ইরানের স্কুলে হামলা: ‘ট্রিগার টেনেছে মানুষ, সহায়তা করেছে এআই’

ইরানের মিনাব শহরে শাজারাহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী বোমা হামলার ঘটনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একজন মানুষ; আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শুধু লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করেছে- এমন দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক পরিচালক ডেভিড পেট্রাউস। ওই হামলায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

এ বক্তব্যে হামলার পেছনে এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে আগের একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ১২৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এআইনির্ভর ‘কিল চেইন’ ব্যবস্থার ভূমিকা ছিল।

এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেট্রাউস বলেন, ‘ট্রিগার টেনেছে মানুষ, সহায়তা করেছে এআই।’

সামরিক অভিযানে অধিকতর নির্ভুলভাবে এআই ব্যবহার করার পক্ষে কথা বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা। এ সময় তাকে ইরানের মিনাব শহরের স্কুলে বোমা হামলা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।

জবাবে পেট্রাউস বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, এটি ছিল মানুষের বিচার-বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত। এআই নিজে সিদ্ধান্ত নেয়নি। একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে তাকে সহায়তা করেছিল এআই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভুল হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে, ইউক্রেনেও নিশ্চয়ই দেখা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রিগার টানা বা বোতাম চাপার সিদ্ধান্ত মানুষই নিচ্ছেন।’

পেট্রাউস এমন একটি ব্যবস্থা ব্যবহারের পক্ষেও মত দেন, যেখানে মানুষের নির্ধারিত অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ও নির্দেশনা অনুসারে এআই সিদ্ধান্ত নেবে।

সম্প্রতি ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির সামরিক সক্ষমতা এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সামরিক বাহিনীকে, যাতে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই হামলা চালানো যায়।

লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অগ্রাধিকার পেয়েছিল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি রক্ষা এবং কখনো কখনো সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার দায়িত্ব রয়েছে এই বাহিনীর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কিছু সদস্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও প্রাথমিক হামলার পরিকল্পনা তৈরিতে মেভেন স্মার্ট সিস্টেমে থাকা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ধরনের লক্ষ্যবস্তু অনুমোদনের সামরিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কিল চেইন’।

প্রায় এক দশক আগে নির্মিত শাজারাহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এমন একটি জমিতে অবস্থিত, যেখানে আগে আইআরজিসির একটি নৌ ইউনিটের স্থাপনা ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসির স্থাপনা হিসেবে ভুল শ্রেণিবিন্যাস সংশোধন না করায় বিদ্যালয়টিকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মেভেন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে প্রথম দিনের হামলার জন্য সুপারিশ করা লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় সেটি উঠে আসে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পালান্টির টেকনোলজিসের তৈরি এআইনির্ভর মেভেন ব্যবস্থা ১৫০টির বেশি ধরনের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে জটিল সামরিক অভিযানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কমান্ডারদের সহায়তা করে। লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন থেকে শুরু করে সামরিক নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ; বিভিন্ন কাজে ব্যবস্থাটি ব্যবহার করা হয়।

আগে এ ধরনের প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা বিশ্লেষক, ছবি বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী কর্মকর্তা, আইনজীবী, কমান্ডার ও অস্ত্র পরিচালনাকারীদের দীর্ঘ ধাপ পেরোতে হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরবর্তী পর্যালোচনা পর্যন্ত এসব অভিযানে মেভেনের প্রভাব বেড়েছে।

কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এআই ব্যবস্থাটি অনেক কাজ কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করতে পারে, যেগুলো আগে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত।

সূত্র : এনডিটিভি

সিআইএয়ের সাবেক পরিচালক ডেভিড পেট্রাউস ও মিনাব স্কুলে নিহত শিক্ষার্থীদের জন্য কবর খোঁড়ার দৃশ্য। ছবি: এনডিটিভি
সিআইএয়ের সাবেক পরিচালক ডেভিড পেট্রাউস ও মিনাব স্কুলে নিহত শিক্ষার্থীদের জন্য কবর খোঁড়ার দৃশ্য। ছবি: এনডিটিভি