Tuesday, October 29, 2013

সহজিয়া কড়চা- মুহূর্তটির দাবি মিলের—গোঁজামিলের নয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

গত দুই দিনে রাজনৈতিক সহিংসতায় জনা দশেকের বেশি নিহত হয়েছেন। কেউ বলবেন, দেশে দেশে রাজনৈতিক কারণে যে হারে মানুষ মরছে, তাতে এটি আর তেমন বড় সংখ্যা কী?

আন্দোলন- অহিংস হরতালের সহিংস রূপান্তর by আলী ইমাম মজুমদার

হরতাল শব্দটি গুজরাটি ভাষার। প্রবল রাষ্ট্রশক্তির কাছ থেকে নিরস্ত্র মানুষের দাবি আদায়ের পন্থা হিসেবে উপমহাদেশে এর সূচনা করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী।

ঝড়ে বিপর্যস্ত যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স

ঝড়ে বিপর্যস্ত যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। গতকাল সোমবার ব্যাপক ঝড়ের কারণে যুক্তরাজ্যে যোগাযোগব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- কবি দিলওয়ার ও তাঁর মাটির ঘর by মফিদুল হক

দিলওয়ার বাংলাদেশের কাব্যধারার এক উজ্জ্বল পুরুষ, আজীবন করে গেছেন সাহিত্যসাধনা, কবিতায় আলাদা কণ্ঠ হিসেবে তাঁকে মান্য না করে আমাদের উপায় নেই,

জীবনের সাইকেল- হরতালের আগের মধ্যরাতের বিচিত্র চিন্তা by মামুনুর রশীদ

সামনে আমার নিস্তরঙ্গ অখণ্ড সময়,
যে সময় কাটে না, নিস্তরঙ্গ দীঘির মতো।

মূল প্রতিবেদন- শিশুদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কম by মোছাব্বের হোসেন

দেশের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করে। এসব ইশতেহারে শিশুদের উন্নয়ন, কল্যাণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নানা অঙ্গীকার করা হলেও এর বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম।

ক্ষতির মুখে শিশু- রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শিশুদের ক্ষতি by মুসলিমা জাহান

উম্মে ফাহমিদা ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আগামী ৫ নভেম্বর তার জেএসসি পরীক্ষা শুরু।

৩৭ মিনিট কাটে যেভাবে: ফোনালাপের পূর্ণ বিবরণ

চার বছর আগে কুশল বিনিময়। তারপর ২৬শে অক্টোবর দু’জনের ফোনালাপ। একজন সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাবনা দিলেন। অন্যজন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আলটিমেটাম।

মুহূর্তটির দাবি মিলের—গোঁজামিলের নয়

গত দুই দিনে রাজনৈতিক সহিংসতায় জনা দশেকের বেশি নিহত হয়েছেন। কেউ বলবেন, দেশে দেশে রাজনৈতিক কারণে যে হারে মানুষ মরছে, তাতে এটি আর তেমন বড় সংখ্যা কী? অনেক বছর আগে ইতালিতে এক শিশু কুয়ার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। তাকে উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্র সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। সেই আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন করায় এক নেতা বলেছিলেন, হোয়েন কোশ্চেন অব লাইফ, ওয়ান ইজ টু বিগ এ নাম্বার। যেখানে জীবনের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে একজন মানুষই অনেক বড় সংখ্যা। যে মানুষগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে, বোমার আঘাতে অথবা অন্যভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের বাবা-মা আছেন। তা না থাকলে আছেন স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, চাচা-মামা, ফুফু-খালা, বন্ধুবান্ধব প্রভৃতি। তাঁদের এই অপমৃত্যুতে তাঁদের শোকসন্তপ্ত আত্মীয়স্বজনের অবস্থা সহজেই অনুমান করা সম্ভব। নিহত ব্যক্তিদের কারও এই জগতে যদি কেউ-ই না থেকে থাকে, আমরা দেশের কোটি কোটি মানুষ তো আছি। আমাদের কি বিন্দুমাত্র করুণা নেই? উপনিবেশিত দেশে পরাধীন মানুষের জীবনের দাম নেই শাসকশ্রেণীর কাছে। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সেখানে জীবন বলিদান গৌরবের, স্বাধীনতাসংগ্রামে যাঁরা জীবন দেন, তাঁরা পান শহীদের মর্যাদা। নজরুলের ভাষায়: ‘গোলামীর চেয়ে শহিদি দর্জা অনেক ঊর্ধে জেনো।’
কিন্তু রাজনৈতিক সহিষ্ণুতায় পথেঘাটে বেঘোরে মৃত্যু কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যাঁরা আত্মোৎসর্গ করেছেন, তাঁরা কেউই কোনো দলের ক্যাডার ছিলেন না। ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলনে যাঁরা নিহত হন, তাঁরা ছিলেন স্বায়ত্তশাসনের পক্ষের মানুষ বা দলের কর্মী—ক্যাডার নন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ হন, তাঁরা স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষের মানুষ— কোনো দলের ক্যাডার নন। স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের দলীয় পরিচয় খুঁজতে যাওয়ার প্রশ্ন আসে না। সেদিন কেউ কোনো না কোনো দলের সমর্থক ছিলেন, কর্মী হলেও হতে পারেন—ক্যাডার নামক বস্তু সেদিন কোনো দলেই ছিল না, একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া। একাত্তরের লাখ লাখ শহীদের প্রায় সবাই ছিলেন দলের ঊর্ধ্বে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিকে জনগণ থেকে সরিয়ে এনে তাকে করা হয়েছে ক্যাডারভিত্তিক। ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে ডাকা হরতাল-অবরোধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করতে দলীয় সমর্থক নয়, ক্যাডার দরকার। ক্ষমতার স্বার্থে হরতালকে প্রতিহত করতেও ক্যাডার দরকার।
হরতাল কার্যকর ও হরতাল প্রতিহত করতে নিরস্ত্র ক্যাডার শুধু নয়, প্রয়োজন লাঠিসোঁটা, দা-বঁটি, বোমা-ককটেল, কাটা রাইফেল, গাদা বন্দুক প্রভৃতি। দুই পক্ষেরই দরকার ক্যাডারদের পেশি প্রদর্শন—জনসমর্থন নয়। কিন্তু সেই ক্যাডার কারা? নগদ প্রাপ্তি ছাড়া কেউ স্বেচ্ছায় ক্যাডারের খাতায় নাম লেখায় না। ক্যাডারের শরীরে যতক্ষণ শক্তি থাকে ততক্ষণ তার চড়া দাম। যে মুহূর্তে সহিংসতায় রাজপথে প্রাণটা চলে যায়, সেই মুহূর্তে তার মৃতদেহের এক পয়সা দাম নেই নিয়োগ দেওয়া দলের নেতাদের কাছে। তখন থেকে তার স্মৃতির অশেষ মূল্য শুধু তার প্রিয়জনদের কাছেই। কারণ, ক্যাডারদের প্রাথমিক পরিচয় তারা মানুষ। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ‘বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি, নির্বাচন ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।’ রাষ্ট্রদূত গত রোববার এক বিবৃতিতে বলেছেন: ‘সব রাজনৈতিক দলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এই বার্তা দিচ্ছে যে সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ নয় এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সহিংসতা কখনোই কোনো কিছুর জবাব হতে পারে না। সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ সরকার সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
শান্তিপূর্ণ উপায়ে লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হওয়ার জন্য আমরা সব দলের প্রতি আহ্বান জানাই।’ [প্রথম আলো] নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় এমন দলগুলো রাজপথে আছে। তারা যানবাহন ভাঙচুর করছে, তাতে আগুন লাগাচ্ছে। তাদের ভান্ডারে ককটেলের মজুত যথেষ্ট আছে বলেই ধারণা হয়। সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন চান এমন দলগুলোর ক্যাডাররাও রাজপথে রয়েছেন। তাঁরা এত নিঃস্ব নন যে খালি হাতে পথে নামবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্ণ সহায়তার ওপরও তাঁরা আস্থা রাখতে পারছেন না। প্রায় তিন হাত লম্বা লাঠি ও অন্যান্য পদার্থ তাঁদের হাতেও আছে—তা টিভির পর্দায় দেখা যায় হরতালের দিন ঘরে বসেও। ‘নাশকতা’ শব্দটি মহাজোট নেতাদের বোল শুধু নয়, সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দে পরিণত হয়েছে। মহাজোট নেতারা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তারা ‘নাশকতা’ পদটিকে তাঁদের রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করেছেন। কয়েকটি নির্বাচিত কাগজ এই শব্দটি প্রচার করে সুখ পাচ্ছে। খুচরো সন্ত্রাসী তৎপরতা, যানবাহন ভাঙচুর আর ‘নাশকতা’ দুই জিনিস।
গত আড়াই বছরে মহাজোট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে অনুমিত নাশকতা যদি শতকরা ৫০ ভাগের ১ ভাগও হতো, তাহলে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যেত আফগানিস্তান, ইরাক ও পাকিস্তানকে। একই কথা প্রতিদিন বললে তার ধার নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু তার পরিণতি খুব খারাপ। বিরোধী দলের কর্মসূচি ঘোষণার অর্থ নাশকতা হবেই—তা অনুমানে দূরদর্শিতা থাকতে পারে কিন্তু প্রজ্ঞার পরিচয় নেই। সতর্ক থাকা ভালো, আতঙ্ক ছড়ানো বা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া অনুচিত। বিরোধী দল কর্মসূচি ঘোষণা করলেই তাদের কার্যালয় পুলিশ দিয়ে অবরুদ্ধ করা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক আচরণ। যেভাবে বিরোধী দলের খ্যাতিমান নেতারা কলাপসিবল গেটের ভেতরে পিতৃমাতৃহীন এতিম বালকের মতো বসে থাকেন, এবং তা আমাদের মিডিয়ায় দেখা যায়—তা করুণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কিছু নয়। কর্মসূচির আগেই বিরোধী নেতাদের বাড়িতে পুলিশের হানা দেওয়া, অপরাধ করার আগেই বিরোধী নেতা-কর্মীদের পাইকারি গ্রেপ্তার আইনের শাসন ও গণতন্ত্র সমর্থন করে না। একই সঙ্গে হরতালের আগের সন্ধ্যায় ও হরতালের দিন সাধারণ মানুষের যানবাহনে আগুন দেওয়া, বোমা মারা, পুলিশের গাড়ি পোড়ানো ফৌজদারি অপরাধ।
বিরোধী দল তাদের কর্মীদের এই অপকর্মের দায় এড়াতে পারে না। সরকারের উচিত অপরাধীদের তাৎক্ষণিক পাকড়াও করে কঠোর শাস্তি দেওয়া। বাংলাদেশে এ ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে গণতন্ত্রের নামে। বর্তমানে এই যে হানাহানি ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং বাইরের চাপে তা সমাধানের যে লোক দেখানো উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা যে ফলপ্রসূ হবে সে সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া কোনো বাস্তববাদীর পক্ষেও সম্ভব নয়। যাঁরা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যেতে চাইছেন, তাঁরা তাঁদের অতীত থেকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে যে বেরিয়ে এসেছেন—সে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ক্ষমতায় গিয়ে কী করবেন সে জন্য কোনো হোমওয়ার্ক নেই। সংবিধান সংশোধন করে মহাজোট পুনর্নির্বাচিত হওয়ার যে পরিকল্পনা করেছে, তাতে তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রমাণ নেই। নিরপেক্ষ নির্বাচনই বলে দেবে জনগণ কাকে চায় আর কাকে আপাতত চায় না। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শক্তিগুলো যদি মনে করে তাদের কথিত সন্ত্রাসবাদ দমনে ১৪-দলীয় জোটই শুধু ভরসা, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি করা হবে অত্যন্ত অবিচার। বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদ এবং ধর্মীয় জঙ্গিবাদ দমনে সেক্যুলারপন্থী আওয়ামী লীগ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী বিএনপি—দুই দলকেই প্রয়োজন। তবে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পর্কে দুই দলকেই উপলব্ধি করতে হবে, শুধু ক্ষমতার চিন্তা মাথায় রাখলে হবে না।
বিদেশিদের বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতা বুঝতে হবে এবং ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সব দলকেই কাজে লাগাতে হবে। আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি কম থাকলেও বাংলাদেশের হতভাগ্য মানুষদের আমরা বিদেশিদের চেয়ে বেশি চিনি। এদের যেমন অনেক দোষ ও দুর্বলতা আছে, কিছু ভালো গুণ ও দৃঢ়তাও আছে। তা না থাকলে আইয়ুব খানের পতন হতো না মেয়াদ পূরণের আগেই, মুক্তিযুদ্ধ হতো না, নব্বইতে সামরিক একনায়কত্বের অবসান হতো না। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের অভাবে গত এক যুগে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থতার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে, এই সময়টিতে দেশ পরিচালনা করেছে চার-দলীয় জোট, তিনোদ্দীনের প্রশাসন এবং ১৪-দলীয় মহাজোট, এই সময়ের সফলতা ও ব্যর্থতার দায় এই তিন প্রশাসনের ওপরই বর্তায়। কিন্তু দায় এড়াতে পারে না ক্ষমতার বাইরে থাকা ছোট দলগুলো, বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী নেতারা এবং গণমাধ্যম। একটি অসাম্প্রদায়িক, উদার, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দায় শুধু প্রধান দু-তিনটি দলের নেতাদের নয়। ছোট দলগুলোর নেতাদের ভূমিকাও হওয়া উচিত যথাযথ। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সেই ভূমিকা তাঁরা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে তাঁদের ভূমিকায় হতাশ হয়েছি। ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ যখন যেদিকে ভারী দেখেন তখন সেদিকে কাত হয়ে যান—তাঁরা সোজা থাকেন না। ফোনালাপ ও নৈশভোজের কথা শুনে পত্রপত্রিকার খবরে ও টক শোতে স্তুতিবাদের বন্যা বয়ে যায়।
বিষয়টি যে কত জটিল ও গভীর তা নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ দেখা গেল না। কাগজে দেখলাম, ‘খালেদা জিয়ার খাবারের মেন্যু জানতে চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর’। নৈশভোজের চেয়ে আলোচনা জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাওয়াদাওয়ার ঝামেলা এড়ানোই ভালো। ডাইনিং টেবিলে যদি বিরোধীদলীয় নেতাকে বাসভবন থেকে উচ্ছেদের প্রসঙ্গ ওঠে বা জিয়া চ্যারিটেবলের মামলায় হাজিরার কথা আসে তাহলে আমন্ত্রাতা বিব্রত হবেন। বেগম জিয়ার পাতে বড় পাবদা মাছটি তুলে দিয়ে যদি তাঁর জন্মদিনের কথা তোলা হয়—তাহলে ভোজটাই মাটি। সুতরাং এই সময় ভোজ কোনো সমাধান নয়। অচলাবস্থা দূর করতে আলোচনা করা অপরিহার্য। ভোজ একটি ব্যক্তিগত বিষয়। সৌজন্য ও সামাজিকতা। তার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক সামান্যই। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আজন্ম শত্রুতা। দুই দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও লিয়াকত আলী খান। কেউ কারও মুখ দেখারই কথা নয়। ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ তিন টুকরা হতে যাবে। বেদনায় কাতর পণ্ডিত নেহরু। দুই দিন আগে তাঁরা একত্রে খেতে বসেন। অবিভক্ত ভারতে নবাবজাদার সঙ্গে সেটাই পণ্ডিতজির শেষ ভোজ। উচ্চতর সংস্কৃতিমানেরা এ রকম করেন। ব্যক্তিগত আচরণ রাজনৈতিক বৈরিতার ঊর্ধ্বে রাখেন তাঁরা।
আমি যদি আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ হতাম, যে ভোজসভা কোনো দিনই হবে না সেই ভোজের মেন্যু চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২-কে বিরোধীদলীয় নেতার সহকারী একান্ত সচিবের কাছে পাঠাতাম না। সময়টি এখন সহকারী একান্তদের নয়— শীর্ষস্থানীয়দের। মুহূর্তটি সংলাপের আলোচ্যসূচি নিয়ে পত্র পাঠানোর। আমি বিএনপির কোনো নেতা হলে দলীয় প্রধানকে বলতাম, বাস্তবের সঙ্গে সংগতি রেখে আলোচনার বিষয়বস্তু তৈরি করুন। এখন দুপক্ষের দুকূলে বসে বসে ঢেউ গোনার সময় নয়। বিদেশিদের দোষ দেব না। তাঁরা ভাববাচ্যে কথা বলছেন। এদিকেও আছেন, ওদিকেও আছেন। তাঁরা আমাদের নেতাদের প্রায়-প্রভু। তাঁদের সবারে আমি নমি। সময়টি দীর্ঘসূত্রতার নয়, চাতুর্যের নয়, গোঁজামিলেরও নয়। মানুষ চায় মিল। অতীতের তিক্ততা ভুলে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে মিলে কাজ করবেন। আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে মিলে অচলাবস্থা ও জাতীয় সংকট সমাধানে কাজ করবে। তা না হলে দুই নেতার অলৌকিক ভোজের কথা শুনে আমাদের জিহ্বায় পানি এলেও জনগণের অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

অনিশ্চিত স্বদেশ

বাংলাদেশের মানুষ এখন উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। উৎকণ্ঠার কমতি নেই আমরা যারা প্রবাসী, তাদেরও। কী হবে, কী হতে পারে—সে রকম প্রশ্নে চলছে নানা রকম জল্পনা। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এজাতীয় সংকট ও সংঘাত কতটা গণতন্ত্রের আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, আমরা যারা বিদেশে থিতু হয়ে আছি, এখনকার গণতান্ত্রিক কাঠামোর আলোকে তা বিচার করে দেখতেই অভ্যস্ত। তাই দেশের রাজনীতিবিদদের, বিশেষত রাজনীতির ময়দানের প্রধান দুই শক্তি এবং তাদের দোসরদের কীর্তিকলাপকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সুস্থ গণতান্ত্রিক চেতনার পরিচয় নয়। সহনশীলতা হচ্ছে গণতন্ত্রের আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যা বরাবর অনুপস্থিত। ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গণতন্ত্রের দ্বিদলীয় ব্যবস্থাই এর কারণ। যা কিনা আমাদের পরোক্ষভাবে বেঁধে রেখেছে সামন্ততান্ত্রিক গোলকধাঁধায়। আর সে সামন্ততান্ত্রিক আবহই যে তৈরি করে দিচ্ছে চূড়ান্ত অসহনীয় পরিবেশ, তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে এই লাঠিয়ালি গণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে বের হয়ে না আসা পর্যন্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গর্ব করার মতো আমাদের কিছুই থাকবে না। গত দুই দশকের গণতন্ত্রচর্চায় যে ভুল শিক্ষা আমাদের রাজনীতিবিদেরা নিয়েছেন তা হলো, গণতান্ত্রিক কাঠামো হচ্ছে নিজের আর অনুসারীদের আখের গুছিয়ে নেওয়ার জুতসই পথ। আর এ কারণেই গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকে সদর্পে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কতিপয় ভবন কিংবা লাঠিয়াল সর্দারের মতো দানবীয় মানুষ। 
বাংলাদেশের জনগণের সামনে ভোটাধিকারের মুলো ঝুলিয়ে রেখে যাবতীয় অপশাসন তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হয়তো এ কারণেই পচনধরা সেই কাঠামো থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। উত্তরণের একটি পথ অবশ্যই নির্ধারিত আছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নির্বাচনী কাঠামোতে, যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিবিশেষকে নয়, বরং দলকে ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনে ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দল দেশজুড়ে কয়েক লাখ ভোট পাওয়া সত্ত্বেও সংসদে নিজেদের উপস্থিত করতে পারছে না। শুধু তা-ই নয়, যে লাখ লাখ ভোটদাতা এলাকাভিত্তিক এঁদেরকে ভোট দিচ্ছেন, তাঁদের আশাও হচ্ছে পদদলিত। অন্যদিকে বিরাটসংখ্যক ভোটারের সেই বঞ্চনার সুযোগ নিয়ে বড় দুটি দল কায়েম রাখছে ক্ষমতার ওপর মৌরসি পাট্টা। আমাদের সংকটের মূলে অনেকাংশে এই নির্বাচনপদ্ধতি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে বড় দুই দলের কেউই তাদের অবস্থান হাতছাড়া করতে রাজি হবে না। তারা ভালোভাবেই অবগত যে পাঁচ-বছর মেয়াদি প্রতিটি ব্যবস্থায় ক্ষমতা ঘুরেফিরে তাদের হাতেই চলে আসবে। নীতির পার্থক্য লক্ষ করা গেলেও রাজনীতিচর্চার গুণগত বিচারে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্যনেই। অর্থাৎ, তোমার যদি থাকে হাওয়া ভবন, আমার থাকবে শামীম ওসমান; তোমার যদি থাকে ছাত্রদল আর যুবদল, তবে আমার থাকবে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় যে দলের যতটা অর্জন, তার প্রায় সবটাই দলীয় ক্যাডারদের দুরন্ত আচরণে ম্লান হয়ে যায়। এ কারণেই সাফল্য থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করা অসাধ্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মন্দের ভালো হিসেবে মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো আগের দলকেই বেছে নেওয়া ছাড়া জনগণের সামনে কোনো পথ খোলা থাকে না।
অন্য যে বিষয়ে দুই দলের মধ্যে বিস্ময়কর মিল তা হলো, কথায় কথায় গণতন্ত্র আর সংবিধানের দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেও দেশ শাসনের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া হয় কিছু অগণতান্ত্রিক ব্যক্তি কিংবা পরিবারের লোকজনের হাতে। ফলে জবাবদিহির সুযোগ যেমন রহিত হয়ে যায়, তেমনি ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ হয় উন্মুক্ত। দুই দলের লাগামহীন আচরণ, যার আরেকটি নগ্ন প্রকাশ জনগণ সম্প্রতি দেখতে পেল টেলিফোন-নাটকের মধ্য দিয়ে। এই বৈরিতা দেশকে চূড়ান্তভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। কোনো একটি দল যখন ক্ষমতায় বসার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, ক্ষমতা লাভের সেই স্বপ্নে বিভোর থেকে কার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা হচ্ছে, সেই চিন্তা তখন তাদের মোটেই বিচলিত করে না। আর এ কারণেই আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় যে প্রতীকী স্থাপনা, সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেখা গেল স্বাধীনতাবিরোধীদের সদর্প পদচারণ। স্বাধীনতাবিরোধী সেই শক্তি সাম্প্রতিক কালে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুরুতেই উল্লেখ করেছি, আমরা প্রবাসীরা অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু ও সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি। দেশ যখন সংকটের মুখে, আমরা তখন দারুণভাবে উদ্বিগ্ন হই। বাংলাদেশের সুনাম যেমন আমাদের আনন্দিত করে, তেমনি সংঘাত-সংঘর্ষ কিংবা মৌলবাদী শক্তির উত্থান হতাশা জাগায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কীভাবে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা যায়, সে ব্যাপারে রাজনীতিকদেরই ভাবতে হবে। সবকিছু দলীয় দৃষ্টিতে দেখার নাম গণতন্ত্র নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে দেশের মানুষের কল্যাণে আইন প্রণয়ন করা, নিজের নির্বাচনী এলাকায় কতজনের চাকরি নিশ্চিত করা গেল কিংবা কত টন চাল বা গম এলাকার জন্য বরাদ্দ করিয়ে নেওয়া গেল, তা নয়। সামষ্টিকভাবে সারা দেশের দেখভাল করার দায়িত্ব সাংসদদের ওপর ন্যস্ত, নিজের গ্রাম কিংবা মহল্লার দেখভাল নয়। ফলে সংসদে যাঁরা বসবেন, তাঁদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা আবশ্যকীয়। আমরা যদি সরকারি অফিসের কেরানি নিয়োগের বেলায় স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করে দিই, তবে কেরানির চেয়ে অনেক গুণ বেশি দায়িত্বপূর্ণ পদ সংসদ সদস্যের বেলায় কেন আমরা লাগাম ছেড়ে দেব?
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ

মনোনয়ন-বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করা হলো। নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান বিরোধী দলের নীরব সম্মতির মধ্য দিয়ে নেতাদের দলবদল ও কালোটাকা দিয়ে ব্যবসায়ীদের সংসদে অনুপ্রবেশের সুযোগ-সংবলিত আইন পাস হলো। বিগত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারবিমুখ রাজনীতিকদের অনীহা সত্ত্বেও অন্তত তিন বছর দলের সদস্য না থাকলেও সংসদ সদস্য হওয়ার বিধান করা হয়েছিল। আমরা এটি সমর্থন করেছিলাম। কারণ, রাজনীতিতে কালোটাকার মালিক ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছিল। বড় দুই দলেই মনোনয়ন-বাণিজ্য ক্রমাগতভাবে সীমা অতিক্রম করছিল। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চাও যথেষ্ট নাজুক। একশ্রেণীর ব্যবসায়ী শুধু টাকার জোরে দলীয় টিকিট বাগিয়ে ফেলছিলেন। গত নির্বাচনে প্রধান দুই দল খুব কম ক্ষেত্রেই গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির মাধ্যমে মনোনয়ন দিয়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দলীয় হাইকমান্ডের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিরা কিছুটা হলেও সংসদীয় আসনে বিনিয়োগ করতে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু গতকাল সংসদ তার অবসান ঘটাল। অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হচ্ছে গণতন্ত্রসম্মত উপায়ে প্রার্থী বাছাই। ব্যক্তি নয়, মার্কানির্ভর ভোটব্যবস্থা আমাদের গণতন্ত্র বিকাশের পথে বিরাট অন্তরায়। এই সংশোধনী তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি একটি ছুরিকাঘাত। পরিতাপের বিষয়, বিগত নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় উদ্যোগে এই বিধান পাস হলেও এবার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন রহস্যজনকভাবে নীরব। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ক্ষীণ কণ্ঠে যুক্তি দিয়েছেন, জনপ্রতিনিধিরা চেয়েছেন বলেই সংসদীয় কমিটি এ সংশোধন এনেছে। সাবেক সিইসি যথার্থই প্রশ্ন তোলেন, গত নির্বাচনকালে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করেই এই বিধান করা হয়। অথচ এখন বলা হচ্ছে, এটা সংবিধানের পরিপন্থী। সে ক্ষেত্রে একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই সংশোধনীকে গণ্য করা যেতে পারে।
কারণ, প্রতিপক্ষকে বাদ দিয়ে একটি নির্বাচন করতে হলে সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় বা মদদে দল ভাঙাগড়া এবং প্রার্থী বদলের হিড়িক পড়লেও যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, তা এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। এই সংশোধনীতে প্রতিটি দলের অপেক্ষাকৃত সৎ ও ত্যাগী নেতা, যাঁরা টাকার জোরে নয়, সংগঠনের জন্য কাজ করে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটাও লক্ষণীয়, সংশোধিত আইনে জামানতের টাকা, নির্বাচনী ব্যয় ও অনুদানের টাকার অঙ্ক বাড়ানো হলেও কী উপায়ে নির্বাচনী খরচের ওপর ইসি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার বিধান নেই। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের দণ্ড পেলে সাংসদ হতে পারবেন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও সম্প্রতি বলেছেন, দণ্ড পেলেই হলো, আপিল করলেও দণ্ডিত ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারবেন না। অথচ গতকাল কেবল দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অযোগ্য করে আরপিও সংশোধন করা হয়েছে। এতে আইনের চোখে সমতার নীতির ব্যত্যয় ঘটল।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ

মনোনয়ন-বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করা হলো। নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান বিরোধী দলের নীরব সম্মতির মধ্য দিয়ে নেতাদের দলবদল ও কালোটাকা দিয়ে ব্যবসায়ীদের সংসদে অনুপ্রবেশের সুযোগ-সংবলিত আইন পাস হলো। বিগত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারবিমুখ রাজনীতিকদের অনীহা সত্ত্বেও অন্তত তিন বছর দলের সদস্য না থাকলেও সংসদ সদস্য হওয়ার বিধান করা হয়েছিল। আমরা এটি সমর্থন করেছিলাম। কারণ, রাজনীতিতে কালোটাকার মালিক ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছিল। বড় দুই দলেই মনোনয়ন-বাণিজ্য ক্রমাগতভাবে সীমা অতিক্রম করছিল। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চাও যথেষ্ট নাজুক। একশ্রেণীর ব্যবসায়ী শুধু টাকার জোরে দলীয় টিকিট বাগিয়ে ফেলছিলেন। গত নির্বাচনে প্রধান দুই দল খুব কম ক্ষেত্রেই গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির মাধ্যমে মনোনয়ন দিয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দলীয় হাইকমান্ডের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিরা কিছুটা হলেও সংসদীয় আসনে বিনিয়োগ করতে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।
কিন্তু গতকাল সংসদ তার অবসান ঘটাল। অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হচ্ছে গণতন্ত্রসম্মত উপায়ে প্রার্থী বাছাই। ব্যক্তি নয়, মার্কানির্ভর ভোটব্যবস্থা আমাদের গণতন্ত্র বিকাশের পথে বিরাট অন্তরায়। এই সংশোধনী তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি একটি ছুরিকাঘাত। পরিতাপের বিষয়, বিগত নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় উদ্যোগে এই বিধান পাস হলেও এবার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন রহস্যজনকভাবে নীরব। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ক্ষীণ কণ্ঠে যুক্তি দিয়েছেন, জনপ্রতিনিধিরা চেয়েছেন বলেই সংসদীয় কমিটি এ সংশোধন এনেছে। সাবেক সিইসি যথার্থই প্রশ্ন তোলেন, গত নির্বাচনকালে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করেই এই বিধান করা হয়। অথচ এখন বলা হচ্ছে, এটা সংবিধানের পরিপন্থী। সে ক্ষেত্রে একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই সংশোধনীকে গণ্য করা যেতে পারে।
কারণ, প্রতিপক্ষকে বাদ দিয়ে একটি নির্বাচন করতে হলে সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় বা মদদে দল ভাঙাগড়া এবং প্রার্থী বদলের হিড়িক পড়লেও যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, তা এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। এই সংশোধনীতে প্রতিটি দলের অপেক্ষাকৃত সৎ ও ত্যাগী নেতা, যাঁরা টাকার জোরে নয়, সংগঠনের জন্য কাজ করে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটাও লক্ষণীয়, সংশোধিত আইনে জামানতের টাকা, নির্বাচনী ব্যয় ও অনুদানের টাকার অঙ্ক বাড়ানো হলেও কী উপায়ে নির্বাচনী খরচের ওপর ইসি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার বিধান নেই। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের দণ্ড পেলে সাংসদ হতে পারবেন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও সম্প্রতি বলেছেন, দণ্ড পেলেই হলো, আপিল করলেও দণ্ডিত ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারবেন না। অথচ গতকাল কেবল দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অযোগ্য করে আরপিও সংশোধন করা হয়েছে। এতে আইনের চোখে সমতার নীতির ব্যত্যয় ঘটল।

আওয়ামী রাজনীতির স্বরূপ by শিমুল বিশ্বাস

আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ের জন্য আওয়ামী লীগ রাজপথ দখলে রাখতে চায় যে কোনো পন্থায়। তাদের ধারণা, রাজপথ দখলে রেখে নির্বাচনে কারচুপি করলে তা নিয়ে কোনো প্রতিবাদ হবে না। আওয়ামী লীগ পেশিশক্তির বলে নির্বাচনী জয় ও ক্ষমতায় থাকা নিরাপদ মনে করে। এটি আওয়ামী লীগের অতি সনাতন স্ট্র্যাটেজি। রাজপথ দখলে রাখতে আওয়ামী লীগ সব সময় দলীয় গুন্ডাবাহিনী দিয়ে অন্য দলের সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভণ্ডুল করে। মুজিব আমলে ১৯৭৩ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল, সে নির্বাচনেও বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে নামতে দেয়া হয়নি, এমনকি নমিনেশন পেপারও জমা দিতে দেয়া হয়নি। বিরোধী দলের প্রার্থীকে ঘরে বন্দি রেখে আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থীকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জয়ের জন্য রাজপথের দখলদারিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকলে আওয়ামী লীগের পক্ষে রাজপথ দখলে নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে আওয়ামী লীগের বিপদ বাড়ে। এ জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিদায় করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ বলছে, জনগণের ভোটের অধিকার পুরুজ্জীবিত করা হয়েছে। ২০০৯-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তির অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল পাঁচটি বিষয়- ১. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা ৩. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা ৪. দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য দূর করা এবং ৫. সুশাসন প্রতিষ্ঠা। নির্বাচনী ইশতেহারে ‘কেমন বাংলাদেশ দেখতে চাই’তে ছিল- ১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদ ২. রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও গণঅংশায়ন ৩. সুশাসনের জন্য আইনের শাসন ও দলীয়করণ প্রতিরোধ ৪. রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ৫. দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন ৬. নারীর ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রতিশ্র“তিগুলো রক্ষায় আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
অতীতের কিছু ঘটনাবলি
অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে বিজয়ের লাল সূর্য উদিত হয়। এটা মনে রাখা জরুরি, আওয়ামী লীগ একা দেশ স্বাধীন করেনি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি এবং আওয়ামী লীগের গোটা নেতৃত্ব ছিল ভারতে। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। ছাত্র-জনতা বাঙালি সৈনিক সে ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বলেছেন, তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রুমি ইমাম মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মেজর জিয়ার ডাকে। বাংলাদেশের মানুষের একটাই ভাবনা ছিল তখন- কী করে তারা শত্র“কে বিতাড়িত করবে, দেশ স্বাধীন করবে। সেটাই ছিল তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে তারা স্বাধীনতাকেই বুঝিয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নয়।
মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং অসামান্য ত্যাগ স্বীকারকারী ব্যক্তি, রাজনীতিক, প্রতিষ্ঠান ও দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিকে অগ্রাহ্য করে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হয় এককভাবে আওয়ামী লীগ। অতঃপর শুরু হয় বাংলাদেশের মানুষের ওপর অপ্রত্যাশিত এক তাণ্ডব। শুরু হয় লুটপাট, হত্যা, গুম, খুন, মজুদদারি, চোরাকারবারি, হাইজ্যাক ও খোলা সীমান্ত দিয়ে দেশের সম্পদ পাচার এবং বিদেশী নিুমানের পণ্য দিয়ে বাংলাদেশের বাজার দখলের খেলা।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ মুজিব। ১১ জানুয়ারি প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় আদেশ জারি শেষে ১২ তারিখ থেকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নিজে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে করেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের যাত্রার প্রায় শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের আশা ভঙ্গ ঘটে। প্রশাসন ও আইন-শৃংখলায় এবং দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা বিরাজ করতে থাকে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শেখ মুজিব স্বৈরাচারী নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি হাল ধরতে পারেননি। সব ব্যর্থতার সঙ্গে এসে যোগ হয় চরম দুর্নীতি। সেই সর্বগ্রাসী দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা বিস্মৃত হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজ পরিবার-পরিজনদের ভেতরে। শাসক দল আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে জনগণ আশাহত হতে থাকে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। এমন এক পরিস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। বছর খানেকের মধ্যেই অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। তার স্থলে আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। তিনি সরকারপ্রধানের ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশ [প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার (পিও)] বলে নতুন নতুন আইন জারি করতে কোনো দ্বিধা করেননি। বছর দুয়েকের মধ্যে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্যাতনের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
১৯৭২ সালে একদিকে বন্যা, অন্যদিকে ব্যাপক চোরাচালান ও লুটপাটের ফলে খাদ্যদ্রব্যসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চরম মূল্যবৃদ্ধি পায়। চাল ডাল, পরিধানের বস্ত্র ও অন্যান্য দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, মজুদদারি ও সমাজবিরোধীদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। দুর্নীতি ও সরকারি নিপীড়নের ব্যাপকতায় ১৯৭৪ সাল নাগাদ দেশে এক গুরুতর অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দেশে আইন-শৃংখলা ব্যবস্থা বলতে কোনো কিছুই ছিল না, ছিল চরম নৈরাজ্য। সরকারি ও বেসরকারি বাহিনী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চালায় ডাকাতি, রাহাজানি, হাইজ্যাক, লুটপাট, ধর্ষণ ইত্যাদি। ব্যাংক, বীমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চালায় অবাধ লুটপাট। সরকার ও তার প্রশাসনযন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ একেবারেই প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের বরকন্দাজ বাহিনীতে পরিণত হয়।
১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করে। কিন্তু যেহেতু আওয়ামী লীগ জনগণের রায় বিশ্বাস করে না, তাই তারা নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও ব্যাপক কারচুপি করে। এমনকি সশস্ত্র রক্ষীবাহিনী প্রকাশ্যে ভোট কারচুপিতে অংশগ্রহণ করে। ভোটগণনা শেষে ফলাফল ঘোষণাকালেও শাসক দলের পক্ষে চরম দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চট্টগ্রাম থেকে একটি আসনে মোজাফ্ফর ন্যাপের একজন প্রার্থীকে রাতে নির্বাচনে জয়ী ঘোষণা করা হলেও পরদিন সকালে তাকে পরাজিত বলে ঘোষণা করা হয়। জাসদ সভাপতি মেজর জলিল, ন্যাপের রাশেদ খান মেনন, ড. আলীম আল রাজী, অলি আহাদসহ ৮ জনের বিজয় নাকচ করে দেয়া হয়।
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও অপশাসন
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের জন্য এককভাবে দায়ী আওয়ামী লীগের দুঃশাসন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় ৬ লাখ মানুষ মারা যায়। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের কারণসমূহের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল : ১. দুর্নীতি ২. স্বজনপ্রীতি ৩. চোরাচালান ৪. বর্ডার ট্রেড ৫. রিলিফ আত্মসাৎ ইত্যাদি। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম সেসব কলংকিত ইতিহাসের দিনগুলোর কথা জানে কি? বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সেগুলো জানার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি।
১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর মুক্তি, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
স্বাধীনতার পর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে মিত্র বাহিনীর কাছে। এর মধ্যে ১৯৫ জনকে গুরুতর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাকবাহিনীর সহযোগী হিসেবে ৩৭ হাজার এ দেশীয় নাগরিককে গ্রেফতার করা হয় এবং দালাল আইনে বিচার শুরু হয়। বিচার চলার মাঝামাঝি অবস্থায়ই ৯ এপ্রিল, ১৯৭৪ উপমহাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নয়াদিল্লিতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমেদ। এই চুক্তির বলেই বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, ২ জুলাই, ১৯৭২ পাকিস্তান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার নমনীয়তা প্রদর্শন শুরু করে। পরে শেখ মুজিব সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত ছাড়া ২৬ হাজার ব্যক্তি (যারা রাজাকার-আলবদর-আল শামস, পিস কমিটির সদস্য) সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পান।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা নতুন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেন। ২৫ মার্চ, ২০০৯ জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত হয়, সরকার ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইন সংশোধনপূর্বক যুদ্ধাপরাধীদের ১৯৭৩ সালের আইনের আওতায় বিচার করবে। আইনমন্ত্রী কর্তৃক উত্থপিত তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ১৬ মে, ১৯৭৩ এবং ৩০ নভেম্বর, ১৯৭৩ অপরাধ মার্জনা সংক্রান্ত ঘোষণা প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইনটি বাতিল করেন। এর ফলে দণ্ডিত ব্যক্তিরা ব্যতীত অন্যরা পর্যায়ক্রমে খালাস পায়। আওয়ামী লীগ নেতারা সব জানা সত্ত্বেও দেশবাসীকে সেই সত্য জানাননি।
সরকার পরিচালনায় সীমাহীন ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও ভয়াবহ দুর্নীতির কারণে মুজিব আমলের শেষ সময়ে ভারত ব্যতীত আন্তর্জাতিক দুনিয়ার প্রায় সব দেশ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধাপরাধ ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার ইস্যু, আওয়ামী লীগের কয়েক বছরের অপশাসনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। সরকারের ভ্রান্তনীতি ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। দুর্নীতির কারণে দেশের শিল্প ও কৃষি উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে পড়ে অচল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হয় দ্রুত নিুগামী।
