Wednesday, February 11, 2026

পশ্চিম তীর দখলে ইসরায়েলের তৎপরতার বিরোধিতা–সমালোচনা

প্রকাশ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে ইসরায়েল। এ লক্ষ্যে নতুন কিছু আইনের অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এমন খবর আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সংগঠন। এর বিরোধিতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের গত রোববারের খবর অনুযায়ী, নতুন আইনে দখল করা পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জন্য জমি কেনা আরও সহজ হবে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর আইন প্রয়োগের জন্য আরও ক্ষমতা পাবেন ইসরায়েলিরা। পাশাপাশি ধর্মীয় কিছু স্থাপনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারবে ইসরায়েল। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের এলাকায় কার্যক্রম জোরদারও করতে পারবে তারা।

এরই মধ্যে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচের দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দেওয়া অব্যাহত রাখব।’ গাজা ও দখল করা পূর্ব জেরুজালেম ছাড়াও পশ্চিম তীর নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চান ফিলিস্তিনিরা। পশ্চিম তীরের বেশির ভাগ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকি অল্প কিছু এলাকায় পশ্চিম–সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের খুবই সীমিত স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। পশ্চিম তীরে প্রায়ই ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে ভয়ংকর পদক্ষেপ

পশ্চিম তীরের বিরজেইত থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা নিদা ইব্রাহিম বলেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য এটি ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়ংকর পদক্ষেপ। ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখলের পর থেকে এটি ইসরায়েলের নেওয়া সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনিদের যে জমি রয়েছে, তার মালিক হতে পারবেন ইসরায়েলিরা।

নিদা ইব্রাহিম বলেন, ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীদের জমি মালিকানা পাওয়া বা বাড়ি নির্মাণ করা অবৈধ। কারণ, এসব আইনে দখলদার শক্তিকে দখল করা এলাকায় নিজ দেশের নাগরিকদের স্থানান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পুরো পশ্চিম তীরকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের পর অবিলম্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কার্যালয়। এক বিবৃতিতে কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত খুবই বিপজ্জনক। ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারি বৃদ্ধির বৈধতা দিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আট মুসলিম দেশের নিন্দা

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আট দেশ সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। দেশগুলো হলো হলো মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তারা বলেছে, ইসরায়েলের পদক্ষেপের লক্ষ্য—অবৈধ বসতি স্থাপন আরও পাকাপোক্ত করা। পশ্চিম তীরে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া।

ইসরায়েলি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে পশ্চিম তীর দখলের চেষ্টা আরও বেগবান করা এবং সেই সঙ্গে ফিলিস্তিনের জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাতের পথ তৈরি করা হচ্ছে বলেও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে আট দেশ।

ট্রাম্পের বিরোধিতা


পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারি সম্প্রসারণের নতুন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, গত সোমবার হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, পশ্চিম তীর স্থিতিশীল থাকলে ইসরায়েলও নিরাপদ থাকে। এটা ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি পদক্ষেপে সম্মত নন ট্রাম্প।

ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করছে এবং ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক’ সমাধানের (ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকট) সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন মহাসচিব গুতেরেস।

এদিকে ইসরায়েলকে পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সরকার বলেছে, ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তরাজ্য দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানায়। ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত গঠন একতরফাভাবে পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

পশ্চিম তীরের তুবাস এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান
পশ্চিম তীরের তুবাস এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিশ্বজুড়ে রাঘববোয়ালদের ফাঁসানো এপস্টেইন কি ইসরায়েলি চর ছিলেন by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

সম্প্রতি নতুন প্রকাশিত এপস্টেইন নথিতে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা মহলের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রকাশ হওয়া এফবিআইয়ের স্মারক, ই-মেইল ও তাঁর আইনি সুরক্ষার ধারাবাহিকতা এ প্রশ্ন জোরালো করেছে—এপস্টেইন কি দীর্ঘদিন কোনো রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা বলয়ের ছায়ায় ছিলেন?

জেফরি এপস্টেইনের পরিচয় শুধু একজন ভয়ংকর যৌন অপরাধী হিসেবেই নয়; তিনি এ কালের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও প্রভাবের অন্ধকার জগতের প্রতীকও হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি এ অন্ধকারকে আরও গভীর করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ছাড়াও অনেক বিলিয়নিয়ার ও রাজপরিবারের সদস্যের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্কের বিষয়টি আগেই নথিভুক্ত হয়েছে। তবে নতুন নথিপত্র (গত শুক্রবার প্রকাশিত) ইসরায়েলের রাজনৈতিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে তাঁর অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নতুন করে আলোকপাত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।

এপস্টেইনের কর্মকাণ্ড আর এর আড়ালে থাকা সম্পর্কের প্রশ্ন এখন আর শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি তুলে ধরেছে রাষ্ট্রীয়, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা এবং কয়েক দশক ধরে চলা সুরক্ষিত দায়মুক্তির রহস্যও।

যৌন নিপীড়নের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এপস্টেইন ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান। যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে নারীদের পাচারের অভিযোগে আরেকটি মামলায় বিচারকাজ চলা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার এক দশকের বেশি আগে এপস্টেইন অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ জন্য তাঁকে যৌন নিপীড়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এমন মেয়েদের নিয়ে যৌনবৃত্তির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।

এপস্টেইনের নিউইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে সস্ত্রীক এহুদ বারাক

২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এহুদ বারাক ও তাঁর স্ত্রী নিলি প্রিয়েল একাধিকবার নিউইয়র্কে এপস্টেইনের অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন। এপস্টেইন ফাইলসে উল্লেখ করা ই-মেইলগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইনের সহকারী লেসলি গ্রফ ঘর পরিষ্কার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ভ্রমণ পরিকল্পনার মতো প্রাত্যহিক বিষয় সমন্বয় করতেন।

এহুদ বারাক ২০০৩ সাল থেকে এপস্টেইনকে চেনেন বলে স্বীকার করেছেন। এমনকি ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে এপস্টেইন দণ্ডিত হওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। তবে এহুদ বারাক কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বা দেখার কথা বারবার অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এপস্টেইন একজন নিবন্ধিত যৌন অপরাধী হওয়ার কয়েক বছর পরও তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ জনমনে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এফবিআইয়ের স্মারক ও মোসাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

২০২০ সালের একটি এফবিআই স্মারকে বিস্ফোরক সব তথ্য পাওয়া গেছে। মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব নিয়ে তদন্তের সময় তৈরি করা ওই স্মারকে এক গোপন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন এবং ধারণা করা হয় মোসাদের একজন নিয়োগকৃত এজেন্টও ছিলেন।

স্মারকে আরও বলা হয়, এপস্টেইন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বারাক ক্ষমতায় থাকাকালে এপস্টেইন তাঁর অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের অংশ হিসেবে শুক্রবার এ স্মারকও প্রকাশ করা হয়।

যদিও এ স্মারক কোনো বিচারিক রায় নয় এবং গোপন সূত্রের ওপর নির্ভরশীল; তবে এটি এফবিআইয়ের দাপ্তরিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয় প্রমাণ করে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল।

এপস্টেইন ও বারাকের মধ্যে ই-মেইল চালাচালিতেও মোসাদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। ২০১৮ সালের এক বার্তায় এপস্টেইন বারাককে প্রকাশ্যে এটি স্পষ্ট করতে বলেছিলেন যে তিনি (এপস্টেইন) ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেন না।

এফবিআইয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, সাবেক ফেডারেল কৌঁসুলি অ্যালেক্সান্ডার অ্যাকোস্টাকে নাকি বলা হয়েছিল, এপস্টেইন গোয়েন্দা সংস্থার (ইসরায়েলি) লোক। অ্যাকোস্টা প্রকাশ্যে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত না করলেও এটি বছরের পর বছর ধরে চর্চিত হয়ে আসছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে কৌঁসুলিরা এপস্টেইনের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেন। ফলে তিনি ফেডারেল মামলার হাত থেকে রেহাই পান। ওই মামলায় তাঁর আজীবন কারাদণ্ড হতে পারত। তবে তা না করে তাঁকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ সময় এপস্টেইনকে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন অফিসে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৩ মাস পর তাঁকে প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয়।

মায়ামি হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাকোস্টা এমন একটি চুক্তি করেছিলেন, যেন এপস্টেইনের অপরাধের প্রকৃত মাত্রা চাপা পড়ে এবং আরও ভুক্তভোগী বা প্রভাবশালী জড়িত ব্যক্তিদের খোঁজে এফবিআইয়ের তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটি একে ‘শতাব্দীর চুক্তি’ বলে উল্লেখ করে।

এ কেলেঙ্কারির জেরে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাকোস্টা পদত্যাগ করেন। যদিও তিনি দাবি করেছিলেন, এই চুক্তি হওয়ার কারণে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও এপস্টেইনের কারাদণ্ড হয়েছিল।

ট্রাম্প, কুশনার ও ইসরায়েলের প্রভাব

নতুন প্রকাশিত নথিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অন্তত ১ হাজার ৮০০ বার এসেছে। ট্রাম্প কোনো ধরনের অপরাধের কথা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এপস্টেইন–কাণ্ডে কোনো অভিযোগও আনা হয়নি।

তবে এফবিআইয়ের স্মারকে অভিযোগ করা হয়েছে, ট্রাম্প ‘ইসরায়েলের মাধ্যমে এ বিষয়ে আপস করেছিলেন’ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে নিযুক্ত করেন। স্মারকে কট্টর অর্থোডক্স ‘চাবাদ-লুবাভিচ’ আন্দোলনের ভূমিকার কথাও বলা হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মতাদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এদের। কুশনারকে এ গোষ্ঠীর সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েল

ই-মেইলগুলো থেকে আভাস পাওয়া যায়, এপস্টেইন ইসরায়েলকে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও দেখতেন। একটি বার্তায় এপস্টেইন দাবি করেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইসরায়েল সফরের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তবে ভারত সরকার এ দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যান্য নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন ইসরায়েলি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পশ্চিমা ক্ষমতাধরদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করতেন। নথিতে তাঁকে এমন এক অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; যিনি প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে কাজ করতেন।

কেন এপস্টেইন–কাণ্ডে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ

এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অন্য সব প্রভাবশালীর তুলনায় আলাদা। কারণ, এটি ছিল কয়েক দশকের ধারাবাহিক সম্পর্ক। অফিশিয়াল নথিতে বারবার মোসাদের নাম আসা ও এপস্টেইনের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার বিষয়টি একটি বিশেষ প্যাটার্ন তৈরি করেছে। কোনো আদালত এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে এপস্টেইন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেছেন। তবে নথিপত্র, ই–মেইল ও স্মারকের স্তূপ একটি সিদ্ধান্তের দিকেই ইঙ্গিত করে—এপস্টেইন একা ছিলেন না; বরং গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি সুরক্ষিত বলয়ের ভেতরে ছিলেন। তাই লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথি এখন জনগণের সামনে আসার পর মূল প্রশ্নটি আর এটি নেই যে এপস্টেইনের শক্তিশালী বন্ধু ছিল কি না; বরং প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতাই কি তাঁর অপরাধগুলো এতকাল আড়াল করে রেখেছিল?

[তথ্যসূত্র: দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকল, বিবিসি, সিএনএন ও দ্য মিডল ইস্ট আই]

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-03%2Fvn52ulm3%2FEpstain-Trump-1.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভালো’ আলোচনার পরও উত্তেজনা কেন by আব্বাস নাসির

ওমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ার পর প্রথমে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—দুজনই আলোচনাকে ‘ভালো’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এখনো ধারালো ছুরির ফলার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ইরান থেকে এক হাজার কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করছে এবং প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আরও অন্তত একটি ক্যারিয়ার গ্রুপ এই অঞ্চলে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তার বহু আকাশপথের সামরিক সম্পদও এই অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে এনে জড়ো করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানিয়েছে, এ ধরনের সামরিক শক্তি প্রদর্শন আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে না। ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডাররা স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের আঙুল এখনো ট্রিগারের ওপর রয়েছে।

এ সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার জন্য প্রস্তাবিত চুক্তির একটি খসড়া প্রকাশ করে আল-জাজিরা। তাদের দাবি অনুযায়ী কাতার, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীরা খসড়াটিকে উভয় পক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী ইরান তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রাখবে; এরপর সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ১ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ করবে। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত একটি তৃতীয় দেশে হস্তান্তর করা হবে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রস্তাবটিতে ইরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু না করার অঙ্গীকার করতে হবে এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র বা প্রযুক্তি হস্তান্তর না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তবে কোনো পক্ষই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। বিস্ময়করভাবে খসড়াটিতে এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী দেবে (বিশেষ করে ধ্বংসাত্মক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি), সে সম্পর্কে কিছু উল্লেখ নেই।

ইরান তুরস্কে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়, যদিও কাতার, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকেও এ প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তেহরান এই অবস্থানে অনড় থাকে যে আলোচনা সেখান থেকেই শুরু হতে হবে, যেখানে তা থেমে গিয়েছিল (যখন গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালায়)।

আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘খারাপ বিশ্বাসে’ ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল, সেটিই শুধু তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেনি; ২০১৫ সালের যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) নিয়ে অভিজ্ঞতাও ইরানের অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। ওই চুক্তির আওতায় ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখতে সম্মত হয়েছিল। সে সময় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আব্বাস আরাগচি ছিলেন এই চুক্তির প্রধান স্থপতিদের একজন।

ওবামা প্রশাসনের সময় পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। কিন্তু সীমিত যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা প্রত্যাহার করেন। ইসরায়েলের বর্ণবাদী রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করে তিনি একতরফাভাবে চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেন এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির আওতায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

পরবর্তী পাঁচ বছরে ইরান ধীরে ধীরে তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। একপর্যায়ে ইউরেনিয়াম প্রায় অস্ত্র-মান (৬০ শতাংশের বেশি) পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকারও সীমিত করে। সাবেক পেন্টাগন উপদেষ্টা ও খ্যাতিমান পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ থিয়োডর পোস্টল বলেন, ইরানকে একটি অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইসরায়েলি চাপ সত্ত্বেও সব পক্ষই শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করবে, যদিও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কিছু করতে চাপ দিচ্ছে, যা সে নিজে করতে পারছে না। কারণ, তাদের অতিরঞ্জিত ও হত্যাপ্রবণ সামরিক যন্ত্র মূলত নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতেই বেশি পারদর্শী।

* আব্বাস নাসির, ডন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক
- ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

একের পর এক গণহত্যা: কতবার পার পাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা by মং জার্নি

প্রকাশ ১৭ মার্চ ২০২৩ঃ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারে মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা সরকার যে পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক চাপ থেকে মুক্তির একটি ফন্দি ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।

আপাতভাবে মিয়ানমারের সামরিক নেতারা ভেবে নিয়েছেন, একের পর এক জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে তারা যে মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ করে চলেছেন, সেটি তাঁরা নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যেতে পারবেন। গণহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তাঁরা নিষ্ঠুর কৌশল প্রয়োগ করে এড়িয়ে চলেছেন। সর্বশেষ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রহেলিকা সৃষ্টি করে জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোকা বানাতে চাইছে।

কিন্তু জার্মানির নাৎসি, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো ও কম্বোডিয়ার খেমার রুজ শাসকদের পরিচালিত গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে যেভাবে হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরাও রোহিঙ্গাসহ একাধিক জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অপরাধের ঘটনায় পার পাবেন না। নাৎসি শাসকেরা ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা-কর্মী, কমিউনিস্ট, জার্মান প্রতিবন্ধী, সমকামী, ইহুদি, রোমা ও সিন্থিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল। ১৯৬০-এর দশকে সুহার্তো সরকার কমিউনিস্ট তকমা দিয়ে ইন্দোনেশিয়ান ও চীনাদের বিরুদ্ধে আর খেমার রুজরা ১৯৭০-এর দশকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, চ্যাম মুসলিম ও খেমার বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া এখন চলমান। কিন্তু মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত মিয়ানমারের সেই একই সামরিক নেতৃত্ব নতুন করে একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করে চলেছে। মিয়ানমারের কারেননি, কারেন, কাচিনসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, কেন্দ্রস্থলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা অভ্যুত্থানবিরোধী, তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রকাশ করেছে। জেনেভাতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৫২তম অধিবেশনে সংস্থাটির হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়েছে—
‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে একটি কৌশল সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। সেটা হলো গ্রামগুলো ও মানুষের বাড়িঘরগুলো পদ্ধতিগতভাবে ও বিস্তৃতভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রেখে জাতিসংঘ প্রতিবেদন বলছে যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশজুড়ে সামরিক অভিযানে (এর মধ্যে ২০১১ সালে কাচিনের ও ২০১৭ সালে রাখাইনের ঘটনা রয়েছে) অন্তত ৩৯ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’

মাত্র পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে যায়। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশে চলে যায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যেভাবে শত শত গ্রাম পুরোপুরি জ্বালিয়ে দেয়, তা থেকে জীবন বাঁচাতেই তারা পালিয়ে যান। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে মিয়ানমারের সেই একই সামরিক বাহিনী একই কৌশল প্রয়োগ করে চলেছে। মিয়ানমারের ৮০ শতাংশ এলাকাজুড়ে যে সংঘাত চলছে, সেসব এলাকায় ১৩ লাখের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ধর্মীয় পরিচয়ে বৌদ্ধ নয় কিংবা জাতিগত পরিচয়ে বর্মিজ নয়, এমন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জঘন্য ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৃশংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরেই তারা এটা করে চলেছে। কিন্তু এবারের সামরিক শাসকেরা নতুন যেটা করছেন, তা হলো ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ব্যাপক অজনপ্রিয় অভ্যুত্থানের সমালোচনা বা বিরোধিতা যেসব গোষ্ঠী করেছে, তাদেরকে তারা ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল মিয়ানমার নিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশের এক সপ্তাহ পর কারেননি ও স্যাগায়িং অঞ্চল থেকে আসা অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সেখানকার জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জান্তারা যে ভয়ংকর নৃশংসতা চালিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তারা। বিমান থেকে গোলাবর্ষণ, মর্টার সেল নিক্ষেপ ও গণহত্যা করেছে। পুরো গ্রাম ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।

জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু কারেননিরা বংশানুক্রমিকভাবে থাইল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বাস করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এই জাতিগোষ্ঠীর বেসামরিক নাগরিক ও তাদের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে উপর্যুপরি হামলা চালায়। এর ফলে তাদের প্রায় অর্ধেক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্যাগায়িং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছাকাছি অবস্থিত। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

মিয়ানমারের সেনারা এখন সংঘাত-কবলিত এলাকায় নিয়মিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করছে। সেসব কাটা মাথা তারা জনসম্মুখে প্রদর্শন করছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দা নয়, অভ্যুত্থানবিরোধী সমস্ত জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানোর জন্য তারা সেসব বিচ্ছিন্ন মাথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। থাইল্যান্ডের সীমানাসংলগ্ন কারেননি ও কারেন অঞ্চলের জাতিগত সংখ্যালঘুদের গ্রামগুলোতে খবার পানির কুয়াগুলোতে বিষও মিশিয়ে দিয়েছে তারা।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে ৩৯ হাজার বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। কিন্তু অন্যান্য বেসামরিক ও ধর্মীয় স্থাপনা যেমন হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বৌদ্ধমঠ, চার্চ, মসজিদ, খাদ্য ও ধান সংরক্ষণের গুদাম ও হাটবাজার তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেগুলো এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে ধরনের জাতিগত নির্মূলের শিকার হয়েছিল, তার সঙ্গেই কেবল চলমান ধ্বংসযজ্ঞের তুলনা চলে।

কিন্তু নানা পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর (গণতন্ত্রকামী ও ভিন্নমতালম্বী এবং তাদের জাতিগোষ্ঠী এবং অভ্যুত্থানবিরোধী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী) বিরুদ্ধে যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে, সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুঁশিয়ারি আমরা শুনছি না। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা জানে যে গণহত্যা সনদ অনুসারে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন।

কিন্তু গণহত্যার সংজ্ঞা নাৎসি গণহত্যার আগে নির্ধারণ করা হয়েছে। পোল্যান্ডের ইহুদি আইনবিশারদ র‌্যাফেল লেমকিন গণহত্যার যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন, তাতে গণহত্যা বলতে শুধু নির্দিষ্ট পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বোঝানো হয়নি। লেমকিনের এই ধারণা যখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গণহত্যাবিষয়ক সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন মাত্র চার ধরনের বিষয় তাতে ঠাঁই পায়। জাতি, বর্ণ, গোত্র ও ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই গণহত্যার সংজ্ঞাটি প্রযোজ্য। কিন্তু গণতন্ত্রী, ভিন্নমতাবলম্বী, কমিউনিস্ট—এ ধরনের ভিন্ন পরিচয়ের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য হয় না।

বার্মিজ মানবাধিকারকর্মী ও নির্বাসনবিশেষজ্ঞ হিসেবে এক দশক আগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ধ্রুপদি গণহত্যার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রথম ফাঁস করেছিলাম। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি নির্মূল করার জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের ওপর তিন বছর ধরে পদ্ধিতগত নিপীড়ন চালিয়েছিল।

অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি শুনে এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে কৌশল প্রয়োগ করছে তার অসংখ্য নথি ঘেঁটে, আমি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছি যে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের গণহত্যাকারী সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ যেভাবে অস্বীকার করে চলেছে এবং এ অপরাধের পক্ষে যেভাবে সাফই গেয়েছে, নতুন গণহত্যার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা সেটার পুনরাবৃত্তি করবে। এ দফায় তারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গণতন্ত্রপন্থী, ভিন্নমতাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জাতিগত সংখ্যাগুরু বামার এবং সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করে চলেছে।

মং জার্নি, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী
- ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনোজ দে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-03%2F63f29e11-d4ee-432b-9708-1f3dcbca5313%2Frohingya_myanmar.jpg?rect=126%2C0%2C1347%2C898&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কৌশল হলো তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে

‘আমরা সৎ, তাই চাঁদাবাজি হবে না’—এই যুক্তির বাস্তবতা কী? by আহমাদ শাব্বীর

বাংলাদেশে চাঁদাবাজি নিয়ে কথা উঠলে সাধারণত একটি দৃশ্যই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে—কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় লোকাল পাতিনেতা বা সংঘবদ্ধ মাস্তান চক্র বেআইনিভাবে সাধারণ ব্যবসায়ী, দোকানদার ও হকারদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করছে। আর চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের জীবন-জীবিকার ওপর হুমকি নেমে আসছে।

এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন এই দৃশ্য দিয়েই আমরা পুরো চিত্রটা বোঝার চেষ্টা করি। তখন আমাদের অজান্তেই মনে হয়—চাঁদাবাজি ঘটছে কেবল কিছু ‘খারাপ মানুষ’ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে বলে। আর সেই ‘খারাপ মানুষের জায়গায়’ কিছু ‘ভালো মানুষ’ বসিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, কিংবা শুধু ক্ষমতাধর মানুষের নৈতিক ব্যর্থতার ফলও নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, দলীয় রাজনীতি, আমলাতন্ত্র এবং বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ভেতরে গেঁথে থাকা একটি দুষ্টচক্র।

এই দুষ্টচক্রে চাঁদাবাজি শুধু বেআইনিভাবে পেশিশক্তির জোরে কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তির কাজ নয়। বাস্তবে চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ ঘটে আইনের দোহাই দিয়ে—আইনের রক্ষক ও প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই। ফলে এই দুষ্টচক্র কীভাবে কাজ করে তা না বুঝে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে, কিংবা একপক্ষীয়ভাবে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের টার্গেট করলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে, ভিন্ন রূপে।

চাঁদাবাজি কেন কারণ নয়, বরং ‘উপসর্গ’

বাংলাদেশে চাঁদাবাজিকে প্রায়ই অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—যেন চাঁদাবাজি থাকায় ব্যবসা বাড়ছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না, রাষ্ট্র কাজ করছে না। কিন্তু বাস্তবে চাঁদাবাজি জন্মায় ঠিক উল্টো পরিস্থিতিতে। যখন অর্থনীতি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না; রাষ্ট্র যখন নিয়ম বানালেও তা দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যার সঙ্গে খাপ খায় না; যখন আইনের প্রয়োগ বেছে বেছে হয়; আর যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে যে অঘোষিত অর্থ ছাড়া দল চালানো কঠিন—ঠিক তখনই চাঁদাবাজির জন্ম হয়।

এই অর্থে চাঁদাবাজি কোনো রোগ নয়; এটি রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ। তাই উপসর্গ দূর করে রোগ সারানোর চেষ্টা করলে মূল সমস্যা দূর হয় না। বরং একই রোগ ভিন্ন রূপে, কিংবা আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে। কারণ, রাষ্ট্র বা আমলাতন্ত্র যখন অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, কিংবা নিয়মতান্ত্রিক অর্থনীতি তাদের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না, তখন একটি অনানুষ্ঠানিক ও চাঁদানির্ভর বিকল্প শৃঙ্খলাব্যবস্থার জন্ম হয়।

এই ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে শোষণমূলক ও বেআইনি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একধরনের বিকৃত শাসনব্যবস্থা তৈরি করে, যা কিছু মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ ও ন্যূনতম শৃঙ্খলা বজায় রাখে। মনে রাখা দরকার—এই ব্যবস্থা শুধু চাঁদাবাজদের জীবিকার উৎস নয়; বহু দরিদ্র ও অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন মানুষও এই অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। এই বাস্তবতা বুঝতে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি—যা দেশের মোট জিডিপির বড় একটি অংশ জোগান দেয়—কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা জরুরি।

ইনফরমাল অর্থনীতি: যেটা না বুঝলে কিছুই বোঝা যাবে না

বাংলাদেশের শহুরে অর্থনীতির একটি বড় অংশ চলে রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুনের বাইরে, অর্থাৎ ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিকভাবে। ফুটপাতের হকার, সরকারি জায়গায় ছোট দোকান, লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশা চালক, নানা ধরনের অস্থায়ী ব্যবসা—এই কাজগুলোর বেশির ভাগই সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করে, যদিও আইনের চোখে এগুলোর অনেকটাই বেআইনি। বাস্তবতা হলো, লাখ লাখ মানুষ এই কাজগুলোর ওপর নির্ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করে।

প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের চোখে বেআইনি এই অর্থনীতি আইন ও রাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে টিকে থাকে? এর উত্তর অস্বস্তিকর। ইনফরমাল অর্থনীতিতে একটি অলিখিত বণ্টনব্যবস্থা কাজ করে। কে ফুটপাতে বসবে, কে বসবে না; কোন স্ট্যান্ডে কার গাড়ি চলবে; কোন এলাকায় কোন দোকান থাকবে—এই সিদ্ধান্তগুলো আইন দিয়ে নয়, বরং বহুস্তরীয় সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক হয়। এই সমঝোতার বিভিন্ন স্তরে লোকাল মাস্তান, দলীয় কর্মী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা থাকে। আর এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রেই থাকে চাঁদা।

চাঁদা এখানে শুধু টাকা আদায় নয়; এটি কার্যত কাজ করার অনুমতি পাওয়ার একটি অঘোষিত মূল্য। নিয়মিত এই মূল্য দিতে পারলে একজন অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন মানুষ এমন কাজ বা ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, যা আইনের চোখে বেআইনি হলেও তার টিকে থাকার জন্য জরুরি। চাঁদার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া ইকোসিস্টেমের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র তার আইনকানুনের কঠোর প্রয়োগ শিথিল করে, আর দরিদ্র ও বেকার মানুষ সীমিত হলেও জীবিকার সুযোগ পায়।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার। চাঁদা নিঃসন্দেহে অনৈতিক ও বেআইনি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে রাষ্ট্রের বহু নিয়মকানুন সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবন ও জীবিকার কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় এসব নিয়ম পাশ কাটিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদা দেওয়া সেই চেষ্টারই একটি উপায়।

এই কারণে চাঁদাবাজি সব সময় একপক্ষীয় জোর-জবরদস্তির বিষয় নয়; অনেক ক্ষেত্রেই নেওয়া-দেওয়ার মধ্যে একটি অলিখিত বোঝাপড়া থাকে। সুতরাং যত দিন রাষ্ট্রের নিয়মকানুন ও সম্পদে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত না হবে, তত দিন চাঁদাবাজি সমস্যার স্থায়ী সমাধান বেশ কঠিন।

রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সামগ্রিক পরিবর্তন ছাড়া চাঁদাবাজি বন্ধ হলে কী হয়—একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন

ধরা যাক, আগামীকাল থেকে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ বা আমলাতন্ত্র—কেউ আর চাঁদা নিচ্ছে না। কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়মকানুন আগের মতোই রয়ে গেছে। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক এবং রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।

এই অবস্থার অনিবার্য পরিণতি হবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি। কারণ, এত দিন চাঁদানির্ভর ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা রেখে আইনের প্রয়োগ শিথিল করত। চাঁদা বন্ধ হলে সেই সমঝোতা ভেঙে যাবে, এবং প্রশাসন বেআইনি কর্মকাণ্ডের অজুহাতে কঠোর আইন প্রয়োগ শুরু করবে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ফুটপাতে বসা হকার, রিকশাচালক এবং নানা ধরনের অস্থায়ী ব্যবসার ওপর। এসব কাজ বন্ধ বা ব্যাহত হবে। অর্থাৎ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সহজেই পরিণত হবে ইনফরমাল অর্থনীতিবিরোধী অভিযানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ। কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, শহরে অস্থিরতা বাড়বে।

এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে নতুন নয়। ‘আইনের শাসন’ বা দুর্নীতি দমনের নামে অতীতেও এমন বহু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দমনমূলক হয়েই থেকেছে।

রাষ্ট্রীয় চাঁদাবাজি: যেটা নিয়ে আমরা কম কথা বলি

আমরা সাধারণত চাঁদাবাজি বলতে বুঝি আইনের বাইরে থেকে প্রভাবশালীদের পেশিশক্তি দিয়ে টাকা আদায়। এই ধারণা আংশিক সত্য হলেও সম্পূর্ণ নয়। বাস্তবে সবচেয়ে ভয়ংকর চাঁদাবাজির বড় অংশই ঘটে আইনের দোহাই দিয়ে।

বাংলাদেশে যাঁরা ব্যবসা করেছেন, তাঁরা জানেন—নিয়ম মেনে ব্যবসা করা কতটা কঠিন। লাইসেন্স, অনুমোদন, মাননিয়ন্ত্রণসহ অসংখ্য টেকনিক্যাল শর্ত পূরণ করতে হয়। এই শর্তগুলো পূরণ করতেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধীর গতি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবসা করতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হয়।

অর্থাৎ আপনি অনিয়ম ছাড়াই ব্যবসা করতে চান—এটাই সহজ কাজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ব্যবসায়ী যতই আইন মানার চেষ্টা করুক, রাষ্ট্র যদি তার কাছ থেকে টাকা তুলতে চায়, আইনের ভেতরেই তার পথ বের করা কঠিন নয়। ফলে জরিমানা, মামলা বা সিলগালার মতো কাগজে-কলমে বৈধ ব্যবস্থার যথেচ্ছ ব্যবহারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

ফলে বাস্তবে ব্যবসা টিকবে কি না, তা অনেক সময় নির্ভর করে আপনি আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনকে সামলাতে পারছেন কি না তার ওপর। এই বাস্তবতার কারণেই অনেক ব্যবসায়ী রাজনৈতিক চাঁদাবাজিকে ‘সবচেয়ে খারাপ অপশন’ নয়, বরং ‘সবচেয়ে সস্তা প্রতিরক্ষা’ হিসেবে দেখেন। কারণ, রাজনৈতিক চাঁদা অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। এটি কোনো আদর্শ অবস্থা নয়—কিন্তু বাস্তবতা।

আসল সমাধান: ইকোসিস্টেম বদলানো

অনেক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে চাঁদাবাজি দূর করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সমস্যা হলো—তাদের বেশির ভাগই চাঁদাবাজিকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখে, কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে নয়।

‘আমরা সৎ, তাই চাঁদাবাজি হবে না’—এই যুক্তি কোথাও কাজ করে না। কারণ, ক্ষমতায় গেলে সবাই একই রাষ্ট্রযন্ত্র পায়—একই পুলিশ, একই আমলাতন্ত্র, একই আইন। এই যন্ত্রের ভেতরের প্রণোদনা কাঠামো না বদলালে ব্যক্তি বদলালেও ফল বদলায় না। চাঁদাবাজি কমাতে হলে পুরো ইকোসিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুনকে বাস্তবসম্মত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে এবং আইন এমন হতে হবে, যা সাধারণ মানুষ বাস্তবে মানতে পারে। নিয়ম যত জটিল হবে, তার প্রয়োগ তত বেশি বেছে বেছে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের জন্য স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা দরকার। যত দিন রাজনীতি চালাতে বিপুল অঘোষিত অর্থ লাগে, তত দিন চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে শত্রু হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। মানুষ যখন নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জীবিকার সুযোগ পায় না, তখন বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই ইনফরমাল অর্থনীতিকে ধ্বংস না করে ধাপে ধাপে সহায়তা দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজি দূর করার প্রশ্নটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতির রূপান্তরের সঙ্গে জড়িত। এখানে শুধু ভালো ইচ্ছা যথেষ্ট নয়। এই রূপান্তরের ইচ্ছা এবং তার মূল্য দিতে প্রস্তুত না থাকলে, চাঁদাবাজিবিরোধী স্লোগান কেবল স্লোগানই থেকে যাবে।

* আহমাদ শাব্বীর, পিএইচডি গবেষক, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি, কানাডা
- ই–মেইল: asabbir32@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

কার্টুন: মুগ্ধ
কার্টুন: মুগ্ধ

এপস্টেইন থেকে গাজা: পশ্চিমা অভিজাতদের নৈতিক মুখোশ by সুমাইয়া ঘান্নুশি

যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিগুলো কেবলই কিছু কেলেঙ্কারির গল্প নয়। এগুলো মূলত দলিল। জবানবন্দি, হলফনামা, সমঝোতা চুক্তি। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর চালানো নির্যাতন কোনো সুস্থ নৈতিক ব্যবস্থার আকস্মিক ভাঙন ছিল না। এটি ছিল পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়া। দরিদ্রতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মেয়েদের সংগ্রহ করা হয়েছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া হয়েছে। অর্থ দেওয়া হয়েছে। চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার চারপাশে ছিল পেশাদার ব্যবস্থাপনা। ওই ব্যবস্থাপনায় আইনজীবীরা ঝুঁকি হিসাব করেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক খ্যাতি অক্ষুণ্ন থেকেছে। ক্ষতির বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়নি, বরং সেটিকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক রুটিনে পরিণত করা হয়েছে।

এপস্টেইনের একজন ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে বলেছেন, তাঁকে ব্যবহার করার পর অন্য পুরুষদের কাছে হস্তান্তর করা হতো। আরেকজন ভুক্তভোগী মারিয়া ফার্মার বলেছেন, তিনি খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিলেন যে তাঁর কোনো মূল্য নেই। তিনি কেবল এমন মানুষদের কামনা পূরণের একটি উপকরণ, যাদের কোনো দিন জবাবদিহি করতে হবে না। এগুলো কোনো রূপক নয়। এগুলো ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ক্ষমতাহীনদের সাক্ষাতের পদ্ধতিগত বর্ণনা।

ব্যাপারগুলো আমাদের খুব বেশি চমকে দেওয়ার কথা নয়। কারণ, যে অভিজাত শ্রেণি বিদেশে মানুষ হত্যা করতে অভ্যস্ত, তারা কি ঘরের ভেতরে হঠাৎ নৈতিক সীমা মেনে চলবে, এমনটা ভাবার কারণ কী?

দশকের পর দশক ধরে বিদেশে ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ কখনো লুকানো ছিল না, সেগুলো টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে। ইরাকে নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ফলে হাজার হাজার শিশু মারা গেছে। এই সংখ্যাটি স্বীকার করা হয়েছে এবং পরে নীতির মূল্য হিসেবে সেটিকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে। শহর ধ্বংস করা হয়েছে। বেসামরিক জীবন নিশ্চিহ্ন হয়েছে। সবকিছু ব্যাখ্যা করা হয়েছে কৌশল, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের নামে।

আবু গারিবে বন্দীদের নগ্ন করা হয়েছে। যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। ছবি তোলা হয়েছে। উপহাস ও অপমান করা হয়েছে। তাঁদের শরীরকে ক্ষমতা প্রদর্শনের অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। সেই নির্যাতনের দলিল তৈরি হয়েছে। কিছুদিন বিতর্ক হয়েছে। এরপর সবকিছু নীরবে ‘স্বাভাবিক’ করে নেওয়া হয়েছে। ওই সহিংসতাকে দেখানো হয়েছে দূরবর্তী মরুভূমি ও দখলকৃত শহরে সীমাবদ্ধ একটি ‘ব্যতিক্রম’ ঘটনা হিসেবে। বাদামি শরীর ও নামহীন বন্দীদের ওপর ঘটে যাওয়া কিছু হিসেবে।

পশ্চিমা সমাজ যে সত্যটি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করেছে, তা হলো এই অভিজাত শ্রেণি বিদেশে জনসংখ্যাকে অনাহারে রাখতে, শহর গুঁড়িয়ে দিতে এবং বন্দীদের যৌন নির্যাতন করতে পারে, তারা ঘরের ভেতরে যাদের তুচ্ছ মনে করে, তাদের নির্যাতন করতেও দ্বিধা করে না। বিদেশের নৃশংসতা আর ঘরের নৈতিকতার মধ্যে যে সীমারেখা টানা হয়েছিল, তা ছিল কল্পিত। দূরত্ব, বর্ণবাদ ও বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একধরনের সান্ত্বনাদায়ক গল্প। বিদেশে যা বিবৃতি, সেন্সরশিপ ও পরিমিত উদ্বেগের মাধ্যমে সামলানো হয়, ঘরের ভেতরে তা সামলানো হয় সমঝোতা চুক্তি ও গোপনীয়তার শর্ত দিয়ে।

এই একই অভিজাত শ্রেণির হাতে গাজার ধ্বংস কোনো নৈতিক ব্যতিক্রম নয়। এটি একই কাঠামোর অংশ। একই মানবমূল্যের শ্রেণিবিন্যাস। একই ধারণা যে—কিছু মানুষের জীবন পূর্ণ মানবজীবন, আর অন্যরা সহজে ত্যাগযোগ্য। হোক সেটা একটি ব্যক্তিগত ক্যারিবীয় দ্বীপে নির্যাতিত শিশু কিংবা গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শিশু। এই দুই ক্ষেত্রের অপরাধীরা একই মানসিকতায় চালিত। তারা মনে করে, অন্যের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার তাদের আছে। ফ্লোরিডায় হোক বা গাজায়, ইচ্ছা করলেই তারা নির্মম হতে পারে।

এই একই শ্রেণি আজ বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রক। প্রযুক্তি ধনকুবের, আর্থিক জগতের বড় খেলোয়াড় ও যুদ্ধ থেকে মুনাফা করা শক্তিগুলো একই অভিজাত বাস্তুতন্ত্রে ঘোরাফেরা করে, যেটি এপস্টেইন গড়ে তুলেছিলেন। এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জগতে স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি একাধিকবার এপস্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং নিউইয়র্কের বাসভবনে থেকেছেন।

এপস্টেইন বারাককে প্যালান্টির টেকনোলজিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দিতে বলেছিলেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য ও ডেটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠছিল। এই পরামর্শটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, এপস্টেইনের জগৎ কেবল ব্যক্তিগত ভোগের জায়গা ছিল না। এটি ছিল এমন এক সংযোগস্থল, যেখানে অভিজাত ভোগবিলাস, গোয়েন্দা যুক্তি ও আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।

প্যালান্টির টেকনোলজিস এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার সফটওয়্যার নজরদারি রাষ্ট্র ও আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েল সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রকাশ্য ও আদর্শিকভাবে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। তারা তাদের প্রযুক্তিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আধুনিক যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সক্রিয় যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তার জন্য একটি কৌশলগত চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। শীর্ষ নির্বাহীরা সরাসরি ইসরায়েলে গিয়ে এই অংশীদারত্ব চূড়ান্ত করেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মগুলো গোয়েন্দা তথ্য, রসদ ও লক্ষ্যবস্তুকে একত্র করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যাকে সামরিক ভাষায় এখন ডিজিটাল কিল চেইন বলা হয়।

এই সংযোগ কেবল প্রযুক্তিগত নয়, আদর্শিকও। প্যালান্টির প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থানকে সভ্যতার দায়িত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যে প্রয়োজন ও নৈতিক ছাড়ের ভাষা একসময় ব্যক্তিগত নির্যাতনকে আড়াল করত, আজ সেই ভাষাই সফটওয়্যারের ভেতরে কোড হয়ে প্রকাশ্য ধ্বংসকে বৈধতা দেয়।

এপস্টেইন সামাজিকভাবে যা তৈরি করেছিলেন, অর্থাৎ প্রবেশাধিকার, সুরক্ষা ও পারস্পরিক জড়িত থাকা, প্যালান্টির মতো প্রতিষ্ঠান তা প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করছে। সহিংসতা যখন এভাবে সফটওয়্যার, নীতি ও মুনাফার ভেতরে গেঁথে যায়, তখন তাকে আর লুকাতে হয় না। গর্বের সঙ্গেই তা নীতি হিসেবে ঘোষণা করা যায়। একসময় যেটাকে যুক্তি দিয়ে ঢাকতে হতো, এখন সেটাই খোলাখুলি বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের ভাষায়, শক্তিই ন্যায্যতা। গাজায়, ভেনেজুয়েলায় কিংবা ফ্লোরিডার বন্ধ দরজার আড়ালে, এটাই নীতি। এই অভিজাত শ্রেণি কেবল ক্ষমতাবান নয়। তারা বড় হয়েছে ব্যতিক্রমী হওয়ার বিশ্বাস নিয়ে। তারা এমন এক বদ্ধ জগতে বাস করে, যেখানে নিয়ম অন্যদের জন্য, আর পরিণতি দর-কষাকষির বিষয়।

এই কারণেই এপস্টেইনের প্রতি এই শ্রেণির এত মানুষের আকর্ষণ ছিল। এত সহজে তারা তাঁর ফাঁদে পড়েছিল। এপস্টেইনের আসল প্রলোভন শুধু ভোগ ছিল না। ছিল এই নিশ্চয়তা যে সাধারণ নৈতিক নিয়ম তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাঁর আয়োজনগুলো ছিল সদস্যপদ যাচাইয়ের পরীক্ষা। তাঁর ব্যক্তিগত বিমান ও নির্জন সম্পত্তিগুলো ছিল অন্তর্ভুক্তির আচার।

তাঁর জগতে প্রবেশের মানে ছিল একটি চিহ্ন পাওয়া। এমন এক বৃত্তে ঢোকা, যেখানে পরিণতির ভয় নেই। এপস্টেইন অভিজাতদের ভোগবিলাসকে শুধু ব্যবহার করেননি। তিনি সেটিকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। অধিকারবোধকে চাপের উপকরণে, বাড়াবাড়িকে দুর্বলতায়, আর বিশেষাধিকারকে ফাঁদে রূপান্তর করেছিলেন।
এপস্টেইন বুঝেছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতাবানদের কাছে মর্যাদা ভোগের চেয়েও বেশি নেশাজনক। নিজেকে দরজার প্রহরী বানিয়ে তিনি ভোগকে দীক্ষায় এবং সীমালঙ্ঘনকে যোগ্যতায় পরিণত করেছিলেন।

সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, এই একই শ্রেণি নিজেদের বিশ্বজুড়ে নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরে। তারা অন্য দেশকে পশ্চাৎপদ, সহিংস বা বর্বর বলে বিচার করে। তারপর সেই ভাষাকেই আধিপত্য ও দমন ন্যায্য করার অস্ত্র বানায়। গাজা ধ্বংস তাদের মূল্যবোধের ব্যর্থতা ছিল না। গাজা ছিল সেই মূল্যবোধের চূড়ান্ত প্রকাশ। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি এই ব্যবস্থার ব্যক্তিগত মুখ উন্মোচন করেছে। গাজা তার প্রকাশ্য আচরণ দেখিয়ে দেয়।

দুটো একসঙ্গে শেষ বিভ্রমগুলো ভেঙে দেয়। প্রকাশ করে দেয় এমন এক অভিজাত শ্রেণির নগ্ন চেহারা, যারা ঘরের ভেতরে নীরবে দুর্বলদের ভোগ করে, আর বাইরে প্রকাশ্যে ধ্বংস করে মানজীবন।

* সুমাইয়া ঘান্নুশি, ব্রিটিশ তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বিশেষজ্ঞ
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

এপস্টেইন অভিজাতদের ভোগবিলাসকে শুধু ব্যবহার করেননি। তিনি সেটিকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।
এপস্টেইন অভিজাতদের ভোগবিলাসকে শুধু ব্যবহার করেননি। তিনি সেটিকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। কোলাজ: প্রথম আলো

ভোটে না থেকেও যেভাবে ‘ভোটে’ থাকবে আওয়ামী লীগ by সোহরাব হাসান

অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। অতীতে অনেক সরকার অনেক দলকে নিষিদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখতে পারেনি।

শেখ হাসিনা সরকারের অন্তিম সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ দলটি এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। জিয়াউর রহমানের আমলে ডেমোক্রেটিক লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা কী করবেন? বিদেশে নিরাপদে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা একের পর এক হুকুম দিয়ে চলেছেন। কিন্তু তাঁদের সে হুকুম দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের কতটা বিপদে ফেলছে, তাঁরা একবারও ভাবেননি।

গত বছর বেশ কিছু অঘটন ঘটেছে নেতাদের উসকানিমূলক বিবৃতির কারণে। তাঁরা ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অনুসরণে শাটডাউন ও কমপ্লিট শাটডাউনের আওয়াজ তুলেও জনগণের সাড়া পাননি। বরং মিছিল করতে গিয়ে সাধারণ কর্মীরা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা এখন বলছেন, ‘যেই নির্বাচনে নৌকা নেই, সেই নির্বাচন কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না।’ আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব এখন সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করার জোর দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে তাঁরা বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে একের পর এক জবরদস্তির নির্বাচন করেছেন।

গত ১৭ মাসে দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দুঃসহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একসময়ের রাজনৈতিক ‘শত্রুদের’ কৃপা নিয়েও অনেকে বেঁচে আছেন। কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষে আনুষ্ঠানিক ভোট বর্জন মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সবাই না হলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং ভোটও দেবেন।

প্রশ্ন হলো, নৌকাবিহীন ব্যালটে তাঁরা কাকে বেছে নেবেন? এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারত বাম দলগুলো। কিন্তু তারা নির্বাচনকে নিয়েছে প্রতীকী আয়োজন হিসেবে। অনেক বড় নেতা ভরাডুবির ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছেন না। দ্বিতীয় বিকল্প হলো বিএনপি বা তাদের সমমনা দলগুলো। বিএনপির নেতাদের একাত্তরকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিধ্বনি মেলে। তৃতীয় বিকল্প হবে স্থানীয়ভাবে জয়ের সম্ভাবনা আছে, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া।

বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পেপস) কিছুটা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মনোভাব তুলে ধরেছে। আগের আওয়ামী লীগ ভোটারদের ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। ১৩ দশমিক ২ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন। আর ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে যাঁরা সিদ্ধান্তহীন ছিলেন বা পছন্দ প্রকাশ করেননি, তাঁদের মধ্য থেকে জামায়াতের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছে বিএনপি। বিএনপির সম্ভাব্য ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে আগে সিদ্ধান্তহীন ও অনির্ধারিত ভোটারদের কাছ থেকে। জামায়াতের সম্ভাব্য ৩১ শতাংশ ভোটের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে একই গোষ্ঠী থেকে। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একাংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকছেন বলে ধারণা করি।

এরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের একটি নির্বাচনী সভায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আলোচিত অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মী। তাঁরা সবাই ধানের শীষের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। একজন পুরোনো অভ্যাস বশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও দিয়েছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, তাঁরা সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জানাচ্ছেন। এর অর্থ আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতারা প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানালেও স্থানীয়ভাবে যাঁদের দ্বারা বিপদ কম হবে মনে করেন, তাঁদের ভোট দিতে বলছেন।

কেবল বিএনপি নয়, অন্যান্য দলও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, কেউ কেউ সহানুভূতিও প্রকাশ করছেন। ফলে নৌকাবিহীন এবারের নির্বাচনে দলটির ভোট সহানুভূতিশীল প্রার্থীর বাক্সেই যে বেশি পড়বে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

গত ২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এবার তো নৌকা নেই। নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের যেসব সমর্থক আছেন, তাঁদের বিপদে ফেলে গেছে। আমরা সেই বিপদে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’ জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হবে না।

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম। আপনাদের একজনেরও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।’

১৯৯১ সালের পর যে কটি নির্বাচন হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাড়া সব কটিতে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। কোনোটিতে তারা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। কোনোটিতে বিরোধী দলে বসেছে। তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেছে তারা। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে।

একটানা ১৫ বছরের শাসন ও তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমেছে সত্য। কিন্তু ভূমিধস হয়নি। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন যদি সর্বনিম্ন স্তরেও এসে থাকে, তারপরও তারা নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের অর্ধেক ভোটারও যদি কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন, তাঁরা যে দল ও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব দল আওয়ামী ভোটারদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।

* সোহরাব হাসান, সাংবাদিক ও কবি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ছবি: রয়টার্স

মক্কা–মদিনার পবিত্র মসজিদে এবারও তারাবি ১০ রাকাত

প্রকাশ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববিতে ১০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করা হবে।

মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৬ সালের (১৪৪৭ হিজরি) রমজানের জন্য এই বিশেষ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। খবর হারামাইন শরিফাইনের।

কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, দুই পবিত্র মসজিদে প্রতি রাতে তারাবির নামাজ ১০ রাকাত এবং এরপর ৩ রাকাত বিতর নামাজ পড়ানো হবে। তারাবির ১০ রাকাত নামাজে মোট পাঁচটি ‘তাসলিম’ বা সালাম ফেরানো হবে। এর মাধ্যমে দুই মসজিদে দীর্ঘদিনের প্রচলিত সুন্নি রীতিনীতি বজায় রাখা হচ্ছে।

সাধারণত রমজান মাস শুরুর আগেই দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনা পর্ষদ তারাবির নামাজের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি এবং ইমামদের তালিকা প্রকাশ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মক্কা-মদিনার এই তারাবির নামাজ সরাসরি সম্প্রচার দেখেন।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় দুই পবিত্র মসজিদে ১০ রাকাত তারাবির রেওয়াজ চালু রয়েছে। মূলত মুসুল্লিদের দীর্ঘ সময় ভিড়ের মধ্যে থাকার ধকল কমাতে এবং ইবাদত সহজতর করতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে।

সূত্র: দি ইসলামিক ইনফর্মেশন ডট কম

মক্কা–মদিনার পবিত্র মসজিদে এবারও তারাবি ১০ রাকাত
ছবি: পেক্সেলস

দাঁত না ফেলে কেন রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট করাবেন by ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ

ঘুমের মধ্যে বা হঠাৎ অসহনীয় দাঁতব্যথা। কিছুতেই কমছে না। কেউ বলছেন দাঁতটি ফেলে দিতে হবে। কেউ ব্যথানাশক ওষুধে সাময়িক ব্যথা লাঘবের চেষ্টা করছেন। কিন্তু আসলে দাঁতের ভেতরের মজ্জা আক্রান্ত হলে এনডোডোন্টিক চিকিৎসা ছাড়া সেই দাঁত রক্ষার কোনো উপায় নেই।

দাঁত নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব এনডোডোন্টিক দিবস বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সেলিব্রেটিং টুথ সেভারস’ অর্থাৎ জনগণের মধ্যে দাঁতের সুরক্ষা ও সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা।

দাঁত মানবদেহের এক অমূল্য অঙ্গ। এটি হারালে শুধু খাবার চিবানোতেই সমস্যা হয় না, বরং মুখের সৌন্দর্য-সামঞ্জস্য, উচ্চারণ, আত্মবিশ্বাস এমনকি স্মরণশক্তিও নষ্ট হয়। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দাঁত উপড়ে ফেলার পরিবর্তে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা রক্ষা সম্ভব। এই চিকিৎসার নাম ‘রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট’।

রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট

রুট ক্যানেল হলো একধরনের সূক্ষ্ম ডেন্টাল চিকিৎসা। এই পদ্ধতিতে দাঁতের ভেতরের সংক্রমিত বা মৃত টিস্যু অপসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা হয় দাঁতকে। এরপর বিশেষ উপাদান দিয়ে সেই স্থান ভরাট বা সিল করে দেওয়া হয়। এতে করে ব্যথা, ফোলা অথবা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত হয়। বহু বছর কার্যকর রাখা সম্ভব হয় দাঁতকেও। তাই কথায় কথায় দাঁত ফেলে দেওয়ার আত্মঘাতী ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

রুট ক্যানেল নিয়ে অনেকের মধ্যে একধরনের ভয় কাজ করে। কেউ কেউ মনে করেন, এই চিকিৎসা অনেক কষ্টের, ব্যয়বহুল ও কিছু দিন পর আবার কষ্ট শুরু হবে বা দাঁত ভেঙে যাবে। এগুলো একেবারে ভ্রান্ত ধারণা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

অনুমোদিত ও দক্ষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিলে এর সফলতার হার অনেক। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে কৃত্রিম মুকুট বা ক্যাপ পরিয়ে না নিলে দাঁত ভেঙে যেতে পারে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে এমন সংবেদনশীল চিকিৎসা নিলে খারাপ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

পরামর্শ

কোনো ব্যথা বা কষ্ট না হলেও বছরে অন্তত একবার ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। এতে রোগের শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। দাঁতের গর্তের শুরুতে বা শিনশিন করলে ফিলিং নামক সহজ ও সবার জন্য সহনশীল খরচে চিকিৎসা করিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে। রোগ পুষে রাখলে জটিলতা, সময় ও খরচ সব বাড়তে থাকে।

* ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ, রাজ ডেন্টাল সেন্টার, পান্থপথ, ঢাকা

দাঁত উপড়ে ফেলার পরিবর্তে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা রক্ষা সম্ভব, এই চিকিৎসার নাম ‘রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট’।
দাঁত উপড়ে ফেলার পরিবর্তে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা রক্ষা সম্ভব, এই চিকিৎসার নাম ‘রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট’। ছবি: পেক্সেলস

গাজায় ৮ হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া

গাজায় ৮ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। গত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে দেশটি এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়াই প্রথম দেশ হিসেবে গাজায় সেনা পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করল।

ইন্দোনেশিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল মারুলি সিমানজুন্তাক জানিয়েছেন, সেনাদের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। গাজায় তারা মূলত চিকিৎসা ও প্রকৌশলগত কাজ পরিচালনা করবেন।

গত মাসে ঘোষিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদে যোগ দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। এই পর্ষদকে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। বাহিনীটি গাজার সীমান্ত নিরাপত্তা এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ অঞ্চলটির অসামরিকীকরণে কাজ করবে।

আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই পর্ষদ গাজার নতুন টেকনোক্র্যাট সরকার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমও তদারকি করবে।

সেনা মোতায়েনের সময় ও তাঁদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এখনো চূড়ান্ত না হলেও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এই সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। তবে গাজায় মার্কিন ভূমিকার কারণে ইন্দোনেশিয়ার কিছু ইসলামি গোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। এর জবাবে প্রাবোও যুক্তি দিয়েছেন, বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ইন্দোনেশিয়ার দায়িত্ব। এটি শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের ‘দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান’ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে বলেও তিনি মনে করেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কানের তথ্যমতে, দক্ষিণ গাজার রাফাহ ও খান ইউনিসের মধ্যবর্তী একটি এলাকায় ইন্দোনেশীয় সেনাদের জন্য ব্যারাক তৈরির জায়গা ইতিমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে কয়েক হাজার সেনার থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোও গাজায় সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা কেবল ‘শান্তিরক্ষী’ হিসেবে কাজ করবে এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই জড়াবে না।

২০১৯ সালে ডোমিনে এডুয়ার্ড ওসক বিমানবন্দরে ইন্দোনেশীয় সেনাসদস্যরা
২০১৯ সালে ডোমিনে এডুয়ার্ড ওসক বিমানবন্দরে ইন্দোনেশীয় সেনাসদস্যরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ঘোড়ায় চেপে অস্ট্রেলিয়ায় ৪,৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেন মার্কিন তরুণী

নিজের প্রিয় ঘোড়া ফ্যাবলের পিঠে চেপে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন মার্কিন অশ্বারোহী জিন জ্যাগোলা।

জিন জ্যাগোলা তাঁর ঘোড়া ফ্যাবলের পিঠে চেপে গত বছরের ২০ মে যাত্রা শুরু করেন। ফ্যাবল কোনো প্রশিক্ষিত ঘোড়া নয়, এটি ব্রাম্বি বা বুনো ঘোড়া। ব্রাম্বি অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে বেড়ায়। সেখানে এসব ঘোড়াকে ‘ওয়াইল্ড হর্স অব অস্ট্রেলিয়া’ নামে ডাকা হয়।

