Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts
Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts

Wednesday, April 8, 2026

ইরানে সভ্যতা ধ্বংসের হামলা হবে ট্রাম্পের যুদ্ধাপরাধ

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভাষ্যঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলা চালিয়ে ইরানে সভ্যতা ধ্বংসের যে হুমকি দিয়েছেন, সেটা কার্যকর করলে তিনি যুদ্ধাপরাধ করবেন বলে শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে। জাতিসংঘের পাশাপাশি এ বিষয়ে আইনবিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় বেপরোয়া হামলা চালানো হলে সেটা জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএন গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এক সম্পাদকীয়তে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে স্বনামধন্য ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিটি লেখাতেই ট্রাম্পের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

বেঁধে দেওয়া সময় মঙ্গলবার রাত আটটার (ওয়াশিংটনের সময়) মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে সেখানে ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, সে বিষয়ে সাংবাদিকেরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সোমবার ট্রাম্প বলেন, তিনি সেসব নিয়ে ‘চিন্তিত’ নন। তাঁর এমন বেপরোয়া হুমকির প্রতিবাদ জানিয়েছেন মার্কিন রাজনীতিকেরা। তাঁকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলেছেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার তাঁকে ‘গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি’ বলেছেন। ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। রিপাবলিকান পার্টির নেতারাও ট্রাম্পের এই হুমকির সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের মিত্র হিসেবে পরিচিত সিনেটর রন জনসন গতকাল বলেছেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা তিনি সমর্থন করেন না। এটা অনেক বড় ভুল হবে।

ট্রাম্পের হুমকির সমালোচনা করে দ্য গার্ডিয়ান গতকাল এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, জেনেভা কনভেনশনের প্রথম অতিরিক্ত প্রটোকলের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রটোকলের ভিত্তিতেই ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জন্য দায়ী রুশ সামরিক কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। ইউক্রেনের শহর ও জনপদে আতঙ্ক ছড়াতে এবং মনোবল ভেঙে দিতে যে ধরনের হামলা ও একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, তা যুদ্ধাপরাধের শামিল। একইভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে এ সপ্তাহে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন, তা যদি কার্যকর করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই আইন প্রযোজ্য হবে।

বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলার এমন লাগামহীন হুমকি আইনবিশেষজ্ঞ ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০০৪-০৫ সালে ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধবিষয়ক শীর্ষ আইনবিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিওফ্রে কর্ন। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘আমি উদ্বিগ্ন যে প্রেসিডেন্টের এই আস্ফালন অপারেশনাল কমান্ডারদের খুব কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলছে। তাঁরা জানেন যে আপনি চাইলেই একটি দেশের ওপর একটি বৃত্ত এঁকে বলতে পারেন না যে বিদ্যুৎ গ্রিডের প্রতিটি অংশ এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তু।’

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক নাগরিকদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগুলোকে হামলা থেকে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। সে কারণে ট্রাম্প যে ধরনের হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তা বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে মত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের আইন উপদেষ্টা হ্যারল্ড হংজু কোহ।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, বিশুদ্ধ পানি শোধনাগারসহ জনগণের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।

মার্কিন সেনাবাহিনীর আইন শাখার সাবেক আইনজীবী মার্গারিট ডোনোভান বলেন, ‘আমরা এমন একটি সরাসরি হুমকি দেখছি, যা বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বিপর্যয়কর হতে যাচ্ছে।’

ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার এক খোলাচিঠিতে শতাধিক মার্কিন বিশেষজ্ঞ বলেন, এমন হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ওই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হার্ভার্ড, ইয়েল, স্টানফোর্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও রয়েছেন। ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলো যেটা করছে এবং দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ‘উসকানিমূলক বাগাড়ম্বরের’ নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্ক। গতকাল এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইরান—কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য দায়ী যে কাউকেই উপযুক্ত আদালতে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি : এএফপি


Wednesday, March 4, 2026

খামেনির হত্যা আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রতীক: সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক পথই সমাধান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনা শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি সংকটজনক মুহূর্ত তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চালানো আকস্মিক এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের আমরা নিন্দা জানাই। এই হত্যাকাণ্ড আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল আরেকবার প্রমাণ করল, চূড়ান্ত ক্ষমতার কাছে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্য কতটা ঠুনকো। এমন হঠকারী হামলা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও চরমপন্থার কত বড় ঝুঁকি তৈরি করে, তার বহু নজির ইতিহাসে রয়েছে।

গত বছরের জুনে ইরান–ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলমান ছিল। এর মধ্যেই শনিবার রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিস্তৃত পরিসরে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় তেহরানে নিজ কার্যালয়ে নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে দেশটি।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর প্রধানসহ সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে বহু হতাহতের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৫০ শিশু নিহত হয়েছে। শিশু, নারীসহ বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচার হামলা ও হত্যাকাণ্ড চূড়ান্তভাবে অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়। উল্লেখ্য যে গাজায় নিরীহ জনগণের ওপর নিষ্ঠুর গণহত্যা চালানোর পরও ইসরায়েলকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে নিদারুণ ব্যর্থ হতে দেখেছি বিশ্বকে।  

ইরান পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার অংশ হিসেবে ইসরায়েল এবং কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এসব হামলায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের পক্ষ থেকেই আরও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি এসেছে।

এটা সত্য যে ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে দমন–পীড়নের অজস্র অভিযোগ রয়েছে। জানুয়ারি মাসে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগে দমন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বাইরে থেকে আগ্রাসন চালিয়ে ইরানে শাসনব্যবস্থা পাল্টানোর কোনো চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই চেষ্টা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান। ইরানের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানি জনগণের হাতেই থাকতে হবে। এর আগে, জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। কাতার ও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্স জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেছে। বর্তমান বিশ্বে যেকোনো যুদ্ধ ও সংঘাত কেবল নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যে আটকে থাকে না, তার বড় দৃষ্টান্ত রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাণিজ্যে তার বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং জ্বালানির সংকট তৈরি হবে। নতুন করে দুর্ভোগে পড়বে শতকোটি মানুষ। আমরা মনে করি, বিপজ্জনক এই সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। সামরিক নয়, কূটনৈতিক পদক্ষেপই উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাতের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ। সব পক্ষ সংযত ও দায়িত্বশীল হলেই কেবল বিশ্ব ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় ঢাকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং দূতাবাসগুলোকে তীক্ষ্ণভাবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং প্রবাসীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন।  

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2Fgu3vyahl%2Fkhameni.JPG?rect=0%2C9%2C579%2C386&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

Wednesday, February 18, 2026

নতুন বাংলাদেশ, ইসলামাবাদের উচিত গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা

দ্য নেশনের সম্পাদকীয়ঃ মঙ্গলবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতা তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক গতিপথে এটি একটি নির্ধারক পরিবর্তনের সূচনা। পাকিস্তানের অনলাইন দ্য নেশনের সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে।

তারেক রহমান এমন একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি, যা ঐতিহাসিকভাবে হাসিনা পরিবারের বিরোধী অবস্থানে থেকেছে। তার ব্যাপক নির্বাচনী জয় অতীত রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান এবং বাংলাদেশের একটি অংশের মধ্যে এমন মনোভাবের প্রতিফলন, যেখানে সমালোচকদের চোখে অতিমাত্রায় ভারতঘেঁষা নীতির পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্য আনার আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। তবে এ ধরনের রূপান্তর সবসময়ই নিজস্ব জটিলতা বহন করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বদানকারী বহুল প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কার্যত আবারও উত্তরাধিকারের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারায় ফিরে গেল, যার সঙ্গে পরিচিত কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও ফিরে এসেছে। বিপ্লবী মুহূর্তগুলো সাধারণত দ্রুত ও মৌলিক সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি করে, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলগুলো ধীর প্রক্রিয়া ও আপসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নতুন বিএনপি সরকার কীভাবে তাদের উত্থানকে সম্ভব করে তোলা সেই বিপ্লবী প্রেরণাকে স্থিতিশীল শাসনের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করবে- এটাই তাদের মেয়াদের নির্ধারক প্রশ্ন হয়ে উঠবে।

এই নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবও পুনর্বণ্টন করেছে। জামায়াতে ইসলামী শেখ হাসিনার আমলে প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। তারা নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি, যে ছাত্রগোষ্ঠীগুলোর আন্দোলনে এই রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে, তারাও এখন বিরোধী আসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিল এবং বাইরের চাপ হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলো প্রতিরোধ করেছিল। বিএনপি সরকার- একদিকে ইসলামপন্থী ও ছাত্রভিত্তিক সক্রিয় বিরোধী শক্তি নিয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শাসনের একটি সুসংহত নীতি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের মন্ত্রীদের উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত। ঢাকা শেষ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক পথই অনুসরণ করুক না কেন, ইসলামাবাদের উচিত ঐতিহাসিকভাবে সংযুক্ত এই প্রতিবেশীর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা, যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় আরও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা যায়।

নতুন বাংলাদেশ, ইসলামাবাদের উচিত গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা

Sunday, January 18, 2026

এলপিজি–সংকট: সরকারি পর্যায়েও আমদানির পথ খোলা জরুরি

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সাম্প্রতিক সংকট, ভোক্তাদের দুর্ভোগ ও বাড়তি ব্যয় আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কৌশলগত পণ্যে একক উৎসে নির্ভরতা মোটেই টেকসই নীতি নয়। ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে বিক্রি হয়েছে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়। বেশি টাকা দিয়েও অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ডিসেম্বরে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম আমদানি হওয়ায় এই সংকটের মূল উৎস। এ বাস্তবতায় এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই আমরা মনে করি।

দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি উৎপাদন করে মাত্র ১৯ হাজার টন। ফলে এ খাত পুরোটাই বেসরকারি খাতের আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি মূলত আমদানি করে। ফলে বাজারে সব সময়ই চাহিদা ও জোগানের যেমন একটা ঘাটতি থেকে যায়, আবার বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে কারসাজি করে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও ঘটে। প্রতি মাসে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েই পণ্যটি কিনতে হয়।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিপিসি বলেছে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করার হাতিয়ার সরকারের নেই। আমরাও মনে করি, এলপিজিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করার খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। এলপিজির বাজারে ভারসাম্য আনতে গেলে সরকারি পর্যায়েও আমদানির অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন।

দেশে এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানায়। একসময় শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করলেও বর্তমানে গ্রামীণ পরিবারগুলোও এলপিজির ওপর অনেক মাত্রায় নির্ভরশীল। এ ছাড়া রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোয়ও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ফলে এলপিজির মাত্রাতিরিক্ত দাম পরিবারগুলোর ওপর যেমন বাড়তি চাপ তৈরি করছে, একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। এমনিতেই টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে নানা কায়দা করে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে, এর ওপর এলপিজির দাম তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এলপিজি নিয়ে বড় সংকটে পড়তে না হয় এবং ভোক্তারা যাতে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি না হন, তার জন্য এলপিজি আমদানির নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি।

