প্রথম বলকান যুদ্ধ

ইতিহাস বিখ্যাত প্রথম বলকান যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে ১৯১২ সালের ৭ অক্টোবর (মতান্তরে ৮ অক্টোবর)। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার পেছনে এ যুদ্ধ ছিল এক অত্যন্ত সংকটময় ও সিদ্ধান্তমূলক অধ্যায়। বলকান রাষ্ট্র জোটের অন্যতম সদস্য মন্টিনিগ্রো কর্তৃক উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে চার জাতিগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ এ সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা হয়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘ইউরোপের অসুস্থ মানুষ’ হিসেবে পরিচিত উসমানীয় সাম্রাজ্য তার বলকান অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত হারাচ্ছিল। উসমানীয় শাসনাধীন মেসিডোনিয়া, থ্রেস এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোয় বাস করা খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী নিজস্ব স্বাধীনতা ও অধিকারের দাবি জানিয়ে আসছিল। একই সঙ্গে বলকান অঞ্চলের উদীয়মান জাতিরাষ্ট্র বুলগেরিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া এবং মন্টিনিগ্রো উসমানীয়দের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করে নিজেদের সীমানা সম্প্রসারণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। এ যৌথ স্বার্থ ও অটোমান শাসনের অবসানের লক্ষ্যে ১৯১২ সালের শুরুতে গঠিত হয় ‘বলকান লিগ’ বা বলকান জোট।

বলকান জোটের সদস্য হিসেবে ১৯১২ সালের ৮ অক্টোবর সর্বপ্রথম সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন মন্টিনিগ্রোর রাজা নিকোলাস প্রথম। তৎকালীন ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও কৌশলগত ও সামরিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে মন্টিনিগ্রো অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং স্কুতারি অভিমুখে সৈন্য চালনা করে। এর কয়েকদিনের মাথায় ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের মধ্যে জোটের অন্যান্য মিত্রদেশ বুলগেরিয়া, সার্বিয়া এবং গ্রিস একযোগে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করে। অটোমান সাম্রাজ্য একযোগে চারদিক থেকে আক্রান্ত হওয়ায় ব্যাপক সামরিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। সামরিক আধুনিকায়নের অভাব, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল এবং দুর্বল নেতৃত্বের কারণে উসমানীয় বাহিনী জোটবদ্ধ বলকান সেনাদলের কৌশলগত আক্রমণ সহ্য করতে ব্যর্থ হয়। কয়েকটি প্রধান যুদ্ধে পরাজয়ের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তারা প্রায় সমগ্র বলকান ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়। ১৯১৩ সালের মে মাসে লন্ডনে স্বাক্ষরিত ‘ট্রিটি অব লন্ডন’-এর মাধ্যমে প্রথম বলকান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এ যুদ্ধের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপ মহাদেশে তার শতাব্দী প্রাচীন প্রায় সব অঞ্চল চিরতরে হারায়। বিজয়ী বলকান রাষ্ট্রগুলো জয় করা এলাকা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয় এবং ইউরোপের মানচিত্রে জন্ম নেয় এক নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র আলবেনিয়া।

প্রথম বলকান যুদ্ধ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের জন্য একটি বিশাল বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনা। এটি একদিকে যেমন অটোমান শাসনের অবসানকে ত্বরান্বিত করে, অন্যদিকে মেসিডোনিয়ার ভূখণ্ড বণ্টনকে কেন্দ্র করে বিজয়ী বলকান দেশগুলোর মধ্যে সৃষ্টি করে চরম তিক্ততা। যার ফলে পরবর্তী সময়ে ‘দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ’ এবং শেষে ১৯১৪ সালে বিশ্বব্যাপী ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’-এর দাবানল জ্বলে ওঠে। 

প্রথম বলকান যুদ্ধ
প্রথম বলকান যুদ্ধ