Thursday, October 22, 2026
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নয়া নিশানা: ডাটা সেন্টার
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নয়া নিশানা: ডাটা সেন্টার
গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন সংঘাতে বিষয়টি একদম স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষই একে অপরের ডাটা সেন্টারে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে পড়ছে অনলাইন আদালত ব্যবস্থা কিংবা জরুরি ডিজিটাল সেবা। এই চিত্র শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার নয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতেও একই কায়দায় ডাটা সেন্টারগুলোকে হামলার নিশানা করা হয়েছে।
এই নতুন বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উপেক্ষিত প্রশ্ন সামনে আসে, যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলো কি আইনগতভাবে এ ধরনের স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে? আর এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, নিজেদের ডাটা সেন্টারে শত্রুর হামলা হতে পারে জেনেও সাধারণ মানুষ ও বেসামরিক জনপদকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব কী?
আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতের আইনে (এলওএসি) এর উত্তর খোঁজা হয়েছে। আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্যাসিভ প্রিকিউশনস’ বা নিষ্ক্রিয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। সহজ কথায়, এর অর্থ হলো—একটি রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদের কোনো সামরিক বা কৌশলগত স্থাপনা সাধারণ মানুষের আবাসিক এলাকা বা বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের খুব কাছাকাছি না থাকে।
কিন্তু সমস্যা হলো, বর্তমান যুগে রাষ্ট্রগুলো তাদের সামরিক বা যৌথ (বেসামরিক ও সামরিক উভয়) কাজের জন্য ডাটা সেন্টার কোথায় স্থাপন করবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। যেমন, ফ্রান্স সম্প্রতি প্যারিসের উপকণ্ঠে ঐতিহাসিক মন্ট-ভ্যালেরিয়েন দুর্গের নিচে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ডাটা সেন্টার তৈরি করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্কেডিয়া’। উদ্দেশ্য একটাই, ফরাসি সামরিক বাহিনীকে আরও বেশি দক্ষ করে তোলা। ইউরোপের অন্যান্য দেশ, যেমন নেদারল্যান্ডসও নিজেদের গোপনীয় তথ্যের জন্য ‘সার্বভৌম ও সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্লাউড’ তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।
কেন এই হুড়োহুড়ি? কারণ মাইক্রোসফট বা অ্যামাজনের মতো মার্কিন ক্লাউড জায়ান্টদের ওপর ইউরোপীয় দেশগুলোর নির্ভরতা কমাতে চায়। কিন্তু এই সামরিক গোপনীয়তা রক্ষা করতে গিয়েই ডেকে আনা হচ্ছে এক বিশাল বিপদ।
একটি ডাটা সেন্টার শুধু কিছু কম্পিউটারের বাক্স নয়, এর পেছনে রয়েছে বিশাল বিদ্যুৎ খরচ, কুলিং সিস্টেম এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের জাল। যুদ্ধের ময়দানে এই প্রতিটি সংযোগই এক একটি দুর্বল পয়েন্ট। অনেক সময় সরকার বা সামরিক বাহিনী আলাদা ডাটা সেন্টার না বানিয়ে অ্যামাজন বা বাণিজ্যিক ক্লাউড প্রোভাইডারদের সার্ভার ভাড়া নেয়। ফলস্বরূপ, একই ডাটা সেন্টারে পাশাপাশি সংরক্ষিত থাকে ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন, হাসপাতালের রোগীর তথ্য এবং সামরিক গোপন কৌশল!
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুক্ত হওয়ার পর থেকে সামরিক বাহিনীতে ডাটা সেন্টারের গুরুত্ব আকাশছোঁয়া। গোয়েন্দা বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে লক্ষ্য নির্ধারণ বা অস্ত্র পরিচালনা— সবকিছুর জন্যই এখন বিশাল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন। আর এ কারণেই বেসামরিক মানুষের একই সেন্টারের ওপর নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও এগুলো আজ যুদ্ধের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানে যখন এই ডাটা সেন্টারগুলোতে হামলা হয়, তখন এর চড়া মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে রুশ এবং ইউক্রেনীয় পাল্টাপাল্টি হামলায় কিয়েভ, কালুগা ও সেন্ট পিটার্সবার্গের একাধিক ডাটা সেন্টার ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া ছাড়াও খাদ্য সরবরাহ, রাইড-শেয়ারিং, অনলাইন ম্যাপিং এবং সবচেয়ে বড় কথা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি জীবন বাঁচানোর সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এ ছাড়া কিয়েভ কিংবা কালুগার ডাটা সেন্টারে হামলায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও যখন বাহরাইন বা আমিরাতে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের ডাটা সেন্টারে হামলা হয়েছে, তখন সেখানে ভয়াবহ আগুন লাগার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং ও নিত্যপ্রয়োজনীয় অ্যাপের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, শত্রুর হামলা থেকে নিজেদের দেশের সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর দায় শুধু আক্রমণকারী পক্ষের নয়, বরং ডিফেন্ডার বা যে দেশের ডাটা সেন্টার—সেই রাষ্ট্রের ওপরও বর্তায়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রগুলোকে কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে হয়। সামরিক ডাটা এবং বেসামরিক ডাটা বা সেবাগুলোকে যতদূর সম্ভব শারীরিকভাবে আলাদা রাখতে হবে। ফ্রান্স বা নেদারল্যান্ডসের মতো একান্তই সামরিক ব্যবহারের জন্য আলাদা সুরক্ষিত ডাটা সেন্টার তৈরি করা যেতে পারে। আবার প্রয়োজনে যুদ্ধকালীন জরুরি ব্যবহারের জন্য মোবাইল ডাটা সেন্টার ইউনিট ব্যবহার করা যেতে পারে, যা জনবহুল এলাকা থেকে বহু দূরে থাকবে।
এ ছাড়া যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে অনেক দেশ তাদের গুরুত্বপূর্ণ ডাটা বা ক্লাউড ব্যাকআপ অন্য দেশে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। যেমন, রাশিয়ার আগ্রাসনের আগেই ইউক্রেন তাদের সরকারি ও বেসরকারি অনেক ডাটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপদ সার্ভারে ব্যাকআপ হিসেবে সরিয়ে নিয়েছিল, যা পরে তাদের ডিজিটাল ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
এমনকি জনবহুল শহরের মাঝখানে বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামরিক ডাটা সেন্টার স্থাপন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মিশিগানে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র বা প্যারিসের উপকণ্ঠে সামরিক ডাটা সেন্টার স্থাপনের ফলে আশপাশের সাধারণ মানুষও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বর্তমান যুগে শুধু বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, সাইবার হামলা বা ডাটা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমেও ডাটা সেন্টার অকেজো করে দেওয়া যায়। তাই শান্তিকালীন সময়েই শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, অফলাইন ব্যাকআপ এবং জরুরি ফায়ার ফাইটিং বা উদ্ধার প্রস্তুতির ব্যবস্থা রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
যুদ্ধ যতটাই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, সাধারণ মানুষের জীবন ততটাই ডাটা সেন্টার ও ক্লাউডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক আইন সরাসরি বাণিজ্যিক ডাটা সেন্টারের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ না করলেও এর ফলস্বরূপ সাধারণ মানুষের যে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যুদ্ধ হয়তো দিন দিন ক্লাউড বা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় চলে যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখার মৌলিক দায়িত্বটি কোনোভাবেই হারিয়ে যাওয়ার নয়।
![]() |
| বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নয়া নিশানা |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(2331)
-
▼
October
(259)
-
▼
Oct 22
(12)
- পারস্য উপসাগর-হরমুজে ৭ জাহাজে হামলার দাবি আইআরজিসির
- ইরান যুদ্ধ এখনই শেষ করতে পারি, তবে স্থায়ী সমাধান চ...
- গৃহযুদ্ধে সুদান যেন এক মৃত্যুপুরী, ৬০০ দাফন করলেন ...
- রাস্তায় হঠাৎ দেখা, দিব্যকে পিঠ চাপড়ে আদর দিলেন আমি...
- মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার ছক কষ...
- বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের নয়া নিশানা: ডাটা সেন্টার
- হরমুজে কুয়েতি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- সৌদি আরবে বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা, নিহত ৪
- যুদ্ধের শঙ্কা বাড়লেও ইউরেনিয়াম ছাড়তে নারাজ ইরান
- যুদ্ধবিরতির পরও প্রতিদিন রক্ত ঝরছে গাজায়, ২৪ ঘণ্টা...
- যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন
- সাগরতলে সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর রাস্তা বানাচ্ছে নরওয়ে
-
▼
Oct 22
(12)
-
▼
October
(259)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment