কিয়েভের পিঠে ট্রাম্পের ছুরি

আরটির বিশ্লেষণঃ বিশ্ব রাজনীতির জটিল খেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি চাল পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার ওপর থেকে হঠাৎ ডিজেল আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ওয়াশিংটন থেকে কিয়েভ পর্যন্ত বড় ধরনের ঝাঁকুনি তৈরি করেছে। ট্রাম্পের এই এক সিদ্ধান্তে কিয়েভে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া, ক্ষোভে ফুঁসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আর ওয়াশিংটনের অনেক রাজনীতিকও হতবাক। বিশ্লেষকরা হিসাব মেলাতে গিয়ে থমকে গেছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেই যে ওয়াশিংটন মস্কোকে কোণঠাসা করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আইন করল, হঠাৎ সেই ট্রাম্পই আবার রাশিয়ান ডিজেলের দরজা খুলে দিলেন কেন? বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি ট্রাম্পের পুরোনো খামখেয়ালি স্বভাব। কিন্তু ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

সব হিসাবের মূল কারণ লুকিয়ে আছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। সামনেই মার্কিন কংগ্রেসে মধ্যবর্তী নির্বাচন, আর হাতে সময় আছে এক মাসেরও কম। সেখানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ট্রাম্প প্রকাশ্যে উদাসীন ভাব দেখালেও তিনি ভালো করেই জানেন, কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারালে আগামী দুই বছর তাকে চরম রাজনৈতিক বিপাকে পড়তে হবে।

ভোটের আগে হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প ভোটারদের মন জয়ের পথ বেছে নিয়েছেন। বাজারে তেলের দাম কমাতে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, যার মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে। ট্রাম্প ভোটারদের দেখাতে চান, আমেরিকানদের কষ্ট কমাতে হোয়াইট হাউস দিনরাত কাজ করছে। পারস্য উপসাগরে তার নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই যে আজ এই তেলের সংকট, ভোটাররা যেন তা ভুলে যায়; এটাই তার কৌশল।

তিনি আগে কী বলেছিলেন আর এখন কী করছেন, তা নিয়ে ট্রাম্প বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন। কারণ তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে কথার গুরুত্ব শুধু বলার মুহূর্তটুকুর জন্যই, পরে তা মেনে চলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ইউক্রেনের গায়ে। সংঘাত শুরুর পর থেকে ওয়াশিংটনের প্রতিটি পদক্ষেপে ইউক্রেনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। কিন্তু এবার ট্রাম্প কিয়েভকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, যা ইউক্রেনের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন ট্রাম্পের এই পরিবর্তন?

ভেতরের খবর হলো, ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চরম অসন্তুষ্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি কেন্দ্রে ইউক্রেন একের পর এক ড্রোন হামলা চালানোয় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও জেলেনস্কি হামলা থামাননি। ট্রাম্প মনে করছেন, মার্কিন জ্বালানি সংকট বাড়িয়ে তোলার জন্য জেলেনস্কিই দায়ী। আর ট্রাম্প কাউকে দায়ী মনে করলে তার সিদ্ধান্ত বদলানো অসম্ভব। ফলে কিয়েভের সব আপত্তি স্রেফ হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া হলো।

সমস্যা শুধু ডিজেল আমদানিতেই থেমে নেই। আসল ভয় অন্য জায়গায়। রাশিয়ার অভ্যন্তরে নিখুঁত হামলা চালাতে ইউক্রেনকে মূলত মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি কিয়েভকে এই গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দেবেন?

দেড় বছর আগেও জেলেনস্কির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প কয়েকদিনের জন্য এ সহায়তা বন্ধ রেখেছিলেন। তবে এবার যদি দীর্ঘমেয়াদে সাহায্য বন্ধ করা হয়, তবে তা হবে ওয়াশিংটন-ইউক্রেন সম্পর্কের চরম অবনতি। এর বার্তা হবে একটাই; আমেরিকা আর ইউক্রেনের পাশে নেই।

অবশ্য ট্রাম্প চাইলেই তা সহজে করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ ওয়াশিংটনে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী চায় কিয়েভকে সহায়তা বজায় রাখতে। এর আগেও ট্রাম্প সমঝোতার চেষ্টা করতে গিয়ে এই গোষ্ঠীর বাধার মুখে পড়েছিলেন। এবারও তিনি তাদের কতটা সামলাতে পারবেন, তা দেখার বিষয়। নির্বাচন পার হয়ে গেলে এই আলোচনার গুরুত্ব এমনিতেই কমে আসতে পারে।

এই পুরো ঘটনা থেকে রাশিয়ার জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ শেষ হলে আমেরিকা ও রাশিয়ার সম্পর্ক কেমন হতে পারে, তার একটি রূপরেখা এতে দেখা যাচ্ছে।

রাশিয়ার ওপর চাপানো হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা হয়তো কখনো পুরোপুরি উঠে যাবে না। আইন ও নীতিগত কারণে এগুলো তোলা খুবই জটিল। তবে আমেরিকা হাঁটবে এক বাস্তববাদী পথে। নিষেধাজ্ঞাগুলো কাগজে-কলমে ঠিকই থাকবে, কিন্তু প্রয়োগ করা হবে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী। যখন কোনো নিষেধাজ্ঞা আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থে আঘাত হানবে, তখন ওয়াশিংটন তা সাময়িক তুলে নেবে, আবার কাজ শেষে তা ফিরিয়ে আনবে।

এখানেই আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের মূল পার্থক্য। ইউরোপীয় দেশগুলো নীতি ও প্রতিশ্রুতির জালে নিজেদের এমনভাবে বেঁধে ফেলে যে, সেখান থেকে পিছিয়ে আসা তাদের জন্য কঠিন। অন্যদিকে আমেরিকানরা পুরোটাই বাস্তববাদী; তারা চরম শক্তিতে নীতির কথা বলতে পারে, আবার দরকার পড়লে এক মুহূর্তেই তা বদলে ফেলতে পারে।

ইউক্রেন সংঘাত এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতির নতুন মানচিত্র তৈরি করছে। আর ট্রাম্পের এই চাল বুঝিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতি বলে কিছু নেই, দিনশেষে আসল বিষয় হলো নিজের স্বার্থ!

কিয়েভের পিঠে ট্রাম্পের ছুরি
কিয়েভের পিঠে ট্রাম্পের ছুরি