কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে নরেন্দ্র মোদি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণঃ এক সপ্তাহ হয়নি শাসক হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ২৫ বছর পূর্ণ করেছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন টানা ১৩ বছর, পরের ১২ বছর দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আরও তিন বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাটিয়ে দেবেন এবং পরের লোকসভা ভোটেও দল ও জোটের নেতৃত্ব দেবেন— এই বিশ্বাসে এখনো মগ্ন বহু মানুষ। এই সিকি শতকে দল কিংবা বিরোধী পক্ষে এমন কোনো মুখ দেখা যায়নি, যা মোদিকে ছাপিয়ে যেতে পারে। তবুও এই মুহূর্তে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। কেননা, রাজনৈতিক ভাগ্য অথবা কর্মফল আবার তাঁকে এক মোক্ষম পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারেও তিনি উতরে যাবেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

২৫ বছরে মোদিকে কম চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মুখোমুখি হতে হয়নি। ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কচ্ছের ভয়ংকর ভূমিকম্পের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। পরের বছর গোধরাকান্ড এবং গুজরাটের দাঙ্গা। দলের শীর্ষ নেতাদের প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। অটল বিহারি বাজপেয়ীর রোষানলে পড়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব যখন প্রায় যায় যায়, তখন পরিত্রাতা হয়ে দেখা দিয়েছিলেন তৎকালীন বিজেপির লৌহপুরুষ লালকৃষ্ণ আদভানি। গুজরাট দাঙ্গার রেশ কম দিন চলেনি দেশে ও বিদেশে। এক ও অদ্বিতীয় ‘ম্যান ফ্রাইডে’ অমিত শাহর গ্রেপ্তারি, দাঙ্গা–সম্পর্কিত মামলা, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল করে দেওয়ার মতো অসম্মান সামাল দিয়ে ক্রমে তিনি আরও শক্তি সঞ্চয় করেছেন এতটাই যে ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে কংগ্রেসের মোকাবিলায় আরএসএস তাঁকেই তুরুপের তাস হিসেবে মেলে ধরে। তারপর তো ইতিহাস।

প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোদি যে নিস্তরঙ্গ জীবন কাটিয়ে চলেছেন, তা নয়। নিজের অজান্তে নিজেই বিপদ ডেকে এনেছেন নোটবন্দীর ঘোষণা দিয়ে। জিএসটি (পণ্য ও পরিষেবা কর) চালু করা নিয়েও কম বিরোধিতা সহ্য করতে হয়নি। সীমান্তপারের বিরোধও তাঁকে তটস্থ রেখেছে। প্রথমে উরি, পরে পুলওয়ামা। আত্মরক্ষার্থে ব্যর্থ হয়েও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কীভাবে অনুকূল করতে হয়, তা তিনি দেখিয়েছেন। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে আরও বেশি আসনে জয়ী হয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কট্টর হিন্দুত্ববাদী প্রচার ও ইলেকশন মেশিনারি কি অসাধ্য সাধন করতে পারে। করোনা মহামারির সময় নরেন্দ্র মোদি তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষেধক সরবরাহ করেন। এতে তিনি নিজেকে বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিপন্নের চেষ্টা করেছেন। গলওয়ানে চীনের আগ্রাসনে বিধ্বস্ত হয়েও পা হড়কাতে দেননি। কৃষক বিদ্রোহে টালমাটাল হয়েছেন; কিন্তু বাধ্য হয়ে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছেন। বুঝিয়েছেন কোন সময় ব্রেক কষতে হয়।

২০২৪ সালের ভোটে কম আসনে জিতেও গত দুই বছরে একবারের জন্যও কাউকে বুঝতে দেননি সরকার চালাতে ও জোট অটুট রাখতে মোদিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ললাটলিখন বদলে দিয়ে সাফল্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ থেকে কুসুমকোমল করে ফেলার নমুনা তাঁর চেয়ে ভালো এ দেশের আর কোনো জননেতা দেখাতে পারেননি এখনো।

আগের সঙ্গে এবারেও এই সংকট মোদি কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না, হঠাৎ সেই প্রশ্ন আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘের মতো গগন ছেয়ে ফেলেছে। সংবিধানসম্মতভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন পরিচালনা করছেন কি না, আইন মেনে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর হয়েছে কি না, বিজেপির স্বার্থে জ্ঞানেশ কমিশনকে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছেন কি না, নিরপেক্ষতার নামাবলি গায়ে চড়িয়েও তিনি মোদি–শাহর অন্ধ অনুগামী হিসেবে কাজ করছেন কি না, এসব মারাত্মক অভিযোগ এখন সরকারের সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এত দিন যেসব অভিযোগের তির সরকারের দিকে ধাবিত হয়েছে, তার প্রতিটিই এসেছে বিরোধী মহল থেকে।

এই প্রথম বিরোধীদের তোলা প্রশ্ন ও বিপক্ষের সন্দেহে ধুনো দিয়েছেন এমন দুজন, যাঁরা জ্ঞানেশ কুমারেরই সহযোগী, যাঁদের নিয়োগকর্তাও মোদি–শাহ। প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলল, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর স্টোরি ‘অসত্য’ বলে ‘জ্ঞানেশ অ্যান্ড কোং’ বিবৃতি দেননি। তিন কমিশনার এখনো সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগগুলো খণ্ডন করেননি; বরং তাঁদের প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকারান্তরে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছে—সংবাদপত্রটির তোলা প্রতিটি অভিযোগই সত্য।

আগের সঙ্গে এবারের এই সংকট বা চ্যালেঞ্জের পার্থক্য রয়েছে অনেক দিক থেকে। এই প্রথম অভিযোগের তির উঠেছে সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, যার কর্তাদের নিয়োগপদ্ধতি মোদি সরকার নিজেদের অনুকূলে তৈরি করেছেন। সিইসি ও ইসি নিযুক্তির কমিটি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে সে জায়গায় মন্ত্রিসভার আরও এক সদস্যকে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট—সরকার তার ‘ইয়েসম্যান’দের হাতেই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে বদ্ধপরিকর। তিন কমিশনারকে আজীবন আইনি রক্ষাকবচ দেওয়ার সিদ্ধান্তও অভূতপূর্ব ও বিতর্কিত। এমন ইমিউনিটি বা ছাড় রাষ্ট্রপতির নেই, প্রধানমন্ত্রীর নেই, প্রধান বিচারপতিরও নেই। কেন ওই রক্ষাকবচ! কার স্বার্থে, নির্বাচন কমিশনকে কোন অপকর্মের জন্য সরকার ওই রক্ষাকবচ দিয়েছে—এই মারাত্মক প্রশ্নগুলো জনমনে তোলপাড় করছে। মোদি সরকারের কাছে এখনো এর জুতসই জবাব নেই। দুটি বিষয়ই আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন।

এতকাল মোদির সামনে সমস্যা হাজির করেছে হয় রাজনৈতিক দল, নয়তো ব্যক্তিবিশেষ; অথবা কৃষক, শ্রমিক, চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবী মহল ও সরকারি কর্মচারীরা। এই প্রথম মাথা তুলে সরকারের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তুলেছে দেশের জেন–জি সম্প্রদায়। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের জেন–জি কি বিশাল পরিবর্তন ঘটিয়েছে, সবার তা জানা। অকুতোভয় এই মহলের সঙ্গে জুটি বেঁধেছে জেন আলফা। এক যুগ ধরে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের নীতি ও কাজকর্ম একধরনের রাজনৈতিক ক্লান্তি ও অবসাদ সৃষ্টি করেছে। সেখানে সরকারের প্রতি জেন–জির এই অনাস্থা বিরোধীদেরও অতি উৎসাহিত করে তুলেছে। এই আন্দোলন এখনো ঠাসবুনট নয়। বিরোধীরাও সবাই মোদি–বিরোধিতায় বরফজমাট নয়। বিজেপিও ইতিমধ্যে ঠিক করেছে, লড়াইটাকে তারা ‘দেশপ্রেমী বনাম দেশবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবাদী বনাম বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘স্বদেশের বিরুদ্ধে বিদেশি চক্রান্তের’ তকমা দেবে। বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীনও তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মোদির ভারতের অগ্রগতি যাদের চক্ষুশূল, সেই বিদেশি শত্রুরাই সরকারের বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত করছে। এই লড়াই তাই প্রকৃত ভারতীয়র সঙ্গে ভারতবিরোধীদের।

এভাবেই নরেন্দ্র মোদি সিকি শতক জয়ী হয়েছেন। তিনি কট্টর হিন্দুত্ববাদে সওয়ার হয়ে ‘হিন্দুস্তান–পাকিস্তান’–এর জিগির তুলে নির্বাচনী ভাগ্য গড়ে তুলেছেন। এই প্রথম সেই নির্বাচন কমিশন মোক্ষম প্রশ্নের মুখে। আর গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার সেই প্রশ্ন তুলেছে জেন–জি। মনে রাখতে হবে, ২০২৯ সালে ভারতে জেন–জি জনসংখ্যা হবে ৩৮ কোটি। এর সঙ্গে জেন আলফা যুক্ত হলে পরবর্তী লোকসভায় এই দুই শ্রেণির মোট ভোটার হবে ৮০ কোটি। এদের বিরোধিতা করে হিন্দুত্ববাদের পালে হাওয়া দিয়ে সুশাসনের তরি বেয়ে নরেন্দ্র মোদি পাড়ে উঠতে পারবেন কি? পারবেন কি সব রাজনৈতিক জল্পনা নস্যাৎ করে মাথা উঁচু রাখতে? সন্দেহ নেই এটাই সম্ভবত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পুলিশের ব্যারিকেড ও চেক পয়েন্ট দিয়ে যানবাহন ও হেঁটে মানুষ পার হচ্ছেন। দিল্লির সড়কে রোববারও মানুষের আনাগোনা কম। ১১ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লি
পুলিশের ব্যারিকেড ও চেক পয়েন্ট দিয়ে যানবাহন ও হেঁটে মানুষ পার হচ্ছেন। দিল্লির সড়কে রোববারও মানুষের আনাগোনা কম। ১১ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: রয়টার্স