হরমুজে হামলা বেড়েছে, থমকে আছে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগে অগ্রগতি না হওয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজে হামলা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নৌপথটির নিরাপত্তা ও চলাচলের নিয়ম উপেক্ষা না করতে সতর্ক করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। অন্যদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

শনিবার রাতে আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালিতে অনুমোদনহীন পথে চলার সময় একটি বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার নৌমাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়। তাদের দাবি, জাহাজটির নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ম উপেক্ষা করে চলাচল করতে চাওয়া অন্য ট্যাংকারগুলোরও একই পরিণতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

বিশ্বে স্বাভাবিক সময়ে মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

রোববার ইরানের সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ সাইয়ারি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর সাত মাসের বেশি সময় পরও ইরানের বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—দুই ধরনের অভিযানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে আবারও হামলা চালানো হবে।

এর আগে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, গত এক দিনে হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে জাহাজকে লক্ষ্য করে একাধিক সামরিক তৎপরতা ও সতর্কবার্তার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ উপকূলের কাছে নোঙর করা জাহাজগুলোকে রাতে বেতারবার্তার মাধ্যমে অবস্থান ছেড়ে সরে যেতে বলা হয়। রোববার বিকেলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানার খবরও জানায় সংস্থাটি।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে আগুন লাগার পর ২২ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কী কারণে আগুন লেগেছে, তা জানানো হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ

রোববার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে ওমান উপসাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজের পেছনের অংশে যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালাতে দেখা যায়। সেন্টকমের দাবি, জাহাজটি ইরানের নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল। হামলায় এর চলাচলের ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি ইরানের বন্দরগুলোতে নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপের পর থেকে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল করা হয়েছে, ১৩৫টি জাহাজকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সেন্টকম। ওয়াশিংটনের দাবি, অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইরান অবরোধরেখা পেরিয়ে তেল রপ্তানি করতে পারেনি।

যুদ্ধ শুরুর পর গত ৫ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে অন্তত ১২টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কোনো এক সপ্তাহে এটিই সর্বোচ্চ হামলার ঘটনা। কাতারের উত্তর উপকূলের কাছেও একটি জাহাজে হামলা হয়। এতে হরমুজ প্রণালির বাইরেও নৌ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

জাহাজে হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমেছে। সিএনবিসির উদ্ধৃত জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ৭ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কম।

আলোচনায় অগ্রগতির আশা কম

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধের সমাধানে পৌঁছাতে ইরান জুনে হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য সাময়িক সমন্বিত পথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের চূড়ান্ত করা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনও চায় তেহরান।

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চললেও আগামী কয়েক সপ্তাহে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার বক্তব্যে ইরানের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগের কঠোর অবস্থান কিছুটা শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তেহরান জানিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ করার মতো বিষয় ভবিষ্যতের আলোচনায় আসতে পারে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা হবে না।

রোববার এক বক্তব্যে ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি বলেন, দেশের নিজস্ব পারমাণবিক শিল্পের অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনকে এই প্রযুক্তির অন্যতম ব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন করে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার দেওয়া হুমকির নিন্দা না করায় সমালোচনাও করেন এসলামি।

ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালভান্দি বলেন, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইরান সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই পথই ব্যবহার করবে। কূটনীতির মাধ্যমে স্বার্থ নিশ্চিত করা গেলে সেটিই ভালো, তবে তা সম্ভব না হলে যুদ্ধক্ষেত্রে সেগুলো রক্ষা করা হবে।

সূত্র: আলজাজিরা

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স