ভারতে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার পর্দা সংস্কৃতি by এলাহী নেওয়াজ খান

সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনকালে পর্দা টানিয়ে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার ঘটনা বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বস্তির জরাজীর্ণ বাড়িঘর ও নোংরা পোশাক পরিহিত মানুষকে পর্দা দিয়ে আড়াল করা হয়েছে, যাতে বিশ্বনেতারা ভারতের আসল চেহারা দেখতে না পান। কিন্তু তাতে কি সত্য গোপন রাখা গেছে? বরং সবাই বুঝে গেলেন, পর্দার ওপারে কী নির্মম সত্যটা লুকিয়ে আছে। বলা যায়, বিজেপি সরকারের এই উদ্যোগের ফলটা উল্টো হয়েছে। কারণ বিরোধী দল, বিশেষ করে আম আদমি পার্টির নেতারা এই কৃত্রিমতাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করায় বিষয়টি বিশ্ববাসীর কাছে আরো নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তবে এটাই ভারতের সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র।

মূলত, ব্রিকস সম্মেলন কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নয়াদিল্লির প্রধান সড়কের পাশে বসন্তবিহার কুলি নামক বস্তিকে ঢেকে রাখতে এই পর্দা টানানো হয়। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও ওই বস্তি ঢাকতে একইভাবে পর্দা টানানো হয়েছিল। তবে এবারের ঘটনা ইতালির প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাসির সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের বর্ণনার কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছে। সেটি ছিল ফ্যালাসির নেওয়া ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার। সে সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অংশে নয়াদিল্লির চরম দারিদ্র্য ও বস্তির এক মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল।

সেই ঘটনার ৫৫ বছর পর সেই দিল্লিতেই ২০২৬ সালে সেই দরিদ্রতার পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে আগের তুলনায় রাস্তায় সেই পবিত্র পশুর বিচরণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ফ্যালাসি তার বর্ণনায় উল্লেখ করেছিলেন। এটি ছিল ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ওরিয়ানা ফ্যালাসির সেই সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অংশের বর্ণনাটি ছিলÑযেমন একদিকে রয়েছে নয়াদিল্লির চওড়া রাস্তা, রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ সরকারি প্রাসাদ এবং লন, আর এর উল্টো পাড়ে নির্মম দারিদ্র্যের দৃশ্য।

ফ্যালাসির বর্ণনাটা ছিল এ রকম—‘ফুটপাতের ওপর জীর্ণ নোংরা কাপড়ের স্তূপের উপর এক বৃদ্ধ ভিখারি অঘোরে ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তার পাশেই একটি গরু মলত্যাগ করছিল। যার ফলে সেই মল ছিটকে এসে ঘুমন্ত বৃদ্ধ লোকটির শরীর ও কাপড় নোংরা করে দিচ্ছিল।’

এই দৃশ্যটি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে তিনি মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলে উঠেছিলেন, ‘ভারতে সবকিছু বোধ হয় একটু বেশি ধীরগতিতে চলে।’ এই মন্তব্যটি ইন্দিরা গান্ধীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। ফ্যালাসি লিখেছেন, ‘তার কথাটি শেষ হতে না হতেই ইন্দিরা গান্ধী লোহার মতো শক্ত পাঁচটি আঙুল দিয়ে তার হাত চেপে ধরেছিলেন এবং অত্যন্ত শীতল ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি তার বিখ্যাত অব দ্য রেকর্ড মন্তব্যটি করেছিলেন।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একদল বোকা দ্বারা পরিবেষ্টিত।’

সে যাই হোক, ওই পটভূমিতে বর্তমানে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির স্বরূপটা আমাদের জানা দরকার। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ভারতে জীবনযাত্রার প্রকৃত মান বোঝার জন্য দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের একটি উচ্চতর দরিদ্রসীমা ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই উচ্চতার মানদণ্ড অনুযায়ী ভারতের প্রায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষÑঅর্থাৎ ৩৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। অর্থাৎ মানুষ এখন না খেয়ে মারা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মানসম্মত জীবনযাত্রার দিক থেকে বড় একটি অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এছাড়া ভারতের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে এসে শহরে অভিবাসনের ফলে বস্তি অঞ্চলে দরিদ্রের একটি নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অন্যদিকে ভারতে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্সফাম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের সিংহভাগ সম্পদ মাত্র ১ শতাংশ ধনকুবেরের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উত্তরণ ধীরগতির হয়ে পড়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপিএইচআই যৌথভাবে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তা শুধু আয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান—এই তিনটি বিষয়ের বারোটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এই আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী, ভারতে তীব্র দারিদ্র্য অনেক কমেছে বটে, তবে এখনো দেশটির হেডকাউন্ট রেশিও ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১৬ শতাংশের অধিক মানুষ এখনো প্রতিদিনের জীবনে পুষ্টি, মানসম্মত বাসস্থান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কিংবা শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের কোনো না কোনোটি থেকে বঞ্চিত।

যদিও বাগাড়ম্বরপূর্ণ প্রচারণার কারণে ভারতের অর্থনীতির সত্যিকারের চেহারা জানা সম্ভব হয় না। তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উপদেষ্টা জয়ন্ত ভান্ডারী বিভিন্ন সময়ে ভারতের দারিদ্র্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা থেকে প্রকৃত সত্যটা পাওয়া যায়। তিনি ভারতকে মেরুদণ্ডহীন জেলিফিশের সঙ্গে তুলনা করে মতাদর্শহীন রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ভারতের দারিদ্র্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্ফোরক সব মন্তব্য করেছেন।

ভান্ডারীর মতে, ভারত বিশ্বশক্তি হয়ে উঠছে—এই প্রচারণামূলক আখ্যানটি একটি মরীচিকা। মহাকাশ অভিযান, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন, ট্রিলিয়ন ডলারের মোট জিডিপির আড়ালে সাধারণ নাগরিকদের প্রকৃত অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আড়াল করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন যে, মোট জনসংখ্যার অনুপাতে মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম। তার মতে, প্রকৃত অর্থে ভারত এখনো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক অসমতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।

ভান্ডারী মনে করেন, ভারতের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার মূল কারণ শুধু ভুল নীতি নয়, বরং সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়। তিনি বলেন, ভারতে সর্বস্তরের শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সমাজে যুক্তি ও সৃজনশীলতার অভাব, লোকদেখানো জাতীয়তাবাদ ও অন্ধবিশ্বাস যোগ্যতার স্থান দখল করে নিয়েছে।

তিনি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের পক্ষে পরবর্তী চীন হওয়া অসম্ভব। চীন যেভাবে তাদের শাসনতান্ত্রিক সক্ষমতা ও উৎপাদনযোগ্যতার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে, সে ক্ষেত্রে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং অদক্ষতার কারণে সেই স্তরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়।

জয়ন্ত ভান্ডারী আরো বলেছেন, ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণেই দেশের শিক্ষিত তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীরা সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার মতে, দেশের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ না থাকায় এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

ভারতে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার পর্দা সংস্কৃতি