Thursday, July 10, 2025
স্বর্ণমন্দিরে অভিযান: থ্যাচারের ছক নিয়ে হামলা করেছিলেন ইন্দিরা? by কুলদীপ নায়ার
এখন জানা যাচ্ছে, ওই সময় একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্বর্ণমন্দির রেকি করেছিলেন এবং তিনিই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে স্বর্ণমন্দিরের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কায়দা-কানুন বাতলে দিয়েছিলেন। এখন বোঝা যাচ্ছে, সেখানে এভাবে সামরিক অভিযানের কোনো দরকার ছিল না এবং অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করেও ‘আকাল তখত্’ থেকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে উৎখাত করা যেত।
তবে ৩৪ বছর পরও ভারতের জনগণ জানতে পারেনি, ঠিক কোন কারণে সেখানে এমন রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়েছিল। এটা সত্যি যে ভিন্দ্রানওয়ালে ‘আকাল তখত্’সহ পুরো স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সকে ঘিরে ফেলে সেটিকে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেকে তিনি শিখ সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র অধিপতি ঘোষণা করেছিলেন এবং গোটা সম্প্রদায় তাঁর আদেশে চলত। সেখানে অভিযান শুরুর একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ট্যাংক ব্যবহার করে। আমার মনে আছে, সেনাবাহিনীর প্রথম দলটি পরিকল্পিত অভিযান শুরু করার পর মধ্যরাতে ইন্দিরা গান্ধীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়েছিল। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি হচ্ছিল।
এমনকি এখনো হারমন্দির সাহেবের দেয়ালে গুলির চিহ্ন দেখা যায়। শিখ সম্প্রদায় স্বর্ণমন্দিরকে তাদের ‘ভ্যাটিকান’ মনে করে। ফলে এখানে অভিযান পরিচালনা তাদের আহত করে। ব্রিটিশ সরকারের হাতে থাকা তথ্য প্রকাশ না করার কারণে এটা বোঝা শক্ত যে কেন বিকল্প কোনো উদ্যোগ না নিয়ে প্রথমেই হারমন্দির সাহেবে সেনা অভিযান চালানো হয়েছিল।
এই সেনা অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিখরা ব্যাপক বিক্ষোভ করে এবং এর কিছুদিন পর ভারতে শিখদের ওপর হামলার ঘটনায় তাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এ ঘটনার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে থাকা বহু শিখ বিদ্রোহ করেন। সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তার পদ থেকে বহু শিখ পদত্যাগ করেন। এর প্রতিবাদে অনেক শিখ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ও সম্মাননা ফিরিয়ে দিয়েছেন।
শিখ সম্প্রদায় যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন। ভুবনেশ্বরে এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, তাঁর মনে হচ্ছে তাঁকে হত্যা করা হবে। এর চার মাসের মাথায় নিজের শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে তিনি মারা যান। প্রতিশোধ হিসেবেই তাঁকে হত্যা করা হয় বলে মনে করা হয়। এখানেই ঘটনা থেমে থাকেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইন্দিরা হত্যার পর শিখবিরোধী দাঙ্গায় শুধু দিল্লিতেই তিন হাজারের বেশি শিখ নাগরিককে হত্যা করা হয়।
একটি পাঞ্জাবি গ্রুপ স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানোর বিষয়ে তদন্ত করতে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, এয়ার মার্শাল অর্জুন সিং এবং ইন্দর গুজরালের (যিনি পরে প্রধানমন্ত্রী হন) নেতৃত্বে একটি কমিটি করেছিল। আমি সেই কমিটির একটি অংশে ছিলাম। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম, স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের দরকার ছিল না এবং অন্য কোনোভাবেও ভিন্দ্রানওয়ালেকে সামাল দেওয়া যেত। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমা রাও।
আমরা সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গেলে তিনি আমাদের বিষয়ে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েন। সরকারের লোকজন ছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরাসহ বাকি সবাই আমাদের বলেছিলেন, সরকার স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি করেছিল।
ইন্দিরা হত্যার পর দিল্লিতে বেধে যাওয়া দাঙ্গা সহজেই দমন করা যেত। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ইচ্ছা করে পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীকে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। তিনি ওই দাঙ্গাকে মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, বিশাল বৃক্ষ মাটিতে পড়লে ভূমি কেঁপে উঠতে বাধ্য।
স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের তিন দশক পর প্রকাশ করা ব্রিটিশ নথিপত্র থেকে এখন জানা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্য সরকার শিখদের উপাসনালয়ে অভিযান চালাতে ভারতকে পরামর্শ দিয়েছিল। নতুন এই তথ্য লন্ডন ও দিল্লিতে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে। ব্রিটেন সরকার এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং বিজেপি এর ব্যাখ্যা দাবি করেছে।
তবে পাঞ্জাবে উগ্রপন্থী শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এবং অপারেশন ব্লু স্টারে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তারা কোনো ব্রিটিশ পরিকল্পনার সহায়তা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের জানামতে, এই অভিযান ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় হয়েছে। এখানে ব্রিটিশদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় মহাফেজখানা থেকে ৩০ বছর পর গোপন নথি প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি প্রকাশ করা ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির একটি নথির শিরোনাম ‘শিখ সম্প্রদায়’। ওই নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন একান্ত সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির থেকে উগ্রপন্থী শিখদের উৎখাত করতে সম্প্রতি ভারত সরকার ব্রিটিশ সরকারের পরামর্শ চেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে একজন এসএএস অফিসার ইতিমধ্যে ভারত পরিদর্শন করেছেন এবং একটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছেন, যেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনও করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ভারত খুব শিগগির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।’
ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, যদি ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা সরবরাহের কথা ফাঁস হয়, তাহলে ব্রিটেনে বসবাসরত ভারতীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে। তবে শেষ পর্যন্ত বি৶টিশদের সরবরাহ করা পরিকল্পনা মাফিকই স্বর্ণমন্দির অভিযান হয়েছিল কি না, সেটি নিশ্চিত করার মতো আর কোনো নথিপত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
আমি মনে করি, অপারেশন ব্লু স্টার-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথিপত্র প্রকাশ করা উচিত। কারণ, যতই দিন যাচ্ছে, ততই জনমনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে ওই অভিযান চালানো ঠিক হয়নি।
- আপডেট: ২২ মার্চ ২০১৮
- ইংরেজি থেকে অনূদিত।
* কুলদীপ নায়ার, ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
![]() |
| অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। ছবি: রয়টার্স |
Wednesday, October 28, 2015
গো-মাংস খাওয়া বেআইনি নয় by কুলদীপ নায়ার
সংঘ পরিবার মুসলমানদের সমর্থন লাভের ব্যাপারটা যদি সত্যিই তীব্রভাবে অনুভব করত, তাহলে তারা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিত। তারা মনে করে, প্রকৃত অর্থে দেশ পরিচালনায় মুসলমানদের ভূমিকা নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দিকেই লক্ষ করুন, সেখানে শুধু একজন মুসলমান মন্ত্রী রয়েছেন, তা-ও আবার অগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে।
সম্প্রতি ভারতে এক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, গরুর মাংস কি নিষিদ্ধ করা উচিত, নাকি উচিত নয়। যে দেশের হিন্দুদের সঙ্গে গরুর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে, সেখানে এই প্রশ্ন তোলাটাই ভুল। হিন্দুরা গরু পূজা করে। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষকে গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে মেরে ফেলা হবে কি না। আবার এই অভিযোগটাও তোলা হয়েছে মিথ্যা গুজবের ভিত্তিতে। ব্যাপারটা যেন এমন, হিন্দু চরমপন্থীরা সেই মানুষদের ধর্মবোধ কেমন হবে, তা নির্দেশ করা শুরু করেছে।
গরুর মাংস খাওয়া–বিষয়ক বিতর্কটা বেশি দিন চলেনি, এটা একরকম আশীর্বাদই বটে। এই আলোচনা সমাজকে বিভক্ত করেছে। হয়তো এই উপলব্ধি থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য হিন্দু-মুসলমানকে একত্র হতে হবে, তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করা চলবে না। তিনি এক সপ্তাহের মতো নিশ্চুপ ছিলেন, আর জনগণের চাপ না থাকলে হয়তো তিনি এই দ্ব্যর্থবোধক অবস্থান নিতেনও না। আর শেষমেশ তিনি যা বললেন তা এত ঈষদুষ্ণ যে মনে হয়েছে, তিনি স্রেফ অনুশীলন করছেন।
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে, সেটা আরও খারাপ ব্যাপার। তাদের মধ্যে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। মনে হয়, তারা উভয়ই নিজেদের জগতে বাস করে। এর মুখ্য কারণ হচ্ছে এই ক্রমেই গভীর হওয়া বিভাজন, সংঘ পরিবার উদ্দেশ্যমূলকভাবে যে বিভাজনের গোড়ায় পানি দিয়ে যাচ্ছে।
কয়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিকের আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এই ব্যাপারটি সামনে এসেছে, পুরস্কার ফেরত প্রদানকারীদের মধ্যে আছেন জওহরলাল নেহরুর ভাগনি নয়নতারা সেগাল। কর্তৃপক্ষকে দেওয়া চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, ভারতে বাক্স্বাধীনতার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। হ্যাঁ, তাঁরা ভারতীয় মূল্যবোধের কথাই বলেছেন। যে প্রজন্ম বাক্স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের আবহে বেড়ে উঠেছে, তাদের কাছে বিজেপির এই গেরুয়াকরণ গ্রহণযোগ্য হবে না।
দিল্লির কাছে দাদরিতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, সেখান থেকে সাবেক আরএসএস প্রচারক মোদির শিক্ষা নেওয়া উচিত। একজন মুসলমান গরুর মাংস খেয়েছেন—এই গুজবের ভিত্তিতে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যদি তা খেয়েও থাকেন, তাতেই বা কী, ভারতে তো এমন কোনো আইন নেই যে গরুর মাংস খাওয়া যাবে না। এটা ঠিক যে দু-তিনটি রাজ্য বাদে সব রাজ্যেই গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে আইন করা হয়নি।
মোদি যদি এখনো বুঝে না থাকেন, তাহলে তাঁর বোঝা উচিত, বহুত্ববাদ ভারতীয় সমাজের প্রাণ। সংঘ পরিবারের অনেক চরমপন্থী সেটা পছন্দ না-ও করতে পারে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক ভারতীয়ের কাছে ভারত হলো গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতার নামান্তর। সন্দেহ নেই, ভারতের অনেক ছোট ছোট জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠরা লাগামহীন হয়ে পড়েছে, তারা বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে। কিন্তু এটা ভারতের জন্য সার্বিকভাবে প্রযোজ্য নয়। ভারত সংখ্যালঘিষ্ঠদের মুক্তবাকে বিশ্বাস করে, তাদের এই অধিকার সে রক্ষাও করবে।
ওদিকে যাঁরা টিভির পর্দায় গরুর মাংস খাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধকে পুষ্ট করছেন না। ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসের কথা বুক চাপড়ে বলতে গিয়ে তাঁরা প্রকারান্তরে এর ক্ষতিই করছেন।
গুরুর মাংস খেয়েছেন—এই গুজবের ভিত্তিতে মোহাম্মদ ইকলাখকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে খুন করা হয়েছে, এ ঘটনাটির প্রতি জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকা উচিত। সেটা সত্যি হলেও এ প্রশ্ন উঠবে: কোনো মানুষ গো-মাংস খেলেই কি তাঁকে খুন করতে হবে? ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের দিকনির্দেশনামূলক নীতিতে বলা হয়েছে, ‘রাজ্যগুলোকে কৃষি ও প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, আর বিশেষ করে, প্রজাতির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে, গরু, বাছুর, অন্যান্য দুগ্ধদাত্রী প্রাণী ও মালবাহী পশু হত্যা নিষিদ্ধ করতে হবে।’
গো-মাংসের বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা হয়েছে। আদালত রায়ে বলেছেন, কেউ গো-মাংস খাবেন কি খাবেন না, সেটা তাঁর একান্ত নিজস্ব ব্যাপার, আর তিনি তা খেলে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হবেন না।
আসল কথা হলো, হিন্দু চরমপন্থীরা নির্বাচনকে সামনে রেখে গো-মাংসের ভিত্তিতে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়েছে। একইভাবে মহারাষ্ট্রভিত্তিক হিন্দু চরমপন্থী সংগঠন শিবসেনার কারণে রাজ্যটির বদনাম হয়েছে। শিবসেনা শুধু ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোরই মানহানি করেনি, সে ভারতের মুখে কালি লেপ্টে দিয়েছে। শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরে বুঝতে পেরেছেন, সহিংসতা করে লাভ নেই। তিনি এর নিন্দাও করেছেন। ফলে শিবসেনা কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, আর মুখ্যমন্ত্রীর পদের জন্য নিজেদের মানুষকে মনোনীত করেছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও শিবসেনার তরুণ তুর্কিরা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পছন্দ করেন না। শিবসেনা বিজেপি ঘরানার মানুষ ও সম্মানিত সাংবাদিক সুরিন্দর কুলকার্নির মুখে কালি মেখে দিয়েছে, তারা এখন এভাবেই কাজ করে। এই ঘটনার পর যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সংঘ পরিবারের বোঝা উচিত, ভারতের আত্মায় ধর্মনিরপেক্ষতার অধিষ্ঠান।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।
Monday, September 28, 2015
আরএসএসের ছায়ায় বিজেপি by কুলদীপ নায়ার
বিজেপি আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখতে চায়। কারণ, তারা বোঝে, গড়পড়তা ভারতীয়দের মধ্যে আরএসএসের গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই প্রশ্নের কারণেই জনতা পার্টি ভেঙে গেছে। বিজেপির পূর্ববর্তী রূপ জন সংঘ জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগে আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার অঙ্গীকার করেছিল। তারা গান্ধীবাদী জয়প্রকাশ নারায়ণকে কথা দিয়েছিল, জনতা পার্টিতে ঠাঁই পেলে তারা আরএসএসের সঙ্গ ত্যাগ করবে। কিন্তু বাস্তবে এই সম্পর্ক ত্যাগের ব্যাপারটা ঘটেনি, তারা জয়প্রকাশ নারায়ণের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল।
মনে পড়ে, আমি জয়প্রকাশ নারায়ণকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কেন আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ না করা সত্ত্বেও জন সংঘকে জনতা পার্টিতে স্থান দিয়েছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, জন সংঘ কথা না রেখে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছিল।
এট নিশ্চয়ই সত্য হবে, কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় জন সংঘ ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি পেয়েছিল। জয়প্রকাশ যে গুরুতর ভুল করেছিলেন, তার জন্য জাতিকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে, আর গতকালের জন সংঘ আজ বিজেপি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে কংগ্রেসের লাভবান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পরিবারতন্ত্র নিয়ে দলটির আচ্ছন্নতা এবং রাহুলকে নিজের উত্তরসূরি বানানোর ব্যাপারে সোনিয়া গান্ধীর পীড়াপীড়ির কারণে তারা এ সুযোগ হারিয়েছে। মুসলমানরা দলটির নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাংক ছিল, দলটি তাদের হারিয়েছে। সমাজ এখন আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছে, এমনকি ওয়াসিকে সমর্থন করার চিন্তাও নাড়াচাড়া করছে। ওয়াসি নিজেকে মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন, ঠিক যেমন দেশভাগের আগে মুসলিম লীগ চেষ্টা করেছিল। সমাজ সংকীর্ণ রাজনীতির কাছে ফেরত যেতে চায় না।
যা হোক, টেলিভিশনের পর্দায় যখন লোকে দেখল আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগওয়াতের সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের মন্ত্রীদের হাজির করেছেন, তখন বোঝা গেল, নেতা কে। এটা সত্য যে ভোটাররা মোদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি কখনো বলেননি, দেশশাসনের বেলায় আরএসএসও তাদের সঙ্গে থাকবে।
সত্য হলো, নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদি সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের আশ্বস্ত করেছিলেন, ইতিপূর্বে পার্টির অবস্থান যা হোক না কেন, নতুন স্লোগান হবে, সব ক্যা সাথ, সব ক্যা বিকাশ। কিছু জনসভায় তিনি একটু ভিন্নপথে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি মুসলমানদের সবচেয়ে ভালো রক্ষক হবেন।
স্বাধীনতাসংগ্রামের ও বহুত্ববাদের দর্শনের প্রতি আবেগের ঘাটতি দেখে মনোবেদনা সৃষ্টি হয়। এমনকি আধুনিক ভারতের স্থপতি জওহরলাল নেহরুর নাম পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে
সত্যি কথা বলতে, এখন পর্যন্ত তাঁর কাজের মধ্যে বৈষম্যমূলক কিছু দেখা যায়নি। যদিও এটা দৃশ্যমান যে আরএসএস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গেরুয়াকরণ করছে আর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের লোক বসাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মোদি খুব ধীরগতিতে ও অবিশ্রান্তভাবে আরএসএসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। এটাও পরিষ্কার যে শাসনব্যবস্থায় মুসলমানদের ভূমিকা আর নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মাত্র একজন মুসলমান মন্ত্রী আছেন, তা-ও আবার গুরুত্বহীন মন্ত্রণালয়ে। তা ছাড়া, সরকারের ভেতরে ও বাইরে এমন ধারণা আছে যে শাসনব্যবস্থায় একরকম মৃদু হিন্দুত্ব কায়েম হয়েছে।
আরএসএসের লক্ষ্য হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, সেটা হয়তো এখন দূর অস্ত মনে হতে পারে। কিন্তু মোদির হাতে এখনো সাড়ে তিন বছর সময় রয়েছে। তিনি ও আরএসএস-প্রধান এখন প্রায়ই জনসমক্ষে মিলিত হচ্ছেন। তাঁদের কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা নাগপুরে আরএসএস সদর দপ্তরে প্রণীত পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করে যাচ্ছেন। বিজেপি ও তার ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের স্বাধীন চিন্তা নেই, তারা শুধু নাগপুরে রচিত পাণ্ডুলিপি পাঠ করে, আর কিছু নয়।
এর আবার নানা রকম বহিঃপ্রকাশ আছে। কখনো কখনো সেটা মাংসের ওপর নিষেধাজ্ঞা রূপে হাজির হয়, কখনো পোশাক বিধান এবং কখনো বিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষা ও কখনো সেখানকার অ্যাসেম্বলিতে সকালের বিশেষ প্রার্থনা বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটে। দিল্লির নেহরু স্মৃতি জাদুঘর সংস্কার করার সিদ্ধান্তও এর একটি অংশ। ব্রিটিশ তাড়ানোর আন্দোলনে যেখানে আরএসএসের টিকিটি পর্যন্ত দেখা যায়নি, সেখানে এখন তারা সব স্থান দখল ও নিজেদের স্বাধীনতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রদর্শন করতে চায়।
স্বাধীনতাসংগ্রামের ও বহুত্ববাদের দর্শনের প্রতি আবেগের ঘাটতি দেখে মনোবেদনা সৃষ্টি হয়। এমনকি আধুনিক ভারতের স্থপতি জওহরলাল নেহরুর নাম পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেমন এরা নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর ছবি ডাকটিকিট থেকে মুছে ফেলছে। শিক্ষা খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরা ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছে, পাঠ্যবই নতুন করে লিখছে। সেখানে স্বাধীনতাসংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ভূমিকা খাটো করা হচ্ছে। ফলে এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো যে নেতারা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের নাম আর তেমন একটা উচ্চারণ করা হয় না।
আসল ব্যাপারটা বোধগম্য, স্বাধীনতাসংগ্রামের কথা বললে আরএসএস ও তার সদস্য বিজেপি ও বজরঙ্গি দল বিচ্ছিন্ন বোধ করে। কিন্তু স্বাধীনতাসংগ্রামকে খাটো করা তাদের উচিত হবে না, সেটা আগামী প্রজন্মের জন্য বড় রকম ক্ষতির কারণ হবে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে স্বাধীনতাসংগ্রাম, আর তার জন্য যে অসংখ্য মানুষ ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই মানুষেরা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।
Sunday, August 16, 2015
জনপ্রতিনিধিদের বেতন কত মানুষের তা জানা উচিত by কুলদীপ নায়ার
আরেকবার পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত আমাদের নিজেদের মুখ আয়নায় দেখতে বাধ্য করেছে। এক যুগান্তকারী রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, প্রাসাদসম রাষ্ট্রপতির বাসভবন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও বিভিন্ন গভর্নর হাউসের ‘বিপুল খরচ’ এবং সেখানকার বাসিন্দাদের অসংযমী জীবনযাপনের খরচ ও সরকারি কর্মচারীরা যে ভাতা পান, তা ‘সরকারি নীতির’ ব্যাপার, এর সঙ্গে ‘রাজনৈতিক প্রশ্ন’ জড়িত।
ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে এই রায় কতটা বিপ্লবী? পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ‘যে দেশ ঋণভারে জর্জরিত, যেখানে জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যারা মৌলিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পায় না, সেখানে এমন বিপুল খরচ শুধু নবীর সাধারণ জীবনযাপনের নীতিরই বিরোধিতা নয়, এটা জনগণের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।’
একই ধরনের কথা বলেছিলেন মহাত্মা গান্ধীও। স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, তাদের ট্রাস্টির মতো আচরণ করা উচিত, মনিবের মতো নয়। তিনি চাইতেন, তাদের বেতন যেন একজন সাধারণ মানুষের গড় বেতনের চেয়ে খুব বেশি না হয়। এমপি, এমএলএ ও পৌরসভার নির্বাচিত শীর্ষ ব্যক্তিরা এটা খুব একটা স্বীকার করতে চান না। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, জনসম্পত্তি আসলে ‘সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত ট্রাস্টের মতো’, এই সত্য এড়ানোর জো আমাদের নেই।
নির্বাচিত ব্যক্তিদের একীভূত বেতন দেওয়া উচিত, যার মধ্যে সব খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মধ্যে থাকবে আবাসন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন প্রভৃতি। এতে মানুষ জানতে পারবে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পেছনে সরকারের রাজস্ব ব্যয় কত আমি আশা করেছিলাম, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে চিরটাকাল ধরেই নিজেদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি করেন, সে ব্যাপারে আদালত কিছু বলবেন। কিন্তু এটার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশ্ন জড়িত, সেই বিবেচনায় তাঁরা সেটা করেননি। প্রায়োগিক কৌশলগত দিক থেকে আদালত সঠিক। কিন্তু এ বিষয়ে বিচারকদের মতামত সহায়ক হতো, কারণ এতে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের সহযোগীদের অপরিমিতি ব্যয় নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করতে পারত, আর সমাজে এখনো বিচার বিভাগের মর্যাদা আছে।
এমনকি তাঁদের জীবনযাপনের সঙ্গে উন্নত পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতিকদের জীবনযাপনের মিল নেই। তাঁদের কে বলবে, তাঁরা ইতিমধ্যে উচ্চ আয়ের কোঠাতেই আছেন? গণমাধ্যম একসময় সে কাজ করত। কিন্তু আজ গণমাধ্যমের মালিক ও করপোরেট খাতের ব্যক্তিরা খবরের শিরোনাম কী হবে শুধু তার তদারকিই করেন না, ক্ষেত্রবিশেষে নির্দেশও দেন, আর পত্রিকায় কী ছাপা হবে, সেই খবরদারি তো আছেই। তাঁদের ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার ও সংস্কারের কারণে গণমাধ্যমের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এটা খুবই বেদনাদায়ক বিষয়। কিন্তু এর চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি এখনো বেরোয়নি, এমনকি পশ্চিমেও নয়, যেখানকার গণমাধ্যম আমাদের চেয়ে উন্নত।
প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া তৈরি করা হয়েছিল সাংবাদিকতার উচ্চ মান সৃষ্টির জন্য। কিন্তু তারা এখন সাংবাদিকদের কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না, সেই তরিকা বাতলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ১ নম্বর হতে গিয়ে হারিয়ে গেছে। এই কাউন্সিলের একজন সাবেক সদস্য হিসেবে আমার মনে আছে, প্রেস সেন্সরশিপের সেই যুগে কাউন্সিলের তৎকালীন চেয়ারম্যান, একজন সাবেক বিচারপতি, সরকারের অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ভি সি শুকলাকে লিখেছিলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্যকে সেন্সরশিপের সমালোচনা করে প্রস্তাব পাস করানো থেকে তিনি নিবৃত্ত করতে পেরেছেন।
জরুরি অবস্থার একদম চূড়ান্ত সময়েও জনতা সরকার এই মনোভাব হাইলাইট করতে এক শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর যখন সেই কাজ করলেন, তখন তাঁর দিকে আঙুল তোলার মতো একটি মানুষও গণমাধ্যম ও কাউন্সিলে ছিল না। এমনকি এখন কাউন্সিলে সম্পাদক ও কর্মরত সাংবাদিকদের নেওয়ার জন্য এটি পুনর্গঠন করা হলেও তেমন কোনো পার্থক্য আসেনি।
সম্ভবত যুক্তরাজ্যের মতো ভারতেও প্রেস কাউন্সিলের জায়গায় অন্য কোনো প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করতে হবে। সেখানেও দেখা গিয়েছিল প্রেস কাউন্সিলের দম ফুরিয়ে গেছে। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে প্রেস কাউন্সিলের জায়গায় প্রেস কমপ্লেইন্টস কাউন্সিল (পিসিসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানকার গণমাধ্যমের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না, কিন্তু সরকার বা গণমাধ্যমের কেউই নতুন কিছু ভাবেনি। ব্যাপারটা আসলে সেখানেই। স্বীকার করছি, ভারতে আবার নতুন করে সেন্সর আরোপ হবে না। তারপরও প্রেস কাউন্সিলকে আরও উদ্দেশ্যমুখী করতে সেটাকে নতুন করে গড়তে হবে। তা না হলে সেটা হবে স্রেফ কাগুজে কার্যালয়।
আমি সাবেক স্পিকার সোমনাথ চ্যাটার্জির পরামর্শের সঙ্গে একমত, সাংসদদের বেতন-ভাতা নির্ধারণে একটি স্বাধীন পে-কমিশন গঠন করা উচিত। সন্দেহ নেই, জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের আরও বেশি বেতন দেওয়া উচিত। কিন্তু কতটা বাড়ানো হবে, সেটা নির্ধারণের জন্য যথোচিত সমীক্ষা করা উচিত। চ্যাটার্জির কথা প্রশংসার দাবিদার। সাংসদেরা নিজেদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারেন না।
একইভাবে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বেতন-ভাতার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। বর্তমানে কেরালার সাংসদদের, যাঁরা মন্ত্রী নন, বেতন হচ্ছে ২১ হাজার ৩০০ রুপি, আর দিল্লির সাংসদ পান ৫০ হাজার রুপি, পাঞ্জাবের সাংসদ পান ৫৪ হাজার ৫০০ রুপি। কেরালার এমএলএর বেতন-ভাতা ভেঙে দেখালে তা এ রকম দাঁড়ায়: বেতন ৩ হাজার রুপি, নির্বাচনী এলাকার ভাতা ৪ হাজার রুপি, টেলিফোন বিল ৬ হাজার রুপি, জ্বালানি, রেলের কুপন ও স্থায়ী যোগাযোগ ভাতা ৭ হাজার ৫০০ রুপি।
নির্বাচিত ব্যক্তিদের একীভূত বেতন দেওয়া উচিত, যার মধ্যে সব খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মধ্যে থাকবে আবাসন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন প্রভৃতি। এতে মানুষ জানতে পারবে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পেছনে সরকারের রাজস্ব ব্যয় কত। বেতন নানা খাতে দেওয়া হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। আবার প্রদেশ ও কেন্দ্রের জন্য একই মানদণ্ড থাকা ভালো। আর তখনই জাতি জানতে পারবে, মহাত্মা গান্ধী যে জনপ্রতিনিধিদের ট্রাস্টি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেটা কতটা অনুসৃত হচ্ছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Saturday, August 8, 2015
বহুত্ববাদই কাশ্মীরের জন্য সর্বোত্তম পন্থা by কুলদীপ নায়ার
তখন যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার পবিত্রতা ছিল, ভিন্ন চিন্তার মানুষ তা ভঙ্গ করতে পারেন না। এমনকি কাশ্মীর তার স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে কোনো আপস করবে না, সেটা পরিষ্কার করার জন্য তারা নিজেদের রাজ্যের জন্য আলাদা সংবিধানও প্রণয়ন করেছিল। এখন সেই স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করা মানে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ নয়াদিল্লির ওপর যে আস্থা স্থাপন করেছিল, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। কোনো পরিবর্তন করতে গেলে সেটা তাদেরই করতে হবে। রাজ্যটি ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল। এখন ভারতীয় ইউনিয়ন কাশ্মীর-বিষয়ক তার ক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে চাইলে রাজ্যের মানুষের সম্মতি ছাড়া তারা সেটা করতে পারে না।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধের দায় তৎকালীন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর বর্তানো হয়। এটা সঠিক। কারণ, তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, তিনি শান্তি বিঘ্নিত করতে চাননি | আর এই অবস্থানের জন্য তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলেও তিনি নিজের অবস্থান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধে যেতে হয়।
ভুট্টোকে এ ব্যাপারে আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজের ভূমিকার কথা অস্বীকার করেননি। আত্মরক্ষায় তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, তিনি ভেবেছিলেন, ভারতকে পরাজিত করতে সেটাই ছিল পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সময়। তিনি বলেছিলেন, ভারতের তখন হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি ছিল, আর ‘মার্কিন সামরিক সহায়তার কারণে আমরা তখন এ ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম।’
পাকিস্তানের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা লে. কর্নেল বারনার্ড ই অ্যান্ডারসন। তিনি টাইমকে লেখা এক চিঠিতে ১৯৬৫ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন, ‘এপ্রিলে আমি পাকিস্তান থেকে ফিরে আসি। আমরা সবাই জানতাম, সামনে এক যুদ্ধ হতে যাচ্ছে: পাকিস্তানিরা গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্টগুলো যুদ্ধের ধূসর রঙে সাজাচ্ছিল, যদিও এগুলোর মূল রং ছিল হলুদ। আর তারা তাদের বিমানের জন্য সংরক্ষণ দেয়াল বানাচ্ছিল।’
১৯৬৫ সালে সেই যুদ্ধে পাকিস্তান আক্রমণ শুরু করে শত শত মুজাহিদকে কাশ্মীরে ঢুকিয়ে দিয়ে। ভারতীয় গণমাধ্যমে এই অনুপ্রবেশের খবর প্রথম ছাপা হয় ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট। একই দিনে এই খবরও আসে যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সে দেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার কেওয়াল সিংয়ের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন। আর সে অনুষ্ঠানে তিনি এও বলেন, ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পাকিস্তান ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় একই পদক্ষেপ নেবে। কাশ্মীরে সেই অনুপ্রবেশের ঘটনাকে জায়েজ করতে তিনি এও বলেন, কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ আর ভারতের অনুপ্রবেশ একই ব্যাপার নয়। স্থানীয় কাশ্মীরিরা অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তা না করায় পাকিস্তান যে ‘বিদ্রোহ’ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, সেটা তারা করতে পারেনি। ফলে রেগেমেগে ভুট্টো অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে তাদের শ্রমিক বলে ভর্ৎসনা করেছিলেন।
আমি যখন ভুট্টোর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘একসময় সামরিক সহায়তা পাওয়ার কারণে বড় আক্রমণ করা ও অস্ত্রভান্ডারের সাপেক্ষে আমরা ভারতীয়দের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সে অবস্থা বজায় ছিল। আর এখন কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমাদের দোষ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে এটা জরুরি, আর সেটা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান না হওয়ায় আমাদের দোষারোপ করা হচ্ছে।
‘ফলে দেশাত্মবোধের প্রজ্ঞা থেকে এটা বলা ভালো, আসুন সমস্যা মিটিয়ে ফেলি, মতৈক্যে আসি, মীমাংসা করি। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার। সে কারণে যেহেতু ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমরা ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম, সেহেতু ভেবেছিলাম, এই কথা বলে তা নৈতিকভাবে জায়েজ করা যাবে। আর ভারত আত্মনিয়ন্ত্রণে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল, সেই পরিস্থিতি ছিল, তাই তেমন ভাবনা আমাদের মাথায় এসেছিল। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। আমি জানি, সেই পরিস্থিতি নেই। অন্য কারও চেয়ে আমি ভালো জানি, সেই পরিস্থিতি নেই, আর ভবিষ্যতে কোনো দিন তা আর আসবেও না।’
১৯৬৫ সালের এই যুদ্ধই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। তার আগ পর্যন্ত দেশ দুটির মধ্যে দূরত্ব ছিল, কিন্তু বৈরিতা ছিল না। আটারি-ওয়াগা সীমান্তে বড় যুদ্ধফটক নির্মাণ করা হয়। এর ফলে ভিসাব্যবস্থা আরও কঠিন করা হয়, এমনকি সীমান্তে যে সীমিত পরিসরে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য হতো, সেটাও বন্ধ হয়ে যায়।
যারা ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করতে আন্দোলন করছে, তারা বুঝতে পারছে না, এর ফলে কাশ্মীরের ভারতে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নটি আবার নতুন করে উঠবে। জম্মু ও কাশ্মীরের গণপরিষদ এই বিশেষ মর্যাদার ভিত্তিতেই এটি অনুমোদন করেছিল। কোনো সংশোধনী আনতে হলে সেটা রাজ্যের গণপরিষদকেই আনতে হবে। রাজ্যসভা বা লোকসভা—কেউই গণপরিষদের ক্ষমতা জবরদখল করতে পারে না। এখন নয়াদিল্লি কি আরেকটি গণপরিষদ গঠন করে রাজ্যটির মর্যাদাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে আগ্রহী, যেটা আবার অবৈধও বটে?
এর মধ্যে কাশ্মীরিদের মধ্যে ভিন্ন চিন্তার উদ্রেক হয়েছে। তারা চায় না ভারত বা পাকিস্তান কেউ তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা হোক। তারা কোনটার উপযোগী, সেটা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়। মৌলবাদীরা সেখানে শক্তিশালী হলেও কাশ্মীরের জনগণ চায়, সেখানকার পণ্ডিতেরাও তাদের সংস্কৃতির অংশ হোক, যেটা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছিল।
জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ মধ্যপথ ধরেছেন। তিনি হিন্দু-অধ্যুষিত জম্মুকে রাজ্য পরিচালনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় তিনি মুসলমান-অধ্যুষিত কাশ্মীর ও হিন্দু-অধ্যুষিত জম্মুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন।
শেখ আবদুল্লাহর মতো বড় নেতা লাদাখসহ পুরো রাজ্যের সমর্থন পেতে তা করতে পারতেন। আজকের পাতিনেতারা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে শান্ত করার সূত্র খুঁজতে পারেন, কিন্তু একসময় যে বহুত্ববাদী পরিবেশ সেখানে ছিল, সেটা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা তাদের নেই। কাশ্মীর উপত্যকায় মুসলিম মৌলবাদ শক্তিশালী হয়েছে, আর জম্মুতে হয়েছে হিন্দু মৌলবাদ। এর কারণ হচ্ছে, সুফি আদর্শ দূষিত হয়ে গেছে।
ভারতের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার আগে শেখ তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেশটির নাড়ি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এরপর তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, বহুত্ববাদই তাঁর দেশের জনগণের জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা। তিনি নাকি আবার এ কথাও বলেছিলেন, পাকিস্তানে মুসলমানরা সংখ্যায় অনেক বেশি, সে কারণে তিনি সেই দেশটিকে পছন্দ করেন না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Monday, July 27, 2015
স্বাধীনতার চেতনা ফিরিয়ে আনতে হবে by কুলদীপ নায়ার
![]() |
| সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার |
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Monday, June 15, 2015
কূলদীপ নায়ারের চোখে মোদির ঢাকা সফর
ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরটি হয়েছে অসময়ে। দেখে মনে হয়েছিল তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পড়তি ইমেজ ঠেকাতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। তিনি সেখানে কেবল ভারতবিরোধী অনুভূতিকেই আরও তীব্রতর করে তুলেছেন। কেননা, নয়া দিল্লিকে নিরপেক্ষ হিসেবে মনে হয়নি।
আমি জানি না কেন, এবং কতদিন ধরে আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। এটা সত্য যে, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করেছেন। কিন্তু এ পরিচয়ের কারণেই হাসিনা সংবিধান ও প্রচলিত নিয়মনীতিকে অবজ্ঞা করার অধিকার পেতে পারেন না।
একটি উদাহরণ দেখুন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। শাসক দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক হারে বাক্সে ব্যালট পেপার ঢোকানো হয়েছে। ভোটার ও অন্যদের কাছে চিত্রটি ভয়াবহ হয়ে ধরা দেয়। শেখ মুজিব নিশ্চিতভাবে তার কবরে ঘুমিয়ে পড়ছেন। তিনি রাওয়ালপিন্ডির সামরিক জান্তা শাসকদের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মপ্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ক্রমবর্ধমান মৌলবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ অক্ষকে শক্তি জুগিয়েছে ঢাকায় মোদির সফর। কিন্তু হাসিনা এরপরও নিজের জন্য কোন না কোন উপায় খুঁজে বের করতেনই। প্রকৃতপক্ষে, যে দাম্ভিক উপায়ে নিজের চারপাশের ভিন্নমত তিনি দমন করেছেন, তাতে তার ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সন্দেহ জন্মে। মুক্ত রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক পথে শাসনের প্রতি কি তার কখনই দৃঢ় আস্থা ছিল?
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হচ্ছে, তিনি যে উপায়ে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনকে অপদস্থ করেছেন, সেটি। কামাল হোসেন তার বাবা শেখ মুজিবের একজন সহকর্মী। সারা জীবন ধরে নীতি আঁকড়ে থাকার কারণে তিনি একজন কিংবদন্তি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচন বর্জন করাটা ছিল একটি হঠকারী কাজ। তবে এটিও সত্য যে, হাসিনা এটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নির্বাচনে জেতার জন্য তিনি যে কোন কিছু করতে পারেন। তারপরও, বিএনপি যদি অংশগ্রহণ করতো, তাহলে এর সামান্য কয়েকজন প্রার্থী হলেও জিতে আসতো। এর ফলে মানুষের সামনে হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা তারা করতে পারতো।
নিঃসন্দেহে, সাধারণ নির্বাচন শাসকদের ভাগ্য নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা, এর মাধ্যমে যাচাই করা যেত, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যেসব প্রতিশ্রুতি শাসক দল দিয়েছে, তা তারা পূরণ করতে পেরেছে কিনা।
ভারত অনেক ভাগ্যবান। কারণ, যেভাবে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেশকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ করে গেছেন, তা এখনও কায়মনোবাক্যে অনুসরণ করা হয়। কিন্তু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী গণতন্ত্রকে কক্ষচ্যুত করেছিলেন। তিনি কেবল গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধই করেননি, অনেক মৌলিক অধিকারকেও বাতিল করেছিলেন। কিন্তু মানুষ বিষয়গুলোকে ভালভাবে নেয়নি। নির্বাচনে মানুষ নিজেদের দমিত ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিল। এটা অভাবনীয় ছিল যে, এমনকি মহান ইন্দিরা গান্ধীও পরাজিত হতে পারেন!
১৯৮০ সালের দিকে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তিনি স্রেফ দায়িত্ব পালনকারী আমলাদেরও শাস্তি দেয়ার পথ বের করে নিয়েছিলেন। এটা দুঃখজনক যে, পূর্বের জনতা সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিল বলে যাকেই সন্দেহ করেছিলেন তিনি, তার বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নেয়া হয়েছিল। জরুরি অবস্থার রচয়িতা ভারতের কংগ্রেস পার্টি শেষ পর্যন্ত শিক্ষা পেয়েছিল। দলটি নিজেদের কুকর্ম নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু দলটি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছে তা দেখাই আমার স্বপ্ন। কারণ, দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে।
শাসনের প্রতি গণমানুষের কিছু একটা বলার অধিকার থেকে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশটি মত প্রকাশের প্রাণশক্তি হারিয়েছে। অথচ এটি এক সময় এ জাতির ছিল। এটিই স্বয়ং একটি অবনমন। কিন্তু এটা আরও মর্মভেদী একটি বিষয় যে, এ পরিবর্তনটা করছে এমন এক পরিবার, যারা পশ্চিম পাকিস্তানের নিষ্ঠুরতা থেকে জাতিকে মুক্ত করেছিল।
এর জন্য হাসিনা ছাড়া কাউকে দায়ী করার নেই। তিনি নিজেই গণতন্ত্রের অগ্নিশিখাকে নিভিয়ে ফেলছেন। শেখ মুজিবের কন্যা এমনটি করছেন- এটা কেবল হতাশাজনকই নয়, অপ্রতিভ একটি বিষয়। তিনি জাতিকে শিকল পরাতে পারেন, এমন ভাবনাটাও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু এটা হতে পারে। কেননা, তিনি সঠিক ও ভুল এবং নৈতিক ও অনৈতিকের মধ্যের রেখাটি মুছে ফেলেছেন।
হাসিনা স্বৈরশাসকের প্রতিচ্ছবির প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ অবস্থার মধ্যে মোদির সফরটি ছিল সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্যজনক। তার উচিত ছিল বাংলাদেশের কোথাও বলা যে, এ দেশটি বিপ্লব থেকে সৃষ্ট। তাই দেশটির উচিত সে ধরনের ভাবনার দীপ্তি ছড়ানো অব্যাহত রাখা। কিন্তু তিনি বরং হাসিনাকে আশ্বস্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ হতাশ। কেননা, মানুষ তার কাছে এমন কিছু লক্ষণ প্রত্যাশা করছিল, যাতে মনে হয়, হাসিনা যেভাবে দেশ চালাচ্ছেন, তাতে ভারত খুশি নয়।
এটা সত্য যে, মোদি ছিটমহল বিনিময়ের ব্যাপারে দীর্ঘদিনের ঝুলন্ত একটি চুক্তি বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছেন। এ চুক্তিটি নিয়ে যখন সংসদে আলোচনা করা হয়, তখন এর পক্ষে সব দলের সমর্থন ছিল। তবে অবশ্যই, চুক্তিটি বাস্তবায়নের কৃতিত্ব তার। পাশাপাশি উপকারী ও চমৎকার প্রতিবেশীর সঙ্গে চুক্তিটিতে সমর্থন দেয়ায় সব রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত ছিল তার। তার জন্য ‘বার্লিন ওয়াল’ পতনের কৃতিত্ব নেয়াটা অভদ্রতাসুলভ।
মোদি পাকিস্তানের সমালোচনা থেকে দূরে থাকবেন, এটাই আমি প্রত্যাশা করি। এর মানে এই নয় যে, সমালোচনাটা অযৌক্তিক। কিন্তু তিনি যখন বিদেশের মাটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় সৌহার্দ্যরে কথা বলছেন, তখন ইসলামাবাদকে সমালোচনা করা এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তার উপলব্ধি করা উচিত, যেমনটি তার পূর্বসূরিরা করেছেন, একদিন অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বাজার থাকবে। একদিন ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের মানুষ তিস্তার পানি নিয়ে একটি চুক্তির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের মন্তব্যটি সহায়ক ছিল না। কারণ, মোদির ঢাকা যাত্রা শুরুর আগেই সুষমা জানিয়ে দেন, সফরের আলোচ্যসূচিতে তিস্তা নেই। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরে অংশ নেয়াটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এ থেকে ঢাকার ইঙ্গিত পাওয়া উচিত যে, তিস্তা সমস্যার সমাধানের বিষয়টি নয়া দিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। মোদির সফরে যেহেতু চুক্তিটি হয়নি, এর মানে এটি ধরে নেয়া উচিত নয় যে, ভারত নিজের অবস্থান বদলাতে রাজি নয়। প্রকৃতপক্ষে, মোদির সফর থেকে ঢাকার এ বার্তা নেয়া উচিত, প্রক্রিয়া যেহেতু শুরু হয়েছে, সমাধান হতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে।
Saturday, June 6, 2015
ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজই ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্য by কুলদীপ নায়ার
স্বাধীনতার পর সংবিধান সভা-শাসনের নানা পন্থা নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু সমাজের সব পক্ষই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষাবলম্বন করেছে। সেটা ছুড়ে ফেলে দেওয়া মানে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনে যাঁরা অনেক ত্যাগ করেছেন, তাঁদের সেই ত্যাগের সঙ্গে মশকরা করা।
অভিযোগ আছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যে দাঙ্গায় কয়েক হাজার মুসলমান মারা যায়। তিনি নিজেও ধর্মের ভিত্তিতে সমাজকে ভাগের অসারতা বুঝতে পেরেছেন। এটা খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি যে মোদি নিজেই এখন জনসমক্ষে বলেন: সবার সরকার, সবার উন্নয়ন।
আবার এটাও দুর্ভাগ্যজনক, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি এনজিওগুলোকে হয়রানি করছে, তাদের ডালকুত্তা দিয়ে তাড়া করছে। জনসংঘ ইন্দিরা গান্ধীর কর্তৃত্বপরায়ণ জামানাকে সফল রুখে দিয়ে জনতা পার্টির সঙ্গে একত্র হয়, তারা মানবাধিকার সমুন্নত রাখার সংগ্রামের অংশ ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সে সময় মানবতা পায়ে মাড়ানো শুরু করেছিল। আর সেই লোকগুলোই কীভাবে এখন এনজিওবিরোধী হয়ে উঠল?
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর হিসাব অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়মিত নিরীক্ষা করে। সব সরকারি তহবিল সরকারি চ্যানেলে আসত। ফলে তা নয়–ছয় করার সুযোগ ছিল খুবই কম। প্রক্রিয়া বদলানো মানে হয়রানি করা। প্রাক-সরকারি অনুমোদন মানে তহবিলের জন্য অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা, যেখানে সেই টাকাটা হয়তো কর্মীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।
আমার বিস্ময় লাগে, বিজেপি কীভাবে ভুলে গেল যে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত-প্রক্রিয়াকে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিরস্কার করেছিলেন? তৎকালীন জনসংঘের কর্মীদের কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি হচ্ছে জনসংঘের নতুন অবতার, যারা ব্যক্তির বাক ও স্বাধীনতার দাবির আন্দোলনে শামিল হয়েছিল।
বিজেপির কিছু সদস্য আগ-পিছ না ভেবেই এবং আরএসএসের প্রভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলে পড়ছে, ঘরে ফেরার নামে গির্জার ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে। মোদিকে কোনো না কোনো সময় রাশ টেনে ধরতেই হবে, তা না হলে ভারতের খুব বদনাম হয়ে যাবে। কারণ, বহির্বিশ্বে ভারত তার সহনশীলতা ও সহাবস্থানের জন্য খ্যাত।
আমার মনে আছে, লন্ডনে ভারতের হাইকমিশনার থাকাকালে এক ইহুদি প্রতিনিধিদল আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। তারা ভারতের সহনশীলতার জন্য ধন্যবাদ জানাতে এসেছিল। তারা বলেছিল, ভারতই একমাত্র দেশ, যেখানে ইহুদিরা কোনো রকম বৈষম্যের শিকার হয়নি। সে সময় পর্যন্ত নয়াদিল্লি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু তারা সেটা নিয়ে কথাই বলেনি।
অস্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে, রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা এত দিনে অনেক গভীরে প্রোথিত হওয়ার কথা থাকলেও সেটা হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৬৮ বছরে অর্থনৈতিকভাবে ভারতের যেমন উন্নতি লাভ করার কথা ছিল, তেমন উন্নতি সে অর্জন করেছে। সম্ভবত দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যেই এর উত্তর নিহিত রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামের পশ্চাৎপদতা আমাদের ব্যর্থতার পরিচায়ক। কিন্তু গ্রামগুলোই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। দেশের বিভিন্ন গ্রামে কৃষকদের আত্মহত্যার খবর দেখে বোঝা যায়, উৎপাদন তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। এমনকি নিরাপদ পানির মতো মৌলিক সুবিধাও তাঁদের কাছে গোলকধাঁধার মতো।
মহারাষ্ট্রের মতো সচ্ছল প্রদেশেও কৃষকেরা আত্মহত্যা করেছেন। গত মার্চ থেকে তিনিসহ নয়জন কৃষক আত্মহত্যা করলেন। অন্যান্য প্রদেশের খবর আরও নিদারুণ যন্ত্রণাকর। রাজস্থানের একজন কৃষক নয়াদিল্লির জনসভায় আত্মহত্যা করলে আমি ভেবেছিলাম, সবার টনক নড়বে, জাতি কৃষকের অবস্থার উন্নতিতে মনোযোগ দেবে। আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমি ভুল করেছিলাম।
ঠিক আছে, সংসদে এ নিয়ে বেশ শোরগোল তৈরি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদিও তাঁর দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তারপর যে লাউ, সেই কদু। কৃষকদের সবাই ভুলে গেল। কৃষকদের অবস্থা উন্নতিতে কোনো নীল নকশা প্রণয়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বস্তুত, ভূমি অধিগ্রহণ বিল সংসদে পেশ হওয়ার মাজেজা হচ্ছে, করপোরেট খাত তার পথেই হাঁটছে।
কৃষকদের ব্যাপারে চিন্তা করা অপরিহার্য হলেও তা এখন বাদ পড়ে গেছে। সেটা এখন দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছে। এমনকি সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধীদের মিছিলও সুদূর অতীতের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এটা বোধ হয় মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার হবে না যে দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ ভূমির ওপর নির্ভরশীল, যে ভূমি ক্রমেই খুনে জমিতে পরিণত হচ্ছে।
করপোরেট খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের মূল্যবোধের বিরোধী, যদিও তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। মহাত্মা গান্ধী গ্রামের মানুষকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ব্যস্ত শহর ছেড়ে ওয়ার্দার মতো নির্জন ছোট জায়গায় চলে গিয়েছিলেন, যেটা পরবর্তীকালে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়।
এনজিওগুলো মহাত্মা গান্ধীর শেষ না হওয়া কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার অভিযোগে যে ৯০০ এনজিওর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাদের আয় নিরীক্ষা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখা যে তাদের তহবিল তছরুপ হচ্ছে না। তারা তাদের হিসাব সংরক্ষণ করবে, এটা আশা করা ভুল নয়। কিন্তু একদম পইপই করে হিসাব চাওয়াটা একটু বেশি হয়ে যায়, কারণ এদের কর্মীরা তৃণমূলে দৈনন্দিন কাজে নিয়োজিত।
মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষ্যে, আর সমাজকেও তা ধরে রাখতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Wednesday, June 3, 2015
দেশ হিন্দু মুসলমান উভয়েরই by কুলদীপ নায়ার
তাঁর দোষ ছিল, তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশভাগের দাবি তোলা হয়েছিল ভুল ধারণার ভিত্তিতে, মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশভাগ ছাড়া আর কোনো উপায় যে নেই, এ ধারণা ভুল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পরও ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা কমতে পারে। তার ওপরে হিন্দুরা বলতে পারে, তোমরা তো নিজেদের ভাগ বুঝে নিয়েছ, এখন তোমরা পাকিস্তানে চলে যাও। ঠিক সেটাই তখন হয়েছিল।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি হতাশ হয়ে ফিরেছি, খুবই বিচলিত হয়েছি। কারণ, সেখানকার ছাত্ররা এখনো সমাজের মূলধারার সঙ্গে মেশেনি। আর বিচলিত হয়েছি, তারা এখনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কথা বলে।
সম্ভবত আলীগড়কে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হলে মুসলমানরা এ ভেবে যারপরনাই আনন্দিত হবে যে তাদের নিজস্ব পরিচয় আছে। উর্দুসহ মাঠের সব লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে মুসলমানদের জীবন নিরানন্দ হয়ে পড়েছে। মুসলমানরা যদি মনে করে, তাদের আলাদা পরিচয় আছে, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু ভারতে বসবাসকারী সব নাগরিকের প্রধান পরিচয় হচ্ছে, তারা ভারতীয়।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কনাহাট সার্কাসে গিয়ে নিজেই কয়েকজন লুটপাটকারীকে পিটিয়েছিলেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সম্ভবত বুঝতে পারেনি, ধর্মভিত্তিক পরিচয়ই ভারত ভাগের কারণ। দেশভাগের পর সেই রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। মুসলমানরা বিভাজনের রেখা টেনেছিল, তাদের এর জন্য ভুগতে হবে হয়তো। ভারতের ৮০ ভাগ হিন্দু জনগণ সেই পুরোনো রাজনীতির কাসুন্দি ঘাঁটবে না।
আমার মনে হয়, মুসলমানরা সামগ্রিকভাবে জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, তারা মূলধারার অংশ হতে চায়। সাম্প্রদায়িকতা কর্ষণ করার বিপদ তারা টের পেয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার দাঙ্গা শেষমেশ পুলিশ ও মুসলমানদের মধ্যকার দাঙ্গায় পরিণত হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা তা-ই হয়েছে।
![]() |
| ধর্মান্তকরণ শিবির আয়োজন করার ঘোষণা করল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) |
এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন কংগ্রেস প্যানেলের প্রতিবেদনটি আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। কিছুটা সাধারণীকরণের ফলে এর কার্যকারিতা কমে গেছে। সেটা ছাড়া ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের এই পর্যবেক্ষণ ঠিক যে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আরএসএসের ‘সহিংস আক্রমণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ এবং ‘ঘর ওয়াপসি’ আন্দোলনের সম্মুখীন হয়েছে।
এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এই প্রতিবেদনটি দাপ্তরিকভাবে বর্জন করা হয়েছে। দেশটিকে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা উচিত ছিল। এই ধারণায় সত্যতার কিছুটা উপাদান আছে যে গত কয়েক বছরে আমরা যে ভারসাম্য অর্জন করেছিলাম, মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছে। হিন্দুদের মধ্যে উন্নাসিকতা সৃষ্টি হয়েছে, আর মুসলমানদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
হ্যাঁ, এটা সত্য যে বন্ধনটা আলগা হলেও সেটা একবারে ভেঙে যায়নি। হয়তো দুই সম্প্রদায়কেই বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে হবে। তাদের মধ্যে একরকম বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়েছে, ফলে সংকটের সময় সেটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে, সময় সময় যখন সেই সংকট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আরএসএস–এর সঙ্গে সহিংসতা যুক্ত করেছে বা তার হুমকি যোগ করেছে। ফলে সেটা এই গল্পকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার পর এই সংগঠনটি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। সংগঠনটি এখন নতুন করে আবার তাদের নোংরা মাথা তুলেছে। এমনকি তারা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের ভাস্কর্যও স্থাপন করতে চায়। আবার এটাও ঠিক যে কংগ্রেস দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে পারেনি। কিন্তু দলটির আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ, আর ধর্মীয় শক্তিগুলো যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনো তারা প্রতিবাদ করে। আরেকটি ধারণা হচ্ছে, মোদির আমলে প্রশাসনের মধ্যেও সাম্প্রদায়িক ভাবধারা জেঁকে বসেছে।
মুসলমানদের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে, তা যতই অসম্ভব হোক না কেন। সম্ভবত উভয় সম্প্রদায়ই নিজেদের জগতে বাস করে। উভয়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে উত্তেজনা থিতিয়ে এসেছে বা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে বলা যায়।
এমনকি পাকিস্তানের প্রতি যে শত্রুতার মনোভাব ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ, সেটার মাত্রাও কমে এসেছে। ভারতের আমজনতা পাকিস্তানের আমজনতার প্রতি তাদের শুভকামনা কখনোই পরিত্যাগ করেনি। এমনকি সরকারও এই বিভাজনের অসাড়তা বুঝতে পেরেছে। ফলে তারা এক টেবিলে বসে আলোচনা করতে পারে।
ভারত ও পাকিস্তানের পাঞ্জাবিরা খুবই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। তারা এটা বোঝে না যে সুফি মতবাদ তাদের উভয়ের ধর্মেরই নির্যাস। পাকিস্তানের অভিযোগ হচ্ছে, ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যার অনুপাত বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে, বোধগম্যভাবেই তা ভুল।
কাশ্মীরে পণ্ডিতদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারটিকে স্বাগত জানানো উচিত। তারা যে মুসলমানদের সঙ্গে মিশে গেছে, তাতে বোঝা যায় সেখানে কাশ্মীরি জাতিসত্তার বিকাশ হয়েছে। সেই জাতিসত্তায় দুই সম্প্রদায়েরই প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এমনকি মৌলবাদী সৈয়দ আলী শাহ গিলানি ছাড়া বিছিন্নতাবাদীরাও পণ্ডিতদের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন এই যুক্তিতে যে তারাও সেই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বস্তুত, কাশ্মীরি জনগণের শক্তি হচ্ছে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ। আলীগড়ের ছাত্রদের উচিত হবে, কাশ্মীরের বই থেকে একটি পাতা উল্টিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করার প্রলোভনে পা দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Monday, April 20, 2015
সংবিধান সমুন্নত রাখতে হবে by কুলদীপ নায়ার
![]() |
| জোর করে হোক আর সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে হোক পূণরায় হিন্দু বানানো হবে: RSS নেতা মোহন ভগবত |
কুরিয়ান জোসেফ যা বলেছেন, তার কোনো ব্যতিক্রম হতে পারে না: ‘ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব আমাদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধে প্রাণ সঞ্চার করেছে। সারা বিশ্ব ঈর্ষাভরে আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐক্য ও অখণ্ডতার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই কঠিন সময়ে ভারতকে অবশ্যই তার এই সদ্গুণগুলো রক্ষা করতে হবে, অন্য জাতির মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’
যদিও আমি মনে করি, বিচারকদের সম্মেলনের দিনক্ষণ পরিবর্তন করে গুড ফ্রাইডের দিন ফেলায় কুরিয়ান জোসেফ কিছুটা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি এইচ এল দত্ত অত্যন্ত সততার সঙ্গেই বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ ছুটির কারণে আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় তিনি এই দীর্ঘ ছুটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে গুড ফ্রাইডের দিন বিভিন্ন রাজ্যের উচ্চ আদালতের বিচারকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি খ্রিষ্টান বিচারক ও সম্প্রদায়ের সংবেদনশীলতা তিনি ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারেননি।
আর ব্যাপারটা এমনও নয় যে গুড ফ্রাইডের দিন এই প্রথম বিচারকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু তখন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে বৈষম্যের অনুভূতি এতটা প্রখর ছিল না। কিন্তু বিজেপি যেভাবে খোলাখুলি হিন্দুত্বের প্রচারণায় নেমেছে, তাতে বহুত্ববাদের আবহ অনেকাংশেই বিঘ্নিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই যে হাওয়ায় আমরা নিশ্বাস নিচ্ছি।
ভারতের জনগণ লোকসভায় বিজেপিকে চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে, এটা সত্য। এতে বোঝা যায়, জনগণের চিন্তাধারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। এই জনগণই কিছুদিন আগেও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে এটা মনে রাখতে হবে, সংবিধানের মৌল কাঠামো সর্বোচ্চ আদালত নির্ধারণ করেছেন, এটা পরিবর্তন করা যাবে না। এই কাঠামোর একটি অংশ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা, এই বৈশিষ্ট্য আমাদের সংবিধানকে প্রাণ দিয়েছে।
চরমপন্থীরা আমাদের জাতিসত্তার মৌল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনে নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে, বিচার বিভাগের কাছে এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার হওয়া উচিত। ঘর ওয়াপসি (পুনরায় হিন্দু হওয়া) স্লোগানটি বানানোই হয়েছে বহুত্ববাদের গোড়ায় কুড়াল মারার জন্য। আবার হরিয়ানার স্কুলের কারিকুলামে গীতা যুক্ত করা হয়েছে।
![]() |
| লক্ষাধিক মুসলিম ও খ্রিস্টানকে ধর্মান্তরিত করবে আরএসএস |
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর অবস্থা আরও করুণ, কারণ সেগুলো জাতীয় পরিসরে আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, এদের সম্বন্ধে মানুষের আকর্ষণও কম। যেকোনোভাবেই হোক, এসব রাজ্য হিন্দুত্ববাদী সংকীর্ণতার দ্বীপে পরিণত হয়েছে। অনেক মুসলিমকেই আমি বলতে শুনেছি, তারা জান আউর মাল (জীবন ও সম্পদ) সম্পর্কে ভীত।
আরএসএস নেতারা দিব্যি বহাল তবিয়তেই আছেন। এমনকি বিজেপির উদার মানুষেরাও নীরব আছেন। বিজেপি হয়তো চায় হিন্দুত্ববাদের জয়জয়কার হোক। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে তারা মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করতে চায়, এটা সংবিধানের মৌলিক বিচ্যুতি। সংবিধানমতে, আইনের চোখে সবাই সমান, এক মানুষের এক ভোট।
![]() |
| রাষ্ট্রীয় স্ময়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত |
ভারতের প্রধান বিচারপতি এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে সঠিকভাবেই বলেছেন, বিচার বিভাগ ও সংসদ ভাইবোনের মতো। ‘প্রকৃত অর্থে কার্যকর বিচার প্রশাসন’ নিশ্চিত করতে তাদের একত্রে কাজ করতে হবে। বিচার বিভাগ ও সংসদ উভয়েই গণতন্ত্রের সন্তান। ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে তাদের হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে। একজন ভুল করলে আরেকজনকে তা শুধরে দিতে হবে।
কিন্তু কর্মীদের চাপে আদালতের রায় প্রভাবিত হয়—এমন ধারণা দূর করা দরকার। ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিটি বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থা দূর করবে, এমনটা আশা করা হচ্ছে, যাতে বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় নির্বাহী বিভাগ আরও অধিকহারে যুক্ত হয়। একসময় তা ছিলও বটে। কিন্তু দেখা গেল যে বিচারক নিয়োগ ও বদলির প্রক্রিয়ায় সরকারের হস্তক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফলে ব্যাপারটা পুরোপুরি বিচারকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
![]() |
ভারত হিন্দু রাষ্ট্র, হিন্দুত্বই পরিচয়, ফের ঝড় তুললেন ভাগবত
|
উদাহরণস্বরূপ, যেকোনো সিদ্ধান্তের কারণ জানার ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এটা দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এনেছে, গণতন্ত্রকে গভীরতর করেছে। সত্য প্রকাশিত হলে সরকার হয়তো বিব্রত হতে পারে। কিন্তু একটি উন্মুক্ত সমাজের দাবির প্রসঙ্গে আপস হতে পারে না।
এ পর্যন্ত বিবেচনা করলে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিরীক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে বুঝতে হবে, সরকারি কর্মচারীরা তাদের কাজ করে। অনেক দুর্নীতির তদন্তের প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখত, যদি সেগুলোয় দাপ্তরিক সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা না হতো।
মোদি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগকেও নির্বাহী বিভাগের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হবে। সময়-সময় নানা নীতি প্রণয়ন করা তাদের অধিকার। শেষ বিচারে উভয়কেই সংবিধানের সীমা অনুসারে কাজ করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Saturday, April 11, 2015
বৈচিত্র্যই ভারতীয় সমাজের শক্তি by কুলদীপ নায়ার
‘পাকিস্তান’ শব্দবন্ধটি সেই প্রস্তাব বা তার পরবর্তী বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু হিন্দুদের মালিকানাধীন অধিকাংশ পত্রিকায় এটাকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে ‘প্রয়োজনবোধে সেই ভৌগোলিক বিন্যাসে আবার পরিবর্তন আনা যাবে’ শব্দবন্ধটি এতে যুক্ত করেছিলেন, তার জন্য তিনি নিশ্চয়ই অনুতাপ করেছেন। কারণ, এই শব্দবন্ধটির কারণেই উপমহাদেশ ভাঙার সময় মুসলিম অধ্যুষিত পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করা হয়েছে।
জিন্নাহর অনুতাপের আরও বড় কারণ হচ্ছে, পাকিস্তান প্রস্তাবে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ শব্দবন্ধের ব্যবহার বিপর্যয়কর। কারণ, পরবর্তীকালে স্বাধীন ‘পূর্ব বাংলার’ (বর্তমানে বাংলাদেশ) সমর্থকেরা বলেছেন, লাহোর প্রস্তাবেই ভারতের ‘উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল’ ও ‘পূর্বাঞ্চলে’ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল।
জিন্নাহ পরবর্তীকালে এই বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে এটা আসলে ছিল মুদ্রণ প্রমাদ, ‘রাষ্ট্রের’ বদলে ভুল করে ‘রাষ্ট্রসমূহ’ লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘স্টেট’-এর বদলে ‘স্টেটস’ লেখা হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে তরুণ নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো রঙ্গ করে বলেছিলেন, তিনি ভবিষ্যতে স্টেনোগ্রাফারদের সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। তার পরও পাকিস্তান প্রস্তাবের সমর্থক ও মুসলিম লীগের উত্তর প্রদেশের নেতা খালিকুজ্জামান বলেছিলেন, তিনি ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কনভেনশনের পক্ষে প্রস্তাবের খসড়া রচনা করতে গিয়ে ‘কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই’ ইংরেজিতে স্টেটের বদলে স্টেটস লিখেছিলেন। তিনি আবার সেই প্রস্তাবে সুযোগমতো ‘উইথ সাচ টেরিটোরিয়াল রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট’ শব্দবন্ধটি বাদও দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে যেটা আবার লাহোর প্রস্তাবে স্থান পায়।
আমি দেশভাগের বিপক্ষে। তার পরও আমার আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, সেটা প্রস্তাবের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু শেষমেশ ধর্মের ভিত্তিতেই বিভাজনটা হলো।
এর ফলে যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি হয়, তাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। এর যেন শেষ নেই, ভারতে প্রায় ১৬–১৭ কোটি মুসলমান বসবাস করে। ১৮ বছর আগে হাশিমপুরায় যা ঘটেছিল, সেটা এক উদাহরণ মাত্র। ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখুন।
হাশিমপুরার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিক্সটিন প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্ট্যাবুলারির (পিএসি) কর্মকর্তাদের নির্দোষ বলে খালাস দেওয়া হয়েছিল। মামলাটি প্রমাণের উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় আদালত বলেছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচিতি সম্বন্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব ছিল। আদালত পরবর্তীকালে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের জন্য মামলাটিকে দিল্লি স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৮৭ সালের মে মাসে ১৯ জন পিএসি কর্মকর্তাকে উত্তর প্রদেশের মিরাটে ৪২ জন মানুষকে হত্যার দায়ে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। এদের মধ্যে তিনজন বিচারের সময়ই মারা যায়। অভিযোগ আছে, মিরাটের হাশিমপুরা মহল্লা থেকে লোকজনকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
যে রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রয়েছে, সেখানে এমন ঘটনা ঘটবে, সেটা শুধু তিরস্কারযোগ্য নয়, বিব্রতকরও বটে। জনগণের মাঝে আমরা যে ধর্মনিরপেক্ষতার আলো ছড়িয়ে দিতে পারিনি, তার দায় আমাদের স্বীকার করতে হবে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের নির্দেশনায় পরিচালিত হন। অনেক আমলাই সংকীর্ণ পরিবেশে থেকে নিজেরাই বিভাজনের রাজনীতি গলাধঃকরণ করছেন।
অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের সংবিধানের প্রাক-কথনে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি এখনো রয়ে গেছে, এটা সত্য। কিন্তু এটা একধরনের ছলচাতুরী। সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তারা মনে করে, হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ধারণ করা তাদের অধিকার আর সংবিধানের গায়েও গেরুয়া রং চড়ানো তাদের অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। যাতে করে তারা উদার হওয়ার ভান করে যেতে পারে। ভারত রাষ্ট্রের মূল্যবোধ ধ্বংসে মোদি সরকার বহু কিছু করেছে।
হরিয়ানায় সংস্কৃত ভাষাশিক্ষা ও গীতা পড়ানো শুরু হওয়ার ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে অশনিসংকেত, আমাদের ভাগ্যে আরও কী আছে আমরা তা এখনো জানি না। হয়তো বিজেপি এসব বাজারে ছেড়ে পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করছে। তারা যদি দেখে যে হিন্দুত্ব প্রচারের তাদের গোপন কর্মসূচি আগের মতো আর উন্মাদনা সৃষ্টি করছে না, তাহলে তারা পূর্ণ গতিতে তা বাস্তবায়ন করবে।
উদার শক্তিগুলো ভূমি অধিগ্রহণ বিলের বিরোধিতা করছে এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে তারা এর বিরোধিতাও করেছে, এটা সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু ভারতের ধারণাটাই যখন হুমকির মুখে পড়েছে, তখন তারা নিজেদের ক্ষুদ্র এজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে তারা সংকীর্ণ শক্তিগুলোর হাতে মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। আর মোদি সরকারের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা উন্মোচিত হয়ে গেলেও উদার শক্তিগুলো নিষ্ক্রিয়। বিজেপির কার্যক্রম ঠেকাতে হলে সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
সময় এসেছে, আমাদের এখন পাকিস্তান প্রস্তাবের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলতে হবে, যেটা শেষ পর্যন্ত বিভাজনের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ভৌগোলিক নয়, ধর্মীয় বিভাজনে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অসহায়ের মতো দেখতে হচ্ছে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তালেবানের পথে হাঁটছে। কারণ, মৌলবাদীরা সেখানে জেঁকে বসেছে। ভারতের উচিত ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা; স্বাধীনতার পর সে যে পথে ছিল।
এমনকি অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে বিজেপির আগের সরকার ভারতের মৌলভিত্তি পরিবর্তনের চেষ্টা তেমন করেনি। তিনি নিজেও এটা জানতেন যে বৈচিত্র্যই ভারতীয় সমাজের শক্তি। কোনো একটি ধর্মের প্রাবল্য থাকলে ভারতের শক্তি ধ্বংস হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মোদি আরএসএসের দর্শনে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন, এটা সত্যিই করুণার উদ্রেক করে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Saturday, March 21, 2015
আম আদমির কাছে ভালো কিছু প্রত্যাশা ছিল by কুলদীপ নায়ার
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আম আদমি পার্টির মধ্যেও এক ব্যক্তির শাসনের প্রথা গড়ে উঠেছে। এটা ঠিক যে অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লির নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় দলের কেন্দ্রীয় পদে তিনিই থাকবেন। তার পরও আম আদমি পার্টির মূল্যবোধ অনুসারে তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হবেন না—সবাই এমনটাই ভেবেছিল। ভুলটা ঠিক এখানেই হয়েছে। কেজরিওয়াল তাঁর নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চেয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, আম আদমি পার্টির দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য যোগেন্দর যাদব ও প্রশান্ত ভূষণকে দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শীর্ষ কমিটি থেকে সরানোর পেছনেও তাঁর হাত আছে।
দলের নির্বাহী পরিষদে কেজরিওয়াল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। তবে তার মানে এই নয় যে দলে তিনি একাই কথা বলবেন, অন্যরা কেউ কিছু বলবেন না। নির্বাহী পরিষদে শক্তির পরীক্ষায় পরিষদ তাঁকে বিভক্ত রায় দিয়েছে, তাঁর পক্ষে ১১ জন আর বিপক্ষে আটজন ভোট দিয়েছেন।
প্রতিদিনই নতুন নতুন খবর বেরোচ্ছে। তার একটি এমন: কেজরিওয়াল দল থেকে তাঁর কাজের ধরনের সমালোচনাকারীদের বের করে দেওয়ার লক্ষ্যে নানা কৌশল করেছেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী পদের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তাঁর সমালোচকদের প্রবল আঘাত হানছেন। আমি আশা করি, এসবই মিথ্যা; আর আম আদমি পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রও ক্রিয়াশীল আছে। কিন্তু দলটির কার্যপ্রণালি অস্বস্তিকর।
দলটির অভ্যন্তরীণ লোকপাল দলের কার্যপ্রণালি নিয়ে তাঁর অসন্তোষ জানিয়েছেন। তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথাও বলেছেন। সম্ভবত, তিনি পদত্যাগের হুমকি দিয়ে দলকে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে বোঝাবেন যে কেজরিওয়ালের কার্যপ্রণালি ঠিক নয়।
আন্না হাজারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, আম আদমি পার্টি সেই আন্দোলনের ফসল। কিন্তু তিনি কেন নিজে এ দায়িত্ব নিলেন না যে পার্টির নিয়ন্ত্রকেরা লোকপাল নিয়োগের মাধ্যমে বড় বড় দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে কাজ করেন? তা না করে আন্না হাজারে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে ভূমি বিলসংক্রান্ত আন্দোলনের পেছনে নিজের ব্যর্থতা লুকিয়েছেন।
সম্ভবত আন্না হাজারে বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর কথার মর্যাদা থাকবে না। গান্ধীবাদী জয়প্রকাশ নারায়ণ ব্যাপারটি ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন, যে পার্টি মোরারজি দেশাইকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেয়। মোরারজি দেশাই যে জনতা পার্টির কথা শোনেননি, সে জন্য তাঁকে মাঠ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করতে হয়নি। আন্না হাজারের উচিত ছিল মোরারজি দেশাইয়ের পথ অনুসরণ করা, যিনি ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের ফসল।
আমার মনে পড়ে যে জয়প্রকাশ নারায়ণকে আমি বলেছিলাম, মানুষ মোরারজি দেশাইয়ের প্রভাবে ভোট দিয়েছে। মানুষ চায় তিনি এ আন্দোলনের আলোকে কেন্দ্রীয় সরকার কার্যকর করবেন। তিনি আমার কথার বিরোধিতা না করে বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁর পক্ষে আর জনসমক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এটা আসলে ওই ব্যাপারটি স্বীকার করারই আরেকটি পন্থা যে তিনি মোরারজি দেশাইয়ের পথে নেই, যাতে জনতা পার্টির কোনো বদনাম না হয়।
জয় প্রকাশ নারায়ণ এ রকম যুক্তিই দেখিয়েছেন। তিনি জানতেন, মোরারজি তাঁর কথা শুনবেন না। আমি ভেবেছিলাম, মোরারজি দেশাইয়ের কাছে যাব। আমি তাঁকে বললাম, জয়প্রকাশ নারায়ণ দিল্লিতে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি আসতে পারেননি। ভেবেছিলাম, আমি তাঁকে যথেষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছি। আমি কী বলতে চাই, মোরারজি তা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি রাগ করে বলেন, জয়প্রকাশ যদি ভেবে থাকেন যে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করব, তাহলে তিনি ভুল করছেন। ‘আমি এমনকি গান্ধীর সঙ্গেও দেখা করতে যাইনি। জয়প্রকাশ তো আর তাঁর চেয়ে বড় নন।’ এটা কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার না যে জনতা পার্টি ভেঙে যায় আর শেষমেশ তা মরেও যায়।
আন্না হাজারে ভিন্নমত দমনের জন্য তাঁর কেজরিওয়াল আচ্ছন্নতা কাটাতে পারেন। কেজরিওয়াল যে আন্না হাজারের সঙ্গে ভূমি বিলের জন্য ধরনায় বসেছেন, তাতে এ সত্য আড়াল হয়ে যায় না যে তিনি দল থেকে সমালোচকদের বিদায় করতে চান। যোগেন্দর যাদব ও প্রশান্ত ভূষণ উভয়েই আম আদমি পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কেজরিওয়াল তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি থেকে বিদায় নিশ্চিত করেছেন। তিনি বুঝতে পারছেন না যে তাঁদের এক বৃহৎ অনুসারী দল রয়েছে। মোরারজি দেশাইয়ের পথে হাঁটা তাঁর উচিত হবে না। যে মোরারজি দেশাই জনতা পার্টি ধ্বংস করেছিলেন। যে দল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছিল, কিন্তু অন্যদের স্থান দেয়নি।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আম আদমি পার্টি জনতা পার্টির পথই অনুসরণ করছে। আবার কেজরিওয়ালের সমর্থকেরা তাঁকে শোধরানোর চেষ্টা না করে উল্টো সমালোচকদের পেছনে লেগেছে, ব্যাপারটা সত্যিই করুণার উদ্রেক করে। তাঁকে বুঝতে হবে, আম আদমি পার্টি নিজেই একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষা ব্যর্থ হলে কংগ্রেস ও বিজেপির বিকল্প গড়ে তুলতে বহু বছর লেগে যাবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Thursday, March 12, 2015
ভারত ফেলনা নয় by কুলদীপ নায়ার
নয়াদিল্লি সে সময় এই অবমাননা নীরবে মেনে নিয়েছিল। এই প্রথমবার বেইজিং প্রকাশ্যে তার অসন্তোষ জানাল। ইতিপূর্বে ভারত তার মানচিত্রে অরুণাচলকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে দেখালেও চীন তাতে আপত্তি জানায়নি। আসলে বিতর্কটা শুরু হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ ও চীন সীমান্তের মধ্যকার ছোট একটি ভূখণ্ড নিয়ে। কিন্তু অরুণাচলের মর্যাদা নিয়ে কদাচিৎই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
যখন গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি চীনা উপ–পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিউ ঝেনমিনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তখন সেটা আসলে ঔদ্ধত্যেরই অংশ। তিনি বলেছেন, ‘মোদির সফর চীনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব, অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে। এমন কাজের কারণে দেশ দুটির মধ্যে বিরাজমান সীমান্তবিষয়ক মতদ্বৈধতা কৃত্রিমভাবে বেড়ে যাবে। দেশ দুটি যে বিষয়টি যথাযথভাবে মোকাবিলার ব্যাপারে নীতিগত মতৈক্যে পৌঁছেছে, এ সফর সেই মতৈক্যের বিরোধী।’
এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লি চীনের আপত্তির ব্যাপারে শক্ত অবস্থানেই আছে। নয়াদিল্লি যে বলেছে, প্রধানমন্ত্রী আবারও অরুণাচল সফল করবেন, তা সে সঠিকভাবেই বলেছে। নয়াদিল্লি সেই সফরের তারিখ ঘোষণা করলে বার্তাটি আরও পরিষ্কার হতো। এটা সত্য যে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত। প্রয়োজন হলে তাতে পরিবর্তনও আনা যায়। তারিখ দেওয়া হলে বার্তাটি আরও পরিষ্কার হতো।
বস্তুত, সরকার না করলেও বিজেপির উচিত হচ্ছে, আগামী মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতের উদ্বেগ ও অসন্তোষ জানাতে চীন সফর করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তোলা। ভারত যে ফেলনা নয়, চীনকে সেটা বুঝতে হবে।
সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর পিছিয়ে দেওয়া হলে নয়াদিল্লির তেমন কোনো সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে না। সফর বাতিল করাটা অবশ্য ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু চীন যে পরিমাণে উসকানি দিচ্ছে, তাতে ভারতের এই সফর নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত। চীনের এই ঔদ্ধত্য এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যায় না, এটা খণ্ডন করতে হবে।
ভূখণ্ডগত ব্যাপার যদি ভারতের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রীর উচিত, শুরুতেই চীনকে বলে দেওয়া যে ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। বস্তুত, ব্যাপারটা উল্টো। উভয়ের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে সংবেদনশীলতার ব্যাপারে মতৈক্য থাকলে চীন-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। চীন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের বেশ কিছু ভূমি দখল করে আছে।
চীনের পেশি ফোলানোর ব্যাপারে নয়াদিল্লির সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, ভারত অতীতেও বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে এক চিঠিতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘দুনিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত অর্থে শান্তি ও সহযোগিতার সম্পর্ক না থাকলেও তাদের অন্তত বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ এড়ানো উচিত। যাতে করে পরবর্তীকালে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো যায়।
‘যদি যুদ্ধ লেগেও যায়, তাহলেও আমাদের এর বাইরে থাকতে হবে। দুনিয়ার কিছু অঞ্চলও যদি পরাশক্তির বিবাদের বাইরে থাকে, তাহলেও কিছু লাভ আছে। সে কারণেই আমরা দুই পরাশক্তির একটির সঙ্গেও জোট বাঁধিনি। একইভাবে আমরা মিডল ইস্ট ডিফেন্স অর্গানাইজেশন ও সাউথইস্ট এশিয়ায়ও যোগ দিইনি...সামনের দিনে আমাদের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হবে।’
তখন নেহরুই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দ্বন্দ্ব এড়াতে পারতেন। তিনি তা করেছিলেনও বটে। মোদির সেই মর্যাদা নেই, তাঁর সেই লক্ষ্যও নেই। তার পরও তিনি যুদ্ধ থামাতে পারেন, বিশেষ করে তঁার নতুন বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাহায্যে। দুনিয়ায় প্রভুত্ব করার বেইজিংয়ের আকাঙ্ক্ষা নতুন ব্যাপার নয়। তারা সব সময়ই সুলতান হতে চেয়েছে, দুনিয়াকে দরবার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে।
চীন এখনো ভারতের ভূমি দখল করে রেখেছে, চীনের এই বৈঠকে এ কথা বলার পর আমি চীনা জেনারেলদের যে রাগান্বিত চেহারা দেখেছি, সেটা আমার এখনো মনে আছে। তাদের উত্তরের মধ্যে সামরিকতার ঝাঁজ ছিল। তারা বলেছিল, ‘১৯৬২ সালে আপনাদের যে শিক্ষা দিয়েছিলাম, সেটা আপনারা ভুলে গেছেন।’
নেহরু তিব্বতকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভুল করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করবেন বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এর মধ্য দিয়ে শুধু নেহরুর আন্তর্জাতিক যোগাযোগগুলো ব্যবহার করেছেন। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে তাঁর আসল চেহারা প্রকাশ পায়।
ভারতের উচিত সর্বতোভাবে চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা, কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই ভূখণ্ডের বিনিময়ে নয়। চীন যদি অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দিতে না চায়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চীন সফর কী কাজে লাগবে? অরুণাচল প্রদেশকে স্বীকৃতি না দিয়ে চীন ভারতের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে যে পার পাবে না, তাকে সেটা বোঝানোর সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
এই অঞ্চলের শান্তির জন্য চীন ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। কিন্তু চীনকে এ ক্ষেত্রে ভারতের মতো আন্তরিকতা দেখাতে হবে। কিন্তু চীনের হাবভাব দেখে মনে হয়, তারা অসম ক্ষমতা সম্পর্কের জায়গা থেকে কথা বলতে চায়। তারা ভারতকে ঘিরেও ফেলতে চায়। চীন নেপালকে উদারভাবে সহযোগিতা করেছে। তারা শ্রীলঙ্কায় বন্দরও নির্মাণ করছে। আবার সে মিয়ানমারকেও নিজের দলে টানতে চায়।
চীন যদি ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়, তাহলে নয়াদিল্লি মোটেও আপত্তি করবে না। কিন্তু সেটা যদি তাকে চাপ প্রয়োগের জন্য হয়, তাহলে সেখানে দুরভিসন্ধি আছে। এটা বন্ধুত্বের নিদর্শন নয়, ভারত সেই বন্ধুত্বই চাষ করতে চায়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
Thursday, February 26, 2015
ভারতীয় সমাজের প্রাণ হচ্ছে বহুত্ববাদ by কুলদীপ নায়ার
তার মানে এই নয় যে ভারতীয় সমাজ তুলনামূলকভাবে আরও পরিশীলিত। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে তা আরও বেশি সহনশীল ও গ্রহণমূলক। ভারত একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, সেই সমাজ নানা সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে টিকে থাকতে শিখেছে। ইন্দোনেশিয়ার পর ভারতীয় মুসলিম সমাজ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়, তার নিজস্ব গতি-প্রকৃতি রয়েছে। তারা হিন্দুদের শিখিয়েছে, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে তাদের মানিয়ে নিতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে হিন্দুদের মধ্যে চরমপন্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা দেশটাকে হিন্দু বানাতে চায়। চরমপন্থী হিন্দু সংগঠন আরএসএস ভারতীয় সমাজকে ঠেলে হিন্দু বানাতে চাইছে, সব সময়। কিন্তু অধিকাংশ হিন্দুধর্মাবলম্বী এই সংকীর্ণতা পরিহার করেছে।
আরএসএসের রাজনৈতিক বাহু বিজেপি মনে হয় বুঝে গেছে, গেরুয়াকরণ ভারতে খুব একটা হালে পানি পাবে না। সে কারণে তারা উন্নয়নকেই মন্ত্র বানিয়েছে। এটা আবার হিন্দুত্ববাদের মুখোশও হতে পারে। তার পরও বোঝা যায়, তাদের এ বোধোদয় হয়েছে যে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
এ থেকে সম্ভবত বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন শেষমেশ নয়াদিল্লিতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তাঁর নীরবতা ভেঙেছেন। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সরকার বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। সবারই তাঁর পছন্দ অনুসারে এবং অযাচিত চাপ ও প্রভাবে ধর্ম গ্রহণ করার অকাট্য অধিকার আছে। আমার সরকার কোনো গোষ্ঠীকে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বা গোপনে ঘৃণা ছড়াতে দেবে না। সব ধর্মের প্রতি আমাদের সমান শ্রদ্ধা থাকবে।’ দৃশ্যত, গির্জায় হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি এ কথা বলেছেন।
মোদি লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইদানীং তাঁর দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন না—অভিন্ন সিভিল কোড ও সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা, যে ধারা কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি হয়তো ধর্মনিরপেক্ষ হননি। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝে গেছেন, ভারতীয় সমাজ বহুত্ববাদকে জীবনধারা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
আবার এটাও সত্য যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ভারতে নিপীড়নের শিকার হতে পারে। আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগওয়াত যখন বলেন, ‘রাম জন্মভূমি ও সেতুসমুদ্রম আমাদের জাতীয় ইস্যু। এমন ধারার আরও বিষয় তুলে আমার সবাইকে বার্তা দিতে পারি, সংঘের আসল উদ্দেশ্য কী।’ তার পরও তিনি ও সংঘ পরিবার জানে যে ভারতীয় সমাজকে পুরোপুরি ধর্মতাত্ত্বিক সমাজে রূপান্তরিত করা যাবে না। এটা জনগণের মনের বিরুদ্ধে।
তুলনামূলকভাবে পাকিস্তানি সমাজ ক্রমাগতভাবে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে। সন্দেহ নেই, দেশটি প্রতিষ্ঠিত এবং ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রটির জন্মের কিছুদিন পরেই বলেছিলেন, সেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্র এক পাত্রে মেলানো হবে না। তার পরও সত্য হচ্ছে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশের মতো। সিন্ধু প্রদেশে নারীদের বিয়ের জন্য জোর করে ধর্মান্তর করা হচ্ছে। আর এমন কোনো মন্দির নেই যে সেখানে হামলা করা হয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৪ সালে নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে। পাকিস্তান সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পাকিস্তানের জন্য ২০১৪ সালটি ‘তুমুল কোলাহলপূর্ণ’ বছর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ওই বছর কোনো ঝামেলা ছাড়াই সেখানে উপদলীয় হামলা হয়েছে। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সামরিক অভিযানে ১০ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে।
উপর্যুক্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত বিবৃতিতে নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফেলিম কিনে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘পাকিস্তান সরকার তার জনগণকে রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মতো মৌলিক কাজটিই করতে পারছে না। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ২০১৪ সালে সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ব্যাপক হারে খুন করেছে, পাকিস্তান সরকার তা থামাতে পারেনি।’
নিঃসন্দেহে ভারতের অনেক মসজিদই চরমপন্থীদের আক্রমণের মুখে পড়েছে। কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম ও উদারপন্থীরা এর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সরকার ও সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। সে সংখ্যাটা একদম কম নয়। ভারত ও পাকিস্তান বাদবিসংবাদ মিটিয়ে না ফেললে দুই দেশের সংখ্যালঘুরাই বিপদে পড়বে। উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের মুর্দাবাদ জানাতে কসুর করে না। ভারত সংবিধান অনুসারে পরিচালিত হলেও সেখানে মুসলমানদের পাকিস্তানি বলা হয়। সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দ্বারা ভারত পরিচালিত হয় না। পাকিস্তান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালেই ধর্মনিরপেক্ষতায় আমাদের ইমান কমজোর হয়ে পড়ে।
কিন্তু দুই দেশেরই যে শত্রুতা মিটিয়ে ফেলা দরকার, সেই বোধের লেশমাত্র তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। পাকিস্তানের জবাব দেওয়ার ভারটা আরও বেশি, কারণ তারা হিন্দুদের নেতিবাচক রঙে দেখিয়ে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছে। পাকিস্তানের ছাত্ররা ঘৃণার ফসল, যে ঘৃণার সলতেয় তেল দিচ্ছে মিথ্যা ও অর্ধসত্য।
সাধারণভাবে ভারতীয় সমাজে তেমন কিছু নেই। তার পরও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ বিজেপি ইতিহাসকে গেরুয়া রঙে সাজাচ্ছে। সমাজ এখনো কলুষিত হয়নি। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির জয়ে দেখা গেল, ভোটারদের বর্ণপ্রথা ও ধর্মীয় মতবিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা রয়েছে। এ ব্যাপারটার সর্বভারতীয় রূপ লাভ করা উচিত। এটা অনেকাংশে নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তান কীভাবে নিজেদের পার্থক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে, তার ওপর। সংখ্যালঘুরা এটা করলে উপকৃত হবে। যত তাড়াতাড়ি তা হয়, ততই মঙ্গল।
ক্রিকেট খেলা দক্ষতার বিষয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট দিন একটি দল কীভাবে খেলল, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। আয়ারল্যান্ডের কথাই ধরুন না কেন, তারা দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, খেলা তার নিজস্ব চেতনাতেই খেলা উচিত। দুটি দেশের মধ্যকার অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে এটা মেলানো উচিত নয়। খেলোয়াড়েরা এ বিষয় সম্পর্কে সচেতন বলেই মনে হয়, কিন্তু সমর্থকেরা তা নয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







.jpg)
+%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8+%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%B9%E0%A6%A8+%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A6%AC%E0%A6%A4.jpg)







