Monday, September 28, 2026
নরক হয়ে উঠেছে ওলেশকি, ঘাস-আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা
নরক হয়ে উঠেছে ওলেশকি, ঘাস-আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা
যুদ্ধের আগে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বসবাস ছিল দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলের এই শহরে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২ হাজার বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০টি শিশু রয়েছে বলে হিসাব দিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
এক নারী জানান, শহরে খাবার শেষ হয়ে গেছে। তিনি একসময় ১১০ কেজি ওজনের ছিলেন, এখন তার ওজন ৬৭ কেজিতে নেমে এসেছে। তিনি জানান, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার না পেলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে তার নিজের বাড়ি ও যেখানে গত শীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই বাড়িটিও ধ্বংস হয়েছে।
ওলেশকি খেরসন শহরের বিপরীতে ডিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই শহরটি রুশ বাহিনীর দখলে রয়েছে। বর্তমানে এটি ইউক্রেনীয় ও রুশ বাহিনীর মধ্যবর্তী একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
বন্ধ খাবার সরবরাহ
ওলেশকির ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, শহরে শেষ খাদ্য সরবরাহ মে মাসে পৌঁছেছিল। এরপর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং বাসিন্দাদের হাতে থাকা খাদ্যও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।
খাবারের অভাবে অনেকে বাগানে জন্মানো আগাছা সংগ্রহ করে রান্না করছেন। স্থানীয় যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপগুলোতে কোন আগাছা খাওয়ার উপযোগী এবং কীভাবে সেগুলো রান্না করতে হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
শহরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কেন্দ্রীয় পানির সরবরাহও নেই। কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের পর ২০২৩ সালে ভয়াবহ বন্যায় ওলেশকির বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর থেকে শহরের স্বাভাবিক জীবন আর ফিরতে পারেনি।
খাবার আনতেও মৃত্যুর ঝুঁকি
খাবারের সন্ধানে পাশের এলাকায় যাওয়াও এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এক স্থানীয় নারী জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর এক দম্পতি ওলেশকি থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরের রাদেনস্ক এলাকায় খাবার আনতে গিয়েছিলেন। কারফিউয়ের আগে তারা শহরে ফিরতে পারেননি। পরে ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন।
এ ধরনের ঘটনার কারণে স্থানীয়রা খাবারের জন্য শহরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। রাস্তার বিভিন্ন এলাকায় মাইন থাকার পাশাপাশি আকাশে ড্রোনের উপস্থিতিও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
লাশ পড়ে থাকার অভিযোগ
শহরের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে মৃতদের দাফন নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকদের অভিযোগ, বিভিন্ন হামলা বা বিস্ফোরণে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ যথাযথভাবে দাফন করা সম্ভব হচ্ছে না।
তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে একাধিক ছবি পেয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দাবি, কিছু মরদেহ দীর্ঘদিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেখানেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কিছু লাশ রাস্তায় পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের হিসাবে, চলতি বছর ওলেশকি ও কাছাকাছি হোলা প্রিস্তান এলাকায় অন্তত ২৯ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত এবং ৫৪ জন আহত হওয়ার খবর নথিভুক্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের হিসাব আরো বেশি।
‘প্রায় কিছুই খাওয়ার নেই’
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ২৫ সেপ্টেম্বর ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, শহরে প্রায় কোনো খাবার অবশিষ্ট নেই। কিছু বেসামরিক মানুষ ঘাস ও আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবা ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিশুদেরও একই পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
সিবিহা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দ্রুত ও বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। যারা শহর থেকে বের হতে চান, তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থারও দাবি করেন তিনি।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এই সংকটের জন্য রাশিয়ার দখলকে দায়ী করা হয়েছে। তবে রুশ পক্ষ পাল্টা অভিযোগ করেছে, ইউক্রেনীয় হামলার কারণে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ২১ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতিকে ‘সংকটজনক’ বলে স্বীকার করলেও এর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেন এবং বলেন, রুশ সেনারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।
ড্রোনে খাবার পাঠাল ইউক্রেন
এর মধ্যেই ওলেশকির বাসিন্দাদের জন্য ইউক্রেনীয় বাহিনী ড্রোনের মাধ্যমে খাবার পাঠিয়েছে। খেরসন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর প্রায় চার টন খাদ্য ১০০টি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
খেরসন কর্তৃপক্ষ বড় ড্রোন ব্যবহার করে ওলেশকি ও আশপাশের এলাকায় জরুরি খাবার, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়েছে। প্রায় চার টন খাবার ১০০টি স্থানে ফেলা হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে এর কতটা রুশ বাহিনী আটক করেছে বা সব মানুষের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
পালানোর পথও বন্ধ
ওলেশকির বাসিন্দাদের জন্য শহর থেকে বের হয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ডিনিপ্রো নদী একদিকে এবং রুশ বাহিনীর অবস্থান অন্যদিকে থাকায় নিরাপদ স্থলপথ সীমিত। মাইন ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির কারণে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে এই মানুষগুলোকে বাঁচানো যাবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বাস্তবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নিরাপদে বেসামরিক মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও'ফ্লাহার্টিও ২৫ সেপ্টেম্বর ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, খাবার, ওষুধ, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুতের অভাবে বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা, গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি মানবিক সহায়তার সুযোগ এবং বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
একসময় ২৪ হাজার মানুষের প্রাণচঞ্চল শহর ওলেশকি এখন যুদ্ধ, দখল, ধ্বংস ও খাদ্যসংকটে প্রায় জনশূন্য। যারা এখনও সেখানে রয়ে গেছেন, তাদের সামনে একদিকে খাবার ও চিকিৎসার সংকট, অন্যদিকে পালানোর পথে মাইন ও ড্রোন হামলার ভয়। ফলে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের এই শহরটি এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(2056)
-
▼
September
(263)
-
▼
Sep 28
(12)
- ইমরান খানের মুক্তি কোন পথে, আন্দোলন স্থগিতের পর কী...
- মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরান বা ইসরাইলের বিরোধী নয়...
- নরক হয়ে উঠেছে ওলেশকি, ঘাস-আগাছা খেয়ে বেঁচে থাকার চ...
- ৬৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদ ভাঙলে একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়ব...
- মসজিদ ভাঙতে বুলডোজার ও পুলিশ মোতায়েন, উত্তপ্ত ভারত...
- পারমাণবিক ইস্যুতে মার্কিন চাপ সহ্য করতে প্রস্তুত ত...
- ইসরাইলের মদতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নজিরবি...
- আবার মন্ত্রী হলে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কা...
- গাজায় যা করা হয়েছে, পশ্চিম তীরেও তা করা উচিত -ইসরা...
- প্রকাশ্যেই অশালীন ভাষা ট্রাম্পের, বদলে যাচ্ছে মার্...
- গাজায় ৬ কোটি টন ধ্বংসস্তূপ, চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার ...
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাল, ধূমপান ছাড়লে প্রথম দ...
-
▼
Sep 28
(12)
-
▼
September
(263)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment