Sunday, October 4, 2026
গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা
গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা
দেইর আল-বালাহর একটি দোকানে প্রিপেইড ইন্টারনেটের কার্ড বিক্রি করেন মোহসেন। তিন বছর আগে ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর আগে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে পেশাগত লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল হাসপাতালে কাজ করবেন, স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করবেন অথবা বিশেষায়িত কোনো কোর্স করবেন।
কিন্তু যুদ্ধ তার সেই পরিকল্পনা বদলে দেয়।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাস দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন মোহসেন। হাসপাতালে তখন আহত ও নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক। পরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অন্য কাজ খুঁজতে বাধ্য হন তিনি।
মোহসেন বলেন, ‘আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিকও পাচ্ছিলাম না। তাই অন্তত সামান্য আয় হবে—এমন অন্য কাজ খুঁজতে শুরু করি।’
আগামী ২৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনের আইনসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০০৬ সালের পর এটিই হবে প্রথম ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচন। মোহসেনের জন্যও এটি প্রথম জাতীয় ভোট।
এই নির্বাচনে তার প্রত্যাশা স্পষ্ট। তিনি চান, প্রার্থীরা তার প্রজন্মের বেকারত্ব, নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা নিয়ে কথা বলুন।
তিনি বলেন, ‘প্রথম চাওয়া হলো, যেন ভালো বেতনসহ একটি স্থায়ী চাকরি পাই। যাতে নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতে পারি। দ্বিতীয় চাওয়া নিরাপত্তা।’
গাজায় বেকারত্বের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। ইসরাইলের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে ভূখণ্ডটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
মোহসেনের পরিবারের গাজার সালাহ আল-দিন সড়কের পূর্বদিকে জমি রয়েছে। ওই এলাকায় ইসরাইলের প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেন না। তিনি আশা করেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইল শিগগির ওই এলাকা থেকে সরে যাবে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় পুনর্গঠন শুরু হবে।
তার কাছে মানুষের জীবনে পরিবর্তন না এলে নির্বাচন যথেষ্ট নয়।
মোহসেন বলেন, ‘একজন প্রার্থীকে মানুষের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতে হবে এবং মানুষের কণ্ঠে কথা বলতে হবে। অন্য কারো কণ্ঠে নয়। ২০ বছর ধরে যুদ্ধ ও ধ্বংসের কারণে যে তরুণেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হয়ে কথা বলতে হবে। এর অবসান দরকার।’
২০০৬ সালের ভোটের স্মৃতি
৫৩ বছর বয়সি গাসসান মারওয়ানের কাছে নির্বাচনের স্মৃতি আরো পুরোনো। ২০০৬ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে হামাস জয়ী হয়েছিল।
মারওয়ান আগে স্বর্ণকারের কাজ করতেন। পরে একটি কারখানা গড়ে তোলেন। সেটিই ছিল তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।
২০০৬ সালে ভোট দেওয়ার সময় তার আশা ছিল, নির্বাচন মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। সন্তানদের জন্য একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎও চেয়েছিলেন তিনি।
নুসেইরাতের একটি স্কুলে ভোট দিয়েছিলেন মারওয়ান। স্বাধীন রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘুতির নেতৃত্বাধীন একটি তালিকায় ভোট দিয়েছিলেন তিনি। তার স্মৃতিতে ওই নির্বাচন ছিল স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু।
মারওয়ান বলেন, ‘আমি অনেক স্বচ্ছতা ও সততা দেখেছি। মনে হয়েছিল, এটি একটি গণতান্ত্রিক উৎসব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ২০ বছরে সেই অভিজ্ঞতা আর ফিরে আসেনি।’
দুই দশক পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধের সময় তার বাড়ি ও কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। ৩০ বছরের বেশি সময়ের পরিশ্রমও এখন পরিবারকে সেই স্থিতিশীলতা দিতে পারছে না, যার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘বাড়ি ও আয়ের উৎস হারানোর পর আর কী চাইবেন? এখন শুধু পুনর্গঠন, শান্তি ও দেশে নিরাপত্তাই চান।’
মারওয়ান সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান সন্তানদের তাঁবুর মধ্যে বসবাস করতে দেখে। যে স্থিতিশীল বাড়ি সন্তানদের জন্য তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি আর নেই।
যুদ্ধ তাকে এমন কাজেও ফিরিয়ে এনেছে, যা দীর্ঘ কর্মজীবনের পর কখনো করার কথা ভাবেননি। দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে বহন করতে হচ্ছে তাঁকে।
মারওয়ান বলেন, ‘এত বছর পর আমাকে দূর থেকে পানি বহন করতে হচ্ছে। আমি কি এভাবেই থাকব? আজ আমার বয়স ৫৩। আর ১০ বছর পর ৬০-এর ঘরে থাকব। তখন এই বোঝা বহন করতে পারব না।’
তার মতে, এই পরিস্থিতি মানুষের রাজনীতির প্রতি আগ্রহও কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রাজনীতির প্রতি আমাদের আগ্রহ কমেছে। রাজনীতি আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে নয়, বরং হতাশা ও ক্ষোভ জমতে জমতে এমন হয়েছে। মানুষ এখন কীভাবে টিকে থাকবে এবং প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করবে, তা নিয়েই ব্যস্ত।’
তবু চারপাশের ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে নির্বাচন সামনে আসায় মারওয়ানের মধ্যে আশা ও সংশয় দুটোই কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো মনে হয়, নির্বাচন নিয়ে কথা বলাটাই প্রায় কৌতুক। কারণ নির্বাচন করার মতো স্পষ্ট কোনো পরিস্থিতি নেই।’
পুনর্গঠনই অগ্রাধিকার
অধিকৃত পশ্চিম তীর, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের হিসাবে, গাজায় প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি ভোট দেওয়ার যোগ্য।
কমিশনের গাজা অঞ্চলের পরিচালক জামিল আল-খালিদি বলেন, ভূখণ্ডজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও যুদ্ধের পর ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে নির্বাচন আয়োজন বড় ধরনের লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইসরাইল গাজায় নির্বাচনী সামগ্রী প্রবেশে বাধা দিলে স্থানীয়ভাবে এসব সামগ্রী তৈরির বিকল্প পরিকল্পনাও করেছে কমিশন।
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ইয়াদ আল-কুরার মতে, যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ শেষ করে দেয়নি। বরং রাজনীতির কাছে তাদের প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে।
প্রায় তিন বছর ধরে বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংস ও জীবিকা হারানোর পর গাজার মানুষের রাজনৈতিক চাহিদা এখন ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কতটা স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে মনে করেন তিনি। শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা রাজনৈতিক স্লোগান এখন আর যথেষ্ট নয়।
আল-কুরার মতে, মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে—এমন নেতৃত্বই এখন প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি গাজার পুনর্গঠন, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সচল করা এবং মানুষকে আবার স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকায় ফেরার সুযোগ তৈরি করা।
তিনি বলেন, ‘গাজা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—এমন নেতৃত্বের প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। কারণ এই ভূখণ্ডকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।’
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(2114)
-
▼
October
(42)
-
▼
Oct 04
(8)
- এআই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া
- চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি বসাতে মরিয়া তিন পরাশক্তি
- হুথিদের হামলায় পুড়ছে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনা
- গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা
- পেডোফাইলরা কি চারপাশে কিলবিল করছে by গওহার নঈম ওয়ারা
- ছায়াযুদ্ধ: ইরান সংঘাতে ‘চীন ফ্যাক্টর’
- হরমুজ প্রণালিতে ট্র্যাকিং বন্ধের পর তেলবাহী জাহাজে...
- ভাইরাল ভিডিও: শিশু শোষণের নতুন মাধ্যম নিয়ে ভাবতে হ...
-
▼
Oct 04
(8)
-
▼
October
(42)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment