Monday, July 16, 2018

বাংলাদেশের নির্বাচনে একপেশে নীতি ভারতের পক্ষে যাবে না by ভারত ভূষণ

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পক্ষপাতপূর্ণ ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে ভারত শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। বৃটিশ আইনজীবী লর্ড আলেক্সান্ডার কার্লাইলকে দ্রুত বিতাড়নের ঘটনা তেমন একটি বিষয়ই নির্দেশ করে।
কার্লাইল দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান আইনি মামলার বিষয়ে দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে চেয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি একটি বিজনেস ভিসা পেয়েছিলেন। কিন্তু এরকম একটি সাদামাটা ঘটনাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়  ঢাকার চাপের মুখে একটি সম্ভাবনাময় ফৌজদারি তৎপরতায় রূপান্তরিত করেছে। লর্ড কার্লাইল মধ্যরাতে অবাঞ্ছিত ঘোষিত হলেন।
লন্ডনে ফেরার পথে কার্লাইল একটি স্যাটেলাইট লিংকের মাধ্যমে ভারতের প্রেসের সঙ্গে কথা বলেন, যা গোটা অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ লাভ করে, যেমন প্রচার হয়তো অন্যভাবে করা সম্ভব ছিল না।
এই ঘটনায় একটি সংকেত ছড়িয়ে পড়ল যে, বাংলাদেশের কেবল একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ভারতের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এই ঘটনা ঘটল এমন একটি সময়ে যখন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের আগামী সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী বিএনপির সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত (এনগেজ) করতে শুরু’ করেছিলেন। এবং হঠাৎ করেই ওই ধরনের পদক্ষেপকে অগ্রাহ্য করা হলো এই বার্তা রটিয়ে যে, সম্পর্কটা আগের মতোই সংকীর্ণ এবং একপেশে রয়ে গেছে।
এর ফলে বিএনপির অভ্যন্তরে ভারতীয় বিরোধী মহল নতুন করে অক্সিজেন পেয়েছে। এতে দলটির ভেতরের সেই অংশটিকে কোণঠাসা করে ফেলেছে, যারা সাহসভরে ভারতের সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে নিজদেরকে স্পষ্টভাষী করে তুলেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা যদি অ-শোধরানো অবস্থায় থেকেই যায়, তাহলে বাংলাদেশে তার সম্পর্ক উন্নয়নের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ ভারত হাতছাড়া করবে। বাংলাদেশ ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনে যাচ্ছে।
২০১৪ সালের যে সাধারণ নির্বাচনটি বিএনপি বয়কট করেছিল, সেই নির্বাচনে অনেকের মতে ভারত একটি পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল। সামনের মাসগুলোতে বাংলাদেশে যেহেতু রাজনৈতিক ঝড়ো হাওয়া বৃদ্ধি পেতে থাকবে, তাই ভারত কিভাবে আচরণ করে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হবে।
আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটাই প্রকট যে, যখন যে ক্ষমতায় থাকে, তখন অন্যের জীবন ধারণ করাই প্রায় একটা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৯ সালের পরে ২০১৪ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ তার অনুকূলে গড়ে তোলা একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্ট করেছে। সহজে প্রভাবিত করা যায় দেশটির এমন বিচারবিভাগ, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, নির্বাহী বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এমনটা করা হয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব্যর্থ করে দিতে ওই যে ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, বাংলাদেশিরা তাকে একটি ‘শান্তিপূর্ণ কারচুপি’ হিসেবে গণ্য করছেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নিরেপক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই তারা সেই বিধান বিলোপ করেছে। তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ৯০ দিন আগে সংসদ বিলোপ করতে হবে, যাতে ক্ষমতাসীন সংসদরা তাদের প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় একটি বিশেষ অনুকূল অবস্থা গ্রহণ না করতে পারে। ওই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই বিএনপি ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কট করেছিল।
উপরন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালে সেনবাহিনীকে ব্যারাকে রাখতে আইন সংশোধন করেছিল। দৃশ্যত এটা একটা যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ। কিন্তু ২০১৪ সালে যেভাবে ব্যাপকভিত্তিক সহিংসতা ও নৈরাজ্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দিতে বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সামর্থ্য যে সত্যিই নেই, সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। সুশিল সমাজের কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন সেনাবাহিনী যদি পাঁচ তারকা হোটেল, নির্মাণ প্রকল্প ও হাসপাতাল পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তারা কেন নির্বাচনকালে ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
দেশটির নির্বাহী বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই সরকারের তালুবন্দি হয়ে পড়েছে, এই অবস্থায় বিরোধী দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোটাই কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ তাদের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করার অনুমতি নিয়মিতভাবে নাকচ করা হয়ে থাকে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের অভিযোগ হলো এটি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দ্বারা গঠন করা হয়েছে।
সরকার তার প্রতিপক্ষকে অ?েযাগ্য ও অক্ষম করে তুলতে আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহারকে একটি রুটিন মাফিক বিষয়ে পরিণত করে ফেলেছে। দুই বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড একজন প্রার্থীকে নির্বাচনে অযোগ্য করে। বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বিএনপির অন্য শীর্ষ নেতারাও ফৌজদারি মামলা মেকাবিলা করছেন। এবং নির্বাচনের আগে তারাও কারাদণ্ড লাভ এবং নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা হতে পারেন। ১৮ লাখ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এপর্যন্ত প্রায় ৭৮ হাজার ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।
আরো অভিযোগ উঠেছে যে, সরকার দুতার্তে স্টাইলে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে, যার আওতায় ইতিমধ্যে ১৩০ জনের বেশি লোকের মৃত্যু ঘটেছে। আর এই অভিযানটাও সরকারের ‘আগ্রহের ব্যক্তিদের’ বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এমনকি বিরোধী দল যদি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে নিতেও পারে, তাহলেও তাকে ব্যালট কারচুপি, ভোটারদের ব্যালট পেপার না দেয়া এবং নির্বাচনী এজেন্টদের ধাওয়া করার মতো বিষয় মোকাবিলা করতে হবে। সামপ্রতিক স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে এসব কূটকৌশলের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে, যাকে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে প্রয়োগের একটি মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ উপলব্ধি করেছে যে, তারা ২০১৪ সালের নির্বাচন, যেটি প্রধান বিরোধী দল বয়কট করেছিল, সেটির আর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারবে না। বিরোধী দলের অংশ গ্রহণ ছাড়া তার বিজয়ের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সেকারণে তারা বিএনপিকে প্রতিযোগিতায় দেখতে আগ্রহী, আর সেটা খণ্ডিত বিএনপির অংশগ্রহণ নির্ভর হলেও। তাই বিএনপিকে ভেঙ্গে ফেলার গুজব প্রবল। এই প্রক্রিয়ায় ভারতীয় এজেন্সিগুলো সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠছে।
এটা বোধগম্য যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারত খুশি। শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা চমৎকার। সীমান্ত সমস্যার নিষ্পত্তি ঘটেছে। এবং একটি ট্রানজিট চুক্তি সই হয়েছে।
এর বিপরীতে বিএনপির ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৫ শাসনামলে বাংলাদেশে ভারত বিরোধী ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছিল। ভারতীয় বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্রের চোরাচালান পৌঁছাতে কক্সবাজার পরিণত হয়েছিল একটি পছন্দের বন্দরে। এছাড়া বিএনপি জোটের অংশীদার জামায়াত ইসলামি ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।
কিন্তু যাই হোক না কেন, আগামী জানুয়ারিতে ঢাকায় যে সরকারই আসুক না কেন, তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারতকে প্রস্তুত থাকতে হবে। দুই দশক আগে বাংলাদেশ যেখানে ছিল সেখানে বাংলাদেশ নেই। এবং বিশ্বে ভারতের অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটেছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধিতে নিতে বিএনপি একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ২০১২ সালে বেগম খালেদা জিয়া তার দিল্লি সফরের সময় ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি তার দল আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে ভারতবিরোধী তৎপরতার জন্য আর কখনও ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।
ভারতকে এখন শুধু তার ভালো উদ্দেশ্য ঘোষণা করলেই হবে না, ভারতকে এটা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে, তারই ঘরের কাছে চীনের সঙ্গে তার স্ট্রেটেজিক প্রতিযোগিতা বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে, বাংলাদেশে তার বিকল্পগুলো (রাজনৈতিক দল) বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে তার পক্ষে কোনো সংকীর্ণ নীতির অনুসরণ করাটা কোনো অর্থ বহন করে না। কারণ ভারত কোনো ভুল পদক্ষেপ নিলেই তা থেকে ফায়দা নিতে উদগ্রীব থাকবে বেইজিং। বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ঘনায়মান বলেই মনে হচ্ছে। তাই এই অবস্থায় বাংলাদেশ রাজনীতির কোনো খেলোয়াড়ের দিকেই ভারতের পক্ষে ঝুঁকে পড়া অবশ্যই কোনোমতে ঠিক হবে না। নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ যেই পথে গেছে, সেই পথে বাংলাদেশকেও ঠেলে দেয়া ভারতের স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না।
(লেখক ভারতভিত্তিক একজন সাংবাদিক, গতকাল বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত তার নিবন্ধের অবিকল তর্জমা ছাপা হলো)

থাইল্যান্ডে টপলেস কেটি প্রাইস

থাইল্যান্ডের সমুদ্র সৈকত। সেখানে টপলেস হয়ে অবলীলায় ঘুরে বেড়ালেন কেটি প্রাইস। টাপলেস মানে শরীরের উপরের অংশে বিন্দুমাত্র পোশাকের বালাই নেই। একদম অনাবৃত করে তিনি হেঁটে বেড়ালেন সৈকতে। বোটে ভ্রমণ করলেন। পানিতে করলেন জলকেলী। এ ঘটনা ধরা পড়েছে সাংবাদিকদের ক্যামেরায়। কেটি প্রাইস ইংলিশ টেলিভিশনের পারসোনালিটি। তিনি একাধারে মডেল, লেখিকা, গায়িকা, ডিজাইনার ও ব্যবসায়ী। সেলিব্রেটি বিগ ব্রাদার সিরিজের ১৫তম রাউন্ডের বিজয়ী তিনি। আগে তিনি জর্ডান নামে পরিচিত ছিলেন। পরে কেটি প্রাইস নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। থাইল্যান্ডে সম্প্রতি তিনি ছুটি কাটাতে এসেছিলেন টয়বয় লাভার ক্রিস বয়সনকে সঙ্গে নিয়ে। তার সঙ্গেই তিনি শরীর অনাবৃত করে সূর্য¯œান করেছেন। কে তাকে দেখলো, কে তার স্পর্শকাতর অঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকলো হা করে সে দিকে কোনোই ভ্রুক্ষেপ ছিল না তার। কয়েক মাস ধরে কেটি প্রাইসের জীবনে বড় ধরনের এক ধাক্কা লাগার পর তিনি প্রেমিক ক্রিস বয়সনকে নিয়ে ছুটে এসেছিলেন থাইল্যান্ডে। এখানে এসে অবাধে জীবনকে উপভোগ করেছেন। নতুন এক উদ্যামে তিনি জীবনের রস আস্বাদন করেছেন। সোমবার তিনি উদ্বোধন করেছেন নতুন রিয়েলিটি শো মাই ক্রেজি লাইফ। কিয়েরেন হেলারের সঙ্গে তার যে নাটকীয়ভাবে সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটেছে তা এতে বেরিয়ে আসবে। কেটি প্রাইসের যুগল জীবন ছিল ৫ বছরের। এ সময় কেটি প্রাইস দেখতে পেয়েছেন তার বেস্ট ফ্রেন্ড জেন পন্টনি এবং ক্রিসি থমাসের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমিয়েছেন কেটি প্রাইসের জীবনসঙ্গী কিয়েরেন হেলার। এটা মেনে নিতে পারেন নি কেটি প্রাইস। তাই নতুন ওই রিয়েলিটি শোতে কিয়েরেন হেলারকে তিনি শয়তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কেটি প্রাইস ৫ সন্তানের মা।

রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সবরকম সহায়তা করা হবে: আইওএম

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর মহাপরিচালক উইলিয়াম লেসি সুইং বাংলাদেশ সরকারকে পুনরায় আশ্বস্থ করে বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তার সংস্থা সবরকম সহায়তা করবে।
আজ দুপুরে আইওএম-এর মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাত করে এই আশ্বাস প্রদান করেন। এ সময় উইলিয়াম লেসি সুইং রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করে  বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ বাসভূমিতে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আইওএম বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
সম্প্রতি তার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে আইওএম-এর মহাপরিচালক বলেন, তারা সেখানকার স্থানীয় জনগণের সমস্যাগুলোও দেখেছেন। আইওএমসহ অন্যান্য সংস্থার কার্যক্রমে সহযোগিতা করায় বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেন মহাপরিচালক।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বাংলাদেশের পক্ষে যা যা করা সম্ভব তা করা হবে। তাদেরকে অন্যত্র স্থানান্তর করে উন্নত আবাসন ও অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করতে কাজ চলছে বলে জানান শেখ হাসিনা। বিশেষ করে বন্যা ও ঘুর্ণিঝড়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে, বলেন তিনি। শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া বাংলাদেশের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আইওএম-এর সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।
আইওএম-এর মহাপরিচালকের সিনিয়র উপদেষ্টা ওয়েন লি জেস, আইওএম-এর শরণার্থী সেল ইউনিট-এর প্রধান পেপি সিদ্দিকসহ সংস্থার প্রতিনিধিবর্গ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এর পর জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্র্যান বার্গেনার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সাক্ষাত করেন। প্রধানমন্ত্রী এসময় মিয়ানমার যাতে তার নাগরিকদের দেশে ফেরত নিয়ে যায় সেজন্য জাতিসংঘের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারসহ ভারত, চীন, লাওস, থাইল্যান্ড-এসব প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশ আলোচনা করেছে এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে মিয়ানমার ইউএনএইসিআরের অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছে। ভারত, চীন এমনকি জাপান রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারে বাসস্থান তৈরি করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশন যে সুপারিশ করেছিল তা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। জাতিসংঘের পক্ষে রাজনীতি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা শিন উমেজু, ইউএনএইচসিআর’র আঞ্চলিক সমন্বয়ক জেমস লিনচ, আইওএম ডেপুটি চিফ অব মিশন আব্দুসাত্তর ইসোয়েভ এবং ইউএনএসজি’র আবাসিক প্রতিনিধির কার্যালয়ের মানবতা বিষয়ক উপদেষ্টা লেন ক্রাইনিক উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকায় গাড়ি চুরির সিন্ডিকেট by রুদ্র মিজান

রাজধানী ও এর আশপাশে ছড়িয়ে আছে শতাধিক গাড়িচোর চক্র। নানা কৌশলে গাড়ি চুরি করাই তাদের কাজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই গ্রেপ্তার হয় চোররা। কিছুদিন কারাভোগ করে। আবার জামিন নিয়ে বের হয়ে ফের আগের কাজে লিপ্ত হয় চোর চক্রের সদস্যরা। দিন দিন তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্তে অগ্রসর হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্যদিকে, নিত্য-নতুন কৌশল অবলম্বন করছে চোর চক্র। প্রতি মাসেই একাধিক চোর গ্রেপ্তার হলেও থামছে না চুরি। গত তিন মাসে প্রায় একশ’ চোরকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। গত জুন মাসে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৩ চোরকে। মামলা হয়েছে ৩১টি। ১৩টি প্রাইভেটকার, ছয়টি জিপসহ উদ্ধার হয়েছে ৫৬টি গাড়ি। মে মাসে গাড়ি চুরিতে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৯ জনকে, মামলা  হয়েছে ৪৪টি। উদ্ধার হয়েছে ৫১টি গাড়ি। এপ্রিলে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩০ জন, মামলা হয়েছে ৪০টি। গাড়ি উদ্ধার হয়েছে ৬৮টি।
চোরদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে গাজীপুর এলাকায়। প্রায় ১০-১৫ জনের এই সিন্ডিকেটটি বিভিন্ন কৌশলে চুরি করে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি হলেও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে তারা। সম্প্রতি ডিবির অভিযানে গ্রেপ্তার চোর চক্রের এক সদস্য পুলিশকে জানিয়েছে, যারা এই চক্রে যোগ দেয় শুরুতে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণকালে চুরির সময় তাকে ঘটনাস্থলের আশপাশে রাখা হয়। বিশেষ করে পার্কিং করা গাড়ি চুরির সময় তার দায়িত্ব থাকে লোকজন কেউ ওই দিকে এলো কি-না তা নজরদারি করা। নেত্রকোনা সদরের বালিচুরির চান মিয়াকে এভাবেই প্রশিক্ষণ দিতো চক্রের বড় ভাইয়েরা। এমনকি বাসায় বসেই প্রশিক্ষণ দেয়া হতো কিভাবে মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির লক খোলা যায়। প্রাইভেট কার, জিপ, সিএনজি অটোরিকশা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চুরি করে তারা। এই চক্র অভিনব পন্থায় মোটরসাইকেল ছিনতাই করতো।
জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা জানিয়েছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইশারা দিয়ে মোটরসাইকেল থামানো হতো। এমনভাবে ইশারা করা হতো মনে হতো তারা ডিবি পুলিশের সদস্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের পোশাক পরেই নির্জন রাস্তায় অবস্থান নিতো তারা। মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই তার কাগজপত্র তল্লাশি করতো। এরমধ্যেই অস্ত্র দেখিয়ে জিম্মি করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিতো। কখনো কখনো মোটরসাইকেল থামানোর পরপর মামলা আছে জানিয়ে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়া হয়। টেনেহিঁচড়ে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে মূল সড়ক থেকে গলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর শুধু মোটরসাইকেল না, সর্বস্ব লুটে নেয় চক্রের সদস্যরা।
এই চক্রের সদস্য কিশোরগঞ্জের খিলপাড়ার আবদুল আলিমের তথ্যানুসারে চক্রটি বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে ছিনতাই করে। এক্ষেত্রে কৌশলে চা, জুস ও ডাবের পানির সঙ্গে নেশা জাতীয় ট্যাবলেট খাইয়ে অজ্ঞান করা হয় চালককে। নির্জন রাস্তায় চালককে ফেলে গাড়ি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা।
তিনশ’ ফিট, উত্তরার জসিমউদ্দিন মোড়, মিরপুরের ষাট ফিট, রূপনগর, বিরুলিয়া বাঁধ, টঙ্গী এলাকা থেকে প্রায়ই গাড়ি ছিনতাই করে এই চক্র। এরকম শতাধিক চক্র রয়েছে ঢাকায়। বড় চক্রের মধ্যে আরেকটি চক্র রয়েছে রামপুরা, খিলগাঁও এলাকায়। ওই চক্রে আবদুল বারেকসহ অন্তত ১৫-১৬ জন সদস্য রয়েছে। এছাড়াও যাত্রাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জে রয়েছে আরো কয়েক চক্র। মোহাম্মদপুরে আজহারুল ইসলাম, মিজান মিয়া, ইসমাইল, মজনুর সমন্বয়ে রয়েছে একটি চক্র। এছাড়াও আবদুর রশিদ, তরিকুল, আবদুল হালিমসহ প্রায় ২০ জনের একটি চক্র রয়েছে বসিলা, কেরানীগঞ্জ এলাকায়। ইতিমধ্যে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলো এই চক্রের সদস্যরা। সূত্রে জানা গেছে, কারাগার থেকে বের হয়ে ফের একই অপকর্মে লিপ্ত হয় তারা।
এসব চক্রের চোরাই গাড়ি বিক্রির জন্য রয়েছে আরেক পার্টি। তারা গাড়ির চেসিস নম্বর পরিবর্তনসহ ভুয়া কাগজপত্র তৈরির কাজটিও করে। পাঞ্চ মেশিনের গাড়ির চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর পরিবর্তন করে বিআরটিএ’র অসাধু কর্মকর্তা ও দালালের মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গাড়িগুলো বিক্রি করে। কিছু সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে মালিকের সঙ্গে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করে টাকা নিয়ে তা ফেরত দেয় গাড়ি চোরেরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করে তারা। দিনে যে ফোন ব্যবহার করে রাতে ওই ফোনটি বন্ধ রাখে তারা। এমনকি ফোন চালু রেখে দীর্ঘ সময় কোথাও অবস্থান করে না। ডিএমপ্থির গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিশাত রহমান মিথুন বলেন, চোররা নানা কৌশল অবলম্বন করে। তারপরও আমরা প্রায়ই তাদের গ্রেপ্তার করছি। গাড়ি জব্দ করছি। গাড়ি চুরি প্রতিরোধ করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি।

'এটা জাস্ট হ্যারাসমেন্ট'

পানামা পেপারসে ইউনাইটেড গ্রুপের কোনো পরিচালকের নাম নেই বলে দাবি করেছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা। আজ দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীর চক্রান্তে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। হাসান মাহমুদ রাজা সাংবাদিকদের বলেন, পানামা পেপারসে আমাদের কোনো নাম নেই। এসব আমরা চেক করে দেখেছি। আপনারাও ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখতে পারেন। এটা জাস্ট হ্যারাসমেন্ট। দুদকের উপপরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঁঞার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত হাসান মাহমুদ রাজাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
এরপর দুপুরেই দুদকের সচিব মো. শামসুল আরেফিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কাউকেই হয়রানি করা হচ্ছে না। দুদক কাউকে হয়রানি করে না, হয়রানি করার সুযোগও নেই। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে দেখা হবে। এদিকে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে হাসান মাহমুদ রাজা বলেন, পানামা পেপারসে আমাদের কোনো নাম নেই। এসব আমরা চেক করে দেখেছি। এটা একটি পত্রিকা লিখেছিল যে আমাদের নাকি নাম আছে। ২০১৬ সালে পানামা পেপারস প্রকাশ পেয়েছিল। আমাদের তো এখন ডাকার কথা না। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে যাদের নাম এসেছিল, তাদের ডাকা হয়েছিল। তখন আমাদের ডাকেনি। আমাদের কমপিটিটর উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি পত্রিকার মাধ্যমে আমাদের নাম প্রকাশ করেছে। আপনারাও ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখতে পারেন। আমাকে জিজ্ঞেস করার কিছু নেই। এটা জাস্ট হ্যারাসমেন্ট। আমাদের আয়করের সব নথি জমা দিতে বলেছে। পানামা পেপারসে নাম আসায় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ছাড়াও ইউনাইটেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মাল্টি ট্রেড মার্কেটিং লিমিডেটের পরিচালক খন্দকার মঈনুল আহসান, আহমেদ ইসমাইল হোসেন ও আকতার মাহমুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) সম্প্রতি ‘পানামা পেপারস’ নামে নথি প্রকাশ করে। যেখানে ১ কোটি ১০ লাখ নথি ফাঁস করা হয়। ওই তালিকায় বিশ্বের প্রভাবশালী কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানসহ শতাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও আত্মীয়-স্বজনের কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। কর ফাঁকি ও অর্থপাচার সংক্রান্ত সাড়া জাগানো এ কেলেঙ্কারিতে এ যাবৎ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ ৩৪ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া তথ্যে। অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের এপ্রিলে দুদকের উপ-পরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঁঞাকে প্রধান করে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক। অনুসন্ধান দলের অন্য সদস্যরা হলেন- দুদকের সহকারী পরিচালক মজিবুর রহমান ও উপ-সহকারী পরিচালক রাফী মো. নাজমুস সাদাত। এরপর ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্যারাডাইস পেপারসের প্রায় ২৫ হাজার নথি প্রকাশ করা হয়। যেখানে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য রয়েছেন। ওই বছরের ৫ই নভেম্বর প্রথম দফায় প্রকাশ করা নথিতে যুক্তরাজ্যের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজসহ বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির গোপন সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে। তবে সেখানে কোনো বাংলাদেশির নাম ছিল না।

প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান, ‘আলে লে ব্লু’ by নিয়াজ মাহমুদ

জয়ের উৎসবে নানা রঙে রঙ্গিন রাতের প্যারিস! রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান, ‘আলে লে ব্লু’ অর্থাৎ এগিয়ে যাও ফ্রান্স। রাতেই প্যারিস গেট এবং আইফেল টাওয়ারের সামনে গভীর রাত পর্যন্ত জড়ো হয়েছিল লাখো লাখো ফুটবল ভক্ত। জয়ের উৎসবকে স্বরণীয় করে রাখতে বিশেষ আলোক সজ্জাসহ নানা রঙে রাঙিয়ে তোলা হয় আইফেল টাওয়ার ও প্যারিস গেট। তবে কাল প্যারিসে রাত নেমেছিল ঠিকই, নামেনি প্যারিসবাসীর চোখে। বিয়ার-শ্যাম্পেনসহ নানা  ব্রান্ডের পানীয় খেয়ে  নেচে গেয়ে উৎসব করে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছন তারা। এ-এক অন্যরকম প্যারিস। কোনো যান্ত্রিকতা নেই, কোনো বিরতি নেই, শুধু উৎসব আর আনন্দ।
রাত নেমে আসার সঙ্গে-সঙ্গে আইফেল টাওয়ারে ১৯৯৮-২০১৮ ফ্লাশ ভেসে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয় ফ্রান্স দু’বার বিশ্বকাপ জিতেছে। আর বিশষ প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্যারিস গেটে  ফ্রান্সের লোগো মুরগি, জাতীয় পতাকা, দুটি বিশ্বকাপ জয় করায় দুটি স্টার ও বিশ্বকাপ জয়ী  গ্রিজম্যান, পগবাসহ জাতীয় তারকা বীরদের ছবিসহ নাম আলোক সজ্জার মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। আইফেট টাওয়ারে প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয় তিন রঙের ফরাসি পতাকা। নীল, সাদা, লাল। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব ধারণ করে আছে এই তিন রং।  পরিচিত-অপরিচিত যে যাকে কাছে পেয়েছিল, তাকেই জড়িয়ে ধরে, মুখে সমস্বরে আওড়াতে থাকে:
axu armes citoyens
Formey vos bataillons
marchons, marchons, marchons (ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত)।
লোকে লোকারণ্য ছিল প্যারিসের প্রতিটি ট্রাম, ট্রেন, মেট্রো, বাস। সবার মুখে মুখে স্লোগান, আলে লে ব্লু  (Alley les blues), ‘এগিয়ে যাও ফ্রান্স।’
তবে প্যারিস ছাড়াও দেশটির বড় বড় শহরে এবং তার আশপাশের  গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বড় পর্দায় খেলা  দেখানোর ব্যবস্থা করায় সমাগম হয়েছিল হাজার হাজার দর্শক। গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস সীমিত রেখে বাকিগুলো বন্ধ  করে দেয়ায় উৎসবমুখর মানুষের ঢল নেমেছিল প্যারিসসহ বড় বড় শহরগুলোতে। ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা হাতে মোটরবাইক ও ট্যাক্সি চালিয়ে হই হুল্লোড় করেছেন তরুন-তরুণীরা। একইসঙ্গে আতসবাজি ফাটিয়ে উৎসবের ভিন্ন মাত্রা তৈরি করা হয়। গলা ভেঙে গেছে, তবু মুখে on est champion (অন এ চ্যাম্পিয়ন), ‘আমরা চ্যাম্পিয়ন।’ অতিরঞ্জিত উল্লাস করতে গিয়ে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটেছে। বিশৃঙ্খল আচরণ  ঠেকাতে আগে থেকেই রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছিল হাজার হাজার দাঙ্গা পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে আনন্দ উদযাপনকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর লিয়নে।
লিয়নের বাসিন্দা বাংলাদেশি আলী সিরাজ বেলকুতে বড় পর্দায় খেলা দেখেন। তিনি বলেন, আমি ১০ বছর ফ্রান্সে থাকি। এমন সুন্দর উৎসব কোনদিন দেখিনি। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে অর্থাৎ সাড়ে ১১টার দিকে জড়ো হওয়া লোকদের গ্যাস ছুড়ে সরিয়ে দেয় পুলিশ। ওদিকে ফ্রান্সের সাপ্তাহিক ‘জুর্নাল দ্য দিমশে’ বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে প্রকাশিত এক আগাম জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছিল শতকরা ৮৪ ভাগ ফরাসির ধারণা ছিল এবার ফাইনালে  ক্রোয়েশিয়াকে হারাবে ফ্রান্স। আর যারা নিয়মিত ফুটবল দেখেন বা ভালবাসেন তাদের মধ্যে এ হার ছিল শতকরা  ৯০ ভাগের বেশি। তবে উটের গণনায় পিছিয়ে ছিল ফ্রান্স। পশু উটের গণনা ভুল প্রমাণিত হলেও ফুটবল বোদ্ধা ও পত্রিকার জরিপ রিপোর্ট সত্যি হয়েছে।

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবন by কাফি কামাল

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জীবন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় পাহাড় কেটে ত্রাণের পলিথিন, ত্রিপল ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা সারি সারি ঝুপড়িঘরে। শীত-গ্রীষ্মের দীর্ঘ মৌসুম কাটিয়ে তারা এখন পার করছে বর্ষা। বৃষ্টি নামলেই পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে আসা পানির স্রোত; ভাসিয়ে দেয় রোহিঙ্গাদের ঝুপড়িগুলো। ভিজে যায় চাল-ডাল আর সামান্য আসবাব। দিন নেই, রাত নেই, বৃষ্টি নামলেই থেমে যায় রোহিঙ্গাদের জীবন। রাতের পর রাত কাটছে   নির্ঘুম। ক্যাম্পে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সমস্যার অন্ত নেই। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার মৌলিক অধিকার পূরণই দায়। ঘরে ত্রাণের চাল-ডাল আছে, পরনের কাপড়ও মিলছে। কিন্তু বাঁশ আর গাছের অভাবে একটু উঁচু ও শক্তপোক্ত করে বানানো যাচ্ছে না ঝুপড়িগুলো। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখন তাই চাল-ডালের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাঁশ ও গাছের। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে একবেলায় রান্না করতে হচ্ছে দুই বেলার খাবার। সেই সঙ্গে সংকট দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হয়েছে ততৈবচ পরিস্থিতি। উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালীর শতাধিক পাহাড় ন্যাড়া করে ঝুপড়ি ঘর বানিয়েছে রোহিঙ্গারা। ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস ও বন্যার মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্প। কয়েক দফা বৃষ্টি ও ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে শত শত ঝুপড়িঘর। বালুখালী ক্যাম্পের লালু মাঝি জানান, পাহাড় কেটেই তৈরি করা হয়েছে ক্যাম্পের অধিকাংশ ঘর। বর্ষা মৌসুমে ছোট ছোট পাহাড়ি ধ্বসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু ঝুঁপড়িঘর। প্রশাসন কিছু পরিবার নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে গেলে কয়েকশ পরিবার এখনও বসবাস করছে ঝুঁঁকিপূর্ণ অবস্থায়। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ নূর জানান, উখিয়ার যেসব পাহাড়ে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে তার থেকে সমুদ্রের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে এখানে ভারি বৃষ্টি হয়। প্রায় প্রতিদিনই অঝোরধারায় বৃষ্টি নামে। পাহাড় থেকে গড়িয়ে নামা পানিতে সয়লাব হয়ে যায় ঝুপড়ি ঘরগুলো। কখনো কখনো ধসে পড়ে। বৃষ্টির সঙ্গে আসে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া। উড়িয়ে নিয়ে যায় ঝুপড়ির পলিথিনের ছাউনি। বালুখালী-২ ক্যাম্পের ই-১৪ ব্লকে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমারের বুসিদং থেকে আসা ওসমান গনির পরিবার। ওসমান জানান, বাঁশ এবং গাছের অভাবে ঘরটি ভালোভাবে তৈরি করতে পারছেন না। বৃষ্টি নামলেই ঘরের মধ্যে জমছে গোড়ালি সমান পানি। মংডু থেকে আসা আব্বাস নামে এক রোহিঙ্গা সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছেন বালুখালী ক্যাম্পে। তিনি জানান, চাল-ডালসহ সামান্য খাবার পেলেও তারা ঘরে থাকতে পারছেন না। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে ঘর। নিচে পলিথিন বিছানো হলেও তা ফুটো হয়ে পানিতে ভিজে গেছে সব। লাকড়ির অভাবে চুলাও জ্বলছে না।
বালুখালী ময়নার ঘোনা ক্যাম্পে যাওয়ার পথটি বড় করে তৈরি করে দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক থেকে সে রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ে একটি অন্যরকম দৃশ্য। রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অনেকগুলো দোকানপাট। সেখানে তরিতরকারি থেকে মুদি মালামাল সবই বিক্রি হচ্ছে। রোহিঙ্গা পুরুষেরা দোকানগুলোতে বসে অলস আড্ডা দিচ্ছেন। সে বাজারে রাস্তার দুই পাশে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল জ্বালানি কাঠের আঁটি। ময়নার ঘোনা ক্যাম্পের আশ্রয় নিয়েছেন বুসিদং থেকে আসা রোহিঙ্গা আবদুর নূরের পরিবার। তিনি বলেন, ত্রাণের চাল-ডাল জুটেছে কিন্তু সেগুলো রান্নার জন্য জ্বালানি মিলছে না। জ্বালানি কাঠ কিনে রান্না করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সেগুলোও আবার অনেক দূর থেকে কিনে আনতে হয়।
সুপেয় পানির জন্য হাহাকার এখন তীব্রতর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। বালুখালী, ময়নার ঘোনা ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে অকেজো হয়ে গেছে বেশিরভাগ টিউবওয়েল। মো. সেলিম নামে এক রোহিঙ্গা জানান, বালুখালীর ময়নারঘোনা ক্যাম্পের অধিকাংশ টিউবওয়েলই অকেজো হয়ে পড়েছে। যার কারণে এ ক্যাম্পে তীব্র আকার ধারণ করেছে সুপেয় পানির সংকট। যে কয়টি টিউবওয়েল সচল আছে সকাল-সন্ধ্যা সেখানে পড়ে লম্বা লাইন। জ্বালানির অভাবে পানি ফুটানোর চিন্তাও আমাদের কাছে বিলাসিতা। বৃষ্টির পানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে কিছু পরিবার। কিন্তু সেটাও পর্যাপ্ত হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি নানা সংস্থার অর্থায়নে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টিউবওয়েল বসানো হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বসানোর কাজ করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। কিন্তু চুক্তি লঙ্ঘন করে বেশিরভাগ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে স্বল্প গভীরতার। ফলে পাহাড়ের শরীর জুড়ে বসানো এসব টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়ে একপর্যায়ে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আরেকটি বড় সমস্যা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। দেশি-বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অর্থায়নে ক্যাম্পে ল্যাট্রিনগুলো বসানো হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের ব্যক্তিরাই এগুলো বসানোর ঠিকাদারি পান। প্রতিটি ল্যাট্রিন ৫ রিংয়ের গভীর করে বসানোর কথা থাকলেও সেগুলো বসানো হয় ২-৩ রিংয়ের। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর কাটা পাহাড় থেকে বৃষ্টির জলের সঙ্গে কাদা ঢুকে বেশিরভাগ ল্যাট্রিনই ভরে গেছে। ফলে ক্যাম্পের অনেক জায়গায় রোহিঙ্গারা পায়খানা করছেন খোলা জায়গায়, আশপাশের জঙ্গল ও পাহাড়ি ছড়ায়; যা পুরো এলাকার পরিবেশ নষ্ট করছে দিন দিন। ময়নার ঘোনা ক্যাম্পের বাসিন্দা ইবরাহিম বলেন, ক্যাম্পের ল্যাট্রিনগুলো ভরে গেছে বৃষ্টির পানি ও কাদায়। আমাদের পরিবারের সদস্যরা ঠিকমতো ল্যাট্রিনে যেতে পারছে না। এ সমস্যা কেবল আমার পরিবারের একার নয়। একই রকম অবস্থা বেশির ভাগ পরিবারের ল্যাট্রিনগুলোর। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ড্যাব মহাসচিব প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ক্যাম্পগুলোর ছোট ছোট এক একটি ঝুপড়িতে বাস করে ৮-১০ সদস্যের পরিবার। বৃষ্টি নামলে ভেজা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, রোদ উঠলে পলিথিনের গরমে তৈরি হয় অসহনীয় পরিস্থিতি। ফলে তাদের মধ্যে চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব চরমে। ক্যাম্পে সুপেয় পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত নানা রোগ। ল্যাট্রিনের অভাবে খোলা জায়গায় পায়খানা করার কারণে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।

রাতের উল্লাসে ফরাসি চুম্বন

দমকলের ইঞ্জিন বা পুলিশের গাড়িকে জনতার উৎসবে শামিল হতে দেখেছেন কখনও? আমি দেখলাম। প্যারিসের শঁজে লিজে-তে দাঁড়িয়ে। কুড়ি বছর পরে ফ্রান্সের ফের বিশ্বজয়ের আবেগের স্রোত তখন বয়ে যাচ্ছে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ রাজপথে।
আবেগ কি শুধু প্যারিসে? খেলা শেষ হতেই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিচকে চুম্বন করলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। আকাশ ভেঙে নেমে এল বৃষ্টি।আর আমি দেখছি শ্যাম্পেনের বৃষ্টি। তাই দাঁড়িয়েছি রাস্তার ধার ঘেঁষে। সারা বছর তো গাড়িগুলো এ ভাবে হর্ন বাজায় না! আজ তারা হর্ন বাজাচ্ছে পাগলের মতো। সেই সঙ্গে টানা বেজে চলেছে পুলিশ আর দমকলের গাড়ির সাইরেন! উদ্বেগে নয়, আনন্দে। গাড়ির গায়ে ঝুলছে ফ্রান্সের জাতীয় পতাকা। কত লোকের হাতে ভুভুজেলা, কেউ বা গান গাইছে। আকাশ আলোয়-আলো আতসবাজিতে।
ঢাকার নারায়ণগঞ্জের ছেলে আমি। প্যারিস ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছি। থাকি নোয়াজ়ি শ্য এলাকায়। প্যারিস এখান থেকে ট্রেনে ২০-২৫ মিনিট। প্রায় গোটা বিশ্বকাপটাই বাড়ির টিভিতে দেখেছি। এমনিতে আমি আড়ালজীবী মানুষ। বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে সেমিফাইনাল দেখতে গিয়েছিলাম প্যারিসের ‘ওতেল দ্যু ভিল’-এর বড় স্ক্রিনে। সে কী পাগলামি! বুঝে গিয়েছিলাম, একটা ঢেউ এসেছে, আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে।
অঁনে অঁ ফিনাল... অঁনে অঁ ফিনাল! আমরা ফাইনালে। সেমিফাইনালের পর থেকেই উড়ে বেড়াচ্ছিল সুরটা। ওই সুর মাথায় নিয়েই আজ তৈরি হচ্ছিলাম ফাইনাল দেখব বলে।
‘ওতেল দ্যু ভিল’-এই যেতাম। হঠাৎ সকালে ইরানের বন্ধু আলি-র ফোন। আমার পরিকল্পনা শুনে বলল, ‘‘পাগল! বাস্তিল প্যারেড যেখানে হয়, সেই শ্যন দু মার্সে এসো। কয়েক হাজার লোক বড় স্ক্রিনে খেলা দেখবে।’’
বেলা ২টো নাগাদ সেখানে পৌঁছে দেখি, যাহ্! গেট বন্ধ। বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। এগোলাম শঁজে লিজের দিকে। একটা পানশালা দেখে মনে হল, এখানে খেলাটা দেখা যাবে। ঢুকে পড়লাম ‘দ্য আইডিয়াল বার’-এ। বসার জায়গা পাওয়ার প্রশ্ন নেই। ঠান্ডা পানীয়ের বোতল নিয়ে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম।
‘‘আলে লে ব্ল্যু, আলে লে ব্ল্যু’’— টিভিতে চোখ রেখে ‘নীল দলের’ এগিয়ে যাওয়ার গান গাইছে সদ্য-যুবক থেকে বৃদ্ধ। টলতে টলতে একটা ছেলে এসে বলল, ‘‘দিনটা কিন্তু ফ্রান্সের।’’
খেলা শুরু হতেই গর্জনে কেঁপে উঠল বার। মদ্রিচকে টিভিতে দেখেই বিদ্রুপ— ‘‘বুড়োর দল, বাড়ি যাও!’’ সেখানে এমবাপেকে ওঁরা বলছেন ‘প্রোশেইন প্রেসিদঁ’। মানে? পরবর্তী প্রেসিডেন্ট! গোড়ায় অবশ্য ‘বুড়োদের’ বেশ ধারালোই মনে হচ্ছিল। এমন সময়ে আত্মঘাতী গোলে এগিয়ে গেল ফ্রান্স। দেখি, বারের মালিকও ভিড়ের মধ্যে এসে নাচছেন। আমি এক পাশে দাঁড়িয়ে ঘামতে ঘামতে লিখছিলাম। মালিকের স্ত্রী এগিয়ে এসে কথা বললেন। তার পর এক গ্লাস ঠান্ডা জল আর কয়েকটা টিসু দিয়ে গেলেন।
বলতে বলতে গোল শোধ ক্রোয়েশিয়ার! মনে হল, একটা বাজ পড়ল ঘরের মধ্যে। মদ্রিচ-পেরিসিচদের নিশানা করে ছুটল অভিশাপের বন্যা। এক বুড়ো তো বিয়ারের গ্লাসটাই ছুড়ে ফেললেন। তার পর গ্রিজম্যান, পোগবা, এমবাপে পরপর গোলগুলো করার পরে স্বস্তি পেলেন সবাই। অপেক্ষা তখন শুধু উৎসব শুরুর। শেষ বাঁশি বাজতেই ভিড়টা ছুটল দরজার দিকে। তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে শঁজে লিজেতে!
আজ প্যারিসে রাত নেমেছে ঠিকই। নামেনি প্যারিসবাসীর চোখে।
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

রোহিঙ্গাদের জন্মনিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সচেতনতা by কাফি কামাল

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশটিই ছিল গর্ভবতী। রোহিঙ্গা নারীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার শিশু। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কেটে গেছে প্রায় দশ মাস। কিন্তু শিশুজন্মের সে হার কমেনি। মিয়ানমারের প্রতিকূল পরিবেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জন্মগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ছিল সন্তান নেয়ার হার। বালুখালী, কুতুপালং, ময়নারঘোনা, তমব্রু জিরো পয়েন্ট ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারই ৮-১২ সদস্যের। প্রতিটি দম্পতিরই রয়েছে ৫ থেকে ১০টি সন্তান। মিয়ানমারের বাস্তবতায় তাদের এ জন্মহার ও প্রবণতার পক্ষে নানা যুক্তি দাঁড় করানো হয়। বর্তমানে তারা জাতিগত নির্মূলের মুখে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু ক্যাম্পজীবনেও তাদের মধ্যে কমছে না অধিক সন্তান জন্মদানের প্রবণতা। ফলে প্রতিদিনই অর্ধশতাধিক শিশু জন্ম নিচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এতে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে বাড়ছে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় রোহিঙ্গা পুরুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি।
ইউনিসেফ সমপ্রতি একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, নয় মাস আগে সংকট শুরুর পর থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্ম হয়েছে ১৬ হাজারের বেশি শিশুর। এদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা করার সুযোগ হয়েছে মাত্র তিন হাজার শিশুর জন্মে। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দৈনিক জন্ম নিচ্ছে ৬০ শিশু। ওদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে কাজ করেন এমন একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আনওয়ান্টেড প্রেগনেন্সির সংখ্যা অনেক। তাদের অনেকেরই স্বামী নেই, কিংবা বিয়েই হয়নি কিন্তু গর্ভে পালন করছে বাচ্চা। চিকিৎসকরা জানান, এই আনওয়ান্টেড প্রেগন্যান্সির সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে অল্প বয়সে বিয়ের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। স্বভাবগতভাবেও অধিক সন্তান জন্মদানের পক্ষে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী। তারা মনে করেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পাপ। তারা মনে করেন, যিনি সৃষ্টি করবেন, তিনিই আহার দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ক্যাম্পের ঝুপড়ি ঘরগুলোতে অধিক সংখ্যক সদস্যের পরিবার খাবার থেকে মাথাগোঁজার ঠাঁই নিয়ে খাচ্ছেন হিমশিম। বৃষ্টি নামলেই ভিজে একাকার হয় ঝুপড়ি ঘরগুলো। রোদ উঠলে পলিথিনের গরমে সেখানে থাকা দায় হয়ে পড়ে। অত্যধিক গরম, ঘনবসতি, জলসংকটে নিয়মিত গোসলের অসুবিধার কারণে চর্মরোগসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব লেগে আছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তারপরও পরিবর্তন ঘটছে না মানসিকতায়।
বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা নূর হোসনা বেগম চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন ড্যাব-এর ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প, মেটারনাল, চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারে। তার কোলে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকন্যা। হাসপাতালের টুলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ৩-৮ বছর বয়সী আরো তিনটি ছেলেমেয়ে। বর্তমানে তিনি ৫ মাসের গর্ভবতী। একাধিক সন্তানের ব্যাপারে তিনি বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ খেলে পাপ হয়। তার স্বামী তাকে সেটাই বলেছে। তিনি আল্লাহকেও ভয় পান, স্বামীকেও ভয় পান। তাই জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করেননি। তার পাশেই নেকাবে মুখ ঢেকে বসেছিলেন আসমা বেগম। ৮ মাসের গর্ভবতী আসমার কোলে আসবে তৃতীয় সন্তান। তিনি বলেন, আমি বলেছিলাম, কিন্তু আমার স্বামী রাজি হয়নি। স্বামীকে নাখোশ করে আমি কীভাবে ওষুধ খাবো? ময়নারঘোনা ক্যাম্পের বাসিন্দা নূর আয়শা বেগম একই ক্যাম্পে দুইমাস আগে বিয়ে দিয়েছেন তার এক মেয়েকে। তাদের ঝুপড়ি ঘরে ১১ জনের বসবাস। এখনো তিনি গর্ভবতী। রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা দেন এমন দুই চিকিৎসক সিফাত ও আসিফ বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মানবেতর এ জীবনের মাঝেই তাই জন্ম নিচ্ছে নতুন জীবন। এ নতুন শিশুর জন্য যেমন চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন তেমনিভাবে প্রসূতি মায়ের জন্যও প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা। কিন্তু শরণার্থী জীবনে এসবের টানাপড়েন হয়। খাবার আর বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যেখানে কষ্টকর একটা ব্যাপার সেখানে অন্য সব ব্যাপার আর মুখ্য হয়ে ওঠে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, এভাবে যদি রোহিঙ্গা শিবিরে নতুন মুখের আগমন ঘটতে থাকে তাহলে তা সার্বিক অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপরে চরম চাপ তৈরি করবে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে এবং সে লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বালুখালীতে ড্যাব-এর ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, মেটারনাল, চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারের মিডওয়াইফ লিপি আক্তার নিয়মিত রোহিঙ্গা নারীদের এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাউন্সেলিং করেন। প্রতিটি সপ্তাহেই তিনি ক্যাম্পেইন করতে যান ক্যাম্পে। লিপি বলেন, আরাকানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ছিল সর্বক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ। নিজ দেশে তারা স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ বলে যে একটি বিষয় রয়েছে সেটার সঙ্গে তারা তেমন পরিচিত নয়। বাংলাদেশে আসার পর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এ বিষয়টি জানতে ও বুঝতে পারছেন। লিপি বলেন, প্রথমদিকে জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা একেবারেই অনাগ্রহী ছিল। তবে পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। এখন রোহিঙ্গা নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণে আগ্রহ প্রকাশ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
ড্যাবের মহাসচিব প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর জন্মনিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গা পুরুষরাই প্রধান প্রতিবন্ধক। তারা তাদের স্ত্রীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করেন। ধর্মের ভয় দেখান। এমনকি মারধর ও বহুবিবাহের ঘটনাও ঘটে ক্যাম্পে। তিনি বলেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের শতভাগ জন্মনিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার বিকল্প নেই। আর সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা নারীদের চেয়ে রোহিঙ্গা পুরুষদের মধ্যেই সৃষ্টি করতে হবে সচেতনতা। এ জন্য সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে নিয়মিত ক্যাম্পেইন, কাউন্সেলিং করতে হবে।   ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন   বলেন, কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিলি করলেই হবে না সেগুলো ব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণের পন্থাও অবলম্বন করতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ করা কেন দরকার সে সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা দিতে হবে। বিশেষ করে নারীদের ধারণা দিতে হবে অতিরিক্ত গর্ভধারণ কীভাবে তাদের জন্য শারীরিক জটিলতা তৈরি বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। রোহিঙ্গা পুরুষদের সচেতন করতে হবে শরণার্থী জীবনে যেখানে খাবার, পানি, চিকিৎসাসহ নানা সংকট রয়েছে সেখানে নতুন শিশুর জন্মদান কেন ঠিক নয়। তাদের বুঝাতে হবে, সন্তান জন্ম দেয়াটাই বড় কথা নয়। তাকে মানুষ করে তোলাটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শরণার্থী জীবনে তা কি আদৌ সম্ভব? তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন আন্তর্জাতিক সংস্থার হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত একজন চিকিৎসক। তিনি বলেন, আরাকানে রোহিঙ্গাদের সন্ধ্যার মধ্যে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে হতো। সেখানে তাদের জীবনে কোনো বিনোদন ছিল না। স্ত্রী সঙ্গই ছিল রোহিঙ্গা পুরুষদের একমাত্র বিনোদন। তার ওপর সান্ধ্য আইনের কারণে সারা রাত বাড়িতে থাকতে হতো। ফলে তাদের মধ্যে জন্মহার বেশি। অন্যদিকে বার্মিজ সেনাবাহিনীর ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে প্রতিবছরই গর্ভধারণ করতেন রোহিঙ্গা নারীরা। দশকের পর দশক ধরে এমন পরিস্থিতি চলে আসায় বছর বছর সন্তান জন্মদানকে তারা প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে বিশ্বাস করে। এখন সে বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটাতে, বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের ধারণা দেয়া ও অব্যাহত কাউন্সেলিং দরকার।

ফ্রান্সই চ্যাম্পিয়ন by সামন হোসেন

ইতিহাস ছিল ফ্রান্সের পক্ষেই। আর ফাইনাল শেষে নিজেদের ইতিহাস সমৃদ্ধ করলো ফরাসিরা। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে শিরোপা উৎসব করলো ফ্রান্স।  গতরাতে মস্কোয় ফাইনালে দাপুটে নৈপুণ্যে ৪-২ গোলে জয় কুড়ায় ফরাসিরা। বিশ্বকাপে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার শিরোপার গৌরব কুড়ালো তারা। ফাইনালে  ক্রোয়েশিয়ার নৈপুণ্যটাও ছিল চোখেপড়ার মতোই। ম্যাচে ৬৫% বলদখল ছিল ক্রোয়েশিয়ার। আর ফ্রান্সের ৬ শটের বিপরীতে ক্রোয়াটরা প্রতিপক্ষ গোলবারে নেয় ১৩টি শট। ফ্রান্সের শুরুর দুই গোলে ছিল ভাগ্যের ছোঁয়া । হেডে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালে  বল জড়ান মারিও মানজুকিচ। ২৮তম মিনিটে ইভান পেরিসিচের গোলে সমতহায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। পরে গ্রিজম্যানের পেনাল্টি থেকে করা দ্বিতীয় গোলেও অবদান ইভান পেরিসিচের। উমতিতি লাফিয়ে উঠায় বল দেখতে পাননি পেরিসিচ, বল হাতে এসে লাগে তার। ভিএআর সিদ্ধান্তে পাওয়া পেনাল্টি গোলে ম্যাচে দ্বিতীয় দফায় এগিয়ে যায় ফ্রান্স।
১৫ মিনিটের সামপনী অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলো হলিউড সুপারস্টার উইল স্মিথের সঙ্গে কসোভোর গায়িকা ইরা ইস্ত্রেফির সঙ্গীত। জার্মানির সাবেক অধিনায়ক ফিলিপ লামের ট্রফি নিয়ে মাঠে প্রবেশ। ব্রাজিলিয়ান তারকা রোনালদিনহোর ড্রামের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীদের সুরের মূর্ছনাও ভালো লাগেনি লুঝনিকির দর্শকদের! তাইতো মনমূদ্ধকর এক সমাপনি অনুষ্ঠানে উচ্ছাস ছিল না। এরাই আবার দু’দল মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পরে। লুঝনিকির গ্যালারির এদিন অর্ধেকটা জুড়েই ছিলো সাদা-লালের সমাহার। ফ্রান্সের নীল-সাদার উপস্থিতি ছিল সে তুলনায় কম। গ্যালারির লড়াইয়ের মতো শুরুর দিকে মাঠও দখলে রেখেছিল ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু গোল করার মতো কোনো সুযোগ তৈরী করতে পারছিলো না ক্রোয়াটরা। উল্টো ম্যাচের ১৮ মিনিটে আন্তোইন গ্রিজম্যানের ফ্রি কিকে আত্মঘাতী গোল খেয়ে বসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠা দলটি (১-০)। বক্সের বাইরে থেকে গ্রিজম্যানের করা ফ্রি কিক মারিও মানজুকিচের মাথা ছুঁইয়ে আশ্রয় নেয় জালে।
তবে গোল হজমের পরই ঘুরে দাড়ায় ক্রোয়েশিয়া। তার নজির এবারের বিশ্বকাপে আগেও দেখিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। নকআউট পর্বের তিন ম্যাচের তিনটিতেই আগে গোল হজম করে পরে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। ডেনর্মাকের বিপক্ষে রাউন্ড অব সিক্সটিনে ডেনর্মাকের বিপক্ষে প্রথম মিনিটেই গোল খায় ক্রোয়েশিয়া। চার মিনিটেই সেই গোল শোধ করেন মারিও মানজুচিক। পরে টাইব্রেকারে জিতে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়াটরা। কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক রাশিয়ার বিপক্ষে আগে এক গোল খেয়ে দুই গোল দেয় ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়া দলটি। এই ম্যাচের নিস্পত্তিও হয় টাইব্রেকারে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও দু’দুবার পিছিয়ে গিয়ে টাইব্রেকারে ম্যাচ জেতে ফিফা র‌্যাঙ্কিং ২০ নাম্বারে থাকা দলটি। গতাকল লুঝনিকিতে এক গোল হজমের পর দশ মিনিটের ব্যবধানে তা শোধও করে তারা। ম্যাচের ২৮ মিনিটে বিপদজনক অবস্থায় ফ্রি কিক পায় ক্রোয়েশিয়া। ইভান রাকিটিচের শট বক্সের মধ্যে কয়েক পাক ঘুরে পেরিসিচের পায়ে পরলে ব্যথা পাওয়া পায়ে জাদু দেখান এই মিডফিল্ডার। দুর্দান্তভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একজনকে কাটিয়ে বা পায়ের কোনাকুনি শটে নিশানা খুঁজে পেলে সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া (১-১)। সমতা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি ইভান রাকিটিচ-পেরিসিচরা। ম্যাচের ৩৪ মিনিটে আবারও দূভার্গ্য ভর করে ক্রোয়েশিয়ানদের । ৩৪ মিনিট ফ্রান্সের এক ফ্রি কিকে লাফিয়ে উঠে হেড করতে ব্যর্থ হন মাতুইদি। এতেই তার পেছনে থাকা পেরিসিচের হাতে লাগে বল। রেফারি প্রথমে এড়িয়ে গেলেও। ফ্রান্সের দাবির প্রেক্ষিতে ভিএআর নেয়। আর্জেন্টাইন রেফারি ভিএআর দেখে নিশ্চিত হন পেনাল্টি। গ্রিজম্যান সেই পেনাল্টি থেকে গোল করতে ভুল করেননি (২-১)। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল পেতে পারতো ক্রোয়েশিয়া। ডি বক্সের ভেতর থেকে আন্তে রেবিচের জোরালো শটে ফরাসি গোলরক্ষক লরিস ফিস্ট করলে বল বার উঁচিয়ে যায়। ৫৯তম মিনিটে পল পগবার গোলে স্বস্তি বাড়ে ফরাসি শিবিরে। আর ডি বক্সের বাইরে থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পের আদায় করা গোলে শিরোপার একবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে ফ্রান্স। পরে যদিও ‘কমেডি অব ইরর’ দেখান ফ্রান্স অধিনায়ক হুগো লরিস। এক পাসে বল নিয়ন্ত্রণে নিতে না পেরে দৃষ্টিকটুভাবে গোল হজম করেন এ ফরাসি গোলরক্ষক।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে এই লুঝনিকি স্টেডিয়ামেই সমতা সূচক গোলটি করেছিলেন ইভান পেরিসিচ। তার সহযোগিতায় মারিও মানজুকিচের গোলে জয় পায় ক্রোয়েশিয়া। ফাইনালে উঠার ওই ম্যাচের পায়ের মাংশ পেশীতে টান পরে পেরিসিচের। আঘাত এতোটাই গুরুতর ছিলো যে মস্কোর একটি হাসপতালে চিকিৎসাও নিতে হয়েছে এই মিডফিল্ডারকে। ফ্রান্সে বিপক্ষে ফাইনালের আগে তাকে নিয়ে দোটানায় ছিলেন ক্রোয়েট কোচ জ্বালাতকো দালিচ। তাইতো দু’দিন বিশ্রাম দিয়েছিলোন এই তারকা ফুটবলারকে। ইনজুরি আক্রান্ত ইভান পেরিচিসকে নিয়েই একাদশ সাজান দালিচ। ফ্রান্সের একাদশও ছিলো অপরবর্তীতো।
সেমিফাইনালে ফ্রান্স ২-০ গোলে বেলজিয়ামকে এবং ক্রোয়েশিয়া ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ।