। ফলে সেখানকার ঘটনাপ্রবাহ আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনেও প্রভাব ফেলে, সে কারণেই আমরা তাদের ব্যাপারে আগ্রহী।
আমাদের প্রথম ও প্রধান উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। এমনিতেই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও টেকনাফে বসবাস করে। তারপর গত বছর মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা হামলার শিকার হয়ে দলে দলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করেনি। ফলে এক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। রোহিঙ্গারা যেহেতু বাংলাদেশেও আসে, সেহেতু আমাদের এ ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। আবার এই রোহিঙ্গাদের আমরা মাসের পর মাস ধরে সাগরে মানবেতর অবস্থায় ভেসে থাকতে দেখেছি, ফলে মানবিক কারণেও আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দাবি করা উচিত।
চীনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মিয়ানমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত মিয়ানমারের ওপর দিয়েই চীনের সঙ্গে আমাদের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে চীনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের গুরুত্ব অপরিসীম। আর দেশটি গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হলে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বড় হবেই বলে আমরা ধারণা করতে পারি।
গুরুত্বের বিষয় হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মিয়ানমার আমাদের জানালার মতো। ফলে ভূরাজনীতির স্বার্থে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রাখতে হবে।
এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত।

অগ্নিপরীক্ষায় মোদির পরাজয় by ইফতেখার হোসেন

১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই বিহারের পদত্যাগী মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব দুর্নীতির দায়ে কারাগারের ফটকে পা রাখতেই তাঁর স্ত্রী রাবড়ি দেবীকে মোবাইল ফোনে একটা কল দিলেন। রাজনীতিতে রাবড়ি দেবীর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নয় সন্তানের ধকল-ধাক্কা সামলাতে সামলাতেই তাঁর জীবনটা কেটে গেছে। তবু লালুর ইচ্ছার ব্যত্যয় ঘটানোর মতো স্পর্ধা তাঁর নেই। তাঁর অনুরোধেই বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হন রাবড়ি। এরই জের ধরে ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় এক যুগ তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।
নিতীশ কুমারের আনুগত্য-ভাগ্য ছিল কিছুটা দুর্বল। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিহারে তাঁর দলের হলো ভরাডুবি; নরেন্দ্র মোদির বিজেপি যেখানে পেল ৩১টি আসন, মুখ্যমন্ত্রী নিতীশের দল পেল সর্বসাকল্যে দুটি। অভিমানে নিতীশ পদত্যাগ করলেন। দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন তাঁরই আস্থাভাজন জিতন রাম মাঝির হাতে। অভিমান অবশ্য বেশি দিন স্থায়ী হলো না। নিতীশ চাইলেন পুরোনো পদ ফিরে পেতে। মাঝি তখন বেঁকে বসলেন; দেনদরবার করতে ছুটলেন দিল্লিতে। নিতীশ সভা ডেকে মাঝিকে দল থেকে বহিষ্কার করলেন। আস্থা ভোটে নিতীশ আবার ফিরে পেলেন তাঁর হারানো কুরসি।
১৯৯০ সালে লালুপ্রসাদ জনতা দলের পক্ষে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন। সমাজ ও রাজনীতিতে হিন্দু উচ্চবর্ণের একচ্ছত্র আধিপত্য লালু ভেঙে দিলেন। একে একে অংশীদারত্ব ও জনকল্যাণমূলক নীতিও গ্রহণ করলেন তিনি। ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিলেন। লালু হয়ে উঠলেন জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠল লালুর দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা। যাদবের বাইরের হিন্দু নিম্নবর্ণের অন্য জাতপাতরা বঞ্চিত হতে লাগল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্তিমিত হয়ে এল।
সমাজবাদী নিতীশ কুমার এককালে ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণের ভাবশিষ্য। নিতীশ লালু যাদবের সঙ্গ পরিত্যাগ করেন ১৯৯৫ সালেই, জড়িয়ে পড়েন দিল্লির রাজনীতিতে, মন্ত্রী হন। ২০০৫ সালে রাষ্ট্রীয় জনতা দল—ইউনাইটেড (আরজেডিইউ) গঠন করেন এবং বিজেপির সমর্থনে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো এই পদ ধরে রাখেন। নিতীশের আমলে বিহারে আর্থসামাজিক উন্নতি ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে, দুর্নীতি কমে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিহারের বিধানসভার নির্বাচনকে নিয়েছেন অপরিসীম গুরুত্বসহকারে। গত ১৮ মাসের ক্ষমতায় মোদি-হাওয়া অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে, প্রতিশ্রুতির অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে বটে, তবে সেটা বিগত ধারার সঙ্গে সংগতি রেখেই। বিদেশে পাচারকৃত ভারতীয় অর্থের ভগ্নাংশও দেশে ফেরেনি। ভূমি অধিগ্রহণ, কর পুনর্গঠন নীতিমালার মতো বড় বড় সংস্কার পরিকল্পনা লোকসভায় থমকে গেছে। পুঁজিবাজার ও মুদ্রা-মূল্যমানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। মোদি ধাক্কা খেয়েছেন দিল্লিতে, কেজরিওয়ালের কাছে। বিহারের নির্বাচন বিজেপির জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অগ্নিপরীক্ষা। এখানে জিতে আসতে পারলে আগামী বছরের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা ও ২০১৭-এর উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপি আস্থার অবস্থানে চলে আসতে পারবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলি অবশ্য মোদির জন্য পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। দাদরিতে গো-হত্যার মিথ্যা অভিযোগে নিরপরাধ মুসিলম হত্যা, হরিয়ানায় দুই ঘুমন্ত শিশুকে পুড়িয়ে মারা; সামগ্রিকভাবে সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ও সহিংসতা বৃদ্ধি—এ সবই অনেকের কাছে ভারতের গতানুগতিক সহনশীলতার ঐতিহ্যের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে প্রতীয়মান হতে শুরু করে। এসবের বিরুদ্ধে মোদি সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে শুধু যে অপারগই হচ্ছেন তা-ই নয়, কারও কারও বক্তব্য পরিস্থিতিকে অধিকতর ঘোলাটে করে তুলছে। বিহারের রাজনীতিতে ধর্ম ও জাতপাত—এ দুটিই সংবেদনশীল।
বিহারের নির্বাচনী ফলাফলে ধর্ম ও জাতপাত মুখ্য ভূমিকা রেখেছে, সন্দেহ নেই। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে নিতীশের জেডিইউ পেয়েছিল ১৬ শতাংশ ভোট, এবারে ভোটের পরিমাণ এর চেয়ে কম হওয়ার কারণ নেই। মুসলিম, যাদব আর কুরমিদের ভোট যথাক্রমে ১৮, ১৩ ও ৪ শতাংশ; সব মিলিয়ে ৩৫ শতাংশ। নিতীশ-লালুর মহাজোটে সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেসও অংশীদার।
লালু যাদব আর নিতীশ কুমারের মধ্যে সম্পর্ক একসময় ছিল শীতল। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তাঁদের দুই দল পৃথকভাবে নির্বাচন করেছে। ভরাডুবি ঘটেছিল উভয় দলেরই। এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে এবার তাঁরা জোট গড়েছেন। প্রতিপক্ষের শত উসকানিতেও চিড় ধরছে না এই জোটে। নিতীশ নেমেছেন ‘অতিভদ্রের’ ভূমিকায়। তাঁর এক সভায় এক সাংবাদিক কিছু একটা প্রশ্ন করেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সম্পর্কে। নিতীশ পরপর দুবার তাঁকে তিরস্কার করলেন নামের আগে ‘শ্রী’ শব্দটি ব্যবহার না করার অপরাধে। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু হেদায়েতও করে দিলেন শিষ্টাচার বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর। মোদি নিতীশকে অহংকারী ও লালুকে শয়তান বলেছিলেন। নিতীশ এরও সমালোচনা করে বলেছেন, দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখে এ ধরনের কথাবার্তা শোভা পায় না। লালু যাদব অবশ্য নিতীশের উপদেশের খুব একটা তোয়াক্কা করছেন না। লালু মোদিকে রাবণ, পিশাচ আখ্যায়িত করে হুংকার দিয়েছেন। বলেছেন, রাবণের রাজনীতির অবসান তিনি বিহারেই ঘটাবেন। মোদিও সুযোগমতো এর পাল্টা জবাব দিয়েছেন। নিতীশ বুঝেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ, রাজপুত, ভূমিহারাদের সমর্থন আশা করাটা বৃথা। লালু বুঝেছেন ‘জঙ্গল-রাজের’ স্মৃতি এখনো জনগণের চেতনায় তাজা। নিপুণ যুগলবন্দীর বাঁশি বাজাচ্ছেন বিপরীত আদর্শ ও চরিত্রের এ দুই নেতা। মোদি বড় বড় সমাবেশ করেছেন, প্রবৃদ্ধির কথা বলেছেন, অর্থবিত্তের কথা ছড়িয়েছেন, বিহারকে উন্নতির মোড়কে মুড়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আর তারই ছায়ায় ছায়ায় লালু-নিতীশ জনসংযোগ করেছেন; একজন বলেছেন সুশাসনের কথা, অন্যজন অন্তর্ভুক্তির বাত বাতলেছেন। ‘গাঁটছড়া জোটের’ এ যেন চাণক্যের চমক রাজনীতি!
১৪ দিন চলে গেছে, মগধার রাজা জরাসন্ধ ও পাণ্ডব রাজপুত্র ভীমের মল্লযুদ্ধে কেউ কাউকে কাবু করতে পারছে না। অগত্যা ভীম রণেভঙ্গ দিয়ে বুদ্ধি আঁটতে ছুটে গেল কৃষ্ণের দরবারে। কৃষ্ণ বাতলে দিল সহজ পথ। জরাসন্ধকে গাছের কচি ডালের মতো ভেঙে ফেলতে পারলেই কাজ সারা। কালক্ষেপণ না করে ভীম মট করে জরাসন্ধকে দুই টুকরা করে ফেলল। বধ্ হলো জরাসন্ধ। মগধার রাজধানী ছিল বিহারের রাজধানী পাটনার অদূরের রাজগিরেতে।
নির্বাচনী প্রচারণার মাঝামাঝি, দুই দফা ভোট পর্বের পর, বিজয়া দশমী উপলক্ষে মোদি ফিরে গিয়েছিলেন দিল্লিতে। মন্দ লোকে বলাবলি করেছে, ভোটের ফলাফল আঁচ করতে পেরেই মোদির এই সাময়িক প্রস্থান। দুই সপ্তাহ পর ফিরে এসে বিহারে তিনি পুনরায় পুরোদস্তুর প্রচারকাজে নেমেছিলেন।
বোফর্স অস্ত্র চুক্তি কেলেঙ্কারির গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে রাজীব গান্ধী তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ভিপি সিংকে বরখাস্ত করলেন। ভিপি সিং ছিলেন নীতিবান সমাজতন্ত্রীমনা রাজনীতিক। পরের বছর ১৯৮৮ সালের ১১ অক্টোবর জেপির জন্মদিনে কয়েকটি ছোট দলের সমন্বয়ে ভিপি সিং গঠন করলেন জনতা দল। এর ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দলকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি হলো জাতীয় ফ্রন্ট। এর পরবর্তী ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনবদ্য। ভিপি সিং নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে ঐক্য গড়ে তুললেন ডানপন্থী বিজেপি ও বামপন্থী কমিউনিস্টদের সঙ্গে। ১৯৮৯-এর নির্বাচনে জাতীয় ফ্রন্টের নির্বাচনী ঐক্য কংগ্রেসকে পরাস্ত করে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেল। ডিসেম্বরে ভিপি সিং প্রধানমন্ত্রিত্বের শপথ গ্রহণ করলেন। ভিপি সিংকে বলা হয় মোর্চা গঠনের দক্ষ কারিগর।
নিতীশ কুমারের বর্তমান অবস্থান অনেকাংশেই ভিপি সিংয়ের তৎকালীন অবস্থার সঙ্গে তুলনীয়। মোর্চা গঠনের দক্ষতায়ও ভিপি সিংয়ের সঙ্গে তাঁর মিল রয়েছে। নিতীশ জোট করেছেন ভিন্ন মেজাজের আরজেডি আর কংগ্রেসের সঙ্গে। মহাগাঁটবন্ধন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় মোদির বিজেপিকে হারিয়ে দিয়েছে। জোট করে ভিপি সিং প্রধানমন্ত্রী থাকতে পেরেছিলেন এক বছরেরও কম সময়। বিজেপি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। রাজীব গান্ধীর সমর্থন পেয়ে ভিপি সিংয়ের দলের নেতা চন্দ্র শেখর সুযোগ বুঝে পৃথক দল গঠন করে জোট ছেড়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে লালু যাদবের আরজেডি নিতীশের জেডিইউর চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। নিতীশের সরকারে লালুর প্রভাব থাকবে দৃশ্যমান। কংগ্রেসও সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। এই জায়গাটিতেই নিতীশের বিপদের আশঙ্কা।
অপর পক্ষে এই বিজয় নিতীশের সামনে সর্বভারতীয় রাজনীতির নতুন দুয়ার উন্মোচিত করল। বিজেপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক অর্থে বিহারের নির্বাচনী ফলাফল ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে এক বড় ধরনের ‘গেম চেঞ্জার’। বিজেপিকে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে, জাতপাত ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে, ‘উন্নয়নের’ স্লোগান দিয়ে লোক ভোলানোর সহজ পন্থা আর কাজে খাটবে না। নিতীশকে কেন্দ্র করে ভারতে বিজেপিবিরোধী রাজনীতি চাঙা হয়ে উঠবে। এই লক্ষ্যে রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যে পরোক্ষভাবে নিতীশের নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিতীশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মোর্চা গঠনের নিপুণতা তাঁকে সামনে এগিয়ে নেবে। এই মুহূর্ত থেকেই ভারতের আগামী লোকসভা নির্বাচনের দিকে নীতিশের শ্যেনদৃষ্টি থাকবে, তাতে আর সন্দেহ কোথায়! ২০১৪ সালে এনডিএর পক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হওয়াতেই নিতীশ লোকসভা নির্বাচনে বিহারে পৃথকভাবে প্রার্থী দিয়েছিলেন, বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নয়।
তবে শেষের পরও শেষ কথা থেকে যায়। বিহারের বিধানসভার বৃহত্তম দল হিসেবে ফিরে আসা লালুজিরও সর্বভারতীয় রাজনীতিতে আগ্রহ আছে প্রচুর, এর আভাসও তিনি দিয়ে রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে নিতীশজিকে এখানেও বাধার সম্মুখীন হতে হবে।
ইফতেখার হোসেন: জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ।

ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও সমাজ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

অনেকে মনে করেন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের পরে পাশ্চাত্য দর্শনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও মৌলিক দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। তিনি জার্মান আইডিয়ালিজমের প্রতিষ্ঠাতা। যুক্তির বাইরে তিনি একচুলও নড়তে চাইতেন না। মুক্তচিন্তা বলতে এ কালে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তার চেয়েও বেশি যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার প্রবক্তা। তাঁর জীবন ছিল কঠোর নিয়মে বন্দী। সারা দিনের পাঁচটি মিনিটও তিনি অপচয় করতেন না। কখন ঘুম থেকে উঠবেন, চা খাবেন, লেখার টেবিলে বসবেন, লাঞ্চ করবেন, কয় মিনিট চোখ বুজে বিশ্রাম করবেন এবং কখন অপরাহ্ণে হাঁটতে বেরোবেন—সবই ছিল তাঁর কঠোর নিয়মে বাঁধা। তাঁকে রাস্তায় বেরোতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের ঘড়ির কাঁটা ঠিক করে নিতেন।
চিরকুমার কান্টের কাজের লোকটির নাম ছিল ল্যাম্বে। দিনরাত সারাক্ষণ তিনি দার্শনিকের বাড়িতে থাকতেন। কান্টকে জ্ঞানচর্চার অবকাশ দিয়ে ঘরদোরের সব কাজ—রান্নাবান্না, কাপড় ধোপাবাড়িতে দেওয়া প্রভৃতি—ল্যাম্বে করতেন। কয়েক দশক তিনি কান্টের বাড়িতে ছিলেন। তিনি ছিলেন দার্শনিকের অতি বিশ্বাসভাজন। কান্ট সারা দিনে পাঁচ-দশটি বাক্যের বেশি বলতেন না। তিনি যখন লিখতেন তখন ল্যাম্বে চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন কখনো কখনো। কান্ট আপন মনে লেখালেখি করতেন। একদিন তিনি অনুভব করেন পেছনে দাঁড়িয়ে ল্যাম্বে কেমন অস্বাভাবিক জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পেছনে তাকিয়ে দেখেন ল্যাম্বের চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছে।
কান্টের মধ্যে আবেগের লেশমাত্র ছিল না। কাঁদার প্রয়োজন হলে কেউ কাঁদবে তাতে বিস্ময়ের কী? কান্ট জিজ্ঞেস করেন, তুমি এখানে কাঁদছ? কান্ট অপ্রয়োজনীয় বাক্য ব্যয়ের পাত্র ছিলেন না। আমরা হলে বলতাম, এখানে কান্নাকাটি কী? কাঁদো তো নিজের ঘরে গিয়ে কাঁদো। কান্টের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ল্যাম্বে বললেন, আমি আপনার লেখা পড়ে কাঁদছি। কান্ট অবাক হন। ল্যাম্বে বলেন, গড আছেন কি নেই, সে সম্পর্কে আপনি লিখছেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ-ট্রমাণ নিয়ে কী সব লিখছেন, আমি তা মানতে পারি না। গডের বিরুদ্ধে কোনো কথা আমার সইবে না।
মহাজ্ঞানী কান্ট ভেবে দেখলেন, ওর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে ওর অনুভূতিরও মূল্য রয়েছে। থাকুক ল্যাম্বে ওর বিশ্বাস নিয়ে। দুই দিন পর এক সকালে কান্ট দেখেন ল্যাম্বে সুটকেস গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে বাইবেলপরিপন্থী লেখায় তাঁদের ৩০-৪০ বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। সুটকেস হাতে নিয়ে ল্যাম্বে চিরদিনের জন্য কান্টের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।
বহু বছর আগে বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির অধীন গেলফার্টস্ট্রাসেতে ইনস্টিটিউট ফর ফিলোসফির এক আলোচনায় কান্টের জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে শোনার সুযোগ হয়েছিল। আঠারো শতকের শেষ দশকে, যখন গির্জার প্রভাব রাষ্ট্রের ওপর প্রবল, প্রকাশিত হয় কান্টের ‘রিলিজিয়ন উইদিন দ্য লিমিটস অব রিজন অ্যালোন’ শীর্ষক সন্দর্ভ। শুধু যুক্তির সীমার মধ্যে ধর্ম। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক উইলিয়ামের কাছে নালিশ জানান। তখন কান্ট ইউরোপের দর্শনের ভুবনে সম্রাট। সম্রাট ফ্রেডরিকের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়ে কান্টকে এক কড়া চিঠি দেয় এই মর্মে যে ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলা বা লেখালেখি চলবে না। তাঁর ওই রচনা একটি অফেন্স বা অপরাধ এবং তা হাইয়েস্ট ডিসপ্লেজার বা সর্বোচ্চ অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। ঝামেলায় জড়িয়ে জ্ঞানচর্চায় ব্যাঘাত ঘটুক, তা যেমন চাইতেন না, তেমনি শেষ বয়সে গর্দানটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হোক, তাও তাঁর একেবারেই কাম্য ছিল না। সম্রাটের নির্দেশের লিখিত জবাবে কান্ট জানান: আপনার একজন অনুগত নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যতে আমি আমার কোনো বক্তৃতায় বা রচনায়—অন রিলিজিয়াস ম্যাটার্স—ধর্মীয় বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। এরপর ১০ বছর বেঁচে ছিলেন, ধর্মের ধারেকাছেও যাননি কান্ট। তবে বলেছেন, এই যে নক্ষত্রখচিত রাতের মহাকাশ, এর সৃষ্টির পেছনে নিশ্চয়ই রয়েছে মহারহস্য—কোনো এক মহাশক্তি। সেই মহাশক্তিকে যে নামেই ডাকা হোক।
কুড়ি শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী যৌক্তিক বিশ্লেষণী দার্শনিক ভিটগেনস্টাইন বই লিখেছেন মাত্র একখানা: ট্র্যাকটেটাস, কিন্তু তাতেই তিনি কিস্তিমাত করেছেন। ওতে দাঁত বসানোর সাধ্য খুব কম দার্শনিক বিজ্ঞানীরই আছে। ভিটগেনস্টাইনকে বিজ্ঞানের দার্শনিকও বলা হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনিও বলেছেন: বিজ্ঞানের প্রধান রহস্যগুলোর সমাধান হয়ে যাওয়ার পরেও মানবজীবনের কিছু প্রশ্ন অজানাই থেকে যাবে।
কপারনিকাস হোন, গ্যালিলিও হোন, কেপলার হোন, নিউটন বা আইনস্টাইন হোন—পশ্চিমের পদার্থবিজ্ঞানীরা কেউ ধর্মবিরূপ ছিলেন না। তাঁরা মহাজগতের বস্তুর রহস্য ও সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁদের আবিষ্কারের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থের বেমিল হয়েছে, কিন্তু তাঁরা নিজেদের আবিষ্কৃত তথ্যের কথাই বলেছেন, ধর্মগ্রন্থের বাণীর সঙ্গে কোথায় তার বিরোধ, তা নিয়ে বাহাস করেননি। ধর্ম প্রবর্তকদের তাঁরা খাটো করেননি। আইনস্টাইন এতটাই ধর্মভাবাপন্ন ছিলেন যে তিনি বড় হাতের ইংরেজি অক্ষর ‘G’ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে লিখতেন। কারণ, গড লিখতে হয় ক্যাপিটাল জি অক্ষর দিয়ে।
ধর্ম আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এক জিনিস নয়। প্রাচ্যের অনগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর বদনাম বেশি। অথচ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা পশ্চিমের ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে কিছু ঘটলে তা নিয়ে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলে। তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা, খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের কথা ধামাচাপা দেয়। বাংলাদেশের বা ভারতের কোনো মুসলমান পাঁচজন হিন্দুকে অথবা কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ পাঁচজন মুসলমানকে গুলি করে হত্যা করলে তা তিন মাস ধরে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম প্রচার করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ। ২০১১ সালের ২২ জুলাই পৃথিবীর ইতিহাসের এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী হত্যাকাণ্ড ঘটে নরওয়েতে। আন্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামক এক খ্রিষ্টান মৌলবাদী একটি সামার ক্যাম্পের ৪১ জন যুবক-যুবতীকে বোমা মেরে ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে গুলি করে হত্যা করে। সে অতি সুস্থ এবং স্বীকার করে যে এশিয়ার কালোদের বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসী নীতির বিরুদ্ধেই তার হত্যা অভিযান। ইউরোপ খ্রিষ্টানদের জন্য—হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের জন্য নয়। তার দেশের অতি প্রগতিশীল সরকার তাকে ‘পাগলাটে’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ বলে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বিচারের এজলাসে তাঁকে দাঁড় করিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ওই খ্রিষ্টান মৌলবাদী ও বর্ণবাদীকে ‘সাইকোটিক প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিক’ বলে হত্যাকাণ্ডটিকে হালকাভাবে দেখা হয়।
ইউরোপে একটি ভালো গণতান্ত্রিক সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে সন্দেহ নেই, আমরা তা করতে পারিনি বা করতে চাইনি ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে। কিন্তু সেখানে যে বর্ণবাদী চেতনা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ, তা দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের চেয়ে অনেক গভীরে। উদার মানবতাবাদের কথা তাঁরা বলেন এবং তা প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যমও তাঁদের আছে; কিন্তু তাঁরা জানেন না প্রাচ্যের হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান মানবতাবাদীদের কথা। আমাদের মহামানবেরা সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাঁদের নিজেদের জীবনাচরণে, তা পশ্চিমে বিরল। আমাদের দুর্বলতা আমরা অন্যের মুখে ঝাল খাই এবং পোঁ ধরতে পছন্দ করি।
ধর্ম যদি মানব প্রগতির বাধা হতো, তাহলে আজ বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি হতো না। পাঁচ-ছয় শ মানুষ ও হাজার হাজার কিলোগ্রাম মালপত্র নিয়ে বিমান আকাশে উড়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেত না। মানুষ চলাফেরা করত নৌকা বা ঠেলাগাড়িতে। চাঁদে বা মহাকাশে মানুষকে যেতে বাধা দেওয়া হতো। ধর্ম মহত্তম সভ্যতা সৃষ্টিতে কোনো অঞ্চলে কোনো কালেই কিছুমাত্র বাধা হয়নি। তা-ই যদি হতো, তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশে মহান বৈদিক হিন্দু সভ্যতা বা বৌদ্ধ সভ্যতা আমরা পেতাম না। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে স্পেন পর্যন্ত মহান ইসলামি সভ্যতা গড়ে উঠত না প্রাক-মধ্যযুগে। বৌদ্ধধর্ম অধ্যুষিত চীন, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় সভ্যতার সৃষ্টি হতো না। সব ধর্মাবলম্বীর ভেতরেই কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নোংরামি আগেও ছিল, এখনো আছে। স্রোতস্বিনী নদীতে মানুষ ও পশুর মৃতদেহ ভেসে যায়, তাতে নদীর পানি নষ্ট হয়ে যায় না। মানুষ নদীর পানিই পান করে। নদীর নির্মল পানিই আসল। অল্প-স্বল্প নোংরা সেই পানিকে অপবিত্র করতে পারে না। পবিত্র ধর্মকে কিছু নোংরামি অপবিত্র করতে পারে না।
ধর্ম এক জিনিস। ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অন্ধত্ব আরেক জিনিস এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বা ধর্মীয় রাজনীতি আরেক বস্তু। ধর্ম মানুষকে হিংসা ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে, অন্তরে নির্মল হয়ে সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তা করে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা মানুষকে ছোট করে। ধর্মীয় রাজনীতি মানুষকে অসহিষ্ণু ও হিংস্র করে তোলে।
এই পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে ধর্ম ছিল। ভবিষ্যতেও ধর্ম স্বমহিমায় থাকবে। আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতি থাকতেই হবে। সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিও থাকবে। কেউ কারও সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেউ কারও জন্য বাধা নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ সহাবস্থান অতীতে যেমন করেছে, এই পৃথিবীতে ভবিষ্যতেও তেমনিভাবে করবে। তবে যখন এই তিনের মধ্যে কোনো কারণে বিরোধ দেখা দেয়, তখন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য সংবেদনশীলতার সঙ্গে তার মীমাংসা করা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বাঘের গুহার সামনে আমরা সবাই একা! by ফারুক ওয়াসিফ