আমরা মনে করি, সরকারি পর্যায়ে শুধু এলপিজি আমদানি করাটাই যথেষ্ট নয়, সরবরাহের জন্য অবকাঠামো তৈরি করাটাও জরুরি। কেননা, আমদানি করে সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি কতটা বন্ধ হবে, তা নিয়ে বড় সংশয় থেকে যায়। এলপিজি আমদানি করে বিপিসি যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারে, সেই অবকাঠোমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়াটাও জরুরি।

এলপিজি
এলপিজি। প্রতীকী ছবি

Friday, January 16, 2026

ক্রিকেট নিয়ে ‘নাটক’ ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে

দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ যে দেশ ক্রিকেটকে শুধু খেলা নয়, বরং কূটনৈতিক ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবেও দেখে- সেই ভারতই আশ্চর্যজনকভাবে খেলাধুলা ও রাজনীতির সীমারেখা আলাদা রাখতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কলকাতা নাইট রাইডার্সের আইপিএল দলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে না নেয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কটি স্বাভাবিকভাবে একটি সাধারণ ক্রীড়া সিদ্ধান্ত হিসেবেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে দেশপ্রেম, পরিচয় ও জাতীয় আনুগত্য নিয়ে উচ্চকণ্ঠ গণভোটে।

এই বিচ্যুতি যতটা সামান্য মনে হয়, আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি পার্থক্য। জাতীয় দল একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি দল প্রতিনিধিত্ব করে একটি শহর, একটি ব্র্যান্ড এবং একটি ব্যবসায়িক মডেলকে।

যখন কোনো দেশ যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা কূটনৈতিক ভাঙনের পর অন্য দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় আচরণ সম্পর্কে একটি প্রতীকী বার্তা দেয়। কিন্তু যখন একটি বেসরকারি মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনৈতিক চাপের মুখে কোনো বিদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেয়, তখন বিষয়টি অনেক বেশি অস্পষ্ট ও সমস্যার হয়ে ওঠে। এতে একজন ব্যক্তিগত পেশাদার খেলোয়াড়কে গোটা একটি দেশের রাজনীতির প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়।

এটি বাংলাদেশের বিষয়ে বাস্তব উদ্বেগ অস্বীকার করার বিষয় নয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বৈরী রাজনৈতিক ভাষ্য, এবং ঢাকার সাম্প্রতিক কৌশলগত সংকেত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাস্তব ও যুক্তিসংগত। এসব গুরুতর বিষয় দৃঢ় কূটনৈতিক আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু যাদের হাতে কোনো নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা নেই, যারা কোনো উসকানি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ নন- এমন ক্রীড়াবিদদের নিশানা করে সেই উদ্বেগের সমাধান হয় না। বরং উল্টো, এতে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়; দেশটিকে নীতিনিষ্ঠ নয়, বরং আবেগতাড়িত ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াশীল বলে মনে হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট শুরু থেকেই সহাবস্থানের এক পরীক্ষাগার। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের খেলোয়াড়রা একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেন, একে অপরের সাফল্য উদযাপন করেন এবং এমন দর্শকদের সামনে খেলেন যারা জাতীয়তার চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এতে কখনোই ভারতের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়নি; বরং এটি ভারতকে একটি আত্মবিশ্বাসী, উন্মুক্ত ক্রীড়াসংস্কৃতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক প্রদর্শনীর জন্য সেই পরিসরকে দুর্বল করা কৌশলগত আত্মঘাতের শামিল। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রতিক্রিয়া আরেকটি অস্বস্তিকর প্রবণতাও উন্মোচন করেছে- পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য খেলাধুলাকে কত সহজে অস্ত্র বানানো হচ্ছে। যখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, আর খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করা হয় পারফরম্যান্স নয়, পাসপোর্ট দেখে- তখন নাগরিক গর্ব ও সাংস্কৃতিক অনিরাপত্তার মাঝের সীমারেখা ঝাঁপসা হয়ে যায়।

এটি জাতীয় শক্তির লক্ষণ নয়। এটি স্নায়ুবিক দুর্বলতার লক্ষণ।
একইভাবে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াও- সম্প্রচার সীমিত করা বা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার হুমকি, সংযম নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোর রাজনীতিকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশীরা প্রতীকী প্রতিশোধে লাভবান হয় না। তারা লাভবান হয় সংযম, যোগাযোগ এবং এই বোধ থেকে যে, প্রতিটি উসকানি জোরালো হওয়ার যোগ্য নয়।
এর একটি গভীরতর ক্ষতিও আছে। যখন প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা ক্রিকেট মাঠে গড়ায়, তখন খেলাধুলা তার অনন্য ভূমিকা, একটি নিরপেক্ষ মিলনস্থল হারাতে থাকে। তখন ক্রিকেটও হয়ে ওঠে অভিযোগের আরেকটি মঞ্চ, রাজনৈতিক পয়েন্ট স্কোরিংয়ের আরেকটি ক্ষেত্র। এই ক্ষতি আমরা বহন করতে পারি না।
ভারতের প্রকৃত শক্তি বরাবরই ছিল তার বৈপরীত্য ধারণ করার ক্ষমতা কঠোর কিন্তু ভঙ্গুর নয়, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু রূঢ় নয়, নীতিনিষ্ঠ কিন্তু দণ্ডনির্ভর নয়। যদি আমরা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সত্যিই সম্মান পেতে চাই, তবে আমাদের প্রমাণ করতে হবে- কখন সীমারেখা টানতে হয়, আর কখন তা না করাই শ্রেয়।
একজন ক্রীড়াবিদকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিতে পরিণত করা রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ নয়।
এটি নিছক নাটক।
দীর্ঘমেয়াদে, এই নাটক ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/198499_1620745538_1606617524_5fc309b4f2a13_mustafizur-rahman.jpg

Monday, January 12, 2026

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

ডনের সম্পাদকীয়ঃ দীর্ঘ ১৪ বছর পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হতে যাচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-করাচি রুটের প্রথম ফ্লাইট উড্ডয়ন করবে আগামী ২৯ জানুয়ারি। শুরুতে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। নতুন করে ফ্লাইটের এই যাত্রা শুরু হওয়াকে একদিকে যেমন স্বাগত জানাতে হয়, তেমনি এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং পর্যটন, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক সহযোগিতা ও বহুদিনের বঞ্চিত ‘পারিবারিক পুনর্মিলন’-এর পথও সুগম হবে।

গত বছর করাচি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হলেও, আকাশপথে যাত্রীরা এতদিন দুবাই ও দোহাসহ বিভিন্ন ট্রানজিট রুট ব্যবহার করতে বাধ্য ছিলেন। কারণ পাকিস্তানি বিমান ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা ফেরায় কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই নতুন যাতায়াতের সুবিধা এবং পাকিস্তান থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে ঢাকার আগের ঘোষণাগুলো উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। অনলাইন ডনে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, ইতিহাসের বিভাজনরেখা আমাদের বহু দশক ধরে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাই নতুন করে পথচলা শুরু করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অঙ্গীকার এবং একে অপরের জীবনাচরণ ও বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়ার মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করেই তা গড়ে তুলতে হবে। পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যে প্রবেশের বিস্তৃত সেতুবন্ধন। একইভাবে, বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান হয়ে উঠতে পারে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার প্রবেশদ্বার।

নিঃসন্দেহে, ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত সক্ষমতা দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শক্তিশালী ও বিকশিত ওষুধ শিল্প পাকিস্তানের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও ওষুধ সহায়তায় অবদান রাখতে সক্ষম।

অপরদিকে, পাকিস্তানের বিশ্বমানের ক্রীড়া ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, উভয় দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এই সংযোগ থেকে পারস্পরিক বিনিয়োগ, কৃষি সহযোগিতা এবং খাদ্য সংকট মোকাবিলার মতো নানা ক্ষেত্রে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সর্বোপরি, এই যোগাযোগ পারস্পরিক সদ্ভাব ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংহতি জোরদার করতে সব অংশীজনের সম্মিলিতভাবে এসব উদ্যোগকে সমর্থন ও এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

mzamin

Wednesday, December 31, 2025

তারেক রহমানের ফেরা মোড় বদলের সূচনা হতে পারে

স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ প্রায় দুই দশকের নির্বাসনজীবন শেষে তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়। এটি দেশে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পুনর্গঠনের এক সুনির্দিষ্ট মুহূর্তকে চিহ্নিত করে। এটি সেই মুহূর্ত যখন দেশে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা, বৈধতা ও ‘মেমোরি’ পুনর্বিন্যাস ঘটছে একসঙ্গে। শেখ হাসিনার পতনের পর যে রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, সেখানে তারেক রহমানের আবির্ভাব নতুন এক বিকল্প ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। বহু বাংলাদেশির কাছে তিনি ভাঙনের নয়, ধারাবাহিকতার প্রতীক। জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারী ও বিএনপি’র প্রধান মুখ হিসেবে দীর্ঘদিনের বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক পরিচিত ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন। তবুও সময়ের গুরুত্ব থেকেই যায়। বিএনপি’র  ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা লিখেছে ভারতের প্রভাবশালী দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা।

তার প্রত্যাবর্তন এমন এক মুহূর্তে ঘটেছে, যখন বছরের পর বছর দমনপীড়ন, সহিংস আন্দোলন ও বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ভিত ক্ষয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত মুখ আশ্বাস জাগাতে পারে- যদিও তার সঙ্গে থাকে অমীমাংসিত অনেক বিষয়। আগের সরকার পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো খারিজ হয়ে গেছে। সমর্থকদের কাছে এই অব্যাহতি পাওয়া সাবেক সরকারের নিপীড়নের প্রমাণ হলেও, সমালোচকদের দৃষ্টিতে জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে। বিপদটি এখানেই- আইনি সমাপ্তিকে যদি নৈতিক নিষ্পত্তি বলে ভুল ধরা হয়। স্বচ্ছ বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া স্থিতির বিনিময়ে রাজনৈতিকভাবে বিস্মৃতি যদি মূল্য হিসেবে গৃহীত হয়- তবে সেই হিসাবনিকাশ অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তবে জনতার উচ্ছ্বাসকে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জনতার উচ্ছ্বাস ও সমর্থন ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নির্বাহী আধিপত্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়।

