ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেস, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে যে ৫ পরিবর্তন আসতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ- কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে দুই বছর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওয়াশিংটনে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে সামরিক অভিযান ও ব্যয়ের ওপর এবার কঠোর নজরদারি চালাতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।

নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ ছিল, রিপাবলিকানরা যুদ্ধ পরিচালনা ও সরকারি ব্যয়ের বিষয়ে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। এখন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় এসব ক্ষমতা ব্যবহারে ট্রাম্পকে চাপে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের সামনে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসের কারণে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে পাঁচটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

১. ইরান যুদ্ধ নিয়ে চাপ বাড়বে

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প। যুদ্ধ বন্ধে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার দাবি জানিয়ে ডেমোক্র্যাটরা একাধিকবার প্রস্তাব এনেছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই পাস হয়। কয়েকজন রিপাবলিকানও এতে সমর্থন দেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব কার্যকর করেনি।

এবার কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার দাবিও তুলতে পারেন তারা। পাশাপাশি যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশাসনকে আইনপ্রণেতা ও সাধারণ মানুষের কাছে নিয়মিত তথ্য দিতে বাধ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

২. ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তার সুযোগ

রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ইউক্রেনকে সরাসরি সামরিক ও আর্থিক সহায়তা অনেকটাই বন্ধ রেখেছেন ট্রাম্প। তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের অনেক আইনপ্রণেতাই যুক্তরাষ্ট্রের এই সহায়তার পক্ষে।

সম্প্রতি রুশ জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় কংগ্রেসের অনেক সদস্য, এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হাতে পাওয়ার পর কোন প্রস্তাব নিয়ে কখন ভোট হবে, তা নির্ধারণ করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা অনুমোদনের উদ্যোগ নিতে পারে তারা।

ট্রাম্প কোনো সহায়তা প্রস্তাবে ভেটো দিলেও কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পেলে তা অগ্রাহ্য করা সম্ভব। ইউক্রেনকে সহায়তার প্রশ্নে দুই দলের অনেক আইনপ্রণেতার সমর্থন থাকায় এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩. ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা কমানো

গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে সহিংসতা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমেছে।

ইসরায়েলকে বছরে নিয়মিত ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের সময় এর বাইরে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এবার ডেমোক্র্যাটরা এই সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারেন। চলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, কয়েকজন ডেমোক্র্যাট ভারী বোমার মতো অস্ত্র সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

৪. সামরিক ব্যয় কমানো ও বিদেশি সহায়তা পুনর্বহাল

সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। এ বছর সামরিক বাজেট ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা না করা এবং সামাজিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা এতে বাধা দেন।

এ ছাড়া কংগ্রেস অনুমোদিত কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিদেশি সহায়তা আটকে দিয়েছেন বা বাতিল করেছেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা এসব অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নিতে পারেন। অতীতে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও বিদেশি সহায়তার বিষয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলেরই ব্যাপক সমর্থন ছিল।

৫. লাতিন আমেরিকায় মার্কিন নীতি নিয়ে বাড়বে নজরদারি

সাম্প্রতিক সময়ের অন্য প্রেসিডেন্টদের তুলনায় পশ্চিম গোলার্ধে অনেক বেশি কঠোর নীতি অনুসরণ করেছেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং দেশটির উপকূলে নৌযান লক্ষ্য করে এক বছরের বেশি সময় ধরে চালানো প্রাণঘাতী হামলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে চাপে রাখতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া হন্ডুরাস, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের নির্বাচনেও মার্কিন প্রশাসন প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ নিয়ে তদন্ত ও শুনানির দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট। কিউবার সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে কেউ কেউ দেশটির নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্র: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা। ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা। ফাইল ছবি