সবাই মহাবিপদের ভয় করছেন। ভয়টা অমূলক নয়। নিহত প্রকাশক দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের পর এত ভয় আমি কখনো পাইনি।’ হয়তো এটাই মানুষের মনের কথা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত ২১ আগস্টে বলেছিলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ না থাকলে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সৈয়দ আশরাফের দায়িত্ব। কিন্তু দেশবাসীকে এক করবে কে? অধ্যাপক হক বিচার চান না, শুভবুদ্ধির উদয় চান। শুভবুদ্ধির উদয় বলতে তিনি জাতীয় ঐক্যের কথাই বলে যাচ্ছেন। সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে, শোকের জমিনে যে পিতা ঐক্যের বীজ বপন করেন, সেই বীজ ফেটে শান্তির উদয় হতে হলে শুধু দলীয় ঐক্য না, জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবতে হবে। তাই শুধু দলীয় ঐক্যের ডাক দিলেই হবে না, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার রূপরেখাও দিতে হবে।
এত হিংসা ও বিভেদ এই দেশে বহুকাল দেখা যায়নি। মানুষ ভরসা ও ঐক্যের দিশা দেখতে চায়। অবিশ্বাসের দেয়াল উঁচু হচ্ছে প্রতিদিন। সমাজে বিশ্বাসে, পরিচয়ে ও মতামতে ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু এখন বিভক্তির পরিখা তৈরি হচ্ছে। তাতে ঢালা হচ্ছে হিংসার তপ্ত গরল। মানুষ খুন হচ্ছে অহরহ। একতা না থাকলে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হলে কী পরিণতি হয়, স্বাধীন দেশের তার অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।
বিপর্যয়ের লক্ষণগুলো দগদগে। একের পর এক লেখক-ব্লগার-প্রকাশক খুন হচ্ছেন অথবা হামলায় ক্ষতবিক্ষত হতে থাকছেন। এগুলো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। এগুলোর লক্ষ্য হিংসা ও বিভক্তির দাবানল লাগিয়ে দেওয়া। কোনো হত্যার পরই বলা যাচ্ছে না, এটাই শেষ। সেই ভরসা জাগাতে সরকার ব্যর্থ।
সন্তানের লাশ কাঁধে, শোকের জমিনে যে পিতা ঐক্যের বীজ বপন করেন, সেই বীজ ফেটে শান্তির উদয় হতে হলে শুধু দলীয় ঐক্য না, জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। তাই শুধু দলীয় ঐক্যের ডাক দিলেই হবে না, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার রুপরেখাও দিতে হবে লেখক ও সাংবাদিক, স্বদেশি ও ভিনদেশি, পুলিশ ও প্রশাসন, সরকারি ও বিরোধী, ডান বা বাম—কে নিরাপদ? কোনো মৃত্যু হয় চাপাতি অথবা গুলিতে, কোনো মৃত্যু হয় বন্দুকযুদ্ধ অথবা ক্রসফায়ারে। কোনো কোনো মৃত্যুর বায়বীয় দায় স্বীকার করার ঘোষণা আসে অনলাইনে। কোনো কোনো হত্যার দায় কেউই স্বীকার করে না। মৃত্যুর আগে কেউ নাস্তিক, কেউ আস্তিক, কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, কেউ বাংলাদেশি, কেউ বিদেশি, কেউ ভালো, কেউ মন্দ; কিন্তু হত্যার পরে যে লাশ পড়ে থাকে, তা মানবের। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে, নাগরিক হিসেবে তার হত্যার বিচার লাগবে, নিরাপত্তা দিতে হবে।
আশুলিয়ায় একজন পুলিশ সদস্য হত্যার পর আক্রান্ত হলেই পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশের চিন্তাটা আত্মরক্ষার দিকে; জননিরাপত্তার কী হবে? বিপদে তো সবাই! পুলিশের বন্দুকে গুলি থাকে না, মন্ত্রীদের কথা ও কাজে সত্য ও মানবিকতা থাকে না। একদিকে চাপাতি আরেকদিকে ৫৭ ধারা। কথা বলবে কে? ক্রসফায়ার-বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ করা কি মানবাধিকারের দাবি, নাকি আইনের শাসনের দাবি, অথবা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তার দাবি, তা নিয়ে ভাবার সুযোগই-বা কই? এই সম্মিলিত ভয়ের সঠিক নাম জাতীয় সংকট, অস্তিত্বের সংকট।
ভীত মানুষ সুস্থ চিন্তা করতে পারে না। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের গোলমালে সত্য শনাক্ত করাও কঠিন। অতীত ও ভবিষ্যতের সবকিছুর জন্য যদি ‘কেষ্ট ব্যাটাই’ দায়ী হয়, তাহলে সর্বময় ক্ষমতা নিয়েও কেন পরাস্ত হচ্ছে সরকার? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমুখে জামায়াতকে দায়ী করেন, আরেক মুখে বলেন জামায়াত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারকে অভিযোগের তোপের মুখে রাখাও বিরোধী দলের কৃতিত্ব হতে পারে না। অদূরদর্শী প্রতিরোধের ডাক দিয়ে যে জীবনের অপচয় হলো, তার জবাবদিহি তাদের করতে হবে। এখন কেউ বলছে জঙ্গি, কেউ বলছে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র, কেউ-বা কপাল চাপড়াচ্ছেন। মুশকিল হলো দুটি পক্ষই যার যার শত্রুকে ‘জাতীয় শত্রু’ আখ্যা দিয়ে বসছে। সাবেক এক কুখ্যাত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে: উই আর লুকিং ফর শত্রুজ! অতীতে এভাবে সত্যের বরখেলাপের ফল ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও হওয়ার নয়।
ভয়কে নাম দিতে পারলে তাকে মোকাবিলা করা যায়। শত্রু চিহ্নিত করা গেলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব। নির্ভরযোগ্য নেতা পেলে তাঁর পেছনে দাঁড়ানো যায়। কিন্তু কী সেই ভয়, কোন সে শত্রু, আর কে দেবেন আশা? বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণে শত্রুকে মোকাবিলার রাজনৈতিক দিশা ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-ননবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’
তখন শত্রুর চেহারা স্পষ্ট ছিল, জাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে একতাও গড়া গিয়েছিল। এখন যখন দেশ দুভাগে বিভক্ত এবং দেশের লোকই দেশের লোকের শত্রু, যখন প্রগতি ও ধর্মের নামে হিংসার আবাদ ছড়ানোর ডিপ পলিটিকস সক্রিয়, তখন ঐক্য আসবে না। যে আগুন জ্বলেছে, তা শিগগির নিভবে না। বদনাম যা হওয়ার হয়েছে, উঠতি বাংলাদেশকে জাগিয়ে রাখতে হলে এখনই যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছেড়ে সহযোগিতার পাটাতন তৈরি করতে হবে। গণতন্ত্র ও অধিকারহীন জাতি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কারও পক্ষেই দাঁড়াবে না। ভয় ও হিংসা সমান তালে বাড়বে। রাজনীতি পরিণত হবে অসামরিক যুদ্ধক্ষেত্রে। অবশ্য লুণ্ঠন-দুর্নীতির তাতে অসুবিধা হচ্ছে না। অসুবিধা হচ্ছে দেশের জীবন ও সম্পদ নিয়ে।
জঙ্গি জঙ্গি বলতে বলতে সত্যি সত্যি যদি আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ এসে যায়, তার মোকাবিলা কি একা করতে পারবে এই সরকার? ব্যর্থ আন্দোলন দিয়ে, গোঁজামিলের কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে আরও অসহিষ্ণুতার দিকে ঠেলে দিয়ে বিএনপিও পগারপার। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিএনপি বা আওয়ামী লীগের একচেটিয়া জয়-পরাজয়ের অংশ নয়। বরং বাংলাদেশ এক থাকলেই দলগুলো টিকবে। ভালো হোক মন্দ হোক, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের দুটি পা, দাঁড়িপাল্লার দুই পাল্লা। এক পা কাটা হয়ে গেলে কিংবা এক পাল্লা ছিঁড়ে পড়লে বিরাট রাজনৈতিক শূন্যতা ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে।
বিএনপি-লীগ পরস্পরের পাতা ফাঁদে নিজেরাই পড়ে গেছে। দেশভাগের সময় মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের শত্রুতা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে ২০০ বছরের দখলদার ব্রিটিশকেই তারা পরম বন্ধু ভেবেছিল। ব্রিটিশের তৈরি দুর্ভিক্ষ ও ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গায় কোটিরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। আজ আওয়ামী লীগের বড় শত্রু বিএনপি, বিএনপির বড় শত্রু আওয়ামী লীগ। দেশের মানুষের চেয়ে বিদেশিদের ওপরই বেশি ভরসা তাদের। এ দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘নিয়ন্ত্রিত’ জামায়াত নিশ্চয়ই মজা পাবে, আর খুশি হবে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়েরা। পরস্পরের জন্য যে খাদ তারা খুঁড়ে যাচ্ছে, তা ডিঙাতে পারবে তো তারা?
আমরা দেখেছি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এবং বিগত জরুরি অবস্থার সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রী একসঙ্গেই নির্যাতিত হয়েছিলেন। যে সমস্যা তাঁরা সৃষ্টি করেছেন, তার সমাধান তাঁদের হাত দিয়ে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এককভাবে কিছু করা খুবই কঠিন। মনের বাঘ বলি বনের বাঘ বলি, বিপদ একটা আছে। বাঘ শিকার নিয়ে একটা গল্প আছে। দুজন শিকারি বন্দুক নিয়ে বনে গেছে বাঘ শিকারে। তো একজন খাদে পড়ে আর নড়েচড়ে না। তখন অপর জন পুলিশে ফোন করে জানতে চাইল, ‘আমার সঙ্গী মনে হয় মৃত, আমি কী করব?’ পুলিশের উত্তর: ‘প্রথমে নিশ্চিত হোন যে আপনার বন্ধু মৃত না জীবিত।’ ফোনের অপর প্রান্তে ‘দুম’ শব্দ শোনা গেল। এবার ফোন কানে নিয়ে শিকারিটি বলল, ‘নিশ্চিত হয়েছি, এবার কী?’
সঙ্গীর মৃত্যু নিশ্চিত করতে গিয়ে শেষ গুলিটি খরচ করে ফেলেছিল শিকারিটি, আর বাঘের গুহার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একা!
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

ঢাকার পথে নূর হোসেন

অবশেষে দেশের পথে বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার অন্যতম আসামি নূর হোসেন। গতকাল সন্ধ্যায় তাকে    পশ্চিমবঙ্গের দমদম কারাগার থেকে পেট্রাপোল সীমান্তের দিকে নিয়ে রওনা হয় ভারতীয় পুলিশের একটি দল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রাতেই তাকে বিএসএফের মাধ্যমে বিজিবির হাতে তুলে দেয়া হবে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একটি দলও রাতেই যশোরের বেনাপোল সীমান্তের দিকে রওনা হয়েছে। বিজিবির কাছ থেকে নূর হোসেনকে বুঝে নিয়ে সকালের মধ্যেই তারা নারায়ণগঞ্জে ফিরবেন। সকালে তাকে নারায়ণগঞ্জের জেলা জজ আদালতে তুলে সাত খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় জানান, নূর হোসেনকে আনতে পুলিশের একটি টিম বেনাপোলের দিকে রওনা দিয়েছে। অপরদিকে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ জানিয়েছেন, বিএসএফের পক্ষ থেকে তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু কখন হস্তান্তর করা হবে সেই সময় বলেনি। তারা (বিএসএফ) নূর হোসেনকে হাতে পেলে সময় নির্ধারণ করবে। সর্বোচ্চ আধ ঘণ্টার মধ্যে বিজিবির প্রতিনিধি দল নূর হোসেনকে গ্রহণ করতে পারবে।
উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে পাওয়ার এক দিনের মাথায় সাত খুনের আসামি নূর হোসেনকে ফেরত পাঠাচ্ছে ভারত। ২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে র‌্যাবের একটি দল। এর তিন দিনের মাথায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে সবারই হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম সেসময় অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকা র‌্যাবকে দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। পরে মামলার তদন্তেও এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর পর গত ৮ই এপ্রিল নূর হোসেন এবং র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এদিকে সাত খুনের মামলার অন্যতম এই আসামি ঘটনার পরপরই ভারতে পালিয়ে যায়। তবে ভারতে গিয়ে বেশি দিন পালিয়ে থাকতে পারেনি। গত বছর ১৪ই জুন কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের কাছে কৈখালি এলাকার একটি বাড়ি থেকে দুই সহযোগীসহ নূর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা হয়। গ্রেপ্তারের পর থেকে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিল নূর হোসেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের স্থায়ীয় সময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নূর হোসেনকে বের করা হয়। ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের দুই গোয়েন্দা অফিসারের হাতে নূর হোসেনকে তুলে দেয়া হয় বলে নিশ্চিত করেন দমদম সংশোধনাগারের সুপার নবীন সাহা। এ সময় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের দুজন কর্মকর্তাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই গোয়েন্দা দল নূর হোসেনকে নিয়ে পেট্রাপোল সীমান্তের দিকে রওনা হয়। এদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একটি দল আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার অনুলিপি নিয়ে সন্ধ্যার দিকে বেনাপোলের দিকে রওনা হন। সাত খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মামুনর রশীদ মণ্ডলও এই দলে রয়েছেন। সূত্র জানায়, রাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কড়া প্রহরায় তাকে নিয়ে পুলিশের গাড়িটি নারায়ণগঞ্জের দিকে রওনা দেবে। বেনাপোল থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে প্রতিটি জেলার পুলিশ সদস্যরা তাদের নির্ধারিত এলাকা পর্যন্ত নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করবেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সাত খুন মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এ কারণে নূর হোসেনকে এখন আর আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোন সুযোগ নেই। তাকে সরাসরি আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, এই মামলায় নূর হোসেনকে রিমান্ডে নেয়া না হলেও তাকে অন্য কোন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
এদিকে আমাদের বেনাপোল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রাত ৯টার আগেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের একটি দল ও বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড- বিজিবির একটি দল বেনাপোলের নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছে। পুরো এলাকায় কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিএসএফ সদস্যদের কাছ থেকে নূর হোসেনকে বুঝিয়ে নেয়ার পরপরই বিজিবি সদস্যরা তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের দলের কাছে বুঝিয়ে দেবে। জেলা পুলিশ তাকে নিয়ে সোজা নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেবে।
যে প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে: কলকাতায় আটক হওয়ার পর থেকেই নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ চলছিল। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নূর হোসেনকে ফেরত পাঠাতে সবুজ সংকেত দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩১১ ধারা অনুযায়ী নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ফরেনার্স আইনে আনা মামলা প্রত্যাহারের জন্য সরকারি কৌঁসুলি আদালতে আবেদন জানান। আবেদনে মামলা প্রত্যাহারের কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, নূর হোসেন বাংলাদেশের একজন দাগি অপরাধী। তার নামে ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিশ রয়েছে। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার এড়াতেই তিনি ভারতে গিয়ে বেআইনিভাবে আত্মগোপন করে ছিলেন। গত ১৬ই অক্টোবর  ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বারাসাতের মুখ্য বিচার বিভাগীয় আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক সন্দীপ চক্রবর্তী রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন অনুযায়ী সব অভিযোগ তুলে দেওয়ার অনুমতি প্রদানের পাশাপাশি নূর হোসেনকে ‘এক্ষুনি’ ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরত পাঠানোর অগ্রগতি সম্পর্কে আদালতকে জানাতে বলা হয়েছিল। তবে আদালতে পূজাবকাশ চললেও গত মাসেই রায়ের কপি দমদম কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকেই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হলেও দুর্গোৎসবের ছুটির জন্য কাজে গতি আসেনি। তবে অনুপ চেটিয়াকে ফেরত পাঠানোর পর ভারত সরকারও নূর হোসেনকে ফেরত পাঠাতে তৎপরতা শুরু করে। দীর্ঘ ১৬ মাস নূর হোসেন দমদম কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে ছিলেন। এর আগে গত বছরের ১৪ই জুন কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অদূরে কৈখালিতে ভিআইপি রোডের উপর সুবিশাল ইন্দ্রপ্রস্থ আবাসনের এ ব্লকের একটি বাড়ির চারতলার ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগী খান সুমন ও ওহিদুল জামানকে। ১৫ই জুন বারাসাত আদালতে পুলিশ যে কেস ডায়েরি পেশ করেছিল তাতে বলা হয়, বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সিমরাইয়ের বাসিন্দা নূর হোসেন ওরফে চেয়ারম্যান, বন্দর থানার কুড়ি পাড়ার ওহিদুল জামান শালিম ওরফে শালিম ও ফতুল্লা থানার বাসরবাদের খান সুমন ওরফে বিট্টুকে অবৈধভাবে ভারতের অনুপ্রবেশের দায়ে বিদেশী আইনের ১৪ ধারায় মামলা করা হয়।

দেশে গণতন্ত্র নেই মানুষ মরে গেলেও বিচার চায় না

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, বর্তমানে দেশের মানুষ নিরাপদে নেই। দেশের মানুষ মরে গেলেও এখন বিচার চায় না। দেশে আইনের শাসন নেই। তিনি বর্তমান সরকারকে আমলাতান্ত্রিক সরকার উল্লেখ করে বলেন, দেশে এখন গণতন্ত্র নেই। আমলাতান্ত্রিকভাবে চলছে দেশ। ‘আর জোট নয়, ৪ দল থেকে ১৪ দল, সব দলই দেখেছি, সবাই আমার সঙ্গে বেইমানি করেছে। কেউ আমার দিকে ফিরে তাকায়নি। বিএনপি-আওয়ামী লীগ কারও কাছ থেকে কিছুই পাইনি। তাই দলকে সুসংগঠিত করে আগামীতে ৩০০ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে জাতীয় পার্টি।’ গতকাল চান্দিনা মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কুমিল্লা উত্তর জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এরশাদ বলেন, জোটগতভাবে নির্বাচন করার জন্য শর্তসাপেক্ষে বিএনপির ডাকে সারা দেয়ার পর বিএনপির যুবরাজ (তারেক রহমান) আমাকে তার হাওয়া ভবনে ডেকে নিয়ে নামমাত্র শর্তে স্বাক্ষর নেয়। আমার সহযোগিতায় ক্ষমতায় যাওয়ার পর আর কোন খবর নেয়নি। একইভাবে রাজধানীর পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলে যুক্ত হলাম। তারাও একই কৌশলে আমাকে হতাশ করেছে। এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর জোট নয়, আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে অংশ নেবে জাতীয় পার্টি। তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালে আমি ক্ষমতা ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে দেশের সব রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন করার আহ্বান জানাই। কিন্তু কোন রাজনৈতিক দল আমার ডাকে সাড়া দেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে ‘গ্রাম বাঁচলে, বাঁচবে দেশ’- স্লোগানে দেশের আপামর জনগণের সমর্থন নিয়ে জাতীয় পার্টি গঠন করি। তারপর থেকে রাজনৈতিক রোষানলে আমার জীবন কাটে কারাগারে। আমার প্রথম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলের জীবন স্কুল থেকে শুরু না হয়ে কারাগার থেকে শুরু হয়। ধ্বংস হয় তার ভবিষ্যৎ জীবন। এরশাদ বলেন, এখন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। মানুষ ঘর থেকে বের হতে সাহস পায় না। দেশের মানুষ ঘর থেকে বের হলে ঘরে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অহরহ ঘটছে খুন-গুম। কিন্তু আমার শাসন আমলে আমি মানুষ মারিনি। কুমিল্লা উত্তর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি লুৎফুর রেজা খোকনের সভাপতিত্বে এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ঢাকা মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি এস এম ফয়সাল চিশতী, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক নূরুল ইসলাম মিলন এমপি, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, কুমিল্লা উত্তর জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আমির হোসেন ভূঁইয়া এমপি প্রমুখ। পরে লুৎফুর রেজা খোকনকে সভাপতি ও মো. আমির হোসেন ভূঁইয়া এমপিকে সাধারণ সম্পাদক করে কুমিল্লা উত্তর জেলা জাতীয় পার্টির নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

বাড়ই পাড়ায় আতঙ্ক by মহিউদ্দিন অদুল ও হাফিজ উদ্দিন

আশুলিয়ায় নন্দন পার্কের সামনে রয়েছে আরও একখণ্ড নৈসর্গিক নান্দনিকতা। মহাসড়কের পাশঘেঁষা শালবনের শ্যামল ছায়ায় নিভৃত শান্ত পল্লী। বাড়ই পাড়া একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। পুলিশের ওপর একটি অতর্কিত দুর্ধর্ষ হামলার ঘটনা পালটে দিয়েছে এ এলাকার স্বাভাবিক জনজীবন। পুলিশি অভিযানে নিরীহ এলাকাবাসী আটক হওয়ার পর আতঙ্ক ও অবিশ্বাস কেড়ে নিয়েছে শান্তি আর স্বস্তি। বন্ধ হয়ে গেছে বহু পরিবারের জীবিকা। ঘটনার নয় দিন পরও বিরাজ করছে ভুতুড়ে নিস্তদ্ধতা। ফিরে আসেনি স্বাভাবিক কোলাহল। চিরচেনা কর্মব্যস্ততা। পুরো এলাকার অনিন্দ্য নৈসর্গিক নান্দনিকতা আজ বড়ই বিমর্ষ।
সাভারের আশুলিয়ার নন্দন পার্কের সামনের এলাকা পরিদর্শনে গেলে ভয়ে এড়িয়ে চলছিলেন স্থানীয়রা। লুকিয়ে পড়েছিলেন বেশ কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কিছুক্ষণ বাক্য ব্যয় করে তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক হতে হয়। দেলোয়ারা বেগম নামে এক মহিলা বলেন, ‘সত্য বলতে কী? এখন নতুন কাউকে দেখলেই ভয় হয়। কখন আবার জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ধরে নিয়ে যায়। স্যার, আপনাদের দেখেই ভয়ে আমাদের পেট কামড়িয়ে উঠছিল।’
গত ৪ঠা নভেম্বর সকালে সশস্ত্র পাঁচ পুলিশ সদস্যের ওপর ফিল্মি স্টাইলে আতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের কোপে নিহত হন শিল্প পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল মুকুল হোসেন। গুরুতর আহত হন অপর কনস্টেবল নূরে আলম ছিদ্দিক। সুস্থ হয়ে ওঠায় গত মঙ্গলবার সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। হামলার আকস্মিকতায় প্রতিরোধ গড়তে না পারায় সঙ্গে থাকা অপর তিন কনস্টেবল পিনারুজ্জামান, আপেল মাহমুদ ও ইমরান আজিজকে পরে বহিষ্কার করা হয়।
ওই দিন হামলার সময় ঘটনাস্থলের পাশে মায়ের দোয়া হোটেলে কর্মরত প্রত্যক্ষদর্শী বকুল মোল্লা বলেন, ঘটনার চিৎকার-চেঁচামেচি এবং হুড়োহুড়িতে আমিও দৌড়ে সরে পড়ি। পরে আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে পাই। এরপর পুলিশ নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। যারা অন্যায় করেছে তারা পালিয়ে গেছে। কিন্তু এখন হয়রানির শিকার হচ্ছি আমরা নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষ। এদিকে দোকান খোলতে পারছি না। আবার এক সপ্তাহ ধরে আমি খুবই অসুস্থ। তার পরও পুলিশের সন্দেহে পড়ার ভয়ে এলাকা ছাড়তে পারছি না।
সরজমিন দেখা যায়, ঘটনাস্থলটি ঢাকা ও গাজীপুর জেলার সীমানায়। গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার ‘স্বাগতম’ লেখা সাইনবোর্ডটি তা জানান দিচ্ছে। আশুলিয়ার নন্দন পার্কের বিপরীতে ঝুপড়ি দোকানগুলোর সামনেই এ হামলার ঘটনা ঘটে। গতকাল দেখা যায়, ছয়টি দোকানই অবহেলিত ও খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। সাইনবোর্ডের পাশের দোকানটির প্রবেশপথে ও কিছুটা মাঝখানে মুকুলের রক্তের দাগ এখনও রয়েছে। চৈত্রের খরতাপে বিলঝিল শুকিয়ে ফেটে যেমন চৌচির হয়ে যায়, তেমনই মানচিত্রের রূপ পেয়েছে তার শুকানো রক্তের ধারা। ছয় দোকানের এলোমেলো বেঞ্চগুলোতে ধোয়া-মোছা নেই। ধুলোবালির পুরো স্তরে স্বাভাবিক বর্ণ হারিয়ে ধূসর হয়ে গেছে সেগুলো। দোকানগুলোর পেছনে শালবন পেরিয়ে অর্ধশতাধিক পরিবারের বাস। মানচিত্রের মতো এঁকেবেঁকে চলা ওই বনের পাশ ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে বসতিগুলো। ঝুপড়ি দোকানগুলোর পাশ ও জঙ্গলের ভেতর দিয়েই ছিল তাদের চলাচলের মেঠোপথ। এখন সেই সংক্ষিপ্ত সহজ পথও কেউ ব্যবহার করছে না। দূরের পথ দিয়ে ঘুরে যাওয়া-আসা করছেন স্থানীয়রা। ওই স্থান থেকে ঢাকাগামী বাসগুলোর স্টপেজও কয়েক শ গজ দক্ষিণে বাড়ই পাড়া বাজারের কাছে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেখানে আগে একটি দোকান বন্ধ থাকলেও এ ঘটনার পর থেকে বাকি পাঁচটিও খোলেননি ব্যবসায়ীরা। নন্দন পার্কের সামনের ওই এলাকায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষের নিত্য আনাগোনা ছিল। নন্দন পার্কের অতিথি, গার্মেন্ট শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক এবং স্থানীয়দের খাওয়া-দাওয়া ও আড্ডায় মুখর থাকতো। ঘটনার পর থেকে চিরচেনা এই কোলাহল এখন আর নেই। বন্ধ হয়ে গেছে পাঁচ দোকানে কর্মরত ১২ পরিবারের জীবিকাও। মায়ের দোয়া ভাত হোটেলের মালিক শামসুল আলম বলেন, ঘটনার পর আমরা তিন পরিবারের আয়-রোজগারও বন্ধ। না খেয়ে থাকার অবস্থা।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার দিন পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য একাধিকবার ওই এলাকায় অভিযান চালায়। একদিন পর মধ্যরাতে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় পুলিশ ওই স্থান থেকে অনেককে আটক করেন। তবে শুভেচ্ছা হোটেলের মালিক মন্টু ও তার ভাই শওকত, বাসের লাইনম্যান ওমর ফারুক, স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম জালাল ও তার স্ত্রীকে এখন ছেড়ে দেয়া হয়নি। তারা এখনও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

ভারত, চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্কে ‘সুফল’ বেশি: লঙ্কান দূত

ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত লঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা। বলেন, ইন্ডিয়া ও চায়নার মতো বিশাল অর্থনীতির দু’টি দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। আমি মনে করি এখানেই আমাদের দুই দেশের (বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা) উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান। এ দু’টি দেশ কেবল এশিয়ায় নয়, বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার হিসাবে নিজেদের আসন করে নিয়েছে উল্লেখ করে হাইকমিশনার জানান. কোন একটি দেশের প্রতি না ঝুঁকে শ্রীলঙ্কা সব সময় দুই দেশের সঙ্গে ‘ভ্যালেন্স রিলেশন’ রাখার চেষ্টা করে। গতকাল কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্ট এসোসিয়েশন (ডিকাব)-এর মতবিনিময় বিষয়ক নিয়মিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ডিকাব-টক এ সংগঠনের সভাপতি মাসুদ করিম সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বশির আহমদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। হাইকমিশনার তার নির্ধারিত বিষয়ে দীর্ঘ বক্তৃতার পর উন্মুক্ত সেশনে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সেখানে কূটনৈতিক রিপোর্টাররা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ডিকাবের সঙ্গে লঙ্কান কোন হাইকমিশনারের প্রথম এমন আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়ে ইয়াসোজা গুনাসেকেরা বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাকে একই পরিবারের দুই সদস্য বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি তার দেশে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। দুই দেশের নানামুখি সম্ভাবনা, বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এখন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যা সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। বাণিজ্য সম্ভাবনা আরো দৃঢ় করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ সইয়ে তার দেশের প্রস্তুতির কথাও জানান হাইকমিশনার। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সামপ্রতিক একটি বক্তব্যের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে চুক্তিটি সইয়ে দুই পক্ষই সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করছে বলে জানান তিনি। লঙ্কার দূত বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ‘কাছাকাছি’ মন্তব্য করে দুইদেশের উষ্ণ সম্পর্কের বিষয়টি স্মরণ করেন। তার দেশের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও মত দেন। বাংলাদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণে তার দেশ বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে হাইকমিশনার জানান, ম্যানুফ্যাকচারিং, সার্ভিস, পর্যটন এবং পর্যটন সম্পর্কিত বিভিন্ন খাত, অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষি, ওষুধসহ অন্তত ১০টি খাতে লঙ্কায় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তিনি স্কয়ার ও বেক্সিমকোর মতো প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এমন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে তারা সব সময় প্রস্তুত রয়েছেন। লঙ্কান বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈষম্য কমাতে কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার সরকার এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিদ্যমান সম্পর্ক, বাণিজ্য ও সম্ভাবনাকে আরও জোরদারে ‘বঙ্গোপসাগর’কেন্দ্রিক যোগায়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম পোর্টের সঙ্গে লঙ্কার হাম্বানটোটা পোর্টের সংযোগ এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে ট্রেডিশনাল লিঙ্কগুলো রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ব্যবসা. বাণিজ্য তেমন একটা নেই। যা আছে তা সম্ভাবনার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। বাণিজ্য বাড়াতে বন্দর ও নৌ-রুটের সম্ভাবনাকে কিভাবে আরও বেশি কাজে লাগানো যায় বিশেষত যৌথ প্রডাকশন এবং যৌথ বিনিয়োগে উভয়ের উন্নতি নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার তাগিদ দেন হাইকমিশনার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার দেশের বর্তমান ঐকমত্যের সরকার দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা সংকট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে পেরেছে। তার দেশে এখন শান্তি, ঐক্য ও সংহতি ফিরে এসেছে। এ সময় ভারত ও নেপালের সম্পর্কের টানাপড়েন প্রশ্নে কোন প্রতিক্রিয়া দেয়া থেকে বিরত থাকেন লঙ্কান দূত। তবে তিনি নেপালেন সংবিধান প্রণয়ণের প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানের সমাপনীতে ডিকাব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অতিথিকে নিয়ে সংগঠনের বার্ষিক প্রকাশনা ‘বিয়ন্ড দ্য বাউন্ডারি-২০১৫’ এর মোড়ক উন্মোচন করেন।

রাজনীতিক মির্জা ফখরুল by ডক্টর তুহিন মালিক

এক. গ্রিক দার্শনিক Diogenes এক সময় হারিকেন লাগিয়ে দিনের বেলায় সৎ মানুষ খুঁজতেন। আমাদেরও বোধহয় এখন দিনের বেলায় হারিকেন দিয়ে সৎ মানুষগুলোকে খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপাদমস্তক সৎ, ভদ্র, মার্জিত, সজ্জন হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিতর্কের ঊর্ধ্বের একজন মানুষ। তার চরম শত্রুরাও তাকে মাস্তান বা বোমাবাজ বলে ভাবতে পারবে না। অথচ যথারীতি ৭ম বারের মতো তিনি এখন রয়েছেন কারাগারে। তার বিরুদ্ধে মামলার কোন অভাব নাই। অভিযোগেরও কোন সীমানা নাই। শত শত অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে অসংখ্য এজাহার দায়ের করা আছে অনেক আগেই। যখন যাকে জেলে ঢুকানো প্রয়োজন, তখন তাকে সেই অজ্ঞাত আসামি বানিয়ে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এবারও পল্টন থানায় কথিত নাশকতার তিন মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হলো। এনিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৬ দফায় ৩৩১ দিন কারাভোগ করেন তিনি। সর্বশেষ চলতি বছরের ৬ই জানুয়ারি গ্রেপ্তার হয়ে ১৮৯ দিন কারাগারে ছিলেন। জটিল রোগের সঙ্গে নিত্যদিন লড়াই করা ৬৮ বছর বয়সের এই সজ্জন, ভদ্র, পরিচ্ছন্ন মানুষটি নাকি বোমা মেরেছেন, গাড়িতে আগুন লাগিয়ে পোড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন! মিথ্যারও নিজের একটা চরিত্র আছে। সেটাকেও দেখি এখন হার মানিয়ে দেয়া হলো। একজন মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে পুরো রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে তাকে যেভাবে দমন-পীড়ন করা হচ্ছে তাতে আগামীর বাংলাদেশে সৎ রাজনীতির দুয়ার বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে যেন কারা নির্যাতনের ভয়ে ভদ্র, মার্জিত ও সৎ মানুষরা রাজনীতি ছেড়ে দিক? নির্যাতন-নিপীড়নের আতঙ্কে সমাজের ভালো মানুষরা রাজনীতিতে না আসুক? গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে জেলে জীবন হারানোর ভয়ে পরিবারের চাপে পড়ে এইসব ভালো মানুষরা রাজনীতিকে বিদায় জানাক?
দুই. বিএনপির শাসনামলে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সরকার পতনের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে ট্রাম্পকার্ডের ঘোষণা দিয়ে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করে তুললেও তাকে কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয়নি। কারণ দেশের কোন প্রধান রাজনৈতিক দলের মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদার কোন নেতাকে আসামি করে বিরতিহীনভাবে কারাগারে রাখার কোন নজির কখনও এদেশের রাজনীতিতে ছিল না। অথচ মির্জা ফখরুলের বেলায় সমস্ত গণতান্ত্রিক নীতিবোধ উপেক্ষা করে এহেন নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাইকোর্ট যতবার তাকে জামিন দিয়েছে ততবারই তাকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক করে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মহাসচিবকে এ ধরনের নিপীড়ন- নির্যাতনের ঘটনা একেবারেই নজিরবিহীন। এটা সৎ ও ভালো মানুষের রাজনীতির জন্যও চরম অশনিসংকেত বটে।
তিন. মির্জা ফখরুল আমাদের রাজনীতির খুবই অসময়ের একজন নেতা। বর্তমান রাজনীতিতে তিনিই সম্ভবত একমাত্র নেতা যাকে তার শত্রুরাও পর্যন্ত নিন্দা করার কোন ভাষা খুঁজে পাবে না। বাংলাদেশের মতো একটা নষ্ট রাজনৈতিক আবহাওয়ায় তিনি একজন বিতর্কমুক্ত সজ্জন, সৎ মানুষ। এই ভদ্র মানুষটির বড় সম্পদ তার শালীনতাবোধ ও চারিত্রিক মাধুর্যতা। একজন সাধারণ মানুষের প্রতি তার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধ থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের প্রতি তার ভদ্র ও মার্জিত প্রতিবাদ তাকে আর দশজনের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। যারা বলে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচার নেই, তাদের উচিত হবে মির্জা ফখরুলকে অনুসরণ করা। শত নির্যাতন, শত নিপীড়ন, শত হেয়প্রতিপন্নের পরও হাসিমুখে গণতন্ত্রের কথা এভাবে আর কে বলতে পারে? অথচ বিএনপির মতো প্রধান একটি দলের মহাসচিব হওয়ার মতো নেতা ছিলেন না তিনি। বড় মাপের রাজনৈতিক সংগঠক বা দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক না হয়েও তাকে দলের বিপদের সময় মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এটা দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমানের অন্যতম বড় একটা দুরদৃষ্টিসম্পন্ন সাফল্য ছিল বলে আজ প্রমাণিত হয়েছে। যে লোকটা বাম রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন, তিনিই আবার কেমন করে হয়ে গেলেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একজন বিমূর্ত আইকন? যে দলে অন্তর্কোন্দল, গ্রুপিং আর দুর্নীতিগ্রস্ত সুবিধাবাদীদের ছড়াছড়ি সেখানে ক্ষমতায় থাকাকালে মন্ত্রিত্বে থাকা এই মানুষটিকে দুর্নীতি বা অনিয়ম কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। তার ভদ্রতা, মেধা, শিষ্টাচার আর মিতভাষী তুখোড় বক্তৃতাই ভাবিয়ে তুলেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে। তাই তাকেই ঘায়েল হতে হলো সবচেয়ে বেশি। অবস্থা এমন যে, তাকেই যেন সবার আগে রুখতে হবে।
চার. আমাদের সুপ্রিম কোর্টের ২০০২ সালের সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র মামলার রায়ে বলা হয়েছে যে, ইতিমধ্যে আটক থাকা কোন ব্যক্তিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলে সেই আবেদন মঞ্জুরের আগে তদন্তের সব কাগজপত্রসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। কিন্তু মির্জা ফখরুলসহ বিএনপি-জামায়াতের এরকম শত শত নেতাকর্মীদের আদালতে হাজির না করেই শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে জেল গেট থেকেই গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। বৃটিশ কিংবা পাকিস্তানি শাসনামলে কিংবা এমনকি স্বৈরাচারী এরশাদের সময়ও এভাবে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকে নিপীড়ন করা হতো না। অথচ এখন যেভাবে প্রতিপক্ষ দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের হুকুমের আসামি করে জেলে ঢুকাচ্ছে তাতে আশঙ্কা হয়, আমাদের ভবিষ্যতের নেতারা কোন না কোন অপরাধের হুকুমের আসামি হয়ে নিশ্চিতভাবেই চিরজীবন জেলের ভাত খাবেন। বর্তমান এইসব মিথ্যা মামলাগুলো তখন আইনি নজির হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। ফলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়বে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতির উদাহরণ মির্জা ফখরুলের মতো সৎ, সজ্জন নেতাকে যেভাবে প্রতিহিংসার কারণে কারারুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে সভ্য সমাজের ভালো মানুষগুলো রাজনীতিতে আসতেও ভয় পাবে।
পাঁচ. মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণের হুকুমদাতা। অথচ সরকার বলছে দু’জন মোটরসাইকেল আরোহী সচিবালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। উদ্ভট ও যুক্তিহীন এইসব মিথ্যা অভিযোগে মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতাকে হুকুমের আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকানো হয়। কিন্তু সরকারের কথিত সেই ‘দুইজন মোটরসাইকেল আরোহী’ আজও গ্রেপ্তার হয়নি। এমনকি তাদেরকে শনাক্ত পর্যন্ত করা হয়নি। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে সরকার তাদের হুকুমদাতাদের কিভাবে শনাক্ত করতে পারলো? সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মোটরসাইকেল চালিয়ে বোমা ফাটিয়ে বীরদর্পে প্রস্থান করার যোগ্যতা কারা রাখে, তা কিন্তু জনগণ ঠিকই বুঝে। তাছাড়া, মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর যে মামলা দেয়া হয়েছে সেই মামলায় যে ড্রাইভারকে বাদী করে মামলা দেয়া হয়েছিল, সে ড্রাইভার নাকি ঘটনাস্থলে ছিলই না। মীর্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, তিনি অবরোধ কর্মসূচিতে জনগণের সহযোগিতা চেয়েছিলেন এবং রাস্তায় গাড়ি না চালাতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, ১৭৩ দিন হরতাল নৈরাজ্য করার কারণে হুকুমের আসামি করে তো তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বা শীর্ষ নেতাদের জেলে ঢুকানো হয়নি।
ছয়. শারীরিকভাবে অসুস্থ মির্জা ফখরুলের একের পর এক কারাগারে প্রেরণের ফলে অসুস্থ এই মানুষটি ১৬ কেজি ওজন হারিয়ে জীর্ণসার দেহে কারা প্রকোষ্ঠে শারীরিক ব্যাধির সঙ্গেও লড়ে যাচ্ছেন। কিছুদিন আগে হৃদরোগসহ ঘাড়ে ক্যারোটিড আর্টারিতে ব্লক নিয়ে দীর্ঘ কারাভোগের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে প্রথমে সিঙ্গাপুরে, পরে আমেরিকায় চিকিৎসা নেন। কিন্তু তার আর্টারির ব্লকটির অবস্থান খুবই জটিল হওয়ায় অপারেশন করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানায় চিকিৎসকরা। এ অবস্থায় কারাগারে সুচিকিৎসার অভাবে তার জীবনহানির উদ্বেগ জানিয়ে স্ত্রী রাহাত আরা আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কার কাছে বিচার চাইবো?’
সাত. গ্রিক দার্শনিক এরিস্টেটল বলেছিলেন ’উৎকৃষ্ট জীবন লাভের জন্য কোন সমাজের সংগ্রামের নাম হচ্ছে রাজনীতি।’ আপদমস্তক নির্ভীক সৎ মানুষ মির্জা ফখরুল দেশকে উৎকৃষ্ট জীবন দান করতে এভাবে আর কতদিন জেল খাটবেন? আর কতটা অসুস্থ শরীর নিয়ে সংগ্রাম করলে এই সমাজ উৎকৃষ্ট একটা জীবন পাবে? আর কতটা নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করলে দেশ গণতন্ত্র ফিরে পাবে? মির্জা ফখরুল একজন দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সজ্জন ব্যক্তি। তিনি পরমতসহিষ্ণু উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চা করে বিএনপিকে সঠিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর সরকার এটাই চাচ্ছে না। তারা চাচ্ছে নিপীড়ন-নির্যাতন, গুম-খুন করে দেশকে ব্যর্থ, অস্থিতিশীল ও গণতন্ত্রহীন করে তোলা। কিন্তু এভাবে নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-গ্রেপ্তার, খুন-গুম চলতে থাকলে ঠিকই একসময় এই মির্জা ফখরুলরাই হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের জনগণের ক্রান্তিকালের গণমানুষের একেকজন মুক্তিকামী নেতা।
লেখক: আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com