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কাঠামো, স্বাধীন আদালত ও রাজনৈতিক সংযমের সংস্কৃতি না থাকলে তাতে ঝুঁকি থেকেই যায়। সেই অর্থে আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল আসনসংখ্যার অঙ্কে নয়- বরং এই প্রশ্নে যে, এখান থেকে কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পূর্বতন শাসকদল কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ায় এই প্রতিযোগিতা প্রতিনিধিত্বের চেয়ে উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে রূপ নেয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তারেক রহমানের জনসমর্থননির্ভর জনপ্রিয়তা দলগত সাংগঠনিক শক্তি ও জমে থাকা বিরোধী শক্তির উন্মোচন ঘটালেও একই সঙ্গে তাতে রাজনৈতিক বিকল্পের পরিসর প্রসারিত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পাল্টা ভারসাম্য নিয়েও আলোকপাত করে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রূপান্তরকে তাই আবেগহীন ও সতর্ক বিবেচনায় দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশীই নয়- আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত-পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সংযোগের এক কৌশলগত অংশীদার। তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পুনর্মিলনের বদলে বর্জনের মাধ্যমে জন্ম নেয়া কোনো সরকার দেশে প্রাথমিক বৈধতা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সংহতি ও বহির্বিশ্বের আস্থার পরীক্ষায় পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল নেতৃত্বের নয়- শেখারও পরীক্ষা। যদি বাংলাদেশের পরবর্তী অধ্যায় কেবল পুরনো রাজনৈতিক ভারসাম্যকেই নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনে, তবে অভিযোগ-প্রতিকারের এই চক্র ঘুরতে থাকবে। কিন্তু যদি এই মুহূর্তটি ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রিকীকরণ নয়, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে তারেক রহমানের এই ঘরে ফেরা পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস নয়, বরং এক সম্ভাব্য মোড় বদলের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

mzamin

খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার নিন্দায় ভারতের দুই প্রভাবশালী দৈনিক, মোদি–বিজেপি নীরব

বড়দিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে ভারতজুড়ে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আজ শনিবারেও নীরব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ নিয়ে এখনো মুখ খোলেননি। তবে প্রথম সারির সর্বভারতীয় দৈনিকগুলো মুখ খুলেছে। সম্পাদকীয় স্তম্ভে গুন্ডাদের শাস্তির দাবি জানানোর পাশাপাশি লেখা হয়েছে, স্বঘোষিত ধর্মপ্রহরীদের দাপাদাপি বন্ধ করা প্রয়োজন।

বড়দিন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়াদিল্লির এক গির্জায় প্রার্থনা জানান। প্রার্থনা শেষে সামাজিক মাধ্যমে শান্তি, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও শুভেচ্ছার বার্তা দেন। অথচ তার আগের দিন থেকে বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হানতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা অগ্রাহ্য করে বড়দিনের দিনেও হামলা অব্যাহত থাকে।

বিস্ময় এই যে ভারতজুড়ে ওই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত একটি কথাও বলেননি। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিজেপিও ঘটনাপ্রবাহের নিন্দা করে কোনো বিবৃতি প্রচার করেনি। শুধু মধ্যপ্রদেশ বিজেপির জব্বলপুর শাখা দলের অন্যতম নেত্রী অঞ্জু ভার্গবকে একটি চিঠি দিয়ে বলেছে, তাঁকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।

মধ্যপ্রদেশের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বড়দিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী খ্রিষ্টান নারীর সঙ্গে অঞ্জু দুর্বব্যহার করছেন।

চলতি বছর বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দেশজুড়ে যেভাবে বড়দিন উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে, অতীতে তা হয়নি। বিজেপিশাসিত রাজ্য আসাম, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, ওডিশা এবং দিল্লির পাশাপাশি বামশাসিত রাজ্য কেরালা ও আম আদমি পার্টি শাসিত (আপ) পাঞ্জাবে এই দুই সংগঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) বড়দিন উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে। বড়দিনের উৎসবে মেতে ওঠা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকেও বাধা দেওয়া হয়।

বিপণিবিতান থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের দোকানে বিক্রির জন্য রাখা ক্রিসমাস ট্রি, সান্তার টুপিসহ অন্য সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদীরা। গির্জায় ঢুকে ক্যারল গাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দুস্তান টাইমস উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আজ শনিবারের কাগজে সম্পাদকীয় লিখেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ‘পানিশ দ্য গুনস্, হোয়াই বিজেপি শুড রেসপন্ড স্ট্রংলি টু ক্রিসমাস অ্যাটাক্‌স’ এবং হিন্দুস্তান টাইমসের শিরোনাম ‘নো প্লেস ফর ফেথ ভিজিল্যান্টেস: অ্যাটেম্পটস টু ডিসরাপ্ট ক্রিসমাস সেলিব্রেশনস গো অ্যাগেইনস্ট ইন্ডিয়াস সিভিলাইজেশনাল ইথস’।

দেশজোড়া তাণ্ডবের বর্ণনা দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আচরণ ঘৃণ্য বেদনাদায়ক ও লজ্জার। তারা ক্রিসমাসের জন্য জমায়েত মানুষদের হয়রান করেছে। ক্যারল গাইয়েদের ভয় দেখিয়ে গান থামিয়েছে। স্কুল ও গির্জায় জবরদস্তি ঢুকে পড়েছে। সান্টা ক্লজের টুপি বিক্রেতা গরিব মানুষদের মারধর করেছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, কেরালা ছাড়া আর কোথাও পুলিশ কি এই অপরাধ নজরে এনেছে? ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬(২) ও ২৯৯ ধারায় এফআইআর দাখিল করেছে, যে ধারায় মানুষে মানুষে শত্রুতা বাড়ানো বা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে? ভিডিও দেখে যাদের সহজেই শনাক্ত করা যাচ্ছে, তাদের কাউকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? এরা সবাই উৎসবের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য দায়ী।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিজেপি ও আরএসএসকে এই জঙ্গিপনা বন্ধ করতে হবে। এরা শুধু দলের ক্ষতিই করছে না, এরা হিন্দু বিরোধীও। ধর্মের নামে কোনো হিন্দু এই বর্বরতা অনুমোদন করে না। ইউনাইটেড ক্রিশ্চান ফোরাম অভিযোগ জানিয়েছে, এই বছর বড়দিনের সময় সারা দেশে এমন ধরনের ৬০০–এর বেশি ঘটনা ঘটেছে। গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। একটি ছাড়া সব কটি রাজ্যই বিজেপিশাসিত। দলটি দেশেরও শাসক। এতে বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণে আরও বেশি করে বিজেপি নেতৃত্বের সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার তুলনায় হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাকদীয় দীর্ঘ। প্রধানমন্ত্রীর গির্জায় যাওয়া, প্রার্থনা করা এবং সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার উল্লেখের পর তারা লিখেছে—আসাম ও ছত্তিশগড়ে সংঘ পরিবারের ধর্মপ্রহরীরা কীভাবে বড়দিনের আগে থেকেই খ্রিষ্টানদের হয়রান করেছে, উদ্‌যাপন বানচাল করেছে।

মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীকে বিজেপি নেত্রীর হেনস্তা করার ভিডিওটি বিরক্তিকর জানিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ছত্তিশগড়ে বড়দিনের দিন বন্‌ধ্‌ পালনের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী প্রহরীরা ভয়ের যে বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল, যা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল, সেটার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মত দেয়। শুধু আইনগতভাবে নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও কম। প্রধানত উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও কেরালায় তাদের অবস্থান জানিয়ে উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, সংবিধান সবাইকে বাধাহীন ধর্মাচরণের স্বাধীনতা দিয়েছে। সর্বভারতীয় স্তরে ধর্মান্তরণ বিরোধী কোনো আইন নেই। কোনো কোনো রাজ্য এই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছে, জবরদস্তি অথবা লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তরণ বন্ধ করতে। ধর্মপ্রহরীরা সেই আইনকেই হাতিয়ার করে অহিন্দুদের হেনস্তা করছে।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়, রাষ্ট্রের উচিত এই ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকেও সক্রিয় হওয়া জরুরি, যাতে কেউ লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম না করে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতের প্রলেপ হবে।

সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, বিজেপির বোঝা উচিত, ধর্মপ্রহরীরা তাদের ক্ষতি করছে। বিজেপি নেতৃত্বের বোঝা উচিত এদের প্রশ্রয় দিলে সম্প্রীতির জন্য দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বার্তা বিফলে যাবে। ভারতীয় সভ্যতার মূল মন্ত্র ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, যার অর্থ—গোটা পৃথিবীই এক পরিবার।

ভারতের বিহারে ক্যাথলিক গির্জায় শিশু জেসাসকে চুমু দিচ্ছেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এক নারী। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাটনা
ভারতের বিহারে ক্যাথলিক গির্জায় শিশু জেসাসকে চুমু দিচ্ছেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এক নারী। ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, পাটনা। ছবি: এএনআই

Tuesday, December 30, 2025

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে ফাটল, দায়ী ভারতের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব

ডনের সম্পাদকীয়ঃ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম তরুণ ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। হাদির সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের একটি অংশের দাবি, ভারতের ইন্ধনেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের সম্পাদকীয় বলছে, দিল্লির বড় ভাইসুলভ ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবই সমস্যার প্রধান কারণ; দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি চাইলে সবাইকে একে অন্যের সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা চালায় একটি হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠী। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য শহরেও বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ভারতের উগ্রবাদী সংগঠন ভিএইচপি (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ) ময়মনসিংহে এক বাংলাদেশি হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে কূটনৈতিক মিশনে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। জবাবে দিল্লিতেও বাংলাদেশি প্রতিনিধি একই ধরনের তলবের মুখে পড়েন। যা কার্যত কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের শীর্ষ কূটনীতিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। অন্যদিকে, ভারত সরকার এসব ঘটনাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে, বিশেষ করে উগ্রবাদী জনতার মাধ্যমে বাংলাদেশি মিশনে হামলার বিষয়টি।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ওয়াজেদের শাসনামলে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত। তবে গত বছর তার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন খুনি ভারতে পালিয়ে গেছে। এমন খবর বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ভারতের বড়ভাইসুলভ ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব। হাদির হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে দিল্লির উচিত ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতা করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হলে প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রই নিজেকে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে অন্যদের ওপর প্রভাব খাটাতে বা ভয় দেখাতে পারে না। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই স্থিতিশীল ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।

mzamin

Tuesday, December 16, 2025

বাংলাদেশে অস্বস্তিকর শূন্যতা

দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং একই সঙ্গে জুলাই সনদ নিয়ে একটি গণভোটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সনদের লক্ষ্য হলো নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তেও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে অস্থির রয়ে গেছে। এখনও রাজনৈতিক অনেক বিষয় অনিষ্পন্ন অবস্থায়। ভারতের প্রভাবশালী দ্য স্টেটসম্যান ‘আনইজি ভ্যাকুয়াম’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে একথা লিখেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয়ভাবে বর্তমানে বাংলাদেশ এক ধরনের অস্বাভাবিকতার মুখোমুখি। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রতিষ্ঠায় হিমশিম খাচ্ছে। আর ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনীতির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে।  তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আইনি ও নিরাপত্তাজনিত বাধাগুলো অনেকটাই দূর হয়েছে। উল্লেখ্য, আগামী ২৫শে ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরছেন বলে এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু দেশে চলমান পরিস্থিতি ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্থবিরতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের দৃঢ় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে তারা। এর মাধ্যমে তারা এমন এক বয়ান তৈরি করছে, যা দেশের বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক চেতনার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তারা মধ্যপন্থী রাজনীতির প্রতি জনআস্থা দুর্বল করার চেষ্টা করছে। এতে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং দেশের নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তিকেও আঘাত করা হচ্ছে।

একই সময়ে, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা আওয়ামী লীগও তীব্র বিশ্বাসযোগ্যতায় সংকটে পড়েছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাসনে, এবং জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষের সঙ্গে যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারায় বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় দলটি প্রায় প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এরই মধ্যে এ দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

এই শূন্যতা কেবল দলীয় দ্বন্দ্বের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র দখলের লড়াই- যে কেন্দ্র ঐতিহাসিকভাবে উদার, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এই অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করছে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান, যারা মধ্যপন্থী-উদার রাজনৈতিক জায়গা দখলের চেষ্টা করছে।

এই নতুন দলগুলো বিএনপির সম্ভাব্য সমর্থনে ভাগ বসাতে চাইছে। আর ভাসমান ভোটাররা গভীর উদ্বেগ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা নেতৃত্বের দৃশ্যমান উপস্থিতি, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও আদর্শিক স্পষ্টতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করছে- একটি অত্যন্ত মেরুকৃত পরিবেশে।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে, কেন্দ্রের দিকে তাদের মনোযোগ দেয়া; অন্যদিকে, নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা। দলটি পূর্বের ইসলামপন্থী মিত্রদের থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিজেকে একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। কিন্তু এই কৌশল অনেকটাই প্রতিক্রিয়াশীল- যে দৃঢ়তা ও আগ্রাসী বয়ান নির্মাণ প্রয়োজন, তা এতে অনুপস্থিত।

বিশেষ করে সেই ভাসমান ভোটাররা- যারা ইসলামপন্থী প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত, আবার প্রচলিত দলীয় রাজনীতির প্রতিও সন্দিহান- তারা এখনো বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এর প্রভাব কেবল বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক কেন্দ্র যদি ইসলামপন্থী আধিপত্যের দিকে সরে যায়, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্তপারের সহযোগিতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, বিএনপি যদি নিজেদের অবস্থান সফলভাবে পুনর্গঠন করতে পারে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা বহুত্ববাদকে শক্তিশালী করবে এবং গণতান্ত্রিক মানদণ্ডকে আরও সংহত করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নেতৃত্বের উপস্থিতি, রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণ এবং আদর্শিক বিশ্বাসযোগ্যতা- এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে দেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক কেন্দ্র টিকে থাকবে, নাকি তা চরম মেরুকরণের কাছে নতি স্বীকার করবে।

আগামী কয়েক মাস কেবল কে দেশ শাসন করবে তা নির্ধারণ করবে না; বরং আগামী বহু বছরের জন্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক গতিপথ ও সামাজিক সংহতির ভিত্তিও গড়ে দেবে।

mzamin

Thursday, November 20, 2025

মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হাসিনা

ডনের সম্পাদকীয়ঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ একসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। গত বছর গণবিক্ষোভের সময় তার সরকারের কর্তৃত্বমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডন এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলেছে। এতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের বাইরে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি রায়ের বিষয়ে বলেছেন, এটি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘প্রস্তুতিপ্রসূত ট্রাইব্যুনালের’ সিদ্ধান্ত। কঠোর রায় দেয়া ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার শাসনামলে এই আদালত তার বেশ কিছু প্রতিপক্ষকে, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ ও বিএনপি’র নেতা ও কর্মীদের, ১৯৭১ সালের সহিংসতায় জড়িত থাকার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তখন অনেকেই এই বিচার প্রক্রিয়াকে অনৈতিক ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করেছিলেন। এখন শেখ হাসিনা নিজেই সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিকার হয়ে গেছেন।

যদিও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু এ বিষয়ে বিতর্ক কম যে, শেখ হাসিনার শাসন ক্রমবর্ধমানভাবে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল। তার আশেপাশের নিকটজনদের সমৃদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিপক্ষদের করা হয়েছে হেনস্থা। গণতান্ত্রিক নীতিমালা উপেক্ষিত হয়ে, শেখ হাসিনা, তার পিতা শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের চারপাশে একটি ব্যক্তিগত রাজনীতি গড়ে তোলেন।

শেখ হাসিনার কঠোর শাসন গত বছরের গণরোষে বিস্ফোরিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতন এবং ভারতের স্বেচ্ছানির্বাসে পাথেয় হয়। স্পষ্ট যে, ২০২৪ সালের অস্থিরতায় তার সরকার প্রতিবাদকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে; নিজে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমরা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি।’ এ বছরের শুরুতে তার দলও নিষিদ্ধ হয়, আর তার প্রয়াত পিতা, যিনি একসময় ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে সম্মানিত ছিলেন, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ের পরও, দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। শেখ হাসিনার শাসনের সময় যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, তা প্রতিবাদ দমন এবং বিরোধী দলের ওপর অব্যাহত আক্রমণে প্রতিহত হয়েছে। আজ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মুখোমুখি। আগামী বছর নির্বাচন হবে, এবং অস্থায়ী কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃস্থাপন করতে হবে। নির্বাচন যাতে বিশ্বাসযোগ্য হয়, সেজন্য আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়ার বিষয় ভাবতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের নির্বাচন, যা বিরোধীরা বয়কট করেছিল, যা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল, তা নিরপেক্ষ বিবেচিত হয়নি। এটি তার সরকারের পতনের মূল কারণগুলির একটি। তাই পরবর্তী নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন, যাতে প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে।

যারা অপরাধে দায়ী তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে প্রক্রিয়া যদি প্রতিশোধমূলক হয়, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তি দিয়ে, তাহলে তা কেবল অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। পরিপক্ব রাষ্ট্রগুলো বিচারের দাবি এবং পুনর্মিলনের প্রয়োজনের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রক্ষা করে।

ন্যায্যবিচার ও ক্ষতিপূরণ অপরিহার্য
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টঃ বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘বাংলাদেশে হাসিনার কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ক্ষোভ ও বেদনা রয়েছে। তবে সব আইনগত প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হতে হবে। হাসিনার শাসনামলে যারা ভয়ঙ্কর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদেরকে ন্যায্য ও স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে দায়ী করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনার সরকারের অধীনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের জন্য স্বচ্ছ, স্বাধীন ও ন্যায্য বিচার ও ক্ষতিপূরণ অপরিহার্য। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আসামিদের অধিকার রক্ষা করা উচিত। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের তিন সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ ও দমন কর্মকাণ্ডে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন। যারা নির্যাতনের জন্য দায়ী তাদের দায়ী করা উচিত। কিন্তু প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোপুরি আসামিপক্ষের প্রতিনিধিত্ব উপস্থাপনের সুযোগ না দেয়া, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসা করার অধিকার এবং নিজের নির্বাচিত আইনজীবী দ্বারা প্রতিনিধিত্বের অধিকার।

মৃত্যুদণ্ডের কারণে বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, জোরপূর্বক নিখোঁজ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনসহ হাসিনার সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

mzamin

Saturday, October 18, 2025

ছিনতাই ও মাদক মামলায় জামিন: আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি

ঢাকা মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কোনোভাবেই কাটছে না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে এই উদ্বেগ না কাটার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মধ্যে একটি ছিনতাইসংক্রান্ত এবং অন্যটি মাদকসংক্রান্ত।

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের অভিযোগে যাঁরা আটক হয়েছিলেন, গত তিন মাসে তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ১০৮ জন আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মাদক পাচারকারীকে আটকের পর মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তিনি জামিন পেয়েছেন। এ দুটি ঘটনাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ছিনতাই রাজধানীবাসীর জন্য একটি অব্যাহত ভয়ের নাম। বাসে, রাস্তায়, এমনকি বাড়ির আশপাশেও মানুষ এখন নিরাপদ বোধ করে না। পুলিশ প্রায় প্রতিদিনই এসব অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের খবর দেয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আদালতের দরজা পেরোতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা খুব সহজে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। ফলে গ্রেপ্তার হওয়া ও দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার এক অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। এই চক্র আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

অপর দিকে মাদক দেশের সামাজিক কাঠামোকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজের তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এই অভিশাপে। অথচ একজন মাদক পাচারকারী গ্রেপ্তারের মাত্র ৩১ ঘণ্টার মাথায় জামিন পেলেন—এ খবর জনমনে নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মাদক মামলায় জামিন এত দ্রুত মঞ্জুর হওয়া কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ মহলের প্রভাব রয়েছে—এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অধিকার রক্ষা করা নিশ্চয়ই জরুরি বিষয়। তবে একই সঙ্গে জননিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় যদি অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়, তবে তাঁরা আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবেন—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

এ রকম বহু উদাহরণ আছে, যেখানে জামিনে মুক্ত আসামিরা আবারও একই অপরাধে ধরা পড়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা যদি অপরাধীদের প্রতি এমন নমনীয়তা প্রদর্শন করে, তবে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হবেন। এর মানে জনগণকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে আর অপরাধীরা পাচ্ছেন পুনরায় অপরাধ করার সুযোগ।

এই পরিস্থিতিতে সরকার, আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জামিন প্রক্রিয়ায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা জরুরি, বিশেষ করে ছিনতাই ও মাদক মামলার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের কার্যকলাপের ওপর নজরদারি এবং প্রয়োজনে জামিন বাতিলের প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

এ ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে হবে, যাতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের কোনো রকম সুবিধা না দেয়। মামলার তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আদালতের সিদ্ধান্তে আস্থা তৈরি হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি।

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু অপরাধীরা যদি গ্রেপ্তারের পরপরই মুক্তি পেতে থাকেন, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। এসব ঘটনা শুধু রাজধানীর নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সমগ্র বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে নষ্ট করছে।

এখন সময় এসেছে বিচারব্যবস্থার ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। তা না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা ভয়াবহ সংকটে রূপ নেবে। এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

Thursday, October 16, 2025

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নামে আপাতত শুধুই ‘শব্দ-বিস্ফোরণ’

ডনের সম্পাদকীয়ঃ বিশ্বনেতারা যখন মিশরের লোহিত সাগর তীরবর্তী রিসোর্ট শার্ম আল-শেখে জড়ো হয়েছিলেন তখন সেখানে ভূ-রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চায়ন এবং অতিশক্তিই যেন বাস্তবতার স্থান দখল করে নিল। সমবেত বিশিষ্টজনেরা মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি’ উদ্‌যাপন করলেন। দলের নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হামাস-ইসরাইল সংঘাত ও গাজা শান্তি পরিকল্পনার উল্লেখ করে আত্ম-অভিনন্দনের মুহূর্তে ঘোষণা করেন, অবশেষে  দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক দুঃস্বপ্নের অবসান হয়েছে। যদিও দূরদর্শী লক্ষ্য এখনও অধরা।

প্রাথমিকভাবে গাজায় গণহত্যা নিশ্চিতভাবে থামলেও  অধিকৃত ফিলিস্তিনে একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি অর্জন এখনও বহু দূরের বিষয়। গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন। যার মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসাও রয়েছে। পাক নেতা আবারও ট্রাম্পকে নোবেল দেওয়ার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তাকে‘লাখ লাখ’ জীবন বাঁচানোর’ কৃতিত্ব দেন। যদিও ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার সারবস্তু সামান্যই।

প্রথমত, একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো স্পষ্ট পথরেখা ট্রাম্পের পরিকল্পনায় নেই। যদিও মিশরের প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, এই চুক্তি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শান্তির জন্য আরও বিস্তৃত ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিও দ্বিতীয় ইন্তিফাদার বিশৃঙ্খলার মধ্যে ভেঙে পড়ে। এর প্রধান কারণ ছিল প্রকৃত শান্তির প্রতি ইসরাইলের আন্তরিকতার অভাব।

তদুপরি, গাজার উপর নজরদারি করার জন্য বিদেশি শাসন, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ধারণা এবং বিদেশি সৈন্য মোতায়েনের বিষয়টিও রয়েছে। যা গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়। এই অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিতদের লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ‘শান্তিরক্ষীদের’ সংশ্লিষ্টতার কথা মনে রাখা উচিত।  ইরাকে ‘জাতি গঠন’-এর ব্যর্থতাও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

সংক্ষেপে, গাজা বা পশ্চিম তীর—কোনোটাই বিদেশি বাহিনীর দ্বারা শাসিত হওয়া উচিত নয়। সব মতের ফিলিস্তিনি দলগুলোর একত্রিত হওয়া এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের ভূখণ্ড নিজেরাই পরিচালনা করা উচিত।

আরেকটি সত্য হচ্ছে শার্ম আল-শেখের এই ‘শান্তি’ উদ্‌যাপনের মাঝে গাজায় গণহত্যার বিষয়ে ইসরাইলের  কোনো জবাবদিহিতার উল্লেখ ছিল না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জায়নবাদী রাষ্ট্রটি দশকের বেশি সময় ধরে এমনভাবে কাজ করছে যেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে। নাকবা’র সময় থেকে শুরু করে তারা ফিলিস্তিনিদের হত্যা, অঙ্গহানি এবং জমি দখল করে চলেছে। ইসরাইল তাদের পূর্বের দায়মুক্তির জন্য শাস্তি না পাওয়ায়, তারা গাজায় হত্যাকাণ্ড চালাতে এমন এমন সাহস দেখিয়েছে।

এই অঞ্চলে যদি প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয় তবে দুটি বিষয় অপরিহার্য। প্রথমত, তেল আবিবে যারা হাজার হাজার গাজাবাসীর হত্যা ও অনাহারের জন্য দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশ্বকে অঙ্গীকার করতে হবে যে গাজার মতো আরেকটি গণহত্যা আর কখনও হবে না। দ্বিতীয়ত, একটি সার্বভৌম ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দিকে একটি দৃঢ় পথরেখা তৈরি করতে হবে। এর চেয়ে কিছু কম হলে তা কেবল সহিংসতার চক্রকেই স্থায়ী করবে। কারণ ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকার দিতে অস্বীকার করছে।

mzamin

Thursday, September 18, 2025

সাপে কাটার চিকিৎসা: প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিষেধক সহজলভ্য করুন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ৭০ দিনে ৩৫০ জনের বেশি সাপে কাটা রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, রাসেলস ভাইপারের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এই বছর সাতজন আইসিইউতে ভর্তি রোগীর মধ্যে ছয়জনই মারা গেছেন। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।

বৃষ্টির মৌসুমে গ্রামগঞ্জে সাপের আনাগোনা বৃদ্ধিতে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। আর এমন রোগীর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত চিকিৎসা। দুঃখজনক হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমনকি উপজেলা পর্যায়েও অনেক হাসপাতালে প্রতিষেধক পাওয়া যায় না। ফলে বিভাগীয় হাসপাতালে বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে নিতে রোগীর আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজশাহীতেও রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে মারা যাচ্ছেন।

সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুতর বিষয় হচ্ছে, এখনো গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কার আর ওঝার ওপর নির্ভরতার প্রবণতা প্রবল। অনেক ক্ষেত্রে সাপে কাটার পর রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে প্রথমেই ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে মূল্যবান ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নষ্ট হয়ে যায়। সাপে কাটা রোগীর ক্ষেত্রে গোল্ডেন আওয়ার বলতে সাপের কামড়ের পর থেকে প্রথম ১০০ মিনিটকে বোঝানো হয়। এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়ের মধ্যে অ্যান্টিভেনম বা প্রতিষেধক দেওয়া গেলে সাপের বিষের প্রভাব কমানো যায় এবং রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে।

এমন পরিস্থিতিতে গণসচেতনতা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুলশিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি যেমন ইমাম, পুরোহিতদের গণসচেতনতার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারে। তবে এটি অবশ্যই জরুরি যে নিকটস্থ হাসপাতালে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রতিষেধক থাকতে হবে। তখন মানুষের মধ্য সাপে কাটা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়বে।

কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের মাঠে কাজ করার ক্ষেত্রে গামবুট পরার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু গামবুট কেনার সামর্থ্য অনেক কৃষকের নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি দিয়ে কম মূল্যে গামবুট বিতরণ করতে পারে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ানো প্রয়োজন। সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাসস্থান ও কৃষিকাজ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি ইত্যাদি উদ্দেশ্যে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছে। ফলে প্রাণীরা কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বাধ্য হয়ে লোকালয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পিটিয়ে সাপ মারার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ মানুষ জানেই না, একটি সাধারণ সাপ বা ব্যাঙও পরিবেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষা ও প্রাণী রক্ষার বিষয়টি নিয়েও গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

Tuesday, September 9, 2025

কাঠমান্ডু পোস্টের সম্পাদকীয়: হত্যাযজ্ঞের দায় ওলি’র, পদত্যাগ ছাড়া বিকল্প নেই

এটি ছিল গণতান্ত্রিক নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার দিন। সোমবার কাঠমান্ডু ও দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই স্কুল ও কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণী। তাদের অধিকাংশের মাথা বা বুকে গুলি করা হয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্টের সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে চলমান উত্তেজনা, সহিংসতা নিয়ে। এতে আরও বলা হয়, জেন-জি প্রজন্মের এই তরুণরা যে সমাজকে নিজেদের ঘর বলে ডাকে, সেই সমাজের অসঙ্গতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। এসব অনুমোদিত বিক্ষোভ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ যখন তরুণরা রাস্তায় নামে, তখন মনে হলো সরকারের কাছে সেই চাপ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হলো প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ। এমনকি স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের ওপরও।
https://mzamin.com/uploads/news/main/179253_Abul-8.webp
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি

সোমবারের এই হত্যাযজ্ঞের দায়ভার প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির কাঁধেই বর্তায়।
না, নেপালি যুবকদের এভাবে গণহত্যা পুলিশি অযোগ্যতা বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশাসনিক শৃঙ্খলাজনিত সমস্যার অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট জবাব চাই দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বসা ব্যক্তির কাছ থেকেই। ওলি সবসময়ই তার তীক্ষ্ণ বাক্য ও জনমতের প্রতি প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীনতার জন্য পরিচিত। কয়েকদিনে তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে, তিনি জেন-জি প্রজন্মকে শোনার মতো যোগ্য মানুষ বলেও মনে করেন না।
অধিকন্তু, সোমবারের দিনে পুলিশের স্বল্প উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়, সরকার একটি বড় জনসমাগম হবে বলে ধারণাই করেনি। অথচ এটি ছিল ভয়াবহ ভুল হিসাব, তরুণদের ক্ষোভের প্রতি সম্পূর্ণ অন্ধত্ব। বিশেষত ২৮ মার্চের রাজতন্ত্রপন্থি সমাবেশে নিরাপত্তা ব্যর্থতার ঘটনা- যেখানে দু’জন নিহত ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। তারপরও সরকারের এমন গাফিলতি অকল্পনীয়।

এই জবাবদিহির অভাবই সবচেয়ে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সোমবার সন্ধ্যায়ও যখন তরুণদের মৃতদেহের সংখ্যা বাড়ছিল, তখনও সরকার দায় চাপাচ্ছিল তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ওপর। অনুপ্রবেশ ছিল কি না তা হয়তো অন্যদিনের আলোচনার বিষয়। কিন্তু আজ বার বার বলতে হয়- এই ট্র্যাজেডির মূল দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর। তিনিই হঠাৎ রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে বিক্ষোভের জন্ম দেন। তিনিই জেন-জি প্রজন্মকে বিদ্রুপ করে তাদের উত্তেজিত করেন। আর তার প্রশাসনের অধীনেই পুলিশ নির্দয়ভাবে মানুষ হত্যা করেছে। এবার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিরপরাধ নাগরিক হত্যার প্রধান নায়ক হিসেবে তার পদত্যাগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেবল তার পদত্যাগের মাধ্যমেই সোমবারের হত্যাযজ্ঞের জন্য প্রকৃত জবাবদিহি শুরু হতে পারে।

মঙ্গলবার সানেপায় শাসকদল নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে জেন-জি আন্দোলনকারীরা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন কাঠমান্ডু পোস্ট। এতে বলা হয়, সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে ১৯ তরুণ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর থেকেই এ আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করে। এ ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে দুর্নীতি ও কুশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ সড়ক বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ও বড় বড় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। কাঠমান্ডু উপত্যকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। অশান্তি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।

Thursday, June 12, 2025

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত: আর কত পর্যটকের মৃত্যু দেখতে হবে

ঈদের ছুটিতে সর্বাধিক পর্যটক সমাগম ঘটে দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে। পর্যটকের চাপ সামলানোর জন্য যে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার কথা, সেটা নেই বললেই চলে। ফলে পর্যটকের মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক ঘটনাও সেখানে ঘটছে। এবারের ঈদের ছুটিতে দুই দিনেই অন্তত ছয়জন পর্যটক সমুদ্রে গোসল করতে নেমে মারা গেছেন। বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও এর কোনো কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত বলা হলেও কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্ভবত সবচেয়ে করুণই বলতে হবে। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মাত্র পাঁচ কিলোমিটারে কিছু লাইফগার্ড ও বিচকর্মী থাকেন, বাকি সৈকত এলাকা একেবারেই অরক্ষিত। বিশেষ করে টেকনাফ, হিমছড়ি, ইনানী, দরিয়ানগর—সব জায়গায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলেও নেই কোনো সমন্বিত উদ্ধারব্যবস্থা। পর্যটকেরা গুপ্তখালের হুমকি বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন।

সরকার, হোটেল-মোটেলের মালিক, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি—সবাই এই বিশাল পর্যটনশিল্প থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছে। কিন্তু সেই আয়ের ন্যূনতম অংশও পর্যটকের জীবনের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। এই অবহেলা অমার্জনীয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বছরে কয়েক শ কোটি টাকা আয়ের বিনিময়ে কি একটি সি-নেটিং ব্যবস্থা, আধুনিক লাইফগার্ড ইউনিট বা পর্যাপ্ত মনিটরিং টাওয়ার তৈরি করা যায় না?

বিশ্বের উন্নত সমুদ্রসৈকতগুলোতে নির্দিষ্ট সুইমিং জোন থাকে, যেখানে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশেও এক যুগ আগে এমন এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কয়েক মাসেই ঢেউয়ের ধাক্কায় ধ্বংস হয় এবং তারপর আর কেউ ফিরে তাকায়নি। অথচ ভাঙনরোধ ও নিরাপদ গোসলের জন্য প্রযুক্তিগত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব।

শুধু প্রশাসন নয়, হোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় পর্যটন ব্যবস্থাপনার প্রতিটি অংশীদারও দায় এড়াতে পারেন না। পর্যটকেরা শুধু নিজেরা সচেতন থাকাই যথেষ্ট নয়, তাঁদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, বিচকর্মী ও মনিটরিং ক্যামেরা এখানে যুক্ত করা উচিত। টানা কয়েক দিনের ছুটিতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবী বা খণ্ডকালীন লাইফগার্ড বা বিচকর্মী নিযুক্ত করা যেতে পারে।

যদি পর্যটক সৈকতে গিয়ে প্রাণ হারান, তাহলে সেটির দায় কেবল ‘নিজ দোষে দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। পর্যটক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ, উদ্ধার এবং সেবার জন্য জরুরি তহবিল গঠন করা হোক। হোটেলমালিকদের নিয়েও একটি সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা হোক, যাতে তাঁরা নিরাপদ পর্যটনে অংশ নেন। মানুষ আনন্দ করতে পরিবার–স্বজন–বন্ধু নিয়ে ঘুরতে গিয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে, তা মানা যায় না। আমরা কক্সবাজারে আর কোনো পর্যটকের মৃত্যু দেখতে চাই না।

Sunday, February 18, 2018

বহুমুখী দূষণের কবলে ঢাকা

নানামুখী দূষণের কবলে পড়ে ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে রাজধানী ঢাকা মহানগরী। অথচ বিষয়টিতে ভালোভাবে নজর দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, পরিবেশকে বিষিয়ে তোলার জন্য দায়ী পানি, বাতাস ও শব্দদূষণ ঢাকায় এত বেশি বেড়েছে যে, তা সহনীয় মাত্রার চেয়ে দুই-তিন গুণ ছাড়িয়েছে। এ কারণে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ, মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, এমনকি হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ ও ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এছাড়া খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকসহ নানা সমস্যা তো রয়েছেই। এ অবস্থায় ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে এবং মানুষের স্বাভাবিক সুস্থতা ও জীবনযাত্রা ঠিক রাখতে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই। জানা যায়, অনেকদিন ধরেই ঢাকার বাতাস বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিসাযুক্ত। এতে প্রতিদিন ১০০ কেজি সিসা, দেড় টন সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৬০ টন কার্বন মনোক্সাইড মিশছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে রাতে ও দিনে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা ৯৫, ৯৬, এমনকি ১১৪ ডেসিবল ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং সর্বনিু মাত্রা থাকছে ৬০ থেকে ৭০ ডেসিবলের মধ্যে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, গানের কনসার্ট ও রাজনৈতিক সমাবেশের সময় এটি যে আরও বেড়ে যায়, তা সহজেই অনুমেয়।
অথচ পরিবেশ অধিদফতরের বিধি অনুযায়ী রাতে শব্দের মাত্রা সর্বনিম্ন ৪০ ও সর্বোচ্চ ৭০ ডেসিবল। এ অবস্থায় ৮ ঘণ্টা করে ৬ মাস কাজ করলে যে কোনো মানুষ বধির হয়ে যেতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় অধিকাংশ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি মারাত্মক হ্রাসের বিষয়টি তা-ই প্রমাণ করে। ঢাকার পানিদূষণ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার দরকার নেই। নদী-খাল-বিল ও বিভিন্ন লেকের পানির দুর্গন্ধে আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়াও কষ্টকর। ২০১৪ সালে বুয়েট জানিয়েছে, যেখানে পানিতে বিওডির সহনীয় মাত্রা ৫০ মিলিগ্রাম, সেখানে একটি খালে এটি ৬০০ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে। ওয়াসার পানি অনেক সময় ধরে ফোটানোর পরও খাওয়ার উপযোগী হওয়া তো দূরের কথা, কোনো কোনো এলাকায় সেগুলো থেকে দুর্গন্ধই দূর হয় না। জারের বিশুদ্ধ খাবার পানি বলে যেগুলো বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোও পানের উপযোগী নয় বলে বিভিন্ন সমীক্ষা-প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে। ফলে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, কলেরাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এ অবস্থায় ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে পানি, বাতাস ও শব্দদূষণের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Wednesday, June 10, 2015

ডিএনএর সম্পাদকীয় বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভাব নিয়ে মোদির নীরবতা

বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের সফররত প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি দেশের বৃহৎ বিরোধীদলীয় নেতা গণতন্ত্রহীনতার কথা বলছেন- এমনটা সচরাচর ঘটে না। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে ঠিক এসবই বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক শ্রেণীর আস্থা অর্জন করেছেন নরেন্দ্র মোদি। পার্লামেন্টে বাংলাদেশ-ভারতের স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন করানোর সফলতাই মোদির এ ইতিবাচক ভাবমূর্তি অর্জনের প্রাথমিক কারণ। এমনকি বাংলাদেশের ডানপন্থি  জামায়াতে ইসলামীও মোদির সফর ও ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। হাস্যকরভাবে, দলটির একমাত্র হতাশার কারণ হলো, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভাব নিয়ে মোদির নীরবতা। এক সমপাদকীয়তে এমনটিই লিখেছে ভারতের পত্রিকা ডিএনএ। সেখানে বলা হয়েছে, মোদির সফর নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দীপনার আরেকটি কারণ হলো ব্যবসা। জানা কথা, মোদি বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পেতে আগ্রহী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ভারতের মাঝে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন। সেটি হলো, ভারত বর্তমানে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বিদ্যমান কৌশলগত অনড় অবস্থানকে পেছনে ফেলে সামনে আগানোর দিকে মনোযোগী। যাই হোক, প্রকাশ্যে উদ্দীপনা প্রদর্শনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করাটাও সাধারণ হতাশার অনুভূতি জন্ম দেয়। তিস্তা ও মুহুরি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় এটাই ঘটেছে। ভারতের কথা যদি বলি, দেশটি লাভবান হয়েছে। ২২টি সমঝোতা স্মারক ও ২০০ কোটি ডলারের ঋণ থেকে ভারতের বাণিজ্য খাত লাভবান হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে প্রবেশও করতে পারবে দেশটি। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারেরও অনুমতি পেয়েছে ভারত। ঢাকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপরীতে বাংলাদেশ তেমন লাভবান হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে এখন অবশ্যই কাজ করতে হবে ভারতের ব্যবসা খাতকে। খোলা মনে ভারতের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে ঢাকা। তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করার দায়িত্ব ভারতের। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সফল সফরে মোদি পাকিস্তানকে একটি বার্তা দিয়েছেন। সেটি হলো, দীর্ঘ দিনের দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করলে পাকিস্তানও লাভবান হবে, যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশের। ঢাকায় নিজের এক বক্তৃতায় এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছেন মোদি। এমনকি মোদি বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতির সুরে বলেছেন যে, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী আচরণের কারণে বাংলাদেশকেও প্রায়ই ভুগতে হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পাকিস্তান খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেবে, তার সম্ভাবনা কম। কেননা, ইসলামাবাদ মনে করে, তারা কৌশলগতভাবে বেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীন এমনকি রাশিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের সামর্থ্যও তাদের আছে। এটি নিয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে সমপর্ক শক্তিশালী করতে চান। ঠিক যেভাবে তিনি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে করেছেন। এ প্রচেষ্টার কারণ হচ্ছে, পাকিস্তানকে দেখানো যে, সার্কের বাকি সদস্যরাষ্ট্রসমূহ ভারতের সঙ্গে লেনদেন করতে রাজি। তাই ইসলামাবাদের উচিত হবে না, এতদিন ধরে যেভাবে সবকিছুতে তারা বাধ সেদেছে, সেটি অব্যাহত রাখার আশা করা। একটি কৌশল হিসেবে এটি সফল হতে পারে। কিন্তু নয়া দিল্লির জন্য আরও ভালো হবে, যদি ভারত পাকিস্তানকে অপদস্থ করার জন্য ঢাকা, থিমপু ও কাঠমান্ডুর সঙ্গে সমপর্কোন্নয়ন না করে, দেশগুলোর নিজেদের স্বার্থে করে। কোনো সন্দেহ নেই যে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতবেশী দেশটি উপেক্ষিত হয়েছে। কেবলমাত্র পাকিস্তানের দিকেই এতদিন মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্য প্রতিবেশী দেশগুলো। ঢাকায় মোদি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পশ্চিমাঞ্চলীয় বিরোধপূর্ণ প্রতিবেশী দেশটির সমান বা তারও বেশি মনোযোগ অন্য দেশগুলোর দিকে তিনি দেবেন। এটি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Monday, August 17, 2009

‘সেনা শাসন’ প্রত্যাহার ও সেটেলারদের সম্মানজনক পুনর্বাসন করতে হবে by এ কে এম জাকারিয়া

পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার জন্ম ১৯৪২ সালে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ারচর থানার মহাপুরং গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এম এ পাস করার পর তিনি তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। এরপর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি জড়িয়ে পড়েন। একসময় চলে আসেন নেতৃত্বে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য জনসংহতি সমিতির পক্ষে সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন তিনি। বর্তমানে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রথম আলো : পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কিছু অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পসহ এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
সন্তু লারমা : সাধারণভাবে এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কিছু অস্থায়ী ক্যাম্প ছাড়া পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু হচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী সব অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করার কথা। সরকার বলেছে, চুক্তির পরপর বেশ কিছু অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের কাছে এর প্রয়োজনীয় তথ্য নেই। বর্তমানে যে প্রত্যাহার করা হচ্ছে সে ব্যাপারেও আমরা তেমন কিছু জানি না। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।
প্রথম আলো : আপনি পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। আপনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি?
সন্তু লারমা : আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। আমরা পত্র-পত্রিকায় কিছু অস্থায়ী ক্যাম্পসহ সেনা প্রত্যাহারের খবর দেখেছি। কীভাবে ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সে ব্যাপারেও আমরা কিছু জানি না। কারণ ক্যাম্প প্রত্যাহারের আগে জমিটি কার, তা চিহ্নিত করে হেডম্যানের মাধ্যমে মূল মালিককে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন। মূল মালিক না পাওয়া গেলে জেলা পরিষদের কাছে জমি হস্তান্তর করা প্রয়োজন। এ ধরনের প্রক্রিয়া মেনে ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের এ ব্যাপারে কিছু জানানো হচ্ছে না।
প্রথম আলো : কিন্তু ক্যাম্প তো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। কোন দিন কোন ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে, পত্র-পত্রিকায় সে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
সন্তু লারমা : দেখুন, ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প বা এক ব্রিগেড সেনা হয়তো প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সেনামুক্ত থাকছে। যে সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সে অঞ্চলগুলো অন্য ব্রিগেডের আওতায় চলে আসবে। আসল কথা হচ্ছে, অপারেশন উত্তরণের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সেনা শাসন চলছে, এর অবসান ঘটাতে হবে। আর তা করলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কারণ চুক্তির পর এই অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সেনা উপস্থিতি ও সেনা নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর প্রায় ১১ বছর চলে গেলেও সেনা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের মতোই রয়ে গেছে। অপারেশন উত্তরণের অবসান না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথম আলো : কিন্তু সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে বিভিন্ন মহলের।
সন্তু লারমা : পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রায় ১১ বছর পার হয়ে গেছে। এখন আর আগের পরিস্থিতি নেই। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা রয়েছে। সে জন্য কি সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে? যারা এ ধরনের কথা বলে তারা বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা কথা বলে থাকে। তারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার স্বার্থে বিভিন্ন গোষ্ঠী সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই তারা সক্রিয় রয়েছে।
প্রথম আলো : কারা এ ধরনের কাজ করছে?
সন্তু লারমা : দেখুন, ইউপিডিএফ নামের একটি সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা অপকর্ম ঘটিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতাকারী এই শক্তিকে একটি বিশেষ মহল সৃষ্টি করেছে, যারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে। ইউপিডিএফ পার্বত্য অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে কার্যত সেখানে খুন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছে। এ পর্যন্ত তারা শতাধিক লোককে হত্যা করেছে। পার্বত্য অঞ্চলে বিদেশিদের অপহরণের সঙ্গেও তারা জড়িত ছিল। সেনাবাহিনী সেখানে রয়েছে কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখিনি। ফলে সেনা উপস্থিতি যে তাদের কার্যক্রম দমাতে পারছে তা নয়। আসল কথা হচ্ছে, এ ধরনের অপশক্তিকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সেটা করলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
প্রথম আলো : মানে সেনা নিয়ন্ত্রণ ও সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফের কার্যক্রমও বন্ধ করতে বলছেন আপনি?
সন্তু লারমা : পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফের সন্ত্রাস ছাড়া আর কোনো সন্ত্রাস নেই। তাদের সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ হয়ে লোকজন আত্মরক্ষার্থে নানা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই সন্ত্রাস ছাড়া পার্বত্য অঞ্চল ঢাকার চেয়েও শান্তিপূর্ণ। আমার প্রশ্ন, যারা এ ধরনের অপকর্ম করে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সেনা উপস্থিতি বা অন্য কোনো উদ্যোগ কিছুই কাজে দেবে না। তাদের তত্পরতার সুযোগে বরং একটি মহল পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রথম আলো : পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বর্তমানে কিছু অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প ও এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের যে কার্যক্রম চলছে, এর বিরোধিতা করছে সেখানকার বাঙালি সেটেলাররা। তাদের আশঙ্কা, এতে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তারা তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা করছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
সন্তু লারমা : সেটেলারদের সরকার এখানে এনে জোর করে বসিয়েছে। এই সেটেলারদের কোনো দোষ নেই। যেসব জায়গায় তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে সেগুলো পাহাড়িদের জমি। পার্বত্য চট্টগ্রামে খাসজমি বলে কিছু নেই। সেখানকার ভূমিব্যবস্থ্যা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে আলাদা। কোনো মৌজায় যারা বসবাস করে তারা যৌথভাবে সেখানকার জমির মালিক। তাই বাইরে থেকে যাদের নিয়ে জোর করে বসানো হয়েছে, তা পাহাড়িদের জায়গা দখল করেই বসানো হয়েছে। আমরা মনে করি, সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এখন সেনা প্রত্যাহারের ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতাকারী শক্তি কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতির পক্ষে তা কাজে লাগানো হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা অতীতে অনেক ঘটানো হয়েছে। সামনেও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথম আলো : পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের বাইরে অনেক স্থায়ী বাঙালি বাসিন্দাও রয়েছে।
সন্তু লারমা : স্থায়ী বাসিন্দাদের ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই। তারা বৈধভাবেই সেখানে রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে সেটেলার বাঙালিদের নিয়ে। পাহাড়িদের জমিতে তাদের বসানো হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেহেতু খাসজমির কোনো ব্যাপার নেই, তাই জরিপ করা হলে দেখা যাবে সেটেলাররা অবৈধভাবে পাহাড়িদের জমিতে বসবাস করছে। তাই তাদের সরে যেতেই হবে।
প্রথম আলো : কিন্তু সেটেলারদের সরিয়ে নেওয়ার কাজটি খুব সহজ নয়। বিকল্প জমির ব্যবস্থা করা এবং এ জন্য প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন পড়বে।
সন্তু লারমা : আমরা মনে করি না যে কাজটি খুব জটিল। দেশে অনেক খাসজমি রয়েছে, যেখানে তাদের সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা যেতে পারে। আর অর্থের যে বিষয়টি বললেন তার উত্তরে বলতে চাই, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্বত্য চুক্তির পর সেখান থেকে সেটেলারদের সরিয়ে পুনর্বাসনের পুরো খরচ দিতে রাজি ছিল। সরকার তখন বলেছিল যে প্রয়োজনে নিজের অর্থেই কাজটি করা হবে। আমি মনে করি না যে অর্থ এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হবে। সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : আপনি পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফের নানা তত্পরতার কথা বললেন। কিন্তু আপনার সংগঠন জনসংহতি সমিতিতেও বিভক্তির কথা শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি রাঙামাটিতে কথা প্রসঙ্গে এক পাহাড়ি জানালেন, জনসংহতি সমিতির দুই পক্ষ ও ইউপিডিএফ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। আপনার মন্তব্য কী?
সন্তু লারমা : জনসংহতি সমিতিতে কোনো বিভক্তি নেই। নানা ইস্যুতে ভিন্ন মত থাকতেই পারে। বিগত জরুরি অবস্থার সময় পার্বত্য অঞ্চলে কার্যত বিভীষিকার পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল। একদিকে অপারেশন উত্তরণের নামে সেনা শাসন, অন্যদিকে জরুরি অবস্থা। ওই সময় পার্বত্য অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে এমন শক্তির সঙ্গে দালালি করে জনসংহতি সমিতির কিছু সদস্য নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। সেটাকেই হয়তো কেউ কেউ বিভক্তি হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, যা সঠিক নয়। ২০০৬ সালে দলের যে কংগ্রেস হয়েছে সে অনুযায়ী সংগঠন চলছে। আগে পাঁচ বছর পর কংগ্রেস হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান গঠনতন্ত্রে তিন বছর পর কংগ্রেস আয়োজনের বিধান করা হয়েছে। সে অনুযায়ী এ বছর নতুন কংগ্রেস হবে। দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে।
প্রথম আলো : বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করেছিল। আবার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের তরফ থেকে কিছু উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সন্তু লারমা : বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। সরকারের আওয়ামী লীগের বাইরেও কয়েকটি দল রয়েছে। বলা হয় মহাজোট সরকার। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছে, চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি পরিবীক্ষন ও বাস্তবায়ন কমিটি হয়েছে, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান আদিবাসী থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কিছু কাজ হয়েছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক কিছু হচ্ছে বলেই মনে হয়। কিন্তু কার্যকর অগ্রগ্রতি হয়েছে এমন বলা যাবে না। যেমন—ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কমিশনের কোনো দপ্তর নেই, লোকবল নেই। তাহলে কীভাবে চলবে? শুধু নিয়োগ দিলে তো চলবে না।
প্রথম আলো : সরকারের কাছ থেকে এখনই করা প্রয়োজন—এমন কী ধরনের উদ্যোগ আশা করছেন?
সন্তু লারমা : পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ হয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনো কার্যবিধিমালা নেই। আমি মনে করি, বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে এই পরিষদগুলোর কার্যবিধিমালা চূড়ান্ত করা।
প্রথম আলো : কিছু অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, বর্তমান সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে আপনি কি আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু দেখছেন?
সন্তু লারমা : আগেই বলেছি, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো আমি ইতিবাচক বলে মনে করি। কিন্তু পাহাড়ে শান্তি নিশ্চিত করার জন্য যে বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই তা সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর নামে সেনা শাসন প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেটেলারদের সন্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, ইউপিডিএফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। সরকার যদি এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে শুরু করে তবে নিশ্চয় আশাবাদী হওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে।

দুনিয়ার এ কী হলো- ন্যায় ও ইতিহাস by এদুয়ার্দো গালিয়ানো

কিছু প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে মাছির মতো ভনভন করছে, সেগুলো নিয়ে আপনাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করতে চাই। দুনিয়া থেকে কি ন্যায়বিচার উধাও হয়ে গেছে?
জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিল ইরাকের যে সাহসী লোকটি তার তিন বছরের কারাবাসের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু তাঁকে একটি মেডেল উপহার দেওয়াই কি উচিত ছিল না? কে সন্ত্রাসী—জুতা নিক্ষেপকারী, নাকি যার গায়ে তা লেগেছে সে? সেই পেশাদার খুনিই কি আসল সন্ত্রাসী নয় যে মিথ্যা অজুহাতে ইরাকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, ভয়াবহ গণহত্যা করেছে এবং আইন পাস করে নির্যাতনের হুকুম দিয়েছে?
কে অপরাধী—মেক্সিকোর আতেনকো, চিলির মাপুচে, গুয়াতেমালার কেকচি আদিবাসী আর ব্রাজিলের ভূমিহীনেরা? নিজেদের জমির হক প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করার অপরাধে যাদের সন্ত্রাসবাদী বলে দোষা হচ্ছে? যদি মাটি পবিত্র হয়ে থাকে তবে আইন যা বলে বলুক, সেই ভূমিপুত্ররাও পবিত্র নয় কি?
মার্কিন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের চোখে সোমালিয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। কে আসল জলদস্যু? সেসব ক্ষুধার্ত মানুষ, যারা জাহাজে হামলা চালায় তারা? নাকি বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে এক আক্রমণে দুনিয়াকে দেউলিয়া করে দেওয়া ওয়ালস্ট্রিটের ফটকাবাজরা? আজ তাদেরই দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ! এসব ব্যাংকডাকাতদের কেন এত বড় ইনাম দেওয়া হচ্ছে? ন্যায়বিচারের দেবী কি তাহলে একচোখা? বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী করপোরেশন ওয়াল মার্ট ট্রেড ইউনিয়নকে নিষিদ্ধ করেছে। ম্যাগডোনাল্ডও তা-ই। কীভাবে এসব কোম্পানি আইনের পরোয়া না করে যা খুশি তা করে যেতে পারে? কারণ, আজকের দুনিয়ায় কাজের থেকে অকাজের দাম বেশি, আবর্জনার থেকে কম দাম শ্রমিকের অধিকারের।
কে তাহলে সত্ আর কে খলনায়ক? আন্তর্জাতিক আইন যদি থাকবেই, তাহলে কেন শক্তিমানদের কৃতকর্মের কোনো বিচার কখনো হয় না? মানুষ হত্যায় সেরা কসাইদের কেন কখনো জেলে পোরা হয় না। এর কারণ হলো, জেলখানার চাবি যে তাদেরই হাতে!
জাতিসংঘে কিসের জোরে পাঁচটি রাষ্ট্রের ভেটো-ক্ষমতা অলঙ্ঘনীয়? তাদের এই ক্ষমতা কি ঈশ্বরের দান? যুদ্ধ যাদের ব্যবসা, তাদের হাতে কি আপনি শান্তিরক্ষার ভার দেবেন? বিশ্বের সর্বোচ্চ অস্ত্র বানানো দেশগুলোর হাতেই থাকবে বিশ্বশান্তির দায়িত্ব, এটা কেমন বিধান? যারা মাদক চোরাচালানের হোতা, তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে আমরা সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধাচরণ করি?
দুনিয়ার স্বেচ্ছাচারী মোড়লেরা যখন এতই হত্যাপ্রেমী, তখন কেন আমরা প্রার্থনা করি তারা যাতে সামাজিক অবিচার ছেড়ে ভালো হয়ে যায়? এটা কি সেই দুনিয়া নয়, যেখানে প্রতি মিনিটে সামরিক খাতে ২১০ কোটি টাকা নষ্ট হয় অথচ সামান্য অসুখে বা না খেয়ে প্রতি মিনিটে মারা যায় ১৫টি শিশু? কার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অস্ত্র শাণ দিয়ে চলেছে? তাদের নিশানায় কী: মানুষের দারিদ্র্য, না দরিদ্র মানুষ?
যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে মাতম করতে ওস্তাদ, তারা কেন বাজারিপনার বিরুদ্ধে তাদের মনের ঝাল মেটায় না, যে বাজারি মূল্যবোধ প্রতিমুহূর্তে জননিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে? একটানা বর্ষিত হওয়া বোমার মতো বিজ্ঞাপনগুলো কি মানুষকে অপরাধী হতে ডাক দেয় না? এই বোমাবর্ষণের শব্দে কোটি কোটি বেকার বা সামান্য মজুরি পাওয়া তরুণরা আর কিছু শুনতে পারে না। তাদের শেখানো হয় এই মিথ্যা যে, ‘কিছু একটা হওয়া=কিছু একটা পাওয়া’। শেখায় গাড়ি বা ব্র্যান্ডের জুতার মালিক হওয়াই জীবনের একমাত্র মানে। তারা বলতে থাকে, কেন কেন কেন, না কিনলে তুমি তো কিছুই না। তাই কি? মানুষ মানে কি তাহলে জুতা, গাড়ি, ব্র্যান্ড; আমি নিজে কি তাহলে কিছুই না, নাথিং?
হত্যাকারীর পাশাপাশি কেন হত্যাকাণ্ডেরই মৃত্যুদণ্ড হয় না? আজকের দুনিয়ার সব আয়োজনই তো হত্যার জন্য সংগঠিত। অস্ত্র কোম্পানি ও মিলিটারি-চক্র হত্যার কারখানা বসিয়ে রেখেছে। সত্য নয় কি যে এর জন্যই আমাদের যাবতীয় সম্পদ ও শক্তির বেশির ভাগই খরচ হয়ে যাচ্ছে? তারপরও দুনিয়ার প্রভুরা কেবল অন্যের সন্ত্রাসকেই নিন্দা জানায়, কিন্তু নিজেরা করলে নাম হয় ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। আর কি বিশ্বাস করা যায় যে মানুষ আশাবাদী প্রাণী? বিশ্বে আমরাই একমাত্র জীব যারা ঠান্ডা মাথায় বিনা প্রয়োজনে অন্য মানুষকে হত্যা করেও খুশি থাকি। আমরা এমন ধ্বংসশক্তি অর্জন করেছি বানিয়েছি এমন প্রযুক্তি, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমাদের এই সাধের গ্রহটি সব অধিবাসীসমেত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে!
ভয় জাগিয়ে রেখেই টিকে আছে এই প্রযুক্তি। শত্রুর ভয়ের জুজু দেখিয়েই সেনা ও পুলিশের নামে বিপুল সম্পদ ওড়ানো হয়। কেন আমরা এই ভয়ের রাজত্বকে চিরবিদায় দিতে পারি না? এভাবেই পেশাদার আতঙ্কবাজদের অপশাসন থেকে বেরিয়ে আসার যোগ্যতা হবে আমাদের। এই ভয়ের বীজ বপনকারীরা আমাদের ছুড়ে ফেলে একাকিত্বের মধ্যে। এক জাতি অন্য জাতিকে, এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ভয় করতে করতে একা হয়ে যায়। তারা শেখায় এই দুনিয়া হলো কুকুর কুকুরের মাংস খাওয়া দুনিয়া। শেখায় যে প্রতিবেশীর কাছ থেকেই নাকি আসবে বিপদ। দিনরাত সতর্ক করে যে বাচ্চার দোলনার নিচেই নাকি রয়েছে ‘জঙ্গি-বোমা’। বলে, ওই তরুণটি দেখতে নিরীহ হলেও কিন্তু সন্ত্রাসী, ওই ভালো মানুষ প্রতিবেশিনী নাকি নিশ্চিতভাবে আমার মধ্যে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস ঢুকিয়ে দেবে।
এই ওল্টানো দুনিয়ায় অতি সাধারণ ভালো কাজকেও ভয়ঙ্কর বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। যখন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তাঁর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীদের লজ্জার হাত থেকে, বঞ্চনার হাত থেকে বাঁচাতে দেশ পুনর্গঠনে নামলেন, সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করা হলো চরমাতঙ্ক। যারা বর্ণবাদী, যারা বংশপরম্পরায় মনে করে দেশের সহায়-সম্পদ কেবল তাদেরই জন্য, তাদের অবশ্যই আতঙ্কিত হওয়ার আছে। যখন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট কোরেয়া তাঁর দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করলেন, সুদি প্রতিষ্ঠানগুলো কেঁপে উঠল। এ রকম দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য ইকুয়েডরকে চরম শাস্তি দেওয়া হবে বলে শাঁসানোও হলো। যখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও লুটেরা রাজনীতিবিদদের সর্বদাই প্রশ্রয় দিয়ে যায়, যখন তাদের শাসন টেকানোর জন্য জনগণের নামে ঋণ নেওয়া হয়, তখনই কি আমরা সেই চরম শাস্তি বরণ করে নিইনি? তখনই কি ঠিক হয়নি যে, ধনীদের ভোগবিলাস চালানোয় ঋণের জোয়াল টানবে সাধারণ মানুষ? এই ঋণ যে অবৈধ, তা কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়।
কাণ্ডজ্ঞান আর ন্যায়বিচার পরস্পর সম্পর্কিত। কাণ্ডজ্ঞান বলে, যে দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত, সেই দেশের কী অধিকার রয়েছে অন্য দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর?
আজ অনেকেরই মন খারাপ। কারণ আর্থিক মন্দার কারণে গাড়ি বিক্রি কমে গেছে। কারও যদি সামান্য কাণ্ডজ্ঞান থাকে তো তিনি বুঝবেন এটা একটা খুশির খবর। কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন যে গাড়ির সংখ্যা কমা মানে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার কম হওয়া, পৃথিবীর ধমনিতে কিছুটা কম বিষ মিশ্রিত হওয়া। অস্বীকার করা অসম্ভব যে এর ফলে পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং তারা আরও বেশি দিন বাঁচবে।
লুইস ক্যারলের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের কাহিনীতে রানি অ্যালিসকে বোঝান যে আয়নামহলের রূপকথার রাজ্যে ন্যায়বিচার আছে:
‘সেখানে রাজদূত আছেন একজন। শাস্তি হিসেবে তিনি এখন কয়েদখানায় বন্দী: তবে বিচার শুরু হবে আগামী বুধবারে: এবং এটা নিশ্চিত যে সবার শেষেই হবে অপরাধের বিচার।’
এল সালভাদরের প্রধান পুরোহিত অস্কার আর্নুলফো রোমেরো দেখলেন যে আইন হলো সাপের মতো, কেবল খালি পায়ের মানুষদেরই কামড়ায়। তিনি মারা যান গুলিতে আহত হয়ে। তাঁর অপরাধ একটাই; তিনি বলেছিলেন, তাঁর দেশে গরিবেরা আজন্ম বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের শিকার।
সেই এল সালভাদরে এখন গরিবদের দল ক্ষমতায়। এক দিক থেকে গত নির্বাচনের ফল আর্চবিশপ রোমেরোসহ তাঁর মতো হাজার হাজার মানুষের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি, যারা অবিচারের রাজ্যে নায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিসর্জন করে লড়ে গেছে।
কখনো কখনো ইতিহাসের কাহিনী মর্মান্তিকভাবে থেমে যায়, কিন্তু ইতিহাস কখনো ফুরায় না। সে যখন বলে বিদায়, তার মানে সে বলছে: আমি আবার আসব।
(কাউন্টার পাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ)
এদুয়ার্দো গালিয়ানো: উরুগুয়ের সাহিত্যিক-সাংবাদিক, ল্যাটিন আমেরিকার জনপ্রিয় লেখক। তাঁর বিখ্যাত বই ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এই বইটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে উপহার দিলে বইটি আন্তর্জাতিক বিক্রি তালিকার শীর্ষে উঠে যায়।