তেল আমদানি: এবার ট্রাম্পের ভরসা পুতিন

ইউক্রেনে হামলার কারণে একদিকে রাশিয়ার ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে আমেরিকায় জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন রাজনীতিতে বড় একটি ঘটনা ঘটে গেল। সামনে নভেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে চাপের মুখে পড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা ও বিশ্ববাজারে ডিজেল পাঠাবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া; কিন্তু বিশ্বরাজনীতির এই মারপ্যাঁচে আসল জয় কার? জ্বালানির এই বিপুল ঘাটতি কি সত্যিই মিটবে, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে শুধুই ভোটের রাজনীতির মারপ্যাঁচ? মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ এবং অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত; এই দুই আন্তর্জাতিক সংঘাত মিলে পুরো বিশ্বকে এক অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ প্রায় স্তব্ধ হওয়ার জোগাড়।

সংকটের আঁচ সবচেয়ে তীব্রভাবে গিয়ে পড়েছে মার্কিন অর্থনীতিতে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫২ ডলারে গিয়ে ঠেকে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। আর এতেই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নেমে এসেছে তীব্র রাজনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিকাজ ও পণ্য পরিবহনের মূল চালিকাশক্তি হলো ডিজেল। মূল্যস্ফীতি আর জ্বালানির চড়া দামে সাধারণ আমেরিকানদের ক্ষোভ যখন তুঙ্গে, তখন আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও হারের সুর বাজছে।

ভোটের লড়াইয়ে টিকতে ট্রাম্পের দ্রুত একটি সমাধান দরকার ছিল। ফলে হোয়াইট হাউসে বসে ইউক্রেনের হামলা বন্ধের আকুতি জানানোর পাশাপাশি ট্রাম্প হাত বাড়ালেন মস্কোর দিকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পুতিনের সঙ্গে এক সফল আলোচনার পর রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও লাখ লাখ টন ডিজেল পাঠাবে মস্কো। ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বেশ খোলামেলাই স্বীকার করেন, আমাদের দেশে প্রচুর তেল দরকার, আর এটি ঠিক সেই ডিজেল যা আমরা চেয়েছিলাম।

যেখানে আমেরিকা বছরের পর বছর ধরে রাশিয়াকে একঘরে করার নীতি ছড়িয়েছে, সেখানে ট্রাম্পের এই আকস্মিক সমঝোতা বিশ্বমঞ্চে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ফ্লরিডায় যখন যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে ইউক্রেনীয় ও মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠক চলছিল, ঠিক তখনই এই ঘোষণা আসে।

সংবাদটি শোনার পরই ক্ষোভ উগরে দেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এই সমঝোতাকে ‘শক্তিশালী অংশীদারদের এক দুর্বল সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, এটি রাশিয়ার হাতকেই শক্তিশালী করবে এবং ইউক্রেনে তাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো বিগত চার বছর ধরে নিজেদের রাশিয়ান তেলের নির্ভরতা থেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। ফলে নৈতিকতার জায়গা থেকে ইউরোপ আদৌ এই রুশ ডিজেল গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চুক্তি হলেও এর বাস্তবতা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার নিজস্ব তেল শোধনাগারগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে খোদ রাশিয়াকেই জুলাই মাস থেকে ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়েছিল। এমনকি গত কয়েক মাসে রাশিয়াকে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি পর্যন্ত করতে দেখা গেছে।

এবার ট্রাম্পের ভরসা পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প