রয়টার্সের প্রতিবেদন: ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে উপসাগরীয় দেশগুলো

মিডল ইস্ট আইঃ ইরান ও তার মিত্রদের হামলায় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য চেপে যাচ্ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন ও কুয়েতে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরও এসব দেশের দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিবরণের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অমিল রয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তর থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দরেও হামলার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ইরানের হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে সৌদি আরবও।

ইরান ও হুথিরা পাইপলাইন, জ্বালানি স্থাপনা এবং একটি ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। রয়টার্সের এই মূল্যায়ন উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তাদের দেওয়া বিবরণ সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, হুথিদের একটি ড্রোন হামলায় দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর ধাহরানে অবস্থিত সদর দপ্তরে ‘সীমিত অগ্নিকাণ্ড’ ঘটেছে। কিন্তু বুধবার রয়টার্স জানায়, হামলায় দপ্তরটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, আরামকোর সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসেরের কার্যালয়ও রয়েছে। ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়েছে। জানালা ও দরজা উড়ে গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির বিবরণের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতির ধারাবাহিক অমিল দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা

উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার কথা স্বীকার করলেও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছে। কিন্তু উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ব্যাপক। হামলার ধরন থেকেও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে হামলাকারীদের বিস্তারিত তথ্য ও নিখুঁত নিশানার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের ছাদে হামলা হয়েছিল। এতে কেন্দ্রটির চারটি চুল্লির একটিকে জরুরি ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। রয়টার্সকে একজন ইরানি কর্মকর্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা ও বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রটির অবস্থান সম্পর্কে ইরানের কাছে তথ্য ছিল।

কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় ইরানের হামলাতেও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানার প্রমাণ পাওয়া যায়। হামলায় গ্যাসকে তরলে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ সরঞ্জাম রাখা ‘কোল্ড বক্স’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া বিবরণের সঙ্গে বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির সবচেয়ে বড় অমিলের উদাহরণ হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান একাধিকবার বন্দরটিতে হামলা চালিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা করা হয়। কখনো কখনো মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পরও আবার হামলা চালানো হয়েছে।

গত ৩ মার্চ ফুজাইরা বন্দরে প্রথম হামলায় দুটি তেলের ট্যাংকে আগুন ধরে যায়। কয়েক দিন ধরে সেগুলো জ্বলতে থাকে। উপগ্রহচিত্রের তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানায়, দ্বিতীয় হামলায় বন্দরের একটি ‘ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ড’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ৬২টি পাইপলাইনের সমন্বয়ে তৈরি একটি স্থানান্তরব্যবস্থা। এর মাধ্যমে তেলের টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য জাহাজে তোলার স্থানে নেওয়া হয়।

আমিরাতের কর্মকর্তারা দুটি হামলারই ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছিলেন। তবে রয়টার্সের মূল্যায়নে দেখা যায়, এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রের মিল নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি আমিরাতের সরকারি ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমিরাতের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাত।’

রয়টার্স জানায়, মার্চে ফুজাইরা বন্দরে পরবর্তী হামলায় অন্য একটি ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেয় আমিরাত। মার্চের শেষ নাগাদ বন্দরটি পুরোপুরি সচল হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মে মাসে ইরান আবারও সেখানে হামলা চালায়। এবার একটি ড্রোন মার্চে প্রথম হামলার শিকার ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডের সঙ্গে যুক্ত পাইপলাইনে আঘাত হানে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুজাইরা বন্দর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে উপসাগরীয় দেশগুলো
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে জ্বালানি ডিপোর কাছাকাছি লাগা আগুন থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। ছবি: এএফপি