Friday, November 6, 2026

ভিক্টোরিয়ায় নির্বাচনে অবস্থান বদলাচ্ছে মুসলিম ভোটারদের সংগঠন

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনে কৌশল পরিবর্তন করছে মুসলিম ভোটারদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মুসলিম ভোটস ম্যাটার (এমভিএম)। গত বছরের ফেডারেল নির্বাচনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে লেবার পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও এবার কট্টর ডানপন্থি দল ওয়ান নেশনের প্রভাব ঠেকাতে দলটির প্রার্থীদের এগিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি।

আগামী ২৮ নভেম্বর ভিক্টোরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে লেবার পার্টির দখলে থাকা কয়েকটি শহরতলির আসনে ওয়ান নেশনের প্রভাব বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে এমভিএম। এ পরিস্থিতিতে গ্রিনভেল, নারি ওয়ারেন সাউথ ও টারনেইট আসনে স্বেচ্ছাসেবীদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনা করেছে তারা।

এমভিএমের জাতীয় মুখপাত্র গাইথ ক্রায়েম বলেন, নির্বাচনের আগে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। গত ফেডারেল নির্বাচনে লেবার পার্টির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। তবে এবার একই কৌশল অনুসরণ করলে তাতে ওয়ান নেশনই লাভবান হতে পারে।

তিনি বলেন, মুসলিম সম্প্রদায় ওয়ান নেশনের প্রভাব বাড়ুক, তা চায় না। বিশেষ করে, লেবারবিরোধী প্রচারণা জোরদার হলে কোনো কোনো আসনে দলটির ভোট কমে গিয়ে ওয়ান নেশনের জয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

ক্রায়েমের আশঙ্কা, নির্বাচনে লিবারেল-কোয়ালিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনের জন্য ওয়ান নেশনের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলটির নীতিগত দাবির কিছু অংশ মেনে নেওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় বোরকা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ওয়ান নেশন নেতা পলিন হ্যানসনের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন।

ক্রায়েমের ভাষায়, এ ধরনের বক্তব্য সমাজে মুসলিমদের পোশাক ও তাদের অস্ট্রেলীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। দেশের জন্য এমন পরিস্থিতি ইতিবাচক নয়।

তবে অবস্থান পরিবর্তন করলেও কোনো আসনেই লেবার পার্টিকে নিজেদের ভোট দেওয়ার তালিকার শীর্ষে রাখবে না এমভিএম। সংগঠনটি জানিয়েছে, প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের নীতি ও অবস্থান বিবেচনা করে ভোটারদের জন্য আলাদা নির্দেশনামূলক কার্ড তৈরি করা হবে। এসব কার্ডে স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর প্রার্থীদেরও অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। তবে যেসব আসনে লিবারেল পার্টির পক্ষে দেওয়া পছন্দের ভোট ওয়ান নেশনের দিকে যেতে পারে, সেখানে লেবার প্রার্থীদের এগিয়ে রাখা হবে।

এমভিএমের লক্ষ্য আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে মেলবোর্নের উত্তরের গ্রিনভেল। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে গঠিত এ আসনটি বর্তমানে লেবার পার্টির দখলে। দুই দলের মধ্যে পছন্দের ভোটের হিসাবে লেবারের ব্যবধান ৭ দশমিক ১ শতাংশ। আসনটিতে মধ্যপ্রাচ্যীয় বংশোদ্ভূত মানুষের উল্লেখযোগ্য বসবাস রয়েছে।

ক্রায়েম বলেন, গ্রিনভেলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বেশি হওয়ায় সেখানে স্বেচ্ছাসেবীদের প্রচারণায় নামানো হলে লেবারের সমর্থন ধরে রাখা এবং আসনটি ওয়ান নেশনের দখলে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

এ ছাড়া মেলবোর্নের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নারি ওয়ারেন সাউথ আসনেও প্রচারণা চালাবে সংগঠনটি। আসনটি লেবার পার্টির দখলে রয়েছে এবং সেখানে দলটির ব্যবধান ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, আসনটির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বাসিন্দা মুসলিম। ভিক্টোরিয়া রাজ্যে এ হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

পশ্চিম মেলবোর্নের টারনেইট আসনেও স্বেচ্ছাসেবী মোতায়েন করবে এমভিএম। সেখানে মুসলিম বাসিন্দার হার ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আসনটিতে লেবার পার্টির ব্যবধান ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনায় লেবার পার্টির প্রতি অসন্তোষের বিষয়টি উঠে আসায় আসনটিকে প্রচারণার লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানান ক্রায়েম।

লেবার পার্টির প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষোভ অবশ্য এখনো কাটেনি। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও গাজা পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিক্ষোভের অধিকার নিয়ে দলটির অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানান এমভিএমের মুখপাত্র। তার মতে, ফিলিস্তিন ও গাজা ইস্যু এখনো বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারের প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের অসন্তোষের প্রধান কারণ।

নির্বাচনে ভিক্টোরিয়ার নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সব আসনের জন্য ভোটারদের নির্দেশনামূলক কার্ড তৈরি করবে এমভিএম। গ্রিনভেল, নারি ওয়ারেন সাউথ এবং টারনেইটের ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবীরা এসব কার্ড বিতরণ করবেন।

সংগঠনটির এবারের নির্বাচনী অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, আবাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার অধিকার সুরক্ষিত রাখা। ফলে লেবারবিরোধী অবস্থান কিছুটা শিথিল করলেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে দলটির প্রতি এমভিএমের অসন্তোষ বহাল থাকছে।

ভিক্টোরিয়ায় নির্বাচনে অবস্থান বদলাচ্ছে মুসলিম ভোটারদের সংগঠন
‘মুসলিম ভোটস ম্যাটার’-এর মুখপাত্র গেইথ ক্রায়েম। তৃণমূল পর্যায়ের এই অ্যাডভোকেসি গোষ্ঠীটি ভিক্টোরিয়ার নিম্নকক্ষের সব নির্বাচনী এলাকায় তাদের সমর্থকদের ‘ওয়ান নেশন’ -এর পরিবর্তে লেবার পার্টিকে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেবে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

তেহরানে পুড়িয়ে দেওয়া হলো ট্রাম্প-ভ্যান্স-নেতানিয়াহুর বিশাল ব্যানার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ইরানের রাজধানী তেহরানে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ট্রাম্প, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি সংবলিত বিশাল একটি ব্যানার। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগানও দেন বিক্ষোভকারীরা।

বুধবার তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে (ইসলামিক রেভল্যুশন স্কয়ার) আয়োজিত এক সমাবেশে এ ঘটনা ঘটে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের বার্ষিকী উপলক্ষে ইরান সরকার সমর্থকদের অংশগ্রহণে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

আলজাজিরার প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি সংবলিত একটি বিশাল ব্যানারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এপির প্রকাশিত ছবিতে ব্যানারটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ছবিও দেখা যায়।

এর আগে ৩ নভেম্বর তেহরানের এনকেলাব স্কয়ারে চার নেতার ছবি সংবলিত বিশাল একটি পোস্টার টাঙানো হয়েছিল। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির আলোকচিত্রী ফাতেমেহ বাহরামির তোলা ছবিতে পোস্টারটির উপস্থিতি দেখা যায়।

বিক্ষোভকারীরা এদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পতাকাও পোড়ান। পাশাপাশি ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘ইসরাইলের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর ইরানে এ বিক্ষোভ বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতারা মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করছেন তারা।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘আমেরিকানরা যুদ্ধকে না বলেছে, আমরাও এই বার্তাকে সমর্থন করি।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন সরকার জনগণের এই বার্তা উপেক্ষা করলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন হলেও তেহরানের প্রতি ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইরানের প্রতি দেশটির বৈরী মনোভাবের অবসান হবে এমন আশা করা ভুল।

এদিকে নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।

১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তেহরানে একদল ইরানি শিক্ষার্থী মার্কিন দূতাবাসে প্রবেশ করে ৫২ জন মার্কিন নাগরিক ও কূটনীতিককে জিম্মি করে। টানা ৪৪৪ দিন পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। প্রায় পাঁচ দশক পরও দুই দেশের মধ্যে সেই বৈরিতা অব্যাহত রয়েছে।

তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আনাদোলু এজেন্সি ও ইসরায়েল ন্যাশনাল নিউজ

তেহরানে পুড়িয়ে দেওয়া হলো ট্রাম্প-ভ্যান্স-নেতানিয়াহুর বিশাল ব্যানার

যেসব কারণে এত বাজেভাবে হেরেছেন রিপাবলিকানরা

বিবিসিঃ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে আসন হারাতে হয়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়কে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের বিরুদ্ধে ভোটারদের জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ, ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত প্রচারণা, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন—এই পাঁচটি বিষয় রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

১. জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোটার

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে নির্বাচনি প্রচারণার সময় ভোটারদের এই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

নির্বাচনের আগে উত্তর ক্যারোলাইনার এক ভোটার বলেন, ‘গ্যাসের দাম, মুদিপণ্যের দাম, সবকিছুরই দাম বাড়ছে।’

তিনি জানান, এবার রিপাবলিকানদের পরিবর্তে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।

জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য সেপ্টেম্বরে রেকর্ড করা প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলারের সামান্য নিচে ছিল।

ভোটারদের ওপর পরিচালিত জরিপেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব উঠে এসেছে। প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৮ জন (৭৯ শতাংশ) ভোটার বলেছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে তারা ও তাদের পরিবার মাঝারি বা গুরুতর দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।

জরিপে অংশ নেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের বেশি এ জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের নীতির কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।

২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ইরান যুদ্ধ। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করে। এর জবাবে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যায়।

এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর। পেট্রলপাম্পে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে তাদের।

যুদ্ধটি অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) সমর্থকদের অনেকের কাছেও এটি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো যুদ্ধে জড়াবে না।

একটি জনমত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন (৬৩ শতাংশ) বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তিন-চতুর্থাংশ ভোটার (৭৪ শতাংশ) জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নির্বাচনের পরদিন সকালে পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করেন ট্রাম্প। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।

৩. ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত প্রচারণা

ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পেছনে শক্তিশালী প্রার্থীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে নিজেদের গ্রহণযোগ্য ও আন্তরিক প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন।

প্রচারণায় তারা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে সুসংহত বার্তা দিয়েছেন।

টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসে যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা ভোটারদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সাউথ ক্যারোলাইনায় অপ্রত্যাশিত জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুস। সাবেক এই শিশু বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন। দেশটির অনেক নাগরিকই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করেন।

মিশিগানে সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল আল-সাইয়েদ সিনেটর নির্বাচিত হয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের ধরে রেখেছেন। তার প্রচারণার মূল স্লোগান ছিল, ‘রাজনীতি থেকে অর্থ দূর করুন, অর্থ আপনার পকেটে আনুন।’

জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারণার প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প দুবার জয়ী হওয়া এই রাজ্যে ৩৯ বছর বয়সি অসফের সহজ জয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জল্পনা আরো বাড়াবে।

এমনকি ট্রাম্পও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘তারা ভালো কাজ করেছে।’

অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী দুর্বল প্রচারণার কারণে সমালোচিত হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

৪. ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া রিপাবলিকানদের জন্য বোঝা

ভোটারদের অসন্তোষের প্রধান দুটি বিষয়—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধ—সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপরও।

এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। এতে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি রাজ্য এবার রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নির্বাচনি প্রচারণায় সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে ট্রাম্প ভোটারদের এমনভাবে কল্পনা করতে বলেন, যেন ব্যালটে তার নাম রয়েছে।

তবে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে এক দশকের বেশি সময় ধরে থাকা ট্রাম্পের পরিচিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব আগের মতো নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় রিপাবলিকান প্রচারণার কেন্দ্রে ট্রাম্পকে নিয়ে আসা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তা দলের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে জনমত জরিপে দেখা যায়, অনেক মার্কিন নাগরিক চেয়েছিলেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগকে ট্রাম্প আরো গুরুত্ব দিন।

কিন্তু সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে শেষ নির্বাচনি ভাষণে তিনি হোয়াইট হাউসের পেছনে অবস্থিত রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে পরিবর্তন

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশ রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাদের সমর্থন ট্রাম্পের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রবণতা পাল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের তিনটি আসনেই জয় পেয়েছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। তথ্য প্রতিবেদক জেফ অ্যাডেলসন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি।

অভিবাসন আইন প্রয়োগ নিয়ে ক্ষোভের মধ্যেই ভোটারদের এই অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ নাগরিক ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

মিসিসিপিতে সিনেট নির্বাচন এখনো অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো রাজ্যের তুলনায় এই রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সংখ্যা বেশি। মোট ভোটারের প্রায় ৩৭ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ।

ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্কট কলোম জয়ী হলে ১৯৮২ সালের পর তিনিই হবেন মিসিসিপি থেকে সিনেটে নির্বাচিত প্রথম ডেমোক্র্যাট।

যেসব কারণে এত বাজেভাবে হেরেছেন রিপাবলিকানরা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: বিবিসি

প্যাচওয়ার্কের পোশাক জোড়াতালি নয়, এটাই এখন শীতের ফ্যাশন by সুরাইয়া সরওয়ার

প্রকাশ ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ রঙিন টুকরা কাপড় একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করা হয় প্যাচওয়ার্কের পোশাক। শীতের আবহাওয়ায় আরাম এবং রং দুটোই পাওয়া যায় এ ধরনের কাপড়ের তৈরি পোশাক থেকে।

ছোটবেলায় মায়ের সেলাইকাজের পর পড়ে থাকা টুকরা কাপড় দিয়ে পুতুল বানাতেন মাহমুদা শান্তা। দেখতেন টুকরা কাপড় জোড়াতালি দিয়ে মা–ও তৈরি করছেন কাঁথা, টেবিল ম্যাট। বড় হয়ে পিনটারেস্ট দেখে জানলেন, নানা রঙের টুকরা কাপড় একসঙ্গে জুড়ে এভাবে কাপড় তৈরি করাকে বলে প্যাচওয়ার্ক।

আর সেই প্যাচওয়ার্ক কাপড় দিয়ে তৈরি হয় নানা পোশাক। ২০২৩ সালে নিজেই অনলাইনে প্যাচওয়ার্কের পোশাক বিক্রি করা শুরু করেন মাহমুদা শান্তা। আমাদের দেশে এ কাজে সাফল্য কতটুকু পাবেন, তা নিয়ে শুরুতে সন্দিহান ছিলেন মাহমুদা।

এখন তাঁর ‘পিঁপড়া বিডি’ পেজের পোশাক তৈরির জন্য কাজ করেন ৪০ জন কর্মী। ‘পিঁপড়ার ঢিবি’ নামে একটি বাড়ি করার স্বপ্ন দেখেন শান্তা, যে বাড়িজুড়ে থাকবে প্যাচওয়ার্কের নানা নিদর্শন।

১৯৬০–এর দশকে হিপ্পি সংস্কৃতির হাত ধরে শক্তপোক্তভাবে ফ্যাশন জগতে ঢুকে পড়ে প্যাচওয়ার্ক। আর এখন তো বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে টুকরা কাপড়ের তৈরি পোশাক।

মিলেনিয়াল থেকে জেন-আলফা—সবার পরনেই দেখা যাচ্ছে নানা রঙের প্যাচওয়ার্কের পোশাক। ‎সাধারণত বর্গ, আয়ত ও ত্রিভুজাকার কাপড়ের টুকরা দিয়ে প্যাচওয়ার্ক করতে দেখা যায়।

তবে প্যাচওয়ার্কের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা ব্যাকরণ নেই। যেকোনো রকমের যেকোনো আকারের কাপড়ের টুকরা দিয়েই করা যায় প্যাচওয়ার্ক। টুকরা কাপড় জোড়া দেওয়ার পর তার ওপর হাতে করা হয় কাঁথা সেলাই।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে পোশাককে টেকসই করতে প্যাচওয়ার্কের অপর পাশে জুড়ে দেওয়া হয় একরঙা কাপড়।

‎‎বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী লিপি খন্দকার বলেন, ‘একসময় গ্রামবাংলায় ব্যবহৃত অথবা নতুন কাপড় জোড়া দিয়ে সেলাই করে তৈরি করা হতো শীতে গায়ে দেওয়া কাঁথা।

আজকাল পুনর্ব্যবহার ও জিরো ওয়েস্টের ধারণা থেকে মানুষ আবার এই কাপড় জোড়া দেওয়ার ধারায় ফিরছে।

যেমন আমরা যারা পোশাক নিয়ে কাজ করি, টুকরা টুকরা অনেক কাপড় বেঁচে যায়। তখন সেই টুকরা কাপড়গুলো জোড়া দিয়ে প্যাচওয়ার্ক করা হয়।’

হরেক রকম নকশা ও রং প্যাচওয়ার্ককে দেয় বোহেমিয়ান এক অনুভূতি। বৈশ্বিক ফ্যাশনে প্যাচওয়ার্কের পোশাকের জন্য ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার জঁ পল গোতিয়ে, বেলজিয়ামের ফ্যাশন ডিজাইনার রাফ সিমন্স এবং জাপানি লেবেল খোকির কাজ বেশ প্রশংসনীয়।

বাংলাদেশের বেশ কিছু ফ্যাশন হাউস ও ডিজাইনার প্যাচওয়ার্ক নিয়ে কাজ করে। যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বরঙ, আফসানা ফেরদৌসী, খুঁত, ভারমিলিয়ন।

‎ফ্যাশন ডিজাইনার আফসানা ফেরদৌসী বলেন, ‘পরিধানকারীর ব্যক্তিত্বে নতুন মাত্রা যোগ করে প্যাচওয়ার্ক। প্যাচওয়ার্ক শুধু টুকরা জোড়া লাগানো নয়, বরং ভিন্ন স্মৃতি, অনুভূতি ও সংস্কৃতির অংশগুলোকে একসঙ্গে করে একটি নতুন গল্প তৈরি করা।’

আজকাল শাড়ি, শাল, পায়জামা, মাফলার, বেল্ট ও গয়নায়ও মিলছে প্যাচওয়ার্কের কাজ। এ ছাড়া বিছানার চাদর ও টেবিল ক্লথেও প্যাচওয়ার্ক করতে দেখা যায়।

‎‎কাপড়ের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতাকে ফুটিয়ে তোলা যায় বলে ডিজাইনাররা যেমন প্যাচওয়ার্ক নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন, তেমনি প্যাচওয়ার্ক করা নানা রঙের বাহারি পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন একদল ক্রেতা।

এ ছাড়া পরিবেশসচেতন ফ্যাশনপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় পাকাপোক্ত জায়গা করে নিচ্ছে প্যাচওয়ার্ক।

মিলেনিয়াল থেকে জেন-আলফা—সবার পরনেই দেখা যাচ্ছে নানা রঙের প্যাচওয়ার্কের পোশাক
মিলেনিয়াল থেকে জেন-আলফা—সবার পরনেই দেখা যাচ্ছে নানা রঙের প্যাচওয়ার্কের পোশাক। মডেল: স্নিগ্ধা, পোশাক: পিঁপড়া বিডি, সাজ: পারসোনা। ছবি: সুমন ইউসুফ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন হিজাবধারী পাঁচ মুসলিম নারী

যুক্তরাষ্ট্রে হিজাব পরা মুসলিম নারীদের ঐতিহাসিক জয়, আইনসভায় যাচ্ছেন চারজন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বেশ কিছু চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হিজাব পরা চারজন অঙ্গরাজ্য সিনেটর এবং একজন কংগ্রেস সদস্যের বিজয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দেশটির ইতিহাসে এই প্রথম এতসংখ্যক হিজাব পরিহিত নারী একসঙ্গে নির্বাচিত হয়ে আইনসভায় যাচ্ছেন।

মঙ্গলবারের এ নির্বাচনে এমন ফলাফলকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও হুমকি বেড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, রিপাবলিকান রাজনীতিক এবং অনলাইন ট্রলদের বিদ্রূপ ও অপমানের শিকার হয়েছেন এসব নারী। তাদের পোশাক ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও নানা ধরনের আক্রমণ হয়েছে।

গত সপ্তাহে মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক) যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থি ও ইসলামবিদ্বেষী উসকানিদাতাদের তৎপরতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির আশঙ্কা ছিল, এসব তৎপরতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি উঠতে পারে, যা মুসলিম আমেরিকানদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

তবে ভোটারদের উপস্থিতির বিস্তারিত চিত্র এখনো পর্যালোচনাধীন। এর মধ্যেই তরুণ ও প্রকাশ্যে মুসলিম পরিচয় বহনকারী কয়েকজন নারী নির্বাচনে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। তাদের সবাই প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে স্টেট সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন রুয়া রোমান। তুলনামূলক রক্ষণশীল এই অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় হিজাব পরা প্রথম মুসলিম নারী ছিলেন তিনি। এবার স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান রোমান। ওই সময় ফিলিস্তিনপন্থি ডেমোক্র্যাটরা দলীয় সম্মেলনে একজন ফিলিস্তিনি বক্তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) ও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

জেরুজালেমে জন্ম নেওয়া দাদার নাতনি রোমানেরই ওই সম্মেলনে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। এর আগেই তিনি দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

নিউইয়র্কে প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান আইনপ্রণেতা

নিউইয়র্কে আগামী জানুয়ারিতে স্টেট সিনেটে যোগ দিতে যাচ্ছেন আবের কাওয়াস। রোমানের মতো তিনিও একজন ফিলিস্তিনি অভিবাসী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাওয়াস বলেছিলেন, নিজের নতুন শহরে সম্মিলিত উদ্যোগ ও নাগরিক অংশগ্রহণকে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করার একটি পথ হিসেবে দেখেন তিনি।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলমানদের ওপর কঠোর নজরদারি ও দমন-পীড়ন শুরু হয়। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন এলাকায় এফবিআইয়ের অভিযান, গ্রেপ্তার এবং মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো হয়। সে সময় কাওয়াসের বাবা ছিলেন বৈধ অভিবাসন নথিপত্রবিহীন। তাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)। প্রায় তিন বছর আটক রাখার পর তাকে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়।

এদিকে দিনের আলোয় জনসমক্ষে আইসিইর সহিংস গ্রেপ্তার অভিযান যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পেছনে এসব অভিযানও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে মিডল ইস্ট আই। এই নির্বাচনি ফলাফলকে ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের নীল ঢেউ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

ইলিনয়ে নাবিলা সৈয়দের জয়

ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে ২৭ বছর বয়সী স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ নাবিলা সৈয়দ রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জয়ী হন তিনি।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মুসলিম নারী ২০২২ সালে অঙ্গরাজ্যের আইনসভার একটি শূন্য আসনে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে নিজের অবস্থান আরো সুসংহত করেছেন।

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এবং সমতা প্রতিষ্ঠাকে নিজের কাজের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

সম্প্রতি তাকে সমর্থন জানিয়েছে বৃহত্তর শিকাগো এলাকায় প্রচারিত ১৫০ বছরের পুরোনো সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি হেরাল্ড’ এবং প্রভাবশালী ‘শিকাগো ট্রিবিউন’।

রোমান ও কাওয়াসের মতো নাবিলাও ইসরাইলের সমালোচনা করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পরদিন ইলিনয়ের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেন তিনি। ওই চিঠিতে ওয়াশিংটনের কাছে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছিল।

তবে সমালোচকেরা চিঠিটিকে হামাসের পক্ষে অবস্থান হিসেবে অভিহিত করেন।

চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘লাখ লাখ ফিলিস্তিনি যখন মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত, তখন আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। সহিংসতার মূল কারণ—অর্থাৎ অসমতা—দূর করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।’

কানেকটিকাটে সিনেটর হচ্ছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মরিয়ম খান

কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি মরিয়ম খানও আগামী জানুয়ারিতে স্টেট সিনেটে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ২০২২ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

এর আগে আগস্টে অনুষ্ঠিত দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে প্রায় এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করা ডেমোক্র্যাট দলের এক প্রভাবশালী প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন তিনি।

পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া মরিয়ম খান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দায়িত্ব পালনকালে বিশেষ শিক্ষাবিষয়ক সিলেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এ ছাড়া বিচার বিভাগীয় ও শিক্ষা কমিটিতেও কাজ করেছেন তিনি।

কানেকটিকাট স্টেট সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বব ডাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মরিয়ম খানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাকে সাবেক বিশেষ শিক্ষা শিক্ষক এবং শিশুদের অধিকার আদায়ে লড়াই করা একজন যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নিজের ডেস্কে পাকিস্তানের পতাকা রাখায় রিপাবলিকানদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মরিয়ম খান। উল্লেখ্য, যুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় যুদ্ধবিরতির পথ তৈরিতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল।

এ বিষয়ে ‘দ্য কানেকটিকাট মিরর’কে মরিয়ম খান বলেন, ‘নিজের ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত গর্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই আমি পাকিস্তানের পতাকাটি রেখেছিলাম। এটিকে অনুপযুক্ত বা অবিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে দেখার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।’

তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অংশীদার। নিজের শিকড় ও পটভূমিকে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কিংবা কানেকটিকাটের মানুষের সেবা করার ক্ষেত্রে আমার অঙ্গীকার কমে গেছে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন হিজাবধারী পাঁচ মুসলিম নারী
বাঁ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী রুয়া রোমান, ইলহান ওমর, নাবিলা সৈয়দ, আবের কাওয়াস, মরিয়ম খান।

নিজেদের না খাইয়ে ইসরাইলিদের বিনোদনের ব্যবস্থা করছেন ট্রাম্প: কার্লসন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দেশের স্বার্থের চেয়ে ইসরাইলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন মার্কিন রক্ষণশীল ভাষ্যকার টাকার কার্লসন। খবর আনাদোলুর।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক পডকাস্টে তিনি বলেন, একজন নেতার জন্য নিজের দেশের মানুষের চেয়ে অন্য একটি দেশকে বেছে নেওয়া অনৈতিক।

ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড বোঝাতে প্রতিবেশীর সন্তানদের ডিজনিল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার উদাহরণ দেন কার্লসন। তিনি বলেন, নিজের সন্তানরা যখন না খেয়ে থাকে, তখন প্রতিবেশীর সন্তানদের বিনোদনের ব্যবস্থা করা অনৈতিক। ট্রাম্পও ঠিক এমন কাজ করেছেন।

কার্লসন বলেন, ‘তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইসরাইলকে বেছে নিয়েছেন। মানুষ এ নিয়ে মিথ্যা বললেও সবাই বিষয়টি দেখতে পাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই কাজ সম্পূর্ণ ভুল।’

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়ারও সমালোচনা করেন তিনি। তার অভিযোগ, ইসরাইলের স্বার্থে বারবার যুদ্ধে জড়িয়ে ওয়াশিংটন নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কার্লসন বলেন, ‘আপনার দেশ যদি ইসরাইলের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক অর্থহীন যুদ্ধ শুরু করে এবং প্রতিবারই পরাজিত হয়, তাহলে দেশটির ক্ষমতা ও প্রভাব কমবে, নিজেদের নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটবে এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে দেউলিয়া হয়ে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একসময় হয়তো তাদের মনে হবে, এটি একটি খারাপ সিদ্ধান্ত। ইসরাইলের সঙ্গে আর কোনো যুদ্ধে জড়ানো যাবে না। কিন্তু এখনো তেমনটি ঘটেনি। কারণ, প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার মতো সাহস কেউ দেখায়নি।’

২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে কার্লসন দাবি করেন, ইসরাইলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ওই যুদ্ধে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ধারা অব্যাহত রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা উল্লেখ করে কার্লসন বলেন, ‘২৩ বছর আগে ইরাক যুদ্ধেও আমরা ইসরাইলের দাবি অনুসরণ করে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা বলবেন, ঠিক এটাই ঘটেছিল। তখনও নেতানিয়াহুই ছিলেন।’

সবশেষে তিনি বলেন, ‘ভালো খবর হলো, এখন সবাই বিষয়টি দেখতে পাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এটিই হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেখে যাওয়া দীর্ঘস্থায়ী অবদান।’

নিজেদের না খাইয়ে ইসরাইলিদের বিনোদনের ব্যবস্থা করছেন ট্রাম্প: কার্লসন
ছবি: সংগৃহীত।