বিএনপির শপথ না নেওয়া গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা by শরীফ ভূঁইয়া
দ্বিতীয়ত, যে কারণে দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে বিএনপি জনরায়কে উপেক্ষা করছে, তা হলো নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুস্পষ্টভাবে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন ১২ তারিখে দয়া করে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেবেন। বিএনপির অন্যান্য প্রতিশ্রুতি যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড ইত্যাদির মতো গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থানও দলটির একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। তাই এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় যে বিএনপি যদি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিত, তাহলে নির্বাচনে তারা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা করতে পারত কি না? ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিলে এমনও হতে পারত যে বিএনপি নির্বাচনে খারাপ ফল করত। কিন্তু এই শপথ না নেওয়ার ফলে কার্যত গণভোটের রায় ‘না’ হলে যে অবস্থা দাঁড়াত, জাতি এখন সেই অবস্থার মুখোমুখি। কাজেই বিএনপি দুভাবে অর্থাৎ গণভোটের ফলাফলকে উপেক্ষা করে এবং তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে জনরায়কে উপেক্ষা করেছে।
এর ফলে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের যে প্রক্রিয়া চিন্তা করা হয়েছিল, তা একটা প্রাথমিক বাধার সম্মুখীন হলো। এই প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি, দ্বিতীয় ধাপ ছিল গণভোট এবং তৃতীয় ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ। প্রথম দুটি ধাপ অনুসরণ করা গেলেও তৃতীয় ধাপে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনপ্রক্রিয়া বাধার সম্মুখীন হলো। তবে এখনো আশা করি বিএনপির প্রতিনিধিরা শপথ নেবেন। এতে বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কাও নেই। যেহেতু সংস্কার পরিষদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে।
আর যদি সংস্কার পরিষদ গঠন করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দুর্বলতা হলো, এই অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা সীমিত এবং এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিষয় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন অতীতে আদালত কর্তৃক অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে। যেমন, হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী। বলা বাহুল্য, আদালত কর্তৃক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করার ফলেই দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এ কারণে জুলাই সনদে বর্ণিত ব্যাপক ও মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত প্রক্রিয়া টেকসই না-ও হতে পারে। বিএনপির পক্ষে এখনো শপথ নেওয়া সম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে পুরো বিষয়ের একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে।
* ড. শরীফ ভূঁইয়া, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।
![]() |
| শরীফ ভূঁইয়া। ফাইল ছবি |

No comments