Thursday, October 15, 2026

হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতানিয়াহুকে কেন বাধা দিলেন সৌদি যুবরাজ

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে ইসরায়েলকে যুক্ত করার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের কাছে এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ। তবে সৌদি জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় যুবরাজ এতে আপত্তি জানান বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু সরকারের ধারণা ছিল যে ইয়েমেনে সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক জোরদার করা সম্ভব হবে। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথও তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের এখনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

রিয়াদের অবস্থান হলো, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ নিশ্চিত না হলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর অঙ্গীকার করেছেন।

সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের খবর নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর মধ্যেই হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। হামলার পর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম শনিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং বিভিন্ন উড়োজাহাজ সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করে।

সৌদি আরবের যুবরাজের পাশাপাশি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ফলে তার সম্মতি ছাড়া ইয়েমেনের যুদ্ধে ইসরায়েলের অংশ নেওয়ার অনুমতি পাওয়া কঠিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের শরৎকালে দুই দেশ একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে নেতানিয়াহু হামাসের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানো এড়াতে চেয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামাসের পরিকল্পনা সম্পর্কে নেতানিয়াহুকে প্রথম সতর্ক করেছিলেন সৌদি যুবরাজ নিজেই। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সেই সতর্কবার্তা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়। হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়াকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল ইসরায়েল। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেওয়ার আগ্রহের পেছনেও এই হিসাব কাজ করে থাকতে পারে।

এদিকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় ইরান রিয়াদকে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় এ প্রস্তাব দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

আরাগচি বলেন, ‘সামরিক পন্থার ওপর জোর দেওয়া এবং রাজনৈতিক সমাধান উপেক্ষা করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।’

তিনি আরও বলেন, অঞ্চলের সংকটগুলোর সামরিক সমাধান নেই। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সহায়তা দিতে তেহরান প্রস্তুত।

সূত্র : মিডলইস্ট আই
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

যৌনতা আছে কিন্তু ‘আগ্রা’ কেবল যৌনতা নিয়ে নয় by লতিফুল হক

প্রকাশ ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ মানুষ কেন যৌন সম্পর্ক তৈরি করে? সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য? সম্পর্কের বন্ধন গড়ার জন্য? নাকি শারীরিক ও মানসিক তৃপ্তির জন্য? ২০১৪ সালে ‘তিতলি’ বানিয়ে চমকে দিয়েছিলেন কানু বেহেল; এবার ‘আগ্রা’য় তিনি যৌনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর গভীর অনুসন্ধান করেছেন। এ সিনেমা দেখায়, যৌনতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

- একনজরে
- সিনেমা: ‘আগ্রা’
- নির্মাতা: কানু বেহেল
- অভিনয়: মোহিত আগরওয়াল, রাহুল রায়, প্রিয়াঙ্কা বোস, রুহানি শর্মা, বিভা চিব্বার
- দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ১২ মিনিট

সিনেমার মূল চরিত্র গুরু (মোহিত আগরওয়াল), বছর চব্বিশের যুবক; যার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে দুঃস্বপ্নের মতো। সেই ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার যৌন চাহিদার প্রকাশ এমনভাবে দেখিয়েছেন নির্মাতা, যা অনেক দর্শকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।

কানু বেহেল ও সহচিত্রনাট্যকার আতিকা চোহানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমরা দেখি, কীভাবে বিষাক্ত পিতৃতন্ত্র নারীর প্রতি পুরুষের মনে বিদ্বেষ তৈরি করে। গুরুর জীবনের নারী চরিত্ররা—মালা (রুহানি শর্মা), মা (বিভা চিব্বার) এবং পরে প্রীতি (প্রিয়াঙ্কা বোস)—শুধু গল্পের অংশ নয়; তারা যে গুরুর ভেতরের অন্ধকার ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন।

কে কোন ঘরে থাকবে, কার ওপরে কার নিয়ন্ত্রণ—সবই যেন মনস্তত্ত্বের প্রতীক। ছেলের কামনা, বাবার মালিকানা, ওপরের ঘরে ‘মিসট্রেস’-এর উপস্থিতি; প্রতিটাই লুকানো ক্ষমতার খেলা, নিয়ন্ত্রণ-লজ্জা-স্বাধীনতার টানাপোড়েন।

নিজের বন্ধ কক্ষ আর ‘ব্যর্থ জীবন’ গুরুকে ঠেলে দেয় একাকিত্ব আর ডিজিটাল যৌন কল্পনার দিকে। সহকর্মীর প্রতি আকর্ষণ তাকে বিভ্রমের জগতে নিয়ে যায়। বাড়িতে ফিরে বয়স্কদের দ্বন্দ্ব, অফিসে নিজের অসহায়ত্ব—সব মিলে সে ক্রমেই ভেঙে পড়ে। এ অবস্থায় বাড়িতে বোনের আগমন বাড়ির ক্ষমতার লড়াইকে আরও জটিল করে তোলে।
যখন মনে হয় গল্পটা পুরুষদের যৌন হতাশার বিজ্ঞাপনে পরিণত হবে, তখনই হাজির হন প্রীতি (প্রিয়াঙ্কা বোস); পোলিওতে আক্রান্ত এক বিধবা যে নিজস্ব আইনি ঝামেলায় জর্জর। প্রীতি চরিত্রটি হয়ে ওঠে গুরুর জন্য আবেগের মোড়।

একাকিত্ব আর সামাজিক ক্ষতই তাদের কাছে টেনে আনে। দুই ভেঙে পড়া মানুষ, যারা সমাজের চোখে অপূর্ণ; একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পূর্ণতা খুঁজে পায়। সিনেমাটি সূক্ষ্মভাবে যৌনতা আর সামাজিক প্রভাবের মিল দেখায়, বুঝিয়ে দেয় ট্রমা কীভাবে কামনা আর হিংসার জন্ম দিতে পারে।

ছবিতে কোনো ‘পরিচ্ছন্ন’ চরিত্র নেই। ইচ্ছাকৃতভাবেই বেহেল দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলেছেন বারবার। তিনি চেয়েছেন, দর্শক যেন নিজেদের অস্বীকার করা অন্ধকারের মুখোমুখি হয়। ছবির প্রতিটি ফ্রেমে উঁকি দেয় আতঙ্ক আর নীরব চাপা অস্বস্তি।
এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে সিনেমা নির্মাণে অনেক ভারতীয় নির্মাতা কমেডির আশ্রয় নেন, তবে কানু বেহেল কোনো রাখঢাক না রেখেই তিক্ত বাস্তব দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন।

গল্পের কিছু অংশ খানিকটা দুর্বল। সিনেমাটিতে নিম্নমধ্যবিত্ত ভারতীয় জীবন—ছোট বাড়ি, ব্যক্তিগত জায়গার অভাব, পারিবারিক চাপ—দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিক হলেও শেষ দিকে কিছুটা সহজ সমাধান মনে হয়।

অভিনয়ের দিক থেকে সবাই নিজেদের জায়গায় দুর্দান্ত। গুরুর চরিত্রে মোহিত আগরওয়াল, তাঁর বাবার চরিত্রে রাহুল রায় সিনেমার মূল আকর্ষণ। প্রিয়াঙ্কা বোস, বিভা চিব্বার, অঞ্চল গোস্বামী, রুহানি শর্মা নিজেদের চরিত্রে মনে রাখার মতো কাজ করেছেন।

কানু বেহেলের ‘আগ্রা’ চলতি বছর মুক্তি পাওয়া ভারতের সবচেয়ে সাহসী সিনেমাগুলোর একটি। এখানে নির্মাতা যৌনতার মোড়কে তিনি আলো ফেলেছেন সমাজের এক অন্ধকার দিকে; যা আমরা দেখেও দেখি না।
‘আগ্রা’ সবার জন্য নয়; দেখতে গিয়ে বারবার অস্বস্তিতে পড়তে হবে। তবে সেসব অস্বস্তি কাটিয়ে যাঁরা দেখতে পারবেন, তাঁদের অনেকের এ সিনেমার কথা অনেক দিন মনে থাকবে।

'আগ্রা' সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য৷ কোলাজ
'আগ্রা' সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য৷। কোলাজ