পর্যটক বা সাধারণ মানুষ অস্ট্রেলিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ভ্রমণ করতে সাধারণত গাড়ি বেছে নেন। কিন্তু ২৫ বছর বয়সী জ্যাগোলার বেছে নেন ঘোড়া, তাও আবার বুনো ঘোড়া।

জ্যাগোলা অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর ট্যাথরা থেকে যাত্রা শুরু করেন। তিনি ভিক্টোরিয়া ও সাউথ অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের উপকূল ধরে নুলারবোর সমভূমি দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের পার্থে যাত্রা শেষ করেন।

জ্যাগোলা বলেন, তিনি খুবই সতর্কভাবে আট মাস ধরে এ পথ পাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ঘোড়া দিনে সর্বোচ্চ ৩২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। এভাবে আট মাসে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার (২ হাজার ৭০০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। পার্থ শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণের বুসেলটনের ফরেস্ট বিচে তাঁদের যাত্রা শেষ হয়।

এই তরুণী বলেন, ‘আমি সব সময় ফ্যাবলের সুস্থতাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাই, প্রতি এক ঘণ্টা ঘোড়া চড়ার পর আমরা ১০ মিনিট করে বিরতি নিতাম। এ ছাড়া দিনের প্রায় এক–চতুর্থাংশ সময় আমি হেঁটেছি, যেন ফ্যাবলের পিঠ খানিকটা বিশ্রাম পায়।’

জিন জ্যাগোলার বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া। তিনি এর আগে নিজে দেশে ঘোড়ার পিঠে চড়ে লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছেন।

জ্যাগোলা বলেন, ‘যখন আমি অস্ট্রেলিয়ার ব্রাম্বি ঘোড়া সম্পর্কে জানতে পারি, এটি সত্যিই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি এখানে এসে একটি ব্রাম্বিকে নিজে একেবারে শুরু থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সেটির পিঠে চেপে এই মহাদেশ অতিক্রম করার অনুপ্রেরণা পাই।’

কোসচিউসকো ন্যাশনাল পার্কের একটি বুনো ব্রাম্বি ছিল ফ্যাবল। ভিক্টোরিয়ান ব্রাম্বি অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সেটিকে দত্তক নেন জ্যাগোলা।

জ্যাগোলা বলেন, তিনি যখন প্রথম ফ্যাবলকে দেখেন, সেটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু সেটির আচরণ তখনো পুরোপুরি বুনো ঘোড়ার মতো ছিল।

এই মার্কিন তরুণী বলেন, ‘যাত্রা শুরু করার আগে আমি প্রায় ছয় থেকে আট মাস পরিকল্পনা করেছি। এরপর ফ্যাবলকে তিন মাস প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, “ঠিক আছে, হয় সবকিছু ভালোভাবে হবে এবং আমি বুঝতে পারব, আমরা এটা আসলেই করতে পারি, নইলে সবকিছু পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং আমরা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যাব”।’

জ্যাগোলা অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সরল সড়ক নুলারবোর সমভূমি অতিক্রম করেছেন, যা প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বিস্তৃত।

প্রতিদিন রাতে জ্যাগোলা তাঁর ঘোড়ার পাশেই ঘুমিয়েছেন। তাদের সঙ্গে ছিল একটি তাঁবু আর স্যাডল ম্যাট। শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে জ্যাগোলার খুব বেশি চেনাজানা ছিল না, বিশেষ করে নুলারবার পার হওয়ার সময়। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে এ সফর শেষ করতে পেরেছেন।

জ্যাগোলা বলেন, ‘আমি সত্যিই বুনো ঘোড়ার প্রেমে পড়ে গেছি।’

এ সফর শেষ করার পর জিন জ্যাগোলা ২০ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে (জিন অ্যান্ড ফ্যাবল) একটি পোস্ট দেন।

এতে জ্যাগোলা লেখেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত, ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। একটি ঘোড়ার সঙ্গে একটি মহাদেশ অতিক্রম করা প্রথম ব্যক্তি আমি। আমার চিরসত্য ও সাহসী সাথি, যাকে আমি সবকিছুর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। ফেবল, দ্য স্নো মাউন্টেন ব্রাম্বি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-30%2F5kirmrp0%2FGin-Szagola.jpg?rect=0%2C0%2C750%2C500&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ফ্যাবলের পিঠে জিন জ্যাগোলা। ছবি: জিন জ্যাগোলার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

গণতন্ত্রের গভীর সমস্যাকে সামনে এনেছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া এবং এখন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান। এই পরম্পরায় বাংলাদেশের মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষার কতটা প্রতিফলন ঘটছে, ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে একটি নিবন্ধ লিখেছেন বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্টের সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি টম ফেলিক্স জোয়েঙ্ক।

দেড় বছর আগে বাংলাদেশকে দেখে মনে হচ্ছিল বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পিছু হটার যে ধারা চলছে, তা অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে দেশটি।

অর্থনৈতিকভাবে হতাশায় ভোগা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গণবিক্ষোভ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়। এর মধ্য দিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই ছোট হয়ে আসা রাজনৈতিক পরিসর এবং ভয়ভীতিনির্ভর শাসনের অবসান ঘটে। সেই মুহূর্তটি কেবল বাংলাদেশে নয়, বরং দেশের সীমানা ছাড়িয়েও আশার আলো দেখিয়েছিল। গণতন্ত্র যখন চাপের মুখে থাকে, তখনো যে মানুষ স্বৈরাচারী শাসনকে হটিয়ে দিতে পারে এবং নতুন সূচনা করতে পারে—এটি ছিল তার প্রমাণ। আগামী বৃহস্পতিবারের জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণের প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। তবে একটি গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের যে উচ্চ আশা ছিল, তা বর্তমানে ফিকে হয়ে এসেছে।

সংকট কাটিয়ে ওঠার সময় আসার বদলে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে চলছে ক্রমাগত সহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক ও শিল্প খাতে ধর্মঘট, বিঘ্ন সৃষ্টি করে, এমন প্রতিবাদ–বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই অভিজ্ঞতা একটি কঠিন সত্য সামনে এনেছে। এই সত্যের প্রভাব উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সত্যিটা হলো—যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর গণতন্ত্র নির্ভর করে, সেগুলো যদি ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়, তবে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ অধরাই থেকে যায়। বাংলাদেশ এখন এর একটি উদাহরণে পরিণত হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে। মতাদর্শ ও নীতিগতভাবে সামান্য পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এই দুই নেত্রী এবং তাঁদের দল বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনে তিক্ত লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন।

তবু একসময় ক্ষমতার হাতবদল মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে হতো। এ জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এই সরকার সাময়িক সময়ের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচন পরিচালনা করত এবং এক সরকারের কাছ থেকে অন্য সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি তদারক করত। শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে ২০১১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী অনিয়ম এবং অবৈধ নির্বাচনের এক যুগের শুরু হয়েছিল। স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটতন্ত্র গভীর হয়েছিল। বিরোধীদের ভয়ভীতি দেখানোর জন্য আদালত, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করেছিল তাঁর সরকার।

লাখ লাখ বাংলাদেশি আশা করেছিলেন যে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনবে। শুরুতে এই আশাবাদের একটি কারণ ছিল মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা। মাইক্রোফাইন্যান্সের পথিকৃৎ হিসেবে ২০০৬ সালে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু গভীরভাবে রাজনীতিকরণের শিকার এবং বিভক্ত একটি রাষ্ট্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফেরাতে অধ্যাপক ইউনূসকে হিমশিম খেতে হয়েছে। তাঁর প্রশাসনের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট এবং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিস্তৃত সমর্থন নেই। পুলিশ ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এবং অতীতের অপকর্মের প্রতিশোধের ভয়ে অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদত্যাগ করায় এসব প্রতিষ্ঠান আরও দুর্বল হয়েছে। বিপ্লবের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরির দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোট কেনার অভিযোগ, অন্যান্য অনিয়ম এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার কারণে বৃহস্পতিবারের ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ইতিমধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

নির্বাচনে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিএনপি। এখন দলটির নেতৃত্বে আছেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। খালেদা জিয়া গত ডিসেম্বর মাসে মারা গেছেন। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে আর সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক সাধারণ নির্বাচন হয়নি। তাই নির্বাচনের ফল অনুমান করা কঠিন। একটি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা এবার ভোট দিচ্ছেন। মোট ভোটারের ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা পুরোনো দলীয় দ্বন্দ্বের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরপেক্ষ শাসনের মতো বাস্তব বিষয়গুলো নিয়ে বেশি আগ্রহী।

ইসলামপন্থী শক্তিগুলো আরেকটি অনিশ্চিত উপাদান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তাদেরকে রাজনীতির প্রান্তে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে তারা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলোর একটি—ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবার ভোট দেবেন—এমন ভোটারদের ৩৭ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ভোট দিতে চান। দলটি তুলনামূলক মধ্যপন্থী ইসলামি ধারা অনুসরণ করে এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে সমর্থন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো দুই দলের বিকল্প হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। তবে অন্যান্য ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ২০২৪ সাল থেকে নারীদের পর্দার বিধান কঠোর করা, ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড আরোপ—এমনকি একটি ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠারও দাবি জানিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ এখন তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে। যদিও এ সপ্তাহের নির্বাচনের আগে তা কার্যকর হচ্ছে না। বৃহস্পতিবারের ব্যালটে একটি গণভোটও থাকবে। এই গণভোট হবে নতুন একটি জাতীয় সনদের প্রস্তাবের ওপর। এটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ করবে।

কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বিএনপি এই সনদের কিছু মূল ধারার বিরোধিতা করছে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা এবং তদারকি সংস্থাগুলোর অধিক স্বাধীনতা। অন্য বেশ কয়েকটি দলও আপত্তি জানিয়েছে। গণভোটে সনদ পাস হলেও তা বাস্তবায়নে আইন, সাংবিধানিক সংশোধন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে, যা এখন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে ঝুঁকিটা অনেক বড়।

অতীতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ক্ষতিকর প্রভাবগুলোকে সামাল দিয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও নতুন নেতৃত্বকে তা মোকাবিলা করতে হবে আরও কঠিন বৈশ্বিক পরিবেশ। সেখানে বৈশ্বিক সুরক্ষাবাদ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং জলবায়ুর ওপর চাপ বাড়ছে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক রয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেন। এটি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব ও আন্দোলনকারীদের ক্ষুব্ধ করেছে। তাঁরা চান শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হন। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঠেকাতে ঢাকা ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছে ভারত। উত্তেজনার আঁচ ইতিমধ্যেই ভিসা স্থগিতকরণ এবং বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ার মতো ঘটনার ওপর পড়েছে।

বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের শিক্ষা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ২০১০–এর দশকের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য জায়গায় অতি সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক পরিসর খুলে দিয়েছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে অর্জনগুলো হয় হারিয়ে গেছে অথবা চরম ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও, ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ আদালত, আইনি কর্তৃপক্ষ ও সরকারি সংস্থাগুলোকে দলীয় সংঘাতের মধ্যে টেনে এনেছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পদক্ষেপগুলো মার্কিন গণতন্ত্রের ভিত্তিগুলো দুর্বল করে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। স্বৈরশাসকদের উৎখাত করা সম্ভব। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করে যায়, তা মেরামত করাই সম্ভবত গণতন্ত্রের জন্য আরও দীর্ঘস্থায়ী এক চ্যালেঞ্জ।

গণ–অভ্যুত্থানে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ। গ্রাফিতিতে সেই আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছিল। তেমনই একটি গ্রাফিতির চিত্র এটি
গণ–অভ্যুত্থানে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ। গ্রাফিতিতে সেই আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছিল। তেমনই একটি গ্রাফিতির চিত্র এটি। ফাইল ছবি

আইসিসিতে নিরপেক্ষতার সংকট by সাদ শাফকাত

আপনি যদি ১৯৪৭ সাল থেকে টানা ঘুমিয়ে না থাকেন, তাহলে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলতে পাকিস্তানের অস্বীকৃতি আপনাকে অবাক করবে না। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটকে বহুদিন ধরেই এক ধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা হয়। একসময় এই ‘যুদ্ধ’ মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যাট আর বলের লড়াইয়েই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতো। সেটা ছিল তখন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাচের ভেন্যু নির্বাচন, সফরসূচি- সবই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এটাই এখনকার বাস্তবতা।

যুক্তি দিয়ে বলা যায়, এই খেলাটা শুরু করেছিল ভারতই, আর পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছে পাল্টা জবাব দিতে- চোখের বদলে চোখ। ২০০৮ সালে করাচিতে এশিয়া কাপ হওয়ার পর থেকে ভারতের ক্রিকেটাররা পাকিস্তানে আর খেলেনি। অথচ এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান ভারতের মাঠে অন্তত ১৯ বার খেলেছে। সবশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে ওয়ানডে বিশ্বকাপে। শুরুতে ভারতের অস্বীকৃতিকে নিরাপত্তার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যেত। ২০০৯ সালের লাহোরে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানকেও তো বছরের পর বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ঘরের মাঠ’ বানিয়ে খেলতে হয়েছিল।

কিন্তু পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর এবং অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের মতো শীর্ষ দলগুলো যখন আবার পাকিস্তানে এসে খেলতে শুরু করল, তখন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডকে নতুন অজুহাত খুঁজতে হলো। তারা সামনে আনল ‘সরকারি অনুমতির’ কথা। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভার তুলে দিল কট্টরপন্থী বিজেপি সরকারের হাতে। তখনই মুখোশ খুলে গেল।

এই ভারতীয় অনড় অবস্থানের ফলেই গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজন কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়। আট দলের টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো যখন লাহোর, করাচি ও রাওয়ালপিন্ডিতে নির্বিঘ্নে চলছিল, তখন ভারতকে তার পাঁচটি ম্যাচই খেলতে দেয়া হয় দুবাইয়ে। এর মধ্যে ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারির পাকিস্তানের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ গ্রুপ ম্যাচ এবং ৯ মার্চের ফাইনালও। এই চরম বৈষম্যের ব্যাখ্যা একটাই- ক্রিকেটে ভারতের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব।

একশ কোটির বেশি দর্শকের বাজার নিয়ে ভারত রাজস্ব, স্পনসরশিপ, লবিং এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)- সবকিছুর ওপরই কর্তৃত্ব কায়েম করেছে। পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মনে হচ্ছিল, আমাদের হাতে আর কোনো তাস নেই।
তবে সাম্প্রতিক দুটি নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনা এই হিসাব বদলে দিয়েছে। প্রথমটি হলো বাংলাদেশে ভারতসমর্থিত শেখ হাসিনা ওয়াজেদের ক্ষমতাচ্যুতি, যা দিল্লির হস্তক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ব্যর্থ দুঃসাহসিকতা, যা পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের ভারতের প্রতি অবস্থানে নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। এই দুই ভূকম্পনের ঢেউ এসে মিলেছে ক্রিকেট দুনিয়ায়।

প্রথমে বাংলাদেশ আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়- তাদের আসন্ন বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যেন ভারতের বাইরে, শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়া হয়। পাকিস্তান আগেই এমন ছাড় আদায় করেছিল। বাহ্যিকভাবে এই অনুরোধের কারণ ছিল আইপিএল থেকে এক বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের রহস্যজনক বহিষ্কার। কিন্তু আসলে এর পেছনে রয়েছে ক্রমাবনত রাজনৈতিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের এই অবস্থানে সাহস পেয়ে পাকিস্তানও কঠোর অবস্থান নেয় এবং জানায়- বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ১লা ফেব্রুয়ারি সরকার নেবে। সেই সিদ্ধান্ত টুইটারে জানানো হয়: পাকিস্তান বিশ্বকাপ খেলবে, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ বয়কট করবে। নকআউট পর্বে ভারতকে পেলে কী হবে- সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

খাঁটি ক্রিকেটের বিচারে গ্রুপ ম্যাচ ছেড়ে দেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলেই মনে হতে পারে। দুটি মূল্যবান পয়েন্ট হাতছাড়া করা মানে পরের পর্বে ওঠা ঝুঁকির মুখে ফেলা। কিন্তু এখানে একটি বার্তা দেয়া জরুরি ছিল এবং পিসিবি সেটা কৌশলে দিয়েছে। আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের রেকর্ড ভয়াবহ; এই ম্যাচে হারার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। অন্যদিকে গ্রুপের বাকি তিন প্রতিপক্ষ সহযোগী স্তরের দল- যারা অঘটন ঘটাতে পারে ঠিকই, তবে অতিক্রম অযোগ্য নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ভারতীয় দর্শকদের তাদের প্রিয় বিনোদন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সেটা হলো পাকিস্তানকে হারানোর দৃশ্য। এই ম্যাচগুলো ভারতের টিভি বাজারে সোনার খনি। ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সম্মিলিত (টিভি ও ডিজিটাল) দর্শকসংখ্যা ছিল ৪০ কোটির বেশি। গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৮০ কোটি। ১৫ই ফেব্রুয়ারির বাতিল হওয়া ম্যাচটিও নিশ্চয়ই একই রেকর্ড গড়ত। নকআউটে যদি দুই দল মুখোমুখি হয়, তাহলে সব দর্শকসংখ্যার রেকর্ড ভেঙে যাবে- এ নিয়ে সন্দেহ নেই।

এই বেছে নেয়া বয়কট পাকিস্তানে শান্ত আলোচনার জন্ম দিলেও ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সেটাই প্রমাণ করে, এটা কতটা কার্যকর হয়েছে। ভারতীয় কট্টরপন্থীরা ক্ষুব্ধ, সাধারণ দর্শক হতাশ। একই সঙ্গে কিছু যুক্তিবাদী ভারতীয় কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে। শশী থারুর আইসিসির ছাতার নিচে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে আলোচনায় বসে ‘এই অর্থহীনতা বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। প্রখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক শারদা উগ্রা সরাসরি দায় চাপিয়েছেন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের ওপর- তাদের ক্ষুদ্র অহং ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কথা বলেছেন।

এই পুরো বিশৃঙ্খলায়, ক্রিকেটের বাইরেও সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো বাংলাদেশ। তাদের সঙ্গে অন্যায় হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তারা শ্রীলঙ্কায় খেলতে পারত। কিন্তু আইসিসি তাদের হুমকি দেয়- না মানলে দল বদলে দেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সেই হুমকিই কার্যকর করা হয়।
এতে আইসিসির জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। বৈশ্বিক ক্রিকেটের কল্যাণের দায়িত্ব যাদের, সেই সংস্থাই যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে সমস্যা আরও গভীর। এখন আইসিসি ভারতের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। সব ক্রিকেট জাতির উচিত একত্রিত হয়ে নীতিগত অবস্থান নেয়া এবং আইসিসিকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কিছু না করার মূল্য অত্যন্ত চড়া।

(লেখক আগা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। তার এ লেখাটি অনলাইন দ্য ডন থেকে অনুবাদ)

mzamin