Tuesday, October 13, 2026

যুক্তরাজ্যে সামরিক স্থাপনায় হামলার চেষ্টা করছে ইরান, সতর্ক করল এমআই৫

যুক্তরাজ্যে সামরিক স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার চেষ্টা বাড়াচ্ছে ইরান, এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর প্রধান কেন ম্যাককালাম। তার মতে, চলতি বছর ব্রিটেনে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।

মঙ্গলবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এর আগে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সোমবার বলেছেন, গত মাসে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন একটি হামলার পরিকল্পনার পেছনে তেহরানের জড়িত থাকার বিষয়টি ‘প্রায় নিশ্চিত’।

ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান ব্যবহার করেছিল।

ব্রিটেনের নিরাপত্তার জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন হুমকি নিয়ে বার্ষিক বক্তব্যে এমআই৫-এর মহাপরিচালক কেন ম্যাককালাম বলেন, চলমান তদন্তের কারণে ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটি নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারবেন না। তবে এ বছর ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে।

তিনি বলেন, ‘সামরিক স্থাপনার মতো কঠিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দিকে ইরানের আগ্রহ বাড়ার ক্ষেত্রে এ বছর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।’

ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় উল্লেখ করে ম্যাককালাম বলেন, শুধু যুক্তরাজ্যেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে।

তবে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলমান থাকায় এর পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

এমআই৫ প্রধানের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এল, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলোর নিরাপত্তা এখন বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

এমআই৫-এর প্রধান কেন ম্যাককালাম। ছবি: রয়টার্স
এমআই৫-এর প্রধান কেন ম্যাককালাম। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা

এএফপিঃ ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়লে ওয়াশিংটনকে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুথি বিদ্রোহীদের এক নেতা।

ইয়েমেনে নিজেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বলে খবর প্রকাশের পর সোমবার এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এদিকে, ধারাবাহিক হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে দেশটির সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কয়েক মাস পর গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। ওই সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে আরো গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পরপরই হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, তেলবাহী ট্যাংকার ও পরিবহনকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। সৌদি রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলায় বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সোমবার রাতেও সৌদি রাজধানীতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

অন্যদিকে, হুথিরা দাবি করে, তারা আবারও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

পরে সৌদি জোট জানায়, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জোট জানায়, হুথি গোষ্ঠীর ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে আসার সময় প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। শহরটিতে আগে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছিল।

শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করছেন তিনি। এর আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়া হলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে খবর রয়েছে।

সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘হুথিরা খুবই খারাপ আচরণ করছে। তারা অত্যন্ত খারাপ আচরণ করছে। এটা মোটেও ভালো নয়।’

হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ নেয়, তাহলে জবাব দেওয়ার বিষয়ে আমরা কোনো দীর্ঘ আলোচনা করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।’

সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও সতর্ক করে দেন তিনি। আল-বুখাইতি বলেন, ‘সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এসব স্থান থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ, এখন এগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’

শনিবার বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলাটি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এতে শত শত মানুষ আহতও হন।

ট্রাম্প ওই হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন এবং সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবেন।

সোমবারও রিয়াদের উপকণ্ঠে অবস্থিত বিশাল বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

‘কঠোর’ জবাবের হুঁশিয়ারি

আল-বুখাইতি বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার উদ্দেশ্য হলো যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে এই বার্তা দেওয়া যে, নিরাপদ অবস্থানে থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আর আগ্রাসন চালানো যাবে না।

সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আবদুল আজিজ বিন সালমান সোমবার রিয়াদে এক সম্মেলনে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, জনগণ ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের জবাবও সমানভাবে কঠোর হতে হবে।’

শনিবারের হামলার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এতে দেখা যায়, ধর্মীয় পোশাক পরা মুসলিম তীর্থযাত্রীরা বিমানবন্দরের যাত্রী অপেক্ষাকক্ষে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বিস্ফোরণে ভবনের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে।

সোমবারও রিয়াদে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল-ইখবারিয়া জানায়, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি মোকাবিলায় সামরিক জোট পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে ‘শত্রুপক্ষের আকাশপথে হামলার হুমকি’ সম্পর্কে সতর্কবার্তা আসে। এর কিছুক্ষণ পর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এই সতর্কবার্তার কারণে উজবেকিস্তানের নেফচি ফেরগানা ও সৌদি ক্লাব আল নাসরের মধ্যকার একটি ফুটবল ম্যাচের খেলা শুরুর সময় পিছিয়ে যায়। আল নাসরের হয়ে খেলেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রিয়াদে এই প্রথম মোবাইল ফোনভিত্তিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলো। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানী লক্ষ্য করে হামলার সময় কেন এ ধরনের বার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

হুথিরা আরো দাবি করেছে, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত

সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, দেশটির যেকোনো বিমানবন্দর ব্যবহার করার আগে মার্কিন সরকারি কর্মীদের দূতাবাসের অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নিলে মার্কিন নাগরিকদের ‘সতর্কতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

দূতাবাস আরো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ছবি তোলার কারণে কয়েকজন মার্কিন নাগরিককে আটক করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় বিমান সংস্থা ইতিহাদ এয়ারওয়েজ সোমবার ঘোষণা করেছে, আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি দাম্মাম ও জেদ্দাগামী ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে।

বাহরাইনের জাতীয় বিমান সংস্থা গালফ এয়ার জানিয়েছে, তারাও শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বাতিল করছে।

মার্কিন বিমান সংস্থা ডেল্টা এয়ারলাইনস ২৩ অক্টোবর থেকে আটলান্টা ও রিয়াদের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছে।

সামরিক সরঞ্জাম কেনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ, মরুভূমিপ্রধান ভূখণ্ডজুড়ে তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও পরিবহনকেন্দ্রে হুথিদের হামলা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সফলতা থাকলেও সৌদি আরবের আয়তন এত বড় যে, দেশটির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সর্বত্র নিজেদের স্থাপনা রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব।

২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট ইয়েমেনের সরকারকে সহায়তা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে ইয়েমেনের আকাশসীমা এবং হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানার বিমানবন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও রয়েছে।

জুনোর মতে, হুথিরা এখন সৌদি আরবের সঙ্গে সেই আচরণই করতে চায়, যা সৌদি আরব তাদের সঙ্গে করে আসছে।

দীর্ঘদিনের ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ দেশটিতে গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। দারিদ্র্যপীড়িত দেশটির সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক সৌদি আরবে বারবার হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সংঘাতে জড়িত উভয় পক্ষকে হামলা বন্ধ করে পিছু হটার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, লড়াই অব্যাহত থাকলে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে, অথচ এ সংঘাতের অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। ছবি: সংগৃহীত

কোরিয়া থেকে ইরান, ৮১ বছরে কোনো যুদ্ধে কেন জেতেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রভান্ডার থাকা সত্ত্বেও এসব অভিযানের অনেকগুলোতেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ওয়াশিংটন। কোথাও যুদ্ধ শেষ হয়েছে অমীমাংসিত অবস্থায়, কোথাও সেনা প্রত্যাহারের পর প্রতিপক্ষ আবার ক্ষমতায় ফিরেছে, আবার কোথাও সামরিক সাফল্যের পরও তৈরি হয়েছে নতুন নিরাপত্তা সংকট।

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ সেই পুরোনো প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি ও সামরিক চাপের মধ্যেও তেহরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের একাংশের। তাদের মতে, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা আর যুদ্ধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা এক বিষয় নয়।

কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন একাধিক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল বয়ে আনেনি। বিপুল অর্থ ব্যয়, প্রাণহানি, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং নতুন প্রতিপক্ষের উত্থানও অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোরিয়া যুদ্ধ: তিন বছর লড়েও মেলেনি চূড়ান্ত সমাধান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সীমাবদ্ধতা বোঝার ক্ষেত্রে কোরিয়া যুদ্ধ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৫০ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে সরাসরি অংশ নেয় মার্কিন বাহিনী। লক্ষ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং কোরীয় উপদ্বীপে নিজেদের মিত্রদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা।

প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘর্ষের পর ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে দুই কোরিয়ার মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। উত্তর কোরিয়ার সরকারও ক্ষমতায় টিকে যায়। ফলে দেশটিকে সামরিকভাবে পরাজিত করে পুরো উপদ্বীপে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

পরবর্তী দশকগুলোতে উত্তর কোরিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি ব্যাপক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়লেও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে থাকে পিয়ংইয়ং। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায় দেশটি। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও বাড়িয়েছে তারা।

উত্তর কোরিয়ার এই সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা যায়নি।

ভিয়েতনাম: দীর্ঘ যুদ্ধের পর সেনা প্রত্যাহার

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে আরেকটি বড় অধ্যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে প্রথম দিকে সরাসরি যুদ্ধে না নেমে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সামরিক পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন সেনা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালানো হয়।

প্রযুক্তি, বিমানশক্তি ও অস্ত্রভান্ডারে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বাহিনীকে পরাজিত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর পর ১৯৭৩ সালে মার্কিন বাহিনী দেশটি থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হন। বিপুল প্রাণহানি ও যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনমত ক্রমশ বিরূপ হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপও মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

১৯৭৫ সালে সায়গনের পতনের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তী সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম একীভূত হয়ে কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক সম্পৃক্ততা শেষ পর্যন্ত দেশটিতে ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

আফগানিস্তান: সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ের উল্টো ফল

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার ইতিহাস আরো জটিল। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করার পর তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা দেয় ওয়াশিংটন। পাকিস্তানের সহযোগিতায় আফগান মুজাহিদিনদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এই গোপন কর্মসূচি পরিচিত ছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’ নামে।

দীর্ঘ সংঘর্ষের পর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায়। তবে দেশটিতে স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যকার বিরোধ পরবর্তী সময়ে নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই আফগানিস্তানে আল-কায়েদার উত্থান ঘটে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার লক্ষ্য নিয়ে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে ওয়াশিংটন। ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’ নামে পরিচালিত এই অভিযানে তালেবান সরকারের পতন ঘটে এবং কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্ররা।

তবে প্রাথমিক সামরিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। বিন লাদেনকে ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন কমান্ডো অভিযানে হত্যা করা হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলতে থাকে।

দুই দশকের যুদ্ধের পর ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করে নিলে তালেবান আবারও কাবুলের ক্ষমতা দখল করে। দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং প্রাণহানির পরও আফগানিস্তানে নিজেদের সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারেনি ওয়াশিংটন।

আল-কায়েদাকেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আফগানিস্তান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের কঠিন বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে আছে।

ইরাক: সাদ্দামের পতনের পর নতুন সংকট

১৯৯০ সালে কুয়েত দখল করে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনের সরকার। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক জোট ১৯৯১ সালে সামরিক অভিযান শুরু করে। ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে হটিয়ে দেওয়া হয় এবং দেশটির স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত সেখানেই শেষ হয়নি। ২০০৩ সালে আবারও দেশটিতে সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। এবার সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটে এবং সাদ্দাম হুসেন গ্রেপ্তার হন। পরে বিচারের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর ইরাকে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়নি। সাম্প্রদায়িক সংঘাত, বিদ্রোহ ও নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়।

একই সময়ে ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইরানের প্রভাবও বাড়ে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।

সাদ্দাম সরকারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক সামরিক সাফল্য হলেও তার পরবর্তী পরিণতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুদ্ধের আগে ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে পরবর্তী বাস্তবতার বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। ফলে ইরাক অভিযানকে শুধু সামরিক বিজয়ের নিরিখে মূল্যায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।

কসোভো: সামরিক হস্তক্ষেপে রাজনৈতিক সমস্যার অবসান হয়নি

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়। এর পর কসোভো থেকে যুগোস্লাভ বাহিনী প্রত্যাহার করা হয় এবং অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে আসে।

তবে সামরিক হস্তক্ষেপের পরপরই কসোভোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত হয়নি। ২০০৮ সালে অঞ্চলটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ কসোভোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সার্বিয়া, রাশিয়া ও চীনসহ কয়েকটি দেশ এই স্বাধীনতা মেনে নেয়নি।

কসোভোর ঘটনাটি দেখায়, সামরিক পদক্ষেপ কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারলেও তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান নিশ্চিত করে না।

ইরান যুদ্ধ: পুরোনো অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি?

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায়। ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেয়। আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করা। কিন্তু সামরিক আঘাতের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২৩ জুন প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের ব্যয় আনুমানিক ৪০০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবের পরিসর ছিল ৩৪০০ কোটি থেকে ৪২০০ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ের ব্যয় এতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে বহু দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়।

১১ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জবাবকে অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেছে ইরান। এতে বোঝা যায়, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ফলাফল তাই শুধু কতটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে বা কতটা সামরিক ক্ষতি হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা কঠিন। যুদ্ধ শেষে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কতটা কমবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন সামরিক শক্তি থাকলেই যুদ্ধ জেতা যায় না?

যুক্তরাষ্ট্রের অতীত যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সাধারণ প্রবণতা চোখে পড়ে। প্রথমত, সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা থাকলে যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের পরও রাজনৈতিক সমাধান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, কোনো দেশের সরকার বা সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা তুলনামূলক সহজ হলেও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি জটিল।

তৃতীয়ত, প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তি কমিয়ে দিলেও তাদের রাজনৈতিক আদর্শ, জাতীয়তাবাদ বা প্রতিরোধের মনোভাব নির্মূল করা যায় না। ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় এই বিষয়টি স্পষ্ট। একইভাবে ইরাকে সরকার পরিবর্তনের পরও নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান দেখিয়েছে, ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এ ছাড়া যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, সেনাদের প্রাণহানি এবং দেশের অভ্যন্তরে জনসমর্থন কমে যাওয়াও সামরিক অভিযানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮৬ সালের গোল্ডওয়াটার-নিকোলস আইন সামরিক বাহিনীর কমান্ড কাঠামো ও যৌথ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনে। তবে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কৌশলগত সমন্বয়, বেসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণের গুরুত্ব থেকেই যায়।

বিজয়ের সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধেই জয় পায়নি—এমন দাবি অবশ্যই অতিরঞ্জিত। ১৯৯১ সালে কুয়েতকে ইরাকি দখলমুক্ত করার অভিযানসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করেছে। তবে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দীর্ঘ সংঘাতে সামরিক সাফল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ফলাফলের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের আলোচনায় তাই মূল প্রশ্নটি হলো, একটি যুদ্ধে জয় বলতে কী বোঝায়। প্রতিপক্ষের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা, সরকার পরিবর্তন করা কিংবা কোনো অঞ্চল থেকে শত্রুপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া এক ধরনের সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে রূপ দেওয়া ভিন্ন বিষয়।

ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তেহরানের সক্ষমতা দুর্বল করা সম্ভব হলেও এর ফলে দেশটির নীতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে কি না, আঞ্চলিক সংঘাত কমবে কি না এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত হবে কি না—সেসবই শেষ পর্যন্ত অভিযানের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অতীত অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে, যুদ্ধ শুরু করার সক্ষমতা আর নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার সক্ষমতা এক নয়। ইরান সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতিও নির্ভর করবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা কতটা কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া যায়, তার ওপর।

সূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন

কোরিয়া থেকে ইরান, ৮১ বছরে কোনো যুদ্ধে কেন জেতেনি যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগে ট্রাম্পের মাথাব্যথা আরো বাড়ল

বিবিসিঃ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে যে নির্বাচন, তার আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটাররা ইতিমধ্যে আগাম ভোট দেওয়া শুরু করেছেন। এমন সময়ে জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি রাশিয়ার দিকে কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকলেও তাতে জ্বালানির দাম কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। বরং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নতুন মোড় তার রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

শুক্রবার বিকেলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আসার কথা। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোতে এ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এসব রাজ্যে কৃষিযন্ত্র চালানো এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে ডিজেল অপরিহার্য।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এ চুক্তিকে ‘আমেরিকানদের জন্য কম দামে জ্বালানি নিয়ে আসার’ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগকে রুশ ডিজেল বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার নির্দেশ দেন।

কিন্তু জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানির উচ্চমূল্যের জন্য ভোটারদের বড় একটি অংশ ইরান যুদ্ধকে দায়ী করছেন। সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমছে। ইরান যুদ্ধ পরিচালনা এবং অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে তার সাফল্য নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির দুই দিন পর ট্রাম্প আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন একটি জ্বালানি যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা প্রচার করেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ছিল আরো জটিল।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, এ চুক্তির বিষয়ে তাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। তবে ইউক্রেন চুক্তিটি মেনে চলবে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে রাশিয়া এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর মধ্যেই রোববার রাতে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নতুন করে হামলা চালায় রাশিয়া।

সোমবার জেলেনস্কি ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে পুতিন ট্রুথ সোশ্যাল পড়েন না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই শীতে রাশিয়া যদি জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়, তবে আমরাও জবাব দেব।’

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্ক বারবার উত্তপ্ত হয়েছে। হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো সহজ হবে। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকায় কখনো রাশিয়া, কখনো ইউক্রেনকে দায়ী করছেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন জেলেনস্কি। রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ঘাটতিতে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইউক্রেনের নতুন একজন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রি এবং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্পের ভাষায়, জেলেনস্কিকে এবার ‘অবশ্যই এটা বন্ধ করতে হবে’।

স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘ এক দশকের একটি প্রকাশ্য রেকর্ড রয়েছে। যারা তার ইচ্ছা অনুযায়ী, যখন এবং যেভাবে তিনি চান, সেভাবে কাজ করেন না, তাদের ওপর চড়াও হওয়ার।’

কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সেটিকে সাফল্য হিসেবে প্রচার করার প্রবণতা ট্রাম্পের পুরোনো। তার ঘোষিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ও সেই প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায় বলে মনে হচ্ছে। অতীতেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি ও বড় ধরনের শান্তিচুক্তির বিষয়ে তিনি সময়ের আগেই ঘোষণা দিয়েছেন।

এটি কূটনীতির ধীরগতিতে ট্রাম্পের অধৈর্য হয়ে পড়ার প্রকাশ, নাকি কোনো চুক্তি সফল করার কৌশল—তা স্পষ্ট নয়। তবে তার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশকে এখন বুঝতে হচ্ছে, ঘোষিত চুক্তির বাস্তব অর্থ কী এবং এর প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত।

প্রতিক্রিয়া আসতেও বেশি সময় লাগেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি যুদ্ধবিরতিকে ‘দৃঢ় সমর্থন’ জানিয়েছেন। তবে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল আমদানির চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি।

তার মতে, এ চুক্তি ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ‘অবৈধ, অহেতুক যুদ্ধের’ অর্থায়নে সহায়তা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্পের ডিজেল আমদানির ঘোষণায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির চারজন সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।

রোববার প্রকাশিত বিবৃতিতে সিনেটররা বলেন, ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের নৃশংস যুদ্ধে মার্কিন ডলারের অর্থায়ন ঠেকাতে ২০২২ সালে কংগ্রেস রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি সরাসরি সেই আইনের পরিপন্থী।’

ট্রাম্পের জন্য আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও ডিজেলের দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। দাম রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা কমলেও প্রতি গ্যালন ডিজেলের মূল্য এখনো ৬ ডলারের ওপরে।

এর মধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের টানাপোড়েনের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে। এতে বিশ্ব জ্বালানিবাজারের সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সপ্তাহান্তে সৌদি আরবে হুথিদের নতুন হামলায় বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়। এসব হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এর ফলে এক দশক ধরে চলা সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, হুথিরা এর মাধ্যমে বার্তা দিচ্ছে যে তারা শুধু সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতেই হামলা চালাবে না, বেসামরিক বিমানবন্দরেও আঘাত হানবে। এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

র‍্যাটনি বলেন, অঞ্চলের কোনো আরব দেশই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চায়নি। হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা সেই যুদ্ধের একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে কোনো শত্রুতা শুরু হলে তা আরো বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এতে তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তার আশঙ্কা, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগে এটি আরো খারাপের দিকে যাবে বলেই আমার মনে হয়।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে ইউক্রেনকে বিশ্ব জ্বালানি সংকটের প্রধান উৎস হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি ইরানের সামরিক হুমকির কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার চলাচল বাড়ানোর কথাও বলেছেন।

তবে জ্বালানি সংকটের দায় ইউক্রেনের দিকে ঠেলে দেওয়ার এ চেষ্টা মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও হতে পারে। কারণ, জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে এমন একটি যুদ্ধ, যা শুরু হয়েছিল ট্রাম্পের আগের মেয়াদে নয়, অন্য এক প্রেসিডেন্টের শাসনামলে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এক সময়ে একজনই প্রেসিডেন্ট থাকেন। ভোটাররা যখন ভোট দিতে যান, তখন সাধারণত ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্টকেই দেশের পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন তারা।

সব মিলিয়ে, জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত—সবকিছুই ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি তার জন্য আরো বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ আবারও দেখিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগে ট্রাম্পের মাথাব্যথা আরো বাড়ল
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে ভবন, বৃষ্টিতে ডুবছে তাঁবু

মিডল ইস্ট মনিটরঃ গাজায় শীতের আগমনে নতুন করে মানবিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ঘরবাড়ি হারানো ফিলিস্তিনিরা আশ্রয়ের জন্য একদিকে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁবুতে আশ্রয় নিলে বৃষ্টি, বন্যা ও তীব্র ঠান্ডার মুখে পড়ছেন। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে হাজারো পরিবারের জীবন এখন দুই ধরনের বিপদের মধ্যে আটকে গেছে।

গাজার বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে এখনো বহু বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন। ভবনের দেয়াল ও ছাদ থেকে প্রায়ই কংক্রিটের টুকরো খসে পড়ছে। তা সত্ত্বেও আসন্ন শীতের ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পরিবারগুলো এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

কিন্তু এসব ভবনে থাকলেও বিপদ কাটছে না। ছাদ ও দেয়ালের ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে অস্থায়ী বসবাসের জায়গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক ও কাপড়ের টুকরো দিয়ে ফাটল বন্ধ করে ঠান্ডা বাতাস ঠেকানোর চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা। এমনকি পানি সংগ্রহ করতে যাওয়ার সময়ও তাঁদের ধসে পড়ার আশঙ্কায় থাকা দেয়াল ও ভবনের নিচ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

‘আমাদের আর কোনো উপায় নেই’

গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তুচ্যুত মাহের আওয়াদ খাদের। তার ভাষ্য, সেখানে বসবাস করার সময় প্রায়ই তাদের ওপর পাথর ও কংক্রিটের টুকরো পড়ে। পানি আনতে গেলেও বিপদের মুখে পড়তে হয়।

প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে সেখানে অবস্থান করছেন মাহের। তার কোনো চাকরি বা আয়ের উৎস নেই। পরিবারের জন্য বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই। তাঁর অভিযোগ, এখন পর্যন্ত কোনো মানবিক সহায়তাকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়ায়নি।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতিগ্রস্ত আরেকটি ভবনের নিচে পরিবার নিয়ে থাকছেন তাহের হাজ্জো। আগের শীতেও ভবনটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছিল। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও থেকে কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ খসে পড়ত।

আসন্ন শীতের কথা মাথায় রেখে তিনি এখন সন্তানদের সুরক্ষায় আশপাশের জায়গা বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে শক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে এতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মিলছে না। ভবনের ছাদ যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে কীভাবে দিন কাটছে, জানতে চাইলে তাহেরের উত্তর, তাদের কিছুই করার নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রাণহানির আশঙ্কা

গাজায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাসের বিপদ এরই মধ্যে প্রাণহানির ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মাসে গাজা সিটির সাবরা এলাকায় আল-সাআদা আবাসিক ভবন ধসে ২১ জন নিহত হন। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এর কয়েক দিন পর একই এলাকায় আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনও ধসে পড়ে।

এসব ঘটনায় যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে আশ্রয় নেওয়া হাজারো মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গাজার গণপূর্ত ও আবাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পুরো গাজা উপত্যকায় প্রায় ৩ হাজার ভবনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেক পরিবার সেগুলোতেই অবস্থান করছে।

শীতকালে ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও প্রতিকূল আবহাওয়া ভবনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া দেয়াল ও ছাদ ধসে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়বে।

জরুরি সহায়তা চেয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ

গাজা সিটির কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসরত মানুষদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর জরুরি সহায়তা চেয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, শীতের প্রতিকূল আবহাওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে।

স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো মেরামত, শক্তিশালী করা কিংবা বিপজ্জনক স্থাপনাগুলো থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রী তাদের হাতে নেই।

এদিকে, ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি, উদ্ধারযান ও কংক্রিট কাটার সরঞ্জাম প্রবেশেরও আহ্বান জানিয়েছে গাজার সিভিল ডিফেন্স। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য অস্থায়ী প্রস্তুতকৃত আবাসন ও জরুরি আশ্রয় উপকরণ সরবরাহের দাবিও উঠেছে। তবে এসব সহায়তার উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত মাহের ও তাহেরের মতো হাজারো পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আজ রাতে তারা কোথায় নিরাপদে ঘুমাবেন?

যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো এসব মানুষের জন্য বাস্তুচ্যুতি এখন শুধু নতুন করে বোমা হামলা বা উচ্ছেদের আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং মাথার ওপর থাকা ছাদটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়বে কি না, সেই আতঙ্কও তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

গাজায় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে ভবন, বৃষ্টিতে ডুবছে তাঁবু

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

দ্য গার্ডিয়ানঃ রিয়াদকে চাপে ফেলতে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইয়েমেনের হুথিরা। পাল্টা অভিযানে নেমেছে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী, বাড়ছে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পাশাপাশি দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিমান চলাচল, প্রশ্ন উঠেছে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের এই আক্রমণ কেবল সামরিক সংঘাতের অংশ নয়; এর মাধ্যমে রিয়াদের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে দেশটির ভাবমূর্তিতেও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত এলাকাগুলো পুনর্দখলে অভিযান জোরদার করেছে। ফলে সংঘাতটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা

গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন রোববার একই বিমানবন্দর এলাকায় আরেকটি হামলায় একজন নিহত হন এবং প্রায় এক ডজন মানুষ আহত হন।

শনিবারের হামলার পর প্রকাশিত নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে বিমানবন্দরের টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। হামলার অভিঘাতে টার্মিনালের ভেতরে ধোঁয়া ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

রিয়াদ বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেন্দ্র। রাজধানী থেকে প্রায় ২২ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরে হামলার কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সময় বাড়িয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাও রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামো ঘিরে হুথিদের হামলা বাড়ছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই অভিযানের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়গুলোর একটি।

এখনই হামলা জোরদার করল কেন হুথিরা?

হুথিদের হামলার সময় নির্ধারণের পেছনে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ এবং বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত—দুইয়েরই প্রভাব রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধে হুথিরা প্রথমদিকে সরাসরি জড়ায়নি। তবে গত মাসে গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের অবস্থানে পৌঁছায়।

বাব আল-মান্দেব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি এবং এশিয়া-ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই পথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে। বাব আল-মান্দেবের আশপাশ থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অবস্থানেও আঘাত হানা হচ্ছে।

সৌদি আরব ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করায় হুথিদের প্রধান প্রতিপক্ষের একটি হয়ে উঠেছে। ফলে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে রিয়াদকে সরাসরি যুদ্ধের মূল্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। রাজধানীর বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ হচ্ছে কীভাবে?

পরপর হামলার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সৌদি আরবের শক্তিশালী বলে পরিচিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তবে হামলাগুলো কেন প্রতিহত করা যায়নি, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবকে একই সঙ্গে সরকারি ভবন, তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখতে বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র এবং কার্যকর নজরদারি সক্ষমতা প্রয়োজন।

হুথিদের হামলার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে একযোগে বা ধারাবাহিকভাবে হামলা হলে কোন লক্ষ্যবস্তু আগে সুরক্ষিত করা হবে, তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এর আগে রিয়াদ বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক ও সংশ্লিষ্ট গুদামগুলোও হামলার লক্ষ্য হয়েছিল। এসব হামলায় বিমানবন্দরে থাকা একটি এয়ারবাস এ৩২০ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ধ্বংস হয় এবং অন্তত আরো পাঁচটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হুথিরা দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করার কৌশল কী?

বিমানবন্দর এমন একটি অবকাঠামো, যার ওপর হামলা হলে শুধু যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হয় না; আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব পড়ে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন ও বড় বৈশ্বিক আয়োজনের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ২০৩২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এমন সময়ে রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা দেশটির নিরাপত্তা-ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করলে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা ও সংঘাত বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি মনে করেন, হুথিদের হামলা বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; তেল পাইপলাইন ও জ্বালানি অবকাঠামোও তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেসামরিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দৃশ্যমান প্রভাব এবং জনমনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া হুথিদের আরও হামলায় উৎসাহিত করতে পারে। সৌদি আরবের কাছ থেকে বাড়তি রাজনৈতিক বা কৌশলগত ছাড় আদায় করাও তাদের লক্ষ্য হতে পারে।

তবে হামলার প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর পেছনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে হুথিদের সামরিক পদক্ষেপ, তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

সংঘাতের প্রভাব ছড়াতে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো বা পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জ্বালানির দাম এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য সংকটটি আরো জটিল, কারণ দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা সেই পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত আয়োজন চলার মধ্যেই হামলাগুলো ঘটেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব আয়োজন চালু রেখে স্বাভাবিক পরিস্থিতির বার্তা দিতে চাইলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ী সরাসরি অংশ নেননি বা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছেন।

ইয়েমেনে পাল্টা অভিযান, বাড়ছে প্রাণহানি

সৌদি আরবের ওপর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এবং আশপাশের এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সৌদি বিমানবাহিনী হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। রোববারের সংঘর্ষে উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৬০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

তাইজের গভর্নর নাবিল শামসান শহরটিতে হুথিদের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। ওষুধের সংকটের কারণে জরুরি অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যা সেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। হুথিদের দাবি, রোববার সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে ১২৪টি হামলা চালিয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অন্যদিকে সৌদি আরব হুথিদের সর্বোচ্চ নেতা আবদুল মালিক আল-হুতিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তার অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

সংঘাতের বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সৌদি আরবের পক্ষে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেছেন।

এর জবাবে হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিলে ওয়াশিংটনকে দ্রুত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও এসব এলাকা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গোষ্ঠীটি এসব স্থাপনাকে তাদের হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে বলে দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সংঘাতটি ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তবে ওয়াশিংটন কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।

মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে ইরান

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে তেহরান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের সমর্থন দিয়ে আসছে। ফলে গোষ্ঠীটির সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগকে সম্ভাব্য সমঝোতার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য আল-বুখাইতির দাবি, সৌদি আরব ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল এবং প্রথমে এক মাস, পরে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে হুথিরা উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আল-বুখাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত আগের লড়াইগুলোর মতো নয় এবং পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার দাবি, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে রিয়াদ ও সানার মধ্যে বিস্তৃত সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ক্ষয়ক্ষতি তত বাড়বে। এদিকে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে হুথিদের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের শক্তিগুলোও সক্রিয় হচ্ছে

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নির্বাসিত নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি দক্ষিণাঞ্চলের বাহিনীগুলোকে শুধু সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমান্ত রক্ষায় নয়, বরং সব ফ্রন্টে লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরো দেশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে আনার পর তার এই বক্তব্য এসেছে। সৌদি আরবও ওই সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।

এসটিসি এমন একটি স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন প্রতিষ্ঠার পক্ষে, যা ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান পৃথক রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সমতুল্য হবে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর ইয়েমেন একীভূত হলেও সম্পদ বণ্টন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়ে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা, ইয়েমেনে পাল্টা সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে হুথিদের হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে রিয়াদকে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল না হলে সংঘাতের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন আরো বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

বাড়িতে তল্লাশির পর ইলহান ওমরের ঘোষণা, ‘চুপ করানো যাবে না’

দ্য গার্ডিয়ানঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক ও ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।গতকাল সোমবার সকালে ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার বাড়িতে এ তল্লাশি চালানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের অনুমোদন নিয়ে তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে।

তল্লাশির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইলহান ওমর অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করতে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প তাকে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচারের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। তবে তাকে চুপ করানো যাবে না।

বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আজ ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস আদালতের অনুমোদিত তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করেছে। এই অভিযান চলমান একটি কেন্দ্রীয় ফৌজদারি তদন্তের অংশ।’

তল্লাশি পরোয়ানার সুনির্দিষ্ট বিষয় কী, তা স্পষ্ট নয়। ইলহান ওমরের দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। হোয়াইট হাউস ও স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ মন্তব্যের জন্য বিচার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে।

তবে ফক্স নিউজ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেওয়া দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইলহান ওমরের অভিবাসনসংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে। ওমর শিশু থাকাকালে তার প্রয়াত বাবা এসব নথি পূরণ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ফক্স নিউজের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের জ্যাকেট পরা কয়েকজনকে দেখা গেছে।

সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ভিডিওটি ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির বাড়ির।

সোমবার তল্লাশির বিষয়ে সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তদন্তের বিষয়টি বিচার বিভাগের এখতিয়ার।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তাকে খুব সতর্কভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সব সময় তাকে পুরোপুরি অসৎ বলে মনে করেছি। তবে এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে ইলহান ওমর এবং তার পরিবারের অভিবাসনের ইতিহাস নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ করে আসছেন। এমনকি তার মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিল করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

ইলহান ওমর বরাবরই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার তাকে আক্রমণ করে বিষয়গুলোকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় এনেছেন। ২০১৯ সালে ইলহান ওমর ও কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপের অভিযোগের মধ্যে এই তল্লাশি নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে একজন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যের বাড়িতে এ অভিযান চালানোয় সরকারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ আরো জোরালো হতে পারে।

ইলহান ওমরকে তদন্তের ইঙ্গিত ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক দিন ধরেই দিয়ে আসছিলেন। গত শনিবার এক নির্বাচনী সমাবেশে ওমরের নাম ধরে আক্রমণ করার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘দেখা যাক কী হয়।’

তিনি আরো বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও তার প্রশাসনের লোকজন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন।

গত কয়েক মাস ধরেই ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা বলে আসছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, ইলহান ওমর তার ভাইকে বিয়ে করেছেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

বহু বছর ধরে প্রচারিত এই অভিযোগের দাবি হলো, ইলহান ওমর তার সাবেক স্বামীকে অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র পেতে সহায়তা করার জন্য বিয়ে করেছিলেন এবং ওই ব্যক্তি আসলে তার ভাই। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এর কয়েক দিন পর ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্তবিষয়ক প্রধান টম হোমান বলেন, তারা ইলহান ওমরের নথিপত্র সংগ্রহ করছেন। তিনি জানান, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের একজন জালিয়াতি তদন্তকারী বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। এই সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)-এর একটি বিভাগ, যা ঐতিহাসিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব পালন করে আসছে।

গত মার্চে ডানপন্থি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বেনি জনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা আসলে মনে করি, ইলহান ওমর নিশ্চিতভাবেই অভিবাসন জালিয়াতি করেছেন।’

এ বিষয়ে ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগী স্টিফেন মিলারের সঙ্গে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সম্প্রতি কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গত মাসে জনসনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তামন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিনও বলেন, ইলহান ওমরকে নিয়ে তদন্ত চলছে এবং এ বিষয়ে ‘কিছু একটা ঘটবে’।

মুলিনের অভিযোগ, ‘আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রে আনার উদ্দেশ্যে তিনি তার ভাইকে বিয়ে করেছিলেন। আমরা জানি, ওই ব্যক্তি এখন লন্ডনে থাকেন। আমরা মনে করি, পরিবারের অভিবাসনের পুরো বিষয়টির সঙ্গে আরো কিছু জড়িত থাকতে পারে। শুরুতে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার ক্ষেত্রেও বেআইনি কর্মকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে আমরা সবাই বিষয়টি তদন্ত করছি।’

এর কিছুদিন পর হোমান বলেন, চলমান ফৌজদারি তদন্ত নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন না।

তিনি বলেন, ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসকে তাদের তদন্ত চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে।’

সোমবার তল্লাশির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ইলহান ওমর লেখেন, ‘আমি ঠিক আছি। ভুলে গেলে চলবে না, রাজনৈতিক শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা এটি।’

তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প বছরের পর বছর ধরে ভিত্তিহীন মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।

তার ভাষায়, ‘রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানোর প্রচারণায় এটি সর্বশেষ পদক্ষেপ। আমাকে চুপ করানো যাবে না।’

ইলহান ওমর দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প ও অন্যদের ছড়ানো নানা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এর মধ্যে তার সাবেক স্বামী আহমেদ নুর সাইদ এলমি আসলে তার ভাই—এমন অভিযোগও রয়েছে।

দাবি করা হয়, অভিবাসনসংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের বিয়ে হয়েছিল। অভিবাসন জালিয়াতি যুক্তরাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধ; এ অপরাধের জন্য পাঁচ বছরের তামাদি মেয়াদ রয়েছে। ধর্মীয় রীতিতে বিচ্ছেদের কয়েক বছর পর ২০১৭ সালে ইলহান ওমর ও এলমির আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

গত মাসে নিউইয়র্ক পোস্ট এক অজ্ঞাতনামা ‘শীর্ষ অভিবাসন কর্মকর্তার’ বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, অভিবাসনের আবেদনে ওমর বা তার বাবা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে ট্রাম্প প্রশাসন তার নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে ইলহান ওমরের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এতে বলা হয়, নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় নথিতে উল্লেখিত ১৭ বছরের চেয়ে তার বয়স বেশি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ তিনি তার বাবা-মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। ইলহান ওমরের বাবা নিজেকে শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে তার মৃত্যুসংবাদে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার কথা বলা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে পরিচিত সোমালি-আমেরিকানদের একজন ওমর। বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের বর্ণবাদী আক্রমণের মুখে পড়েছেন তিনি।

সোমবার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইয়ংস্টাউনে নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইলহান ওমর ‘পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর একটি’ থেকে এসেছেন। এরপর তিনি সোমালিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত লোকজন ‘দেশ থেকে বের করে দাও’ বলে স্লোগান দেন।

গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, মিনেসোটা ‘সোমালি অভিবাসীদের দখলে চলে যাচ্ছে’। অথচ অঙ্গরাজ্যটির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সোমালি-আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

ট্রাম্প আরো লিখেছিলেন, ‘সোমালিরা যা করছে, তা করতে দেওয়া উচিত নয়।’ একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটির সমর্থকদের ‘পাল্টা লড়াই’ করার আহ্বান জানান তিনি।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউস থেকে সোমালি-আমেরিকানদের নিয়মিত অপমানজনক বক্তব্যের মুখে পড়তে হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে তাদের ‘আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, তারা ‘নরক থেকে এসেছে, অভিযোগ করে এবং শুধু গালাগাল করে’।

তিনি আরো বলেছিলেন, ‘তারা যেখান থেকে এসেছে, সেখানে ফিরে যাক এবং নিজেদের সমস্যার সমাধান করুক।’

বাড়িতে তল্লাশির পর ইলহান ওমরের ঘোষণা, ‘চুপ করানো যাবে না’
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর। ছবি: এপি

সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে অভিনয়, অপছন্দের সেই দৃশ্য নিয়ে কথা বললেন জেসিকা

প্রকাশ ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ সৌদি আরবের জেদ্দায় চলছে রেড সি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পঞ্চম আসর। গতকাল উৎসবের দ্বিতীয় দিনে কথা বলেছেন হলিউড তারকা জেসিকা অ্যালবা। এদিন নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অভিনয়জীবনের এক অস্বস্তিকর ঘটনা তুলে ধরেন অ্যালবা।

আলাপে আলাপে অভিনেত্রী কথা বলেন ২০০৫ সালে টিম স্টোরি পরিচালিত মার্ভেলের ছবি ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’-এ সু স্টর্ম চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে। অ্যালবা জানান, ছবির একটি দৃশ্যে সু স্টর্ম ব্রিজের ওপর সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় দৃশ্যমান হয়—এ দৃশ্যটি তাঁর সবচেয়ে অপছন্দের দৃশ্য।

‘ওই দৃশ্য ছিল ভয়ানক। বাস্তব জীবনে এটা আমাকে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ফেলেছিল। আমি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছি, আর নিজেও বেশ সংযত মানুষ। অনেক দিন ধরে ওই দৃশ্যের কথা ভাবলেই ভয় লাগত। এখনো ওটা আমাকে কষ্ট দেয়’, বলেন অ্যালবা।
তবে সবকিছুর পরও জেসিকা অ্যালবা সু স্টর্ম চরিত্রটিকে খুব ভালোবাসেন। তিনি বলেন, সেই সময়ের সুপারহিরো ও অ্যাকশন ছবিতে প্রচলিত লৈঙ্গিক ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিল এই চরিত্র।

অ্যালবার ভাষ্যে, ‘সে ছিল মা-সুলভ, দয়ালু—কিন্তু একই সঙ্গে দৃঢ়, নিজের মত স্পষ্টভাবে বলত। তার নৈতিক অবস্থান ছিল অসাধারণ। সেই সময় নারী চরিত্রগুলোকে সাধারণত উদ্ধার করে কেউ একজন; নারী ছিল সমস্যার কারণ বা সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায়। সু স্টর্ম ছিল আলাদা, আর আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম।’

ডাকোটা জনসনের পরিচালনায় নতুন ছবিতে
জেসিকা অ্যালবা জানান তিনি ডাকোটা জনসনের নতুন সিনেমা ‘আ ট্রি ইজ ব্লু’-তে অভিনয় করছেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে থাকছেন ব্রিটিশ গায়িকা চার্লি এক্সসিএক্স ও অভিনেত্রী ভ্যানেসা বার্গহার্ট।
‘এটা এক মা ও মেয়ের মাঝে স্বাধীনতা নিয়ে টানাপোড়েনের গল্প। সব ঠিক থাকলে হয়তো আগামী বছরই রেড সি ফেস্টিভ্যালে দেখাতে পারব’, বলেন তিনি।

নিজের প্রযোজনা
সম্প্রতি নিজের প্রযোজনা সংস্থা লেডি মেটালমার্ক এন্টারটেইনমেন্ট শুরু করেছেন জেসিকা অ্যালবা। তাঁর লক্ষ্য—হলিউডে বৈচিত্র্যের গল্পকে সামনে আনা। অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি বড় হয়েছি এমন এক সময়, যখন গল্পে খুব কম বৈচিত্র্য দেখা যেত। আমি হলিউডকে দোষ দিই না। অনেক সময় গল্প বলার ক্ষমতা থাকে সাদা পুরুষদের হাতে—তারা তাদের পরিচিত দৃষ্টিকোণ থেকেই গল্প বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।’
জেসিকা আরও বলেন, ‘এখনো নারীর নেতৃত্ব খুব কম, তবে নারী-নেতৃত্বাধীন গল্প যে শুধু নারীর জন্য—এটা ভুল ধারণা। নারীরা পরিবারের আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আমাদের গল্পগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সব সময় নারীর “উদ্ধার”-এর গল্প না দেখালেও চলে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে লাতিনো দর্শক বিনোদনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।’
ভ্যারাইটি অবলম্বনে

রেড সি উৎসবে জেসিকা অ্যালবা। এএফপি
রেড সি উৎসবে জেসিকা অ্যালবা। এএফপি

কিয়েভের পিঠে ট্রাম্পের ছুরি

আরটির বিশ্লেষণঃ বিশ্ব রাজনীতির জটিল খেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি চাল পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার ওপর থেকে হঠাৎ ডিজেল আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ওয়াশিংটন থেকে কিয়েভ পর্যন্ত বড় ধরনের ঝাঁকুনি তৈরি করেছে। ট্রাম্পের এই এক সিদ্ধান্তে কিয়েভে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া, ক্ষোভে ফুঁসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আর ওয়াশিংটনের অনেক রাজনীতিকও হতবাক। বিশ্লেষকরা হিসাব মেলাতে গিয়ে থমকে গেছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেই যে ওয়াশিংটন মস্কোকে কোণঠাসা করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আইন করল, হঠাৎ সেই ট্রাম্পই আবার রাশিয়ান ডিজেলের দরজা খুলে দিলেন কেন? বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি ট্রাম্পের পুরোনো খামখেয়ালি স্বভাব। কিন্তু ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

সব হিসাবের মূল কারণ লুকিয়ে আছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। সামনেই মার্কিন কংগ্রেসে মধ্যবর্তী নির্বাচন, আর হাতে সময় আছে এক মাসেরও কম। সেখানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ট্রাম্প প্রকাশ্যে উদাসীন ভাব দেখালেও তিনি ভালো করেই জানেন, কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারালে আগামী দুই বছর তাকে চরম রাজনৈতিক বিপাকে পড়তে হবে।

ভোটের আগে হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প ভোটারদের মন জয়ের পথ বেছে নিয়েছেন। বাজারে তেলের দাম কমাতে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, যার মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে। ট্রাম্প ভোটারদের দেখাতে চান, আমেরিকানদের কষ্ট কমাতে হোয়াইট হাউস দিনরাত কাজ করছে। পারস্য উপসাগরে তার নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই যে আজ এই তেলের সংকট, ভোটাররা যেন তা ভুলে যায়; এটাই তার কৌশল।

তিনি আগে কী বলেছিলেন আর এখন কী করছেন, তা নিয়ে ট্রাম্প বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন। কারণ তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে কথার গুরুত্ব শুধু বলার মুহূর্তটুকুর জন্যই, পরে তা মেনে চলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ইউক্রেনের গায়ে। সংঘাত শুরুর পর থেকে ওয়াশিংটনের প্রতিটি পদক্ষেপে ইউক্রেনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। কিন্তু এবার ট্রাম্প কিয়েভকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, যা ইউক্রেনের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন ট্রাম্পের এই পরিবর্তন?

ভেতরের খবর হলো, ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চরম অসন্তুষ্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি কেন্দ্রে ইউক্রেন একের পর এক ড্রোন হামলা চালানোয় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও জেলেনস্কি হামলা থামাননি। ট্রাম্প মনে করছেন, মার্কিন জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে তোলার জন্য জেলেনস্কিই দায়ী। আর ট্রাম্প কাউকে দায়ী মনে করলে তার সিদ্ধান্ত বদলানো অসম্ভব। ফলে কিয়েভের সব আপত্তি স্রেফ হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া হলো।

সমস্যা শুধু ডিজেল আমদানিতেই থেমে নেই। আসল ভয় অন্য জায়গায়। রাশিয়ার অভ্যন্তরে নিখুঁত হামলা চালাতে ইউক্রেনকে মূলত মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি কিয়েভকে এই গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দেবেন?

দেড় বছর আগেও জেলেনস্কির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প কয়েকদিনের জন্য এ সহায়তা বন্ধ রেখেছিলেন। তবে এবার যদি দীর্ঘমেয়াদে সাহায্য বন্ধ করা হয়, তবে তা হবে ওয়াশিংটন-ইউক্রেন সম্পর্কের চরম অবনতি। এর বার্তা হবে একটাই; আমেরিকা আর ইউক্রেনের পাশে নেই।

অবশ্য ট্রাম্প চাইলেই তা সহজে করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ ওয়াশিংটনে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী চায় কিয়েভকে সহায়তা বজায় রাখতে। এর আগেও ট্রাম্প সমঝোতার চেষ্টা করতে গিয়ে এই গোষ্ঠীর বাধার মুখে পড়েছিলেন। এবারও তিনি তাদের কতটা সামলাতে পারবেন, তা দেখার বিষয়। নির্বাচন পার হয়ে গেলে এই আলোচনার গুরুত্ব এমনিতেই কমে আসতে পারে।

এই পুরো ঘটনা থেকে রাশিয়ার জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ শেষ হলে আমেরিকা ও রাশিয়ার সম্পর্ক কেমন হতে পারে, তার একটি রূপরেখা এতে দেখা যাচ্ছে।

রাশিয়ার ওপর চাপানো হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা হয়তো কখনো পুরোপুরি উঠে যাবে না। আইন ও নীতিগত কারণে এগুলো তোলা খুবই জটিল। তবে আমেরিকা হাঁটবে এক বাস্তববাদী পথে। নিষেধাজ্ঞাগুলো কাগজে-কলমে ঠিকই থাকবে, কিন্তু প্রয়োগ করা হবে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী। যখন কোনো নিষেধাজ্ঞা আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থে আঘাত হানবে, তখন ওয়াশিংটন তা সাময়িক তুলে নেবে, আবার কাজ শেষে তা ফিরিয়ে আনবে।

এখানেই আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের মূল পার্থক্য। ইউরোপীয় দেশগুলো নীতি ও প্রতিশ্রুতির জালে নিজেদের এমনভাবে বেঁধে ফেলে যে, সেখান থেকে পিছিয়ে আসা তাদের জন্য কঠিন। অন্যদিকে আমেরিকানরা পুরোটাই বাস্তববাদী; তারা চরম শক্তিতে নীতির কথা বলতে পারে, আবার দরকার পড়লে এক মুহূর্তেই তা বদলে ফেলতে পারে।

ইউক্রেন সংঘাত এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতির নতুন মানচিত্র তৈরি করছে। আর ট্রাম্পের এই চাল বুঝিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতি বলে কিছু নেই, দিনশেষে আসল বিষয় হলো নিজের স্বার্থ!

কিয়েভের পিঠে ট্রাম্পের ছুরি
কিয়েভের পিঠে ট্রাম্পের ছুরি

যেভাবে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে হামলা চালায় হুতিরা

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কীভাবে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে রিয়াদে পৌঁছাল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলাটি প্রতিহত করতে না পারার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা।

সোমবার ওই কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রথমে ঝাঁকে ঝাকে ড্রোন ছোড়ে হুতিরা। এর মাধ্যমে রিয়াদের দিকে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর পথ তৈরি করা হয়। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা এসব তথ্য জানান, কারণ প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি তাদের নেই।

হুতিদের কাছে এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সৌদি আরবের ব্যবহৃত প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সেগুলো প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এক কর্মকর্তা জানান, হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা কেন দেওয়া যায়নি, সেটিও তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য। হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ৬২০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছেছিল বলে জানান তিনি।

এদিকে ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়লে দ্রুত ও বেদনাদায়ক জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে হামলায় অংশ নিলে তাদের এবং অঞ্চলটিতে থাকা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখাইতি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও বেদনাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।’

একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। বুখাইতি বলেন, ‘এসব স্থাপনা এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’

সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুখাইতি বলেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বার্তা দেওয়া যে তিনি আর নিরাপদ অবস্থানে থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে পারবেন না।

সূত্র : সিবিএস নিউজ
সৌদির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুতিরা। ছবি: এএফপি
সৌদির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুতিরা। ছবি: এএফপি

প্লেন ওড়ার ৩০ সেকেন্ড পর কেন মনে হয় নিচে পড়ে যাচ্ছি by শিউলী সুলতানা

তুমি কি প্লেনে চড়তে ভয় পাও, নাকি ভালোবাসো? তুমি যে দলেরই হও না কেন, একটা অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচিত। প্লেনটা যখন রানওয়ে ছেড়ে আকাশে ডানা মেলে, ঠিক তার ৩০ সেকেন্ড পর হঠাৎ মনে হয়, এই রে! প্লেনটা বুঝি নিচে পড়ে যাচ্ছে!

পেটের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগে, মনে হয় রোলার কোস্টারের ওপর থেকে নিচে নামছ। অথচ জানালা দিয়ে তাকালে দেখবে প্লেন কিন্তু ঠিকই ওপরে উঠছে। তাহলে কেন এমন মনে হয়? এটা কি কোনো বিপদ, নাকি মনের ভুল?

এই রহস্যের সমাধান দিয়েছেন সাইমন নামের একজন অভিজ্ঞ পাইলট। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্লাইম্যান সাইমন নামে পরিচিত। ২৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ক্যাপ্টেনের কাজই হলো মানুষের প্লেনভীতি দূর করা। চলো, তাঁর কাছ থেকেই শোনা যাক আসল ঘটনা।

প্লেন কি আসলে নিচে পড়ে

সাইমন বলছেন, ‘একদমই না। ওই পড়ে যাওয়ার অনুভূতিটা আসলে একটা ভ্রম বা সেনসেশন মাত্র। বাস্তবে প্লেন নিচে নামে না।’

ঘটনা হলো, টেক-অফের সময় প্লেন ইঞ্জিনের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে খাড়াভাবে ওপরে উঠতে থাকে। কিন্তু মাটি থেকে একটু ওপরে ওঠার পরই পাইলটরা ইঞ্জিনের শক্তি বা থ্রাস্ট কিছুটা কমিয়ে দেন। আর প্লেনের নাকটা মানে সামনের অংশটা সামান্য নিচু করেন। কেন জানো? যাতে প্লেন বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজের গতি বাড়াতে পারে।

এই সময়েই পাইলটরা ডানার বাড়তি অংশগুলো গুটিয়ে ফেলেন। একে বলা হয় ক্লিনিং আপ। এতে প্লেনটি আরও মসৃণ হয় এবং আরও দক্ষভাবে উড়তে পারে।

কেন মনে হয় প্লেন নিচে পড়ছে

সমস্যাটা প্লেনের নয়, সমস্যাটা আমাদের শরীরের। আমাদের কান এবং পেট এই হঠাৎ পরিবর্তনটা ঠিকঠাক মেনে নিতে পারে না। আমাদের কানের ভেতরে শরীরের ভারসাম্য রক্ষার একটা সেন্সর আছে। টেক-অফের সময় তীব্র গতিতে ওপরে ওঠার পর যখনই হঠাৎ প্লেনের ওপরে ওঠার হার বা ত্বরণ একটু কমে যায় এবং ইঞ্জিনের শব্দ কমে আসে, তখন আমাদের কান ভুল সংকেত পাঠায়। মস্তিষ্ক ভাবে, আমরা বুঝি নিচে পড়ে যাচ্ছি! একে বলা হয় একধরনের ভার্টিগো বা ভ্রম। দ্বিতীয় কারণ হলো, টেক-অফের সময় প্লেন তীব্র গতিতে ওপরে ওঠে। একই সঙ্গে ওপরে উঠি আমরাও। হঠাৎ প্লেনটি তার ওপরে ওঠার ত্বরণ কমালে, আমাদের শরীর জড়তার কারণে তখনো আগের গতিতেই ওপরে উঠতে চায়। এই পার্থক্যের কারণেই পেটের ভেতর রোলার কোস্টারের মতো সেই অদ্ভুত ওজনহীন অনুভূতি হয়।

পাইলটরা কেন এমন করেন

তোমার মনে হতে পারে, পাইলটরা কি আমাদের ভয় দেখানোর জন্যই এমন করেন? মোটেও না। এর পেছনে দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। প্রথমত, সারাক্ষণ সর্বোচ্চ শক্তিতে ইঞ্জিন চললে ক্ষতি হতে পারে। তাই ওড়ার কিছুক্ষণ পরই ইঞ্জিনের ওপর চাপ কমানো হয়। আর দ্বিতীয়ত, বিমানবন্দরের আশপাশে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের যেন প্লেনের বিকট শব্দে সমস্যা না হয়, সে জন্যই টেক-অফের পরপরই ইঞ্জিনের শব্দ ও শক্তি কমানো হয়।

তবে তোমরা যদি শিগগিরই প্লেনে ওঠো, তাহলে ভয় পেও না যেন। কারণ, ফ্লাইম্যান সাইমন অভয় দিয়ে বলছেন, ‘এই অনুভূতিটা খুব অল্প সময়ের জন্য হয়। এর পরপরই তুমি দেখবে প্লেন আবার গতি বাড়িয়ে তরতর করে ওপরে উঠছে।’

তাই প্লেন ওপরে ওঠার সময় ভয় পেও না। নিজেকে মনে করিয়ে দেবে, প্লেন নিচে পড়ছে না, বরং আরও দ্রুত এবং শান্তভাবে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তুমি নিরাপদেই আছ! এই সংকেত তোমার মস্তিষ্ক একবার বুঝে নিলে আর ভয় লাগবে না।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

প্লেন রানওয়ে ছেড়ে আকাশে ডানা মেলার ৩০ সেকেন্ড পর হঠাৎ মনে হয়, প্লেনটা বুঝি নিচে পড়ে যাচ্ছে
প্লেন রানওয়ে ছেড়ে আকাশে ডানা মেলার ৩০ সেকেন্ড পর হঠাৎ মনে হয়, প্লেনটা বুঝি নিচে পড়ে যাচ্ছে। ছবি: ডাগেন্স