চীনা ঋণের শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাবে অস্বস্তিতে ঢাকা

দেশের বড় বড় প্রকল্পে চীনের ঋণ সহায়তার শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাবে অস্বস্তিতে পড়েছে ঢাকা। আর প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার আভাস পেয়ে এখনই আটঘাট বেঁধে দরকষাকষিতে নামতে চায় বাংলাদেশ। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চীনের ঋণে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় থাকা প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করেছেন পররাষ্ট্র সচিব। গত অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরে ওইসব প্রকল্পে দেশটির ঋণ সহায়তা পাওয়ার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার এবং এ সংক্রান্ত চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়েছিল। ‘প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সফরে সই হওয়া চুক্তি-সমঝোতা এবং যৌথ অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন’- শীর্ষক স্টক টেকিং ওই পর্যালোচনা সভায় মূলত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী ওই পর্যালোচনায় চীনা ঋণের শর্ত পরিবর্তনে প্রস্তাব নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা কথা হয়। সভা সূত্র বলছে, ইআরডি এবং সড়ক ও সেতু বিভাগের প্রতিনিধিরা চীনের শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সভায় উত্থাপন করে। সভার সভাপতি পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অবশ্য বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন। এ নিয়ে ইআরডি প্রতিনিধিরা বেইজিংয়ের সঙ্গে যেসব চিঠি চালাচলি করেছেন তাও সভাকে অবহিত করেন। সভার সমাপনীতে পররাষ্ট্র সচিব উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন থেকে কমিপ্রহেনসিভ মুভমেন্ট জরুরি বলে মত দেন। বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রতিনিধি কিংবা ইআরডি বেইজিংয়ের সঙ্গে যে আলোচনায় করুক না কেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তা অবহিত করতে হবে। যাতে প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস বেইজিংয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বা কার্যকরি পর্যায়ে আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সচিবের ওই পরামর্শের বিষয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও সহমত পোষণ করেন। সভা সূত্র বলছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরে দেশের যেসব মেগা প্রকল্পে দেশটির ঋণ সহায়তা সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল তা নিয়ে নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ছিল উচ্চ সুদে এবং তুলনামূলক কঠিন শর্তে সই হওয়া ওই ঋণ চুক্তি বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে পারবে কি-না? এ সবই ছিল আশঙ্কা আর সমালোচনা ছিল। সেই সময়ে শাসক মহল কিংবা বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা অনেকটাই নীরব ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল পরবর্তী দরকষাকষিতে সুদের হার ঠিক রেখে অন্যান্য শর্তগুলো হয়ত শিথিল করা যাবে। কিন্তু না, দরকষাকষিতে সেই শর্ত তো শিথিল নয়ই বরং এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। উল্লেখ্য, ওই সফরে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। সেই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সরকারি খাতে ২৭টি চুক্তি এবং সমঝোতা হয়। যার মূল্যমান ছিল- ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ওই অর্থ ঋণ হিসাবে দেয়ার অঙ্গীকার করে বেইজিং। ঋণের সুদ ও সার্ভিস চার্জ মিলে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে পরিশোধের কথা রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য পণ্য চীন থেকেই আমদানি করার শর্ত ছিল। এছাড়া চুক্তি কার্যকরের এক মাসের মাথায় চুক্তির ব্যবস্থাপনা ও প্রতিশ্রুতি ফিও আদায়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেখানে প্রকল্প হিসেবে ছিল- চট্টগ্রাম এবং খুলনায় দু’টি বড় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যার একেকটির উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে একটি টানেল তৈরির প্রকল্পেও অর্থ সহায়তার অঙ্গীকার করেছিল চীন। এছাড়া একটি সার কারখানা, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে চীনা অর্থ সাহায্যে। শুধু তাই নয়, বেসরকারি পর্যায়ে চীনের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকার ব্যবসায়ীদের ১৩টা চুক্তি হয়েছিল। যাতে আরও প্রায় এক হাজার তিনশ’ ষাট কোটি ডলার ব্যবসা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে।