Saturday, October 17, 2026

মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ নামের জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পের ঠাট্টা

মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ নামের ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এক নির্বাচনি সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট পদ নিয়ে ব্যঙ্গ করার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর রয়টার্সের।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডালটনে সমবেত জনতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের কারও নাম নিয়ে সন্দেহ হলে শুধু ‘মুহাম্মদ’ বলে ডাকবেন। ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬৫ শতাংশ। বলবেন, ‘হ্যালো, মুহাম্মদ। আমি বহু বছর ধরে এটা করছি। কখনো ভুল হয়নি।’

মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ ছেলেদের অন্যতম প্রচলিত নাম। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম অনুসারে অনেক মুসলিম পরিবার তাদের ছেলেদের এ নাম রাখেন।

জর্জিয়ার ডালটন মিউনিসিপ্যাল বিমানবন্দরের একটি উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গারে আয়োজিত সমাবেশে ইরান নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানই একমাত্র দেশ, যেখানে কেউ প্রেসিডেন্ট হতে চায় না।’ এরপর তিনি ‘মুহাম্মদ’ নামের কয়েকজনকে কল্পিতভাবে প্রশ্ন করার ভঙ্গি করেন, তারা প্রেসিডেন্ট হতে চান কি না। ২০২৪ সাল থেকে ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। ট্রাম্পের এই ঠাট্টায় সমাবেশে উপস্থিত জনতার মৃদু প্রতিক্রিয়া ছিল।

ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন মানবাধিকারকর্মী ও মুসলিম অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্পের বক্তব্যে মুসলিম, অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর এ ধরনের বক্তব্য আরও জোরালো করেছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে সোমালি ও মুসলিম বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের পাশাপাশি মুসলিম ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ এবং মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমরকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছেন তিনি। সোমালিয়ার শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ওমর দেশটির কংগ্রেস সদস্য।

সমাবেশে ট্রাম্প আবারও প্রতিশ্রুতি দেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করার লক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাত মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপ এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ দমনের উদ্যোগকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র : রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন রণতরি তাড়াতে ইরানের নতুন কৌশল

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে এমন কিছু ‘নতুন কর্মপরিকল্পনা’ রয়েছে, যা আগামীতে মার্কিন রণতরিগুলোকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরো দূরে সরে যেতে বাধ্য করবে। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া একথা বলেন।

শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকার দাবি করলেও, মার্কিন বাহিনী সেখানে আসার সাহস পায় না।

তিনি বলেন, ইরানের উপকূল থেকে ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থান করছে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ। ওমান সাগরেও বর্তমানে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

আকরামিনিয়া জোর দিয়ে বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা, গোয়েন্দা দক্ষতা ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই মার্কিন বাহিনী ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মেরামত করে পুনরায় সচল করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন সরঞ্জাম যুক্ত করা এবং আধুনিক যুদ্ধকৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে মার্কিন বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রত্যাহারে একটি যৌথ আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। ৪০ দিন পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: প্রেস টিভি

মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন রণতরি তাড়াতে ইরানের নতুন কৌশল
ছবি: প্রেস টিভি

এডেন বিমানবন্দরে হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা পেল যাত্রীবাহী বিমান

আল-জাজিরাঃ ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান সমর্থিত হুথিরা। গতকাল শুক্রবার চালানো এ হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে আঘাত হানে। তখন উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল একটি বিমান। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমানটি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে আঘাত হানে। এতে যাত্রী ও ক্রুদের কেউ হতাহত হননি বলে জানিয়েছে দেশটির পশ্চিমা সমর্থিত ‘সরকার।

এর এক দিন আগে একই শহরে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল হুথিরা।

ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, শুক্রবার এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তখন একটি বিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমানটি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার বা ১ হাজার ৬৪০ ফুট দূরে পড়ে।

এ ঘটনায় সব যাত্রী ও বিমানের ক্রুরা নিরাপদে আছেন বলে জানান তিনি। সম্ভাব্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এড়ানো যাওয়ায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আল-এরিয়ানি। বিমানবন্দরে এ হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির গুরুতর লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে হুথিরা বিমানবন্দরে হামলার কথা সরাসরি স্বীকার করেনি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার হুথিদের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সামরিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়, এডেন প্রদেশে বদর শিবিরে সৌদি বাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর এবং একটি অস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

ইয়েমেনে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের সদর দপ্তর এডেনে। দেশটিতে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান সমর্থিত হুথিদের মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াই চলছে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত আরো জোরালো হয়েছে।

মারিবে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির দাবি

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী গত শুক্রবার জানিয়েছে, রাজধানী সানার উত্তর-পূর্বে মারিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে তারা অগ্রগতি অর্জন করেছে। সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি বলেন, বিমান সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে সরকারি বাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোও নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা।

আল-নাজিলির দাবি, ২৪ ঘণ্টায় সরকারি বাহিনীর অভিযানে হুথিদের ৪৩০ জনের বেশি যোদ্ধা ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়েছেন। এ ছাড়া হুথিদের শতাধিক যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব দাবির বিষয়ে হুথিদের বক্তব্য জানা যায়নি।

যুদ্ধের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র তায়েজ প্রদেশেও লড়াই চলছে। শ্চিমা সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, সেখানে হুথিদের বেশ কয়েকটি বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। এতে হুথিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া তায়েজ এলাকায় হুথিদের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ ড্রোন পরিচালনাকারী দলকেও আটক করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তায়েজ ঘিরে ফেলেছে। শহরটি থেকে দক্ষিণে এডেন যাওয়ার প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যাপকসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এতে ওই অঞ্চলের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।

রিয়াদের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত

এদিকে শুক্রবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এই জোট।

সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে হামলায় উৎসাহিত করছে। তবে শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান বলেছে, হুথিদের কোনো সামরিক অভিযানে ইরান জড়িত নয়। একই সঙ্গে হুথি ও রিয়াদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও আবার তুলে ধরেছে দেশটি।

ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হচ্ছে গৃহযুদ্ধ

২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। হুথিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। আরবি এই নামের অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’।

এর পর ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট হস্তক্ষেপ করে। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বছরের পর বছর লড়াই চলে।

২০২২ সালে জাতিসংঘের সমর্থনে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে আসে। তবে গত জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি আরবের বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণার পর থেকে উত্তেজনা বেড়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে হুথিরা আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী মোখায় অগ্রসর হয়। এ সময় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অনুগত সেনারা শহরটি থেকে পিছু হটে। একই মাসে হুথিরা দেশটির পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের আরো কিছু এলাকা দখল করে নেয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাইয়ুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে যায়।

সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা অভিযানে ইয়েমেনের সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এডেন বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সৌদি আরবের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা আঞ্চলিক উত্তেজনাও বাড়িয়ে তুলেছে।

উল্লেখ্য, রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের একটি বড় অংশ এবং প্রধান সরকারি অফিসগুলোর নিয়ন্ত্রণ মূলত হুথিদের হাতেই রয়েছে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে হুথিরা সানা দখল করার পর থেকেই তারা সেখানে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো ও সরকার পরিচালনা করে আসছে। তবে, কূটনীতি এবং জাতিসংঘের দপ্তরে ইয়েমেনের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি ভোগ করে কথিত ‘সরকারি বাহিনী’, যাদের সঙ্গে হুথিদের সংঘাত চলছে।

এডেন বিমানবন্দরে হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা পেল যাত্রীবাহী বিমান
ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ছবি: এএফপি

হুথিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থিত ‘সরকারি বাহিনী’ কি টিকে থাকতে পারবে

আলজাজিরার বিশ্লেষণঃ ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনীর ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরবরাহপথ দখল এবং সরকারি শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এ অভিযানের সাফল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত এ অভিযানের ভবিষ্যৎ এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা, রসদ সরবরাহের সক্ষমতা ও বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।

সম্প্রতি ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ আল-মাশিকের কাছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। হামলার সময় দেশটির পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেও তিনি অক্ষত ছিলেন। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সরকারি বাহিনী ও তাদের সমর্থনে নিয়োজিত সরঞ্জাম লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের স্থল অগ্রযাত্রা সরকারি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগর উপকূল বরাবর দ্রুত অগ্রসর হয়ে হুথিরা মোখা বন্দর দখল করে। পশ্চিম তাইজ অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দরটি রসদ সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। পাল্টা অভিযানে সরকারি বাহিনী হারানো কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে পারলেও মোখা এখনো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় সরকারি বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়েছে।

তাইজ শহরের পরিস্থিতি এ সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। হুথিরা শহরটির সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সদর দপ্তর এডেনের সংযোগকারী প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আশপাশের পাহাড়ি এলাকার বিকল্প পথগুলোও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং গত সপ্তাহে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এ পরিস্থিতি বেসামরিক মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর গোলাবারুদ, জ্বালানি ও অতিরিক্ত সেনা সরবরাহেও বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহপথে বাধা সৃষ্টি হলেও অভিযান বন্ধ হবে না। পশ্চিম ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জয়েন্ট ফোর্সেসের মুখপাত্র কর্নেল ওয়াদাহ আল-দুবাইশের মতে, হুথিরা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। স্থল, নৌ ও আকাশপথ ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে রসদ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তবে এতে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং কোনো কোনো রণাঙ্গনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

বিকল্প সরবরাহপথ ও সৌদি সহায়তার ওপর নির্ভরতা

সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনী বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইয়েমেনের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ফয়সাল আল-মাজিদির ভাষ্য অনুযায়ী, শাবওয়া, মারিব, তাইজের হুথিমুক্ত এলাকা, লোহিত সাগর উপকূল এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন কেন্দ্রকে কাজে লাগিয়ে পৃথক রণাঙ্গনে রসদ পৌঁছানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কৌশলগত পাহাড়ি এলাকাগুলো দখলে রাখার চেষ্টা চলছে।

তাইজের আল-ওয়াজিয়াহ পার্বত্য জেলাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এলাকাটি লোহিত সাগর উপকূলের ওপর নজরদারির সুযোগ দেয় এবং পশ্চিম দিক থেকে তাইজ শহরের অবরোধ ভাঙার সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এ এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। তবে বিকল্প সরবরাহপথ থাকলেই যে দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত নয়। কারণ, প্রতিটি রণাঙ্গনে নিয়মিত গোলাবারুদ, জ্বালানি, চিকিৎসাসামগ্রী ও নতুন সেনা পাঠাতে হলে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা বজায় রাখা জরুরি।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা সরকারি বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, অক্টোবরের শুরু থেকে তাদের হামলায় হুথিদের শত শত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।

আল-দুবাইশের মতে, ইরানের সরবরাহ করা উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি সহায়তা ছাড়া ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পক্ষে বড় ধরনের অভিযান চালানো কঠিন। সৌদি বিমান হামলা হুথিদের শক্তিবৃদ্ধি ঠেকানো, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং স্থলবাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তাইজ অবরোধের সাম্প্রতিক পর্যায়ে সরকারি বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছাতে আগের মতো আকাশপথে সরবরাহের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে বড় বাধা বাহিনীগুলোর সমন্বয়হীনতা

সরকারি বাহিনীর জন্য শুধু রসদ সংকটই নয়, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাও বড় সমস্যা। হুথিবিরোধী শিবিরের বিভিন্ন সামরিক ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে পৃথক নেতৃত্ব, অর্থায়ন ও কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়েছে। ফলে কোনো এলাকায় হুথিরা দ্রুত অগ্রসর হলে অন্য বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে সরকারি বাহিনীর পরাজয়ের পেছনেও এ দুর্বলতা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ সমস্যা দূর করতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল জানুয়ারিতে সুপ্রিম মিলিটারি কমিটি (এসএমসি) গঠন করে। জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমির নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন হুথিবিরোধী বাহিনীকে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে এনে সরকারি সামরিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত করা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর এ উদ্যোগ আরো গুরুত্ব পায়।

ইয়েমেনের সামরিক বিষয়ে গবেষক আদনান আল-জাবারনির মতে, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আগের তুলনায় উন্নত হচ্ছে। তবে নতুন কমান্ড কাঠামো কার্যকর করতে সময় প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন, পৃথক অর্থায়ন এবং নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই কাগজে-কলমে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

পশ্চিমা সমর্থিত সরকার দীর্ঘমেয়াদে টিকবে কি না

ইরান সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর অভিযান এখন একাধিক রণাঙ্গনে ছড়িয়ে রয়েছে। লোহিত সাগর উপকূল, তাইজ শহরের আশপাশ এবং সানার পূর্বাঞ্চলে মারিব ও আল-জাওফ এলাকায় লড়াই চলছে। এসব এলাকায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করতে হলে বিপুল পরিমাণ রসদ, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। হুথিরা যদি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরবরাহকেন্দ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়াতে পারে, তাহলে সরকারি বাহিনীর পক্ষে একই সঙ্গে সব রণাঙ্গনে চাপ বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, সৌদি বিমান সহায়তা এবং বিকল্প সরবরাহপথের ব্যবহার সরকারি বাহিনীকে অভিযান অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, হুথিদের হামলা তাদের অভিযান থামানোর বদলে আরো জোরদার করতে পারে। তবে এ দাবি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো, তাইজের অবরোধ ভাঙা এবং মোখার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পুনর্দখলের সক্ষমতার ওপর।

সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী আপাতত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখলেও হুথিদের পরাজিত করে সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য অর্জন এখনো অনিশ্চিত। সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। সরবরাহপথ সচল রাখা, যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিভিন্ন বাহিনীকে কার্যকর একক কমান্ডের অধীনে পরিচালনা করতে পারাই হবে অভিযানের স্থায়িত্ব ও সাফল্যের প্রকৃত পরীক্ষা।

হুথিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থিত ‘সরকারি বাহিনী’ কি টিকে থাকতে পারবে
ইয়েমেনের পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: মিডল ইস্ট ফোরাম

গণহত্যার মুখে ভারতের মুসলমানরা by মেহেদী হাসান

ভারতের আসাম ও উত্তর প্রদেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্যানেল গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র। তিন সদস্যের ওই প্যানেলে যুক্তরাষ্ট্র, সার্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে একজন করে মোট তিনজন সদস্য নিয়োগ দেয় ওয়াশিংটন। তিন আইনজীবীর প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সদস্য ছিলেন স্টিফেন জে. র‍্যাপ। তারা ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ পর্যালোচনা করেন। চলতি বছরের ৩১ মার্চ প্যানেল এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নিপীড়ন, নির্যাতন, নির্বাসনসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। আসাম ও উত্তর প্রদেশ রাজ্যে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন, বর্ণবৈষম্য, জাতিগত নির্মূলের প্রস্তুতি মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল হতে পারে। এই দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা জাতিগত নির্মূলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের গঠন করা প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ১৩ এপ্রিল স্টিফেন জে. র‍্যাপের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণ। সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনের ভূমিকায় দ্য ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, ‘ভারতে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। তবে ২০১৪ সাল থেকে, যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন থেকে ভারতের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রা ধারণ করেছে। মুসলিমরা মারধরসহ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও মুসলিমদের নিয়মিত অমানবিক নির্যাতনের পথে ঠেলে দিতে সহায়তা করছেন। তারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেন। মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, মুসলিমদের ওপর এই সহিংস, ব্যাপক এবং পরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে।’

৭ মে ২০২৬ তারিখে ‘ইউএস কমিশন ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম হিয়ারিং অন রিলিজিয়াস ফ্রিডম কন্ডিশনস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই শুনানিতে স্টিফেন জে. র‍্যাপ প্যানেলের একজন সদস্য হিসেবে ভারত বিষয়ে তার লিখিত বক্তব্য জমা দেন।

স্টিফেন জে. র‍্যাপ তার প্রতিবেদনের শুরুতে লিখেছেন, ‘ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক অত্যাচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টান ও শিখরাও এর বাইরে নন।’

এরপর তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে গত এক দশক ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অত্যাচার স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় বেসরকারি গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের যোগসাজশ রয়েছে। এর সবকিছুই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম অমানবিকীকরণ এবং উসকানির এক বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে ঘটছে।’

র‍্যাপ লিখেছেন, “আমরা যে তথ্য পর্যালোচনা করেছি, তা থেকে দেখা যায়, আসাম ও উত্তর প্রদেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা সবচেয়ে গুরুতর নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন। এই রাজ্যগুলোজুড়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে নানা ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই রাজ্যগুলো সংখ্যালঘুবিরোধী উসকানি ও সহিংসতারও কেন্দ্রস্থল। এখানে ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন হিন্দু জঙ্গি গোষ্ঠী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), এর সহযোগী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল (হনুমানের সেনাবাহিনী) এবং বিভিন্ন ‘ভিজিল্যান্ট’ গ্যাং। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও এসব জঙ্গি দল মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। উভয় রাজ্যেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত ভিত্তি আমরা পেয়েছি। আমাদের ২০২২ সালের প্রতিবেদনের মতোই, এখানেও আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছি, বিশেষত এমন সব কর্মকাণ্ডের, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।”

আসামে সহিংসতার পাশাপাশি অন্তত ১৭ হাজার মুসলমানকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৫০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের সমতুল্য হতে পারে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বাংলাভাষী মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা কার্যকরভাবে সহিংস সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রতিক একটি বিশেষ উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। আসাম বিজেপির সরকারি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এই ভিডিওতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সহিংসতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক শট’ শিরোনামের ভিডিওটিতে শর্মার রাইফেল তাক করার আসল ফুটেজ বলে মনে হওয়া একটি দৃশ্য দেখানো হয়, যেখানে স্প্লিট স্ক্রিনে বন্দুকের নিশানায় থাকা মুসলিম পুরুষদের দেখা যাচ্ছিল। পর্দাজুড়ে অসমিয়া ভাষায় ঘৃণাসূচক স্লোগান ভেসে উঠছিল, যার মধ্যে ছিল, ‘কোনো দয়া নেই’ এবং ‘বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই’। এটি আমাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযুক্ত করার অভিজ্ঞতা এবং হুতুদের দশটি আদেশের কথা ভীষণভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বিশেষ করে, ‘তুতসিদের জন্য কোনো করুণা নেই’—এই আদেশটির কথা, যা আট লাখ তুতসি পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যার তিন বছর আগে কাঙ্গুরা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

স্টিফেন জে. র‍্যাপ আরো লিখেছেন, “আসাম ও উত্তর প্রদেশ উভয় রাজ্যেই পুলিশের দ্বারা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘এনকাউন্টার কিলিং’ ঘটেছে। এ ধরনের ‘এনকাউন্টার কিলিং’-এর শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যাই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। এ জন্য কোনো জবাবদিহি নেই এবং প্রায়ই হত্যাকারীদের প্রশংসা করা হয় ও পদোন্নতিও দেওয়া হয়। আসামে শর্মার সরকারের প্রথম তিন বছরে এ ধরনের ঘটনায় ৮৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সরকারের প্রথম ৭ বছরে ২৬৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।”

উত্তর প্রদেশের পুলিশও ‘অপারেশন ল্যাংলা’ নামে পরিচিত একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলে কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীকে হত্যা না করে বরং পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করে দেয়, যা ‘হাফ-এনকাউন্টার’ ঘটনা নামে পরিচিত। আমরা শুধু ২০২৪ সালেই এমন ৫৬ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পেয়েছি।

স্টিফেন জে. র‍্যাপ তার প্রতিবেদনে আসামে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার অধীনে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে গণহারে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

র‍্যাপ উল্লেখ করেছেন, ‘আসাম ও উত্তর প্রদেশ শুধু দেশব্যাপী সেই প্রবণতারই প্রতীক, যা বিহার, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ডের মতো অন্যান্য বিজেপিশাসিত রাজ্যে সরকারি কার্যকলাপ, আইন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে সংঘবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের এ ধরনের ঘটনার জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

র‍্যাপ পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, “সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। ইতিহাস

আমাদের শেখায়, গণসহিংসতার দিকে যাত্রা যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় বিভিন্ন বয়ান থেকে এবং ধীরে ধীরে এই ধারণার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে যে সহাবস্থান আর সম্ভব নয়। এর পরে আসে আইনি ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ, যা জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিবদ্ধ করে, অধিকারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু পরবর্তী সময়েই এই প্রক্রিয়াগুলো জাতিগত নির্মূল এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যায় রূপ নেয়, যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া ও মিয়ানমারে দেখেছি। এসব ঘটনাতেই অনেক ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পরই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।

‘জেনোসাইড ওয়াচ’ তাদের ১০ ধাপের প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারতের আসাম রাজ্যের মুসলিমদের পরিস্থিতিকে ‘পর্যায় ৭ : প্রস্তুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা আশঙ্কা করছে, এই অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ের সমান্তরাল।”

সরাসরি আক্রমণ পর্যায়

ভারতে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে, মুসলমানদের জন্য বর্তমানে দমবন্ধ করা পরিবেশ বিরাজ করছে। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নিপীড়ন ও ঘৃণা প্রচারের পর বর্তমানে সরাসরি হামলা, হত্যা ও তাদের স্থাপনা ধ্বংসের পর্যায় শুরু হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত সেপ্টেম্বর মাসে বিহার রাজ্যের দরভাঙ্গা জেলার মেকনা গ্রামে হিন্দুদের জমির ওপর দিয়ে একজন মুসলমানের লাশ নিয়ে যেতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এতে ওই জমি অপবিত্র হবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে আর কোনো দিন মন্দির নির্মাণ করা যাবে না।

সেপ্টেম্বরে কলকাতায় আরো দুটি ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, বিজেপি সরকার মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবাদকে কোন মাত্রায় নিয়ে যেতে চায়। সালাম দেওয়া ও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার কারণে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নারী আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানুকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের মুসলিম উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদী তরন্নুমকে ২৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে পদত্যাগে বাধ্য করেছে হিন্দুত্ববাদী ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ।

কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে মুসলিম কর্মকর্তাদের মেনে নিতে পারছে না বর্ণবাদী উগ্র হিন্দুরা। আদালতে বিচারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলিম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের অনেককে পদ ছাড়ার জন্য সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ির একটি আদালতে একজন মুসলিম বিচারকের সামনে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মুসলিমকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। লোকসভায়ও অনেক উগ্রবাদী হিন্দু সাংসদ মুসলিম সাংসদদের উপস্থিতি সহজে মেনে নিতে পারছেন না।

গরু পালন, গরু পরিবহন ও গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে মারার বর্বরতা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ৩ অক্টোবর রাতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাগডোগরার কাছে গরু পাচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দুই মুসলিম যুবককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে বিজেপির উগ্র গো-রক্ষক বাহিনী। এর আগে জুলাই মাসে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে একজন, জুন মাসে মহারাষ্ট্রের নাসিক এলাকায় একজন, মে মাসে আসামের বালিকুং জেলার শানিতপুরে দুজন এবং জানুয়ারিতে ওড়িশার বালাসোর জেলায় একজন মুসলিমকে গরুসংক্রান্ত ঘটনায় পিটিয়ে হত্যা করে উগ্র হিন্দুরা।

২০২৩ সালে রাজস্থানের জুনাইদ ও নাসির নামের দুই মুসলিম যুবককে হরিয়ানায় গাড়ির ভেতরে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে গো-রক্ষা গোষ্ঠীর হিন্দুরা। গরুসংক্রান্ত ঘটনায় তাদের হত্যা করা হয়।

২০২২ সালে নাজির আহমদ নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গরু পরিবহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান ১৪ জন হিন্দুত্ববাদী আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর জের ধরে রাষ্ট্রীয় বজরং দল ও গো-রক্ষা পরিষদ ওই মুসলিম নারী বিচারককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থেকে মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে সম্প্রতি কিছু তথ্য সামনে এসেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দেশটির গণমাধ্যম এসব বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়।

মানবাধিকার সংস্থা ও মুসলিম সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ভারতে প্রায় ২ হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধারা বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে অবস্থিত প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের একটি বড় অংশ এবং এর মিনার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মসজিদ ও মাদরাসা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও বস্তুত দেশটি বিজেপির নেতৃত্বে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতে উগ্র হিন্দুদের যেসব সংগঠন রয়েছে এবং তারা মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যেসব বর্বরতা চালাচ্ছে, তা যদি বাংলাদেশসহ কোনো মুসলিম দেশে ঘটত, তাহলে ভারত বিশ্বে সেই দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করত। চলমান মোদিবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা বোরা বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে একজন স্বৈরাচারী লুকিয়ে রয়েছেন।’

গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে মোদি একজন স্বৈরশাসক—এ কথা যেমন বিশ্ব জেনেছে, তেমনি বিশ্ব শিগগিরই জানতে পারবে, ক্ষমতাসীন বিজেপি আসলে হিন্দুদের একটি জঙ্গি ও ফ্যাসিবাদী দল, যাদের অধীনে মুসলমানরা বর্তমানে গণহত্যার পরিস্থিতির মুখোমুখি।

লেখক: সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

গণহত্যার মুখে ভারতের মুসলমানরা

ফিলিস্তিনিদের জলপাই ‘চুরি’র অনুমতি দিলেন ইহুদি ধর্মগুরু

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জমি থেকে জলপাই লুট করার অনুমতি দিয়ে ধর্মীয় ফতোয়া বা নির্দেশ জারি করেছেন প্রভাবশালী ইসরাইলি রাবি ডভ লিওর। এই ইহুদি ধর্মগুরুর দাবি, জলপাই সংগ্রহের মাধ্যমে ওই ভূমির ওপর ইহুদিদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রমাণিত হয়।

শুক্রবার জারি করা এই ধর্মীয় ফতোয়া ইসরাইলি টেলিভিশন চ্যানেল ১৩-এ প্রকাশিত হয়। পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে প্রভাবশালী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে পরিচিত লিওর দাবি করেন, ফিলিস্তিনিরা তাদের জমির বৈধ মালিক নন। তার যুক্তি হলো, তারা ইসরাইলি জনগণ কিংবা কোনো ইহুদির কাছ থেকে জমিগুলো কেনেননি; তাই এসব জমি আসলে ‘চুরি করা সম্পত্তি’।

ইহুদি ধর্মীয় আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে লিওর দাবি করেন, চুরির মাধ্যমে জমির মালিকানা হস্তান্তরিত হতে পারে না। সুতরাং, ফিলিস্তিনিদের জমি আসলে ‘ইসরায়েলি জনগণ’-এরই সম্পত্তি।

তিনি যুক্তি দেন, ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জমিতে জলপাইগাছ রোপণ করলেও তাতে জমি কিংবা উৎপাদিত ফসলের ওপর তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

লিওর আরো দাবি করেন, বছরের পর বছর জলপাইয়ের ফল ভোগ করার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিরা গাছ রোপণের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ পেয়ে গেছেন। ফলে জমি ও ফসল উভয়ই তার কথিত ‘প্রকৃত মালিকদের’ কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

তার এই ফতোয়া শুধু অবৈধ ইসরাইলি বসতির আশপাশের জমিতে সীমাবদ্ধ নয়। বসতি থেকে দূরবর্তী ফিলিস্তিনি এলাকাগুলোর জলপাইয়ের ফসল সংগ্রহেরও অনুমতি দিয়েছেন তিনি।

এমন সময় এই ধর্মীয় নির্দেশ দেওয়া হলো, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষক ও তাদের সম্পত্তির ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বাড়ছে। এসব হামলার মধ্যে রয়েছে কৃষকদের ওপর শারীরিক আক্রমণ, জমিতে প্রবেশে বাধা, জলপাইগাছ ধ্বংস এবং ফসল লুট।

প্রতি বছর অক্টোবরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম থাকে। এ সময় ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটে। চলতি মাসেও ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি তাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও অন্যান্য সম্পত্তিতে হামলার ঘটনা বেড়েছে।

ফিলিস্তিনি, ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করে আসছে, এসব সহিংসতা বন্ধে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। একই সঙ্গে হামলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, কৃষিজমি, যানবাহন ও অন্যান্য সম্পত্তি নিয়মিতভাবে এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গড়ে তোলা ইসরাইলি বসতিগুলো অবৈধ। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমির ওপর নিজেদের অধিকার বজায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন এবং জমি দখলের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করছেন।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

ফিলিস্তিনিদের জলপাই ‘চুরি’র অনুমতি দিলেন ইহুদি ধর্মগুরু
ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস করে রাখাইনে সেনাচৌকি!

মিয়ানমার সরকার খুব পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলি ধ্বংস করেছে। সেখানে সেনাচৌকি বসানোর জন্য এসব কাজ করা হয়েছে বলে খবর দিয়েছে জাতিসংঘ সমর্থিত সংস্থা ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম (আইআইএমএম)। তারা বলেছে, রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের একের পর এক গ্রাম এবং জমিজমা ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে সেনাচৌকি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মিয়ানমারের সেনারা। সোমবার এক রিপোর্টে এ তথ্য প্রকাশ করে আইআইএমএম।

তারা বলেছে, মিয়ানমার সরকার খুব পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের জমিজমা, সম্পত্তি নষ্ট করেছে। যদিও মিয়ানমার সেনার তরফে এই রিপোর্ট প্রসঙ্গে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। আইআইএমএম-এর রিপোর্টে আরও বলা হয়, সেনাঘাঁটি এবং সেনাশিবির বানানো হচ্ছে উত্তর রাখাইন প্রদেশে ইন দিনের গ্রামগুলিতে। নতুন করে রাস্তা, সেনার দফতর, হেলিপ্যাডও বানানো হচ্ছে। অনলাইন আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক রয়েছে নিউ ইয়র্কে। সেখানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তার আগেই এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যালোচনার গতিমুখ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (ওএইচসিএইচআর) এবং কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দফতর সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে নথিভুক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। 

mzamin

রয়টার্সের প্রতিবেদন: ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে উপসাগরীয় দেশগুলো

মিডল ইস্ট আইঃ ইরান ও তার মিত্রদের হামলায় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য চেপে যাচ্ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন ও কুয়েতে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও এসব দেশের দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিবরণের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অমিল রয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তর থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দরেও হামলার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ইরানের হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে সৌদি আরবও।

ইরান ও হুথিরা পাইপলাইন, জ্বালানি স্থাপনা এবং একটি ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। রয়টার্সের এই মূল্যায়ন উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তাদের দেওয়া বিবরণ সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, হুথিদের একটি ড্রোন হামলায় দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর ধাহরানে অবস্থিত সদর দপ্তরে ‘সীমিত অগ্নিকাণ্ড’ ঘটেছে। কিন্তু বুধবার রয়টার্স জানায়, হামলায় দপ্তরটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, আরামকোর সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসেরের কার্যালয়ও রয়েছে। ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়েছে। জানালা ও দরজা উড়ে গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিবরণের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতির ধারাবাহিক অমিল দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা

উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার কথা স্বীকার করলেও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছে। কিন্তু উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ব্যাপক। হামলার ধরন থেকেও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে হামলাকারীদের বিস্তারিত তথ্য ও নিখুঁত নিশানার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের ছাদে হামলা হয়েছিল। এতে কেন্দ্রটির চারটি চুল্লির একটিকে জরুরি ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। রয়টার্সকে একজন ইরানি কর্মকর্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা ও বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রটির অবস্থান সম্পর্কে ইরানের কাছে তথ্য ছিল।

কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় ইরানের হামলাতেও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানার প্রমাণ পাওয়া যায়। হামলায় গ্যাসকে তরলে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ সরঞ্জাম রাখা ‘কোল্ড বক্স’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া বিবরণের সঙ্গে বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির সবচেয়ে বড় অমিলের উদাহরণ হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান একাধিকবার বন্দরটিতে হামলা চালিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা করা হয়। কখনো কখনো মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পরও আবার হামলা চালানো হয়েছে।

গত ৩ মার্চ ফুজাইরা বন্দরে প্রথম হামলায় দুটি তেলের ট্যাংকে আগুন ধরে যায়। কয়েক দিন ধরে সেগুলো জ্বলতে থাকে। উপগ্রহচিত্রের তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানায়, দ্বিতীয় হামলায় বন্দরের একটি ‘ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ড’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ৬২টি পাইপলাইনের সমন্বয়ে তৈরি একটি স্থানান্তরব্যবস্থা। এর মাধ্যমে তেলের টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য জাহাজে তোলার স্থানে নেওয়া হয়।

আমিরাতের কর্মকর্তারা দুটি হামলারই ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছিলেন। তবে রয়টার্সের মূল্যায়নে দেখা যায়, এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রের মিল নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি আমিরাতের সরকারি ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমিরাতের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাত।’

রয়টার্স জানায়, মার্চে ফুজাইরা বন্দরে পরবর্তী হামলায় অন্য একটি ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেয় আমিরাত। মার্চের শেষ নাগাদ বন্দরটি পুরোপুরি সচল হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মে মাসে ইরান আবারও সেখানে হামলা চালায়। এবার একটি ড্রোন মার্চে প্রথম হামলার শিকার ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডের সঙ্গে যুক্ত পাইপলাইনে আঘাত হানে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুজাইরা বন্দর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে উপসাগরীয় দেশগুলো
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে জ্বালানি ডিপোর কাছাকাছি লাগা আগুন থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। ছবি: এএফপি

ইরানের নিখুঁত হামলায় বিপর্যস্ত উপসাগরীয় দেশ, চাপে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধপরিকল্পনা

রয়টার্সঃ উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে ইরান ও তাদের মিত্ররা। তেল রপ্তানির বন্দর, পাইপলাইন, গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানিশোধনাগার ও শিল্পকারখানাকে লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম অচল হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ ও রপ্তানি। কোথাও মেরামতে কয়েক মাস লাগছে, কোথাও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতির পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির তুলনায় অনেক দুর্বল অবস্থানে থেকেও ইরান কীভাবে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, এসব হামলা তার একটি ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমা হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশে অন্তত ৮৪টি অবকাঠামোগত স্থাপনায় ১৩৫টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন। এসব হামলার কয়েকটি চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বাহিনী ও তেহরানের নিয়ন্ত্রণাধীন ইরাকি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।

হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বেড়েছে তেলের দাম। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেশটিকে তার প্রতিবেশীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টির সুযোগ দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও তেহরানের প্রভাব বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও দর-কষাকষিতেও এ পরিস্থিতি ইরানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এসব হামলার কথা জানালেও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। এগুলো অচল হয়ে পড়ায় পুরো স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কোথাও একটি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থায় একের পর এক সমস্যা তৈরি হয়েছে।

কিছু লক্ষ্যবস্তু ভবনের ছাদ বা রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য তৈরি আচ্ছাদনের নিচে থাকায় মহাকাশ থেকে সহজে দেখা যায় না। কোনো কোনো লক্ষ্যবস্তুর বিস্তৃতি মাত্র কয়েক মিটার। আবার কিছু সরঞ্জামের গুরুত্ব বোঝার জন্য তেল পরিশোধন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কিংবা ধাতু গলানোর মতো বিশেষায়িত বিষয়ে জ্ঞান প্রয়োজন।

রয়টার্স জানিয়েছে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে না পারায় সব ক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে বারবার দেখা গেছে, ইরানের হামলা ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এবং যেসব সরঞ্জামে আঘাত করা হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রয়টার্সের অনুসন্ধানের ফলাফল পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরের সাবেক বিশেষ অভিযানবিষয়ক বিমান হামলা সমন্বয়কারী রায়ান স্টিভেনস। তার মতে, এসব হামলায় ইরানের নিখুঁত নিশানা, লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের জ্ঞান এবং ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। দেশটি ইরানের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর সক্ষমতাকেও বারবার খাটো করে দেখিয়েছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সরকার প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন আকাশে প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরানের হুমকি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে।

তার ভাষ্য, গত সাত মাসে দশের অধিক প্রতিবেশী দেশ এবং শত শত বাণিজ্যিক জাহাজকে নির্বিচার লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ইরানের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের মিশন, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে, রয়টার্সের বিস্তারিত মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়ে ইরান আবারও প্রমাণ করেছে, বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও দেশটি টিকে থাকতে পারছে। এর আগে রয়টার্সের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অবৈধ আয় সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান কীভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময়ব্যবস্থা ও অবৈধ জুয়া নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধের মধ্যে দমন-পীড়ন বাড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো কোনো স্থাপনায় প্রায় প্রতিদিন হামলা হয়েছে। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের মেরামত ব্যয় ও রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম গলনাগার এক দিনেই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরা বন্দর। হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে অবস্থিত এই বন্দর দিয়ে হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানের অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হলে ফুজাইরা বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফুজাইরা বন্দরে অন্তত ১৯ বার হামলা চালিয়েছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। এসব হামলায় বন্দরের কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম অচল হয়ে পড়ে।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ফুজাইরা বন্দরের কাছে একটি সড়ক থেকে হামলার দৃশ্য দেখেছিলেন এক বিদেশি ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমরা ড্রোনগুলোকে আসতে দেখছিলাম। হেলিকপ্টার থেকে সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টাও দেখেছি।’

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা হামলার ছবির সঙ্গে তার বর্ণনার মিল পাওয়া গেছে। ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘তারা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠাচ্ছিল। এর মধ্যে একটি বা দুটি প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়েছিল।’

এই অনুসন্ধানের জন্য রয়টার্স অবকাঠামোগত হামলা সম্পর্কে জানেন—এমন ৩৬ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। হামলার ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছে। সরকারি বিবৃতি এবং রাডার, দৃশ্যমান আলো ও আবহাওয়াবিষয়ক উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলার সময় ও ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করেছে। প্রকাশের আগে অনুসন্ধানের ফলাফল হামলার শিকার স্থাপনাগুলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছেও পাঠানো হয়।

রয়টার্সের হিসাবে, হামলার পর অন্তত ৩৪টি সরকারি বিবৃতিতে ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশে প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করা হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছেই অবস্থান করছে। প্রতিরক্ষাবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনস উপগ্রহচিত্রে ফুজাইরা বন্দরের প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত করেছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানের বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বলেছে, ‘ইতিহাস দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা প্রায়ই এ অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে যায় এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।’

সরকার আরো বলেছে, বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে উত্তেজনা কমানোর নতুন উদ্যোগ জরুরি।

উপসাগরীয় দেশগুলো হামলার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্যও সীমিত রাখছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবে হামলার পর নির্দিষ্ট ধরনের ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং ছড়িয়ে দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। এসব দেশে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন ব্যবহার করেও হামলার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ সীমিত করা হয়। তবে যুদ্ধ চলাকালে রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হামলার দৃশ্যের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে।

তেলবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফরেন রিপোর্টসের প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ রিড বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নকে এমনভাবে বিবেচনা করছে, যেন তা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য সীমিত রেখেছে। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিয়েছে কেবল বাহরাইন সরকার। তাদের বক্তব্য, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তদন্তের স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা বজায় রাখা এবং হামলার পরের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে যাতে নতুন হামলার পরিকল্পনা করা না যায়, সে জন্য এসব বিধিনিষেধ রয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় হামলার পাশাপাশি ইরান সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শক কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর শত শত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য বিমানও।

রয়টার্সের অনুসন্ধানের ফলাফল ও ছবি পর্যালোচনা করেছেন সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের ১১ জন অভিজ্ঞ ব্যক্তি, সাবেক মার্কিন সেনা স্টিভেনস, নিরাপত্তা খাতে কর্মরত আরেক সাবেক মার্কিন সেনাসদস্য এবং সন্ত্রাসবাদ দমন ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে অভিজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাদের ১৪ জনের সবাই বলেছেন, অসংখ্য বড় অবকাঠামোগত স্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি মূলত আকাশ থেকে এলোমেলোভাবে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষের কারণে হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা অত্যন্ত অসম্ভাব্য। তাদের অনেকে বিস্ফোরণের দৃশ্যমান চিহ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। শুধু ধাতব কোনো বস্তু আঘাত করার মতো ক্ষতি নয়, বরং লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্বও তাদের এই মূল্যায়নের ভিত্তি।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এমন একটি শান্তিচুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তাদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের যুবরাজ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প তাতে সাড়া দেননি।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এই পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়ে।

সৌদি আরবের দাবি, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলা চালিয়েছে।

এর চেয়েও বড় প্রভাব ফেলেছে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় ইরানের হামলা। এতে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

মার্চে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি বলেছিলেন, ইরানের দুটি হামলায় ধ্বংস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি স্থাপনার কোল্ড বক্স পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত চারটি অবকাঠামোগত স্থাপনা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে প্রায় এক বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। রাস লাফান এলএনজি স্থাপনা ছাড়াও রয়েছে কাতারের পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইডস শোধনাগার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স এবং আল তাওয়েলা অ্যালুমিনিয়াম গলনাগার। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিবৃতি ও জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আইআইআর এনার্জির মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডিএনওসি) প্রধান নির্বাহী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী সুলতান আল জাবের মে মাসে আটলান্টিক কাউন্সিলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুই ছিল বেসামরিক—বিমানবন্দর, টার্মিনাল, শোধনাগার, গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা, বিপণিবিতান এবং সবশেষে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।’

তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আমাদের জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানছে।’

কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকের সরকার এবং এডিএনওসি রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

ফুজাইরা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি গোপন মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, নিজেদের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করলে ইরান কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ‘বেছে নেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলাই উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।’

যুদ্ধের প্রথম দুই মাসে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে ফুজাইরা বন্দর। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম তিন মাসে বন্দরটি কখনো হামলার শিকার হয়েছে, কখনো মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিল।

ফুজাইরা বন্দরে প্রথম হামলার খবর জানানো হয় ৩ মার্চ। দুই দিন পরও উপগ্রহচিত্রে তেলের ট্যাংকগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। দুটি তেল সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

৯ মার্চ দ্বিতীয় হামলার খবর জানানো হয়। এতে শুধু জ্বালানি পণ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, বন্দরের প্রথম ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডটিও ধ্বংস হয়েছে। ৬২টি পাইপলাইনের সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি জাহাজে তোলার স্থানে নেওয়া হয়।

আমিরাতের কর্মকর্তারা প্রথম দুটি হামলার ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছিলেন। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানের ফলাফল পর্যালোচনা করা ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি বলেন, ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ পড়ে গিয়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন স্থানান্তরব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—এ ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তার ভাষায়, ‘এটি মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাতের মতো।’

১৪, ১৬ ও ১৭ মার্চ ফুজাইরা বন্দরে আরো হামলা হয়। এসব হামলা শুরু হয়েছিল ইরানের খারগ দ্বীপের তেল রপ্তানি টার্মিনালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর। রয়টার্সের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ, চারজন বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা এবং ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানেন এমন একজনের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার একটিতে বন্দরের দ্বিতীয় ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দ্বিতীয় ম্যানিফোল্ডের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আগে প্রকাশিত হয়নি। তবে এর ফলে ফুজাইরা বন্দরে তেল ওঠানোর কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছিল, তা বোঝা যায়। জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ শুরু হওয়া সপ্তাহে বন্দরটি থেকে দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ কমে ৪ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। ২০২৫ সালে বন্দরটির দৈনিক গড় রপ্তানির তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম।

যুদ্ধের প্রভাবে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহমূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার বা তারও বেশি হয়ে যায়। ফেব্রুয়ারিতে এই দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আগের দিনের ব্রেন্টের সমাপনী মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলার বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসবাদ দমনবিষয়ক নীতির সাবেক উপসহকারী মন্ত্রী থমাস ওয়ারিক বলেন, ইরানের কাছে তেলশিল্প সম্পর্কে জানেন—এমন অনেক লোক রয়েছেন। একই সঙ্গে দেশটির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে তা নিক্ষেপ করতে জানেন, এমন লোকও রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ছিল ইরানের। এর মধ্যে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রও ছিল, যা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা কঠিন। পাশাপাশি ইরানের ড্রোনশিল্পও বেশ উন্নত। যুদ্ধের আগে দেশটি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরিতে সক্ষম ছিল। এর মধ্যে বিস্ফোরকবাহী শাহেদ ড্রোন ছিল অন্যতম প্রধান।

২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর অন্তত ছয়টি সরকারি বিবৃতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ ইরানের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী করেছে। কোনো বিবৃতিতেই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হয়নি।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র হকিন্স বলেন, ‘ইরানের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আঞ্চলিক অংশীদারদের পাশে ছিল এবং এখনো রয়েছে। সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার হামলাকারী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এতে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।’

মার্চের মাঝামাঝি হামলার পর ফুজাইরা বন্দরে মেরামতকাজ শুরু হয়। উপগ্রহচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর কাছে ক্রেন দেখা যায়। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে বন্দরটির সাপ্তাহিক রপ্তানি বেড়ে দৈনিক হিসাবে ৩২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। ২০১৩ সালে বন্দরটির তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ রেকর্ড।

কিন্তু এরপরও হামলা বন্ধ হয়নি। রয়টার্সের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ এবং ওয়ারিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ৬ এপ্রিলের হামলায় এডিএনওসির তেল পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম রাখা একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর ৪ মে ড্রোন হামলায় প্রথম ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডের সঙ্গে যুক্ত একগুচ্ছ পাইপ ভেঙে যায়। মার্চে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এই ব্যবস্থার ওপর হামলার ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথটি আবারও আগুনে জ্বলে ওঠে।

তবে আরো বড় সমস্যা তৈরি হয় পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হামলার দিন থেকে ১ জুন পর্যন্ত ফুজাইরা বন্দর থেকে মাত্র একটি জাহাজে পণ্য পাঠানো হয়েছিল। পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগে।

৪ মে হামলার কথা স্বীকার করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এরপর ১৭ মে ইরান আবার দেশটির বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্তত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে।

জুনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আটকে থাকা ইরানের অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড় করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল বলে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়েছিল। ওই সূত্রগুলোর দুজন বলেছিলেন, এর বিনিময়ে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছিল।

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘ইরানের কোনো জব্দ করা অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে ছাড় করা, স্থানান্তর করা বা স্থানান্তরে সহায়তা করা হয়নি।’

আগস্টে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তার দাবি, এর সঙ্গে আমিরাতে হামলা বন্ধের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

তার ভাষায়, এটি ছিল ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের আচরণ সংশোধনের’ ফল।

১৭ মে-র পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবকাঠামোয় নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে সেপ্টেম্বরে সমুদ্রে এডিএনওসির তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলার মধ্যেই ফুজাইরা বন্দর থেকে মোট রপ্তানি দৈনিক হিসাবে রেকর্ড ২৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছায়। তখন অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি—দুই ধরনের পণ্যই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে পরিবহন করা হচ্ছিল।

ইরানের গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশাধিকার রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছবি ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে ইরান। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন তিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাদের একজন ইরানের এবং দুজন উপসাগরীয় অঞ্চলের।

তথ্য আদান-প্রদান সম্পর্কে জানতে চাইলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ‘আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ধারাবাহিকভাবে ও কঠোরভাবে পালন করে’। রাশিয়া এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

ওই তিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা এবং সেখানে হামলার শিকার বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রটির অবস্থান সম্পর্কেও ইরানের কাছে তথ্য ছিল।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাবি, ১৭ মে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানা ড্রোনটি ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাঠানো তিনটি ড্রোনের একটি ছিল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি চুল্লির একটিকে জরুরি ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়।

রয়টার্সের হাতে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো স্পষ্ট উপগ্রহচিত্রটি ধারণ করা হয়েছিল ১৬ জুন। এতে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থাকা একটি ভবনের ছাদে দুটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভবনটি একটি চুল্লি থেকে প্রায় ১৩০ মিটার দূরে অবস্থিত।

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, এ হামলা থেকে বোঝা যায়, হামলাকারীদের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল। ২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় তিনি বলেন, ‘এর অর্থ, যারা হামলার পেছনে ছিল বা আছে, তারা ঠিক কী করছে, তা ভালোভাবেই জানত।’

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী এমিরেটস নিউক্লিয়ার এনার্জি করপোরেশন ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেনি। তবে সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্ধারিত কার্যপ্রণালি যথাযথভাবে কাজ করেছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বজায় ছিল। কেউ আহত হননি, তেজস্ক্রিয় পদার্থও ছড়ায়নি। বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক ছিল এবং জনসাধারণ বা পরিবেশের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি। আইএইএ এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

কুয়েতের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা হামলা ঠেকাতে যথেষ্ট হয়নি। যুদ্ধ শুরুর পরপরই দেশটির জ্বালানি রপ্তানির অবকাঠামো ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করে ইরান। কুয়েত সিটির প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে আহমাদি গভর্নরেটের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়। এ এলাকায় রয়েছে মিনা আল-আহমাদি ও মিনা আবদুল্লাহ শোধনাগার, শুয়াইবা বন্দর এবং শুয়াইবা বিদ্যুৎ ও পানিশোধনকেন্দ্র।

যুদ্ধের প্রথম দিন শুয়াইবা বন্দরের কাছে ধ্বংসাবশেষ পড়ে যাওয়ার পর কুয়েত বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখে। তিন সপ্তাহের মধ্যে পাশের মিনা আল-আহমাদি ও মিনা আবদুল্লাহ শোধনাগারেও হামলা হয়।

ট্যাংকারের চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে কুয়েত এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলও রপ্তানি করতে পারেনি। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল তাওয়েলা অ্যালুমিনিয়াম গলনাগারেও হামলা চালানো হয়। অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে বিশ্বের নয়টি গলনাগারে ৪২ বছর কাজ করা এবং এডিএনওসির ওই স্থাপনা পরিদর্শন করা বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক ডেভিস রয়টার্সের পাওয়া উপগ্রহচিত্র পর্যালোচনা করে জানান, হামলায় স্থাপনাটির বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তিনটি গলন-উৎপাদন লাইনের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি লাইনে শত শত পাত্রে অ্যালুমিনিয়াম গলিয়ে তরল ধাতু তৈরি করা হয়।

ডেভিসের মতে, একটি উৎপাদন লাইনে হামলা হলে বাকি দুটি লাইন সচল থাকতে পারত। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘এটা সত্যিই দুঃখজনক। এটি অসাধারণ একটি স্থাপনা।’

এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওই গলনাগার এবং একই সপ্তাহান্তে বাহরাইনের আরেকটি গলনাগারে তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতির হামলার পর বিশ্ববাজারে অ্যালুমিনিয়ামের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

বাহরাইন সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, বিদ্যুৎ, পানি, যাতায়াত ও মানুষের জীবিকার ওপর নির্ভরশীল স্থাপনাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

দেশটির সরকার আরো বলেছে, বাহরাইনে বসবাসকারী ও ভ্রমণকারী সবার নিরাপত্তা তাদের অগ্রাধিকার। হামলার ঘটনা ঘটলে জীবন রক্ষা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

কুয়েতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহব্যবস্থায় হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্চে প্রথম প্রকাশ্যে ইরানের পানির সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লোর মতে, শেষ পর্যন্ত ইরানই প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে সেই হুমকিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

মরুভূমির দেশ কুয়েত পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য পানিশোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে পানযোগ্য করতে বিপুল তাপ ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনেক পানিশোধনাগার উপকূলীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২ মার্চ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে কুয়েতের আটটি যৌথ বিদ্যুৎ ও পানিশোধনকেন্দ্রের অন্তত চারটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। কোনো কোনো স্থাপনায় একাধিকবার হামলা হয়েছে। জুলাইয়ে টানা চার দিনের একটি সময়ে কুয়েত সরকার যেসব স্থাপনাকে ‘বেশ কয়েকটি’ পানিশোধনাগার বলে উল্লেখ করেছিল, সেগুলোর ওপর হামলা হয়। এর মধ্যে একটি স্থাপনায় ওই অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তত দুবার আঘাত হানা হয়।

উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ শুয়াইবার বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চলে অন্তত ১৩টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

লো বলেন, পানিশোধনাগার ছাড়া কুয়েতের টিকে থাকার মতো প্রাকৃতিক পানির উৎস নেই।

তার ভাষায়, ‘আপনি যদি তাদের পানিশোধন সক্ষমতার যথেষ্ট অংশে হামলা করেন, তাহলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের পানির সংকট দেখা দিতে পারে।’

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুয়েত সরকার নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানায়। এ জন্য ‘যৌথ দায়িত্ববোধের চেতনায়’ সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়।

জ্বালানি স্থাপনার বাইরে বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষভাবে বেশি হামলা হয়েছে। হুথিদের দায়ী করা একটি হামলায় শনিবার সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১২ জন নিহত হন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটিই ছিল এসব হামলার মধ্যে প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা।

কুয়েতের বিমানবন্দরে আটবার হামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলা হয়েছিল আগের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল মেরামত করে পুনরায় চালুর মাত্র দুই দিন পর।

ডিজিটাল অবকাঠামোও হামলা থেকে রেহাই পায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজনের তথ্যকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত করা সম্ভব না হওয়ায় বাহরাইনে ছয় মাস পরও সেবা বন্ধ ছিল। রয়টার্সের অনুসন্ধান সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করেনি অ্যামাজন।

তবে ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতির কথা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা ‘আঞ্চলিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে’।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল তাওয়েলা গলনাগারে হামলায় মোট ১ হাজার ২৬২টি অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হামলার দুই মাস পর প্রথম সেলটি আবার চালু করা সম্ভব হয়। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ নাগাদ মোট সেলের মাত্র এক-চতুর্থাংশ চালু করা গিয়েছিল। উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোও ধারাবাহিক হামলার মুখে পড়েছে। দেশটির তেল ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা কূপ থেকে শুরু হয়ে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন, শোধনাগার ও বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি অংশই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। কয়েক দশক ধরে এ দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে ১৯৮৩ সালের সিআইএ মূল্যায়নও রয়েছে।

সৌদি আরব বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ শতাংশ উৎপাদন করে। দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যালও উৎপাদন করে। তাদের তেল রপ্তানির প্রায় পুরোটাই দুটি প্রধান বন্দরের মাধ্যমে হয়। সাধারণত সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি হয় পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত রাস তানুরা বন্দর দিয়ে। বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত কিং ফাহদ শিল্পবন্দর থেকেও তেল রপ্তানি করা যায়।

যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর এবং সেখানে তেল পৌঁছানোর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। তবে লোহিত সাগরের এ বন্দর থেকে যাত্রা করা অধিকাংশ জাহাজকে ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং সংকীর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়।

শিল্প খাতের দুটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্চ ও এপ্রিলে ইরান সীমান্ত থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরে অন্তত দুবার ড্রোন হামলা হয়।

আইআইআর এনার্জির জ্বালানি গোয়েন্দা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলারি স্টিভেনসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ মার্চ ড্রোন হামলায় সৌদি আরামকো মোবিল রিফাইনারি লিমিটেডের ইয়ানবু শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত শোধনাগারটির উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশে সীমিত ছিল। ওই সময়ের কাছাকাছি ধারণ করা উপগ্রহচিত্রে ইয়ানবুতে আগুনে পোড়া দাগ দেখা গেলেও শোধনাগারের ঠিক কোন অংশে আঘাত লেগেছিল, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে লোহিত সাগর এলাকায় হামলা কমে আসে। কিন্তু ১৩ জুলাই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডাররা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরঞ্জাম নিয়ে ইয়েমেনে যান বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল।

এর পরদিন ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেন। রয়টার্সের দৃশ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোর অন্তত তিনটি সেতু ও একটি সুড়ঙ্গে হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বন্দর আব্বাস ইরানের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর।

এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবে হামলা চালায়। সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো তখন ব্যাপকভাবে হামলার শিকার হয়। ইরান অবশ্য হুথিদের কর্মকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেছে। হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুথিরা। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেননি হুথি মুখপাত্র।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৫ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইয়েমেন সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত জাজান শোধনাগারে অন্তত চারবার হামলা হয়। প্রথম হামলায় শোধনাগারের ট্যাংক সংরক্ষণ এলাকা এবং পাশের ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কমপ্লেক্সে তেলকে গ্যাসে রূপান্তর করে শোধনাগারের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

স্টিভেনসন ও আরামকোর কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন এমন দুজনের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর জাজান শোধনাগারের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

কেপলারের তথ্য বলছে, ২৪ জুলাইয়ের পর থেকে শোধনাগারটি থেকে মাত্র একটি জাহাজে পণ্য তোলা হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং প্রধান তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আরামকোর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রও রয়েছে।

যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসের বেশির ভাগ সময় সৌদি আরবের দৈনিক তেল উৎপাদন ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে ছিল। যুদ্ধের আগে তা ছিল এক কোটিরও বেশি ব্যারেল। বর্তমান দামে এই উৎপাদন হ্রাসের কারণে দেশটির ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব হারানোর হিসাব পাওয়া যায়।

এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় পশ্চিমা জ্বালানি কোম্পানিগুলো যৌথ উদ্যোগে সৌদি আরবে বিভিন্ন স্থাপনা পরিচালনা করে। হামলার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি ডলার। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি আরামকো, এক্সনমোবিল ও শেল।

৭ সেপ্টেম্বর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হামলার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘বিষয়টি সহজ: তেল ও গ্যাস উৎপাদনের শৃঙ্খল বিস্তৃত, সেখানে পৌঁছানো সম্ভব এবং তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব জলসীমা ও স্থাপনায় থাকা মার্কিন তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোও একই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

এর তিন দিন পর সৌদি মরুভূমিতে তিনটি পাম্পিং স্টেশনে আকাশপথে হামলা হয়। এর একটিতে ভয়াবহ আগুন লেগে সেটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ফলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

এ হামলায় হরমুজ প্রণালির বিকল্প আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথও বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে ইরানের অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে দেশটিকে দুর্বল করার যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখার প্রচেষ্টাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

ইরানের নিখুঁত হামলায় বিপর্যস্ত উপসাগরীয় দেশ, চাপে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধপরিকল্পনা
ছবি: রয়টার্স

ইসরাইলের নির্বাচনে ক্ষমতার চাবিকাঠি হতে পারেন আরব নেতা আব্বাস

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ ইসরাইলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন আরব রাজনীতিক মানসুর আব্বাস। একবার নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। এবারও সেই লক্ষ্য সামনে রেখে মধ্য-বামপন্থি ইহুদি নেতা ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিৎজের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন আব্বাস। তবে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার যে কৌশল তিনি নিয়েছেন, তা নিয়ে আরব ও ইহুদি—দুই পক্ষের রাজনীতিকদেরই সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রচারেও বারবার উঠে আসছে মানসুর আব্বাসের নাম। তার দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আমের নেতা আব্বাসকে কেন্দ্র করে ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করছেন নেতানিয়াহু। তার প্রচারের বক্তব্য, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে পরবর্তী সরকারে প্রকৃত ক্ষমতাধর হয়ে উঠবেন আব্বাস। তিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম চালিকাশক্তি।

তবে আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারের সঙ্গে পশ্চিম তীর ও গাজার চেয়ে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যার সম্পর্ক বেশি। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব। তাদের বড় সমস্যা সহিংস অপরাধ, অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং আবাসনের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি।

নেতানিয়াহুর ধারাবাহিক আক্রমণের পেছনে নির্বাচনে আব্বাসের সম্ভাব্য ভূমিকা বড় কারণ। ইসরাইলের বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থায় তিনি হয়ে উঠতে পারেন সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তি। বিরোধী নেতারা তার সমর্থন নিতে রাজি না হলে নেতানিয়াহুকে সরানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গঠন তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

এ কারণে আব্বাসকে ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিকদের একজন বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ তার দল রা’আম সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। ১৯৯৬ সালে ইসরাইলের ইসলামি আন্দোলনের একটি শাখা দলটি প্রতিষ্ঠা করে। মুসলিম পরিচয় শক্তিশালী করা এবং ইসরাইলের আরব সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন দলটির অন্যতম লক্ষ্য। এ অবস্থানে থেকেও উদারপন্থি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন আব্বাস।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার লক্ষ্য শুধু বর্তমান সরকারকে পরাজিত করা নয়। এই সরকারকে তিনি ‘বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ বলে অভিহিত করেন। তার লক্ষ্য এমন একটি সরকার গঠন, যেখানে আরব নাগরিকেরা অংশীদার হবেন, নিজেদের কথা বলতে পারবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রাখতে পারবেন।

ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন অধ্যুষিত শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে শত শত সমর্থকের সামনে তিনি বলেন, ক্ষমতাবানদের টেবিলে আরবরা অনাথ হয়ে পড়ে থাকবেন না। আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

নেতানিয়াহুকে একবার সরিয়েছিলেন আব্বাস

অনেকে আব্বাসকে ইসরাইলের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিকদের একজন মনে করেন। ২০২১ সালে তিনি প্রথম বড় আলোচনায় আসেন। ওই সময় নেতানিয়াহুর সঙ্গে নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন তিনি। এতে একটি ইসলামপন্থি দলের সরকারে অংশ নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। সেই জোটের হাত ধরেই ক্ষমতা হারান নেতানিয়াহু।

পরের বছর আবার প্রধানমন্ত্রী হন নেতানিয়াহু। তিনি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র ডানপন্থি সরকার গঠন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। হামলার পর অনেক ইসরাইলির মধ্যে ফিলিস্তিনিদের—এমনকি ইসরাইলের আরব নাগরিকদেরও—নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।

এ পরিস্থিতিতে ইহুদিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আরো সক্রিয় হন ৫২ বছর বয়সি আব্বাস। ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই তিনি এর নিন্দা জানান। গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরাইলিদের থাকার ব্যবস্থা করতেও সহায়তা করেন। হামাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সহিংসতার পথ ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

কিন্তু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে এখন প্রায় সব দিক থেকেই আক্রমণের মুখে তিনি। নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা আব্বাসকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে, যে ইহুদি জাতীয়তাবাদী বিরোধী নেতারা একসময় তাকে সাহসী পথিকৃৎ বলে প্রশংসা করেছিলেন, তারাও এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন। ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই তাদের এই অবস্থান।

আরব দলগুলোর অন্য নেতারাও আব্বাসের সমালোচনা করছেন। তারা সাধারণত ইসরাইলের সরকারগুলোর বিরোধিতা করেন, কিন্তু সরকারে অংশ নেন না। তাদের কেউ কেউ আব্বাসকে কার্যত আপসকামী বা নিজেদের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া নেতা হিসেবে দেখছেন।

তবে এসব সমালোচনায় দমে যাননি আব্বাস। তুবা-জাঙ্গারিয়ায় এক সমাবেশে মুসলিম পুরুষদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদের নেতৃত্ববিষয়ক শিক্ষার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন নেতার নিজের পথের ওপর আস্থা থাকা প্রয়োজন।

এর কয়েক দিন পর নাজারেতে এক সংবাদ সম্মেলনে আরো বড় পদক্ষেপ নেন আব্বাস। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থি রাজনীতিক ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োভ সেগালোভিৎজ তার দল রা’আমের প্রার্থী তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন। মূলধারার আরব ও ইহুদি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের মধ্যে এ ধরনের জোট ইসরাইলের রাজনীতিতে নজিরবিহীন।

সেগালোভিৎজকে পাশে নিয়ে হিব্রু ভাষায় আব্বাস বলেন, পরিবর্তন আনতে হলে অন্য ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

আরব নাগরিকদের ‘জ্বলন্ত সমস্যা’ সমাধানের চেষ্টা

গালিলি অঞ্চলের দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত শহর মাগারে জন্ম আব্বাসের। রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা কখনোই তার ছিল না।

তার বাবা ছিলেন মুদি দোকানি। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শহরের মানুষ নানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তার বাবার কাছে যেতেন। আব্বাস বলেন, স্কুলে পড়ার সময়ও সহপাঠীরা তাকে বিরোধ মেটানোর দায়িত্ব দিত।

পরে দন্তচিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন আব্বাস। একসময় তার নিজ শহরে দ্রুজ ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়, হাজারো মানুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত করতে নিজের চিকিৎসাকেন্দ্র এক মাস বন্ধ রাখেন তিনি। মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। পরে বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের কাজও শুরু হয়।

মানুষের জন্য আরো বেশি কিছু করার ইচ্ছা থেকেই রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান আব্বাস। তার উপলব্ধি হয়েছিল, রাষ্ট্রের হাতিয়ার ব্যবহার করেই বড় পরিসরে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

২০১৯ সালে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে যোগ দেওয়ার পর থেকে আরব নাগরিকদের ‘জ্বলন্ত সমস্যা’ সমাধানে মনোযোগ দেন তিনি। বিশেষ করে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সহিংস অপরাধ ও চাঁদাবাজি ঠেকানো তার অন্যতম অগ্রাধিকার।

তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে ফেরার পথে আব্বাস বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে তিনিও হুমকির মুখে পড়েছেন। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পাশাপাশি আরব, ইহুদি ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও সহিংসতার হুমকি পেয়েছেন তিনি।

তবে ইসরাইলের জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি বেশি ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগের কারণে। ২০২১ সালের মে মাসে ইসরাইলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে তিনি লোদের একটি পুড়ে যাওয়া সিনাগগ পরিদর্শন করেন। শহরের ডানপন্থি ইহুদি মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে সেটি পুনর্নির্মাণে সহায়তার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সহিংসতার নিন্দা জানান।

তখন অনেক আরব তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, ইসরাইলি পুলিশ যখন আরব নাগরিকদের আটক করছিল, তখন আব্বাস ভুল জায়গায় মনোযোগ দিচ্ছেন।

আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি বলেন, ওই সময় আব্বাসের অবস্থান গ্রহণযোগ্য মনে করেননি অনেকে। ইসলামি আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা তাকে ফোন করে বলেছিলেন, আব্বাস তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে ফেলেছেন বলে তিনি লিখতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আব্বাস নিজের অবস্থানের যথার্থতা বোঝাতে সক্ষম হন।

সরকারে অংশ নেওয়া নিয়ে আরবদের মধ্যেও বিতর্ক

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে রা’আমের যোগদান ছিল ইসরাইলের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর আগে আরব দলগুলো সাধারণত সরকারের বাইরে থেকে নীতির সমালোচনা ও প্রতিবাদ করত।

আব্বাসের যুক্তি, ক্ষমতায় অংশ নেওয়া ছাড়া বড় ধরনের অর্জন সম্ভব নয়। আরব নাগরিকদের অপছন্দের কোনো নীতির দায়ও যদি নিতে হয়, তাতে তিনি প্রস্তুত। তার ভাষায়, এর জন্য মূল্য দিতে হলেও তারা রাজি।

তবে আরব নাগরিকদের একটি অংশ মনে করে, এই কৌশলের জন্য আব্বাসকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তিনি খুব কম কথা বলেন। ইসরাইলের ভোটারদের মধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকেন তিনি।

গত আগস্টে দলের এক সম্মেলনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সংক্ষেপে কথা বলেছিলেন আব্বাস। এরপর তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গী বিরোধী নেতাদের কয়েকজনই ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেন।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হলেও এ বিষয়ে আরো জোরালোভাবে কথা না বলায় আরব নাগরিকদের একাংশ আব্বাসের সমালোচনা করেছে।

ইসরাইলে আরব-ইহুদি সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা সংস্থা আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের সহসভাপতি বাশায়ের ফাহুম-জাইউসি বলেন, আব্বাসের কৌশলগত আপসের বিষয়টি আরব সমাজে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে।

কারো মতে, এ জন্য তাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে। তারা মনে করেন, তিনি ইহুদি জাতীয়তাবাদী দলগুলোর শর্তে বেশি ছাড় দিচ্ছেন। অন্য আরব দলগুলোর অবস্থান হলো, তাদের নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান মেনেই গ্রহণ করতে হবে।

ইসরাইলের ইসলামি আন্দোলনের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেইজ বলেন, আরব নাগরিকেরা আব্বাসের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তবে তাদের অনেকেই বোঝেন, তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হলো সমঝোতা।

অন্যদিকে, অতীতে ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য ডানপন্থীদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ছেন আব্বাস। একসময় তিনি বলেছিলেন, জেরুজালেমের ওপর ইসরাইলিদের কোনো অধিকার নেই এবং তারা ওই ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশকারী।

রাজনীতিতে আসার আগে ইহুদি ইসরাইলিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সীমিত ছিল বলে জানান আব্বাস। তার ভাষায়, এতে পরিস্থিতি, বাস্তবতা ও অন্য পক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার বোঝাপড়ায় প্রভাব পড়েছিল। সময়ের সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। অতীতের কিছু বক্তব্য এখন আর দেবেন না বলেও স্বীকার করেন তিনি।

আব্বাসের দাবি, তার এই অবস্থান ফিলিস্তিনি প্রশ্ন থেকে সরে আসার অর্থ নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত সমাধানের পথ তৈরি করতে চান তিনি।

তার মতে, ইসরাইলের ভেতরেই আরব ও ইহুদিরা একসঙ্গে সমস্যা সমাধান করতে পারেন—এটি প্রমাণ করা জরুরি। এর মধ্য দিয়েই যৌথ ভবিষ্যৎ গড়ার আশা ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

ইহুদি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে নতুন জোট

সেগালোভিৎজের সঙ্গে আব্বাসের জোট এই কৌশলের একটি উদাহরণ হতে পারে। নেসেটে একসময় তারা একসঙ্গে নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে রসিকতা করেছিলেন। ওই সময় সেগালোভিৎজ ছিলেন আব্বাসের অংশ নেওয়া জোট সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী।

আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অপরাধ দমনে কাজ করাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন সেগালোভিৎজ। তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ দলও গঠন করেন। তার দাবি, ওই উদ্যোগের সময় হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল।

এ কারণে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরার পর পুলিশের দায়িত্ব দেন উগ্র-ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন গভিরকে। এরপর সেগালোভিৎজের উদ্যোগগুলো পরিত্যক্ত হয় এবং হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।

আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইসরাইলে রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হন।

তবে আব্বাস ও সেগালোভিৎজের জোটে মতপার্থক্যও রয়েছে। সেগালোভিৎজ আরবি জানেন না, যা নির্বাচনী প্রচারে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। আব্বাস সমকামীদের অধিকারের বিরোধী। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ সেগালোভিৎজ এসব অধিকারের সমর্থক; তার মেয়েও সমকামী। আরো বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতভেদ রয়েছে।

তবে তারা জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে একমত না হলেও একসঙ্গে কাজ করতে চান।

সাবেক প্যারাট্রুপার সেগালোভিৎজকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে আব্বাসের জন্য দুটি সুবিধা হতে পারে। প্রথমত, ডানপন্থিদের আক্রমণের জবাব দেওয়া সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, রা’আমের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন নিয়ে বিরোধী নেতাদের উদ্বেগ কমতে পারে।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিৎজ বলেন, ইসলামপন্থি দলের প্রার্থী তালিকায় যোগ দেওয়ায় নেসেটের অনেকের কাছ থেকেই আক্রমণের শিকার হবেন বলে তিনি জানেন। তবে আব্বাসের ওপর তার আস্থা রয়েছে। তার ভাষায়, আব্বাস সাহসী মানুষ এবং সেই সাহসের জন্য তাকে মূল্য দিতে হয়। ইসরাইলের ভবিষ্যতের জন্য আব্বাসকে একধরনের আশার প্রতীক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনেই এই আশার বাস্তব পরীক্ষা হবে।

অপরাধ কমানোর আশায় আব্বাসকে সরকারে দেখতে চান ভোটাররা

উত্তর ইসরাইলের আরেক শহর সাখনিনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সমাবেশ শেষে দীর্ঘ সময় সমর্থকদের সঙ্গে কাটান আব্বাস। পরিচিতদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, ছবি তোলেন। সেখানে ৫৩ বছর বয়সি ভোটার ইহসান বশির তাকে পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। এমনকি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার হলেও তাতে অংশ নিতে বলেন তিনি। তার আশা, এতে অপরাধের মাত্রা কমবে।

বশির বলেন, তার এক ছেলে ও চার মেয়ে রয়েছে। সন্তানদের বাইরে যেতে দিতে তিনি ভয় পান।

আব্বাস তার কথা শুনে হাসেন ও মাথা নাড়েন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রা’আম নির্বাচনে অনেক আসন পাবে এবং নতুন সরকার বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত হবে।

ইসরাইলের নির্বাচনে ক্ষমতার চাবিকাঠি হতে পারেন আরব নেতা আব্বাস
ইউনাইটেড আরব লিস্টের নেতা মানসুর আব্বাস। ছবি: এএফপি

‘নেতানিয়াহু মিথ্যাবাদী, তার হাতে ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্ত’

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান রো খান্না। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর হাতে লেগে আছে ‘ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্ত’।

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা দায়মুক্তি নিয়ে সহিংস কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন মার্কিন কংগ্রেসম্যান রো খান্না। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক আলোকচিত্রী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার পর তিনি এ অভিযোগ করেন।
বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দুটি পোস্টে রো খান্না ফটোসাংবাদিক হেইডি লেভিনের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হামলাকারীরা তাকে তুলে আছড়ে ফেলে এবং তাকে লাথি মারতে থাকে।

ইসরাইলের বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে খান্না বলেন, ‘ইসরাইলকে দেওয়া যে সহায়তা বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়, তা আমাদের বন্ধ করতে হবে এবং এসব অস্ত্র বিক্রিও থামাতে হবে।’

গত জুলাইয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন তিনি। সে সময় খিরবেত জানুতা এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা তাকে এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন আলোকচিত্রীকে আটকে রেখেছিল। খান্না জানান, সেই ঘটনায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ করে খান্না বলেন, ‘নেতানিয়াহু, আপনিই মিথ্যাবাদী। ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্ত আপনার হাতে।’

সূত্র: আল জাজিরা

‘নেতানিয়াহু মিথ্যাবাদী, তার হাতে ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্ত’

ইয়েমেনে রণক্ষেত্রে উত্তেজনার কেন্দ্রে তাইজ, শহরটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজকে ঘিরে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর লড়াইয়ে শহরটি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র। কৌশলগত অবস্থানের কারণে তাইজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শহরটির দক্ষিণে এডেনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়কে হুথিদের অগ্রযাত্রায় তাইজ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানবিক সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সামরিক ও ভৌগোলিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ

প্রায় ছয় লাখ মানুষের আবাসস্থল তাইজ দীর্ঘদিন ধরে হুথিবিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ব্যাপক আকার ধারণ করার পর থেকেই শহরটি সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হুতিবিরোধী শক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান শহুরে অবস্থান হওয়ায় সামরিক দিক থেকে তাইজের গুরুত্ব অনেক।

শহরটির ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে এডেন এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে যাতায়াত ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব। এডেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। অন্যদিকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

তাইজের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে গেলে এডেনের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে সরকারপন্থী বাহিনীর সামরিক তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

এডেনের সড়ক বিচ্ছিন্ন করে হুথিদের অগ্রযাত্রা

তাইজের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা আগে থেকেই হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শহর এবং এর আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে সরকারপন্থী বাহিনী। তবে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে হুতিরা দক্ষিণ দিকে জাবাল সাবা পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অগ্রসর হয়ে এডেনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক বন্ধ করার চেষ্টা চালায়।

প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম পাহাড়ি সড়কটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে আল-তুরবাহ ও মুদিরিয়াত আল-মিসরাখ এলাকাও রয়েছে। ফলে অক্টোবরের শুরু থেকেই তাইজের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অবরোধ ভাঙতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তায় অভিযান চালাচ্ছে সরকারপন্থী বাহিনী। তাদের লক্ষ্য হারানো এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করে এডেনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তবে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

কেন হুথিবিরোধী প্রতিরোধের প্রধান ঘাঁটি শহরটি

তাইজের সঙ্গে উত্তর ইয়েমেনের শাসকদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই টানাপোড়েনপূর্ণ। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় শহরটি সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হন।

হুথিরা জাইদি শিয়া মতাবলম্বী হলেও তাইজের অধিকাংশ বাসিন্দা সুন্নি মুসলমান। তবে শহরটিতে হুথিবিরোধী মনোভাবের পেছনে শুধু ধর্মীয় পার্থক্য কাজ করেনি। রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং আরব বসন্তের পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রত্যাশাও এ বিরোধের সঙ্গে যুক্ত।

২০১৪ সালে সালেহ ও হুথিরা জোটবদ্ধ হয়ে রাজধানী সানা দখল করলে আরব বসন্ত-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হয়। পরের বছর তাইজে সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে হুথি ও সালেহপন্থী বাহিনী অভিযান শুরু করলে বিক্ষোভ ও সশস্ত্র সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর দীর্ঘ অবরোধের মধ্যে শহরটির বাসিন্দাদের গোলাবর্ষণ, স্নাইপারের হামলা এবং খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। ফলে তাইজের প্রতিরোধ কেবল সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধেরও প্রতিফলন।

অবরোধে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকট

তাইজকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে তাইজ প্রদেশে অন্তত ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ শহরের বাইরের গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।

এডেনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরে খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তাইজে গমের আটার মজুত প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে।

এর মধ্যে ইয়েমেনে আগে থেকেই অপুষ্টি ও বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ রয়েছে। কলেরা, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও ব্যাপক। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক জরিপে পরীক্ষা করা শিশুদের প্রতি তিনজনের একজনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

সামনে কী হতে পারে

তাইজের অবরোধ ভাঙতে সরকারপন্থী বাহিনী অভিযান চালালেও তাদের সাফল্য এখনও অনিশ্চিত। অন্যদিকে হুতিরা শহরটির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করে ভেতরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ কিংবা সরাসরি শহর দখলের অভিযান—দুই ধরনের পরিস্থিতিই তৈরি হতে পারে।

তবে তাইজে স্থানীয় প্রতিরোধ শক্তিশালী হওয়ায় সরাসরি দখল অভিযান সহজ হবে না। এমন অভিযান শুরু হলে তা দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

ইয়েমেনে রণক্ষেত্রে উত্তেজনার কেন্দ্রে তাইজ, শহরটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ।

ভারতে মুসলিম হওয়াই কি অপরাধ, প্রাণনাশে পুলিশের হুমকি ঘিরে প্রশ্ন

ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সাহিল খান নামে ২০ বছর বয়সী এক মুসলিম শিক্ষার্থীকে আটক, মারধর ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গত ১৩ অক্টোবর এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম মাকতুব মিডিয়া।

সাহিল খান ভারতের স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) কর্মী এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তার অভিযোগ, প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে পুলিশ তাকে আটক করে পানবাজার থানায় নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ সদস্যরা তাকে ইসলামবিদ্বেষী গালাগাল করেন এবং মুসলিম হয়েও কেন প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সাহিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেকটিভের আয়োজনে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। গুয়াহাটির নেহরু পার্কের কাছে আয়োজিত এ কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর এক বন্ধুকে নিয়ে স্কুটারে ফেরার সময় পুলিশ তাদের পথ আটকায়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে পুলিশ প্রথমে স্কুটারের কাগজপত্র দেখতে চায়। কাগজপত্র ঠিক থাকার কথা জানানোর পরও পুলিশ তাঁকে গাড়িতে উঠতে বলে।

কেন তাকে নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চাইলে পুলিশ কোনো কারণ জানায়নি বলে অভিযোগ সাহিলের। তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানালে এক পুলিশ সদস্য ও গাড়িচালক তাকে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলেন। তিনি বলেন, গাড়ির ভেতরে তারা আমার চুল ধরে আমাকে মারধর করে। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কেন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি, কারণ আমি একজন মুসলিম। পুলিশ আমাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে

২০ বছর বয়সী এই তরুণী বলেন, পুলিশ বারবার আমাকে ‘মিয়া’ বলে সম্বোধন করছিল। তাদের একজন আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বলে, ‘তোকে গায়েব করে দেব’, আর অন্যজন বলে, ‘আমরা তোকে মেরে ফেলব’।

সাহিল প্রশ্ন তোলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ন্যায়বিচার চাওয়া কি অপরাধ? নাকি মুসলিম হওয়াটাই অপরাধ? তার দাবি, প্রতিবাদে দুই শতাধিক মানুষ অংশ নিলেও পুলিশ শুধু তাকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে।

থানায় আটকের কথা প্রথমে অস্বীকার পুলিশের

সাহিলের আটকের খবর পেয়ে তার বন্ধু ও সহকর্মীরা তাকে খুঁজতে একাধিক থানায় যান। তাদের অভিযোগ, প্রথমে পুলিশ বিভিন্ন থানায় সাহিলকে আটকের কথা অস্বীকার করে। পরে তারা স্বীকার করেন যে তিনি ভেতরেই আছেন এবং তাকে পেছনের দরজা দিয়ে আনা হয়েছে।

এই বিক্ষোভ কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক এবং এসএফআই-এর রাজ্য যুগ্ম সম্পাদক উৎপলা দাস জানান, খানকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে তা খুঁজে বের করার আগে বিক্ষোভকারীরা বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়েছিলেন। “সাহিলকে আটক করার খবর পাওয়ার পর আমরা বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিই, কিন্তু তারা তাকে আটকে রাখার কথা অস্বীকার করে। আমরা চাপ প্রয়োগ করি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হই; এরপর জানতে পারি যে তাকে পানবাজার থানায় আটকে রাখা হয়েছে।”

উৎপলা দাসের অভিযোগ, সাহিলকে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া, মারধর এবং সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করার বিষয়টি বিক্ষোভকারীরা তার কাছ থেকেই জানতে পারেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে মুসলিম পরিচয়ের কারণে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। পরে সাহিলের নামের সঙ্গে ‘মিয়া’ শব্দ যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে এভাবে সম্বোধন করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেন বলে জানান উৎপলা। তবে এ ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাহিলের নাম সাহিল খান।

সাহিলকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উৎপলা। তার অভিযোগ, পুলিশ তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ পথ ঘুরে যায় এবং পরে থানায় ফিরিয়ে আনে। এর পেছনে পুলিশের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উৎপলা জানান, এ ঘটনায় তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন। তার মতে, বিষয়টি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নয়; মুসলিমদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।

সাহিলের ও বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে আটক করা হয়। পরে চিকিৎসা পরীক্ষা শেষে রাত ৯টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’

১৩ অক্টোবর নেহরু পার্কের কাছে ‘উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেক্টিভ’ (নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে গঠিত জোট) একটি ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’-এর আয়োজন করে। এতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের দাবি জানানো হয় এবং লিঙ্গ সমতার আহ্বান জানানো হয়। এই কর্মসূচির কয়েক ঘণ্টা পরই খানকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

আয়োজকদের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মিছিলটি এগিয়ে যেতে বাধা দেন। পরে আয়োজকেরা মিছিল না করে ঘটনাস্থলেই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।

আয়োজকরা জানান, ১৫ দিনের ব্যবধানে যৌন সহিংসতার কারণে দুজন তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। এটি নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা এবং চরিত্র হননের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

আয়োজক সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে আসামের এক নারীকে রেললাইনের পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর আগে ওই নারী ট্রেনে মদ্যপ পুরুষদের আচরণের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। রেলওয়ে পুলিশের ধারণা, চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে হয়তো তার মৃত্যু হয়েছে; অন্যদিকে পরিবারের অভিযোগ, তাকে হত্যা করা হয়েছে।

ওই আয়োজক বলেন, শহরে নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অপরাধের মোকাবিলায় এটি ছিল একটি সম্মিলিত আহ্বান।

সংহতি প্রকাশের আহ্বানে আয়োজকরা গুয়াহাটির নারীদের প্রতি আহ্বান জানান—যারা প্রাণ হারিয়েছেন, যারা বেঁচে থেকেও মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন এবং যারা ভয় বা লজ্জা ছাড়া বাঁচতে চাইছেন—সেই সব নারীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

পদযাত্রার পর খানকে আটক করার অভিযোগের বিষয়ে ওই আয়োজক বলেন, এটি মুসলমানদের প্রতি পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্পষ্ট করে তোলে; এটি পুলিশের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় বৈষম্য।

প্রতিবাদ কর্মসূচির পর সাহিলকে আটকের অভিযোগ প্রসঙ্গে আয়োজকদের একজন বলেন, এ ঘটনা মুসলিমদের প্রতি পুলিশের মনোভাব তুলে ধরে। তার অভিযোগ, এটি পুলিশের ধর্মীয় বৈষম্যেরই প্রকাশ।

ভারতে মুসলিম হওয়াই কি অপরাধ, প্রাণনাশে পুলিশের হুমকি ঘিরে প্রশ্ন

নেটফ্লিক্সের ৬৫০ কোটি রুপির প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিলেন ‘বাহুবলী’ নির্মাতা

প্রকাশ ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ অস্কারজয়ী ‘আরআরআর’-এর পর নতুন সিনেমা নিয়ে আসছেন এস এস রাজামৌলি। গত মাসেই বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমাটির প্রথম ঝলক প্রকাশ করা হয়েছে। ‘বারাণসী’ নামের সিনেমাটির প্রধান গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন মহেশ বাবু, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারন। প্রথম ঝলক প্রকাশের পর থেকেই সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এদিকে নতুন গুঞ্জন—নেটফ্লিক্স নাকি সিনেমাটির ওটিটি স্বত্বের জন্য ৬৫০ কোটি রুপির প্রস্তাব দিয়েছিল; কিন্তু রাজামৌলি সেটি ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মহেশ বাবুকে নতুন রূপে দেখার অপেক্ষা
মহেশ বাবু-এসএস রাজামৌলি জুটি প্রথমবারের মতো একসঙ্গে কাজ করছেন  ‘বারাণসী’ ছবিতে। বাজেট ১ হাজার ২০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি রুপি, যা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসেই অন্যতম ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। ছবিতে আছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের মতো অভিনয়শিল্পী। শুটিংও চলছে অবিশ্বাস্য গতিতে। ফলে সিনেমা মুক্তির আগেই বিশ্বব্যাপী দারুণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ওটিটি চুক্তি নিয়ে কেন এত টানাপোড়েন
নেটফ্লিক্স ছবিটির ওটিটি স্বত্বের জন্য প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা অফার করেছিল; কিন্তু রাজামৌলি ও তাঁর টিম মনে করছে, ছবিটির বিশালতা ও আন্তর্জাতিক সম্ভাবনার তুলনায় দামটি কম। তাঁদের লক্ষ্য আরও বড়—এক হাজার কোটি রুপি! চুক্তি তাই আপাতত স্থগিত।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত ব্লকবাস্টার নিশ্চিত না হলে অতিরিক্ত বিনিয়োগে সতর্ক থাকে। তবে রাজামৌলির ব্র্যান্ড ভ্যালুই এখানে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

ভারতীয় ওটিটির রেকর্ড ভাঙতে পারে ‘বারাণসী’
ভারতের সবচেয়ে বড় ওটিটি চুক্তিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে ‘কাল্কি ২৮৯৮এডি’র স্বত্ব বিক্রি হয়েছিল ৩৭৫ কোটি রুপিতে, ‘কেজিএফ ২’ ৩২০ কোটি রুপিতে। তিনে আছে রাজামৌলির আগের সিনেমা ‘আরআরআর’, যেটি বিক্রি হয়েছিল ৩০০ কোটি রুপিতে। ‘বারাণসী’ যদি সত্যিই এক হাজার কোটি রুপিতে চুক্তিবদ্ধ হয়, তবে তা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ওটিটি চুক্তি হবে।

প্রচারেই আলাদা রাজামৌলি
রাজামৌলি সব সময়ই তাঁর বিপণন পরিকল্পনার জন্য আলাদাভাবে সমাদৃত। তাঁর ছবিগুলো মুক্তির আগে থেকেই বিশ্বব্যাপী আগ্রহ তৈরি করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রামোজি ফিল্ম সিটিতে ছবির নাম প্রকাশ করা হয়েছে বড় আয়োজনে।
ছবিটি মুক্তি পাবে ২০২৭ সালে। কোন প্ল্যাটফর্ম শেষ পর্যন্ত ওটিটি স্বত্ব পাবে, সেটি জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।

হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে

সিনেমার পোস্টারে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। এক্স থেকে
সিনেমার পোস্টারে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। এক্স থেকে