Monday, January 12, 2026
ডাকসু–জকসু: শিবিরের জয়, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের মৃত্যুঘণ্টা ও জেন–জি মনস্তত্ত্ব by হেলাল মহিউদ্দীন
ডাকসু–জকসু: শিবিরের জয়, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের মৃত্যুঘণ্টা ও জেন–জি মনস্তত্ত্ব by হেলাল মহিউদ্দীন
ফেসবুকে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছি। প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর এ রকম ফলাফল কেন হয়েছে, জানতে চেয়ে তাঁদের কয়েকজনের কাছে নির্মোহ মতামত দেওয়ার অনুরোধ রেখেছি। উত্তরদাতাদের নির্বাচনের আগে তাঁদের প্রোফাইল ও পোস্টগুলো ভালোমতো পর্যালোচনা করেছি। যাঁদের চিহ্নিত করতে পেরেছি ছাত্রশিবির, ছাত্রদল বা বাম সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থক হিসেবে, তাঁদের নির্বাচিতদের তালিকায় রাখিনি। আপাতনীরব, আপাতনিরপেক্ষ, ফেসবুকে তেমন সক্রিয় নন, খুব বেশি পোস্ট দেন না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেন, তাঁদের বেছে নিয়েছি।
আমার ইমেইল দিয়ে জানিয়েছি, ইচ্ছা করলে তাঁরা তাঁদের মতামত জানাতে পারেন। বেশির ভাগই মতামত দিয়েছেন। সবশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন বিষয়েও কয়েকটি মতামত পেয়ে গেছি।
বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষক ও ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়ে চমৎকার গবেষণা শুরু করতে পারেন। চমকপ্রদ ফলাফল পাবেন, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বুঝতেই গবেষণা দরকার।
আমার অনুরোধে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা সাড়া দিয়েছেন বেশি। তাঁদের বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে পর্যালোচনার শক্তিও ছাত্রদের চেয়ে শক্তিশালী মনে হয়েছে। যা–ই হোক, উত্তরদাতাদের ভাষ্যগুলোর সংযোগ-সমন্বয় ও পুনঃপর্যালোচনা করার পর নিশ্চিত হলাম, ছাত্রশিবিরের জয়জয়কারকে শুধু সাময়িক বিস্ময়-ঘোরজাগানো ঝাঁকুনি ভাবলে বাংলাদেশের সামাজিক রাজনীতির নতুন গতিপথ ও বাঁক-সন্ধিগুলো চেনা যাবে না।
২.
বাংলাদেশে গ্রাম-সমাজ ও মফস্সলের নিম্নমধ্যবিত্তদের সন্তানেরা দ্রুত শহুরে মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। আমরা যাঁদের জেন-জি বলি, এঁরা তাঁরাই। বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির গতিপথও তাঁরাই নির্ধারণ করবেন। কারণ, তাঁদের ভুবনদৃষ্টি তাঁদের আগের দুটি প্রজন্ম (মিলেনিয়াল ও জেনারেশন এক্স) থেকে আলাদা। আলাদা হওয়ার পরও জেন-জিদের সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ, জানাশোনা ও বোঝার মিথস্ক্রিয়া এই দুই প্রজন্মের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি। জেন-জিদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মানস গড়ে উঠেছে এই দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাব-ভাবনার ঠিক-বেঠিক, ভুলভ্রান্তি দেখেশুনেও পর্যালোচনা করে।
জেন-আলফারা এখনো বয়সে ছোট। মাত্র বারো-তেরো বছরে বা কৈশোরে পড়েছে জেন-আলফাদের প্রথম সারিটি। জেন-জিদের অন্য রকম শক্তির বড় উৎস জেন-আলফাদের সঙ্গেও জেন-জিদের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতাই থাকবে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ জেন-জিরাই একমাত্র প্রজন্ম, যারা চারটি জেনারেশনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় সক্রিয়। জেন-আলফাদের ওপরও তাদের প্রভাব হবে অপরিসীম।
এ আলাপকে আপাতদৃষ্টে খাপছাড়া বা ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হলেও পাঠক শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে বুঝবেন, কীভাবে বিষয়গুলো অঙ্গাঙ্গি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
৩.
উত্তরদাতাদের একজনের মতামত ছিল দীর্ঘ। মতামত না বলে একটি চোখ খুলে দিতে পারা কেস স্টাডি বলাই ভালো। সেটিই সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখছি।
লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যাকে পছন্দ হবে, তাকেই ভোট দেব। কিন্তু মা বললেন—যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই। মাকে ভালোবাসি, তাঁর কথা ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তেমন সচ্ছল নই। বাবা মফস্সলে একটি ওষুধের দোকান চালান। একসময় জাসদ করতেন, পরে খানিকটা আওয়ামী লীগপন্থী। মা প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। কখনোই শুনিনি জামায়াত-শিবির পছন্দ করতেন। বড় ভাই আমার চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড়। ছাত্রদল করতেন সক্রিয়ভাবে। দুজনকেই জিজ্ঞেস করলাম—মা বলছেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিতে। তোমাদের কী মত? দুজনই বললেন—তোমার যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই করো।
‘বাবা ও বড় ভাই স্বভাবে বেশ কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ার পরও আমার বিবেচনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন দেখে নিজেকে সম্মানিত লাগছিল। কিন্তু মার অনুরোধের কারণ জানার কৌতূহলটি গেল না। তাই তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি আবার কবে জামায়াত-শিবির হলে?
‘মা জানালেন—কখনো হননি, এখনো না। কিন্তু ওনার স্কুলেরই আরেক সহকর্মী নারীর পরিবার জামায়াতের রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। শেখ হাসিনার শাসনকালের কোনো এক সময় তাঁর পুরো পরিবার ও স্বজন যেভাবে নির্যাতিত-নিগৃহীত হয়েছে, ভাষায় প্রকাশের অতীত। সবচেয়ে কষ্টকর ঘটনা, ভদ্রমহিলার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেটিকে তার চার বন্ধুসহ ছাত্রলীগের পান্ডারা তুলে নিয়ে যায় এবং এমনই নির্যাতন চালায়, ছেলেটি এখনো ট্রমাগ্রস্ত। ছেলেটি ক্লাস টেনেও সেরা তিনজন ছাত্রের একজন ছিল। কিন্তু আর পরীক্ষাই দিতে পারেনি। সে এবং তার চার বন্ধুর চারজনই একসময় মার প্রাইমারি স্কুলেরই ছাত্র ছিল। মার ভাষায়, পাঁচজনই ছিল ভালো ছাত্র, ভদ্র, শান্তশিষ্ট ও অমায়িক। ছাত্রশিবিরও করত না। কিন্তু মাত্র একজনের পারিবারিক জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অপরাধে পাঁচটি ছেলের জীবন, ভবিষ্যৎ, পাঁচটি পরিবার তছনছ হয়ে গেল।
‘মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—তোমার কলিগ ভদ্রমহিলাই কি তোমাকে অনুরোধ করেছেন আমাকে বলতে যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই? মা জানালেন—না! ভদ্রমহিলাকে স্কুলে দেখামাত্রই তাঁর নিজ থেকে মনে হতো আমাকে বলবেন। কিন্তু বলতে ভুলে যান। সেদিন আর ভোলেননি। মার তীব্র অপরাধবোধ—ভদ্রমহিলার জন্য নামাজে বসে দোয়া করা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি। আমাকে অনুরোধ জানানোকে তিনি সামান্য হলেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করা হবে ভেবে নিয়েছেন।
‘আগে জানতাম ভোট দিতে পারলে বাবা-মা কোন দলকে ভোট দিতেন। এবার সংসদ নির্বাচন নিয়ে বলছেন—কোনো দলকে নয়, ব্যক্তিকে—সত্যিকারের যোগ্যজনকেই ভোট দেবেন। আমিও সেভাবেই ভোট দিয়েছি।’
৪.
কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়? কোথাকার ভোট কোথায় এসে কীভাবে কোন প্রার্থীর বাক্সে জমা হয়! ঘটনাটি আবারও দেখায়, বাংলাদেশের সমাজ এখনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী, নিকটজনের পারস্পরিক বিজড়নের একটি মানবিক সত্তা, একটি নেটওয়ার্ক। কান টানলে মাথা আসার মতো। ছাত্রীটি জেন-জি। তাঁর বড় ভাই মিলেনিয়াল বা জেন-ওয়াই। মা–বাবা জেন-এক্স। তিন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। তাঁর মানস গঠনও তাই অনেক পরিণত।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। প্রথম সংসদীয় সরকারটি জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে না পারলেও ভালো-মন্দ, ভুলত্রুটি মিলিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে খুব একটা হতাশ করেনি। সম্ভাবনা বাড়ছিল।
ছিয়ানব্বই হতেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতনের শুরু। তারপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড খারাপ থেকে খারাপতর এবং চব্বিশে এসে চূড়ান্ত খারাপতম হয়েছিল। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেল দুর্নীতির বরপুত্র, পুঁজিপতি, বেনিয়া, লুটেরা, টাকা পাচারকারী ঋণখেলাপিদের হাতে।
মফস্সল থেকে উঠে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক শ্রেণি হয়ে ওঠা দূরে থাক, বড় অংশই ছিটকে দূরে সরে গেল। যারা রাজনীতিতে নামল, তারা সরাসরি উচ্চবিত্তের খাতায় নাম লেখাল। পদ্ধতি অবশ্যই লুটপাট, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর নিজ মুখে স্বীকারোক্তি তাঁর পিয়নের চার শ কোটি টাকার মালিকানা। রূপপুর প্রকল্পের এক বালিশের মূল্য পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হওয়া। হাদির হত্যাকারী ফয়সালের মতো ওয়ার্ড পর্যায়ের সন্ত্রাসীর ঘরে পৌনে তিন শ কোটি টাকার ব্যাংক চেক মেলা। সম্রাটদের ঘরে সিন্দুকে, ফ্রিজে হাজার কোটি টাকা মেলা। ব্যাংক থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা লোপাট। গুন্ডাতন্ত্রের ছোবল থেকে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নিস্তার না মেলা। আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড।
জেন-এক্স (ছাত্রীটির পিতার প্রজন্ম) তিনটি পর্বের প্রত্যক্ষদর্শী হলেও কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। জেন-এক্স অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হওয়ার মতো কিছু করতে পারেনি। ফলে তাদের নৈতিক শক্তিও সামান্যই। তাই জেন-জিদের চোখে তারা ব্যর্থ। পুরোনো রাজনীতিতে তাদের বলিদান জেন-জিদের তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন সম্পর্কে ভাবনা গড়ে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, শক্তি দিয়ে সবকিছু পদানত রাখার চেষ্টা বুমেরাং হয়েছে। অন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতেও একই সুর পেলাম। প্রায় সবাই জানালেন, আত্মীয়স্বজন পরিমণ্ডলে একই রকম ঘটনা দেখেছেন, শুনেছেন, জেনেছেন।
৫.
ছাত্রশিবিরের জয় মানে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির জয় ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। বরং বিষয়টির বড়সড় বার্তা—‘ওল্ড স্কুল পলিটিকস’ বাংলাদেশে আর কাজ করবে না। মতামতদাতাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের পেছনে বিবেচনায় ছিল কোন প্রার্থী কতটা গোছানো, সুশৃঙ্খল এবং নির্ভরযোগ্য; কারা কতটা বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করতে পেরেছেন। কোন দল কোন রাজনৈতিক আদর্শবাদ প্রতিষ্ঠা করবে বা না করবে, তাদের বিবেচনায় ছিল না। কারা ধর্মাশ্রয়ী কারা নয়, কারা জাতীয়তাবাদী কারা সমাজতন্ত্রী, বিষয়গুলো তাঁদের মধ্যে কোনো আবেদন তৈরি করেনি। কোন ব্যানারে ভোট করছেন, তা-ও নয়। তাঁদের যাপিত জীবনের সমস্যা সমাধানে কোন প্রার্থীকে সত্যিকার আন্তরিক, সৎ, নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে, সেটিই দেখেছেন বেশি।
আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলাপ পেয়েছি। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ছাত্রসংগঠনের মূল পিতৃপ্রতিম রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তারা যেন ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়। ‘ঘরপোড়া গরুদের সিঁদুরে মেঘ দেখে আগুন ভাবা’র মতো। আওয়ামী শাসনামলে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য তাঁরা দেখেছেন। ভয়—এখানেও ক্ষমতা, সরকারেও ক্ষমতা; এত বেশি ক্ষমতার আঁচে তারাও যদি ছাত্রলীগের মতোই দানবীয় ক্ষমতায় ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। সেটি হতে না দেওয়াও শুদ্ধির একটি পথ।
একটা সময় ছিল যখন ভাবা হতো, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্র সংসদে এলে বরাদ্দ পেতে, সরকারি আনুকূল্য পেতে, উন্নয়ন ও ছাত্রকল্যাণের কাজগুলো করতে ঝক্কিঝামেলা কমবে। এ ভাবনা কখনোই সঠিক প্রমাণিত হয়নি। জেন-জিরা সেটি জেনেছে। জানার আলোকে নতুন পথ ধরতেও শিখেছে। ‘নিউ স্কুল পলিটিকস’ অনেকটা এ রকম শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিণত হয়ে উঠবে সম্ভবত।
৬.
জেন-জিদের চোখে বর্তমান সময়টি একটি ‘কারেকশন ফেজ’। আর ‘ভুল করা যাবে না’ প্রতিজ্ঞার সময়। তাই সক্রিয় রাজনীতির বাইরের আপাত-অরাজনৈতিক জেন-জিরাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুদ্ধি আনতে অবদান রাখছে। শুদ্ধি পর্বটি চলছে পাঁচটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। যাতে শেষমেশ একটা সময়ে গিয়ে মোটামুটি পরিশুদ্ধ একটি রাজনীতির পথ তৈরি হয়।
দেখা যাক প্রক্রিয়া পাঁচটি কী কী:
এক. নিরীক্ষণ (স্ক্রুটিনি) ও পরীক্ষণ (এক্সপেরিমেন্ট) : ‘গতানুগতিক পথে হেঁটে বাপ-দাদারা অনেক তো দেখেছে। এবার একটু ভিন্নভাবেই না হয় হেঁটে দেখি—কী হয় দেখা যাক’ ভাবনা। জেন-জিদের মধ্যে এই মনোভাব প্রবল। আমরা জেন-এক্সরা ভাবতাম—ওকে ভোট দেব? সে তো জিতবে না। মাঝে ভোটটিই নষ্ট হবে। জেন-জিরা ‘ভোট নষ্ট’ ধরনের সেকেলে তত্ত্বটির ধার ধারে না। কালোকে কালো, সাদাকে সাদাই দেখে!
দুই. মূল্যায়ন (ইভালুয়েশন): ‘দেখলাম তো কে কতটা কী করেছে না করেছে; আমাদের হিসাব-নিকাশ যথেষ্টই করা হয়ে গেছে’—এই ভাবনা। এরা অতীতের ক্ষমতাসীনদের ভালো-মন্দের মূল্যায়ন দলান্ধ জেন-এক্সদের চেয়ে অনেক বেশি নির্মোহভাবে করতে পারে।
তিন. পর্যবেক্ষণ (অবজারভেশন) ও পরিবীক্ষণ (মনিটরিং): ‘সবকিছুতেই চোখ রাখছি, কোনো কিছুই নজর এড়াচ্ছে না’, ‘সবকিছু মনে রাখা হবে’ ভাবনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দখল থাকার সুবাদে প্রজন্মটির এক বড় অংশ নিত্যদিনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখে এবং বিশ্লেষণ করে নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করে। দল-মত-পথ অন্ধভাবে মেনে নেয় না।
চার. বর্জন (রিজেকশন) : চিরাচরিত উত্তরাধিকারের রাজনীতি বর্জন বড় উদাহরণ। পুরোনো রাজনীতির একটি ধারাবাহিকতা ছিল বাবা যে দল করে, পুরো পরিবার সে দলই করে। তিনজন মতামত দানকারী জানিয়েছেন, তাঁদের বংশপরম্পরা আওয়ামী লীগ রাজনীতির। তবু তারা পরিবারকে অসন্তুষ্ট করেই লীগের রাজনীতিকে সজ্ঞানে বর্জন করেছে।
পাঁচ. শুদ্ধীকরণ (কারেকশন) : ‘রাজনীতিবিদেরা ভুল করলে ছাড় দেওয়া হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, লিখে-এঁকে, ট্রল করে যতভাবে সম্ভব তাদের শুদ্ধির পথে ঠেলে দিতে হবে’ মনোভাব। মতামত দানকারীদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের বিবেচনা ছিল—তাকেই ভোট দেব, যে চুরিদারি করবে না, টাকা মেরে খাবে না, লাইসেন্স-পারমিট নেবে না, নেতার পেছনে ছুটবে না, নেতার নামে স্লোগান দেবে না, কাউকে মিছিলে যেতে বাধ্য করবে না, গেস্টরুম আর সিট বরাদ্দের রাজনীতি করবে না, গুন্ডামি-মাস্তানি-দাদাগিরি ও ক্ষমতার দাপট দেখাবে না।
রাজনীতিতে বড় ব্যবসায়ী ও কালোটাকার মালিকদের সংসদীয় আসনের সিট কেনাবেচা, টাকাপয়সায় দৌরাত্ম্য, রাজনীতির মাঠ দখল আবারও শুরু হয়েছে। জেন-জিদের ভোটিং বিহেভিয়ার এ বার্তাও দিচ্ছে—এই আয়োজনগুলো কিছুদিনের জন্য সাময়িক সাফল্য দিলেও জেন-জিরা তাদেরও বেশি দিন টিকতে দেবে না। কারণ, আগামী কয়েকটি বছর বাংলাদেশের রাজনীতি বিচিত্র ধরনের শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। এই নতুন প্রক্রিয়া আমাদের চিরাচরিত রাজনীতির পূর্বানুমান ও হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করেই এগোবে।
* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ৭ জানুয়ারি, বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। তাঁরা তিনজনই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের। ছবি: প্রথম আলো |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1427)
-
▼
January
(307)
-
▼
Jan 12
(15)
- ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে আইন নয়, শক্তিই কি শেষ কথ...
- ডাকসু–জকসু: শিবিরের জয়, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের মৃত্য...
- ইরানে হামলা নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করল মার্কিন সামরি...
- বিক্ষোভের পর ইরানের পরিস্থিতি ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে...
- যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে ইরানের হুঁশ...
- ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঠিক হবে কি না,...
- ইরানে বিক্ষোভে নিহত পাঁচ শতাধিক: মানবাধিকার সংস্থা
- ওয়াইসির ঘোষণা: একদিন হিজাব পরা মহিলাই ভারতের প্রধা...
- ঢাকা শহরে একজন ‘জোহরান মামদানি’ কোথায় পাব by কাজী ...
- গ্রিনল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা তৈরির নির...
- পলিটিক্যাল কদমবুসি কালচার যে কারণে ভয়ের by সারফুদ্...
- ‘কুকি-চিন’ নিয়ে আসলে কী ঘটছে by আলতাফ পারভেজ
- বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত
- সোমালিল্যান্ডে ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা...
- ইরানে হামলার নানা বিকল্প নিয়ে ট্রাম্পকে ব্রিফিং
-
▼
Jan 12
(15)
-
▼
January
(307)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment