৪৭ বছরে গলেছে ১২ লাখ কোটি টন বরফ

অ্যান্টার্কটিকা-গ্রিনল্যান্ডঃ বিশ্বের দুই বৃহত্তম বরফস্তর অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে দ্রুত বরফ গলছে। গত ৪৭ বছরে এই দুই অঞ্চল থেকে ১২ লাখ কোটি টনের বেশি বরফ গলে গেছে। গলে যাওয়া সেই বরফের পানি সমুদ্রে মিশে বাড়িয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এতে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিস্তীর্ণ এলাকা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৫৮ জন বিজ্ঞানী মিলে এ বিষয়ে একটি গবেষণা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্টিফিক ডাটা’ জার্নালে। গবেষকরা ২৭টি কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি ৪২টি পৃথক গবেষণার তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৯ সাল থেকে বরফ গলার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বেড়েছে। বরফ গলার এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অদূরভবিষ্যতে তা থেমে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

অ্যান্টার্কটিকায় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বরফ রয়েছে। সেখানে মোট বরফের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ঘন কিলোমিটার। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বরফে ঢাকা। এর আয়তন প্রায় ১৭ লাখ বর্গকিলোমিটার। সেখানে রয়েছে প্রায় ২৯ লাখ ঘনকিলোমিটার বরফ। গবেষকরা জানিয়েছেন, তাদের হিসাবে শুধু সেই বরফ ধরা হয়েছে, যা গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় প্রভাব ফেলেছে। বরফের স্তর পাতলা হওয়া বা সমুদ্রের তলদেশের কাছের বরফ কমে যাওয়ার হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোট বরফ গলার ৮৪ শতাংশের জন্য দায়ী হিমবাহের ভারসাম্যহীন গতি। হিমবাহ যখন সমুদ্রের সংস্পর্শে আসে, তখন উষ্ণ পানির কারণে বরফ দ্রুত গলতে থাকে।

ব্রিটেনের নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহবিদ ইনেস ওতোসাকা বলেন, ক্ষয়ে যাওয়া বরফের প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগই হিমবাহের মাধ্যমে সমুদ্রে মিশেছে। বাকি ১৬ শতাংশ বরফ গলার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর প্রধান কারণ বিশ্ব উষ্ণায়ন। গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। সেই অতিরিক্ত তাপ সমুদ্রও শোষণ করছে। ফলে সমুদ্রের পানি আরও উষ্ণ হচ্ছে। উষ্ণ স্রোত বরফস্তর ও হিমবাহের ওপর প্রভাব ফেলছে।

গ্রিনল্যান্ডে ‘আটলান্টিফিকেশন’ প্রক্রিয়াও বরফ গলানোর অন্যতম কারণ। এর ফলে আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ পানি আরও উত্তরে প্রবেশ করছে। এতে গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তরের ওপর চাপ বাড়ছে।

এন্টার্কটিকার কাছেও উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাব বাড়ছে। এসব স্রোত বরফের সংস্পর্শে এসে হিমবাহের গভীরে প্রবেশ করছে। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে বরফের ওপর তাপের প্রভাব পড়ছে। নব্বইয়ের দশক থেকে এ প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এন্টার্কটিক উপদ্বীপে বরফ গলার প্রবণতা কিছুটা কমেছিল। এর সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি সাময়িক আবহাওয়াগত পরিবর্তনের প্রভাব হতে পারে। ওই সময়ে পূর্ব এন্টার্কটিকায় রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছিল।

তবে ২০২৩ সালের পরের তথ্য আবার বরফ গলার প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষকদের মতে, এই গবেষণা ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়ে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করবে।

৪৭ বছরে গলেছে ১২ লাখ কোটি টন বরফ
৪৭ বছরে গলেছে ১২ লাখ কোটি টন বরফ