যুক্তরাষ্ট্রের নাকের নিচ দিয়ে ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম এনেছে ইরান!

শিরোনাম পড়লে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে এ কাজটি আসলেই করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নাকের নিচ দিয়ে নিজেদের জন্য ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে দেশটি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বার্তা সংস্থাটি তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানির জন্য পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। এসব সংস্থার মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে তেহরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের সময় হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে কাজ করছে, অনুসন্ধানী এ প্রতিবেদনে সেটির বিস্তারিত উঠে এসেছে।

রয়টার্স বলছে, ইরানের এই নেটওয়ার্কে জড়িত দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তাদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত রেখেছে দেশটির প্রভাবশালী অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বুনিয়াদ’ নামে পরিচিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো। ২০১৬ সাল থেকে পণ্য খালাসের বিল ও অন্যান্য নৌ-পরিবহন নথিতেও এ নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেনের চিহ্ন রয়েছে। সংস্থাগুলো পরিচিতি পায় একটি নম্বরের মাধ্যমে। ফলে এসব সংস্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা সরকারগুলো কখনো নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেনি। রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করে এমন কোনো প্রমাণও পায়নি।

যেভাবে কাজ করে গোপন নেটওয়ার্ক

‘গোপন’ এই নেটওয়ার্ক বর্তমানে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। রয়টার্স ও মার্কিন-ইসরায়েলি ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিকস’ও তাদের অনুসন্ধানে এই প্রথম এমন কোনো অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছে।

সংস্থাগুলোর নামের শুরুতে ইংরেজি ‘এমওডি’ অথবা ফারসি ‘ভিওডিজেএ’ অক্ষর থাকে। এরপর পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি সংখ্যা দীর্ঘ শব্দে লেখা হয়। সব সংস্থার ঠিকানা হিসেবে তেহরানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি; যেদিন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

তবে করপোরেট নথিতে দেখা গেছে, এসব সংস্থার বেশির ভাগই প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। ওই সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের তেল রপ্তানি ও মুদ্রাবাজার সংকটে পড়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারী ও বিদেশি ভুয়া কোম্পানির একটি জাল ব্যবহার করে সংস্থাগুলো লেনদেন পরিচালনা করে। এসব মধ্যস্থতাকারীকে সম্মিলিতভাবে ‘ট্রাস্টি’ বলা হয়। অবৈধভাবে বিক্রি করা তেলের আয় ব্যবহার করে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত পুনরায় পূরণে সহায়তা করে।

এখানেও রয়েছে কৌশল। ইরান যেসব পণ্য বা সরঞ্জাম আমদানি করেছে, তার আনুমানিক ৯৭ শতাংশ লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই। রয়টার্স বলছে, তাদের পর্যালোচনা করা কয়েকটি চালানে এমন কিছু তথ্য রয়েছে; যাতে বোঝা যায় সীমান্ত পেরিয়ে অর্থের সরাসরি লেনদেন খুব কম হয়েছে। এবং তা নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হয়েছিল।

তেহরানের আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং ভারী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান। এসব পণ্যের উৎস হিসেবে চীন, রাশিয়া ও জার্মানির নাম পাওয়া গেছে।

যেভাবে শনাক্ত হলো নেটওয়ার্ক

২৪০ অ্যানালিটিকসের অর্থনীতিবিদ নোয়াম বিনস্টক ২০২৫ সালের জুনে প্রথম এ নেটওয়ার্কের ধরন শনাক্ত করেন। তিনি ইরানের আইআরজিসির সদস্যদের বেতন-ভাতা পরিচালনাকারী ব্যাংক ‘সেপাহ’র ফাঁস হওয়া নথি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিষয়টি খুঁজে পান। ওই নথিগুলো টেলিগ্রাম ও উইকিইরান ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়েছিল।

নথিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩৬টি সংস্থার কাছে বৈদেশিক মুদ্রায় ১২০ কোটি ডলার ছিল। অন্য সংস্থাগুলোর কাছে স্থানীয় মুদ্রায় ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।

পরবর্তী অনুসন্ধানে বিনস্টক দেখতে পান, এসব সংস্থা তেল বিক্রির আয় গ্রহণ করছে এবং দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী সরঞ্জাম কিনছে। প্রতিটি সংস্থার আলাদা ১১ অঙ্কের পরিচিতি নম্বর রয়েছে, যা পণ্য পরিবহনের নথি, চালান ও ব্যাংক হিসাবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে ভুয়া কোম্পানির আড়ালে থেকেও নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

রয়টার্স প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথির একটি অংশের সঙ্গে নৌ-পরিবহনসংক্রান্ত কাগজপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, স্যাটেলাইট চিত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য মিলিয়ে দেখেছে।

সবচেয়ে বড় আমদানিকারক সংস্থা এমওডি ৩৪৬৪২৮

ইরানের গোপন এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় সংস্থা এমওডি ৩৪৬৪২৮। ২০২৩ সালের মার্চে শেষ হওয়া এক বছরে সংস্থাটির আমদানি ছিল ৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। এতে ইরানের শীর্ষ ১০ আমদানিকারকের তালিকায় জায়গা করে নেয় সংস্থাটি। ফলে সংস্থাটি বিশেষভাবে নজরে এসেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে এমওডি ৩৪৬৪২৮। রয়টার্সের দাবি, এসব আমদানির মধ্যে রয়েছে- রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিস্ফোরক ও অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করে সংস্থাটি। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল- সোডিয়াম ক্লোরেট ও বিভিন্ন পারক্লোরেট, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। পণ্যগুলো আনা হয় বন্দর আব্বাস দিয়ে।

রয়টার্সের সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ ইরানের শহিদ রাজায়ি বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পেছনে এসব চালানের একটি থেকে আসা সোডিয়াম পারক্লোরেটের ভূমিকা ছিল। বন্দরের কনটেইনারে থাকা রাসায়নিকটিতে আগুন ধরে এ বিস্ফোরণ ঘটে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, রাসায়নিকগুলো সংরক্ষণ করেছিল সিনা পোর্ট অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি কয়েকশ কোটি ডলারের সম্পদের মালিক বুনিয়াদ মোস্তাজাফানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই ফাউন্ডেশন সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং এক হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।

ট্রাক ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান আমদানি

৪৩৫টি আইভেকো ট্রাকও আমদানি করেছে এমওডি ৩৪৬৪২৮। সামরিক বাহিনী এসব ট্রাককে ছদ্মবেশী চলমান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ২০২২ সালে একই ধরনের ছয়টি ট্রাক কেনার পর সেগুলো শেষ পর্যন্ত ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সাহারা থান্ডারের কাছে পৌঁছেছিল। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এ ছাড়া হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানি করেছে সংস্থাটি। আইআরজিসি এসব গাড়িতে পরিবর্তন এনে ভারী মেশিনগান স্থাপন করে। আইভেকো জানিয়েছে, ইরানে তাদের কোনো গাড়ি ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে টয়োটা বলেছে, ইরানে তাদের কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই।

যুদ্ধ শুরুর পরও আমদানি অব্যাহত

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ইরানে সামরিক সরঞ্জাম ও কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত ছিল। যুদ্ধ শুরুর আগের কয়েক সপ্তাহে দেশটি চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম আমদানি করে। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এ ধাতু ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো ও রকেটের ইঞ্জিনের আবরণ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।

এ ছাড়া চীন থেকে ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করা হয়। এসব পণ্যের মধ্যে রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরির উপাদান রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে মাসিক আমদানির পরিমাণ ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। তবে মে মাসে তা আবার বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।

রাশিয়া থেকে ৭৬ লাখ ডলারের বিস্ফোরক সক্রিয় করার যন্ত্র পাঁচটি চালানে ইরানে পৌঁছায়। এর সর্বশেষ চালানটি আসে জুনে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে বলে নথিতে উল্লেখ থাকা ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্যও ইরানে পৌঁছেছে। এর সর্বশেষ চালানটি আসে জুনে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নৌ অবরোধ স্থগিত করার কয়েক দিন পর।

এ ছাড়া কম্পিউটারনিয়ন্ত্রিত লেদ মেশিন ও ইলেকট্রন-বিম ফার্নেসের মতো নিখুঁত যন্ত্রপাতিও কিনেছে ইরান। এসব সরঞ্জাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।

অনুসন্ধানের তথ্য পর্যালোচনা করা বিশেষজ্ঞরা একে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনকে ‘শিল্পপর্যায়ের উদ্যোগ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে তারা এও সতর্ক করেছেন, আমদানি করা অনেক উপাদানই দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী। অর্থাৎ সামরিক কাজের পাশাপাশি বেসামরিক উদ্দেশ্যেও সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব।

সূত্র : রয়টার্স

আইআরজিসির স্বাক্ষরিত সিলমোহর, তেহরানে অবস্থিত কাস্টমস লটে আইভেকো ট্রাক, সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার স্যাটেলাইট চিত্র ও কুচকাওয়াজে আইভেকো ট্রাক প্রদর্শন। ছবি: রয়টার্স
আইআরজিসির স্বাক্ষরিত সিলমোহর, তেহরানে অবস্থিত কাস্টমস লটে আইভেকো ট্রাক, সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার স্যাটেলাইট চিত্র ও কুচকাওয়াজে আইভেকো ট্রাক প্রদর্শন। ছবি: রয়টার্স