সৌদি আরবের এমন অবস্থারই অপেক্ষায় ছিল ইসরায়েল

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য পেতে রিয়াদ ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে এ যোগাযোগ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত আন্তর্জাতিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আরটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের যোগাযোগ সত্যিই হয়ে থাকলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতা এতদিন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় ছিল।

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নৌপথের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এতে সৌদি আরবের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি দেশটিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও লজিস্টিকসের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েল কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে হুথি ও ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। স্যাটেলাইট নজরদারি, সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা ও অস্ত্রের গতিবিধি বিশ্লেষণে দেশটির সক্ষমতা রয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য এসব তথ্য হুতিদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর বিনিময়ে রিয়াদকে রাজনৈতিকভাবে কতটা মূল্য দিতে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের ওপর হামলার বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়িয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন গোয়েন্দা সহায়তা দিতে আগ্রহী হলেও ইয়েমেনে নতুন করে সরাসরি যুদ্ধের মূল দায়িত্ব নিতে এখনই প্রস্তুত নয়।

ইরানকে ঘিরে বদলে যেতে পারে সৌদি অবস্থান

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে রিয়াদ।

এ নীতির ফলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ পেয়েছে। এমনকি বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হওয়ার পরও রিয়াদ নিজেকে সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ হিসেবে দেখাতে চায়নি এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু হলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইরান সৌদি আরবের কাছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য হস্তান্তরকে শুধু হুতিদের বিরুদ্ধে কারিগরি সহযোগিতা হিসেবে না দেখে তেহরানবিরোধী আঞ্চলিক জোটে রিয়াদের যোগদানের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কারণ ইরানের দৃষ্টিতে হুতিরা বিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি নয়, তারা বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর অংশ।

ফিলিস্তিন ইস্যুও বড় বাধা

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সহযোগিতা শুধু ইরানের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে না। আরব বিশ্বে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক শর্তের কথা বলে আসছে। ফলে রাজনৈতিক সমাধানের আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা কেন প্রয়োজন, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে রিয়াদকে।

এখানেই সেন্টকমের মধ্যস্থতার গুরুত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড দুই দেশের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে সৌদি আরব সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ঘোষণা না দিয়েও ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারে। একইভাবে ইসরায়েলও আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারবে।

ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত সুযোগ

ইসরায়েলের জন্য এমন সহযোগিতা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আগেই সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে ইসরায়েল দেখাতে পারবে, ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলায় দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরব দেশগুলোর জন্যও প্রয়োজনীয়।

ফলে ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ শুধু রাজনৈতিক প্রকল্প না থেকে বাস্তব নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

গত কয়েক বছর ধরে উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে ইসরায়েল। কয়েক বছর আগেও এমন সহযোগিতা প্রায় অকল্পনীয় মনে হলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সৌদির সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

হুতিদের হামলা, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের ঝুঁকি এবং সৌদি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা রিয়াদকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

সৌদি আরবকে হয় ইয়েমেনে আবারও জটিল ও অনিশ্চিত সামরিক অভিযানে একা যেতে হবে, নয়তো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এমন দেশগুলোর সহযোগিতা নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক। যুক্তরাজ্য মূলত পরামর্শক পাঠানোর মধ্যেই সীমিত রয়েছে। আবার সৌদি আরবের আঞ্চলিক অংশীদাররাও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।

আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও এখন পর্যন্ত রিয়াদের তাৎক্ষণিক সামরিক প্রয়োজন মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলই হয়তো হুতিদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য দিতে সক্ষম হতে পারে।

যদি ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য সৌদি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে প্রথম কার্যকর সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হতে পারে। শুরুতে এটিকে জরুরি পরিস্থিতির সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হলেও তা কার্যকর প্রমাণিত হলে পরে ভেঙে ফেলা কঠিন হতে পারে।

ইরানের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ইরানের প্রতিক্রিয়া। তেহরান সম্ভবত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানের সঙ্গে ইসরায়েলের বৃহত্তর ইরানবিরোধী কৌশলের বিষয়টি আলাদা করে দেখবে না।

ইরান যদি মনে করে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতায় যাচ্ছে, তাহলে সৌদি সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি তেল স্থাপনা, বন্দর, ট্যাংকার চলাচলের পথ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এসব অবকাঠামো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জোটের পথে কতটা এগিয়েছে রিয়াদ?

তবে এখনই বলা কঠিন যে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরং রিয়াদ আপাতত একটি নির্দিষ্ট সামরিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা খুঁজছে; এমনটাই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সৌদি নেতৃত্ব ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য, মার্কিন সহায়তা এবং ব্রিটিশ পরামর্শ নিতে আগ্রহী হলেও অন্য কোনো পক্ষের যুদ্ধে নিজেদের সরাসরি সম্মুখসারিতে দেখতে চাইবে না।

তবে হুতিদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা যদি ধীরে ধীরে ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপ নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তখন বিষয়টি শুধু ইয়েমেন, লেবানন বা লোহিত সাগরের পৃথক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ইসরায়েল, সৌদি আরব ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের একদিকে এবং ইরান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোকে অন্যদিকে রেখে দুটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বর্তমান যোগাযোগকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের আরেকটি ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এটি ভবিষ্যতে পুরো আঞ্চলিক সংঘাতের কাঠামো বদলে দেওয়ার একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে।

তবে এখনো রিয়াদ চূড়ান্ত কোনো সীমা অতিক্রম করেছে; এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। বরং বর্তমান যোগাযোগকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সূত্র : আরটি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স