‘মধ্যযুগীয়’ ও ‘উদ্বেগজনক’: যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা

প্রকাশ্যে গুলি করে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তা সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকেরা এই পরিকল্পনাকে ‘বর্বর’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এতে ইরান ও আফগানিস্তানের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের মিল দেখা যাচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানের।

২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড আগামী ৩ ডিসেম্বর সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন।

শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর সতর্ক করে বলেছে, হত্যার ঘটনা সম্প্রচার করা হলে তা প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শামিল হবে এবং ‘নির্যাতনের ওপর আরোপিত নিরঙ্কুশ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করবে’।

যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা এবং মানবাধিকারকর্মীরাও এই পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এটি একটি বর্বর ধারণা, যা একটি দেশ হিসেবে আমাদের মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।’

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন ডেমোক্র্যাট সদস্য ইয়াসামিন আনসারি লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের আমেরিকায় এখন প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। কী হচ্ছে এসব! ইরান ও আফগানিস্তানের মতো নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের অধীনে এমনটাই ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে নিয়ে যাওয়ার ট্রাম্পের প্রচেষ্টারই অংশ এটি।’

১৯৬০-এর দশকে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা যুক্তরাজ্যও এই পরিকল্পনা থেকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দেশটির সমতাবিষয়ক মন্ত্রী ও লেবার পার্টির চেয়ার ব্রিজেট ফিলিপসন বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, বিষয়টি তার কাছে বেশ উদ্বেগজনক মনে হয়েছে।

ফিলিপসন বলেন, সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিজস্ব বিষয়। তবে তিনি যোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তার মানে কি দেশটির সরকার যা করে, আমরা সবকিছু সমর্থন করি? উত্তর হচ্ছে, না।’

মার্কিন সামরিক আইনে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সুপারিশের ভিত্তিতে এ অনুমোদন দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, তিনি হাসানের মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি সম্প্রচার দেখবেন না। তবে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেননি তিনি।

খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাস কীভাবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে, এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ককে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ভ্যান্স বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে যে বিতর্কই থাকুক না কেন, মানুষ যেন ভুলে না যায় যে এই ব্যক্তি নির্মমভাবে অনেক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত যদি এটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, আমি তা দেখব না।’

এর আগে মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে কার্যকরের কথা বলেছিলেন হেগসেথ। পরে রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম রিয়েল আমেরিকাস ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তার বক্তব্য, মানুষকে এটি দেখতে দেওয়া উচিত, কারণ এ ধরনের অপরাধের গুরুতর পরিণতি সম্পর্কে তাদের জানা প্রয়োজন।

হাসান শেষ কোনো অনুরোধ জানিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে হেগসেথ বলেন, ‘এসব নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। ৩ ডিসেম্বর তার সঙ্গে দেখা হবে।’

বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী হাসানকে ২০১৩ সালে সামরিক আদালতের জুরি মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৩টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আরও ৩২ জনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যাচেষ্টার দায়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে ১২ জন এবং আহতদের মধ্যে ৩০ জন ছিলেন সেনাসদস্য।

সাবেক এই সেনা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুডের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে পিস্তল দিয়ে গুলি চালান। ওই সময় সেনাসদস্যরা মোতায়েনের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গুলি করেন। এতে তিনি আংশিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমানে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন।

হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা হবে ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রথম মৃত্যুদণ্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দায়িত্ব ছেড়ে পালানোর দায়ে সেনাসদস্য এডি স্লোভিককে সে বছর গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৬১ সালে। সে সময় জন বেনেটকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল।

গত সপ্তাহে টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইকের প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগে ত্রুটির ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাইকের আইনজীবীদের দাবি, হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত ছিলেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালের বিছানায় হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল।

অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা টেলিভিশনে সম্প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আদালতের বাধায় সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো দেশে আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা টেলিভিশনে বা সরাসরি সম্প্রচার করার নজির জানা নেই।

বিশ্বজুড়েই প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচলন অনেকটাই কমে এসেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে অন্তত ১৭টি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইরানে ১১টি এবং তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে ৬টি ঘটনা ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯০ বছর ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে ব্যক্তিগত পরিসরে। ১৯৩৬ সালে কেন্টাকিতে রেইনি বেথিয়াকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ঘটনাকে সাধারণত দেশটির সর্বশেষ প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই ঘটনায় হাজারো মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তবে পরের বছর মিসৌরিতে আরেকটি ফাঁসি কার্যকরের ঘটনাও ঘটেছিল।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করবে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি আমার দেশ অনলাইন থেকেঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত মেজর নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যম রিয়েল আমেরিকাস ভয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেগসেথ একথা জানান। ফায়ারিং স্কোয়াডে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হেগসেথ এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একে ‘নিঃসন্দেহে সঠিক সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ যাতে এটি দেখতে পারে, আমরা তা নিশ্চিত করব। এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কারণ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের গুরুতর পরিণতি রয়েছে-মানুষের তা বোঝা প্রয়োজন।’ হেগসেথ আরো জানান, ৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় ফোর্ট হুডে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। ২০০৯ সালে ওই সময়েই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়টি হবে ৪ ডিসেম্বর রাত ১টা। প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে বলেও জানান তিনি। নিদাল মালিক হাসান ছিলেন মেজর পদমর্যাদায় মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ চিকিৎসক। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে তিনি গুলি চালান। এতে ১৩ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২ জন সক্রিয় সেনাসদস্য ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ছিলেন। পরে তিনি দাবি করেন, মুসলিম দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন। সূত্র: আল জাজিরা