একের পর এক ভুলে ইয়েমেন যুদ্ধে আবার জড়াল সৌদি আরব

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ বহু বছর ধরে ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও আবারও দেশটির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে বিরোধ, হুতিদের হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা; একের পর এক ভুলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের লক্ষ্য, দেশটিকে পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় সেই পরিকল্পনা আবারও ঝুঁকিতে পড়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও তেল স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি কনসার্ট, চলচ্চিত্র উৎসব ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানও স্থগিত করা হয়েছে। শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততা ১১ বছরের। শুরুতে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও পরে তাদের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে রিয়াদ। বিদ্রোহীদের সমর্থক ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে দেশটি। কিন্তু এখন আবারও সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে সৌদি আরব।

সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি সিএনএনকে বলেন, নিজেদের রূপান্তর পরিকল্পনায় মনোযোগ দিতে ইয়েমেনের সংঘাতকে সীমান্ত থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে চেয়েছিল রিয়াদ।

তিনি বলেন, ‘হুতিরা যাতে তাদের রূপান্তর পরিকল্পনায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, সে জন্য সংঘাতকে যতটা সম্ভব নিজেদের থেকে দূরে রাখাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এখন তারা নিজেরাই সংঘাতের মাঝখানে পড়ে গেছে।’

ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছে সৌদি আরব ও ইউএই। কিন্তু দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের পরিকল্পনায় মতবিরোধ দেখা দেয়। ইউএই সমর্থন দেয় সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি), যারা দক্ষিণ ইয়েমেনকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সৌদি আরব এর বিরোধিতা করে।

গত বছর ইউএইর পাঠানো সামরিক যানবাহী একটি চালানে সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালানোর পর বিরোধ আরও তীব্র হয়। ওই যানগুলো এসটিসির জন্য পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইয়েমেন নিয়ে দুই দেশের অংশীদারত্বের অবসান ঘটে। নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয় ইউএই, ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব অনেকটাই সৌদি আরবের ওপর পড়ে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমিরাতিরা চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।’ তার মতে, নিজেদের বাহিনী পরিচালনায় ইউএইর সুসংগঠিত ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু সৌদি আরব সেই ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।

ইয়েমেনে হুতিদের নতুন করে হামলা শুরু হলে সৌদি আরবের সংকট আরও বাড়ে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এর আগে সৌদি আরবে হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছিল হুতিরা। তবে জুলাইয়ে ইরান হুতি নেতাদের বহনকারী একটি বিমান খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে পাঠালে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিমানটি ইয়েমেনে আকাশপথে চলাচল নিয়ে সৌদি আরবের আরোপিত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেছিল।

এরপর বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন সানার বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি আরব।

জবাবে সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি প্রত্যাহার করে দেশটির জাহাজ চলাচলে অবরোধ ঘোষণার কথা জানায় হুতিরা। পরে ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় নতুন অভিযান চালিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে তারা। আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এরপর সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও পাইপলাইনে হামলা চালায় হুতিরা। জবাবে সৌদি আরব শত শত বিমান হামলা চালায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদিরা বেশ কিছু ভুল করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। হুতিদের অভিযানের জন্য রিয়াদ প্রস্তুত ছিল না। ইউএইর কাছ থেকে পাওয়া মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয়েরও ঘাটতি ছিল।’

সৌদি আরবের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা।

গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি করে রিয়াদ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ন্যাটোর বাইরের প্রধান মিত্রের মর্যাদা দেয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তায় মার্কিন সহায়তা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছে সৌদি নেতৃত্ব।

সিএনএনের উদ্ধৃত সূত্রগুলোর দাবি, গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুই দফা কথা বলেন। তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাতে রাজি হননি। এর পরিবর্তে নিজেদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি সুরক্ষিত রাখতে ওমানে হুতিদের সঙ্গে আলোচনা করে ওয়াশিংটন।

হুতিরা জানায়, তাদের লড়াই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর দিয়ে মার্কিন জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয় তারা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। গত মাসে মিসরে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন যুবরাজ মোহাম্মদ। পরে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান তিনি।

ফ্রান্স সামরিক সদস্যসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠাতে সম্মত হয়েছে। সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি উড়োজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টাও সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।

রিয়াদে জরুরি বৈঠকের পর মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমেইসি সিএনএনকে বলেন, বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং নিজেদের বিরোধ মেটাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘তাদের কমান্ড সেন্টারগুলোকে একীভূত করতে হবে এবং গোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করতে হবে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যদি দখল করা এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে সেসব এলাকা দখলের কোনো মূল্য থাকবে না।’

সূত্র : সিএনএন

সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি : রয়টার্স
সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি : রয়টার্স