ক্ষুধার্ত দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রেরিত বিপুল ত্রাণসামগ্রী বাংলাদেশের ভেতরে ও সীমান্তের ওপারে অবাধ লুণ্ঠনের বস্তুতে পরিণত হয়। দেশে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। অতীতের দুর্ভিক্ষের ন্যায় চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষও খাদ্যশস্যের অভাবের জন্য হয়নি। দুর্ভিক্ষের সময় দেশে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ ছিল বলে এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে অনাহারে লাখ লাখ লোক মারা যায়। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার ‘দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ’ গ্রন্থে লিখেছেন : বাংলাদেশে তখন যথেষ্ট খাদ্য মজুদ ছিল কিন্তু প্রশাসনিক ত্র“টি ও বণ্টনের সুব্যবস্থার অভাবে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ হয়।
১৯৭৪ সালের ২২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ফণীভূষণ মজুমদার জানান, দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা ২০,৫০০। বেসরকারি সূত্র মতে এ সংখ্যা ছয় লাখ। সরকার সে সময় ৫,৮৬২টি লঙ্গরখানা খোলে। সে সময় নারীর লজ্জা নিবারণের জন্য বস্ত্রের অভাবে বাসন্তী-দুর্গাদের মাছ ধরার জাল পরার চিত্র বিশ্ব-বিবেককে স্তম্ভিত করে। কাফনের কাপড়ের অভাবে কলাপাতা মুড়ে লাশ দাফন ছিল তখনকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ওপর চতুর্থ সংবিধান সংশোধনী বিল চাপিয়ে দেন। সে সংশোধনী কোনো আলোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের মধ্যে পার্লামেন্টে গৃহীত হয়। সেই বিলে শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। সংশোধনীটি আইনগতভাবে ছিল অবৈধ এবং রাজনৈতিকভাবে ছিল দেশে গণতন্ত্র হত্যার শামিল। পার্লামেন্টের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংশোধনী বিলটি ফার্স্ট রিডিং বা প্রথম পাঠে সংসদে উত্থাপন, দ্বিতীয় পাঠে আলোচনা এবং তৃতীয় পাঠে ভোট গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া অগ্রাহ্য করে শুধু সংসদ সদস্যদের টেবিলে দিয়ে পাঠ বা আলোচনা ছাড়াই সরাসরি কণ্ঠ ভোটে পাস করানোর ফলে সংশোধনীটি হয়ে পড়ে অবৈধ। কিন্তু স্পিকার মালেক উকিল আইন, বিধি সব ভুলে বিলের পক্ষে কাজ করে যান। সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ নজির স্থাপিত হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে এভাবেই একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা হয়। এজন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবকে অনেক মাশুল দিতে হয়েছে।
২০১৩ সালে ক্ষমতার শেষ বেলায় এসে বাকশালের নব প্রজন্মওয়ালারা আবার আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদী পথে ধাবিত করতে তৎপর হয়েছে।
আওয়ামী-জামায়াত সখ্য
আওয়ামী লীগ তাদের নিজস্বার্থে সব কিছুই করতে পারে। যে জামায়াতকে নির্মূল করার জন্য আজ তারা উঠেপড়ে লেগেছে, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই জামায়াতের সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সময় গভীর সখ্যের প্রমাণ রয়েছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল এবং যথারীতি সংসদেও যোগ দিয়েছিল। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনে জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন দিলে আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ হয় জামায়াতের ওপর। এরপরও রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াতের সমর্থন লাভের জন্য অধ্যাপক গোলাম আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সমর্থন আদায় এবং জামায়াতকে তাদের পক্ষে আনার জন্য আওয়ামী লীগ আপ্রাণ চেষ্টা করে। ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গোলাম আযমের ফাঁসির দাবিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে গণআদালত বসে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে সুকৌশলে সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ আবদুর রাজ্জাককে দিয়ে কুক্ষিগত করে। আওয়ামী লীগের নির্দেশে তাদের নেতাকর্মীরা গোলাম আযমের বাড়ি ঘেরাও করে তাকে ধরে এনে প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসির রায় কার্যকর করার ঘোষণা দেয় এবং গোলাম আযমের বাড়ি ঘেরাও করতে মিছিল করে। বিএনপি সরকার গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে। ফলে বিএনপির ওপর জামায়াত ক্ষুব্ধ হয় এবং বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ সে সুযোগে আবার জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে। ১৯৯৬ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে যৌথ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে জামায়াত এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতাদের সুসম্পর্ক দেখা যায়। ১৯৯৬ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি যুগপৎ আন্দোলনের নামে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জোট নির্দলীয়-নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয়। ২৪ ফেব্র“য়ারি, ১৯৯৪ শেখ হাসিনা সংসদের সব বিরোধী দল ও গ্র“পের সঙ্গে যৌথ বৈঠক করেন। সে সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যৌথ আন্দোলন করতে তারা ঐকমত্যে পৌঁছায়। ২৭ জুন ১৯৯৪ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে যৌথ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা শুরু করে ভয়াবহ আন্দোলন ও পরিকল্পিত নাশকতামূলক কার্যকলাপ। হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে দেশে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তারা সংসদ থেকে পদত্যাগ করে এবং শেষ পর্যন্ত জনতার মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে আমলা বিদ্রোহের মতো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে প্রকাশ্যে মদদ দেয়। ১২ জুন, ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সহায়তায় আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে এবং মিত্রদের সমর্থনে সরকার গঠন করে।
১৯৯৬-২০০১ সময়কালে আওয়ামী লীগ একটিবারের জন্যও জামায়াতের নেতাদের যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী ভাবেনি বা তাদের বিচারের জন্য টুঁ-শব্দটিও করেনি। তখন জামায়াত ছিল আওয়ামী লীগের মহান বন্ধু। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিশ্র“তির বরখেলাপ, দুর্নীতি, অবাধ লুটপাট, হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির কারণে ১৯৯৯ সালে যখন তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নামে, সে পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ নভেম্বর, ১৯৯৯ বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে গঠিত হয় চারদলীয় জোট। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে চাপে ফেলে জোট থেকে বের করে নিতে পারলেও জামায়াতকে পারেনি।
তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের চার বছরের শাসনামলে দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস, বিদ্যুতের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি দলের ক্যাডারদের হত্যা, রাহাজানি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, শেয়ারবাজার থেকে লাখো কোটি টাকা লুণ্ঠন করে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীকে সর্বঃস্বান্তকরণ, হলমার্ক, ডেসটিনি, ইউনিপে-টু নামক ভূঁইফোড় সংগঠনের নামে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট, পদ্মা সেতুর নামে লুটপাট এবং সরকারি বাহিনী কর্তৃক গুম-খুনের কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নামে।
কোনো পরিবর্তন নেই
আওয়ামী লীগের প্রথম শাসনকাল, দ্বিতীয় শাসনকাল এবং তৃতীয় শাসনকালের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগ একই ধারাবাহিকতায় চরম নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে দেশ শাসন করে। বিরোধী দলের মতামতকে কখনোই তারা সহ্য করতে পারে না। আওয়ামী লীগের নিষ্ঠুরতা ও ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ জাসদ ও বামপন্থীদের একাংশ তাদের নিজস্ব রাজনীতি ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমবেত হয়েছে। আওয়ামী লীগের মহা গুণগান করছে। তাদের দলের নিজস্ব নির্বাচনী প্রতীক ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের প্রতীক গ্রহণ করে নির্বাচন করেছে। তারা এমপি, মন্ত্রী হয়েছেন। এটা জাসদ ও বামপন্থীদের জন্য কতটুকু সম্মানজনক?
যে আওয়ামী লীগ ’৭২-’৭৫ সময়কালে রাজাকার, আলবদর, আল শামস, জামায়াতকে নিরাপদ রেখে জাসদ, বামপন্থীদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল, সেই আওয়ামী লীগ ২০১৩ সালে এসে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ১৮ দলভুক্ত জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, জাগপা, এলডিপি ও অন্য সমমনাদের নির্মূল করতে গোপনে, প্রকাশ্যে হত্যার কৌশল নিয়েছে। আওয়ামী লীগের এই দ্বিমুখী নীতি ও আদর্শ বিচ্যুতির কারণেই ওই দলের প্রতিষ্ঠাতা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালে দল ত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবের দুঃখজনক মৃত্যু ও বাকশাল সরকারের পতন হয়। তখন বিএনপি নামে কোনো দলই ছিল না। বিএনপি গঠিত হয়েছিল জাতির এমন এক ক্রান্তিলগ্নে যখন বাকশাল সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া একজন সামরিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও জাতিকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে সামরিক শাসনের বদলে জাতিকে উপহার দেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। সংবিধানে ৫ম সংশোধনী এনে প্রেসিডেন্ট জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন এবং সব সংবাদপত্রের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে মানুষের বাক স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। রাজনীতিশূন্য বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায় বাংলাদেশের জনগণ। জাতির উন্নয়নের পূর্বশর্ত যে গণতন্ত্র তা মুক্তি পায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার হাতে।
আসুন আমরা সব ধরনের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করি। বিভেদ আর হানাহানির রাজনীতিকে পরাজিত করি। প্রভাবমুক্ত অবাধ, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বীকৃত ব্যবস্থা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি’ ফিরিয়ে আনি। আমরা সবাই মিলেমিশে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে একুশ শতকের উপযোগী মডেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলি। রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনি দেশপ্রেম, সততা, সহমর্মিতা, শৃংখলা এবং গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার।
শিমুল বিশ্বাস : বিআইডব্লিউটিসির সাবেক চেয়ারম্যান; বিরোধীদলীয় নেতার বিশেষ সহকারী

ককটেল মারে কারা? by নুরুল ইসলাম বিএসসি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে ফোনে আলাপ করছিলেন, ঠিক ওই সময়েই মন্ত্রী, বিচারপতি, সিইসির বাসা, পুলিশ অফিসের সামনে ককটেল বিস্ফোরিত হচ্ছিল। এর অর্থ এই হতে পারে যে, দুই নেত্রীর সংলাপ ককটেল পার্টিরা চায় না এবং যে কোনো মূল্যে দুই নেত্রীকে মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে বাধার সৃষ্টি করতে চায়। প্রশ্ন হল, এরা কারা? নিশ্চয়ই এরা বিএনপি বা ছাত্রদলের কর্মী নয়। জামায়াত-শিবিরই এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাই রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণ করেছেন। একদিন আগেও যে নেত্রী এই সরকারকে অবৈধ ঘোষণা দিলেন, তাকে ফোন করে বড় আত্মার পরিচয় শুধু নয়, শেখ হাসিনা আবারও প্রমাণ করলেন তিনি দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। দেশের স্বার্থে তিনি যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। বেগম জিয়া হরতাল প্রত্যাহার করে গণভবনে আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করলে দেশের মানুষের মনে শান্তি ফিরে আসত, সেই সঙ্গে বেগম জিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পেত। কী অদৃশ্য কারণে তিনি প্রস্তাবে ওই মুহূর্তে রাজি না হয়ে সময় ক্ষেপণের কৌশল নিলেন, বোঝা মুশকিল। আমার তো মনে হয়, তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানি আইএসআই’র সংশ্লিষ্টতার যে কথা হচ্ছে, ওই সূত্র ধরেই তিনি এগিয়ে যেতে চান। এ মুহূর্তে বেগম জিয়া পুরোপুরি জামায়াত-শিবিরের কবজায় চলে গেছেন। বিএনপির রাজনীতি এখন বিএনপির হাতে আছে বলে মনে হয় না। জামায়াতই বিএনপির মূল শক্তি ও ভোট ব্যাংক। বেগম জিয়া চাইলেও তাদের বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন বলে প্রতীয়মান হয় না।
বেগম জিয়া যেখানে যেখানে পাবলিক মিটিং করেন, জামায়াতিরাই ওখানে যুদ্ধাপরাধীদের ছবি নিয়ে নানা ধরনের স্লোগান দেয়। এমনকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মিটিংয়ে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধেও স্লোগান দিয়ে জামায়াতিরা প্রমাণ করেছে, তারা এ দেশের আইন-কানুন কিছুই মানতে নারাজ। বেগম জিয়া একবারের জন্যও যুদ্ধাপরাধে বিচারাধীন ব্যক্তিদের পক্ষে ছবি প্রদর্শন ও স্লোগান বন্ধের নির্দেশ দিলেন না। এতে কী প্রমাণিত হয়? সিলেটের জনসভায়ও ছাত্রদলের কর্মীদের সামনের সারি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে শিবির পুরো মাঠই দখলে রেখে প্রমাণ করেছে, এটা বিএনপির জনসভা নয়, এটা জামায়াতের জনসভা। এখন বেগম জিয়া দুই ভূমিকায়- একবাহু বিএনপি, আর শক্ত বাহু জামায়াত-শিবির। জামায়াত এ দেশের জন্মে বিশ্বাস করেনি। বাংলাদেশের জন্ম হোক জামায়াতিরা কোনোদিন চায়নি। মওদুদী পুত্র আশ্চর্য হয়ে বলেছেন, জামায়াতিরা এদেশে রাজনীতি করে কীভাবে?
জামায়াতিরা এদেশের ক্ষতি করতে পারলে খুশি। পাকিস্তান প্রতিশোধ গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে আইএসআই’র সাহায্যে জামায়াতিদের দিয়ে এদেশে উন্নয়নমূলক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে চায়। বিভিন্ন পত্রিকার খবরে দেখা যায়, তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআই’র নিয়মিত যোগাযোগ আছে। শিবিরের ছেলেরা রাস্তায় গাড়ি ভাঙে। গাড়ি কী দোষ করল? গাড়িগুলো কি জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেছে? মোদ্দা কথা, এ দেশের অর্থনীতির চাকা স্তব্ধ করাই এদের মূল উদ্দেশ্য।
যে কথা বলছিলাম, বেগম জিয়া যদি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সায় দিয়ে হরতাল নামক ভয়তাল প্রত্যাহার করতেন, তাহলে একটা ভালো পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা ছিল। খাওয়ার টেবিলে বসে হয়তো অনেক কিছু সমাধান করা যেত। দেখা যাক, এখনও সময় আছে, ২৯ তারিখের পর বেগম জিয়া কীভাবে সাড়া দেন, সেটার ওপরই আগামী দিনের শান্তি নির্ভর করছে। আমরা সবাই রাজনীতি করি দেশের কল্যাণে, মানুষের সমৃদ্ধি বর্ধনে। মারামারি করে যদি সব শেষ হয়ে যায়, রাজনীতিটা কার স্বার্থে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে অনেক কিছু ছাড় দিতে এগিয়ে এসেছেন। সাংবিধানিক এই সরকার অবৈধ হয় কীভাবে? দেশে একটা সরকার তো থাকতে হবে। শেখ হাসিনার সরকার অবৈধ হলে, এ মুহূর্তে চলে গেলে দেশের ভার কে নেবে? নিয়ম অনুযায়ী একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। নির্বাচনই ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ। নির্বাচনের জন্য সবাইকে তৈরি থাকতে হবে এবং জনগণের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

আশার দোলাচলে by ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আলোছায়ার খেলা চলছে। এ ধরনের খেলা আমরা দেখেছিলাম বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে। চুড়ান্ত পর্যায়ে কাজের কাজ কিছুই হয়নি, মাঝখান থেকে এসেছিল অসামরিক চেহারায় সামরিক প্রভাবাধীন সরকার। এবারও বক্তৃতা-বিবৃতি সর্বশেষ টেলিফোনে আশা-নিরাশার দোলাচলে জনগণ। প্রশ্ন উঠেছে আন্তরিকতা নিয়ে। আসলেই কি ফোনের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল নাকি সবই লোক দেখানো, জনগণকে বোকা বানানো? লাল টেলিফোন নষ্ট থাকলে সরকারের তো জানার কথা। তাহলে আগের দিন অথবা ওই দিন দুপুরে কেন ফোন করা গেল না? তাহলে তো জোট সদস্যদের সঙ্গে যে আলোচনার কথা বিরোধীদলীয় নেতা হরতাল প্রত্যাহার প্রসঙ্গে বললেন, সেটির সুযোগ থাকত না। দু’নেতাই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন কয়েকবার, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তাদের জীবনে এসেছে নানা চরাই-উৎরাই। দু’জনেই হারিয়েছেন প্রিয়জন। দু’জনেই সাত বছর আগে কারাভোগ করেছেন। আরও আগে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গৃহবন্দি-নজরবন্দি থেকেছেন। দেশের উন্নয়নে রয়েছে দু’জনেরই ভূমিকা। একজনের পিতা স্বাধীনতার মহান স্থপতি, আরেকজনের স্বামী সেক্টর-কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক। মূল কথা, দু’জনেরই দেশের উন্নতিতে রয়েছে ভূমিকা। ফলে তাদের কাছে জাতির আশা-আকাক্সক্ষাও অনেক। দেশ আর রক্তপাত চায় না। জনগণ, দলীয় কর্মী, কিংবা পুলিশ সবাই এদেশের সন্তান- কারও মৃত্যুই কাম্য নয়।
নির্বাচন নিয়ে যে কালবৈশাখীর আভাস দেখা দিয়েছে তা ফোনালাপের মাধ্যমে একেবারে কেটে গেছে বলে মনে করলে ভুল হবে। তবে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বক্তব্য এবং গত শুক্রবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তব্য ও পরবর্তী ফোনালাপ একটু হলেও অগ্রগতির ইঙ্গিত। কারণ আলোচনার বল গড়াতে শুরু করেছে। ভয় থাকত যদি বলটি থেমে যেত। দু’জনই অনড় অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে আপাত প্রতীয়মান হচ্ছে। যদিও চাপ প্রয়োগের কৌশল রাজনীতিরই অংশ আর সেটা একে অপরের ওপর প্রয়োগ করেছেন, এখনও করে চলেছেন। সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আমার মনে হয়, দু’জনই বুঝতে পারছেন তৃতীয় শক্তির সমর্থনে আসা সরকার নিশ্চিতভাবেই দেশ-জাতিসহ দু’নেতার ব্যক্তিগত মঙ্গল বয়ে আনবে না। কারণ, দু’জনই তাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন। যদিও বিরোধীদলীয় নেতার পরিবারের ওপর খড়গ ব্যাপকভাবে নেমে এসেছিল। তার কারণ বোধহয়, তিনি ছিলেন সদ্য ক্ষমতাহারা- এ ঘটনা প্রধানমন্ত্রীরও মনে রাখা জরুরি। কারণ উর্দি সমর্থিত সরকারের চেয়ে দু’পক্ষের সমঝোতায় আসা যে কোনো নামের সরকারই ভালো। অন্যথায় কোনো সেটআপই কাজ করবে না। ক্ষমতা ভিন্ন জিনিস, বিএনপির মনোনীত বাহিনী প্রধানের ইঙ্গিতেই বিএনপি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তার অনমনীয় মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন এবং দেরিতে হলেও ফোন করেছেন। এটি আলোচনার বন্ধ-কপাট খোলার স্পষ্ট ইঙ্গিত। যদিও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেননি সেই সরকারের রূপরেখা। নিজে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান থাকবেন কি-না সেটাও বলেননি। আর যেহেতু বলেননি, তাহলে বোঝা যায় তিনি সে পদে নাও থাকতে পারেন। যদিও দলীয় কিংবা মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন তিনিই থাকবেন, তবে এটি চাপে রাখার কৌশল হতে পারে, যা খুব একটা দোষণীয় নয়। প্রধানমন্ত্রী আলোচনার বলটি গড়িয়ে দিয়েছেন, তবে মাঝখানে একটু গোল বাধাল সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা। একটি টকশোতে সরকারের একজন উপদেষ্টার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেল, এগুলো হয়তো অতি উৎসাহী কোনো না কোনো এজেন্সির পরামর্শে ঘটেছে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা নিশ্চয়ই খুব একটা মঙ্গল বয়ে আনবে না। কারণ ক্ষমতায় কোনো সামরিক সরকার নেই, রয়েছে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা। আর গণতন্ত্রের মূল কথাই হল সবাইকে বলতে দেয়ার অধিকারে বাধা না দেয়া। কিছুদিন আগের সম্মিলিত পেশাজীবী কনভেনশন নিয়ে আরেক অনিশ্চয়তা আলোচনা ও সমাধানের পথকে আরেক দফা আহত করতে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষবেলায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছায় সুন্দরভাবে কনভেনশনটি সম্পন্ন হয়েছে। এটাও কিছুটা অগ্রগতির লক্ষণ। কারণ, সুচিন্তা-বিবেচনার জয় হয়েছে।
বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই কোনো বক্তব্য না দিয়ে ধৈর্য নিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে ধীরে এগিয়েছে। মনে হয় বিএনপিও আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান চায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। অর্থাৎ, তারা তার নমনীয় অবস্থানকে গ্রহণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় নেতা যথেষ্ট মার্জিত ও রুচিশীল বক্তব্য দিয়েছেন। অনেকের আশংকাকে দূরে ঠেলে রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তব্যের মাধ্যমে নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন এবং পথ বাতলে দিয়েছেন। যদিও কেউ কেউ বলেছেন, এটি সম্ভব নয়। তবে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার পথ তৈরি করতে হবে। উভয় পক্ষ ‘তালগাছ’ চাইলে হবে না। একটি বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আলোচনার বিষয়টি যেমন প্রধানমন্ত্রী উড়িয়ে দেননি, তেমনি বেগম খালেদা জিয়াও বাতিল করেননি। তবে তিনদিনের হরতাল কর্মসূচি একটি রাজনৈতিক চাপ সরকারি দলের ওপর। মনে রাখা দরকার, এতে জানমালের ক্ষতি হয় এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন দলীয় কর্মীসহ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশে যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে সব দলকে নিয়ে আলোচনার যে রেওয়াজ রয়েছে, সেটি আমাদের দেশের জন্য আরও বেশি প্রয়োজন টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থে।
সংবিধান কোনো ঐশী গ্রন্থ নয়। অতীতে পরিবর্তিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও পরিবর্তিত হবে- জনআকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা সম্প্রতি লিখেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনী হতে পারলে জাতির স্বার্থে কেন ষষ্ঠদশ সংশোধনী নয়? আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা প্রায়ই ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলেন, কিন্তু তারা কি জানেন ব্রিটেনের কোনো লিখিত সংবিধান নেই- সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয় প্রথা, রীতি-নীতির ওপর ভিত্তি করে। জনগণকে আস্থায় রাখতে হবে। কারণ জনরায় ছাড়া বিকল্প পথে ক্ষমতায় যাওয়া বাংলাদেশে এখন অসম্ভব। কেউ কেউ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানিয়ে নির্বাচন করার বিকল্প চিন্তার কথা বলছেন। তবে মনে রাখা উচিত ১৯৮৬ সালে এ ধরনের সরকার বেশিদিন টিকে থাকেনি। জনপ্রত্যাশার প্রতি সম্মান রেখে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল। আর বিএনপি তো নির্বাচনেই যায়নি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে এরশাদ সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। আজ এই ২৩ বছর পর ইলেক্ট্রনিক-প্রিন্ট মিডিয়া, ফেসবুক-টুইটারের যুগে এ ধরনের নির্বাচন একেবারে অসম্ভব। কাজেই এসব ভাবনাকে পেছনে ফেলে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়কোচিত ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করি। কোনো গোষ্ঠীর লাভালাভ নিয়ে না ভেবে দেশের কথা ভাববেন। কারণ সরকারপ্রধান হিসেবে তার দায়িত্ব বেশি। বিরোধী দলের নেতাকে দেয়া তার আমন্ত্রণ বহাল থাকবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বেরিয়ে আসবে। আর দ্রুত সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ করার ক্ষেত্রে পরিবেশ তৈরি করে নজির স্থাপন করবেন। কারণ, যে কোনো স্বাভাবিক রীতিকে বাধাগ্রস্ত করলে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং ঘোলাপানির মাছ শিকারিদের শিকারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করে- যা দু’দলের কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে, তাহলে পক্ষপাতহীন আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন। আমরা সাধারণ মানুষ গুমোট পরিবেশ চাই না। হত্যা, নারকীয় পাশবিকতা দেখতে চাই না। চাই হানাহানিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, যেখানে জনগণ দেখে-শুনে-বুঝে ভোট দেয়ার অধিকার পাবে।
ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া : অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

তিনি তো একচুল নড়লেন, উনি কী করলেন? by বদিউর রহমান

রাজনীতিতে শেষ কথা নেই বলে যে শেষ কথা আমরা হরহামেশা শুনে আসছি, তার বাস্তবায়নও তো আমরা হরহামেশাই দেখছি। খুনি ডাকাতকে আমরা আউলিয়া হতে যেমন দেখি, পাণ্ডা-গুণ্ডা-সন্ত্রাসী-বদমাশকে রাজনীতিক বনে যেতে যেমন দেখি, ঠিক তেমনিই নুরানি চেহারার ভালো মানুষ মনে করা মানুষগুলোকেও আবার চোর-হার্মাদ-লুটেরা হয়ে যেতে দেখি। তেমনি আবার আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে পরে গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিতেও দেখি। অন্য দেশে এটা কত বেশি হয় তা না বলেও নিজ দেশে কী হচ্ছে, তা ভাবলেই যেন যথেষ্ট। তারপরও রাজনীতিই আমাদের শেষ ভরসা। দু’দিনের যোগী ভাতকে অন্ন বলার মতো তিন মাইস্যা বা সুযোগ বুঝে দু’বছইর‌্যা তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবশ্যই কোনো সমাধান নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যারা উপদেষ্টা হন, তাদের রুচি-অভিরুচি নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। হতে পারে তাদের কেউ কেউ হয়তো সমাজে তুলনামূলকভাবে ভালো, হয়তোবা নিরপেক্ষও; কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তারা যে কাজটি করে দিয়ে যান তা হল অপরাজনীতি আর অপকর্মকে জায়েজ করে দেয়া মাত্র। যে রাজনৈতিক দল বা জোট তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসে, সে দল বা জোট তখন নিরপেক্ষ নির্বাচনে জিতে আসার লাইসেন্স পেয়ে যায়। স্থূল বা সূক্ষ্ম কারচুপির স্থূল বা সূক্ষ্ম অভিযোগ তাদের ওই লাইসেন্সকে খর্ব করতে পারে না, পাঁচ বছরের জন্য তারা শাহেনশাহ। এ পাঁচ বছর ওই সরকার যত নষ্টামিই করুক না কেন তা যেন বৈধ, তারা যে নিরপেক্ষ নির্বাচনে ম্যান্ডেট পেয়েছেন!
কী দরকার এ কথিত অরাজনৈতিক ব্যক্তিগুলোর ওইসব রাজনৈতিক জোট বা দলকে কার্যত নিরপেক্ষ নির্বাচনে একটা বৈধতার সিল মেরে দেয়ার? আমি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগেও চাইনি, এখনও চাই না। ইনশাআল্লাহ পাগল বা শিশু না হওয়া পর্যন্ত চাইবও না। ফখরুদ্দিন-মির্জা আজিজরা কারা, এরা কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন? আকবর আলি-সুলতানা কামালরাই বা কারা যে তারা রাজনীতির পাঁচ বছইর‌্যা মেয়াদের সরকার নির্ধারণের রেফারিগিরি করবেন? তারা ভালো মানুষ হলে ভালো থাকুন, পাঁচ বছরের জন্য অপকর্মের/ভালোকর্মের লাইসেন্স দিতে রেফারিগিরিতে আসবেন কেন? যারা রাজনীতি করেন, যারা রাজনীতিকে বাজনীতিতেও পরিণত করেন, যারা সরকারে এসে দেশের মঙ্গল করার সঙ্গে সঙ্গে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে দেশের অমঙ্গলও করেন, তাদের নির্বাচনের রেফারিগিরি তারাই করুন। অতএব রাজনৈতিক পিঠা ভাগের জন্য অরাজনৈতিক বানর কোনোভাবেই প্রত্যাশিত হতে পারে না, কাম্য হতে পারে না।
রাজনীতিতে শেষ কথা নেই বলেই তিনি একচুলও নড়বেন না বলেও একচুল অবশ্যই নড়েছেন। এটা তার হার ভাবা বোকামি। আমি মনে করি, এটা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বড় কৌশল। কেউ হয়তো বলতে পারেন, এই-ই যদি করবি বাপু, তবে কেন ‘খেল’ দেখালি? আমি বলব এ ‘খেল’টাই হচ্ছে রাজনীতি, এ ‘খেল’টাই হচ্ছে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আগেই যদি এ শেষ কথাটা (আপাতত) বলে ফেলি, তাহলে ওনাকে মেয়াদের শেষের ক’টা বছর ব্যস্ত রাখতাম কী দিয়ে? আগেই যদি সরকারের মেয়াদ শেষের পর কীভাবে কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে ঘোষণা করে দেই, তাহলে কি উনি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির অনেক সময় পেয়ে যেতেন না? তাকে তো ব্যস্ত রাখতেই হবে। তাই যদি তিনি না চাইতেন, তাহলে কি সরকারের মেয়াদ শেষের এত আগে তড়িঘড়ি করে আদালতের রায়ের অজুহাতে ইউ-টার্ন নিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী করে ফেলতেন? গ্রামের এক ভাসুরের ছোট ভাইয়ের বউকে বড় পছন্দ, বারবার কেবল বউয়ের দিকে তাকান। ভাসুর তো শ্বশুরতুল্য, মান্যবর, মাননীয়, সময়-সুযোগে মহামান্যও বটে, তারপর আবার রক্ষণশীল গ্রাম্য পরিবার বলে কথা। অতএব ছোট ভাইয়ের বউ অনেক বড় করে ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে চলেন ভাসুরের সামনে। কিন্তু শাড়ির প্রস্থ তো সীমিত, ফলে বউয়ের পিঠ হয়ে পড়ে উদাম। ভাসুর ছোটমুখ ছেড়ে এবার উদাম বড় পিঠই দেখেন আর বলেন, এই-ই ভালো, তাই বড় ঘোমটা দিয়ে ছোট মুখ-চোখ-নাক ঢেকে চল, পর্দাও হোক, আর আমি তোর উদাম করা বড় পিঠটাই নির্বিঘ্নে দেখে যাই। তিনি পঞ্চদশ সংশোধনী করে ওনাকে কি সে অবস্থায় ফেলে দিয়ে ‘ভাসুর’ হলেন নাকি? তারপরও তিনি একচুল নড়লেন, পিঠ যা দেখার তাতো দেখেই নিলেন। তার এ একচুল নড়াতে অর্থাৎ সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাবে তিনি হারেননি, তিনি জিতেছেন। ওনার সাঙ্গপাঙ্গরা হয়তো ঢোল বাজাচ্ছেন যে তিনি আমাদের ভয়ে এটা করেছেন, এক ধাপ এগিয়েছেন, একবারে তত্ত্বাবধায়কে চলে এলে শরম লাগবে না তার, তা-ই একটু একটু করে এগুচ্ছেন। ওনার চেলা-চামুণ্ডারা অর্থাৎ প্রধান রাজনীতিক হয়েও ওনার আন্ডা-বাচ্চা ছেলেকে ‘বাপ’ মানার, পুজো করার ব্যক্তিগুলো হয়তো এমন ডুগডুগিও বাজিয়েছেন যে, ২৫ অক্টোবরে সমাবেশ থেকেই তো সরকারের ‘পতন’ হয়ে যাবে। ভাবটা যেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি মিছিলের কিছু লোকের ধাক্কায় রানা প্লাজা ধসে পড়ে যেতে বলতে পারেন, তাহলে ২৫ অক্টোবর ওনাদের সমাবেশের পর সরকার পড়ে যাবে বলতে অসুবিধে কোথায়? আর স্মর্তব্য যে, উনিও কিন্তু এক সময়ে ক্ষমতায় বসতে ছাগল-প্রকল্প নিয়েছিলেন। আমার এখনও ভাবতে অবাক লাগে, ওনাকে ওই ছাগল-প্রকল্প নিতে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছিলেন কোন ‘ছাগল’ বা ‘ছাগলরা’। আল্লাহ মাফ করুন, এবার যেন উনি সরকার ফেলে দেয়ার ছাগলামিতে না যান।
ভালো কথা, উনি হলেন আপসহীন নেত্রী, ওনার চেলা-চামুণ্ডাদের দেয়া তকমা হচ্ছে দেশনেত্রী। তিনি ’৯০-এর দশকের প্রথমদিকে এবং এরশাদের আমলে আপসহীন থেকে এ আপসহীন খেতাব কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত করেছেন। অপরপক্ষে তিনি এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গেলে জাতীয় বেঈমান হবেন বলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউ-টার্নে গিয়ে ’৮৬-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। জানি না তিনি ’৮৬-তে শত্র“র শত্র“ মিত্র ভেবে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়েছিলেন কি-না, কিংবা আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষায় তখন কৌশলী হয়েছিলেন কি-না। তবে জাতি তখন তাকে জাতীয় বেঈমানই ভেবেছিল। এরশাদ অবশ্যই তার প্রতিদান দিয়েছেন, ভাতিজার সঙ্গে লাঞ্চ খেয়েও ইউ-টার্নেই ‘মহাজটে’ শামিল হয়েছেন। আমি বলি, ‘বিশ্ববেহায়াই’ বলুন আর ‘স্বৈরাচারই’ বলুন, এরশাদই এ দেশে বাপের ব্যাটা এবং দেশের রাজনীতির অঙ্গনের একমাত্র ‘পুরুষ’। তারপর কি আর এ দেশে কোনো রাজনৈতিক পুরুষ আপনারা দেখেছেন? যতই তাল-বেতাল করুন না কেন, যতই মামলার জুজুতে তাকে ঘায়েল করুন না কেন, তারপরও গাজীপুরের সিটি নির্বাচনের সময়েই হোক, আর এবারের গণভবনের নেমন্তন্নেই হোক, এরশাদ দেখা যায় এখনও বাপের ব্যাটা। কিন্তু উনি (দেশনেত্রী) আপসহীন থাকতে চাচ্ছেন কোন ভরসায়? সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় যেতে তার এত অনীহা কেন? এতে তার সমর্থন যে কমছে, তা উনি বুঝতে পারছেন না?
তার সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব আর ওনার পাল্টা প্রস্তাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আমরা যারা আমজনতার সঙ্গে মিশি, কথা বলি, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, তাদের কাছে তার আর ওনার প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাবের একটা তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ আছে। গোঁয়ার্তুমি করা আর দৃঢ় থাকা এক কথা নয়। এ বিবেচনায় তিনি গোঁয়ার্তুমি বর্জন করে একচুল নড়ে আপসের পথে এসেছেন, সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। আর উনি ওনার গোঁয়ার্তুমি ধরে রেখেছেন; ’৯৬ ও ২০০১-এর ২০ উপদেষ্টা থেকে ১০ জন নিয়ে আর সবার সম্মতিতে প্রধান উপদেষ্টা করে দেয়ার পাল্টা প্রস্তাবে নতুনত্ব নেই, ওনার গোঁ-ই ঠিক রাখলেন। জনগণ এখন ভাবছে, তিনি তো নরম হয়েছেন, উনি কেন হচ্ছেন না? তাহলে উনি কি সংঘাতই চান? হ্যাঁ, প্রশ্ন উঠেছে, তিনি তার ভাষণে বেশকিছু অস্পষ্টতা রেখেছেন। রাখবেনই তো, তা না হলে ওনার সঙ্গে আলোচনা হবে কী নিয়ে, দরকষাকষি হবে কী নিয়ে? এটাই তো রাজনীতির বলুন আর বাজনীতিরই বলুন, খেলা। বড় মাছকে বড়শিতে আটকিয়ে কি একটানে তোলা যায়? তা করতে গেলে যে হয় সুতা ছিঁড়ে যাবে, নয়তো বড়শি ভেঙে যাবে যে! বড় মাছের মুখ না হয় কিছুটা ছিঁড়বে, কিন্তু মাছ তো বেঁচে যাবে। অতএব সুতা ছাড়তে হয়, সুযোগ বুঝে আবার একটু টানা, আবার ছাড়া- বড় মাছকে নিয়ে খেলার মজাটিই আলাদা। থাক না কয়েক ঘণ্টা, কয়েকদিন, মাছটাকে রাখতে হয় টানটান অবস্থায়, জলের ভেতর নিরাপদ আশ্রয়ে অন্য বড় গাছের গুঁড়িতেও যেন না লুকাতে পারে- তাও তো দেখতে হয়, নাকি? তিনি এখন রাজনৈতিক খেলা খেলছেন। সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেয়ায় তার জনসমর্থন বেড়েছে, মানুষ তাকে সমস্যা সমাধানে আগ্রহী ভাবছেন। ওনাকে পরে সুযোগমতো বড় বেকায়দায় ফেলার জন্যও এটা জনমত পক্ষে আনার একটা বড় রাজনৈতিক প্রাপ্তি। উনি এগিয়ে না এলে, পরে ‘ভিন্ন’ কিছু ঘটলে বা ঘটানো হলে তখন জনগণ বলবে, ওনার গোঁয়ার্তুমির জন্যই তো এটা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে আবার ওনার প্রস্তাবই যদি গ্রহণ করবেন, তাহলে তিনি এতদিন পঞ্চদশ সংশোধনীর পর খেলেছেন কি এমনি এমনি? উনি কি পাগল নাকি যে ভাববেন, তিনি নিজ হাতে বিষপান করবেন? ভিন্ন কিছু ঘটে গেলে লোকসান হবে ওনার, তার নয়। বরং তার লাভ হবে, তিনি আরও সময় পাবেন; আর ওনার ক্ষতি হবে, তিনি ৭ বছরের পর আরও ক্ষমতার বাইরেই থাকবেন। তার প্রস্তাবে এগিয়ে এসে নির্বাচনে গেলে ওনারই লাভ, পরে ক্ষমতায় এসে উনিই তার প্রস্তাবের পরবর্তী সুবিধাভোগী হবেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা পোক্ত হলে, ওনার বরং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করেই পরবর্তী সুবিধাভোগী হওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করা বোকামি ভাবি আমি।
আগেও লিখেছি, ফয়সালা একটা হবেই, লক্ষণও ভালো, তারপরও তিনি-উনি যদি শেষতক বেঁকে বসেন, তাহলে আমার পূর্ব ফর্মুলায়ই আসুন, নির্বাচনকালীন সরকার দলীয় ও তত্ত্বাবধায়কের সমন্বয়েই হোক- তিনি পাঁচজন মন্ত্রী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, উনি পাঁচজন উপদেষ্টা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হবেন। নাজুক কিছু মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকবে, বাকিগুলো আপসে অথবা আপসে সম্ভব না হলে লটারির মাধ্যমে তিনি-উনির মধ্যে ভাগ হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে ‘কী বিচিত্র’র এ দেশে নতুনত্ব আনুন।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান