Saturday, October 17, 2026
রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস করে রাখাইনে সেনাচৌকি!
তারা বলেছে, মিয়ানমার সরকার খুব পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের জমিজমা, সম্পত্তি নষ্ট করেছে। যদিও মিয়ানমার সেনার তরফে এই রিপোর্ট প্রসঙ্গে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। আইআইএমএম-এর রিপোর্টে আরও বলা হয়, সেনাঘাঁটি এবং সেনাশিবির বানানো হচ্ছে উত্তর রাখাইন প্রদেশে ইন দিনের গ্রামগুলিতে। নতুন করে রাস্তা, সেনার দফতর, হেলিপ্যাডও বানানো হচ্ছে। অনলাইন আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক রয়েছে নিউ ইয়র্কে। সেখানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তার আগেই এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যালোচনার গতিমুখ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (ওএইচসিএইচআর) এবং কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দফতর সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে নথিভুক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ।

Wednesday, March 25, 2026
মিয়ানমারে স্বৈরাচারদের পতন হয় না কেন by ক্যো জ্ওয়া মো
তবে মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অদ্ভুত ভাগ্যবান। জেনারেল নে উইন থেকে থান শ্বে কিংবা মিন অং হ্লাইং পর্যন্ত গল্পটা প্রায় একই। তাঁরা দেশটাকে ধ্বংস করেছেন। মানুষকে নির্মমভাবে দমন করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা কেউই প্রায় কখনো জবাবদিহির মুখে পড়েননি। এই ভাগ্য বলতে আমি নৈতিক ভাগ্য বোঝাচ্ছি না। কোনো কর্মফলের ধারণাও নয়। এটি আসলে দায়মুক্তি, যেখানে জোর করে কাউকে জবাবদিহি করানো হয় না।
চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ব চমকে ওঠে একটি খবরে। ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নেতা নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নাকি কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। সেখানে তাঁদের মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটক রাখা হয়েছে। এই অভিযানের আইনগত বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে বিতর্ক চলছেই। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট। একটি পরাশক্তি চাইলে কোনো স্বৈরশাসকের ক্ষমতার অবসান এক রাতেই ঘটতে পারে।
মাদুরোই প্রথম নন, যাঁর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করে। ওয়াশিংটন এই অভিযানকে ন্যায্যতা দিয়েছিল মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা, গণতন্ত্র রক্ষা, মাদক পাচার দমন এবং পানামা খাল চুক্তি রক্ষার যুক্তিতে। নোরিয়েগাকে পরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিচার করা হয়।
২০০৩ সালে ইরাকে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। পরে তদন্তে দেখা যায়, এই দাবি সত্য ছিল না।
লিবিয়ার ঘটনা আবার কিছুটা আলাদা। ২০১১ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে ন্যাটো সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। লক্ষ্য ছিল বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করা। ন্যাটো মূলত আকাশ ও নৌপথে ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার ভেতরের শক্তিগুলোই মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ধরে হত্যা করে।
এই ঘটনাগুলো এক রকম নয়। কিন্তু এগুলো একটি নির্মম সত্য সামনে আনে। অনেক সময় স্বৈরশাসকের পতন শুধু জনগণের প্রতিরোধে ঘটে না, বরং ঘটে কোনো শক্তিধর দেশের সিদ্ধান্তে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তিনভাবে অপছন্দের সরকার বা শাসকদের অপসারণ করেছে। একটি হলো সরাসরি সামরিক আগ্রাসন। সেনা নামিয়ে শাসককে ধরে ফেলা এবং পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। সাদ্দাম বা নোরিয়েগার ঘটনা এর উদাহরণ।
দ্বিতীয়টি হলো গোপন হস্তক্ষেপ। প্রকাশ্যে সেনা না নামিয়ে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া। ইরান, গুয়াতেমালা বা চিলির ঘটনাগুলো এই ধরনের।
তৃতীয়টি হলো অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের সমর্থন দেওয়া। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা এবং ভেতরের অসন্তোষকে শক্তিশালী করা। নিকারাগুয়া বা লিবিয়ায় এই কৌশল দেখা গেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের হস্তক্ষেপ বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যর্থ হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাক তার বড় উদাহরণ।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়। যখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য অনেক দেশে এমন হস্তক্ষেপ করেছে, তখন মিয়ানমারের জেনারেলদের ক্ষেত্রে কেন নয়। তাঁরা কি সত্যিই অতিমাত্রায় ভাগ্যবান। নাকি ওয়াশিংটনের চোখে মিয়ানমার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। নে উইন ২৬ বছর একনায়কতন্ত্র চালিয়ে দেশটিকে ধ্বংস করেছিলেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবু তিনি নব্বইয়ের বেশি বয়সে নীরবে মারা যান। কোনো আদালতে তাঁকে দাঁড়াতে হয়নি।
থান শ্বের শাসনকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রকাশ্যে অত্যাচারের প্রতীক বলেছিল। তিনি প্রায় দুই দশক ভয় আর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। তবু তাঁকে কেউ গ্রেপ্তার করেনি। তিনি নিজ শর্তেই ক্ষমতা ছেড়েছেন এবং দৃশ্যত এখনো দায়মুক্ত। এরপর এলেন মিন অং হ্লাইং। অনেকের মতে, তিনিই মিয়ানমারের ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক শাসক।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে যে মামলা চলছে, সেখানে রাষ্ট্রের দায় বিচার করা হয়। ব্যক্তির বিচার সেখানে হয় না। ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য অন্য কাঠামো রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার একটি আদালতও সর্বজনীন বিচারব্যবস্থার আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছেন। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অপরাধ অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবৈধ আফিম উৎপাদকদের একটি। সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেই এই উৎপাদন ১০ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই সবকিছু সত্ত্বেও মিন অং হ্লাইং এখনো মুক্ত। তিনি বিদেশে যাতায়াত করছেন। রাজনৈতিক সমঝোতা করছেন। ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বৈধতা তৈরির চেষ্টা করছেন।
তাহলে প্রশ্নটি থেকেই যায়। কেন মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অন্যদের মতো গ্রেপ্তার হন না, অপসারিত হন না। ভেনেজুয়েলা বা পানামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী। তাদের যুক্তরাষ্ট্র নিজের উঠান বলে মনে করে। সেখানে সমস্যা হলে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মূল কারণগুলো সাধারণত তিনটি। একটি হলো মতাদর্শ। শীতল যুদ্ধের সময় সমাজতন্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশে সরকার পরিবর্তনে নেমেছিল।
দ্বিতীয়টি হলো জাতীয় স্বার্থ। গণতন্ত্রের নামে তখন আমেরিকার অভিযানের প্রকৃত চালিকা শক্তি থাকে নিরাপত্তা ও অর্থনীতি। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদ কিংবা ইরাকের তেল এর উদাহরণ।
মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এই স্বার্থগুলো তেমনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত নয়। এখানকার জেনারেলরা নিষ্ঠুর হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অর্থনীতির জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করে না।
তৃতীয়টি হলো ভূরাজনীতি। মিয়ানমার চীনের প্রতিবেশী। কার্যত এটি এখন চীনের ছায়াতলে। সেখানে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ মানে বেইজিংয়ের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাত। ওয়াশিংটনের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিয়ানমার নয়।
এই কারণেই ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়। নেতৃত্ব দেওয়া হয় আঞ্চলিক জোটকে। মিয়ানমারের জেনারেলদের এই নিরাপত্তাই তাঁদের ভাগ্য।
তবে একটি বার্মিজ প্রবাদ আছে। দীর্ঘ জীবন মানেই গৌরব নয়। নে উইন দীর্ঘজীবী ছিলেন, কিন্তু অপমান নিয়েই মারা গেছেন। তাঁর দাফনও হয়নি। ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে।
থান শ্বে বা মিন অং হ্লাইং হয়তো একদিন সামরিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন। কিন্তু একদিন যখন স্বৈরতন্ত্রের অবসান হবে, তখন তাঁদের কবর মানুষের ঘৃণার স্মৃতিস্তম্ভ হয়েই থাকবে।
• ক্যো জ্ওয়া মো, দ্য ইরাবতীর নির্বাহী সম্পাদক
- দ্য ইরাবতী থেকে নেওয়া, ইংরেজিতে থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অদ্ভুত ভাগ্যবান। জেনারেল নে উইন থেকে থান শ্বে কিংবা মিন অং হ্লাইং পর্যন্ত গল্পটা প্রায় একই। ছবি: দ্য ইরাবতীর সৌজন্যে |
Thursday, February 12, 2026
মিয়ানমারে নির্বাচন শেষে যে রাজনৈতিক মোড়বদল ঘটছে by আলতাফ পারভেজ
বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই মিয়ানমারে ভোট হয়ে গেল। তিন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন শেষ হলো ২৫ জানুয়ারি। সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে ও তত্ত্বাবধানেই এই নির্বাচন হয়। নতুন সরকার গঠন শেষে ‘তাতমা-দ’ নামে পরিচিত দেশটির সশস্ত্র বাহিনী দেশব্যাপী গেরিলা প্রতিরোধ দমনে নতুন অভিযানে নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যার একটা অংশ হতে পারে রাখাইন বা আরাকান প্রদেশে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও। কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে।
নির্বাচন ও নতুন বেসামরিক সরকার গঠনের ডামাডোলের মধ্যে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান গেরিলা প্রতিরোধযুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামোতেও একটা মোড়বদল ঘটছে এবং তার সঙ্গে গভীর যোগ রয়েছে ভূরাজনীতির, যা বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন সরকারের মনোযোগ দাবি করছে।
নির্বাচনের মাধ্যমে জেনারেলদের ‘ছদ্ম সরকার’
যদিও এই ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্তি হলো, তবে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া দেশটি গত আট দশক সামরিক ছত্রচ্ছায়াতেই আছে। প্রধান রাজনীতিবিদ অং সান সু চি পাঁচ ধরে কারাগারে বন্দী। তাতমা-দ–এর ধরপাকড়ের মুখে তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডির প্রায় কোনো নেতা আর প্রকাশ্যে নেই।
চলমান সামরিক শাসনকে কিছুটা বেসামরিক আবরণ দিতেই সম্প্রতি নির্বাচন দেন জান্তাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাই। তবে নির্বাচনের আগে সামরিক শাসনের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাতিল করে নেওয়া হয়। জান্তার অনুমোদন পাওয়া ছয়টি দল কেবল জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। এনএলডির পাশাপাশি প্রধান আঞ্চলিক দল শান ন্যাশনালিস্ট লিগ ফর ডেমোক্রেসিও নির্বাচনে ছিল না।
মিয়ানমারের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা জানেন, নির্বাচন শেষে নতুন সরকারেও ক্ষমতার লাগাম জেনারেলদের হাতে থাকবে। আগামী মাসে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো বেসামরিক সরকারে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীর হাতে থাকে এবং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে ২৫ শতাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রাখার নিয়ম। ফলে নতুন সরকারেও তাদের চূড়ান্ত প্রভাব থাকবে।
তা ছাড়া যে দলটি নির্বাচন শেষে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেই ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে সাবেক জেনারেলদের মাধ্যমেই ২০১০-এ। এখন দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক পুলিশপ্রধান খিন ই। দলটি ২০২১–এর সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থনও করেছিল।
এনএলডির নিবন্ধন বাতিল করিয়ে ইউএসডিপিকে পার্লামেন্টে প্রধান দল হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনী ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন ঘটাল এবার। সংসদের একটা কক্ষে এবং প্রাদেশিক পরিষদগুলোতে আসনের একাংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোকে ভোটের সংখ্যানুপাতে বরাদ্দ করা হচ্ছে। ভোটে আসা সব দলকে পার্লামেন্টে কিছু আসন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার লক্ষ্যে এটা করা হলো। এ রকম সব উপায়ে সম্ভাব্য যে বেসামরিক শাসন শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে ফেব্রুয়ারির পরও সেনাছাউনির প্রভাব আগের মতোই থাকবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকেও তাই দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে তাতমা-দ–এর জেনারেলদের সঙ্গেই বোঝাপড়ায় আসতে হবে।
নির্বাচনকালে শঙ্কার চেয়ে কম গোলযোগ হওয়ায় জেনারেলদের আন্তর্জাতিক পরিসরে অগণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি আড়াল করার কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলো নির্বাচনকে ক্রমাগত ‘সাজানো’ হিসেবে উল্লেখ করলেও মিয়ানমারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব ট্রাম্পের আমলে কিছুটা নমনীয় দেখা যাচ্ছে।
অস্তিত্বের সংকটে সু চির সমর্থক এনইউজি
মিয়ানমারে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাদেশিক প্রতিপক্ষ বহু। জাতীয় পর্যায়ে বিরোধীপক্ষ মূলত নিষিদ্ধ এনএলডি। এই দল–প্রভাবিত দেশটির গণতন্ত্রপন্থী প্রবাসী সরকার (ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি) গত ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে একটা বিবৃতি দেয়। সেখানে প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে বলা হয়, ২০২০–এর নির্বাচনে বিজয়ীদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়াকে তারা এখনো অবৈধ মনে করে। তা ছাড়া বর্তমান সংবিধানের অধীনে কোনো নির্বাচন মিয়ানমারের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে বলে মনে করে না তারা। ‘প্রবাসী সরকার’ নাগরিকদের প্রতি নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে, যদিও ভোটে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না।
সামরিক জান্তার নির্দেশমতো শ্রমিক-কর্মচারীদের ভোট দিতে বাড়িতে যাওয়ার পর্যাপ্ত ছুটি দেওয়া হয়। প্রশাসন নানাভাবে এ–ও জানিয়েছে, যেসব এলাকায় ভোট কম হবে, সেখানে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এনইউজির গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে দেশের কিছু কিছু এলাকা থাকলেও তাদের শক্তি এত বেশি ছিল না যে ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নির্বাচনী কর্মসূচি প্রতিরোধ করতে পারে। সরকারের দাপ্তরিক দাবি, ৩৩০টি টাউনশিপের ২৬৫টিতে তারা নির্বাচন করিয়েছে। বাকিগুলো গেরিলানিয়ন্ত্রিত এলাকা বলে অনুমান করা হয়।
প্রবাসী জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বলছে, তাদের ভাষায়, ‘প্রহসনমূলক’ এই নির্বাচন শেষেও সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য ও ছদ্ম শাসন উৎখাত এবং তাদের সংবিধান বাতিল করে ফেডারেলধর্মী মিয়ানমার গড়তে সব জাতিসত্তাকে নিয়ে গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরির রাজনৈতিক লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে তারা।
পর্যবেক্ষকেরা অবশ্য মনে করছেন, সশস্ত্র বাহিনী যে নির্বাচন করে ফেলতে পারল, এটা প্রবাসী সরকারের জন্য বড় এক ধাক্কা। দীর্ঘ পাঁচ বছরেও জান্তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক সফলতা না আসায় জনগণ ভবিষ্যতে তাদের ব্যাপারে উৎসাহ না–ও দেখাতে পারে। ফলে তাদের সামনে এখন নতুন করে সংগ্রাম পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
গেরিলা সংগ্রাম গঠন-পুনর্গঠনের নতুন পর্ব
মিয়ানমার গেরিলাযুদ্ধের দেশ হিসেবে পরিচিত। সব প্রদেশ ও বিভাগে কোনো না কোনো জাতির গেরিলা সংগঠন সক্রিয় সেখানে। তবে নির্বাচনের পর রাজনৈতিকভাবে পক্ষ দাঁড়াচ্ছে তিনটি—সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক সরকার ও গেরিলা সংগঠনগুলো।
২০২১–এর আগে গৃহযুদ্ধের ভরকেন্দ্র ছিল প্রান্তিক সীমান্তপ্রদেশগুলো। কিন্তু এনএলডির কাছ থেকে নির্বাচনী ফল ছিনতাই করে তাকে নিষিদ্ধ করার পর জাতীয়ভাবে সু চির সমর্থক বামার তরুণেরাও গণতন্ত্র উদ্ধারে অস্ত্র হাতে নেন। এ রকম সব গেরিলা গোষ্ঠী নানাভাবে বিভক্ত। তাদের বিভক্ত রাখা এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সামরিক জান্তার পাশাপাশি গণচীনেরও পরোক্ষ, কিন্তু সক্রিয় ভূমিকা আছে।
জাতীয়ভাবে একক কোনো নেতৃত্বের অধীনে না থাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার ধারা গেরিলা সংগঠনগুলোকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে এখন। পরিস্থিতি সামলাতে অনেক অঞ্চলে এ রকম সংগঠনগুলো জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে টিকে আছে। ২০২৩ থেকে গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক এলাকা সম্প্রতি কেড়ে নিতেও সক্ষম হয়েছে তাতমা-দ। দৃঢ় সামরিক কমান্ড এবং চীন-রাশিয়া থেকে রসদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গেরিলাদের থেকে এগিয়ে রাখছে তাদের। তবে তাতমা-দ যেহেতু দেশটির মূল রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান দিতে পারছে না বা দিতে অনিচ্ছুক, সেই কারণে গৃহযুদ্ধ তুষের আগুনের মতো জ্বলছেই।
গেরিলাদের জন্য এখনকার সময়টা ভাটার মতো। সেটা বিবেচনায় নিয়ে গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে এ রকম সংগঠনগুলো সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনায় নেমেছে। তারই ফল হিসেবে ছোট ছোট ১৯টি গেরিলা সংগঠনের একটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে গত ১৫ ডিসেম্বর। এটা সরকারবিরোধী বহুল আলোচিত ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’–এর বাইরের ঘটনা, যা পর্যবেক্ষকদের বিশেষ মনোযোগ কাড়ছে।
এসআরএর আত্মপ্রকাশ
মিয়ানমারজুড়ে তিন ধারার গেরিলা সংগঠন রয়েছে এ মুহূর্তে। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে কিছু দল। এর মধ্যে আবার দুটি উপধারা আছে। একদল বহুকাল ধরে যুদ্ধবিরতিতে আছে। যেমন শান প্রদেশের ওয়া আর্মি। আবার কিছু কিছু দল সম্প্রতি যুদ্ধবিরতিতে গেছে, মূলত চীনের চাপে। যেমন তাঙ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি বা টিএনএলএ (কিছুদিন আগেও টিএনএলএ থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্য হিসেবে সরকারের সঙ্গে সংঘাত ছিল)।
দ্বিতীয় একগুচ্ছ গেরিলা দল আছে, যারা কেন্দ্রীয় আর্মির সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধে লিপ্ত। যেমন আরাকান আর্মি, কাচিন আর্মি। ভারত–সংলগ্ন চিন প্রদেশের কিছু কিছু সংগঠনও এ রকম লড়াইয়ে আছে। প্রবাসী সরকার–সমর্থিত বিভিন্ন এলাকার পিপলস ডিফেন্স ফোর্সগুলোকেও এই তালিকায় রাখা যায়। এর বাইরেও দেশজুড়ে সরকারবিরোধী ছোট ছোট অনেক গেরিলা সংগঠন গড়ে উঠেছে ২০২১–এর পর থেকে। তৃতীয় ধারার এই গ্রুপগুলো গত ১৫ ডিসেম্বর জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিশেষ নজর কেড়েছে। ‘স্প্রিং রেভোল্যুশন অ্যালায়েন্স’ বা এসআরএ নাম নিয়েছে তারা।
এসআরএ যে দেশটির সরকারবিরোধী খ্যাতনামা প্রাদেশিক গেরিলা সংগঠনগুলোকে বাদ দিয়েই গড়ে উঠেছে—সেটা বেশ অভিনব। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের কোনো সদস্য এই জোটে নেই। এসআরএ বলছে, তারা জোটবদ্ধ হওয়ার আগে কাচিন আর্মি, আরাকানি আর্মিসহ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বড় সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছে। এই জোট তাতমা-দ–বিরোধী সামরিক প্রতিরোধ সমন্বয় করতে আগ্রহী এবং একই সঙ্গে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে নাগরিক সুবিধার বিকল্প কাঠামো (মোবাইল ক্লিনিক, স্কুল ইত্যাদি) গড়ে তুলতে চায়।
এসআরএর আওতায় সম্মিলিতভাবে ১০ থেকে ১৫ হাজার সদস্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪২ বছর বয়সী খ্রিষ্টান কারেন খুন বেদু। তিনি কাইয়া প্রদেশের কারেননি ডিফেন্স ফোর্সের একজন নেতা। ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় অনেক দেশের রাজনৈতিক চাপে ২০১২ সালে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন বেদু। তাঁর ভাষায়, বিচ্ছিন্ন লড়াই একটা কৌশলগত সংকট। এসআরএ–ভুক্তরা পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অন্যান্য কাঠামোগত সহায়তায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। প্রত্যেকের এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায় সম্পদ লেনদেনও তাদের সমঝোতায় রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তারা একক কমান্ডের অধীনে বিকল্প ফেডারেল সেনাবাহিনী গড়ার দিকে যেতে চায়।
মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থী প্রবাসী সরকারের ঘোষিত একটা লক্ষ্য, ফেডারেল রাজনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি একই ধাঁচের কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী গঠন। এসআরএ এনইউজির রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তবে নতুন এই গেরিলা জোট পুরোপুরি এনইউজি–নিয়ন্ত্রিত নয়।
অনেকের ধারণা, সামনের দিনগুলোতে এনইউজি রাজনৈতিক-সামরিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে অসমর্থ হলে এসআরএ সেই জায়গা দখল করবে এবং কাচিন, কারেন, রাখাইন ও চিনদের পুরোনো সংগঠনগুলোও সম্ভবত তা–ই চাইছে। কিছু ইউরোপীয় শক্তিও মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এ রকম পুনর্বিন্যাসে উৎসাহী—যেখানে অং সান সু চির মতো পুরোনো বামার একক নেতৃত্বের বদলে বহু জাতিসত্তার সংগঠকদের যৌথ নেতৃত্ব জান্তাকে চ্যালেঞ্জ করবে। এসআরএ জোট সামরিকভাবে চীনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে, যা ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের গেরিলা সংস্কৃতিতে এটা বেশ নতুন ঘটনা।
নতুন সংঘাতের শঙ্কায় আরাকান
কাচিন, রাখাইন বা কারেনসহ মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার বড় গেরিলা সংগঠনগুলো যে জাতীয়ভাবে এসআরএ জোট গড়ে ওঠায় সবুজ সংকেত দিয়েছে, তার কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। নতুন সরকার গঠন শেষ হলেই কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী সব অঞ্চলে বিরুদ্ধবাদীদের লক্ষ্য করে সামরিক অভিযানে নামবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষ আতঙ্ক রয়েছে আরাকানে; যদিও এই প্রদেশের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু রাজধানী সিত্তিউই, শিল্পশহর চাইয়াকফুসহ দক্ষিণের ২-৩টি গুরুত্বপূর্ণ টাউনশিপের পতন ঘটাতে পারেনি তারা। আবার উত্তরে মংডুর দিকের রোহিঙ্গাদের প্রতিরোধসংগ্রামও মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের। বাংলাদেশ–সংলগ্ন সীমান্তচৌকিগুলোতে গত বছর কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রপাতি পেয়ে অনেক রোহিঙ্গা উপদল এখন বেশ উজ্জীবিত অবস্থায় আছে।
এসব কারণে আরাকান আর্মির জন্য সামনের সময়টা খুব চ্যালেঞ্জিং। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এনইউজির অনুগতও নয় তারা। ফলে তাতমা-দ–এর ভবিষ্যৎ আক্রমণের মুখে টিকে থাকার চেষ্টায় নামা সব প্রদেশের ছোট-বড় গেরিলা সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে যুক্ত আছে তারাও। এসআরএর গঠন সেই লক্ষ্যেই। এতে দেশটির কেন্দ্রীয় বামার অঞ্চলের সঙ্গে প্রান্তিক অন্য জাতির প্রদেশগুলোর গেরিলাদের যোগাযোগের কাঠামো গড়ে উঠল। তবে খুন বেদুর মতো তরুণদের নেতৃত্ব সব জাতিসত্তার সশস্ত্র ধারার পুরোনো নেতারা মেনে নেবেন কি না, সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে। আবার সামরিকভাবে টিকে থাকার পাশাপাশি আরাকানসহ সর্বত্র তাতমা-দ–বিরোধীদের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার বিষয়ও বড় প্রশ্ন হিসেবে আছে।
* আলতাফ পারভেজ, গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি কেন্দ্র ঘুরে দেখছেন দেশটির জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং। ছবি : এএফি |
Wednesday, February 11, 2026
একের পর এক গণহত্যা: কতবার পার পাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা by মং জার্নি
আপাতভাবে মিয়ানমারের সামরিক নেতারা ভেবে নিয়েছেন, একের পর এক জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে তারা যে মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ করে চলেছেন, সেটি তাঁরা নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যেতে পারবেন। গণহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তাঁরা নিষ্ঠুর কৌশল প্রয়োগ করে এড়িয়ে চলেছেন। সর্বশেষ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রহেলিকা সৃষ্টি করে জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোকা বানাতে চাইছে।
কিন্তু জার্মানির নাৎসি, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো ও কম্বোডিয়ার খেমার রুজ শাসকদের পরিচালিত গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে যেভাবে হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরাও রোহিঙ্গাসহ একাধিক জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অপরাধের ঘটনায় পার পাবেন না। নাৎসি শাসকেরা ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা-কর্মী, কমিউনিস্ট, জার্মান প্রতিবন্ধী, সমকামী, ইহুদি, রোমা ও সিন্থিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল। ১৯৬০-এর দশকে সুহার্তো সরকার কমিউনিস্ট তকমা দিয়ে ইন্দোনেশিয়ান ও চীনাদের বিরুদ্ধে আর খেমার রুজরা ১৯৭০-এর দশকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, চ্যাম মুসলিম ও খেমার বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া এখন চলমান। কিন্তু মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত মিয়ানমারের সেই একই সামরিক নেতৃত্ব নতুন করে একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করে চলেছে। মিয়ানমারের কারেননি, কারেন, কাচিনসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, কেন্দ্রস্থলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা অভ্যুত্থানবিরোধী, তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রকাশ করেছে। জেনেভাতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৫২তম অধিবেশনে সংস্থাটির হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়েছে—
‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে একটি কৌশল সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। সেটা হলো গ্রামগুলো ও মানুষের বাড়িঘরগুলো পদ্ধতিগতভাবে ও বিস্তৃতভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রেখে জাতিসংঘ প্রতিবেদন বলছে যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশজুড়ে সামরিক অভিযানে (এর মধ্যে ২০১১ সালে কাচিনের ও ২০১৭ সালে রাখাইনের ঘটনা রয়েছে) অন্তত ৩৯ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’
মাত্র পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে যায়। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশে চলে যায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যেভাবে শত শত গ্রাম পুরোপুরি জ্বালিয়ে দেয়, তা থেকে জীবন বাঁচাতেই তারা পালিয়ে যান। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে মিয়ানমারের সেই একই সামরিক বাহিনী একই কৌশল প্রয়োগ করে চলেছে। মিয়ানমারের ৮০ শতাংশ এলাকাজুড়ে যে সংঘাত চলছে, সেসব এলাকায় ১৩ লাখের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ধর্মীয় পরিচয়ে বৌদ্ধ নয় কিংবা জাতিগত পরিচয়ে বর্মিজ নয়, এমন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জঘন্য ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৃশংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরেই তারা এটা করে চলেছে। কিন্তু এবারের সামরিক শাসকেরা নতুন যেটা করছেন, তা হলো ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ব্যাপক অজনপ্রিয় অভ্যুত্থানের সমালোচনা বা বিরোধিতা যেসব গোষ্ঠী করেছে, তাদেরকে তারা ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল মিয়ানমার নিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশের এক সপ্তাহ পর কারেননি ও স্যাগায়িং অঞ্চল থেকে আসা অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সেখানকার জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জান্তারা যে ভয়ংকর নৃশংসতা চালিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তারা। বিমান থেকে গোলাবর্ষণ, মর্টার সেল নিক্ষেপ ও গণহত্যা করেছে। পুরো গ্রাম ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।
জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু কারেননিরা বংশানুক্রমিকভাবে থাইল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বাস করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এই জাতিগোষ্ঠীর বেসামরিক নাগরিক ও তাদের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে উপর্যুপরি হামলা চালায়। এর ফলে তাদের প্রায় অর্ধেক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্যাগায়িং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছাকাছি অবস্থিত। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
মিয়ানমারের সেনারা এখন সংঘাত-কবলিত এলাকায় নিয়মিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করছে। সেসব কাটা মাথা তারা জনসম্মুখে প্রদর্শন করছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দা নয়, অভ্যুত্থানবিরোধী সমস্ত জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানোর জন্য তারা সেসব বিচ্ছিন্ন মাথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। থাইল্যান্ডের সীমানাসংলগ্ন কারেননি ও কারেন অঞ্চলের জাতিগত সংখ্যালঘুদের গ্রামগুলোতে খবার পানির কুয়াগুলোতে বিষও মিশিয়ে দিয়েছে তারা।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে ৩৯ হাজার বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। কিন্তু অন্যান্য বেসামরিক ও ধর্মীয় স্থাপনা যেমন হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বৌদ্ধমঠ, চার্চ, মসজিদ, খাদ্য ও ধান সংরক্ষণের গুদাম ও হাটবাজার তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেগুলো এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে ধরনের জাতিগত নির্মূলের শিকার হয়েছিল, তার সঙ্গেই কেবল চলমান ধ্বংসযজ্ঞের তুলনা চলে।
কিন্তু নানা পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর (গণতন্ত্রকামী ও ভিন্নমতালম্বী এবং তাদের জাতিগোষ্ঠী এবং অভ্যুত্থানবিরোধী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী) বিরুদ্ধে যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে, সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুঁশিয়ারি আমরা শুনছি না। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা জানে যে গণহত্যা সনদ অনুসারে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন।
কিন্তু গণহত্যার সংজ্ঞা নাৎসি গণহত্যার আগে নির্ধারণ করা হয়েছে। পোল্যান্ডের ইহুদি আইনবিশারদ র্যাফেল লেমকিন গণহত্যার যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন, তাতে গণহত্যা বলতে শুধু নির্দিষ্ট পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বোঝানো হয়নি। লেমকিনের এই ধারণা যখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গণহত্যাবিষয়ক সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন মাত্র চার ধরনের বিষয় তাতে ঠাঁই পায়। জাতি, বর্ণ, গোত্র ও ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই গণহত্যার সংজ্ঞাটি প্রযোজ্য। কিন্তু গণতন্ত্রী, ভিন্নমতাবলম্বী, কমিউনিস্ট—এ ধরনের ভিন্ন পরিচয়ের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য হয় না।
বার্মিজ মানবাধিকারকর্মী ও নির্বাসনবিশেষজ্ঞ হিসেবে এক দশক আগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ধ্রুপদি গণহত্যার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রথম ফাঁস করেছিলাম। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি নির্মূল করার জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের ওপর তিন বছর ধরে পদ্ধিতগত নিপীড়ন চালিয়েছিল।
অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি শুনে এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে কৌশল প্রয়োগ করছে তার অসংখ্য নথি ঘেঁটে, আমি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছি যে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের গণহত্যাকারী সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ যেভাবে অস্বীকার করে চলেছে এবং এ অপরাধের পক্ষে যেভাবে সাফই গেয়েছে, নতুন গণহত্যার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা সেটার পুনরাবৃত্তি করবে। এ দফায় তারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গণতন্ত্রপন্থী, ভিন্নমতাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জাতিগত সংখ্যাগুরু বামার এবং সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করে চলেছে।
● মং জার্নি, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী
- ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনোজ দে
![]() |
| মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কৌশল হলো তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে |
Saturday, February 7, 2026
মিয়ানমারের সামরিক–সমর্থিত দলের ভূমিধস জয়, এখনো স্বীকৃতি দেয়নি আসিয়ান
মিয়ানমারে এবারের জাতীয় নির্বাচনে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হয়ে গত সপ্তাহে নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়। এতে দেশটির পার্লামেন্টের নিম্ন ও উচ্চকক্ষে ইউএসডিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। দলটি নিম্নকক্ষ পিথু হ্লুট্টের ২৬৩টির মধ্যে ২৩২টি এবং উচ্চকক্ষ অ্যাম্যোথা হ্লুট্টে ১৫৭টির মধ্যে ১০৯টি আসনে জিতেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ও আজ শুক্রবার নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ মাধ্যম আজ এ খবর জানিয়েছে।
ইউএসডিপি দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষে কাজ করে আসছে। দলটির চেয়ারম্যান একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। আর শীর্ষপদের অনেকে উচ্চপদস্থ সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জান্তা সরকারবিরোধী বিদ্রোহ ব্যাপক ও তীব্রতর হয়েছে। এতে দেশটির অনেক পুরোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীও যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সেনাবাহিনী ও জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেই পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছেন। বিতর্কিত এ নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক দল অংশ নেয়নি।
গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের অনেক প্রশাসনিক অঞ্চলে (টাউনশিপ) ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভোট না হওয়ায় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো বলছে, নির্বাচন ‘আবাধ ও সুষ্ঠু’ হয়নি। সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে রোহিঙ্গাসহ অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিতে পারেনি, তা ছাড়া ভোটের সময়ে বিমান হামলায় অন্তত ১৭০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৪০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
স্বীকৃতি দেয়নি আসিয়ান
আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসিয়ানের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে ফিলিপাইন। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্রসচিব তেরেসা লাজারো বলেন, ‘মিয়ানমারে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি’ আসিয়ান।
লাজারো জানান, আসিয়ান এখনো মিয়ানামারের নির্বাচনের বিষয়ে নিজেদের চূড়ান্ত সম্মতি বা অবস্থান ঠিক করতে পারেনি। তিন ধাপে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
গতকাল ফিলিপাইনের সেবু শহরে চলতি বছর প্রথমবারের মতো আসিয়ানের মন্ত্রিপর্যায়ে বড় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এবারের বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। বৈঠক শেষে লাজারো সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় এসব উল্লিখিত মন্তব্য করেন।
![]() |
| ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন মিয়ানমারের জগনণ। রাজধানী নাইপিডোতে, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Thursday, January 29, 2026
আইসিজেতে শুনানিতে গাম্বিয়া: রোহিঙ্গাদের জীবন বিভীষিকাময় করে তুলেছে মিয়ানমার
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাটি করে। মামলাটির এ শুনানি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গত এক দশকের বেশি সময়ে জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগে প্রথম মামলা হিসেবে এটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ শুনানি হচ্ছে। তাই এ মামলার রায়ের প্রভাব শুধু মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অন্যান্য দেশের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা জাতিগত নিধন মামলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো গতকাল আইসিজের শুনানিতে বলেন, রোহিঙ্গারা ‘সহজ–সরল মানুষ। তাঁরা শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখতেন। ধ্বংস করার জন্য তাঁদের নিশানা করা হয়েছে। মিয়ানমার তাঁদের স্বপ্নকে শুধু অস্বীকার করেনি, বরং তাঁদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। তাঁরা এমন নৃশংস সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছেন, যা কল্পনাতীত।’
২০১৯ সালে মামলাটি করার পর প্রাথমিক শুনানিতেই মিয়ানমার সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তখন মামলার অভিযোগে গাম্বিয়া বলেছিল, মিয়ানমার নিজেদের রাখাইন রাজ্যের প্রত্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালিয়েছে।
আইসিজেতে মামলা হওয়ার দুই বছর আগে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচার হামলার মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক ধর্ষণ এবং তাঁদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে ‘জাতিগত নিধনের মতো ঘটনা’ ঘটেছে।
গাম্বিয়াকে আইসিজেতে মামলা করতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭ দেশের জোট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সহযোগিতা করেছে। মামলাটির প্রাথমিক শুনানিতে অংশ নিয়ে মিয়ানমারের তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি গাম্বিয়ার জাতিগত নিধনের অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতটি মিয়ানমারের ‘প্রাথমিক আপত্তি’ খারিজ করে দেন।
চলমান শুনানি ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবস চলবে। এতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কথা শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার কারণে এসব সেশনে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত থাকতে পারবেন না।
![]() |
| মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ফাইল ছবি |
Wednesday, January 28, 2026
আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল: মিয়ানমারে নিপীড়িত রোহিঙ্গা নারী
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগসংক্রান্ত শুনানি শুরু হওয়া প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন মোনাইরা (ছদ্মনাম)। তিনি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো নির্মম দমন-পীড়নে বেঁচে যাওয়া মানুষদের একজন।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়, তখন এ রোহিঙ্গা নারীকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
মোনাইরা বলেন, সেই সহিংসতার সময় তাঁর ভাইকে সেনাসদস্যরা ধরে নিয়ে যায়, গুলি করে হত্যা করে ও তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেনাসদস্যদের হাতে তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হন।
মোনাইরা বলেন, ‘আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল।’
গতকাল সোমবার জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। মোনাইরার মতো রোহিঙ্গাদের অনেকের আশা, এর মধ্য দিয়ে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পথে তাঁরা অন্তত এক ধাপ এগোতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে গাম্বিয়া। মূলত ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে এ মামলা করা হয়। ওই অভিযানের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
মোনাইরা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই।’ শুনানিতে অংশ নিতে তিনি বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত শরণার্থীশিবির থেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গিয়েছেন।
এটি গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) প্রথম কোনো জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জাতিগত নিধনের অভিযোগগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে ক্ষেত্রে এই শুনানি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
এর মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা একটি মামলাও রয়েছে।
গতকাল সোমবার শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো আদালতকে বলেন, এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প ও একটি বাস্তব মানবগোষ্ঠীকে ঘিরে মামলাটি করা হয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা হলো সেই মানবগোষ্ঠী, ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যেই যাঁদের নিশানা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছে—কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, দাদা-দাদি।
জ্যালো আরও বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবনকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তাঁদের এমন সহিংসতা ও ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা কল্পনা করাও কঠিন।
গাম্বিয়া আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিচার আদালতে তাদের প্রথম পর্যায়ের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। দেশটির অভিযোগ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।
দাউদা জ্যালো আদালতে বলেছেন, ‘আমরা হালকা ধরনের প্রস্তুতির ভিত্তিতে এ মামলা করিনি। বহু বছর ধরে অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি অসহায় গোষ্ঠীর ওপর যে নৃশংস ও নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করার পরই আমরা এই মামলা দায়ের করেছি।’
মিয়ানমার জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা ১৬ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারির ভেতর তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। নিপীড়নের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জন্য বিরল ঘটনা। ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষ হবে।
এর আগে মিয়ানমারের ৮০ বছর বয়সী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি আদালতে গিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। ওই সময় তিনি মিয়ানমার সরকারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সেনা অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। বর্তমানে সু চি সেনাবাহিনীর নির্দেশে আটক রয়েছেন। ২০২১ সালের ওই সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা মিয়ানমারকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে।
তুন খিন আরও বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দীর্ঘ পথে বড় এক অগ্রগতি।’
তুন খিন আঞ্চলিক রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২০ সালে আইসিজে মিয়ানমারের ওপর জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী পদক্ষেপ জারি করেছিল। এর আওতায় রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনমূলক সহিংসতা রোধ ও অতীতের অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে মিয়ানমার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সেনাবাহিনী এখনো নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক গবেষক শায়না বাউচনার বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচিত ‘নৃশংস নির্যাতন ও দমনমূলক অব্যবস্থাপনার চক্র’ শেষ করা। তাঁর মতে, দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের জান্তাকে আইসিজে-নির্ধারিত অস্থায়ী ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করা।
আইসিজেতে করা মামলাটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হবে, মিয়ানমার জাতিগত নিধন (জেনোসাইড) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করেছে কি না।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালে আইসিসির কৌঁসুলি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং–এর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করেন।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টোনিয়া মালভি বলেন, ‘আমরা যখন সশস্ত্র সংঘাত, ন্যায়বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখছি, তখন ২০২৬ সালের শুরুতেই এমন একটি মামলায় বিচারকাজ শুরু হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।’
মালভি বলেন, ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে মামলার রায় আসতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, যদি মিয়ানমারে বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না হয়, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে থেকে যাবে।
![]() |
| মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বিমান হামলার পর আগুন ধরে যাওয়া একটি বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি |
ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতেই কি নির্বাচন দিল মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান
চশমা পরা এ সেনা কর্মকর্তা ২০১১ সালে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান হন। ঠিক ওই সময় দেশটি দীর্ঘদিনের কঠোর সামরিক শাসনের ইতিহাসকে ভেঙে দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছিল।
৬৯ বছর বয়সী মিন অং হ্লাইং অভ্যুত্থান করার আগে প্রায় এক দশক ধরে নীরবে নিজের আধিপত্য সুদৃঢ় করেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠান। এর কয়েক মাসের মধ্যে দেশটিতে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
গত মাসের শেষের দিকে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। তিন ধাপে এ নির্বাচনের ভোট চলছে। তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট গ্রহণ হয়েছে গত রোববার। মিন অং হ্লাইং নিজেই পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছেন।
মিয়ানমারের চলতি নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি–সহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক দল অংশ নিচ্ছে না। তাই এ নির্বাচন কী ফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে দেশটির জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু মিন অং হ্লাই সব সন্দেহ উপেক্ষা করে বারবার বলেছেন, এ নির্বাচন দেশে শান্তি ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।
এবারের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত প্রধান রাজনৈতিক দল যাতে নিরঙ্কুশ জয় পায়, সেভাবেই সবকিছুর আয়োজন করা হয়েছে। আর মিন অং হ্লাইং নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি সামরিক ইউনিফর্ম খুলে প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
মিন অং হ্লাইং এখনো সেনাপ্রধান। আইনি বৈধতা না থাকলেও তিনিই দেশটির ক্ষমতার সর্বেসর্বা-এটা সব মিয়ানমারবাসী জানেন।
তৃতীয়বারের চেষ্টায় সেনাবাহিনীতে
মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলের দাওয়ে শহরে মিন অং হ্লাইংয়ের জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়াশোনা শেষে তিনি তৃতীয়বারের চেষ্টায় অফিসার ট্রেইনিং স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ধাপে ধাপে সামরিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে উঠতে থাকেন। চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট আছে, এমন এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী একটি জাতিগত বিদ্রোহীদের দমন করে তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
মিন অং হ্লাইংয়ের আগে সেনাপ্রধান ছিলেন থান শ্যে। তিনি প্রায় দুই দশক মিয়ানমার শাসন করেন। এর ভেতর তাঁর কপাল ঘটল এক বিরল ঘটনা—তিনি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধীনে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু দেশটির খসড়া সংবিধান তাঁকে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ করে দিয়েছিল। দেশটির খসড়া সংবিধানে পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদ সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
রোহিঙ্গা নিধন
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই মিন অং হ্লাইং অনেক দেশের কাছে অবাঞ্ছিত ব্যক্তির তালিকায় ছিলেন। ২০১৭ সালে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বড় সামরিক অভিযান চালায়। এতে করে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেন। এ অভিযানের সঙ্গে মিন অং হ্লাইংয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছেন।
হিংসাত্মক বক্তব্যের কারণে ফেসবুক মিন অং হ্লাইংকে নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের অনেক দেশ তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য আবেদন করেন।
কিন্তু মিন অং হ্লাইং বারবার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সামরিক অভিযান জরুরি ছিল। অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণের বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছেন মিন অং হ্লাইং। এ প্রকল্পে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। চীন, রাশিয়া ও ইসরায়েল থেকে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কিনছেন।
মেডেলের আড়ালে অপকর্ম
প্রতিবছরের ২৭ মার্চ রাজধানী নেপিডোতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন মিন অং হ্লাইং। হুড খোলা জিপে দাঁড়িয়ে তিনি অভিবাদন গ্রহণ করেন। তাঁর দুই বাহু ও বুকে থাকে সামরিক ও বেসামরিক স্বীকৃতির অনেক মেডেল।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাপ্তরিক পদবি হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের একটি দীর্ঘ নাম লেখা হয়। তা হলো ‘স্টেট সিকিউরিটি অ্যান্ড পিস কমিশন চেয়ারম্যান কমান্ডার ইন চিফ অব ডিফেন্স সার্ভিসেস সিনিয়র জেনারেল থাদো মহা থ্রায় সিত্থু থাদো থিরি থুদধর্মা মিন অং হ্লাইং’। এতে তাঁর একাধিক সামরিক-বেসামরিক খেতাব ও দায়িত্বের কথা উল্লেখ আছে।
তবে মিন অং হ্লাইংয়ের খেতাব ও পদবি যত লম্বাই হোক, বার্ষিক কুচকাওয়াজে প্রতিবছর সেনাসংখ্যা কমছে। কারণ, তাঁর বাহিনীকে বিস্তৃত ও দুর্গম দেশটির নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জোরদার হচ্ছে সেনাশাসন
অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাগারে পাঠানোর পর মিন অং হ্লাইং তাঁর বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। কিন্তু নিজের দাবির পক্ষে তিনি প্রমাণ দিতে পারেননি।
বিশ্লেষকেরা তখন বলেছিলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত দলগুলো ভালো করতে পারেনি। তাই রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা কমা নিয়ে মিন অং হ্লাইং উদ্বিগ্ন ছিলেন।
অভ্যুত্থানের পর নাগরিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের শক্ত হাতে দমন শুরু করে। এ অবস্থায় বিক্ষোভকারীরা শহর ছেড়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। তাঁদের সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের পুরোনো অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠীও যোগ দেয়। কর্মজীবনের শুরুতে এসব বিদ্রোহী দমনে মিন অং হ্লাইং নিজেই লড়াই করেছিলেন।
পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারে কত মানুষ মারা গেছে, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে সব পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত মানুষদের একটি বড় অংশ জান্তার জোর করে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া সেনাসদস্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
![]() |
| ভোট দেওয়ার পর মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। রাজধানী নেপিডোতে, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Sunday, January 4, 2026
মিয়ানমারে ভুয়া নির্বাচন ও জেনারেলদের নতুন রাজনৈতিক খেলা by কিয়াও জওয়া মো
আমি যখন বলি জনগণ নীরবতায় ডুবে আছে, তখন আমার কথার অর্থ হলো তারা এই নির্বাচনে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না এবং চুপচাপ এর বিরোধিতা করছে। যখন তাদের দিকে বন্দুক তাক করা থাকে, তখন কে আর নির্ভয়ে কথা বলতে সাহস পায়? যদি তারা ভয় ছাড়া কথা বলতে পারত, তাহলে শুধু বলত, আমাদের কেন আগ্রহী হওয়া উচিত (নির্বাচন নিয়ে)? এটা তো নির্বাচন নয়, এটা একধরনের প্রহসন।
মিয়ানমারের মানুষ নির্বাচন সম্পর্কে বাইরের অনেক পর্যবেক্ষকের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। ১৯৯০, ২০১০ ও ২০২০ সালে তারা যে ভোটগুলো আশা নিয়ে দিয়েছিল, সেগুলো হয় চুরি হয়েছে, নয়তো বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গভীর এক মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে। তিন দশকে তিনটি নির্বাচন, অথচ একটিও সম্মানিত হয়নি। এ কারণেই আমি একে ‘নির্বাচনী ট্রমা’ বলি।
তাই ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত কিছু আসনে জান্তা যখন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, তখন অধিকাংশ মানুষের মনে আবারও প্রতারণার আশঙ্কা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাদের চোখে সামরিক বাহিনী যা করতে যাচ্ছে, তা কোনো নির্বাচন নয়। এটি একটি রাজনৈতিক প্রতারণা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মুখোশ পরে সামরিক ক্ষমতাকে স্থায়ী করার চেষ্টা।
২০২০ সালে জনগণ যে নেতাদের নির্বাচন করেছিল, তারা এখনো কারাগারে। সামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানকে প্রকাশ্যেই উপহাস করা হচ্ছে। এর ফল কী? ফলাফল সবাই আগেই জানে।
সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক শাখা ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিই তথাকথিত ‘জয়ী’ হবে। শুরু থেকেই এই নির্বাচন সাজানো হয়েছে জেনারেল ও সাবেক জেনারেলদের সরকার গঠনের জন্য। এ থেকে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে বলে কেউ বিশ্বাস করে না। যে জেনারেলরা অতীতে জনগণের ভোট কারচুপি করেছে, কলুষিত করেছে এবং মুছে দিয়েছে, তাদের আয়োজিত নির্বাচন থেকে পরিবর্তনের আশা করা নিছক কল্পনা। বিরোধী শক্তি, বিপ্লবী গোষ্ঠী ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো এই নির্বাচনকে ঠিক যেভাবে তা, সেভাবেই দেখছে। এটি ভুয়া, আগেই নির্ধারিত এবং অবৈধ।
নীরব জনগণের বিপরীতে এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো ব্যস্ত নিজেদের হিসাব–নিকাশে। কে জিতবে, তারা কতটি আসন পেতে পারে, পরে কোন কোন পদ তারা পেতে পারে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের ঠিক উল্টো। কিন্তু যে জনগণ এই নির্বাচনই প্রত্যাখ্যান করছে, তাদের কাছ থেকে তারা কীভাবে ভোট পাওয়ার আশা করে।
এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মোট ৫৭টি দল। এর মধ্যে মাত্র ছয়টি দল সারা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ২৯টি দল জাতিভিত্তিক। অধিকাংশ দলেরই জনগণের মধ্যে তেমন কোনো সমর্থন নেই। দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জান্তার রাজনৈতিক রোডম্যাপের অধীন, যা স্পষ্টভাবে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তৈরি।
এই দলগুলোর নাম নতুন নয়। কিন্তু তারা জনপ্রিয়ও নয় এবং বেশির ভাগই ঐতিহ্যগতভাবে শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ। বাস্তবে তারা ‘শূন্যস্থান পূরণ’ দল হিসেবে কাজ করছে। মূলত অগণতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম রাজনৈতিক বহুত্ববাদের চেহারা দেখানোর জন্যই তাদের উপস্থিতি।
কিছু দলের নেতা আশা করছেন, এই নির্বাচন একটি নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করবে, যা রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংঘাত কমাবে। আবার অন্যরা কেবল ব্যক্তিগত লাভের কথা ভাবছে। রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা, ক্ষমতার কাছে পৌঁছানো এবং অর্থসম্পদের সুযোগ পাওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
যখন জনগণ নীরবতায় ডুবে আছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বিগ্ন, তখন জেনারেলরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের ছক কষছে। তারা ইতিমধ্যেই কোন জেনারেল কোন আসনে দাঁড়াবে, তা ঠিক করছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। সংসদ ও সরকারের কোন পদে কোন অনুগত বসবে, তারও মানচিত্র তারা তৈরি করে ফেলেছে। এই পুরো পরিকল্পনার মূল কারিগর অবশ্যই জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং।
২০২২ সাল থেকেই মিন অং হ্লাইং এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সে বছর তিনি ইউএসডিপির চেয়ারম্যান উ থান হটেকে সরিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠ উ খিন ইয়িকে বসান। উ খিন ই ছিলেন সাবেক অভিবাসনমন্ত্রী ও পুলিশপ্রধান। পাশাপাশি তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিয়ো জ অ থেইনকে উপ-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। তারা সবাই আগামী সংসদ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় হাজির হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে ২০১০ সালের নির্বাচনের সঙ্গে এখানেই একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। মিন অং হ্লাইং অবসর নিতে চান না। সাবেক সর্বময় ক্ষমতাধর থান শ্বের মতো তিনি সরে দাঁড়াবেন না। তাঁর লক্ষ্য প্রেসিডেন্ট হওয়া। মিন অং হ্লাইং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান। এর কম কিছু নয়, এর বেশি কিছু নয়।
এই নির্বাচন থেকে জনগণের নির্বাচিত কোনো সরকার আসবে না। জনগণের সেবায় নিয়োজিত কোনো সরকারও গড়ে উঠবে না। যা গড়ে উঠবে, তা হলো এক নিষ্ঠুর জেনারেলের টিকে থাকার জন্য সম্পূর্ণভাবে সাজানো একটি সরকার।
• কিয়াও জওয়া মো, দ্য ইরাবতীর নির্বাহী সম্পাদক
- দ্য ইরাবতি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত কিছু আসনে জান্তা যখন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, তখন অধিকাংশ মানুষের মনে আবারও প্রতারণার আশঙ্কা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কোলাজ: দ্য ইরাবতীর সৌজন্যে |
Saturday, January 3, 2026
‘একটি কমেডি শো’: মিয়ানমারের তরুণদের চোখে জান্তার আসন্ন নির্বাচন
শরীরে প্রচুর ট্যাটু আঁকা ইঙ্গ লা বলেন, ‘পাঙ্কের অর্থ স্বাধীনতা।’ থাইল্যান্ডের মে সোতে নিজের ‘পাঙ্ক বার’-এর পেছনে বসে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এক স্বদেশিকে ট্যাটু করে দেওয়ার সময় তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এটি কেবল গান বা ফ্যাশন নয়, এটি বেঁচে থাকার একটি উপায়।’
স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষাই ছিল মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে ইঙ্গ লা-এর পালিয়ে আসার অন্যতম কারণ। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ এখন থাইল্যান্ডে একজন নথিপত্রহীন নাগরিক হিসেবে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছেন।
তবে ইঙ্গ লা–এর মতে, জান্তা সরকারের হাতে বন্দী হওয়ার চেয়ে এটি অনেক ভালো। এই জান্তা সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি প্রথমে প্রতিবাদ করেছিলেন এবং পরে অস্ত্র ধরেছিলেন।
ইঙ্গ লা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ভয় ছিল যদি আমি ধরা পড়ি, তবে আমাকে আবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা আর মৃত্যুকে ভয় পাই না। কিন্তু সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়া মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।’
মে সোতে নির্বাসিত ইঙ্গ লা-এর এই গল্প মিয়ানমারের সেই সব হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর মতো, যাঁরা গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়েছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়েছিল।
মিয়ানমারের ২০১৫ এবং ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে উল্টে দিয়েছে এই অভ্যুত্থান। অথচ এসব নির্বাচনকে দেশটির ইতিহাসে প্রথম সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সু চির দল বিপুলভাবে জয়ী হয়েছিল।
সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে মিয়ানমারে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বিমান হামলা, স্থলমাইন বিস্ফোরণ, বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে পুরো দেশে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইঙ্গ লা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘অভ্যুত্থানের শুরুতে জান্তা সরকার আদেশ দিয়েছিল, কেউ যেন ৭২ ঘণ্টা ঘরের বাইরে বের না হয় বা প্রতিবাদ না করে। সেই সময়ের মধ্যেই আমি আর আমার দুই বন্ধু হাতে তৈরি ব্যানার নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করেছিলাম।’
গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে ইঙ্গ লা থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী জঙ্গলে পালিয়ে যান এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সে (পিডিএফ) যোগ দেন। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তিনি আবারও পালাতে বাধ্য হন। তিনি গোপনে থাইল্যান্ডে ঢুকে যান। সেখানেই সঙ্গিনীর সহযোগিতায় গড়ে তোলেন এই ট্যাটু পার্লার ও বার।
থাইল্যান্ডের জীবন নিয়ে ইঙ্গ লা বলেন, ‘অবৈধভাবে আসায় আমার কাছে কোনো কাগজপত্র ছিল না। কোথাও যেতে পারতাম না, টিকে থাকার জন্য কাজ জোগাড় করাও ছিল অসম্ভব।’
নথিপত্রহীন হওয়ার কারণে ইঙ্গ লা–কে প্রতিনিয়ত থাই কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন ফি বা ‘লাইসেন্স’ খরচ দিতে হয় এবং সব সময় দেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে থাকতে হয়।
‘আমাদের সব আশা-স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গেছে’
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পক্ষে সেনাবাহিনীর যুক্তি ছিল, সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নির্বাচনে কারচুপি করে জিতেছে। এখন সেই সামরিক বাহিনী আগামী রোববার (২৮ ডিসেম্বর) নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচনের আয়োজন করছে। তবে এই নির্বাচনকে বিশ্বজুড়ে একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধভাবে দখল করা ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়া।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা’ (ডিভিবি) জানিয়েছে, নির্বাচনে অনেক দল নিবন্ধন করলেও অং সান সু চির জনপ্রিয় দল এনএলডিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুস এই নির্বাচনকে ‘নকল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা বন্দী ও মৌলিক স্বাধীনতা নেই, সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
আল–জাজিরার প্রতিবেদক টনি চেং জানিয়েছেন, নির্বাচনের সমালোচনা করার দায়ে শিল্পী ও সংগীতজীবীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ইঙ্গ লা-এর মতো অনেকেই তাই দেশ ছাড়ছেন।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, তারা এই নির্বাচনের ফল মেনে নেবে না। ইঙ্গ লা-এর কাছেও এই নির্বাচনের কোনো মূল্য নেই।
![]() |
| মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, December 30, 2025
সাত দশক ধরে সামরিক শাসনের আবর্তে মিয়ানমার
পাঁচ বছর ধরে সামরিক জান্তার শাসনের মুখে মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। এরই মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছে সরকার। এই নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ হবে বা তাতে জনগণের মতের কতটা প্রতিফলন হবে, তা নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বহু বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই একে দেখছেন জান্তার ক্ষমতা পোক্ত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে।
মিয়ানমারে সামরিক শাসন সম্পর্কে শুরু থেকে জানতে হলে ফিরতে হবে বেশ খানিকটা পেছনে। মিয়ানমার তখন পরিচিত বার্মা নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পায় মিয়ানমার। মিয়ানমারের এই স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অং সান। তিনি দেশটির কারাবন্দী নেত্রী নোবেলজয়ী অং সান সু চির বাবা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের উৎখাত করতে জাপানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন অং সান। তবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে মিত্রপক্ষের দিকে গেলে তিনি আবার দল বদলান। স্বাধীনতার জন্য লন্ডনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর মিয়ানমারে বেশ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ের মুখে পড়ে বেসামরিক সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনীকে দুই বছরের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর নির্বাচন হয়েছিল। তবে ১৯৬২ সালে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয় সামরিক বাহিনী। অং সানের একসময়ের সহযোদ্ধা নে উইন দেশ রক্ষার কথা বলে এই পদক্ষেপ নেন। অং সান হত্যার পর এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়েছিলেন।
নে উইন বলেছিলেন, সময়মতো তিনি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন; তবে কথা রাখেননি। ২৬ বছর মিয়ানমার শাসন করেন তিনি। কায়েম করেন নামমাত্র সমাজতান্ত্রিক একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা। এতে বিশ্বে মিয়ানমার একঘরে হয়ে পড়ে। এর ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। অর্থনীতি ধসে পড়ে। ক্ষমতা ধরে রাখতে ভিন্নমত দমনের পথে হাঁটে জান্তা।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের মুখে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করেন নে উইন। তখন সামরিক বাহিনীর নতুন নেতৃত্ব আবার অভ্যুত্থান করে। আন্দোলনকারীদের কঠোর হাতে দমন করা হয়। হত্যার শিকার হন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। কারাগারে স্থান হয় অনেকের। এরপর ১৯৯২ সালে সামরিক সরকারের দায়িত্ব নেন জেনারেল থান শোয়ে।
২০১১ সালে থান শোয়ে অবসর নেন। ক্ষমতা তুলে দেন বেসামরিক সরকারের হাতে। মিয়ানমারের নতুন নেতা হন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। তিনি সু চিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। ২০১৫ সালে নির্বাচনে বিশাল জয় পায় সু চির দল। ২০২০ সালেও জয় পান তিনি। তবে এই নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী।
জান্তা সরকারের প্রধান হন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। আবার কারাবন্দী করা হয় সু চিকে। বিভক্ত হয়ে পড়ে দেশ। শুরু হয় জান্তাবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহীরা চান না ২৮ ডিসেম্বরের নির্বাচন হোক। কারণ, এর মাধ্যমে সামরিক শাসন আরও পোক্ত হওয়া ছাড়া অন্য কিছু দেখছেন না তাঁরা। এমনই পরিস্থিতিতে শুরু হতে যাচ্ছে ভোট গ্রহণ। তা শেষ হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হতে পারে ফল প্রকাশ।
![]() |
| মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Sunday, December 28, 2025
গৃহযুদ্ধ থেকে এবার ভোটের মাঠে, মিয়ানমারে জান্তার সামনে কী
হ্লাইংয়ের এই বক্তব্য থেকে সহজেই বোঝা যায় যে গৃহযুদ্ধের ময়দানে জান্তা যা করতে পারেনি, নির্বাচনের মাধ্যমে তা করতে চায়। তা হলো নির্বাচনে নিজেদের সমর্থিত দলকে জয় পাইয়ে দেওয়া। আর এর মাধ্যমে সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে নিজেদের ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করা। একই সঙ্গে নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে বিদেশে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা কিছুটা কমিয়ে আনা।
তবে বিশ্লেষক ও কূটনীতিকেরা বলছেন, গৃহযুদ্ধ আরও ভয়াবহ হতে থাকা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা যে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করছে, তা একপ্রকার দুঃসাধ্য। আর যেখানে বিদেশিরাই এই নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করছেন এবং বাঁকা চোখে দেখছেন, সেখানে জয়ের পর ওই দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
মিয়ানমারে ভোট হবে দুই ধাপে। ২৮ ডিসেম্বর ও ১১ জানুয়ারি। এই দুই দিনে দেশটির ৩৩০টি শহর এলাকার মধ্যে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আছে—এমন ২২০ এলাকায় ভোট হবে। গবেষণা সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক রিচার্ড হর্সে বলেন, ‘পরোক্ষ সামরিক শাসন সশস্ত্র বিদ্রোহ বা নাগরিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কোনো সমাধান আনবে না, বরং মিয়ানমার সংকটের মধ্যেই ডুবে থাকবে।’
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা পায় মিয়ানমার। তখন থেকেই দেশটিতে বেশির ভাগ সময় শাসন করেছেন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের তালিকায় নাম লেখান মিন অং হ্লাইং। সে সময় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে মিয়ানমারে নোবেলজয়ী অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ২০১৫ ও ২০২০ সালে নির্বাচনে জয় পেয়েছিল। দলটিকে ভেঙে দিয়েছে মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন। এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না তারা। জান্তাবিরোধী অন্য দলগুলোও অংশ নিচ্ছে না। নির্বাচন করছে ছয়টি দল। এর মধ্যে সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) জেতার সম্ভাবনা বেশি।
ইউএসডিপি জিতলে মিন অং হ্লাইং শক্তিশালী অবস্থানে থেকে যাবেন, এটা বলাই যায়। তবে অতীতে কিছু ভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। যেমন ২০১০ সালের নির্বাচনের পর সাবেক জেনারেল থেইন সেইনকে বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে বসিয়েছিল সামরিক বাহিনী। তবে তিনি কিন্তু উল্টো উদারপন্থী নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর জেরেই ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন গণতান্ত্রিক সু চি।
এটাও ঠিক যে সেই সময়ের চেয়ে বর্তমান চিত্র একেবারে ভিন্ন। গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের ঐক্য এক ছিন্নভিন্ন। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট এশিয়া পিস ইনস্টিটিউটের গবেষক ইয়ে মিও হেইন বলেন, সামরিক বাহিনীর আয়োজিত এই নির্বাচনের জেরে দেশে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে টেকসই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে না।
![]() |
| মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
জান্তার ভয়াবহ হামলা আর ভোট নিয়ে আতঙ্কের কথা জানালেন মিয়ানমারের এক নারী
ইয়াং জা কিম বলেন, ‘আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, জান্তা সরকারের যুদ্ধবিমানগুলো আমাদের ওপরও বোমা ফেলবে। তাই আমরা কিছু খাবার, জামাকাপড়সহ হাতের কাছে যা পেলাম, তা নিয়ে গ্রামের পাশের জঙ্গলে দৌড়ে পালাই।’
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় চিন প্রদেশে নিজ গ্রাম কে-হাইমুয়ালে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন এই নারী। গত ২৬ নভেম্বর ঘটে যাওয়া ওই দুর্বিষহ ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় ইয়াং জা কিমের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ দেখা যাচ্ছিল।
২৮ ডিসেম্বর থেকে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দমন–পীড়ন শুরু করেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো নতুন করে নিজেদের দখলে নিতে ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। এ কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় আক্রান্ত এলাকার কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদেরই একজন ইয়াং জা কিম।
কিম যখন বিবিসির কাছে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর পাশে মাদুর পেতে বসে ছিলেন আরও চার নারী। এ সময় তাঁরাও কাঁদতে শুরু করেন। সে রাতে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে গিয়ে তাঁদের যে দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার ছাপ তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
বিমান হামলার পরপরই বাড়ি ছেড়ে পালানো কিম আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে চান না।
এই নারী বলেন, ‘যদি আমরা ধরা পড়ি এবং ভোট দিতে রাজি না হই, তবে তারা আমাদের জেলে ঢোকাবে এবং নির্যাতন করবে। আমাদের যাতে ভোট দিতে না হয়, সে জন্যই আমরা পালিয়ে এসেছি।’
মিয়ানমারের চিন প্রদেশের কেউ কেউ জান্তা সরকারের সর্বশেষ এই হামলা ও দমন–পীড়নকে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন।
বাড়িঘর ছেড়ে পালানো মানুষদের অনেকে প্রদেশের অন্যান্য অংশে আশ্রয় নিয়েছেন। আর ইয়াং জা কিমসহ কিছু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে প্রবেশ করেছেন। তাঁরা সেখানকার ভাফাই গ্রামের ব্যাডমিন্টন খেলার পরিত্যক্ত একটি মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। সঙ্গে করে সামান্য যেসব জিনিস আনতে পেরেছেন, তা প্লাস্টিকের বস্তায় রেখে দিয়েছেন। ওই গ্রামের বাসিন্দারা তাঁদের খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সাহায্য করছেন।
৮০ বছর বয়সী রাল উক থাংকেও এই বয়সে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত দিনের পর দিন জঙ্গলে তাঁবু টাঙিয়ে থেকেছেন তিনি।
রাল উক থাং বলেন, ‘আমরা আমাদের এই সরকারকে ভয় পাই। তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তাদের সেনাবাহিনী অতীতে আমাদের ও অন্যান্য গ্রামে ঢুকে মানুষকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করেছে এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।’
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রাণখুলে কথা বলা সহজ নয়। সামরিক সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের দেশটিতে অবাধে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থাৎ গত নির্বাচনের পরপরই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা ক্ষমতা দখল করে। এর পর থেকেই নিজেদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর আগ্রাসন চালাচ্ছে।
জান্তা বাহিনী সর্বশেষ গত সপ্তাহে চিন রাজ্যের দক্ষিণে রাখাইন রাজ্যের একটি হাসপাতালে হামলা চালায়। রাখাইনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো বলছে, এতে অন্তত ৩০ জন নিহত ও ৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
চিন হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন বলেছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত চিন রাজ্যের অন্তত তিনটি স্কুল ও ছয়টি গির্জাকে বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে জান্তা। এতে ৬ শিশুসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন।
বিবিসি গত ১৩ অক্টোবর ভানহা গ্রামের একটি স্কুলে বোমা হামলার ঘটনাটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করেছে। হামলার সময় সেখানে পাঠদান চলছিল। হামলায় জোহান ফুন লিয়ান চুং (৭) ও জিং সের মাউই (১২) নামের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। তা ছাড়া এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি মিয়ানমারের সামরিক সরকার।
এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বাউয়ি নেই লিয়ান। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে ছোট পরিবার তাঁর। ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের ঠিক পরেই ফালাম শহরে তাঁদের বাড়িটি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এরপর তাঁরা কে-হাইমুয়াল গ্রামে নতুন করে জীবন সাজিয়েছিলেন। এবার সেখানে হামলার পর তাঁরা আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
লিয়ান বলেন, ‘এটা কত যন্ত্রণাদায়ক ও কঠিন এবং দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কত বড় কষ্টের ছিল, তা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের এটা করতে হয়েছে।’
লিয়ান আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বকে জানাতে চাই, আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে সামরিক বাহিনী যে দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলকেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না, সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র কীভাবে থাকতে পারে?’
মিয়ানমারের সাবেক নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) অভ্যুত্থানের আগের দুটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিল। তবে এই নির্বাচনে তারা লড়ছে না। কারণ, সু চিসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশ এখন কারাগারে।
বাস্তুচ্যুত রাল উক থাং বলেন, ‘আমরা এই নির্বাচন চাই না। কারণ, সামরিক বাহিনী দেশ চালাতে জানে না। তারা শুধু উচ্চপদস্থ নেতাদের স্বার্থে কাজ করে। যখন অং সান সু চির দল ক্ষমতায় ছিল, আমরা কিছুটা গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমরা শুধু চোখের পানি ফেলছি।’
ইয়াং জা কিমের আশঙ্কা, এই নির্বাচনে কারচুপি হবে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জোটবদ্ধ নয়—এমন কোনো দলকে ভোট দিলে তারা আমাদের ভোট চুরি করবে। পরে দাবি করবে, আমরা তাদেরই ভোট দিয়েছি।’
এই নির্বাচন কয়েকটি ধাপে অনুষ্ঠিত হবে এবং জানুয়ারির শেষ নাগাদ ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচনের আয়োজনকে ‘ধোঁকাবাজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
![]() |
| মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া বাড়ি ঘুরে দেখছেন স্থানীয়রা। ৬ ডিসেম্বর ২০২৫; মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের তাবাইন শহরে। ছবি: এএফপি |
মিয়ানমারে জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে ‘নৃশংসতা’ চালাচ্ছে জান্তা: জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষকে ভোট দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জনগণের প্রতি নৃশংস সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশের কারণে মানুষকে গ্রেপ্তার থামাতে হবে। মিয়ানমারের জান্তা আগামী রোববার থেকে ভোট আয়োজন করতে যাচ্ছে। তারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হিসেবে প্রচার করছে। দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের ও গৃহযুদ্ধ শুরুর পাঁচ বছর পর নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে।
অপর দিকে সাবেক বেসামরিক নেতা নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি এখনো কারাগারে রয়েছেন এবং তার জনপ্রিয় দলটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা ধাপে ধাপে এক মাসব্যাপী এই ভোটকে সামরিক শাসনের নতুন রূপ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলকার টুর্ক গত মাসে এএফপিকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে নির্বাচন আয়োজন ‘অকল্পনীয়’। মঙ্গলবার তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সাধারণ মানুষ সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী উভয়ের হুমকির মুখে পড়ছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘নির্বাচন সুরক্ষা আইন’-এর অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগের কারণে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অনেককে ‘অত্যন্ত কঠোর সাজা’ দেওয়া হয়েছে। ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের হ্লাইংহায়া শহরতলির তিন যুবককে নির্বাচনবিরোধী পোস্টার টাঙানোর কারণে ৪২ থেকে ৪৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, তারা ম্যান্ডালে অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়েছে। তাদের সতর্ক করা হয়েছে, ভোট দিতে না গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে বা তাদের বাড়িঘর দখল করা হবে।
ফলকার টুর্ক জোর দিয়ে বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষকে অনিরাপদ অবস্থায় ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, মানুষ সামরিক সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকেও ‘মারাত্মক হুমকির’ মুখে পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছেন ৯ জন নারী শিক্ষক, যাঁদের গত মাসে কিয়াইকতো থেকে অপহরণ করা হয়। তখন তাঁরা ব্যালটসংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন। বিবৃতিতে বলা হয়, পরে তাঁদের অপরাধীদের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তাসহ মুক্তি দেওয়া হয়।
ফলকার টুর্ক বলেন, এই নির্বাচন স্পষ্টতই সহিংসতা ও দমন–পীড়নের পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যেখানে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগের কোনো পরিবেশ নেই।
![]() |
| জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
মিয়ানমারর গৃহযুদ্ধের মধ্যে বিতর্কিত নির্বাচন
* জয়ের সম্ভাবনা সেনাসমর্থিত ইউএসডিপির। ২০২০ সালের নির্বাচনে মাত্র ৬ শতাংশ আসন পেয়েছিল দলটি।
ওপরের চিত্রটা সাম্প্রতিক। আজ রোববার মিয়ানমারে শুরু হওয়া নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহের ঘাটতি এ ঘটনা থেকেই কিছুটা বোঝা যায়। কারণ, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার। দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বিভক্ত জাতি। এরপর সামরিক জান্তার মঞ্চস্থ এই নির্বাচনকে ভালো চোখে নিচ্ছেন না দেশ-বিদেশের মানুষ। নির্বাচনের পেছনে দেখা হচ্ছে অসৎ উদ্দেশ্য।
নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপ আজ। দ্বিতীয় ধাপ ১১ জানুয়ারি আর তৃতীয় ধাপ ২৫ জানুয়ারি। জানুয়ারির শেষে ফল ঘোষণা করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের মোট ৩৩০টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ২৬৩ এলাকায় নির্বাচন হবে। শুধু সেনানিয়ন্ত্রিত এলাকায়গুলোতেই নির্বাচন হচ্ছে। অন্যান্য এলাকা সশস্ত্র বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে।
মিয়ানমারের সাধারণত বহু মানুষের মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচন চায় না। ২০২১ সালে নোবেলজয়ী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জান্তা ক্ষমতায় এসেছিল। ওই দলটিও নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। সরকারবিরোধী অনেক দলও নির্বাচনের মাঠে নেই। যে কটি দল নির্বাচন করছে, তার অনেকগুলোই সেনাসমর্থিত।
‘এটা মিথ্যার নির্বাচন’
নির্বাচন নিয়ে মানুষের আপত্তির নানা কারণ রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকেও আপত্তি জানিয়ে বলা হচ্ছে যে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতেই এই নির্বাচনের আয়োজন করেছে জান্তা। এর মাধ্যমে বেসামরিক সরকার গঠন করা হলেও তা ঘুরবে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ছড়ির ইশারায়। বিদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কাছ থেকেও মিয়ানমার কিছুটা বেশি বৈধতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওপরে মান্দালয়ে সে সমাবেশের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ইউএসডিপি কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিল বিবিসি। তবে তাঁদের নাকি দলের নেতারা কথা বলতে মানা করেছেন। আসলে তাঁদের ভয়ের কারণটা আশপাশে থাকা উর্দিবিহীন সামরিক গোয়েন্দারা। ইউএসডিপি জান্তাসমর্থিত হলেও বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে গোয়েন্দা উপস্থিতিতে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা।
মিয়ানমারের এখন যদি কেউ নির্বাচনের সমালোচনা করে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে লাইকও দেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এরই মধ্যে কথা বলার সাহস দেখালেন এক নারী। তবে সবার চোখের আড়ালে, পরিচয় গোপন করে। তিনি বললেন, ‘এটা মিথ্যার নির্বাচন। সবাই তাঁদের স্বাধীনতা হারিয়েছেন। অনেকে মারা গেছেন। অনেকে দেশ ছেড়েছেন। কীভাবে এসব ক্ষেত্রে বদল আসবে?’
জেনারেলের চালাকি
এরপরও অসাধারণ এক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী জান্তাপ্রধান হ্লাইং। তাঁর হাত ধরে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হলেও বড়দিনে ইয়াঙ্গুনের এক গির্জায় উপস্থিত হয়ে মানুষে মানুষে বিদ্বেষের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ। তাঁর শাসনামলে গৃহযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৯০ হাজার মানুষ।
নির্বাচন নিয়ে হ্লাইং যে চালাকিটা করছেন, তাতে চীনের কূটনৈতিক সমর্থন রয়েছে। নির্বাচনে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সমর্থনও দিচ্ছে বেইজিং। আর চীন ও রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে জান্তাবিরোধী বিদ্রোহীদের দখল করা অঞ্চলগুলো মুক্ত করছে সামরিক বাহিনী। গত দুই বছরে এলাকাগুলো দখল করেছিল বিদ্রোহীরা। ভোটের শেষ নাগাদ তাদের কাছ থেকে আরও ভূখণ্ড উদ্ধারের আশা হ্লাইয়ের।
আর অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি মাঠে না থাকায় নির্বাচনে সেনাসমর্থিত ইউএসডিপি জয় পাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। ২০২০ সালে যখন মিয়ানমারের সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিল, তখন দেশটির পার্লামেন্টে মাত্র ৬ শতাংশ আসন পেয়েছিল ইউএসডিপি। দলটি এবারের নির্বাচনে জয় পেলে মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট পদেও বসতে পারেন বলে ধারণা কিছু পর্যবেক্ষকের।
‘ছাড় দিতে কেউ রাজি নয়’
মান্দালয় থেকে কিছুটা দূরে, ইরাবতী নদীর অপর পাশেই মিনগান গ্রাম। একসময় পর্যটকদের কাছে গ্রামটি বেশ আকর্ষণীয় ছিল। তবে চার বছর ধরে মিনগানসহ মান্দালয়ের আশপাশের অনেক এলাকা জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের দখলে রয়েছে। সেখান থেকে প্রায়ই জান্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
মান্দালয় থেকে মিনগানে যেতে কয়েকটি তল্লাশিচৌকি পার হতে হয়। সেখানে বিবিসির সঙ্গে কথা হয় স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকা থেকে উত্তর দিকের বেশির ভাগ গ্রামে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। চলমান লড়াইয়ে সবাই কোনো না কোনো পক্ষ নিয়েছে। এটি খুবই জটিল একটি বিষয়। কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়।’
| মিয়ানমারে আজ নির্বাচন। এ উপলক্ষে ভোট গ্রহণের আগে ভোটকেন্দ্রে প্রস্তুতি চলছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের। গতকাল ইয়াঙ্গুনে। ছবি: রয়টার্স |
Saturday, December 27, 2025
মিয়ানমারের নির্বাচনে ছায়া ফেলছেন সু চি
আশির কোঠায় পৌঁছানো এই নেত্রী রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া নির্বাচনের সময়ও বন্দি অবস্থায়ই থাকবেন। এই নির্বাচন দিয়ে জান্তা ২০২০ সালের ভোটকে মুছে দিতে চায়। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তার সরকারের ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সু চির সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মিয়ানমারের বহু সমর্থকের কাছে তার নাম এখনো গণতন্ত্রের প্রতিশব্দ। ব্যালটে তার অনুপস্থিতিই তাদের কাছে প্রমাণ যে এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হবে না। সু চি জীবনের প্রায় দুই দশক সেনাদের অধীনে আটকাবস্থায় কাটিয়েছেন। অথচ এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য হলো, তিনি মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতার কন্যা। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৯ জুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সপ্তাহগুলোতে জাপানি দখলদারত্বের অধীনে থাকা ইয়াঙ্গুনে। তার বাবা অং সান দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বৃটিশ ও জাপানি উভয় উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেন। স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক মাস আগেই ১৯৪৭ সালে তিনি নিহত হন। এরপর সু চি তার শৈশবের বড় অংশ মিয়ানমারের বাইরে কাটান। প্রথমে ভারতে, সেখানে তার মা রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে তিনি তার বৃটিশ স্বামীর সঙ্গে পরিচিত হন। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন পূর্ণ ক্ষমতা দখল করে নিজের সমাজতান্ত্রিক শাসন চাপিয়ে দেন। এর ফলে একসময় এশিয়ার চালের ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত দেশটি বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র ও বিচ্ছিন্ন দেশে পরিণত হয়।
সু চির গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে ওঠা অনেকটাই ছিল আকস্মিক। ১৯৮৮ সালে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী মাকে সেবাযত্ন করতে দেশে ফিরে আসেন। আর সেখান থেকেই তার রাজনৈতিক উত্থানের সূচনা ঘটে।

Tuesday, December 23, 2025
নির্বাচনের আগে মিয়ানমারে তীব্র হামলা সেনাবাহিনীর: ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাণ দিতে হলেও খুশি’
যেমন বলা চলে লাং জা কিমের কথাই। গত মাসের শেষের দিকে এক রাতে চিন রাজ্যে তাঁর গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যায় যুদ্ধবিমান। কাছেই ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছিল। হাতের কাছে যা কিছু ছিল, তা নিয়েই পালিয়ে যান তিনি। গত কয়েক সপ্তাহে জান্তার হামলার মুখে কিমের মতোই বিদ্রোহী–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো থেকে পালিয়েছেন হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাংলাদেশ–সংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হামলা চালিয়ে অন্তত ৩০ জনকে হত্যা করেছে জান্তা বাহিনী। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে চিন রাজ্যে অন্তত তিনটি স্কুল ও ছয়টি চার্চে হামলা চালানো হয়েছে। এতে ছয় শিশুসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। এসব বিষয় নিয়ে বিবিসির কাছে কোনো মন্তব্য করেনি জান্তা সরকার।
চিন রাজ্যের অনেকেই বলছেন, জান্তা বাহিনী এখন যে হামলা চালাচ্ছে, তা তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। মিয়ানমারে জান্তার সঙ্গে বিদ্রোহীদের এই সংঘাতের শুরু ২০২১ সালে অং সান সু চি সরকারের পতনের পর। ওই বছর নির্বাচিত সু চিকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। তার পর থেকে চরম দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে জান্তা সরকার।
আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা সরকার নিজেদের ক্ষমতা আরও পোক্ত করতে চায় বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। বিভিন্ন দেশ থেকেও আপত্তি জানানো হয়েছে। সু চির দল দ্য ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। হামলার মুখে ঘরবাড়ি ছাড়া রাল উক থাং বলছিলেন, ‘আমরা নির্বাচন চাই না। জান্তা সরকার চালাতে জানে না। সু চির সময় কিছুটা হলেও গণতন্ত্র ছিল।’
নির্বাচন হলে সেখানে কারচুপি হবে বলে বিশ্বাস করেন ইয়াং জা কিম। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি জান্তাসমর্থিত দলকে ভোট না দিই, তাহলে আমাদের ভোট চুরি করে, ওই দলগুলোকে দিয়ে দেওয়া হবে।’ আর চিন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠী চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ভাইস চেয়ারম্যান সুই খারের ভাষায়, ‘এই নির্বাচন শুধুই সামরিক স্বৈরশাসন দীর্ঘ করার জন্য। মানুষের পছন্দ–অপছন্দের জন্য নয়।’
সুই খার বলেন, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত চিন রাজ্যের উত্তরাংশে শত শত জান্তা সেনা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও কামানের গোলার মাধ্যমে তাঁদের সহায়তা করা হচ্ছে। যদিও চীনের এই উত্তরাংশে প্রবেশ করাটা সামরিক বাহিনীর জন্য কষ্টসাধ্য। কারণ, সেখানে বিদ্রোহীদের ঘাঁটিগুলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত।
সেখানকার একটি হাসপাতালে গিয়ে কয়েকজন আহত বিদ্রোহী যোদ্ধাকে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অঙ্গচ্ছেদও করতে হয়েছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের সময় এই বিদ্রোহীদের অনেকেই ছিলেন স্কুলপড়ুয়া। এখন প্রাপ্তবয়স্কের কাতারে পা রাখা এসব তরুণ সাধারণ জীবন ছেড়ে জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।
এমনই একজন ১৮ বছর বয়সী অ্যাবেল। ডান পা হারিয়েছেন তিনি। হাতেও গুরুতর আঘাত লেগেছে। হাসপাতালে তাঁর পাশের বিছানায় শুয়ে ছিলেন ১৯ বছর বয়সী সি সি মাউং। তাঁরও একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শত্রু সেনারা পিছু হটছিল। আমরা সামনে এগোতে থাকি। তখন আমি একটি স্থল মাইনের ওপর পা দিয়ে ফেলি। বিস্ফোরণে আমরা আহত হই। এরপর আকাশপথে হামলা চালানো হয়। আমি একটি পা হারিয়েছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জন্য একটি ভালো জীবন উপহার দিতে যদি প্রাণ দিতেও হয়, তাতেও আমি খুশি।’
![]() |
| মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Saturday, December 20, 2025
মিয়ানমারের আফিম চাষ ১০ বছরে সর্বোচ্চ উল্লম্ফন: জাতিসংঘের সতর্কর্তা
জরিপে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ সালে পপি চাষের জমি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রতি হেক্টরে আফিম উৎপাদনের পরিমাণ কমেছে। ইউএনওডিসি বলছে, তীব্র সংঘাত, অনিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে কৃষকরা ঠিকমতো চাষ করতে পারছেন না। ফলে ফলন কম হচ্ছে। এদিকে মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা আবার পপি চাষে মনোযোগী হচ্ছেন। ২০১৯ সালে ১ কেজি কাঁচা আফিমের দাম ছিল ১৪৫ ডলার। বর্তমানে যার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩২৯ ডলারে। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বর্ধিত বাজারমূল্য ও জীবিকার সংকটে কৃষকদের বড় অংশ আবার পপি চাষে ঝুঁকছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে মিয়ানমার-উৎপাদিত হেরোইনের প্রবাহ বাড়ছে। ইউএনওডিসি জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে হেরোইন সরবরাহ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মিয়ানমারের হেরোইন দ্রুত প্রবেশ করছে। এমনকি ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এ বাণিজ্যিক বিমানের যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ কেজি মিয়ানমার-উৎপাদিত হেরোইন জব্দ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নতুন সরবরাহ অঞ্চল বৈশ্বিক মাদকবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বলা হচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই মাদক চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষীরা। ডেলফিন শান্টজ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সংঘাত, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং মূল্যবৃদ্ধির লোভ- সব মিলিয়ে কৃষকরা পপি চাষে আকৃষ্ট হচ্ছেন। গত বছরের বৃদ্ধি মিয়ানমারের ভবিষ্যতের জন্য গভীর প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শুধু অঞ্চলই নয়, বৈশ্বিক মাদকবাজারকেও প্রভাবিত করবে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

Tuesday, December 9, 2025
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ২৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বৃটিশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি
বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অর্থ দিয়ে খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ১ লাখ ৭৫ হাজার নারী ও কিশোরীর জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। এছাড়া যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকারদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও করা হবে। কুপার বলেন, এই নতুন বৃটিশ সহায়তা বাংলাদেশে থাকা পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী সেবা প্রদান করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করবে। আমরা কাজ চালিয়ে যাব, যাতে সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষরা প্রয়োজনীয় সহায়তা, সুরক্ষা, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পায়।
২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের কারণে পালিয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ বিদেশি সহায়তা বন্ধ করে দেয়া এবং ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। মিয়ানমারের রাখাইনে ২০১৭ সালে সেনা-সমর্থিত বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের হামলার পর রোহিঙ্গাদের পালানো শুরু হয়। পরে ২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর রাখাইনের আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাত তীব্র হলে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট তীব্র হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, খুব শিগগিরই খাদ্য সহায়তা কমে গিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬ ডলারে নেমে আসবে, যা ক্ষুধা ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দেবে। তিনি দাতাদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান দাতাদের আরও বেশি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং নতুন সম্ভাব্য দাতাদেরও উদার সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিতে হবে, না হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
বৃটেনের এই নতুন সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে আছে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় ৬ মিলিয়ন পাউন্ড, খাদ্যে ৬ মিলিয়ন, পানি ও স্যানিটেশনে ৪.২ মিলিয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড। বৃটিশ সরকার জানিয়েছে, এই উদ্যোগ তাদের বৈশ্বিক মানবিক প্রতিক্রিয়ায় নেতৃত্বের প্রমাণ এবং মিয়ানমারের সংকট মোকাবিলায় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। নতুন এই সহায়তার ফলে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য বৃটেনের মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াল ৪৪৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি।

Saturday, November 22, 2025
ট্রাম্পকে কংগ্রেসের আহ্বান: মিয়ানমারের জান্তার ভুয়া নির্বাচনের নিন্দা জানান
বুধবারের এক কংগ্রেশনাল শুনানির পর এই আহ্বান জানানো হয়। সেখানে মিয়ানমারের চলমান সামরিক ও মানবিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন হাউস কমিটি অন ফরেন রিলেশনস পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া- এই দুই উপকমিটির যৌথ শুনানি আয়োজন করে। এর শিরোনাম: ‘নো এক্সিট স্ট্র্যাটেজি: মিয়ানমারের শেষহীন সংকট এবং আমেরিকার সীমিত বিকল্প।’ শুনানিতে দেশটির গভীরতর মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তুলে ধরা হয় এবং জান্তা তাদের দখল আরও শক্ত করার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে- এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ইস্ট এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক সাবকমিটির চেয়ারওম্যান ইয়াং কিম বলেন, সামরিক সরকার স্বৈরাচারী শাসনকে আড়াল করতে ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করছে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সংকট সরাসরি মার্কিন স্বার্থকে হুমকিতে ফেলছে। কারণ জান্তা-নিয়ন্ত্রিত প্রতারণা নেটওয়ার্কগুলো মার্কিন করদাতাদের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার লুট করছে।
নাগরিকদের সুরক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পুনর্বিবেচনার জন্য জরুরি কংগ্রেশনাল পদক্ষেপ প্রয়োজন। আইনপ্রণেতারা সতর্ক করেন যে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ না নিলে মিয়ানমার ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে আরও এগোবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের নতুন কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে। তারা আরও আহ্বান জানিয়েছেন বার্মা অ্যাক্ট কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের, যাতে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোকে সরাসরি শক্তিশালী, অপ্রাণঘাতী সহায়তা দেয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে শাসনব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং মুক্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রশাসন পরিচালনায় প্রযুক্তিগত সহায়তা।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2389)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












