Showing posts with label আনোয়ার হোসেন. Show all posts
Showing posts with label আনোয়ার হোসেন. Show all posts

Tuesday, June 23, 2026

আওয়ামী লীগের সামনে চারটি পথ, বেছে নেবে কোনটি by আনোয়ার হোসেন

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দলটি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি আজ ক্ষমতার বাইরে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে। শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে।

টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?

দেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে দলটি। সবচেয়ে বেশি সময় দেশের ক্ষমতায় থাকার স্বাদ নিয়েছে। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এত এত সাফল্যের গল্প সবই ঢাকা পড়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।

এ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির অতীতের গৌরবের চেয়ে তাই বেশি আলোচিত হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ। পুরোনো ও প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক দল কীভাবে এ সংকট অতিক্রম করবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।

বর্তমান কৌশল কতটা কার্যকর

ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও নিষিদ্ধ। ফলে দলটির কার্যক্রম পুরোপুরিই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল, হরতালের ডাকও এসেছে। তবে সেটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কিছু নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রয়েছে।

এবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিল করছিল আওয়ামী লীগ। আজ মঙ্গলবার তা সারা দেশেই করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতারা।

এ পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে সরকার যে প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটাই তাদের সাফল্য। কারণ, ঝটিকা মিছিল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু দেশে এবং দেশের বাইরে এ নিয়ে যে আলোচনা হোক—এটাই চাইছে আওয়ামী লীগ।

তবে আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না; বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

ওই নেতা আরও বলেন, ছয় মাসের একটি সরকারের ওপর এভাবে চাপ দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবে; বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ওঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার।

ইতিহাসের শক্তি, বর্তমানের দুর্বলতা

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে যাত্রা শুরু, পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার ঘটে।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময়ই ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে দলটির ভূমিকা। পাকিস্তানি শাসনামলে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বাঁকে আওয়ামী লীগ ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি।

১৯৬৬ সালে ছয় দফাভিত্তিক বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিণত হয় দলটি। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এসব অর্জন আওয়ামী লীগকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬০টি আসন লাভ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও দলটি বিপুল বিজয় অর্জন করে; যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর পাল্টে যায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে পরাজয় এবং ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারির পর আরেক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।

ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পদ নয় বা পক্ষে থাকবে না—এটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইতিহাস আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু গত এক দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামল দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল। এই সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকেও অগ্রগতির দাবি করেছে দলটি। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন আওয়ামী লীগকে আগ্রাসী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। দেশে–বিদেশে জোটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের তকমা। দীর্ঘ সময় গুম-খুনের পর গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলি করে হত্যা—অপশাসনের চরম সীমায় নিয়ে যায় আওয়ামী লীগকে।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং দেশে–বিদেশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের কারণে ভোটারদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসে। একসময় যে দল গণভিত্তিক আন্দোলনে সুনাম অর্জন করেছিল, তারাই অগণতান্ত্রিক পথে দেশ চালাতে থাকে।

শেখ হাসিনাতে পুনরুত্থান, শেখ হাসিনাতেই পতন

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচ মেয়াদে ২০ বছরের বেশি দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চার যুগের কাছাকাছি সময় ধরে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে আছেন।

ফলে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ইতিহাস মূলত শেখ হাসিনার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান শেখ হাসিনা। এরপর এই পদে তাঁর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই তৈরি হয়নি দলে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যখন দলের দায়িত্ব নেন, তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিভক্ত ও নেতৃত্বসংকটে আক্রান্ত একটি দল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলটি বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা দলকে পুনর্গঠিত করেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন।

১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। ফলে দলটির ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ কার্যত থেমে যায়।

এখানেই আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে নেতাকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারণ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯৯০ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতন হয়। তিনি কারাগারে যান। আমৃত্যু তিনি দেশে ছিলেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। একমাত্র শেখ হাসিনাই বাংলাদেশে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও নেতা যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষ নেতা, এমনকি সহযোগী সংগঠনের নেতারাও দেশ ছাড়েন, যা বাংলাদেশে বিরল।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ দৃশ্যমান ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের এই করুণ পরিণতির মূল দায়ভার শেখ হাসিনারই বলে মনে করেন দলটির অনেক নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী।

সাংগঠনিক শক্তি কোথায় হারাল

আওয়ামী লীগ সব সময় দাবি করে এসেছে যে তাদের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতা হারানোর পর দেখা যায়, সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের এতটা দুরবস্থা হয়নি। জেল হত্যাকাণ্ড, অনেক নেতাকে কারাগারে প্রেরণের পরও দেশে অনেক নেতা ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, সহযোগী সংগঠনের সব শীর্ষ নেতা বিদেশে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যরা কারাগারে চলে গেছেন। ফলে দেশে দলটি অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য। বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগই মূল ভরসা, যা রাজপথ কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।

বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে মনে করেন রাজনীতি–বিশ্লেষকেরা।

প্রথমত, দলটি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় থাকতে পারে। নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং জনসমর্থনের সংকট মিলিয়ে দলটির পুনর্গঠন দীর্ঘায়িত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে। দলটি যদি শেখ হাসিনানির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনে এবং অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা করে, তাহলে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তৃতীয়ত, দলটি বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ অতীতেও একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রশ্নে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চতুর্থত, রাজপথে শক্তি দেখিয়ে আবার ফিরে আসা। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভুল করবে। বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হবে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন একটা সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবে। দৃশ্যত আওয়ামী লীগ এখনো এই পথেই হাঁটছে বলে মনে দলটির সূত্র জানিয়েছে। তবে অনেকেই এটাকে ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা করছেন।

৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ তাই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দলটি কি আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথ বেছে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি অতীতের গৌরবের স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অন্ধকারে পথ খুঁজবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয় যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে নিয়ে
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয় যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে নিয়ে। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Friday, August 21, 2015

যন্ত্রণা এখনো সঙ্গী by আনোয়ার হোসেন

‘আজাদ ছিল বেশ আমোদপ্রিয়। এ জন্য আমাদের বিয়েটা হয়েছিল ১৯৯৫ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে। এক মেয়ে ও এক ছেলে এল সংসারে। আনন্দেই দিন কাটছিল। কিন্তু এক বিকেলেই সব অন্ধকার হয়ে গেল। এখন আছে কেবল স্মৃতি, আজাদের ক্ষতবিক্ষত দেহের ছবি আর রক্তমাখা জামা।’
কথাগুলো মাকসুদা আজাদের। কান্না থামিয়ে দিল তাঁর কথা। পাশে বসা শাশুড়ি আনোয়ারা বেগম, মেয়ে মাহফুজা আজাদ ও ছেলে আল আমিন আজাদও কান্না চেপে রাখতে পারল না। স্মৃতি মনে করে তাঁর জন্য তিন প্রজন্মের অঝোর কান্না।
আজাদের পুরো নাম আবুল কালাম আজাদ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলায় নিহত ২২ জনের একজন তৎকালীন ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। নিহত অন্যদের মতো তাঁর স্বজনেরাও প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক-ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছেন, আঁকড়ে আছেন স্মৃতি। আর ওই হামলায় আহত অনেক নেতা-কর্মীর এখনো সঙ্গী দুঃসহ যন্ত্রণা। কারও পা অচল, কেউ হারিয়েছেন চোখ, কেউ শ্রবণশক্তি। ওই হামলায় আহত হয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।
নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও আহত কয়েকজন বলেছেন, ওই গ্রেনেড হামলায় আহত ব্যক্তিদের আওয়ামী লীগ থেকে চিকিৎসা খরচসহ এককালীন ও মাসিক ভাতা দেওয়া ছাড়াও চিকিৎসা করানো হয়। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের ও আহত ব্যক্তিদের ১০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র দেন। এ থেকে মাসে ১০ হাজার ৭০০ টাকা আসে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে দেওয়া হয় মাসে পাঁচ হাজার টাকা। নিহত কয়েকজনের স্বজন বললেন, সরকার একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলে সবচেয়ে উপকার হয়।
সেই দিনের কথা: আজাদের মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকে বালুঘাটের বারানটেকে। মিরপুর উড়ালসড়ক দিয়ে মানিকদী গিয়ে ভাঙা সড়ক ধরে এগোলে বালুঘাট বাজার, সেখান থেকে বেশ কিছুটা গেলে বারানটেকে আজাদদের বাড়ি। গত বুধবার ওই বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ে আজাদের মা বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম ছেলের বাঁধানো একটা ছবিতে পরম মমতায় হাত বোলাচ্ছেন। ছেলের কথা জানতে চাইলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। একপর্যায়ে বলেন, ‘ওই দিন যে জামাকাপড় পরে আজাদ সমাবেশে গিয়েছিল, সেগুলো যত্ন করে রেখেছি। এগুলোতে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র। স্প্লিন্টারগুলো ঢোকার সময় কত কষ্টই না পেয়েছে আমার সোনার চান।’ স্বামীর ভিটায় একতলা বাড়ির একাংশে তিনি আজাদের বিধবা স্ত্রী মাকসুদা ও দুই সন্তান মাহফুজা ও আল আমিনকে নিয়ে থাকেন। আনোয়ারার আরও তিন ছেলে ও দুই মেয়ে আছে।
বাবাকে হারানোর সময় মাহফুজার বয়স ছিল পাঁচ বছর, আল আমিনের দুই বছর। মাহফুজা এখন বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী। ২০০৪ সালের ওই দিনটি সম্পর্কে সে প্রথম আলোকে বলে, ‘আমি তখন মানিকদী গ্রিন হ্যাভেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে নার্সারিতে পড়ি। স্কুল শেষে বেরিয়ে দেখি, বাবা ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে গেটে অপেক্ষা করছেন। বাসায় আসার পথে বাবা আমাকে একটা পুতুল কিনে দেন। এটাই বাবার দেওয়া শেষ উপহার।’ বলতে বলতে ফুঁপিয়ে ওঠে মাহফুজা।
মাকসুদা বলেন, ‘সেদিন সন্ধ্যার দিকে টিভিতে দেখি আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা হামলা হয়েছে। তখনই মনটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। আজাদ তো আওয়ামী লীগের সমাবেশ মিস করে না। শাশুড়িকে বললাম পাড়ায় খোঁজ নেন। অনেকে জানাল, আজাদ সমাবেশে গেছেন। সর্বনাশ হয়ে গেছে ভেবে আমি প্রায় অজ্ঞান। এরপর তো ঘটেই গেল।’
গ্রেনেড হামলার পর আজাদ হতাহত অসংখ্য মানুষের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ভেবে তাঁকে মর্গে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় নড়ে ওঠেন। তখন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ছুটে যান স্বজনেরা। পরে তাঁকে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নেওয়া হয়। চোখ খোলা থাকলেও ছিলেন নির্বাক, অচেতন। ওই অবস্থায় বেঁচে ছিলেন ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। স্বজনেরা গ্রেনেডে ক্ষতবিক্ষত দেহটা দেখেছেন, কিন্তু কথা বলতে পারেননি।
আজাদের স্ত্রী বলেন, ‘দল (আওয়ামী লীগ) ও শেখ হাসিনা আর্থিক সহায়তা করেছেন। অবস্থার সামান্য উন্নতি হলে আজাদকে উন্নত চিকিৎসা করানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উন্নতি হয়নি। আসলে আমার ভাগ্যই খারাপ। সবার সহানুভূতিই পাচ্ছি। কিন্তু স্বামীকে তো পাচ্ছি না। সন্তানেরা বাবা ডাকতে পারছে না।’
বিয়েবার্ষিকী করা হয়নি আইরিনের: মোস্তাক আহমেদ (সেন্টু) ও আইরিন সুলতানার বিয়েবার্ষিকী ২২ আগস্ট। ঘরোয়া হলেও প্রতিবছরই দিনটি পালন করতেন এই দম্পতি। ২০০৪ সালেও কিছু প্রস্তুতি ছিল তাঁদের। কিন্তু ২১ আগস্টের বিকেলেই সব শেষ হয়ে যায়। গ্রেনেড কেড়ে নেয় স্বামীকে।
আইরিন বলেন, ‘সাত বছরের সংসার। রাত ১২টার পর বিয়েবার্ষিকী। ঘটনার দিন বিকেলেও আমাকে বলে গেল, তুমি প্রস্তুতি নিয়ে রেখো। আমি আগে আগেই বাসায় আসব। কিন্তু তাঁর আর আসা হলো না। বিয়েবার্ষিকী আর স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী এখন একাকার।’ তিনি বললেন, মোস্তাক আহমেদ ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করতেন। ২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট গ্রামের বাড়ি বরিশালে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে ২০ আগস্ট ঢাকায় ফিরেছিলেন। ২১ আগস্ট দুপুরের পরই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে যোগ দেন।
আইরিন বলেন, গ্রেনেড হামলা হওয়ার পর তিনি স্বামীর খোঁজে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে যান। সেখানে না পেয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেন। এরপর খবর পান, পঙ্গু হাসপাতালে আছেন। কিন্তু মারা গেছেন তা জানতেন না। রাত নয়টায় পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে জেনেই জ্ঞান হারান।
মোস্তাক ও আইরিন দম্পতির একমাত্র সন্তান আফসানা আহমেদ। চার বছর বয়সেই বাবাকে হারানো আফসানা এখন আইডিয়াল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।
আইরিন আহমেদ বলেন, ‘মেয়েটা এখন সবই বোঝে। তবে সেদিনের স্মৃতি মনে করতে পারে না। আমরাও তাকে মনে করাই না। কারণ, আমাদের মনে যে ব্যথা, সেটা তার মধ্যে সংক্রমিত হোক তা চাই না।’
মোস্তাক আহমেদের মা অন্য ছেলেদের সঙ্গে থাকেন। আইরিন মেয়েকে নিয়ে থাকেন তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে। স্বামীর মৃত্যুর পর আইরিন মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন।
দৌলতুন্নাহার অনেকটা ঘরবন্দী: ওই গ্রেনেডে হামলায় বাঁ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন দৌলতুন্নাহার। পা দুটিতে অসংখ্য স্প্লিন্টারের দাগ, দুটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। তাঁর সঙ্গে কথা হয় পল্লবীর বাসায়। একেবারে অচল হয়ে যাননি। তবে অনেকটাই ঘরের মধ্যে বন্দী। তিনি বললেন, গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বাঁ চোখে লাগার পরই তিনি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের ড্রেনে পড়ে যান। এরপর আর কিছু মনে নেই। লাশের সঙ্গে তাঁকে মর্গে ফেলে রাখা হয়েছিল। মর্গ থেকে তাঁকে খুঁজে বের করেন এক স্বজন। বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করান। পরে দলীয়ভাবে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়।
দৌলতুন্নাহার বলেন, ‘প্রাণে বেঁচে গেলেও জীবন বলতে যা বোঝায় তা নেই। মাস ছয়েক আগে অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা উঠেছিল। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসক অস্ত্রোপচারে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ, সারা শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার। অস্ত্রোপচার করতে গেলে যদি কোনো বিপত্তি বাধে। যা-ই ঘটুক এর দায় আমার—এ নিশ্চয়তা পেয়ে পরে চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেন।’
দৌলতুন্নাহার বলেন, ‘রাতে যখন স্প্লিন্টারের জন্য ব্যথা শুরু হয়, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। হাত, পা, মাথা সর্বত্রই ব্যথা হয়। পুরো শরীরই যেন অবশ হয়ে পড়ে।’
শরীফের ব্যবসায় ভাটা: গেন্ডারিয়ার ধুপখোলা মাঠের পাশে হার্ডওয়্যার ও মেশিনারির কারখানা আছে শরীফ হোসেনের। নিজেই এসব তৈরি করে বিক্রি করেন। গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার আগে ব্যবসা ভালোই ছিল। আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী শরীফ দলের অন্য মিছিল-সমাবেশের মতো ২০০৪ সালের ২১ আগস্টও যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে। কিন্তু সেদিনের গ্রেনেড হামলায় তাঁর শ্রবণশক্তি প্রায় চলে গেছে। পা দুটিও গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। কোনোরকমে চলাফেরা করতে পারেন।
বর্তমানে ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শরীফ বলেন, প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়, পরে নেওয়া হয় পঙ্গু হাসপাতালে। এরপর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্মচারী দিয়ে ব্যবসা চালিয়েছেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে নিজে যখন ব্যবসার হাল ধরতে গেলেন, তখন আর আগের অবস্থা নেই। কোনোমতে ব্যবসা টিকে ছিল। এখনো চলছে কোনোমতে। অর্ডার পেলে কিছু কিছু মালামাল সরবরাহ করেন। তাঁর দুই মেয়ে সম্মানের ছাত্রী, ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

Monday, August 10, 2015

নতুন বাস নামাতে মূল বাধা মালিক সমিতির চাঁদাবাজি by আনোয়ার হোসেন

ঢাকাসহ সারা দেশে নতুন বাস-মিনিবাস নামানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা মালিক সমিতিগুলোর চাঁদাবাজি। বাস নামানোর আগেই মালিক সমিতির সদস্যপদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ২ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাস-মিনিবাস না নামার এটি অন্যতম কারণ। এই সুযোগে রাস্তা দখল করে নিয়েছে নানা ধরনের তিন চাকার ছোট্ট যানবাহন।
সারা দেশে চলাচলরত বাস-মিনিবাসের অন্তত ৩০ শতাংশ ২০ বছরের বেশি পুরোনো, লক্কড়-ঝক্কড়। আর ৬১ শতাংশের বয়স ১০ বছরের ওপরে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বাস নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার থেকে জানা গেছে, সারা দেশে বাস-মিনিবাসের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ৬১ হাজার ৫৮৯টি। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৮২২টি বাস-মিনিবাস ১০ বছরের পুরোনো। ২০ বছরের পুরোনো বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ১৮ হাজার ৫৪টি।
বিআরটিএর আরেক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালের পর থেকে সারা দেশে বাস-মিনিবাসের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৩৫টি। অথচ এই সময় অটোরিকশা ও টেম্পোর নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ১৬২টি। কিন্তু সারা দেশে বৈধ-অবৈধ অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইক রয়েছে ১৩ লাখের বেশি। এগুলোকে জাতীয় মহাসড়ক থেকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে এখন নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশে কত মানুষের জন্য কী পরিমাণ গণপরিবহন দরকার, এই বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই। তবে বিদ্যমান গণপরিবহনব্যবস্থা যে মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না, এটা পরিষ্কার। তা না হলে তো ধীরগতির তিন চাকার যানের এত চাহিদা থাকত না। তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিকদের সিন্ডিকেটের কারণে গণপরিবহনে বিনিয়োগ কমে গেছে। দূরপাল্লার কিছু পথ বাদ দিলে বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থা আরামদায়ক কিংবা আকর্ষণীয় নয়। ফলে মানুষ ধীরগতির যানের দিকে ঝুঁকছে।
পরিবহন খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী একাধিক ভুক্তভোগী জানান, বিআরটিএ এবং পরিবহন কমিটির অনুমোদনের আগেই মালিক সমিতির সদস্য হতে হয়। আর মালিক সমিতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতা বা নেতাদের আত্মীয়স্বজন। এই চাঁদা আদায়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোরও সমর্থন থাকে।
কয়েকজন পরিবহনমালিক প্রথম আলোকে বলেন, মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বাস নামানোর পর মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পুলিশকে দিতে হয় দৈনিক বা মাসিক চাঁদা। এমনকি মালিক সমিতি না চাইলে সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাসও চলতে পারে না। গত এক দশকে মালিক সমিতির চাপ, ধর্মঘট ও ভাঙচুরে শিকার হয়ে বিআরটিসিই অন্তত ৫০টি পথে বাস চলাচল গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।
অবশ্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, এখন আর চাঁদা নিয়ে সমিতির সদস্য করার বিষয় নেই। অতীতে ছিল। টুকটাক কোনো জেলায় চাঁদা নেওয়ার খবর পেলে তাঁরা প্রশাসনকে নিয়ে মোকাবিলা করে থাকেন।
বাসের দামের চেয়ে সমিতির চাঁদা বেশি: বছর তিনেক আগে ভোলা-চরফ্যাশন পথে চালানোর লক্ষ্যে ১১ লাখ টাকা দিয়ে একটি পাঁচ বছরের পুরোনো বাস কিনেছিলেন মেহেদী হাসান। কিন্তু বাস কেনার পর জানতে পারলেন, সরকারের অনুমোদনের আগে স্থানীয় মালিক সমিতির সদস্যপদ লাগবে। সদস্যপদের জন্য গেলে তাঁর কাছে দাবি করা হয় ১৮ লাখ টাকা। ব্যর্থ হয়ে পরে মেহেদী বাসটি বিক্রি করে দেন।
মেহেদী হাসান বলেন, ১৮ লাখ টাকায় সদস্যপদ নিয়ে একটি বাস চালিয়ে পোষাবে না ভেবে তিনি সরে আসেন। তবে সম্প্রতি ওই জেলায় একজন ২০ লাখ টাকায় মালিক সমিতির সদস্যপদ কিনে বাস নামিয়েছেন।
১৯৯৬ সালের পর ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফজলুল কাদের মোল্লা মালিক সমিতিকে পাশ কাটিয়ে চারটি নতুন বাস নামিয়েছিলেন। কিন্তু তিন মাসের বেশি টিকতে পারেননি।
ফজলুল কাদের মোল্লা বর্তমানে ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই জেলার বেশির ভাগ বাসই ছিল কয়েকবার ইঞ্জিন-বডি পরিবর্তন করা লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা। তিনি চারটি নতুন বাস নামিয়েছিলেন। কিন্তু মালিক সমিতির সদস্যপদ না নেওয়ার কারণে তাঁর বাস ভাঙচুর করা হয়। পরে তিনি বাস বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
ভোলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সমিতির মালিকানায় বাস, জমিসহ অনেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে। সদস্য হওয়ার অর্থ হচ্ছে ১৩-১৪ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হওয়া। এ জন্যই চাঁদার ব্যবস্থা।’ তিনি জানান, সমিতি থেকে প্রতি মাসে সদস্যদের ১০ হাজার টাকা করে বোনাস দেওয়া হয়।
ভোলার মালিক সমিতির এই চিত্র বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কম-বেশি এটাই সারা দেশের চিত্র। সম্প্রতি সিলেট পথে চলাচলকারী একটি বাস কোম্পানির মালিক পিরোজপুরের মালিক সমিতিকে তিন লাখ টাকা দিয়ে সেই জেলায় বাস চালানোর অনুমতি পেয়েছেন। ঢাকায় দিশারী পরিবহনের অধীনে একটি বাস নামাতে মালিককে ব্যয় করতে হয় তিন লাখ টাকা। তবে ভুক্তভোগীদের কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।
পিরোজপুর জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান ওরফে মহারাজ। কিন্তু তাঁর নিজের কোনো বাস নেই। তিনি স্থানীয় সাংসদ এ কে এম এ আউয়ালের (সাইদুর রহমান) ভাই।
ঢাকা থেকে পিরোজপুর পর্যন্ত বাস চালানোর অনুমতি দিতে একটি কোম্পানির কাছ থেকে তিন লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন মশিউর রহমান। তিনি গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। তবে জেলায় বাস চালানোর জন্য বিআরটিএর অনুমোদনের বাইরে আমাদের অনুমোদন নিতে হয়। নতুবা আমাদের মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ঢাকার পরিবহন কোম্পানিকে শর্ত দিয়েছি, যাতে ভোর ছয়টার আগে শহর ছাড়ে।’
সমিতির সদস্য হতে মোটা অঙ্কের চাঁদা লাগে কি না জানতে চাইলে মশিউর রহমান বলেন, পিরোজপুরে চার-পাঁচ বছর ধরে সদস্য নেওয়া বন্ধ আছে। কারণ, নতুন বাস নামলে পুরোনো মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি দাবি করেন, আগে পিরোজপুরে দৈনিক ১৬৫ টাকা চাঁদা নেওয়া হতো। তিনি এসে কমিয়ে ১০ টাকা করেছেন। সমিতি চালানো কঠিন হয়ে গেলে চাঁদা ২৫ টাকা করা হয়।
নিজের বাস না থাকার বিষয়ে মশিউর বলেন, ‘আমার বাস নেই এটা সত্যি। তবে আগে ছিল। নেতা হওয়ার জন্য বাস থাকার চেয়ে সদস্যপদ থাকা বাধ্যতামূলক।’
ঢাকা-টাঙ্গাইল ও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে বাস যোগাযোগ বেশ জনপ্রিয়। সেখানকার মালিক সমিতি নতুন বাস নামানোর ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয় বলে মালিকদের সূত্রে জানা গেছে। ওই জেলায় ৮০০-৯০০ বাস-মিনিবাস চলাচল করত। এখন শ দেড়েক বাস কমে গেছে। টাঙ্গাইলে বাস মালিকদের দুটি সংগঠন একত্র করে এর সভাপতি হন স্থানীয় সাংসদ আমানুর রহমান খানের ভাই জাহিদুর রহমান। খুনের মামলায় খান পরিবারের সদস্যরা এখন পলাতক।
অবশ্য জেলার বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির বাস শাখার সাধারণ সম্পাদক তাবিবুর রহমান দাবি করেন, সমিতির কেউ বাস নামালে পাঁচ হাজার এবং বাইরের হলে ১০ হাজার টাকা নিয়ে সদস্যপদ দেওয়া হয়। এর বাইরে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই।’
টাঙ্গাইলের নাগরিকেরা দীর্ঘদিন ধরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস নামানোর দাবি করে আসছিলেন। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হন আগ্রহীরা। সর্বশেষ আক্তার হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে এই বিষয়টি তুললে প্রশাসন তৎপর হয়। সনি এন্টারপ্রাইজ নামে চারটি বাস নামেও। তবে জেলার ঢাকামুখী সব বাসের গন্তব্য মহাখালী টার্মিনাল হলেও সেই এসি বাস সার্ভিসকে মহাখালীতে থামতে দেওয়া হয় না। তাকে দাঁড়াতে হয় শ্যামলীতে।
লক্কড়-ঝক্কড় যান বাড়ছে: বিআরটিএ সূত্র জানায়, কাগজেপত্রে বর্তমানে সারা দেশে প্রতি মাসে গড়ে ২০০ বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এর অর্ধেককেই এক জেলা থেকে এনে অন্য জেলায় কিংবা এক রুট থেকে অন্য রুটে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়। নতুন বাসগুলো নামছে দূরপাল্লার পথে।
মোটরযান আইন অনুসারে, যত দিন ফিটনেস থাকবে, তত দিন একটি গাড়ি চলতে পারবে। তবে নির্বাহী আদেশে রাজধানীতে বাসের ২০ এবং ট্রাকের জন্য ২৫ বছরের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ২০ বছরের অধিক পুরোনো বাসও ঢাকার রাস্তায় চলছে।
বিআরটিএর হিসাবে, বর্তমানে সারা দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ৩ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস ৪১ শতাংশ বা প্রায় ২৫ হাজার। অবশ্য ফিটনেস সনদ হালনাগাদ না করলেও তা ফিটনেসবিহীন গাড়ির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, ফিটনেসবিহীন যানের সংখ্যা পাঁচ হাজারের মধ্যে থাকলে বলতে হবে পরিবহনব্যবস্থা ঠিক আছে।
মহানগরগুলোতে বাস চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট) দেয় পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বাধীন পরিবহন কমিটি। জেলায় কমিটি হয় পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে। আন্তজেলা পরিবহনের চলাচলের অনুমোদন দেয় বিআরটিএর সদর কার্যালয়। সব কমিটিতেই মালিক-শ্রমিকের প্রতিনিধি থাকেন। বিআরটিএর প্রতিনিধি কমিটির সদস্যসচিব এবং সংস্থাটি নথিপত্র সংরক্ষণ করে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, ছোট গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির অর্থ হলো যানজটকে ডেকে আনা। আর সড়ক নিরাপত্তা তো বিপন্ন হবেই। এ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি বলেন, সবচেয়ে ভালো হয় রেল ও নৌপথব্যবস্থার উন্নয়ন। বিকল্প হিসেবে অবশ্যই বাসকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে এর জন্য সরকারকে সুস্থ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে।

Wednesday, August 5, 2015

মহাসড়কে ৩ চাকার যান ১৩ লাখ by আনোয়ার হোসেন

জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলে
নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড
এলাকায় রাস্তা অবরোধ করেন অটোরিকশা শ্রমিক ও
মালিকেরা। একপর্যায়ে পুলিশ বাধা দিলে উভয় পক্ষের
মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয় l ছবি: প্রথম আলো
কিছু স্ববিরোধিতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের শৈথিল্যের কারণে মহাসড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। সরকার মহাসড়কে ধীরগতির ইজিবাইক বন্ধের কথা বললেও আমদানি বন্ধ করেনি। ‘মহাসড়কে চলতে পারবে না’ সিল মেরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে অবাধে। আর নছিমন-করিমন-ভটভটি নিবন্ধন ছাড়া মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়ালেও কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করেছে। এই তিন ধরনের যানের সংখ্যা ১৩ লাখেরও বেশি।
সড়ক খাতের বিশেষজ্ঞ ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দু-তিন বছর আগেও জাতীয় মহাসড়কে এত ধীরগতির যান চলত না। ২০১০ সালে এগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মন্ত্রণালয় তৎপর হলে সাধারণ মানুষকে এখন এত ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। তবে সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়ক থেকে ধীরগতির যান উচ্ছেদের কোনো বিকল্প নেই।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে আরও আগেই ধীরগতির যান মহাসড়ক থেকে উচ্ছেদ করা উচিত ছিল। তবে এখন যেভাবে আড়ম্বর করে বন্ধের অভিযান চলছে, তা যেন থমকে না যায়। অবশ্য বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা না থাকলে সেটাও করতে হবে।
মহাসড়ক থেকে ধীরগতির তিন চাকার অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি চলাচল বন্ধের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয় জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২০১০ সালের এক বৈঠকে। এরপরও অপরিকল্পিতভাবে তিন চাকার অটোরিকশা ও টেম্পোর নিবন্ধন দিয়ে চলেছে সরকার।
ধীরগতির যান না চলা ও আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত পাঁচ বছরেও কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুসারে, সারা দেশে নিবন্ধিত অটোরিকশা ও টেম্পোর সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজারের কিছু বেশি। আরও প্রায় এক লাখ নিবন্ধন ছাড়াই চলছে। বিআরটিএ ও মালিক-শ্রমিক সমিতিগুলোর ধারণা, নিবন্ধনহীন নছিমন-করিমন-ভটভটি ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, শুধু চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলাতেই প্রায় ১৫ হাজার অটোরিকশা চলে নিবন্ধন ছাড়া। সিলেট অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের একটি সূত্র জানায়, সেখানে নিবন্ধনহীন অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার।
বিআরটিএ ২০১০ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৩৮৮টি অটোরিকশা এবং প্রায় আড়াই হাজার টেম্পোর নিবন্ধন দিয়েছে। অথচ সড়কে-মহাসড়কে পর্যাপ্ত বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা নেই। ফিটনেসবিহীন ও ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাস মহাসড়কে চললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অভিযোগ আছে, মালিক সমিতিগুলোর অশুভ তৎপরতার কারণে নতুন করে বাস নামছে না। কারণ, নতুন বাস নামাতে মালিক সমিতির সদস্য হতে হয় এবং এ জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়।
২০১০ সালে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মহাসড়কে চলাচল বন্ধ এবং এগুলোর কোনো নিবন্ধন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। একই সঙ্গে এগুলোর আমদানি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়।
কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা ৪৪। স্বরাষ্ট্র, সড়ক পরিবহন, নৌ, রেল ও তথ্য—এই পাঁচ মন্ত্রণালয়ও কাউন্সিলর সদস্য। এর বাইরে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা রয়েছেন। সব বিভাগ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কখনোই সমন্বয় রক্ষা করা হয়নি।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সোমবার কমলাপুর স্টেডিয়াম মার্কেট এবং এর আশপাশে গড়ে ওঠা শোরুমে অসংখ্য ইজিবাইক বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখতে দেখা যায়। বিক্রেতারা জানান, চীন থেকে যন্ত্রাংশ এনে ঢাকায় সেগুলো সংযোজন করে বিক্রি করা হয়।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই অভিযান থেকে সরে আসা হবে না। মাত্র ৩ হাজার ৫৭০ কিলোমিটারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের প্রায় আড়াই লাখ কিলোমিটার রাস্তায় ধীরগতির যান চলতে পারবে।
আগেই এগুলোর চলাচল বন্ধের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আমরা তৎপর ছিলাম। নানা কারণে সম্ভব হয়নি। এখন আর ছাড় দেওয়া হবে না।’ ইজিবাইকের আমদানি বন্ধ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আন্তমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তের বিষয়। কাজ চলছে। অবাধে অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি মহাসড়কের বাইরে চালিয়ে আয় করতে পারে, সেটা করুক।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধ যানবাহন উচ্ছেদের পাশাপাশি সরকারকে বাস্তববাদী হতে হবে। বিকল্প বাস নামাতে হবে, না হলে অটোরিকশার জন্য আলাদা লেন করতে হবে।

Sunday, August 2, 2015

‘দেখেছেন না বাহে, হামরা বাংলাদেশি হইছি’ লাঠিখেলায় আনন্দ আয়োজন by আনোয়ার হোসেন ও এ বি সফিউল আলম

৬০ বছরের বৃদ্ধ বাহেদ আলীর হাতে একটি বাঁশের লাঠি। লাঠিটি দিয়ে তিনি আঘাত করার চেষ্টা করছেন ৩৫ বছর বয়সী নুরুজ্জামানকে। নানা কসরতে সেই আঘাতের চেষ্টা হাতের লাঠি দিয়ে ঠেকিয়ে পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করেন নুরুজ্জামান। তা প্রতিহত করেন বাহেদ আলী।
বাহেদ আলী ও নুরুজ্জামান সম্পর্কে বাবা-ছেলে। তাঁদের এই ‘লড়াই’ পারিবারিক কোনো কলহ নয়। গ্রাম-বাংলার চিরায়ত উৎসব লাঠিখেলায় মেতেছিলেন তাঁরা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা ছিটমহলে গিয়ে এই লাঠিখেলা দেখা গেল। স্থানীয় লোকজন বললেন, ৬৮ বছর পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার মুহূর্ত উদ্যাপনের অংশ হিসেবে এই লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়।
বাবা-ছেলের লাঠিখেলা বেশ উপভোগ করেন বাঁশকাটা এলাকার কয়েকটি ছিটমহলের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষ। এঁদের মধ্যে ছিলেন বাহেদের স্ত্রী সুরাতন্নেছা, নুরুজ্জামানের স্ত্রী সামিনা খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও। তাঁরা হাততালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন দুজনকেই। দর্শকদের বেশির ভাগই ছিলেন নানা বয়সের নারী।
৪২ বছর বয়সী নুরনাহার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘কী কমো বাহে। দেখেছেন না বাহে, হামরা বাংলাদেশি হইছি। এ জন্য আনন্দ-উল্লাস করছি বাহে।’
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রাক্কালে এমন নানা উৎসবের আয়োজন করেছেন বাঁশকাটার ছিটমহলের বাসিন্দারা। গতকাল রাত ১২টার সময় ৬৮টি মোমবাতি জ্বালিয়ে উৎসব করেন তাঁরা। ওই এলাকায় ২১টি ছিটমহল রয়েছে। এর মধ্যে ১১টিতে কোনো বাসিন্দা নেই। বাকি ১০টি ছিটমহলের বাসিন্দা ২ হাজার ৮২৪ জন। এর মধ্যে বসটারি গ্রামের ৯৭ জন ভারতে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অবশ্য তেমন কোনো উৎসব দেখা যায়নি।
ছিটমহল বিনিময় কমিটির নেতা ও বাঁশকাটার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, আজ শনিবার সকাল সাতটায় বাঁশকাটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হবে। এ সময় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ ছিটমহলবাসীরা উপস্থিত থাকবেন।
ছিটমহলের নারীদের জন্য বিকেলে রয়েছে বালিশ খেলা। বিকেলে পুরুষেরা খেলবেন বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু।
ছিটমহলের বাসিন্দা ও পল্লিচিকিৎসক রেজাউল করিম বলেন, ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবনে খেলাধুলা বা উৎসবের স্থান ছিল না। তাঁদের বিনোদন বলতে ছিল খেতে কাজ করা। এবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়াটা উদ্যাপনের জন্য সবাই নানা আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ছিটমহলের সব বাসিন্দার জন্য আজকের দিনটি ঈদের মতো।
ছিটমহলে মাঠ নেই। আনন্দ আয়োজনের এসব অনুষ্ঠান তাই গ্রামের বড় একটি বাড়ির উঠানেই সম্পন্ন হচ্ছে। বাড়ির বাসিন্দারাও সানন্দে এই আয়োজনে অংশ হতে পেরে গর্বিত বলে জানিয়েছেন।
লাঠিখেলা দেখতে আসা ছিটমহলের বাসিন্দা ৫০ বছরের রফিকুল ইসলামের চোখে-মুখেও ফুটে উঠেছিল উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, ‘হামরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হমো বাহে। এই জন্যে আনন্দের শেষ নাই। বাংলার ঐতিহ্য খেলার মধ্য দিয়ে আরও একবার স্বাধীন হইনো।’
স্থানীয় লোকজন বললেন, লাঠিখেলায় দুজন খেলোয়াড় একসঙ্গে অংশ নেন। তাঁদের পালা শেষ হলে আসেন আরেক দল। এভাবে গতকাল বিকেল থেকে সাত-আটটি দল লাঠিখেলায় অংশ নেয়। এরা সবাই ছিটমহলের বাসিন্দা।

Friday, July 31, 2015

সড়ক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে by আনোয়ার হোসেন

পেশাদার মোটরগাড়ি চালকদের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে আইনের কোনো শর্তই মানছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। শর্ত না মেনে বা যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই গত ছয় মাসে প্রায় ৩২ হাজার পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ যানবাহন চলছে ফিটনেস সনদ ছাড়া।
এই অবস্থায় দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। ১৫ জুলাই থেকে গত শনিবার পর্যন্ত ঈদকালীন ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫২ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ঈদের পরদিন সিরাজগঞ্জে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ১৭ জনের। এর মধ্যে একটি বাসের ফিটনেস সনদ ছিল না। গত বছরের অক্টোবরে নাটোরে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৬ জন প্রাণ হারায়। ওই বাসের ফিটনেস সনদ ছিল না। এ জন্য তদন্ত কমিটি মালিকদের দায়ী করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালাচ্ছি। এরপরও পরিস্থিতি আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না।’ এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিকদের দিক থেকে বাধা বা চাপ আছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, কঠোর অবস্থানে গেলে জনগণকে জিম্মি করে মালিক-শ্রমিক ধর্মঘট ডেকে বসে। তখন জনগণের কথা ভেবে নমনীয় হতে হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৪ সালে মারা গেছে সাড়ে আট হাজার মানুষ। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ২ হাজার ৬৭। সড়ক নিরাপত্তার মূল পাঁচটি বিষয় হচ্ছে—ত্রুটিমুক্ত যান ও সড়ক, যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া লাইসেন্সধারী দক্ষ চালক, সড়কের পরিবেশ এবং আইনের প্রয়োগ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো উপেক্ষিত।
দেশে ত্রুটিমুক্ত সড়ক ও যানবাহন এবং যথাযথ পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। মোটরযান-সংক্রান্ত আইন হালনাগাদ করাও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু কোনোটাই সঠিকভাবে হচ্ছে না। বরং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে আরেক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠনের চাপ ও সুপারিশে।
সড়কে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তও নেন তিনি। সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয় না। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইন মানা এবং সড়ক ত্রুটিমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণাতেই থেকে গেছে। মোটরযান আইন পরিবর্তনের জন্য করা খসড়াটিও দুই বছর ধরে ঝুলে আছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ত্রুটিপূর্ণ যান ও যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে চালক নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। বর্তমানে শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এর কার্যকরী সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। শাজাহান খানের পরিবারের বাসের ব্যবসাও আছে। আর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান। সমিতির নেতাদের বেশির ভাগই সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
গত জানুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলন শুরু হলে এর বিরুদ্ধে পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের নিয়ে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেন শাজাহান খান। এর আগে ২০১১ সালে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরকে চাপা দেওয়া বাসের চালককে গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে ঢাকায় সমাবেশ করে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। এরপর বাসচালক ছাড়া পেয়ে যান।
শাজাহান খানের শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার পেশাদার চালককে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিয়েছে বিআরটিএ। এরপর ২০১০-১১ সালেও একইভাবে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন শাহজাহান খান ও তাঁর সংগঠন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দিতে বলিনি। আমরা বলেছি, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ঠিকভাবে নেওয়া হোক। লিখিত পরীক্ষাটা একটু শিথিল করা হোক। বিআরটিএ যদি তাদের লোকবলের অভাবে এটি করতে না পারে, সেটি তাদের সমস্যা। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই।’ তিনি দাবি করেন, একসময় ফিটনেস ও লাইসেন্সের ব্যাপারে মালিক-শ্রমিকদের প্রভাব থাকত, এখন তা নেই।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন খাতের সুবিধাভোগী হচ্ছেন রাজনীতিকেরা। আর এই খাতের এক নম্বর সমস্যা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
ছয় মাসে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ৩২ হাজার পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন। শাজাহান খানের ফেডারেশনের তালিকা ধরে ১৯৯০ সাল থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার লাইসেন্স প্রদান মোটরযান আইন মানলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অদক্ষ চালক—কোনোটারই সড়কেই থাকার কথা নয়। আর দায়ী চালকদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য মোটরযান আইন যুগোপযোগী করার ব্যাপারেও সরকারের আগ্রহ নেই বললেই চলে। সড়কের পরিবেশ ঠিক করার জন্য অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইক এক যুগ আগে নিষিদ্ধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।
মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দেশের বাইরে থাকায় এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কোনোমতে লাইসেন্স নবায়ন: মোটরযান আইনে তিন বছর পরপর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন করার কথা বলা আছে। লাইসেন্স সংগ্রহ করার সময় যেমন শারীরিক ও কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি বোর্ডের’ মাধ্যমে তা নিতে হয়। নবায়নের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম মানতে হবে। আর বোর্ডের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের।
আইনে কারিগরি ও শারীরিক সক্ষমতার অন্তত ২৪টি শর্ত পূরণ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে কীভাবে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেতুর ওপর দিয়ে কীভাবে যানবাহন চালানো যাবে, সড়কের সংকেতব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিসীমার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখার নিয়ম।
কিন্তু বিআরটিএ গত ফেব্রুয়ারি মাসে ওই বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে একজন মোটরযান পরিদর্শককে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন দীর্ঘদিন ধরেই পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের শর্ত শিথিলের এই দাবি জানিয়ে আসছিল।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, একজন মোটরযান পরিদর্শকের পক্ষে এসব পরীক্ষা যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবের কথা চিন্তা করে মোটরযান পরিদর্শকও পরীক্ষা না নিয়েই লাইসেন্স নবায়ন করে দেন।
বিআরটিএর হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে গত রোববার পর্যন্ত সারা দেশে পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ৩২ হাজার ৭১টি। মাসে গড়ে ২৫ দিন কর্মদিবস ধরলে দৈনিক গড়ে লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ২১৪টি। নবায়ন হওয়া লাইসেন্সের প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে বিআরটিএর মিরপুর ও ইকুরিয়া কার্যালয় থেকে। বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে যথাযথ পরীক্ষা নিয়ে বিপুলসংখ্যক এই লাইসেন্স নবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
পরীক্ষা ছাড়া ছয় মাসে ৩২ হাজার পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্বাভাবিক এই সংখ্যাটা বিবেচনায় নিলাম। অচিরেই সভা ডেকে এটি পর্যালোচনা করা হবে।’
কম্পিটেন্সি বোর্ড কার্যকর নয়: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মোটরযান আইনে সব ধরনের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য যে কম্পিটেন্সি বোর্ডের কথা বলা হয়েছে, তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ঢাকায় সপ্তাহে দুই দিন একসঙ্গে তিনটি স্থানে এ ধরনের বোর্ড বসে। ঢাকার বাইরে বসে সুবিধাজনক সময়ে। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তা বলে বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যই নিজেরা না এসে অধস্তন প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে দেন। অনেকের প্রতিনিধিও আসেন না।
বোর্ড ঠিকভাবে না বসা এবং যথাযথ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি না থাকার অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো মোটরযান পরিদর্শকের মাধ্যমে লাইসেন্স নবায়নের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে চালকের লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ। এর মধ্যে পেশাদার চালকের লাইসেন্স প্রায় আট লাখ। বাকিরা অপেশাদার।
ফিটনেস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: দেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে এক লাখ ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা-অটোটেম্পো চলাচল করছে। এরপরই ট্রাকের সংখ্যা—প্রায় ৪১ হাজার। এমন বাস-মিনিবাস রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। বাকিগুলো অন্যান্য যানবাহন।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল এবং এগুলোর ফিটনেস সনদ নিতে হয় না। আর কিছু যানবাহন অকেজো হয়ে গেছে।
অবশ্য ফিটনেস সনদ থাকা না-থাকা প্রায় সমানই। বাস-ট্রাকের যেগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, এগুলোর বেশির ভাগই বিআরটিএ কার্যালয়ে না গিয়েই সনদ নিয়ে থাকে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন একদিকে যেমন সড়ক নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তেমনি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একটা যানবাহনের ফিটনেস দিতে ৪২টি পরীক্ষা করার নিয়ম। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিতেও ঘাটতি আছে। ফলে দেশে এখনো প্রায় আট লাখ চালকের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরা এই কাজ পারছে না। তাই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোটরযান আইনটিও দায়ী। এটি যুগোপযোগী করার উদ্যোগও গতি পাচ্ছে না ওই প্রভাবের কারণে। এই অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনের সংস্কার ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

Sunday, July 26, 2015

এক দশক ধরে শুধুই সিদ্ধান্ত, প্রয়োগ নেই by আনোয়ার হোসেন

সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে, তার বেশির ভাগ ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইকের মতো ধীরগতির যান চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে প্রায় এক দশক ধরে। এ ক্ষেত্রে গত দুই বছরে দেওয়া বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি।
সর্বশেষ গত বুধবার এক সভায় মহাসড়কে অটোরিকশাসহ ছোট যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তু গত বৃহস্পতিবারও সড়ক ও মহাসড়কে এসব ছোট যান নির্বিঘ্নে চলেছে। ২০০৬ সালে সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিলের বৈঠকে এসব ধীরগতির যানবাহন সড়ক থেকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর ২০১২ সালে একই বৈঠকে তা সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর প্রতিটি বৈঠকেই এই সিদ্ধান্ত আলোচিত হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের ঘোষণা এসেছে।
সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় এখন সড়ক-মহাসড়ক অধিকতর প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় সাড়ে আট হাজার মানুষ। দুর্ঘটনা ঘটে প্রায় ছয় হাজার। অবশ্য সরকারি হিসাবে দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের সামান্য বেশি। প্রতিবছরই তা কমছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ কমিটি হচ্ছে সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিল। এর প্রধান হলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। আর বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক সড়ক নিরাপত্তায় ডাকা হয় আন্তমন্ত্রণালয় সভা। সেখানেও সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী। গত দুই বছরে এই দুই কমিটির বৈঠকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নেওয়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।
গত বছর ঈদুল আজহার আগে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মহাসড়ক, রেল ও নৌপথে বড় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে হেলিকপ্টারের সহায়তা নেওয়া হবে। এরপর এ নিয়ে আর কোনো আলোচনাই হয়নি। এবারের ঈদুল ফিতরের বৈঠকেও হেলিকপ্টারের বিষয়টি সিদ্ধান্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এভাবে যেখানেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে, সেখানেই সড়ক চার লেন করার ঘোষণা দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জনচাপে এভাবে নেওয়া তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই পরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। তবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আদলে সারা দেশে প্রায় দেড় শ দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে (ব্ল্যাক স্পট) সড়ক বিভাজক বসানো এবং বাঁক সোজা করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে সরকারের বক্তব্য জানতে গতকাল রাতে বারবার ফোন করা হলেও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীকে পাওয়া যায়নি।
পরে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ধীরগতির যানবাহন বন্ধে ১ আগস্ট থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে সচিব বলেন, অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সবার সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী মাসে শুধু ওই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে একটা বৈঠক হবে। সহজ শর্তে পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে সচিব বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত করে যদি মনে হয় সিদ্ধান্তের অপব্যবহার হচ্ছে, তাহলে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না: ২০১১ সালে সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিল সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সুপারিশ তৈরির জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে নয় সদস্যের কমিটিতে বুয়েটের শিক্ষক, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও মালিক-শ্রমিক নেতারা ছিলেন।
২০১২ সালের মাঝামাঝি কমিটির সদস্যরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে প্রায় ৭৮টি সুপারিশ করেন। এর মধ্যে ৫২টিই স্বল্পমেয়াদি। কিন্তু এর বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
কমিটির স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে ছিল, দুর্ঘটনার জন্য দোষী ব্যক্তি চালক-মালিক-প্রকৌশলী-ফিটনেস অথরিটিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এই সুপারিশ দেওয়ার পর নাটোরের বড়াইগ্রামে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৬ জন মারা যান। পরে তদন্ত কমিটি জানতে পারে, দুর্ঘটনায় পড়া দুটি বাসেরই চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট ও ফিটনেস) সনদ ছিল না। কমিটি বাস ও ট্রাকচালক এবং দুই বাসের মালিককে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর হানিফ পরিবহনের একটি বাস হতাহত ব্যক্তিদের মাড়িয়ে যায় বলে তদন্ত কমিটি জানতে পারে এবং দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিলেও আর কিছুই হয়নি। গত বছর ঢাকার কারওয়ান বাজারে সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীকে একটি মিনিবাস চাপা দিলে তিনি মারা যান। এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা শোনা যায়নি।
আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটি স্বল্পমেয়াদি আরও যেসব সুপারিশ করে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাসড়কে অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইক চলাচল বন্ধ করা। দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই করে যথাযথ আইন মেনে লাইসেন্স দেওয়া। পরিবহনচালকদের নিয়োগপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা। সড়কে যথাযথ সংকেত স্থাপন করা।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মহাসড়কে হাটবাজার স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পর্যায়ক্রমে সব সড়ক-মহাসড়কে সড়ক বিভাজক দেওয়া, সড়ক দুর্ঘটনার একটি মামলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিচালনা করে এর রায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
এসব মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি।
দুর্ঘটনার হিসাবও রাখতে পারছে না সরকার: ২০১২ সালের সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিলের এক সভায় সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশের মাধ্যমে যুগপৎভাবে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।
পুলিশ সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পর ৬৮টি ঘর পূরণ করে তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়। এতে পুলিশ খুব একটা আগ্রহ পায় না। জেলা প্রশাসনেরও প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। ফলে সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়ন হয় না। এতে সরকারি হিসাবের সঙ্গে বেসরকারি হিসাবের বড় ধরনের গরমিল হচ্ছে।
জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের যে সংখ্যা তাঁরা পেয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি। দুর্ঘটনা রোধে পরিকল্পনা করতে হলে তো সঠিক তথ্য প্রয়োজন। সরকারি তথ্যই যদি ভুল হয়, তাহলে পরিকল্পনা তো সঠিক হবে না।
মোটরযান আইন: সরকার মোটরযান আইন হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেয় ২০১০ সালে। ২০১২ সালে একটি খসড়াও প্রস্তুত করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা আইনে পরিণত করতে পারেনি সরকার।
আইনের খসড়া তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী চালকের বিরুদ্ধে শাস্তি বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তের পক্ষে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ জন্যই মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এরপর আর তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, মোটরযান আইনটি যুগোপযোগী করা খুবই জরুরি। দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির ধারায় এই অপরাধকে জামিন-অযোগ্য করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁরা। এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি।
পেশাদার চালকের লাইসেন্সে ছাড়: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দেওয়া তালিকা ধরে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার পেশাদার চালককে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিয়েছে বিআরটিএ। ২০১১ সালে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর হাইকোর্ট এভাবে লাইসেন্স দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। গত চার বছর সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাউন্সিলের প্রতিটি বৈঠকে পেশাদার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) উল্টো যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া চালকদের সহজ শর্তে নবায়নের সুযোগ দিয়েছে। মোটরযান আইন অনুযায়ী, পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন করতে হলে সারা দেশে থাকা ড্রাইভিং কম্পিট্যান্সি বোর্ডের মাধ্যমে শারীরিক ও লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু বিআরটিএ গত ফেব্রুয়ারিতে বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষার বদলে বিআরটিএর একজন মোটরযান পরিদর্শকের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, অধিক জনসংখ্যার দেশে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন করা দরকার। নইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মহাসড়ক থেকে ছোট যান উচ্ছেদও এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে, তাই সুপারিশ আসা মাত্রই তা বাস্তবায়ন করা উত্তম।

Friday, July 24, 2015

সাশ্রয়ে, স্বস্তিতে কৃষক by আনোয়ার হোসেন

নিজের বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরির কৌশল
বলছেন নাসির উদ্দিন l প্রথম আলো
বেশভূষায় গ্রামের আর দশজন সাধারণ কৃষকের মতোই। জীবন-যাপনের ধরনেও অন্য কৃষকদের থেকে আলাদা করা যাবে না তাঁকে। তবে নিজের কাজ দিয়ে নিজেকে অনন্য করেছেন তিনি।
সমাজবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক ও ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার ফতেপুর গ্রামের নাসির উদ্দীন (৪৭)। পরিবেশবিরোধী ব্যয়বহুল রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বদলে সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করছেন তিনি। তৈরি করছেন জৈব কীটনাশকও। সার ও কীটনাশক তৈরির কৌশল শিখিয়ে তা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছেন কৃষকদের। এভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন জৈব কৃষি আন্দোলন।
কৃষিকে পেশা হিসেবে নেওয়া প্রসঙ্গে নাসির বলেন, ‘ঢাকায় তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছিলাম। শহরের পরিবেশ, খাওয়া-দাওয়া কিছুই ভালো লাগত না। ১০ থেকে ১২ বছর আগে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসি। এই গ্রাম আর কৃষির প্রতি ভালোবাসার টানে কৃষিকেই পেশা হিসেবে নিলাম।’
নাসিরের জৈব কৃষি আন্দোলন শুরুর পেছনে একটা কষ্টের গল্প আছে। সেই গল্পটা শোনালেন তাঁর স্ত্রী আয়েশা খাতুন, ‘প্রায় চার বছর আগে বাড়ির একটি স্বাস্থ্যবান বকনা গরু খেত থেকে চরে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষের পরামর্শে গরু জবাই করা হয়। কিন্তু মাংস কাটতে গিয়ে দেখা গেল, মাংস স্বাভাবিক নয়। পরে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। সবার ধারণা, কীটনাশক স্প্রে করা কোনো খেতের ফসল খেয়ে গরুটির এ দশা। গরুটির মৃত্যুতে আমরা মুষড়ে পড়ি।’ আয়েশা জানালেন, ঠিক তখন থেকে নাসির ভাবতে শুরু করলেন জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কীভাবে বন্ধ করা যায়। আর সেই ভাবনা থেকেই তাঁর মাথায় আসে পরিবেশবান্ধব জৈব কৃষির কথা।
এরপর যোগ দিলেন নাসির। জানালেন, বেশ কিছুদিন আগে রাজশাহীতে চিকিৎসার জন্য গিয়ে পরিচয় হয় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার এক লোকের সঙ্গে। ওই লোকের কাছে জানতে পারেন যে কালীগঞ্জের মহেশ্বচন্দ্রা গ্রামের হেলাল উদ্দীন পরিবেশবান্ধব কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করেন। ফোন নম্বর সংগ্রহ করে হেলালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজেই কেঁচো নিয়ে এসে নাসিরকে দেন। শেখান সার তৈরির কৌশল। পরে হেলালের বাড়ি গিয়ে এ প্রক্রিয়া দেখে আসেন। নাসির জানান, হেলাল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক (প্রযুক্তি হস্তান্তর) কৃষিবিজ্ঞানী গুল হোসেনের কাছ থেকে কেঁচো সংগ্রহ ও সার তৈরির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
হেলালের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে শুরুর পর গত দুই বছরে নাসির নিজের ইউনিয়ন আকবরপুরসহ আশপাশের প্রায় দুই হাজার কৃষকের কাছে কেঁচো সরবরাহ করেছেন। অনেক কৃষককে শিখিয়েছেন সার তৈরির কৌশল। নাসির জানান, এখন কেঁচো সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহারকারী কৃষকদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। সমবায় ভিত্তিতে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের একটি বাজার সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়েও তাঁরা এগোচ্ছেন।
‘পরিবেশবান্ধব জৈব কৃষি সম্প্রসারণকে আমরা একটি আন্দোলন হিসেবে নিয়েছি। এ আন্দোলন একদিন এ এলাকায় সফলতার মুখ তো দেখবেই, এমনকি আশপাশেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’ বললেন, দৃঢ় প্রত্যয়ী নাসির।
ফতেপুর গ্রামে একদিন: সম্প্রতি নাসিরের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল কেঁচো কম্পোস্ট তৈরির আয়োজন। ১০০টি মাটির চাড়িতে সার তৈরি করেন তিনি। নাসির জানালেন, কাঁচা গোবর সংগ্রহ করে দুই দিন মাটির ওপর এবং পরে কয়েক দিন পলিথিনের ওপর রাখি। এরপর প্রতি ৪০ কেজি গোবরের সঙ্গে কলাগাছের এক কেজি পরিমাণ বাকল কুচি কুচি করে কেটে মিশিয়ে পলিথিন দিয়ে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ঢেকে রাখা হয়। এরপর তা মাটির চাড়িতে তোলা হয়। ওই চাড়িতে কমপক্ষে ২৫০টি বিশেষ প্রজাতির কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়। এই কেঁচো থেকেই প্রজননের মাধ্যমে অসংখ্য কেঁচোর জন্ম হয়। সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই সার তৈরি হয়ে যায়। তবে কেঁচোর পরিমাণ বেশি হলে সার তৈরিতে আরও কম সময় লাগে।
নাসির জানালেন, পর্যায়ক্রমে প্রতি চাড়ি থেকে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর ২৫ কেজি করে সার পান। গড়ে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ মণ সার বিক্রি করেন ২০ টাকা কেজি দরে। কেঁচো বিক্রি করেন প্রতিটি দুই টাকা করে।
জৈব কীটনাশক তৈরির প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে নাসির বলেন, ২৫০ গ্রাম রসুনের নির্যাস ও ২৫০ গ্রাম গরুর মূত্রের সঙ্গে ৪৮ লিটার পানি মিশিয়ে এক বিঘা জমির ফসলে ছিটাতে হয়। জানালেন, বাড়িতে রসুন বাটা ও গরুর মূত্রের ওপর মশা-মাছি বসে না—বিষয়টি খেয়াল করে এগুলো দিয়ে কীটনাশক তৈরির আগ্রহ জন্মে তাঁর। বেগুন খেতে ব্যবহার করে ভালো ফল পান। পরে তা ব্যবহার করতে থাকেন। কৃষকদেরও এ বিষয়ে পরামর্শ দেন।
সার ও কীটনাশকের গুণাগুণ: নাসিরের তৈরি কীটনাশক সম্পর্কে পত্নীতলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, রসুনের নির্যাস ও গরুর মূত্রের মধ্যে কীট-পতঙ্গবিরোধী উপাদান আছে। এটা কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কেঁচো কম্পোস্ট সার সম্পর্কে আক্তারুজ্জামানের মূল্যায়ন, এ সার উৎকৃষ্ট মানের। এতে বালাইনাশক উপাদান আছে। এ সার প্রয়োগে মাটির স্বাস্থ্য ভালো হয়।
বিএআরসির সাবেক পরিচালক কৃষিবিজ্ঞানী গুল হোসেন কেঁচো কম্পোস্ট সারের গুণাগুণ সম্পর্কে বলেন, মাটির খাদ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম। রাসায়নিক সারের তুলনায় এই সারে নাইট্রোজেন পাঁচ গুণ, ফসফরাস সাত গুণ ও পটাশিয়াম ১১ গুণ বেশি রয়েছে। উদ্ভিদ এই সার খুব সহজেই গ্রহণ করতে পারে।
উপকৃতদের প্রতিক্রিয়া: পত্নীতলার বজরুক মোহাম্মদপুর গ্রামের কৃষক পলাশ চন্দ্র বর্মণ বললেন, ‘প্রতিবছর গড়ে ৩০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করতে গিয়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হতো কেবল রাসায়নিক সার ও কীটনাশকে। এ বছর কেঁচো কম্পোস্ট সার এবং রসুনের নির্যাস ও গরুর মূত্র দিয়ে তৈরি জৈব কীটনাশক ব্যবহার করেছি। খরচ হয়েছে মাত্র ২৪ হাজার টাকা। ফলনও হয়েছে ভালো।’
নাসিরের গ্রামের কৃষক জয়নাল আবেদিন তাঁর ২০ শতক জমিতে পটোলের চাষ করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মিলিয়ে খরচ করেছিলেন সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু এবার কেঁচো কম্পোস্ট ব্যবহার করেছেন ৬০ কেজি। আর ইউরিয়া সার ব্যবহার করেছেন মাত্র পাঁচ কেজি। জয়নাল বললেন, ‘গতবারের তুলনায় খরচ হয়েছে চার ভাগের এক ভাগ। উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ।’
কাশিপুর এলাকার জোসনা অধিকারী জানান, নাসিরের মাধ্যমে কাশিপুরের দত্তপাড়া, কোলপাড়ায় কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি হচ্ছে। তিনি নিজেসহ ওই এলাকার কয়েকজন এই সার বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছেন।
স্বীকৃতি: নাসির তাঁর জৈব কৃষি আন্দোলনের স্বীকৃতি পেতেও শুরু করেছেন। জৈব কৃষি সম্প্রসারণে অবদান রাখার জন্য আকবরপুর ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে গত ৯ মে তাঁকে সম্মাননা দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ইউএনও আখতার মামুন।
আকবরপুর ইউপি চেয়ারম্যান আককাস আলী বলেন, নাসির উদ্দীন তাঁর সার তৈরির প্রক্রিয়া কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই আন্দোলনে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

Sunday, July 19, 2015

অটোরিকশা বরাদ্দ নিয়ে অবৈধ বাণিজ্য: দাম ৪ লাখ, নিবন্ধন খরচ ১০ লাখ টাকা by আনোয়ার হোসেন

রাজধানী ঢাকায় নতুন সিএনজিচালিত অটোরিকশা বরাদ্দ দিচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে এই বরাদ্দ নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অটোরিকশা বরাদ্দ পেয়ে অনেকেই প্রতিটি ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ শোরুমে আমদানি করা একটি অটোরিকশার দাম ৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এই বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে শুধু একটি ‘নিবন্ধন নম্বর’ যুক্ত করার জন্য। কিন্তু নিবন্ধন নম্বরের জন্য সরকারিভাবে দিতে হয় মাত্র ১৩ হাজার টাকা।
অটোরিকশার নীতিমালা অনুযায়ী, একজনের নামে নিবন্ধন নেওয়ার পর তা বিক্রি করা যায় না। এভাবে হাত বদল হয়ে দাম বাড়ার কারণে ২০০২ সাল থেকে অটোরিকশা খাতে নৈরাজ্য চলছে। সে সময় পৌনে দুই লাখ টাকার অটোরিকশা নিবন্ধন নম্বর যুক্ত হওয়ার পর পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এই বাণিজ্য ঠেকাতে নিবন্ধনের অন্তত দুই বছর আগে হাতবদল নিষিদ্ধ করার শর্ত নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০০৪ সালে ঢাকায় নতুন অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া বন্ধ করে দেয় বিআরটিএ। এর আগে ২০১৩ সালে ঢাকায় চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ মিশুকের ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের মধ্যে নতুন অটোরিকশা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ যিনি একটি মেয়াদোত্তীর্ণ মিশুকের প্রকৃত মালিক, তিনি একটি নতুন অটোরিকশার নিবন্ধন পাবেন।
অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম ভেঙে হাতবদলের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মালিক নির্ধারণ এবং মিশুকের পরিবর্তে অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়ায়ও মোটরযান বিধির লঙ্ঘন করা হয়েছে। যানবাহন বিক্রি হলে ১৪ দিনের মধ্যে মালিকানা বদলের লক্ষ্যে যাবতীয় ফিসহ দলিলাদি বিআরটিএতে জমা দিতে হয়। ফিটনেস সনদ হালনাগাদ থাকলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মালিকানা বদলি সম্পন্ন হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে নতুন অটোরিকশা দেওয়া হচ্ছে ১৫ বছরের পুরোনো দলিলের ওপর ভিত্তি করে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, নতুন অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া শুরু হয়েছে গত মার্চ থেকে। এ পর্যন্ত প্রথম দফায় প্রায় সাড়ে ৩০০ নিবন্ধন হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই গেছে ঢাকা সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতাদের নামে। বর্তমানে ঢাকায় যে ১১ হাজার অটোরিকশা চলে, সেগুলোর মালিকদের একাধিক সংগঠনের মধ্যে এটি অন্যতম। মগবাজার এলাকার কিছু অটোরিকশার শোরুম মালিকও পেয়েছেন কিছু নতুন অটোরিকশা।
১৯৯৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া এমন মিশুকের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অটোরিকশা দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই করে দেড় হাজার আবেদনকারীর তালিকা তৈরি করে বিআরটিএ। অবশ্য এই তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন মাত্র ৭৭ জন। বাকিরা সবাই ১৫ বছরের পুরোনো দলিলে অ্যাফিডেভিট মূলে মালিকানা দাবি করে আবেদন করেছিলেন।
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে দ্বিতীয় দফায় আরও ৫০২টি অটোরিকশা বরাদ্দের লক্ষ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এভাবে নীতিমালা ভেঙে অটোরিকশা বরাদ্দ এবং তা আইন অমান্য করে বিক্রির মাধ্যমে দেড় হাজার অটোরিকশা থেকে ১৩৫ থেকে ১৫০ কোটি টাকা বাণিজ্যের পরিকল্পনা নিয়েছে চক্রটি। এই চক্রে বিআরটিএর কর্মকর্তা, অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা ও স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা দালাল চক্র জড়িয়ে পড়েছে।
বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন যে অটোচালকেরা ইচ্ছেমতো গন্তব্যে যাত্রী বহন ও ভাড়া আদায় করছেন, এর মূল কারণ বরাদ্দ-প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও বেশি দামে হাতবদল। এবার একই পথে চলছে সবকিছু।
সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের জন্যই নতুন অটোরিকশা নামানো হচ্ছে। কিন্তু বেশি দামে হাত বদল করলে তো যাত্রীরা সেই সেবা পাবে না। হাতবদল এবং ঘুষ-দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে কি না, তা তিনি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
কীভাবে হাতবদল: বিআরটিএতে রক্ষিত দলিল অনুসারে ঢাকা মেট্রো থ-১৩-৫৫৭৫ অটোরিকশার মালিক ভাটারার জসিম উদ্দিন। কিন্তু এখন এটি চালাচ্ছেন মোহাম্মদপুরের জাবেদ নামের এক ব্যক্তি। গত মাসে ১৩ লাখ টাকায় মগবাজারের দিগন্ত অটো নামে একটি শোরুম থেকে তিনি এটি কিনেছেন। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হিসেবে কাজ করেছে দিগন্ত অটো।
নতুন অটোরিকশা কেনার আগ্রহ দেখিয়ে জাবেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বিক্রেতা মালিকানা বদলির দলিলে সই দিয়ে রেখেছেন। তবে বিআরটিএতে জমা দেওয়ার শর্ত দিয়েছেন দুই বছর পর।
জানতে চাইলে দিগন্ত অটোর মালিক গৌতম দাস বলেন, অন্যের অটোরিকশা বিক্রির মধ্যস্থতা করে তিনি দুই থেকে চার হাজার টাকা পান।
একাধিক ক্রেতা জানান, নতুন অটোরিকশা বিক্রি হচ্ছে দুই পদ্ধতিতে। কিছু মালিক নিজে করছেন। তবে তা পরিচিত জন ও আত্মীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর অপরিচিতদের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে শোরুমের মাধ্যমে।
ঢাকা মেট্রো থ-১৩-৫৫৮০ নম্বরের অটোরিকশাটির নিবন্ধন হয় আবদুল কুদ্দুস মণ্ডলের নামে। গত মাসে সেটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কিনে নেন মোহাম্মদপুরের আবদুল কাদির। এখানেও মালিকানা বদলির দলিলে বিক্রেতার সই রেখে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে আবদুল কাদিরের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, তাঁর পুরোনো ১০টা অটোরিকশা ঢাকার রাস্তায় চলাচল করছে। মগবাজারের হৃদয় অটো থেকে তিনি নতুনটি কিনেছেন। হৃদয় অটোই বিক্রেতার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
আর হৃদয় অটোর মালিক জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, তিনি এভাবে বিক্রি করেননি। আশায় আছেন, ভবিষ্যতে নিজেই অটোরিকশার নিবন্ধন পাবেন এবং বিক্রি করবেন।
যাত্রাবাড়ী এলাকার শামীম ঢাকা মেট্রো থ-১৩-৫৫৩৮ নম্বরের অটোরিকশা চালাচ্ছেন। অথচ বিআরটিএর নথি বলছে, এটির মালিক জিগাতলার এস এম জিয়া উদ্দিন কায়সার।
পরিচয় গোপন করে জানতে চাইলে শামীম বলেন, পুরোনো অটোরিকশা তাঁরও আছে। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি বলে নতুন অটোরিকশাটি এক দালালের মাধ্যমে গত মাসে কিনেছেন ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।
মূল সুবিধাভোগী চার পক্ষ: বিআরটিএ সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, মিশুকের বয়স হবে নয় বছর। এই সিদ্ধান্তের কারণে ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় তিন হাজার মিশুকের প্রায় সব কটিই ঢাকার বাইরে চলে যায়। নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে মিশুক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ নাম দিয়ে নতুন অটোরিকশা দেওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করে একটি পক্ষ। এ পরিস্থিতিতে সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতাসহ অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ মিশুক ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় ক্রয় করা শুরু করে। নতুন অটোরিকশা পেয়ে বিক্রি করে দেওয়ার মূল সুবিধাভোগী এসব মালিকই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত নিবন্ধন হওয়া অটোরিকশার মধ্যে মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ সমিতির নেতা ও তাঁদের মনোনীতরা ১৫০টি অটোরিকশা পেয়েছেন। পরের ধাপে অটোরিকশার নিবন্ধনের যে তালিকা হয়েছে, সেখানেও এই নেতাদের নামেই বেশি।
জানতে চাইলে বরকত উল্লাহ দাবি করেন, তিনি ছয়টি অটোরিকশা পেয়েছেন, সেগুলো রাস্তায় নেমেছে। তবে কেউ কেউ বেচা-বিক্রি করছে। ঘুষ-কমিশন দেওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আংশিক সত্য থাকতে পারে। সবকিছু যদি আইনে চলত, তাহলে দেশ অনেক এগিয়ে থাকত।’
আর মিশুকের বদলে অটোরিকশা বরাদ্দের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ভূমিকা রাখে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এই সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান ও সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএতে অনুষ্ঠিত অটোরিকশা বরাদ্দ-সংক্রান্ত একাধিক বৈঠকে ওসমান আলীকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। এ জন্যই ফেডারেশনকে প্রতিটি অটোরিকশার বিপরীতে ৬০ হাজার টাকা কমিশন দেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক মালিক জানান।
জানতে চাইলে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, মিশুকের চালকদের স্বার্থে ফেডারেশন যুক্ত হয়েছিল। অটোরিকশা বরাদ্দ-প্রক্রিয়া নিয়মানুযায়ী হওয়া উচিত। আর ফেডারেশনের আয়ের উৎস শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা। অটোরিকশা বরাদ্দ থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ নাম ভাঙিয়ে করে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রী হওয়ার পর বহু লোক ভুয়া পরিচয় দিয়ে সুযোগ নিতে আসে। কয়েকটা ঘটনা তাঁর কাছে ধরাও পড়েছে। এখানেও এমন কিছু ঘটছে কি না, খতিয়ে দেখা হবে।
ওসমান আলী বলেন, অটোরিকশা খাতে দুর্নীতি হয় না, সেটা বলা যাবে না। তবে তিনি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। ফেডারেশনের নাম ভেঙে কেউ কমিশন নিতে পারে। এমন উদাহরণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিআরটিএর কর্মকর্তাদের ঘুষের টাকা দুই ভাগ হচ্ছে। মালিকানা বদলি এবং অটোরিকশার নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের ভাগ ৪০ হাজার। আর মেয়াদোত্তীর্ণ মিশুক কেটে অকেজো করার জন্য বিআরটিএর আরেকটি কমিটি আছে। তাদেরও ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। কারণ, কমিটি পুরোনো মিশুক কেটে অকেজো না করেই প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, শ্রমিক ফেডারেশনের কমিশন এবং বিআরটিএর কর্মকর্তা ও অকেজো করার কমিটির ঘুষের ভাগ সংগ্রহ করেন মিশুক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি সারোয়ার হোসেন। এই কমিটির নেতারাও কমিশন পান।
জানতে চাইলে সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকারি ফি ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেওয়া হচ্ছে। তবে অদৃশ্য কিছু টাকা বিআরটিএর কর্মকর্তাসহ অন্যদের দিতে হচ্ছে। তবে তা পাঁচ-দশ হাজারের বেশি না।’

Thursday, July 2, 2015

ঢাকা–চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প: ব্যয় বাড়ছে ১৩৩৫ কোটি টাকা by আনোয়ার হোসেন

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে উড়ালসড়ক
নির্মাণকাজের জন্য মহাসড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বাড়তি যানবাহনের চাপে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ।
গত রোববার চলছিল মেরামতের কাজ l ছবি: হাসান রাজা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজের ব্যয় বাড়ছে ১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৬২ শতাংশ। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এখন বেড়ে হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। সময়মতো কাজ না হওয়ায় ঠিকাদারদের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে।
ব্যয় বাড়লেও প্রকল্পের কাজ শেষই হচ্ছে না। দুই দফা সময় বৃদ্ধির পর এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত মাস পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৭০ শতাংশ।
প্রকল্পের অগ্রগতিসংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের অধীন ১৯২ কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে গত সপ্তাহ পর্যন্ত ১৪২ কিলোমিটার পিচ ঢালাই হয়েছে। তবে তা একটানা নয়, খানিক বাদে বাদে। ফলে পুরোনো সড়কের পাশাপাশি নতুন সড়ক পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
১৪২ কিলোমিটারের বাইরে মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার পথ প্রাথমিক পাকা করার কাজ হয়েছে। এর ওপর পুনরায় পিচ ঢালাই হবে। বাকি ৩০ কিলোমিটার সড়কে এখনো মাটির কাজ চলছে; যার বেশির ভাগই পড়েছে কুমিল্লা থেকে ফেনীর মধ্যে।
আর প্রকল্পের অধীন সাতটি সেতু ও তিনটি উড়ালসড়ক নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছিল ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। চুক্তি অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। গত মাস পর্যন্ত অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্র জানায়, বাড়তি ব্যয় সংযোজন করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আরেকটি সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করছে। সেটি শিগগিরই অনুমোদনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ওই প্রস্তাবে প্রকল্পের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাবও থাকবে। ২০০৬ সালে করা মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। ২০১২ সালে সংশোধনের পর তা দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এখন যে প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, তাতে ব্যয় গিয়ে ঠেকছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।
গণখাতে ক্রয়সংক্রান্ত আইনে (পিপিআর) বলা হয়েছে, কোনো প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের পর ওই ঠিকাদারের পেছনে মূল চুক্তির ৫০ শতাংশের বেশি খরচ করা যাবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ৬২ শতাংশ।
সওজ সূত্র জানায়, এই বাড়তি খরচের বেশির ভাগই যাচ্ছে ঠিকাদারের মাশুল হিসেবে। কারণ, ঠিকাদারের সঙ্গে করা চুক্তিতে মূল্যবৃদ্ধি যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে বছর বছর নির্মাণসামগ্রী ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠিকাদারের বিলও বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যত বেড়েছে, ঠিকাদারের মাশুলও বেড়েছে সেই হারে।
আর দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলার কারণে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরোনো সড়কটিও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সড়ক অচল হয়ে যাবে—এ আশঙ্কায় সওজ কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারদের দিয়ে সড়ক মেরামতের কাজ করায়। এর জন্য বাড়তি বিলও দিতে হয় ঠিকাদারদের। চুক্তিপত্রে নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সড়কটিও চালু রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু চীনা কোম্পানি সিনোহাইড্রো পুরোনো সড়ক মেরামতের কাজ করবে না বলে জানিয়ে দেয়। পরে সওজ চীনা কোম্পানির আওতাধীনসহ পুরো সড়কের মেরামতকাজের দায়িত্ব দেয় ওই প্রকল্পের বাকি দুই ঠিকাদার বাংলাদেশের রেজা কনস্ট্রাকশন ও তাহের ব্রাদার্স লিমিটেডকে।
প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল, পুরো মহাসড়কই হবে পিচের। কিন্তু পরে মহাসড়ক ঘেঁষে বাজার গড়ে ওঠা স্থানগুলোতে প্রায় দেড় লাখ বর্গমিটার কংক্রিটের ঢালাই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য কিছু ব্যয় বাড়ে।
সময় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক ইবনে আলম হাসান বলেন, তাঁরা এখনো ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। না পারলে সেটা পরে দেখা যাবে। আর ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং চুক্তির বাইরে কাজ করার কারণে ব্যয় বেড়েছে। পুনরায় ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
বাড়তি এই ব্যয় পিপিআরের লঙ্ঘন কি না, জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রতিবছরের মূল্যবৃদ্ধি আর বাড়তি কাজের খরচ এক জিনিস নয়। বাড়তি কাজের বিল ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের নিয়ম আছে। এ ক্ষেত্রে আইনের লঙ্ঘন হয়নি।
বাড়তি কাজের নামে বিল: দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেন করার ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। শর্ত ছিল, তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। এরপর সময় বাড়িয়ে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। তাতেও ব্যর্থ হলে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখন আরেক দফা সময় বাড়াতে হবে।
সড়ক চার লেন করার কাজ ১০টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। সাতটি প্যাকেজের কাজ পায় চীনের সিনোহাইড্রো। বাংলাদেশের রেজা কনস্ট্রাকশন পায় দুটির এবং তাহের ব্রাদার্স পায় একটি।
সওজ সূত্র জানায়, মেরামত ও বাড়তি কাজ করার দাবি করে রেজা কনস্ট্রাকশন মূল চুক্তির চেয়ে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা বাড়তি পেয়েছে। এর সঙ্গে বছর বছর মূল্যবৃদ্ধি তো আছেই। মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া তাহের ব্রাদার্স বাড়তি পাচ্ছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। সিনোহাইড্রো মেরামতসহ অন্য কিছু কাজ ছেড়ে দেওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ছে না। তবে নির্মাণসামগ্রী ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির জন্য বাড়তি টাকা পাচ্ছে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সেতু ও উড়ালসড়কের কাজে ধীর গতি: সাতটি সেতু ও তিনটি উড়ালসড়কের কাজ ভাগ করা হয়েছে তিন ভাগে। এর মধ্যে চৌদ্দগ্রামের মিয়ার বাজারে একটি সেতু নির্মাণের কাজ পেয়েছিল তাহের অ্যান্ড সন্স। সেটির কাজ সময়মতো শেষ হয়েছে। আরও ছয়টি বড় সেতু ও তিনটি উড়ালসড়ক নির্মাণের দুটি আলাদা প্যাকেজের কাজ পেয়েছিল শিখো-পিবিএল (যৌথ) ও গ্যানন ডানকারলি অ্যান্ড কোম্পানি। দুটি প্রতিষ্ঠানকেই ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত মাস পর্যন্ত শিখো-বিপিএল কাজ করেছে ৫৬ শতাংশ। আর গ্যানন ডানকারলি করেছে ৮১ শতাংশ।
সওজ সূত্র জানিয়েছে, শিখো-পিবিএল যৌথভাবে কাজ পেলেও মূল দায়িত্ব পিবিএল বা প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেডের। বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠান ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পেও কাজ পেয়ে তা শেষ করতে পারছে না। সওজের চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলের অধীনে দুটি প্রকল্পের কাজ নিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করার কারণে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য চিঠি দিয়েছেন সওজের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে গ্যানন ডানকারলি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। এর কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে থাকেন, বর্ষায় চলে যান। এ সময় সাধারণ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়েও ঝামেলা তৈরি হয়।

Friday, June 26, 2015

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম যাচ্ছে বিলেতে by আনোয়ার হোসেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের পলশা এলাকার একটি বাগানে বিশেষ
ধরনের কাগজের ব্যাগ দিয়ে মোড়ানো আম l ছবি: প্রথম আলো
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ফ্রুট ব্যাগিং (বিশেষ ধরনের কাগজের ব্যাগ দিয়ে আম আবৃত করা) পদ্ধতিতে উৎপাদিত রাসায়নিক বালাইনাশকমুক্ত নিরাপদ আমের রপ্তানি শুরু হচ্ছে। গতকাল বুধবার দুই হাজার কেজি ল্যাংড়া ও ফজলি আম রপ্তানির জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিমানযোগে আমের এ চালান যাবে যুক্তরাজ্যে। এগুলো যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে আরও আম রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আম গবেষণা কেন্দ্র) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরফ উদ্দীন জানান, রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ আম উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে গত বছর চীন থেকে আমদানি করা ফ্রুট ব্যাগ আমে আবৃত করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এতে সুফল পাওয়ার পর এ বছর আমচাষিদের পরামর্শ দেওয়া হয় ওই ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের। চলতি বছর ১ লাখ ৫০ হাজার আমে ব্যাগিং করা হয়। এতে করে ১০০ মেট্রিক টন নিরাপদ আমের উৎপাদন নিশ্চিত হয়।
শরফ উদ্দীন জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও এ মৌসুমে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, গোপালগঞ্জ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও বাণিজ্যিকভাবে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রপ্তানিকারক ও ফল উৎপাদনে সহায়তাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁরাই খোঁজখবর নিয়ে প্রথম পর্যায়ে দুই হাজার কেজি আম রপ্তানির উদ্যোগ নেন।
রপ্তানিকারক মেসার্স দ্বীপ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ চন্দ্র প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির আম নিরাপদ জেনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছি। এ ব্যাপারে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের সহায়তা পাওয়া গেছে। এভাবে উৎপাদিত আম রপ্তানিতে দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’
ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিতে আম উৎপাদনকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষি মো. মিলন, রবিউল ইসলাম, মো. হাসান ও পিন্টু মাস্টার রপ্তানিকারককে দুই হাজার কেজি আম সরবরাহ করেন। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ল্যাংড়া প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফজলি আম এখনো বাজারের সেভাবে নামেনি। আগাম জাতের ফজলি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে। চাষিরা ওয়ালমার্টের কাছে ল্যাংড়া ৭০ টাকা কেজি ও ফজলি ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। চাষি রবিউল ও হাসান জানান, এ বছর আমের প্রত্যাশিত দর না পেয়ে তাঁরা হতাশ ছিলেন। তবে ফ্রুট ব্যাগিং করে উৎপাদিত আমে কিছুটা হলেও লাভবান হয়েছেন।
ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি: এই পদ্ধতি সম্পর্কে শরফ উদ্দীন জানান, ফ্রুট ব্যাগিং হচ্ছে গাছে থাকা অবস্থায় বিশেষ ধরনের কাগজের ব্যাগ দিয়ে ফলকে আবৃত করা। ৪০ থেকে ৫৫ দিন বয়সের আমে ব্যাগিং করার উপযুক্ত সময়। ব্যাগিং করার আগে আমে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করে শুকিয়ে নিতে হবে। তিনি জানান, রঙিন আমের জন্য সাদা ব্যাগ ও সবুজ আমের জন্য দুই আস্তরের বাদামি ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। ফল সংগ্রহ করার আগ পর্যন্ত লাগানো থাকে ব্যাগ। বৃষ্টি ও ঝড়ে ছিঁড়ে যায় না এ ব্যাগ। তিনি আরও জানান, এই ব্যাগ ব্যবহারে আম বিভিন্ন ধরনের আঘাত, পাখির আক্রমণ, প্রখর সূর্যালোক, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।
শরফ উদ্দীন বলেন, আম সংগ্রহ করার পর থেকে পরের মৌসুমে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত অসচেতন আমচাষিরা ১৫ থেকে ৬২ বার পর্যন্ত বালাইনাশকের ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, তিন থেকে পাঁচবার স্প্রে করাই যথেষ্ট। অর্থাৎ গাছে মুকুল আসার ১৫ থেকে ২০ দিন আগে প্রথমবার। দ্বিতীয়বার মুকুল ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে এবং তৃতীয়বার আম যখন মটর দানার আকার ধারণ করে। পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধে বিশেষ প্রয়োজন আরও দুবার হতে পারে। তিনি জানান, আমে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বালাইনাশকের ব্যবহার কমানো সম্ভব।

Thursday, June 18, 2015

‘মরুর গোলাপ’ বাংলাদেশে by আনোয়ার হোসেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে অ্যাডেনিয়াম l প্রথম আলো
‘প্রাকৃতিক বনসাই’ আর ‘মরুর গোলাপ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া অ্যাডেনিয়ামের সঙ্গে পরিচয় ঘটলে এর প্রেমে না পড়ে আপনার উপায় নেই। এমন মন্তব্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারের সহকারী উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা, অ্যাডেনিয়াম-প্রেমিক শাহীন সালেহ্উদ্দীনের। তাঁর হাত ধরেই কয়েক বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আগমন ঘটেছে অ্যাডেনিয়ামের। এর ব্যাপক পরিচিতি না থাকলেও একদিকে মনোরম ফুল, অন্যদিকে প্রাকৃতিক বনসাই—এমন সমন্বয়ের কারণে ক্রমেই অ্যাডেনিয়াম-প্রেমিকের সংখ্যা বাড়ছে। শাহীন সালেহ্উদ্দীন জানান, অ্যাডেনিয়ামের আদি মাতৃভূমি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মরুভূমি। এপোচাইনেসি পরিবারভুক্ত গাছটি বাংলাদেশে সাধারণত শীতের পর থেকে শীতের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অবিরাম ফুল দিয়ে থাকে। ফুলের রং সাধারণত গোলাপি থেকে লাল ও সাদা বর্ণের। অ্যাডেনিয়ামগাছটি খুবই খরা-সহনশীল। এটি কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখায় প্রচুর পরিমাণ পানি ধারণ করে রাখতে পারে, যা খুব অল্প বৃষ্টিপাত ও খরার সময় ব্যবহার করে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পারে। এর বৈশিষ্ট্য ও এর বাহ্যিক গঠনপ্রকৃতি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই এটি বনসাই প্রকৃতির বলে খরাপ্রবণ এলাকায় টবে চাষ করার জন্য খুবই উপযুক্ত একটি গাছ। সাত-আট দিন পর টবে অল্প কিছু পানি দেওয়া ছাড়া আর তেমন পরিচর্যা লাগে না। একটি গাছ বাঁচতে পারে ৫০-৬০ বছর থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত। এ প্রসঙ্গে শাহীন সালেহ্উদ্দীন বলেন, আপনার লাগানো একটি অ্যাডেনিয়াম স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে দু-এক প্রজন্মের কাছে। কলকাতার ফুলবিজ্ঞানী সুবিল চন্দ্র দে তাঁর ফুলের চাষ বইয়ে এ ফুলের নাম দিয়েছেন ‘কিন্নরী’। তিনি বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ফুলটি সমতল বাংলায় যেকোনো মাটিতে সহজেই চাষ করা যায়। এটি টবে চাষের জন্য উপযুক্ত।
শাহীন সালেহ্উদ্দীন বলেন, ‘এ উদ্ভিদটি সাধারণত আমরা মরুভূমির গোলাপ বলে জানি, যা Adenium obesum, কিন্তু পুরো ল্যাটিন নাম Adenium obesum var obesum। পুরোনো তথ্যে এই মরুভূমির গোলাপটি Adenium arabicum নামে পরিচিত। অ্যাডেনিয়াম নামটি আরবিতে ওডাইন, যার অর্থ অ্যাডেন অর্থাৎ ইয়েমেনের পূর্ব নাম।
অ্যাডেনিয়ামের আদি মাতৃভূমি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মরুভূমি, সুদান, কেনিয়া, সেনেগালের পশ্চিমাঞ্চল, ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ছাড়া উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবেই শ্রীলঙ্কাতেও আছে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হচ্ছে থাইল্যান্ডে—এ ফুলের কদর ও সৌন্দর্যের কারণে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ফিলিপাইন, জাপান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও কানাডাতেও এর চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর চাষ শুরু হয়েছে, তবে সব জায়গায় নয়। রাজশাহী শহরে ও হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে কিছুসংখ্যক চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছড়িয়েছে।

Wednesday, May 20, 2015

পদ্মা সেতু- কাজ হয়েছে ১৮%, ব্যয় বাড়ছে ৮ হাজার কোটি টাকা by আনোয়ার হোসেন

মাটি পরীক্ষার জন্য মাঝ নদীতে
এ আয়োজন । ছবি: জাহিদুল করিম
বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ১৮ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এখন এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। তবে অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় এর ওপর দিয়ে শুরু থেকেই রেল চালু করার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সেতু বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরে শুরু হবে সেতুর মূল পাইলিংয়ের কাজ। আগামী বছর মে মাসে খুঁটির ওপর সেতুর স্প্যান বসানো শুরু হবে। আর সেতুটি চালু হবে ২০১৮ সালে। এখন চলছে মূল সেতুর পরীক্ষামূলক পাইলিং। পদ্মা সেতুর দুই পারে ১৬০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প রেলপথ মন্ত্রণালয়ের। এর জন্য প্রয়োজন প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এখনো এই অর্থের সংস্থান হয়নি। সরকার চীনা অর্থায়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছে।
পদ্মা সেতুর কাজ মোটাদাগে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে মূল সেতু, নদীশাসন, দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো (সার্ভিস এলাকা) নির্মাণ। এর বাইরে আছে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন। এ পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে, এর বেশির ভাগজুড়েই রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো।
এর মধ্যে মূল সেতুর জন্য চীনের চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনকে (এমবিইসি) ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় নিয়োগ দেওয়া হয় গত বছর জুনে। নিয়োগের পরই মূল চুক্তির ১৫ শতাংশ অর্থ দেওয়া হয় ঠিকাদারকে। গত বছরের নভেম্বরে ৮ হাজার ৭০৭ কোটি টাকায় নদীশাসনের কাজ পায় চীনেরই সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ পায় বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড। চুক্তি হয় ২০১৩ সালের শেষের দিকে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ যেসব মালামাল বা যন্ত্র ব্যবহৃত হবে, প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিকের সেবা নেওয়া হবে—এর ২৫ শতাংশ দেশের ভেতর থেকে জোগান দেওয়া হবে।
সেতু বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, সব যন্ত্রপাতি ও মালামাল সময়মতো পৌঁছাতে হবে। আর নকশায় যে গভীরতায় পাইলিং করার কথা বলা হয়েছে, তা মিলতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে প্রকল্পের কাজও পিছিয়ে যাবে। আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা-অনিয়ম হলেও কাজে গতি কমে যাবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চীনা কোম্পানি। কারণ, চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে সময়ক্ষেপণ ও নিম্নমানের কাজ করার উদাহরণ আছে বাংলাদেশেই।
মাওয়া প্রান্তে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ
এগিয়ে চলেছে। ছবি: জাহিদুল করিম
গত শুক্রবার সরেজমিনে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ দেখা গেছে। মাওয়া ও জাজিরার মধ্যেই হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতুর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন, নিচ দিয়ে যাবে রেল।
মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর দিয়ে সেতুটি হবে। এ জন্য সেখান থেকে ফেরিঘাট সরিয়ে আড়াই কিলোমিটার দূরে শিমুলিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
আগের ফেরিঘাটের দুটি স্থানে ৫০০ ও ২৫০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি এবং ৫০ টনের কয়েকটি ক্রেন ভাসমান বার্জে বসিয়ে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের কাজ চলছে। মাওয়ার কোমারভোগে নদীর পারে বিশাল নির্মাণ মাঠে মূল সেতুর মালামাল রাখা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ও ঠিকাদারি কোম্পানির লোকজনের থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছে বড় বড় শেড। দুটি জেটি তৈরি করা হয়েছে নদী থেকে মাঠে মালামাল তোলার জন্য।
সেতু বিভাগের হিসাবে গত এপ্রিল পর্যন্ত মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭.৮৩ শতাংশ।
নদীশাসনের কাজ একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। বার্জে করে বালুভর্তি বস্তা নদীতে ফেলতে দেখা গেছে। তিনটি ড্রেজার, একটি বহুমুখী কাজের জাহাজ, একটি টাগবোট, তিনটি অ্যাংকর বোট, ২৫টি কনটেইনার ও প্রায় ৫০০ ড্রেজিং পাইপ প্রকল্প এলাকায় বসানো হয়েছে। নদীর দুই তীরে প্রায় ১৪ কিলোমিটারজুড়ে নদীশাসন করা হবে।
মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ১৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৪২ শতাংশ। অবকাঠামো নির্মাণ এগিয়েছে ৩৩ শতাংশ। অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে অফিস ভবন, ল্যাবরেটরি, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডুপ্লেক্স ভবনের মোটেল, ওভারহেড পানির ট্যাংক, বিদ্যুতের সাবস্টেশন, গার্ডদের বাসস্থান, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা।
জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তুতিপর্বে বেশি সময় ব্যয় হয়। কাজ শুরু হয়েছে। আগামী বছরই মূল সেতু দৃশ্যমান করা যাবে।
ব্যয় ও সময় বাড়ছে: চলতি মাসের শুরুতে পদ্মা সেতুর জন্য ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সেতু বিভাগ। এতে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে জটিলতার পর ২০১২ সালে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এর আগে ২০১১ সালে একবার প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। পদ্মা সেতুর মূল প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছিল ২০০৭ সালে। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, আগের ব্যয় ছিল প্রাক্কলন। ঠিকাদার নিয়োগ তখনো হয়নি। এখন যে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে, সেটাই প্রকৃত। আর এ সময়ে কাজও কিছু বেড়েছে।
শুরুতে রেল চলাচলে অনিশ্চয়তা: অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় শুরু থেকেই পদ্মা সেতু দিয়ে রেল চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, চীন সরকারের কাছে রেললাইন নির্মাণে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, চীনেরই কোম্পানি চায়না রেলওয়ে গ্রুপের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। এই কোম্পানিটি টঙ্গী-ভৈরববাজার পথে নতুন একটি রেললাইন নির্মাণের কাজ করছে। মূল পদ্মা সেতুর কাজ পাওয়া চায়না মেজর ব্রিজ রেলওয়ে গ্রুপেরই একটি প্রতিষ্ঠান।
পদ্মার দুই পারে ১৬০ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। আর ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত ৭৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্ম্যাককে দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই ও রেলপথ ঠিক করে জমি চিহ্নিতও করা হয়েছে।
জানতে চাইলে রেলের এই প্রকল্পের পরিচালক সাগর কৃষ্ণ চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, সরকার প্রথম দিন থেকেই রেল চালুর বিষয়টি অগ্রাধিকারে রেখেছে। তাঁর আশা, চীনের অর্থ পাওয়া যাবে এবং আগামী বছরই কাজ শুরু করা যাবে।

Wednesday, April 1, 2015

নামেই সরকারি স্পর্শকাতর স্থাপনা, বিটিসিএলের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে ফুটপাত দখল by আনোয়ার হোসেন

ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা হকারদের অবৈধভাবে ফুটপাত দখল।
মানুষের চলার পথ দখল করে তাঁদের বেচাকেনায় প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ
পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীর। বছরের পর বছর এভাবে চলে এলেও বিষয়টির
কোনো চূড়ান্ত সুরাহা নেই। গতকাল ফার্মগেট এলাকা থেকে তোলা ছবি
গুলিস্তানের রমনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কম্পাউন্ড প্রথম শ্রেণির সরকারি স্পর্শকাতর স্থাপনা (কেপিআই-১)। এর ৬০ ফুটের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু সেখানকার সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে ফুটপাতের মধ্যে ২০১৩ সালের জুনে প্রকাশ্যে প্রায় ৫০টি দোকান গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেগুলো উচ্ছেদও করে। কিন্তু এখন ওই ফুটপাতে রীতিমতো পাকা ঘর করে চলছে দোকানদারি।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কী নেই—বিরিয়ানির দোকান, সেলুন, ফলের দোকান, স্টেশনারি। সবই গড়ে উঠেছে সীমানাপ্রাচীরের দেয়াল ঘেঁষে। ইটের দেয়াল দেওয়া প্রতিটি দোকান আলাদা করা হয়েছে। ওপরে দেওয়া হয়েছে সিমেন্টের ছাউনি। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি ফুটপাতের ওপর আছে অস্থায়ী দোকানও। ফুটপাতের এই অংশে হাঁটার কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের সড়ক ধরে হাঁটতে হচ্ছে।
দোকানিরা জানান, প্রতিটি দোকান থেকে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন (জামানত) নিয়েছে। মাসে মাসে ভাড়া দিতে হয়। বিটিসিএল ভবনের উত্তর-পূর্ব কোনায় একটি ফটক আছে। সেটির ঠিক মুখে ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। এখন ওই ফটকটি পুরোপুরিই বন্ধ।
সিটি করপোরেশন, দোকানদার ও বিটিসিএল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে দোকান নির্মাণের পেছনে রয়েছে যুবলীগ দক্ষিণের প্রভাবশালী একটি দল। এখান থেকে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের লোকজনও মাসোহারা পান।
সর্বশেষ ২২ মার্চও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চিঠি দিয়ে উচ্ছেদের আকুতি জানিয়েছে বিটিসিএল। এর আগেও কয়েক ডজন চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংস্থার কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, টিঅ্যান্ডটি কার্যালয়ের পাশে একবার উচ্ছেদের পর উচ্চ আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা এনেছেন দোকান নির্মাণকারীরা। এ জন্য পুনরায় উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। অন্য স্থানগুলোতে তাঁরা উচ্ছেদ অভিযান চালান নিয়মিত। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দখল হয়ে যাচ্ছে।
২০১২ সালের মার্চে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত মুক্ত করার বিষয়ে রিট করা হয়। এ বিষয়ে রুলও জারি করেন হাইকোর্ট। এরপর আদালতের পৃথক বেঞ্চে হকার্স ফেডারেশনও রিট করে। আদালত হকারদের পুনর্বাসনের রুল দেন। কিন্তু ফুটপাত দখলমুক্ত কিংবা হকারদের পুনর্বাসন—কোনোটাই হয়নি।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, উচ্ছেদ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুনরায় হকাররা বসে যায়। গত ৫ জানুয়ারি থেকে অবরোধ-হরতাল শুরু হলে সিটি করপোরেশন কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি। কারণ, এ সময় পুলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র আরও জানায়, হকার সমিতিগুলো নির্বিঘ্নে দোকান করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার এবং পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। সিটি করপোরেশনও ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ফুটপাত আছে। আর ২০১৩ সালে ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের গবেষক মারুফ রহমানের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার ৪৪ শতাংশ সড়কে ফুটপাত নেই। আর বাকি যে ৫৬ শতাংশ অংশে ফুটপাত আছে, তার কোথাও ৫০ শতাংশ এবং কোথাও ২০ শতাংশ হকারদের দখলে। রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেট ও নিউমার্কেট এলাকায় সমীক্ষা চালান তিনি।
সমীক্ষা অনুসারে, যেখানে ফুটপাত আছে, তার ৮২ শতাংশ উঁচু-নিচু, ভাঙাচোরা কিংবা চলাচলের জন্য মসৃণ নয়।
সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও হকার সমিতি—কারও কাছেই ঢাকার হকারের প্রকৃত সংখ্যা নেই। তবে এই তিন সংস্থার আনুমানিক হিসাব যোগ করলে ভাসমান, স্থায়ী ও অলিগলি মিলে হকারের সংখ্যা ১০ লাখের কম নয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কোনো না কোনো সমিতির সদস্য।
সূত্র জানায়, রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক মিলে প্রায় ২০০ হকার স্পট বা স্থান আছে। এগুলোর প্রতিটির জন্য একজন করে লাইনম্যান রয়েছেন। নির্দিষ্ট এলাকার চাঁদা আদায় করেন লাইনম্যান। প্রতিটি লাইনম্যানের নির্ধারিত এলাকাকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফুট’ হিসেবে। কয়েকটি ‘ফুটের’ দায়িত্ব থাকেন একজন ‘সর্দার’। সর্দারই মূলত চাঁদার ভাগ রাজনৈতিক প্রভাবশালী, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের যাদের যাদের দেওয়া দরকার, তা দেন।
আলাপ করে জানা গেছে, রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ২৫টি ফুট রয়েছে। প্রতিটি ফুট থেকে আকার ও স্থানভেদে দৈনিক ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তন হলে সর্দার ও লাইনম্যানও পরিবর্তন হয়। বর্তমানে সবচেয়ে দাম বেশি ফুট হচ্ছে গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট এলাকা এবং শান্তিনগর বাজারের সামনে।
ঢাকায় হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় গুলিস্তান, সদরঘাট, বঙ্গবাজার ও ধানমন্ডি এলাকায় একাধিক মার্কেট করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত হকাররা পুনর্বাসিত হয়নি।
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাসেম প্রথম আলোকে বলেন, বড় বড় মার্কেট হলেও হকাররা পুনর্বাসিত হয় না। অসাধু পুলিশ ও মাস্তানদের চাঁদা দিয়ে হকারদের আয় থাকে না। তাই তাদেরকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া উচিত।