আপনার প্রবীণ সময়ের জন্য কতোখানি প্রস্তুত? by মিতালী হোসেন

পৃথিবী জুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা যত আধুনিক হচ্ছি তার ফলে ভেঙে যাচ্ছে যুথবদ্ধ জীবন। ভাবলে ভুল হবে না যে শুধু পরিবার ভেঙে ছোট হচ্ছে তা কিন্তু নয়। পরিবার ভাঙছে যত দ্রুত তার চেয়ে কিছুটা কম গতিতে ভাঙছে সমাজ। কিন্তু ভাঙন সর্বত্র। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যার ২৫% প্রবীণ থাকবে। এই প্রবীণদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ব্যবস্থা করার জন্য আমাদের রাষ্ট্র সমাজ বা পরিবার কেউই প্রস্তুত নয়- এই কথাটা দ্বিধাহীন ভাবেই বলা যায়।

কিন্তু আমি বলতে চাই, আপনি আমি কি প্রস্তুত বৃদ্ধ বয়সকে মোকাবিলা করার জন্য। আপনারা যারা মধ্যবয়সি তারা কি কোনো পরিকল্পনা করেছেন- বৃদ্ধ বয়সের জন্য। আমি জানি অধিকাংশ মানুষই করেননি। বৃদ্ধ বয়সের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা খুবই জরুরি। সে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যতই সাধারণ বা ছোট মাপের হোক। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে ভাবা জরুরি। সাধারণত মধ্য বয়স থেকেই নানা রোগ আক্রমণ করে। সেসব থেকে মুক্ত থাকতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বার্ধক্যে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হবেন সেগুলো মোকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণের উপযুক্ত সময় যৌবন। যখন আপনি অধিকতর কর্মক্ষম শারীরিক ও মানসিকভাবে। নিজের বার্ধক্যকালীন সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য প্রথমেই আমাদের নেশামুক্ত হতে হবে। হতে পারে সে নেশা পান-জর্দা, মদ-গাঁজা, অর্থের প্রতি আসক্তি বা টাকার নেশা। এসবই আপনার বৃদ্ধ বয়সকে কষ্টদায়ক করে তুলতে পারে। বৃদ্ধ বয়সের জন্য সঞ্চয় করুন। যতটুকু সম্ভব। আমাদের দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় সঞ্চয় আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য সহজ নয়। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে। বন্ধু, আত্মীয় ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ান। সবার আনন্দে অংশ নিন। তাহলে দেখবেন শেষ বয়সে একা হয়ে যাবেন না।
মধ্য বয়স থেকেই ধীরে ধীরে নিজের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করুন। কারণ যৌবনে বা মধ্য বয়সে যা খেয়ে সহজেই হজম করে ফেলা যায় বৃদ্ধ বয়সে সেটা সম্ভব না। সম্ভব হলে এ বিষয়ে ডাক্তার বা পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। মধ্যবয়স থেকেই আস্তে আস্তে নিজের শখকে সময় দিতে শুরু করুন। বই পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা, বেড়াতে যাওয়া, যা করতে মন চায় বা যা করা সম্ভব। নইলে হঠাৎই একদিন দেখবেন আপনি এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মধ্যে একাকী বসে আছেন। আপনার চার পাশ একেবারে শূন্য।

নিজের পোশাক পরিচ্ছদের দিকে মনোযোগ দিন। পোশাক দামি হতে হবে না। কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া আবশ্যক। এরকম ভাববেন না-কি হবে ভালো পোশাক পরে? রঙিন পোশাক পরে কি হবে? এসব ভাবনাকে প্রশ্রয় দেবেন না, লোকে কি বলবে ভাববেন না। যদি আপনার কমফোর্টেবল লাগে, আপনার মনে হয় ভালো লাগছে, ব্যাস আর কোনো চিন্তার দরকার নেই। যদি পলো টি-শার্ট পরতে ভালো লাগে পরবেন। আপনার কখনো কখনো যদি শাড়ি না পরে লং স্কার্ট, ফতুয়া পরতে ইচ্ছা হয় তো পরতে দ্বিধা করবেন না।

বৃদ্ধ বয়সের জন্য প্রস্তুত হওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় মধ্য বয়স। সবাইকে ভালোবাসুন কিন্তু একটু স্বার্থপর হয়ে। নিজেকে নিঃস্ব করে সন্তানদের হাতে সব দিয়ে দেবেন না। আবার সন্তানের কাছেও এত বেশি আশা করবেন না যে, তাদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আজ যারা মধ্য বয়সি তারাই আগামী দিনের প্রবীণ। আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, আপনার বার্ধক্যের দিকে। নিজের প্রবীণ জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন আজই। সুস্থ স্বাভাবিক-নিরাপদ প্রবীণ জীবন পেতে কাজ শুরু করুন। আর দেরি নয়, সকলের জীবন আনন্দময় হোক, মৃত্যু হোক শান্তির।

mzamin