Monday, October 12, 2026

হরমুজে হামলা বেড়েছে, থমকে আছে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগে অগ্রগতি না হওয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজে হামলা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নৌপথটির নিরাপত্তা ও চলাচলের নিয়ম উপেক্ষা না করতে সতর্ক করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। অন্যদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

শনিবার রাতে আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালিতে অনুমোদনহীন পথে চলার সময় একটি বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার নৌমাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়। তাদের দাবি, জাহাজটির নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ম উপেক্ষা করে চলাচল করতে চাওয়া অন্য ট্যাংকারগুলোরও একই পরিণতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

বিশ্বে স্বাভাবিক সময়ে মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

রোববার ইরানের সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ সাইয়ারি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর সাত মাসের বেশি সময় পরও ইরানের বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—দুই ধরনের অভিযানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে আবারও হামলা চালানো হবে।

এর আগে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, গত এক দিনে হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে জাহাজকে লক্ষ্য করে একাধিক সামরিক তৎপরতা ও সতর্কবার্তার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ উপকূলের কাছে নোঙর করা জাহাজগুলোকে রাতে বেতারবার্তার মাধ্যমে অবস্থান ছেড়ে সরে যেতে বলা হয়। রোববার বিকেলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানার খবরও জানায় সংস্থাটি।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে আগুন লাগার পর ২২ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কী কারণে আগুন লেগেছে, তা জানানো হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ

রোববার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে ওমান উপসাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজের পেছনের অংশে যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালাতে দেখা যায়। সেন্টকমের দাবি, জাহাজটি ইরানের নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল। হামলায় এর চলাচলের ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি ইরানের বন্দরগুলোতে নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপের পর থেকে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল করা হয়েছে, ১৩৫টি জাহাজকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সেন্টকম। ওয়াশিংটনের দাবি, অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইরান অবরোধরেখা পেরিয়ে তেল রপ্তানি করতে পারেনি।

যুদ্ধ শুরুর পর গত ৫ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে অন্তত ১২টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কোনো এক সপ্তাহে এটিই সর্বোচ্চ হামলার ঘটনা। কাতারের উত্তর উপকূলের কাছেও একটি জাহাজে হামলা হয়। এতে হরমুজ প্রণালির বাইরেও নৌ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

জাহাজে হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমেছে। সিএনবিসির উদ্ধৃত জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ৭ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কম।

আলোচনায় অগ্রগতির আশা কম

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধের সমাধানে পৌঁছাতে ইরান জুনে হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য সাময়িক সমন্বিত পথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের চূড়ান্ত করা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনও চায় তেহরান।

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চললেও আগামী কয়েক সপ্তাহে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার বক্তব্যে ইরানের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগের কঠোর অবস্থান কিছুটা শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তেহরান জানিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ করার মতো বিষয় ভবিষ্যতের আলোচনায় আসতে পারে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা হবে না।

রোববার এক বক্তব্যে ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি বলেন, দেশের নিজস্ব পারমাণবিক শিল্পের অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনকে এই প্রযুক্তির অন্যতম ব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন করে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার দেওয়া হুমকির নিন্দা না করায় সমালোচনাও করেন এসলামি।

ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালভান্দি বলেন, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইরান সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই পথই ব্যবহার করবে। কূটনীতির মাধ্যমে স্বার্থ নিশ্চিত করা গেলে সেটিই ভালো, তবে তা সম্ভব না হলে যুদ্ধক্ষেত্রে সেগুলো রক্ষা করা হবে।

সূত্র: আলজাজিরা

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

সৌদি-হুতি সংলাপে সহায়তার প্রস্তাব ইরানের, কূটনীতির আহ্বান

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংলাপ শুরুর উদ্যোগে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সময় রোববার (১১ অক্টোবর) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পথ উপেক্ষা করে সামরিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলোর সামরিক কোনো সমাধান নেই।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ইরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

এর আগে রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেন নিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা পুনর্বিবেচনার কথা বলেন। ইরানের ওপর আবার হামলা চালানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে আবার হামলা চালানো হবে না। নতুন বক্তব্যে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেখা গেছে।

দীর্ঘদিনের মতবিরোধ সত্ত্বেও ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু রয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়। এর আগে সাত বছর ধরে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল।

তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর তেহরানের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ওই যুদ্ধের পর ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

গত মার্চে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সৌদি আরব ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার বিষয়টি আর অনির্দিষ্টকাল সহ্য করা হবে না। তিনি তেহরানকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সূত্র: আলজাজিরা

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: মেহর নিউজ এজেন্সি
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: মেহর নিউজ এজেন্সি

তাজমিনকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা ফেরার পথে ১৫ বছরের জান্নাতুল তাজমিনের নিরাপত্তা নিয়ে কারও উদ্বেগ ছিল না? বাস কাউন্টারের কর্মী বুঝেছিলেন, একা মেয়েটির রাতে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু যাত্রার সময়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তার নিরাপত্তা কিংবা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাস থেকে নেমে সিএনজিতে ওঠা তাজমিনের মরদেহ মিলল ধানখেতে। পুলিশ বলছে, হত্যাকারী একজন, সিএনজিচালক সুমন মিয়া। তবে তাজমিনের বাড়ি ছাড়ার কারণ, কক্সবাজার যাওয়া, ফেরার যাত্রা এবং শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।

‘ওদের (তাজমিন ও রাজুর) বুঝা উচিত ছিল, আমি দিনে যাচ্ছি (রওনা হচ্ছি)। একটা মেয়ে রাতে ওইখানে (কুমিল্লায়) পৌঁছাবে। ওরও (তাজমিন) বুঝা উচিত ছিল। আমি বলতে চাইছিলাম ওদের। কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে, তাই বলা হয়নি।’ কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজার আইকনিক বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ।

জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা ফেরার বাসের টিকিট কাটতে যায় সে ও তার প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কাটা হয়। বাস ছাড়ে দুপুর একটার দিকে। একা যাত্রা করবে বলে তাজমিনের জন্য সিঙ্গেল সিটের টিকিট কাটেন রাজু।

রাজুর দাবি, তাজমিন যাতে নিরাপদে কুমিল্লার বাসায় পৌঁছাতে পারে, সে জন্য তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাজমিনের শেষ যাত্রার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

আটক রাজুর ভাষ্য, একটি হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। রাজুকে সে জানিয়েছিল, ওই নারী তার সৎমা এবং তার নিজের মা মারা গেছেন। এরপর সে এক বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকার সময় থেকেই রাজুর সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। পরে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারে পৌঁছায় তাজমিন।

তবে পরিবারের দাবি, ৪ অক্টোবর তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করছিল। এ সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ থাকলেও সে কোথায়, কার কাছে ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের আইফোনের অবস্থান শনাক্ত করে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পান বলে জানা গেছে।

রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমিনের বাবা তাকে একাধিকবার ফোন করে অবস্থান জানতে চান এবং বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করেন। বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তাজমিনকে বলতে শুনেছিলেন, সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। এরপরই মঙ্গলবার রাতে দুজন আইকনিক এক্সপ্রেসের কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের টিকিট কাটে।

কিন্তু তাজমিনের বাড়ি ফেরার সেই যাত্রা আর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল বলে সাংবাদিকদের জানান তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন মা। কিন্তু বান্ধবীর নাম কিংবা তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি বলে জানান তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন, চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। তবু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমিনের মা যে বান্ধবীর কথা বলেছেন, তিনি তাজমিনের চেয়ে বয়সে বড়। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, তবে তিনি কুমিল্লায় থাকেন। হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে রাজুর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন।

শিক্ষকের ভাষ্য, বাড়িতে রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বেরিয়ে যেত।

তাজমিনের বাড়ি ছাড়ার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্ব ও রাজুর সঙ্গে সম্পর্কের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বাড়ি ছাড়ার পর কয়েক দিন ধরে তার অবস্থান, চলাফেরা ও যোগাযোগের ধারাবাহিকতা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে হত্যা করেছেন একজনই, সিএনজিচালক সুমন মিয়া (৩৫)। শনিবার রাতে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলছে।

কক্সবাজারে অবস্থানকালে রাজুর ভূমিকা এবং তাজমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তদন্তে এখনো তার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে রাজুকে আটক করে পুলিশ। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে পুলিশ। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে গেছেন।

পুলিশ জানায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাস থেকে নেমে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত
স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত

আইফোনের লোভেই তাজমিন হত্যা? সিএনজিচালককে ঘিরে যত রহস্যের জট

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৩) হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। নিহতের ব্যবহৃত আইফোনের প্রতি লোভ থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালক মো. সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে তাজমিনের আইফোন। ফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে ফোনটি উদ্ধার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূত্র মেলানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সুমন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বলে তারা মনে করছেন। তবে তিনি একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা রয়েছে।

বাসা থেকে বেরিয়ে দুই জেলায়, এরপর কুমিল্লায় ফেরা

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়।

পরে হোটেলের আশপাশের বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে তার হাতে মোবাইল ফোন এবং কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ দেখা যায়। একপর্যায়ে তাকে সড়কের দিকে চলে যেতে দেখা গেলেও এরপর তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

সিএনজিতে ওঠার পর কী ঘটেছিল?

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য তাজমিন একাই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। চালক সুমন তার হাতে থাকা আইফোন দেখতে পান। এরপর শহরের পথে না গিয়ে তিনি অটোরিকশাটি অন্য পথে নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের দাবি, সুমন মাদকাসক্ত অবস্থায় অটোরিকশা চালাতেন। তবে ঘটনার সময় তার শারীরিক অবস্থা এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্তের বিষয়।

তদন্তকারীদের ধারণা, আইফোনের প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পুরো বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে এখনো তদন্ত চলছে।

ধানক্ষেতের পাশে পড়ে ছিল সিএনজি, পরে মিলল মরদেহ

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে তারা ধানক্ষেতের পাশে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামতও তাদের চোখে পড়ে। পরে আলামত অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে মরদেহ দেখতে পান তারা। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

অটোরিকশার সূত্র ধরে গ্রেপ্তার সুমন

মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন।

সুমন লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পরে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে আটক করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।

সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন তিনি। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে।

আইফোনের তথ্যেই মিলবে কি সব প্রশ্নের উত্তর?

তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেখানে কার সঙ্গে দেখা করেছিল এবং কুমিল্লায় ফিরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। তার নতুন কিংবা পুরোনো পরিচিতদের কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তাজমিনের চলাফেরা এবং যোগাযোগের সূত্রগুলো যাচাই করছে পুলিশ। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে ঘটনার আগে ও পরে তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এ ছাড়া হত্যার আগে তাজমিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে। শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’

তাজমিনের হাতে থাকা একটি আইফোন কি শেষ পর্যন্ত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রমাণিত হবে, নাকি তদন্তে বেরিয়ে আসবে আরও কোনো যোগসূত্র- এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

অভিযুক্ত সিএনজিচালক মো. সুমন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার জান্নাতুল তাজমিন। পুরোনো ছবি
অভিযুক্ত সিএনজিচালক মো. সুমন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার জান্নাতুল তাজমিন। পুরোনো ছবি

যুবরাজের একের পর এক ভুল হিসাব—সৌদি আরব কীভাবে নতুন করে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল

সিএনএনঃ ইয়েমেনে সৌদি আরবের নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে একের পর এক ভুল হিসাব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জোট ভাঙন, হুতিদের মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত ভূমিকা রিয়াদকে আরও বিপাকে ফেলেছে। কমবেশি সামরিক সাফল্য এলেও সৌদির বিভক্ত মিত্রবাহিনী ও রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে এ সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর দেশকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, পর্যটন ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তবে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষায় এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেন থেকে ইরান–সমর্থিত হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র।

এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র এখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানছে। ফলে যুবরাজ যে আঞ্চলিক অশান্তি পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চেয়েছিলেন, এখন বাধ্য হয়ে সেই সংঘাতের গভীরেই জড়িয়ে পড়ছে তাঁর দেশ।

গত কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থা ভেঙে চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গত মাসে তা তীব্র রূপ নিয়েছে। সৌদি আরব ১১ বছর ধরে সামরিক শক্তি ও কূটনীতি—উভয়টির মাধ্যমে তাদের দক্ষিণ সীমান্তের এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে আসছিল। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রিয়াদ প্রথমে ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালায় এবং হুতিদের মূল পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত সব প্রচেষ্টার পরও ধারাবাহিকভাবে কিছু ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে রিয়াদ ইয়েমেনের এ নতুন সংঘাতের মুখে নিজেদের অরক্ষিত করে ফেলেছে। ইয়েমেনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার জের ধরে গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অবসান ঘটায়। এ ছাড়া সংকটের সময় পাশে পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন করতেও রিয়াদ ভুল করেছে। আবার ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে সৌদি আরবকে।

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এখন ইয়েমেনের হুতিবিরোধী স্থানীয় অংশীদারদের সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া এ সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।

এক দশকের বেশি সময় আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুবরাজ বিন সালমানের সৌদি আরবকে বদলে দেওয়ার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে সৌদির তেল অবকাঠামোয় বহুমুখী হামলার কারণে তেল রপ্তানি কমে যাচ্ছে, বড় বড় প্রকল্প বাতিল করতে হচ্ছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট পথ ছাড়াই দেশটি একটি যুদ্ধের দিকে টানাহেঁচড়ার শিকার হচ্ছে। ফলে যুবরাজের সেই পরিকল্পনাগুলো এখন আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দরে হুতি বাহিনীর হামলায় একজন সৌদি পাইলটসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক এই অস্থিরতার কারণে দেশটিতে এ বছর তারকাবহুল চলচ্চিত্র উৎসব, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও কনসার্ট স্থগিত করতে হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অক্টোবরের শেষে সৌদির ফ্ল্যাগশিপ আর্থিক সম্মেলন (মরুভূমির দাভোস নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক এ হামলার কারণে সম্মেলনটি এখন চরম চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরবের শুধু এতটুকুই দরকার ছিল, যেন ইয়েমেন সংঘাত তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে এবং হুতিরা যেন তাদের (সৌদি আরব) রূপান্তর পরিকল্পনা ব্যাহত করতে না পারে। কিন্তু এখন রিয়াদ নিজেদের এ সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকস্মিক বিদায়

গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঠানো সামরিক যানের একটি চালানের ওপর সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান হামলা চালালে দুই দেশের এক দশকের পুরোনো জোটে ফাটল ধরে। ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব রুখতে এ দুই দেশ একসঙ্গে লড়ছিল। তবে ওই ঘটনার পর আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে সৌদি আরব ইয়েমেন সংকটে একেবারে একা হয়ে পড়ে।

ইউএইর সঙ্গে এ সম্পর্কচ্ছেদ পুরো অঞ্চলকে চমকে দিয়েছিল।

সৌদি আরব তখন এ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এক বিরল গণমাধ্যম যুদ্ধ শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে সুদান ও ইয়েমেনে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সৌদির বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যে ইউএইকে এমন এক ছোট ভাই হিসেবে চিত্রায়িত করতে থাকেন, যে কিনা বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক দাউদ আল-শিরিয়ান লিখেছিলেন, সৌদি আরব হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যার ওপর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যদি (সৌদি আরব) হোঁচট খায়, তবে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে ও উপসাগরীয় অঞ্চল ছিটকে যাবে।’

রিয়াদ যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য চাপ দিচ্ছিল, তখন ইয়েমেনের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। হুতিদের সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধবিরতি এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। তার ওপর রিয়াদের দাবিতে ইউএইর দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের ফলে এক চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ, ইয়েমেনে যে হাজার হাজার যোদ্ধা এক দশক ধরে আবুধাবির অধীনে লড়াই করছিলেন, তাঁরা সৌদির নতুন কৌশল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

আরব আমিরাতের মিত্র যোদ্ধাদের দাবি, আবুধাবির চলে যাওয়ার ফলে ইয়েমেন যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সৌদিরা তা পূরণ করতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমিরাতিরা (ইউএইর সেনা) যখন চলে যায়, তখন দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে হয়নি। এরপর পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে, তা সত্যিই ভয়াবহ। আমিরাতের সেনা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দক্ষ, সৌদিরা সেই দক্ষতার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।’

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে লড়াইরত বাহিনীগুলো পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছিল কি না ও দায়িত্ব হস্তান্তর ঠিকঠাক হয়েছিল কি না, তা জানতে সিএনএন সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রস্তুতির ঘাটতি

ইউএইর সেনা প্রত্যাহারের আট সপ্তাহ পরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র ইসরায়েল, যা এ অঞ্চলে নজিরবিহীন অশান্তি ডেকে এনেছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে সৌদি আরবসহ মার্কিন মিত্ররা সরাসরি ইরানের নিশানায় পরিণত হয়।

বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মত, সৌদির জন্য ওই সময়টা ছিল খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ইয়েমেনে ইউএইর মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাপ সামলানোর পরপরই সৌদি আরবকে এ আঞ্চলিক যুদ্ধের (ইরান যুদ্ধ) মুখোমুখি হতে হয়। বছরের পর বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করলেও, ইরানের ওপর ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের ফলে ইরানপন্থী হুতিরা যে সৌদির ওপর চড়াও হবে, তা একরকম নিশ্চিতই ছিল।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র‍্যাটনি বলেন, নিজের ভূখণ্ডে শত্রু বাহিনীর হামলার পর সৌদিদের পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না...তাই এখানে একটি প্রতিক্রিয়া হওয়াটা অবধারিত ছিল।’

পূর্ব দিক থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদিতে আঘাত হানলেও, রিয়াদের পুরো মনোযোগ ছিল দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্তে। হুতিরা তখনো সৌদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে থাকায় প্রথমে তাদের ইরানি মিত্রদের সাহায্য করতে অনিচ্ছুক বলেই মনে হচ্ছিল। তবে তেহরান সৌদিদের এ যুদ্ধে (হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে) টেনে আনে।

গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সৌদির বিমান অবরোধ অমান্য করে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় নিয়ে আসার জন্য একটি বাণিজ্যিক বিমান পাঠায় ইরান। বিমানটিকে অবতরণে বাধা দিতে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় রিয়াদ। এর জবাবে বিদ্রোহী হুতি গোষ্ঠী যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় ও সৌদির জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে এক ঝটিকা অভিযান শুরু করে। নিয়ন্ত্রণে নেয় গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ কৌশলগত এ অঞ্চলের। ২০২২ সালের পর এটিই ছিল ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনা।

হুতিরা সৌদির তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালালে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বেশ কিছু ভুল ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’ রিয়াদ হুতিদের এমন আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আহমেদ নাগি আরও বলেন, ‘(ইয়েমেনে) যেসব অঞ্চল হাতছাড়া হয়েছে, তার ফলে মিত্রদের মনোবল ভেঙে গেছে। এটি এখন সৌদিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, হুতিদের কাছে এখন আরও উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদির বেশ কয়েকটি শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।’

‘অনিশ্চিত’ ট্রাম্পের ওপর ভরসা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল হিসাব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন ও হুতিদের ওপর হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব যুদ্ধবিরতি রক্ষা করা। হুতিরাও এটি স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের লড়াই শুধু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। ফলে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে চলাচলের সুযোগ পায়।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, যে সামরিক বাহিনী মার্কিন অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে তাদের ‘সমগ্র বিশ্বদর্শন’ গড়ে তুলেছে, সেই সৌদিরা এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্প কতটা অপ্রত্যাশিত।

র‍্যাটনি আরও বলেন, ‘নিজেদের শক্তিতে একা একা এ যুদ্ধগুলো লড়া কখনোই তাদের সামরিক কৌশল বা কাঠামোর মধ্যে ছিল না। সাধারণ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমলে এমন পরিস্থিতি হলে, আমরা একটি যৌক্তিক ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের অংশীদারকে (সৌদি আরব) সাহায্য করতাম।’

র‍্যাটনি বলেন, ‘এখন আমাদের সেই প্রক্রিয়া নেই এবং সবকিছু শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ের ওপরই এসে ঠেকেছে, তা হলো ট্রাম্প কী ভাবছেন? আর এর ফলেই সৌদি আরব সম্ভবত নিজেদের অরক্ষিত বোধ করছে।’

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অন্যদিকে নজর দিয়েছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে দেখা করতে কায়রো যান। এর কয়েক সপ্তাহ পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান। ফ্রান্স তাদের সামরিক কর্মীসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েনে রাজি হয়েছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠাবে তারা। এ ছাড়া নবগঠিত যৌথ বাহিনী কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার জন্য বর্তমানে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদিতে কাজ করছেন।

রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকের পর গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অধীন ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে’ সম্মত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে করা এ চুক্তির উদ্দেশ্য, এ তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া ইউএইর অনুগত ইয়েমেনি বাহিনীও হুতিবিরোধী এ অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা সৌদি ও ইউএইর মধ্যকার সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলার আভাস দিচ্ছে।

আঞ্চলিক সমাধান জরুরি

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাইরের দেশের সমর্থন এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের প্রাথমিক সাফল্য চলতি সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করতে পারবে না। বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো খুবই সাধারণ বিষয় এবং যুদ্ধের (সৌদি–হুতি লড়াই) কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিণতি এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যেতে হলে সুশৃঙ্খল সংগঠন, আঞ্চলিক সমর্থন, তহবিল ও লজিস্টিকস বা রসদ সহায়তার প্রয়োজন, যা বর্তমান সৌদি জোট ধরে রাখতে পারবে কি না, এখনো নিশ্চিত নয়।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে বলেন, ‘তাদের কমান্ড সেন্টারগুলো একীভূত করতে হবে এবং এ জোটের ভেতরের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যদি (হুতিদের কাছ থেকে) মুক্ত করা অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তবে এ ভূখণ্ডগত অর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।’

অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য মনে করেন, ইয়েমেনের এ লড়াই মূলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। আর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এ সংঘাত যত দিন চলবে, তত দিন সৌদি আরবকে বিপর্যস্ত রাখতে হুতিদের উসকে দেওয়ার শক্তিশালী কারণ ইরানের থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে অথবা হুতি নেতৃত্বকে নির্মূল করতে তাদের সামরিক হামলা আরও জোরদার করতে পারে।

তবে র‍্যাটনি বলেন, ‘এ দুটি পরিস্থিতির কোনোটিই নিকট ভবিষ্যতে ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করবে না। সৌদি আরবকে শুধু একটি ত্রুটিপূর্ণ পথ ধরেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।’

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্

সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক যোদ্ধা গাড়িতে বসানো অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রাভিযানের সময় গত সোমবার ধারণ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থির চিত্র এটি। ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের ধুবাবের কাছে
সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক যোদ্ধা গাড়িতে বসানো অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রাভিযানের সময় গত সোমবার ধারণ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থির চিত্র এটি। ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের ধুবাবের কাছে। ছবি: রয়টার্স

পকেটমারদের সহজ লক্ষ্য কারা, জানলে অবাক হবেন

প্রকাশ ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ ইনস্টাগ্রামে লুইস গানসন নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পোস্ট ভাইরাল। সেই পোস্টের শিরোনাম ‘আমি একজন পকেটমারকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁরা কাদের টার্গেট করেন। উত্তর শুনে আমি তখনই নিজের জ্যাকেট বদলেছি।’ পোস্টটি ইতিমধ্যে ১২ মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে। লুইস সম্প্রতি একজন পকেটমারের সঙ্গে কথা বলেছেন। লুইস সেই পকেটমারের কাছে জানতে চেয়েছেন যে তাঁরা (পকেটমাররা) কাদের নিশানা বানান? উত্তরটা জানলে আপনি বাইরে যাওয়ার আগে আপনার পোশাক নিয়ে আরেকবার ভাববেন।

হয়তো ভাবতে পারেন, যাঁদের দেখে মনে হয় ধনী, পকেটমাররা তাঁদেরই লক্ষ্য করে। আসলে পকেটমার সাধারণত এমন মানুষদের টার্গেট করে, যাঁদের কাছ থেকে চুরি করা সবচেয়ে সহজ। তাঁদের ‘ধনী দেখায় কি না’, সেটা দেখে না, বরং দেখে, কে সবচেয়ে অসাবধান। পকেটমার সাধারণত কাদের পকেট মারে, জেনে নিন।

১. যাঁরা ফোনে ব্যস্ত থাকেন
বারবার ফোন চেক করলে বা হাঁটতে হাঁটতে ফোনে ডুবে থাকলে অন্য দিকে মনোযোগ থাকে না। আর পকেটমার সেই দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিতে ভুল করে না।

২. যাঁরা পেছনের পকেটে টাকা রাখেন বা ব্যাগের চেইন খোলা থাকে
পেছনের পকেটে মোবাইল, মানিব্যাগ বা টাকা রাখার অর্থ হলো পকেটমারদের নীরব ইশারায় ডেকে আনা। লুইস যে পকেটমারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তিনি বলেছেন, ‘পেছনের পকেটে যা কিছু, আমরা মনে করি সেসব আমাদের। আর কারও ব্যাগের চেইন খোলা মানে সেটা তো আমাদের জন্য একদম ফ্রি! যে (পকেটমার) নিতে পারল না, সেটা তার নিতান্তই ব্যর্থতা।’

৩. যাঁরা ঢিলেঢালা পোশাক বা জ্যাকেট পরেন
কেননা ঢিলেঢালা কাপড়ে হাত ঢুকিয়ে চট করে কিছু নেওয়া সহজ। আবার ভুক্তভোগীদের পক্ষে টের পাওয়াও কঠিন।

৪. যাঁদের চিন্তিত বা বিভ্রান্ত দেখায়
অন্য কিছুতে ব্যস্ত থাকায়, চারপাশে খেয়াল না করায় সহজেই অনেকে পকেটমারের শিকার হয়ে যান।

৫. যাঁরা সব সময় ব্যস্ত
তাড়াহুড়া করলে চারপাশ দেখা হয় না, খেয়াল থাকে না। পকেটমারেরা সেই সুযোগই লুফে নেয়।

৬. যাঁরা পাবলিক প্লেসে নিজের মূল্যবান জিনিস স্পর্শ করে
এতে চোর বুঝে যায়, জিনিসটা ঠিক কোথায় আছে।

৭. যিনি দলে থেকেও অসাবধান থাকেন
এটা পকেটমারদের জন্য দারুণ সুযোগ। দলবদ্ধ ও অমনোযোগীরা পকেটমারদের অন্যতম সহজ টার্গেট। কেননা পাশে কেউ এলেও ভুক্তভোগীরা আলাদা করে খেয়াল করেন না। চুরির অনেকক্ষণ পর পর্যন্ত টেরও পান না। ফলে সহজে পকেটমার কাজ সেরে দিব্যি নিরাপদ জায়গায় সটকে পড়তে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-02%2F8fwrfts6%2Fclose-up-man-preparing-steal-from-young-woman.jpg?rect=606%2C0%2C3266%2C2177&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যাঁরা ফোনে ব্যস্ত থাকেন, পকেটমাররা তাঁদেরই লক্ষ্য করে। ছবি: ফ্রি পিক

কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে নরেন্দ্র মোদি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণঃ এক সপ্তাহ হয়নি শাসক হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ২৫ বছর পূর্ণ করেছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন টানা ১৩ বছর, পরের ১২ বছর দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আরও তিন বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাটিয়ে দেবেন এবং পরের লোকসভা ভোটেও দল ও জোটের নেতৃত্ব দেবেন— এই বিশ্বাসে এখনো মগ্ন বহু মানুষ। এই সিকি শতকে দল কিংবা বিরোধী পক্ষে এমন কোনো মুখ দেখা যায়নি, যা মোদিকে ছাপিয়ে যেতে পারে। তবুও এই মুহূর্তে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। কেননা, রাজনৈতিক ভাগ্য অথবা কর্মফল আবার তাঁকে এক মোক্ষম পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারেও তিনি উতরে যাবেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

২৫ বছরে মোদিকে কম চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মুখোমুখি হতে হয়নি। ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কচ্ছের ভয়ংকর ভূমিকম্পের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। পরের বছর গোধরাকান্ড এবং গুজরাটের দাঙ্গা। দলের শীর্ষ নেতাদের প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। অটল বিহারি বাজপেয়ীর রোষানলে পড়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব যখন প্রায় যায় যায়, তখন পরিত্রাতা হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তৎকালীন বিজেপির লৌহপুরুষ লালকৃষ্ণ আদভানি। গুজরাট দাঙ্গার রেশ কম দিন চলেনি দেশে ও বিদেশে। এক ও অদ্বিতীয় ‘ম্যান ফ্রাইডে’ অমিত শাহর গ্রেপ্তারি, দাঙ্গা–সম্পর্কিত মামলা, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল করে দেওয়ার মতো অসম্মান সামাল দিয়ে ক্রমে তিনি আরও শক্তি সঞ্চয় করেছেন এতটাই যে ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে কংগ্রেসের মোকাবিলায় আরএসএস তাঁকেই তুরুপের তাস হিসেবে মেলে ধরে। তারপর তো ইতিহাস।

প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোদি যে নিস্তরঙ্গ জীবন কাটিয়ে চলেছেন, তা নয়। নিজের অজান্তে নিজেই বিপদ ডেকে এনেছেন নোটবন্দীর ঘোষণা দিয়ে। জিএসটি (পণ্য ও পরিষেবা কর) চালু করা নিয়েও কম বিরোধিতা সহ্য করতে হয়নি। সীমান্তপারের বিরোধও তাঁকে তটস্থ রেখেছে। প্রথমে উরি, পরে পুলওয়ামা। আত্মরক্ষার্থে ব্যর্থ হয়েও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কীভাবে অনুকূল করতে হয়, তা তিনি দেখিয়েছেন। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে আরও বেশি আসনে জয়ী হয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কট্টর হিন্দুত্ববাদী প্রচার ও ইলেকশন মেশিনারি কি অসাধ্য সাধন করতে পারে। করোনা মহামারির সময় নরেন্দ্র মোদি তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষেধক সরবরাহ করেন। এতে তিনি নিজেকে বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিপন্নের চেষ্টা করেছেন। গলওয়ানে চীনের আগ্রাসনে বিধ্বস্ত হয়েও পা হড়কাতে দেননি। কৃষক বিদ্রোহে টালমাটাল হয়েছেন; কিন্তু বাধ্য হয়ে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছেন। বুঝিয়েছেন কোন সময় ব্রেক কষতে হয়।

২০২৪ সালের ভোটে কম আসনে জিতেও গত দুই বছরে একবারের জন্যও কাউকে বুঝতে দেননি সরকার চালাতে ও জোট অটুট রাখতে মোদিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ললাটলিখন বদলে দিয়ে সাফল্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ থেকে কুসুমকোমল করে ফেলার নমুনা তাঁর চেয়ে ভালো এ দেশের আর কোনো জননেতা দেখাতে পারেননি এখনো।

আগের সঙ্গে এবারেও এই সংকট মোদি কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না, হঠাৎ সেই প্রশ্ন আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘের মতো গগন ছেয়ে ফেলেছে। সংবিধানসম্মতভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন পরিচালনা করছেন কি না, আইন মেনে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর হয়েছে কি না, বিজেপির স্বার্থে জ্ঞানেশ কমিশনকে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছেন কি না, নিরপেক্ষতার নামাবলি গায়ে চড়িয়েও তিনি মোদি–শাহর অন্ধ অনুগামী হিসেবে কাজ করছেন কি না, এসব মারাত্মক অভিযোগ এখন সরকারের সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এত দিন যেসব অভিযোগের তির সরকারের দিকে ধাবিত হয়েছে, তার প্রতিটিই এসেছে বিরোধী মহল থেকে।

এই প্রথম বিরোধীদের তোলা প্রশ্ন ও বিপক্ষের সন্দেহে ধুনো দিয়েছেন এমন দুজন, যাঁরা জ্ঞানেশ কুমারেরই সহযোগী, যাঁদের নিয়োগকর্তাও মোদি–শাহ। প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলল, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর স্টোরি ‘অসত্য’ বলে ‘জ্ঞানেশ অ্যান্ড কোং’ বিবৃতি দেননি। তিন কমিশনার এখনো সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগগুলো খণ্ডন করেননি; বরং তাঁদের প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকারান্তরে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছে—সংবাদপত্রটির তোলা প্রতিটি অভিযোগই সত্য।

আগের সঙ্গে এবারের এই সংকট বা চ্যালেঞ্জের পার্থক্য রয়েছে অনেক দিক থেকে। এই প্রথম অভিযোগের তির উঠেছে সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, যার কর্তাদের নিয়োগপদ্ধতি মোদি সরকার নিজেদের অনুকূলে তৈরি করেছেন। সিইসি ও ইসি নিযুক্তির কমিটি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে সে জায়গায় মন্ত্রিসভার আরও এক সদস্যকে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট—সরকার তার ‘ইয়েসম্যান’দের হাতেই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে বদ্ধপরিকর। তিন কমিশনারকে আজীবন আইনি রক্ষাকবচ দেওয়ার সিদ্ধান্তও অভূতপূর্ব ও বিতর্কিত। এমন ইমিউনিটি বা ছাড় রাষ্ট্রপতির নেই, প্রধানমন্ত্রীর নেই, প্রধান বিচারপতিরও নেই। কেন ওই রক্ষাকবচ! কার স্বার্থে, নির্বাচন কমিশনকে কোন অপকর্মের জন্য সরকার ওই রক্ষাকবচ দিয়েছে—এই মারাত্মক প্রশ্নগুলো জনমনে তোলপাড় করছে। মোদি সরকারের কাছে এখনো এর জুতসই জবাব নেই। দুটি বিষয়ই আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন।

এতকাল মোদির সামনে সমস্যা হাজির করেছে হয় রাজনৈতিক দল, নয়তো ব্যক্তিবিশেষ; অথবা কৃষক, শ্রমিক, চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবী মহল ও সরকারি কর্মচারীরা। এই প্রথম মাথা তুলে সরকারের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তুলেছে দেশের জেন–জি সম্প্রদায়। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের জেন–জি কি বিশাল পরিবর্তন ঘটিয়েছে, সবার তা জানা। অকুতোভয় এই মহলের সঙ্গে জুটি বেঁধেছে জেন আলফা। এক যুগ ধরে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের নীতি ও কাজকর্ম একধরনের রাজনৈতিক ক্লান্তি ও অবসাদ সৃষ্টি করেছে। সেখানে সরকারের প্রতি জেন–জির এই অনাস্থা বিরোধীদেরও অতি উৎসাহিত করে তুলেছে। এই আন্দোলন এখনো ঠাসবুনট নয়। বিরোধীরাও সবাই মোদি–বিরোধিতায় বরফজমাট নয়। বিজেপিও ইতিমধ্যে ঠিক করেছে, লড়াইটাকে তারা ‘দেশপ্রেমী বনাম দেশবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবাদী বনাম বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘স্বদেশের বিরুদ্ধে বিদেশি চক্রান্তের’ তকমা দেবে। বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীনও তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মোদির ভারতের অগ্রগতি যাদের চক্ষুশূল, সেই বিদেশি শত্রুরাই সরকারের বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত করছে। এই লড়াই তাই প্রকৃত ভারতীয়র সঙ্গে ভারতবিরোধীদের।

এভাবেই নরেন্দ্র মোদি সিকি শতক জয়ী হয়েছেন। তিনি কট্টর হিন্দুত্ববাদে সওয়ার হয়ে ‘হিন্দুস্তান–পাকিস্তান’–এর জিগির তুলে নির্বাচনী ভাগ্য গড়ে তুলেছেন। এই প্রথম সেই নির্বাচন কমিশন মোক্ষম প্রশ্নের মুখে। আর গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার সেই প্রশ্ন তুলেছে জেন–জি। মনে রাখতে হবে, ২০২৯ সালে ভারতে জেন–জি জনসংখ্যা হবে ৩৮ কোটি। এর সঙ্গে জেন আলফা যুক্ত হলে পরবর্তী লোকসভায় এই দুই শ্রেণির মোট ভোটার হবে ৮০ কোটি। এদের বিরোধিতা করে হিন্দুত্ববাদের পালে হাওয়া দিয়ে সুশাসনের তরি বেয়ে নরেন্দ্র মোদি পাড়ে উঠতে পারবেন কি? পারবেন কি সব রাজনৈতিক জল্পনা নস্যাৎ করে মাথা উঁচু রাখতে? সন্দেহ নেই এটাই সম্ভবত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পুলিশের ব্যারিকেড ও চেক পয়েন্ট দিয়ে যানবাহন ও হেঁটে মানুষ পার হচ্ছেন। দিল্লির সড়কে রোববারও মানুষের আনাগোনা কম। ১১ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লি
পুলিশের ব্যারিকেড ও চেক পয়েন্ট দিয়ে যানবাহন ও হেঁটে মানুষ পার হচ্ছেন। দিল্লির সড়কে রোববারও মানুষের আনাগোনা কম। ১১ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: রয়টার্স

গাজা যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ

দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিতর্কঃ গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দেয়নি, বরং বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক অবস্থান নিয়েও গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংঘাত শুরুর তিন বছর পরও এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। গাজা যুদ্ধের প্রভাব এখন আর কেবল ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত কাঠামো এবং পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকেও প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক।

গাজা থেকে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় ইসরাইলের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সেখানে বিপুল প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং আবাসিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ধ্বংস ঘটে।

গাজার যুদ্ধ ক্রমে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক সংঘর্ষ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরো জটিল করেছে। ইয়েমেনসহ অন্যান্য অঞ্চলেও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে।

এই পরিস্থিতি দেখিয়েছে যে একটি ভূখণ্ডে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কীভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক জোট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিতে পারে। যুদ্ধের বিস্তার শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক নৌপথ, আঞ্চলিক বিনিয়োগ, শরণার্থী পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে দ্বৈত নীতির অভিযোগ

আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে পশ্চিমা দেশগুলোর ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইউক্রেনের প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের পক্ষে এসব নীতি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও বেসামরিক মানুষের বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষত ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের অব্যাহত সমর্থন আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগকে জোরালো করেছে।

একই ধরনের আন্তর্জাতিক নীতি এক ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং অন্য ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মিত্রের কারণে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেওয়া পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান এক নয়। তাদের মধ্যে সামরিক সহায়তা, অস্ত্র রপ্তানি, যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং ইসরাইলের নীতির সমালোচনা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। তাই পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে একটি অভিন্ন অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশভিত্তিক নীতি ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি সহিংসতা

গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সংঘাতের অবসানের প্রত্যাশা তৈরি করলেও তা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। ওই দিন গাজায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হন বলে চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী হামাসের সদস্যদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর কথা জানায়; হামাসের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং গাজার পুনর্গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য শুধু গোলাগুলি বন্ধ করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ, জিম্মি ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে সমাধান, গাজার পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ। যুদ্ধবিরতি বারবার ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষের জীবন আরো অনিশ্চিত হয়ে ওঠে এবং কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়।

সামরিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা

গাজা যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সামরিক লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং আক্রমণের পরিকল্পনায় স্বয়ংক্রিয় বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এ ধরনের প্রযুক্তি সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য শনাক্তকরণে ভুল, অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভরতা এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্ধারণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক মানুষ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, আনুপাতিকতার নীতি অনুসরণ করা এবং সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হলেও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব বিলুপ্ত হয় না। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যত বাড়ছে, যুদ্ধের মানবিক ও আইনগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও কি ততটা শক্তিশালী হচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে জনমতের পরিবর্তন

গাজা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম, প্রগতিশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিবর্তন পশ্চিমা সরকারগুলোর পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তাদের সমাজের কিছু অংশের মূল্যবোধের ব্যবধানকে সামনে এনেছে। ফিলিস্তিনিদের মানবিক দুর্দশা, যুদ্ধবিরতির দাবি এবং ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরো তীব্র হয়েছে।

তবে জনমতের পরিবর্তনকে সব জনগোষ্ঠী বা সব রাজনৈতিক দলের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিভিন্ন জরিপে মতামতের পার্থক্য দেখা যায় এবং সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থানও বদলায়। তা সত্ত্বেও গাজা যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

গাজা যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হতে পারে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট। আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর হবে কি না, তা শুধু আইন ও চুক্তির অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কোনো রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বা আন্তর্জাতিক মিত্রতার কারণে তার কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে অন্য রাষ্ট্রগুলোও আন্তর্জাতিক নিয়মের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এতে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনকে শুধু গাজা যুদ্ধের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথাযথ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থান এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতাও বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। গাজা যুদ্ধ এসব বিদ্যমান টানাপোড়েনকে আরো দৃশ্যমান করেছে।

যুদ্ধের অবসানই বড় পরীক্ষা

গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও পশ্চিমা নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংঘাতের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অসামঞ্জস্য নিয়ে বিতর্ক বিশ্বরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এই পরিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো নির্ধারিত নয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণ এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।

গাজা যুদ্ধের তিন বছর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তাই দুটি পরস্পর সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতার বিস্তার থামানো, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও জবাবদিহির প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই দুই ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া স্থায়ী শান্তি এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স

গাজা যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ

ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের জটিল সমস্যা চারকোট আর্থ্রোপ্যাথি কেন হয়, চিকিৎসা কী by ডা. সাকিব আল নাহিয়া

চারকোট আর্থ্রোপ্যাথি পায়ের সন্ধিগুলোর একটি জটিল অবস্থা। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের কারণে এতে পায়ের স্নায়ু দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ব্যথা কম অনুভূত হয়। এ ছাড়া অজান্তেই হাঁটাচলার কারণে পায়ের হাড়-অস্থিসন্ধি ভেতরে-ভেতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। হাড় ও সন্ধি বিকৃত হয়ে পড়ে।

কেন হয়, লক্ষণ কী

দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের কারণে স্নায়ু বিকল হওয়ার কারণে এটা হয়। ব্যথা কম অনুভূত হওয়ায় ছোট ছোট আঘাত টের না পেয়ে হতে পারে। আর হাঁটাচলায়
হাড়ে বাড়তি চাপ পড়ার কারণে ক্ষুদ্র হাড়ের অংশে ধীরে ধীরে ভাঙন হয়। এ ছাড়া অ্যালকোহলিক নিউরোপ্যাথি, কুষ্ঠরোগ, সিফিলিস, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির মতো কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে।

প্রথম দিকে পা গরম, লাল ও ফুলে যায়। এ ধরনের সমস্যায় স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে ব্যথা প্রায় থাকে না। পা ঢিলে মনে হয় বা অনুভূতিশূন্য মনে হয়। পরে ধীরে ধীরে হাড় ভেঙে বিকৃতি দেখা দেয়। একে বলে রকার বটম ডিফরমিটি। পায়ের তলায় ক্যালাস বা ঘা থাকতে পারে। হাঁটাচলায় সমস্যা হতে থাকে।

রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা

পায়ের এক্স-রে বা এমআরআই করে রোগ নির্ণয় করা হয়। আক্রান্ত পায়ের তাপমাত্রা অপর পায়ের তুলনায় বেশি থাকে। রক্ত পরীক্ষায় সচরাচর সংক্রমণের মতো উচ্চ মার্কার থাকে না।

এ সমস্যার চিকিৎসার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় টোটাল করটাক্ট কাস্ট ব্যবহার করা, যাতে আক্রান্ত পাটির কোনো ওজন না নিতে হয়। ওজন না নিয়ে চলাফেরার জন্য ক্রাচ বা হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হবে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যথা থাকলে ব্যথানাশক ওষুধ খেতে হবে। ঘা থাকলে তার চিকিৎসা প্রয়োজন। পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসায় বিশেষ ধরনের জুতা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজনও হতে পারে।

আরেকটি হলো ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাপনা। এ ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে কোনোভাবেই ওজন না নিতে হয় তেমন ব্যবস্থা করা, যাকে নন–ওয়েট বিয়ারিং বলা হয়ে থাকে। ক্রাচ/ওয়াকার ব্যবহার শেখানো হয়। পা উঁচু করে বিশ্রাম নেওয়া।

অ্যাংকেল আইসোমেট্রিক, হিপ নি স্ট্রেংথ, কোর এক্সারসাইজের মতো ব্যায়াম করতে হবে। খালি পায়ে হাঁটা যাবে না। পরবর্তী পর্যায়ে ধীরে ধীরে ওজন নিতে হবে। হাঁটার প্রশিক্ষণ, পায়ের শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, ভারসাম্য রক্ষার প্রশিক্ষণ ও প্রতিদিন পায়ের তলা পর্যবেক্ষণ করার মতো কাজগুলো করতে হবে।

দৈনন্দিন জীবনে করণীয়

সহায়ক জুতা ব্যবহার করতে হবে। ডায়াবেটিসের রোগীরা খালি পায়ে কখনো হাঁটবেন না। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। সিঁড়ি যতটা পারা যায় কম ব্যবহার করবেন। ভারী জিনিস তোলা যাবে না।

রান্না/কাপড় ধোয়ার কাজ বসে করতে হবে। প্রতিদিন আয়নায় পায়ের তলা পর্যবেক্ষণ করুন। সঠিক পুনর্বাসনের জন্য ফিজিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।

* ডা. সাকিব আল নাহিয়ান, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-04%2F03z3c3f6%2FThumb.jpg?rect=125%2C0%2C1350%2C900&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চারকোট আর্থ্রোপ্যাথি পায়ের সন্ধিগুলোর একটি জটিল অবস্থা; দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের কারণে এতে পায়ের স্নায়ু দুর্বল হয়ে যায়। ছবি: দ্য ফিট পিপল