অবসান হবে ট্রাম্পের একরোখা সিদ্ধান্তের, শান্তি ফেরার আশা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির বিশ্লেষণঃ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট বা আমেরিকা প্রথম’ নীতি ও তার আকস্মিক ও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দোলাচল সৃষ্টি করেছে। স্নায়যুদ্ধ-উত্তর যুগে বিশ্বরাজনীতিতে ওয়াশিংটন যে একক আধিপত্য ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তি গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো তাকে নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে বহুপক্ষীয় জোটগুলো থেকে পিছু হটার নীতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে যেমন ঝুঁকিতে ফেলেছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতিতেও তৈরি করেছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু এবং পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

এ ছাড়া ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ওপর সামরিক আক্রমণ বৃদ্ধির জবাবে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়েছে। ফলে সুয়েজ খালভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমনকি বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে চরম বাণিজ্য শুল্ক ও প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে তাইওয়ান প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

ট্রাম্পের সংঘাতময় নীতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে সংকটের কারণে অপরিশোধিত আন্তর্জাতিক তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে চরম মূল্যস্ফীতি ডেকে আনে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও প্রতিবেশী দেশের পণ্যের ওপর ঢালাও শুল্ক আরোপ করার ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি স্তিমিত হয়ে যায়।

বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্ক থেকে আমেরিকার সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করেছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে ফের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অর্থায়ন বন্ধের হুমকিতে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বড় ধাক্কা খেয়েছে। এ ছাড়া ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের কঠোর মনোভাব ও জোট ছাড়ার হুমকিতে ইউরোপীয় নিরাপত্তার ভিত্তি নড়ে উঠেছে।

দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে দেখা হলেও, ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতির কারণে মিত্র দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের নীতিগত স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর সংশয়ে ভুগছে। একতরফা সিদ্ধান্ত ও ঘনঘন অবস্থান বদলের কারণে বৈশ্বিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

ওয়াশিংটন যে কৌশলগত ও কূটনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে, চীন ও রাশিয়া তা দ্রুত পূরণ করছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য এবং গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল বিশ্ব) বিশ্বস্ত অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে স্থান করে নিচ্ছে। এমনকি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত করে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে একমেরু থেকে বহুমেরুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায়

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী ‘পাওয়ার অব দ্য পার্স’ বা অর্থ বরাদ্দের চূড়ান্ত ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। নতুন কংগ্রেস প্রতিরক্ষা বাজেটে নির্দিষ্ট আইনি শর্ত জুড়ে দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের অর্থায়ন বা একতরফা বিদেশি সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে। এর ফলে প্রেসিডেন্টের একক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করা সম্ভব।

ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি থেকে বাঁচতে মিত্র দেশগুলোকে স্বাবলম্বী হতে হবে। ন্যাটোর ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা তহবিল ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে হবে। এ ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিজেদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জোট শক্তিশালী করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র অনুপস্থিত থাকলেও গ্লোবাল সাউথ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনকে জলবায়ু চুক্তি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম মেনে চলার অঙ্গীকার বজায় রাখতে হবে। এমনকি ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে মার্কিন একতরফা নীতি এড়িয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অধীনে বহুপক্ষীয় আলোচনা ফের চালু করতে হবে।

ট্রাম্পের নীতি এ কথা স্পষ্ট করে, একক কোনো দেশের খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করতে পারে না। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলি একক কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে।

অবসান হবে ট্রাম্পের একরোখা সিদ্ধান্তের, শান্তি ফেরার আশা
অবসান হবে ট্রাম্পের একরোখা সিদ্ধান্তের, শান্তি ফেরার আশা