ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টায় নিজের ক্ষমতা দুর্বল করে ফেললেন ট্রাম্প

ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে ইরানের নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থাকে কটাক্ষ করেছেন তিনি; কখনো শাসকগোষ্ঠীর পতনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, কখনো ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ইরানে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে না পারলেও যুদ্ধের আট মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান।

যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এবং জ্বালানির চড়া দামে ক্ষুব্ধ ভোটারদের রায়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তার দল রিপাবলিকান পার্টি। ফলে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এখন নিজেই কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে ট্রাম্প।

ইরানের রাজধানী তেহরান এবং দেশটির মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনরায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তারা ভাবছেন, এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কোন পথে এগোবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় এক মিত্র দেশের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।’ মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান ওই সূত্র।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। পরে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুদ্ধের কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

উপসাগরীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের মতে, দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্পের সামনে এখন এমন একটি কংগ্রেস রয়েছে, যারা তার সামরিক পদক্ষেপের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সমঝোতায় পৌঁছানোর তাগিদ ট্রাম্পের বেড়েছে। তাদের ধারণা, ইরানে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা এখন কম। তবে পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত আকারে আরও হামলা চালিয়ে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের দাবি করে যুদ্ধের ইতি টানার পথ খুঁজতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে সংঘাতের অবসানে সমঝোতা করাতে চীনের তৎপরতাও বাড়ছে।

তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এমন কোনো সমঝোতা যদি ইরানকে স্পষ্ট বিজয় দাবি করার সুযোগ দেয় এবং ট্রাম্পকে পরাজিত হিসেবে তুলে ধরে, তাহলে সংযমের বদলে আরও বেপরোয়া পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মার্কিন ভোটারদের এই রায় এসেছে যুদ্ধের আরেক নেপথ্য কারিগর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী ধাক্কার এক সপ্তাহ পর। গত ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচনে তার ডানপন্থি জোট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৩টি পেয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আটটি আসন কম পাওয়ায় ক্ষমতা ধরে রাখতে লড়তে হচ্ছে তাকে।

রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকা এই দুই নেতা নিজেদের ভবিষ্যৎকে ক্রমেই যুদ্ধের ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসেবে তারা সংঘাত আরও বাড়ানোর কথা ভাবতে পারেন। এমন হিসাব অযৌক্তিক হলেও তা কম বিপজ্জনক নয়।

ভুল হিসাবের ঝুঁকি

আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতবি বলেন, ‘মার্কিন নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের জন্য সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে, তবে ইরানের জন্য তা সহজ করেনি।’

তার মতে, পরিস্থিতিকে তেহরান কীভাবে ব্যাখ্যা করছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি বলেন, ‘তেহরান যদি বুঝতে পারে যে ট্রাম্পের একটি সমঝোতা প্রয়োজন, তবে যেকোনো ধরনের সমঝোতা নয়, বরং প্রকৃত সমাধান। তাহলে যুদ্ধ শেষ করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু তারা যদি নির্বাচনের ফলকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ়তা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখে, তাহলে তা ট্রাম্পকে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে।’

আল-কেতবি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো চায়, এই নির্বাচন যুদ্ধের অবসানের পথ খুলে দিক। তবে যেকোনো মূল্যে নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা উপেক্ষা করে, ইরানকে জাহাজ চলাচলে টোল বা রাজনৈতিক শর্ত আরোপের সুযোগ দিয়ে কিংবা উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিক হুমকির মুখে রেখে কোনো সমঝোতা হলে তা হবে সাময়িক ব্যবস্থা। এতে ভবিষ্যতে আরেকটি সংকটের ভিত্তি তৈরি হবে।

তেহরানে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয়কে স্বাগত জানালেও সতর্কতা কমায়নি ইরানের নেতৃত্ব। দেশটির প্রধান আলোচক এই ফলকে ‘যুদ্ধ নয়’ বার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইরানের জ্যেষ্ঠ দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প নির্বাচনে পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সামরিক হামলা চালাতে পারেন, এমন আশঙ্কায় তেহরান এখনো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামান্যতম নতি স্বীকারের প্রবণতার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছেন। এতে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের দাবিতে ছাড় দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ইরানের নেই।

তদন্তের আশঙ্কায় উদ্বেগ

সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের সতর্ক করে বলেছেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের হামলার প্রবণতা কমার বদলে বাড়তেও পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ায় এবং তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ না থাকায় তাকে সংযত রাখার নির্বাচনী বিবেচনাগুলোও আর আগের মতো কার্যকর থাকবে না। ফলে হারানোর ঝুঁকি কম মনে করে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে চাইতে পারেন তিনি।

সাগেরের মতে, ক্ষমতা ছাড়ার আগে ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ‘কাজ শেষ করার’ সুযোগ হিসেবে দেখতে পারেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইরান যদি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে এবং নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরে, তাহলে ট্রাম্প হয়তো এমন পরিণতি ঠেকাতে এবং নিজের প্রেসিডেন্সির জন্য স্পষ্ট সাফল্য দাবি করতে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য বোধ করবেন।’

লেবাননের রাজনৈতিক ভাষ্যকার সারকিস নাউম বলেন, নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এতে দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেছে এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর বিকল্পও সীমিত হয়েছে।

ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচনের পর যুদ্ধের আশঙ্কা যে কমে গেছে, তা নিশ্চিত নয়। এখনো ‘বেপরোয়া পদক্ষেপের’ সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সংঘাত বাড়া ও কমার সম্ভাবনা প্রায় সমান।’

আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের অধিবেশনে আসন গ্রহণের পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসন, তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কর্মকাণ্ড তদন্তে নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করবে তারা।

ওয়াশিংটনের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য শুধু যুদ্ধের বাইরেও নানা ঝুঁকি তৈরি করেছে। সরকার সংশ্লিষ্ট চিন্তাভাবনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে সম্ভাব্য তদন্তের আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন।

সূত্র : রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: গেটি ইমেজেস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: গেটি ইমেজেস