Showing posts with label ফারুক ওয়াসিফ. Show all posts
Showing posts with label ফারুক ওয়াসিফ. Show all posts

Sunday, December 6, 2015

প্রবাসীদের এসওএস বার্তা শুনুন by ফারুক ওয়াসিফ

‘আমাদের রক্ষা করো নতুবা গুলি করে মারো’! এত মরিয়া কারা হতে পারেন? না, তাঁরা সিরীয় শরণার্থী নন, নন রোহিঙ্গা দেশহীন। তাঁরা বাংলাদেশি। গ্রিস সীমান্তে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর শরণার্থীদের সঙ্গে এক সারিতে তাঁরাও দাঁড়িয়ে। তাঁরাও বলছেন, আমাদের বাঁচান। মেসিডোনিয়া যেমন সিরীয় শরণার্থীদের সামনে নিষেধের কাঁটাতার তুলেছে, সেই কাঁটাতারে আমাদের দেশি ভাইয়েরাও আটকা। তাঁরাও ইউরোপের সমৃদ্ধ কোনো কোনো দেশে যেতে চান। প্রথম আলোর ২৪ নভেম্বরের সংবাদ বলছে, মেসিডোনিয়া সীমান্তে তাঁদের আটকে রেখেছে পুলিশ। এএফপির ছবি দেখে তাঁদের যুদ্ধের তাড়া খাওয়া মানুষ থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। এঁদের হয়তো ‘অর্থনৈতিক অভিবাসী’ বলা যায়। এই অভিবাসীরা গত সোমবার থেকে গ্রিস-মেসিডোনিয়া সীমান্তে আন্দোলন শুরু করেছেন।
ঘটনাটা তিল পরিমাণ, কিন্তু তালের আকার পাওয়ার সব সম্ভাবনা এর মধ্যে রয়েছে। দুঃখজনক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে এখনো মুখ খোলেনি। কিন্তু ঘটনা কীভাবে পাকিয়ে উঠছে, প্রথম আলোরই বিগত কিছু খবর খেয়াল করলেই তা বোঝা সম্ভব দেখা যাবে। ২০১১ সালে গ্রিস উপকূলে ১০ বাংলাদেশি সমুদ্রে ডুবে মারা যান। ২০১৩ সালে খামারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর গুলিতে ৩২ জন আহত হন। ২০১৪ সালে খামারের মালিককে সে দেশের আদালত বেকসুর খালাস দিয়ে দেন। গত আগস্টে গ্রিসের কুস দ্বীপে ২০০ বাংলাদেশি অভিবাসীর আটকে পড়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে।
এর পটভূমিতে ছিল বাংলাদেশের সাহসী উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের এক সাফল্য-কাহিনি। গ্রিসে বাংলাদেশিদের মালিকানায় ছোট-বড় প্রায় ২৫০টি পোশাক কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোয় কাজ করেন পাঁচ হাজার বাংলাদেশি। বাংলাদেশ থেকে পাওয়া ক্রয়াদেশের ওপরই মূলত এসব কারখানা চলে। কিন্তু ২০১৪ সালে গ্রিস দেউলিয়া হয়ে গেলে অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও তাদের ক্রয়াদেশ কমে আসায় শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শত শত নয়, হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ইউরোপে পাড়ি জমাতে মরিয়া হবেন। গ্রিসে সরকারি হিসাবে ২০ হাজার বাংলাদেশি থাকার কথা। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, মালে, ইরাক প্রভৃতি যুধ্যমান দেশের অবশিষ্ট বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী যুক্তরাজ্যসহ ধনী দেশগুলোকে বাংলাদেশের দুর্গতদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তা শুনবে কেন?
এঁদের পেছনে যাওয়ারও উপায় নেই, সামনের দিকেও কাঁটাতার ও সীমান্ত বাহিনী। আর সমুদ্র তো মরণের ফাঁদ। বাধ্য হয়ে তাঁরা সেখানকার একটি রেলপথ অবরোধ করে বলেছেন, ‘আমাদের গুলি করে মেরে ফেলো, আমরা কখনোই ফিরে যাব না।’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার ভয় আছে। অন্যদিকে, প্যারিসে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের হামলার পর রাশিয়া বাদে পশ্চিমা দুনিয়াতেই মুসলিমভীতি বাড়ছে। ইউরোপের ডানপন্থী দল এবং কিছু কিছু মিডিয়া তীব্র মুসলিমবিদ্বেষ ছড়াতে কোমর কষে নেমেছে। এতে তাদের ফায়দা রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের শ্রমিকেরা নিজেদের ‘অর্থনৈতিক অভিবাসী’ বললেও তাঁদের দেখা হবে ধর্মপরিচয় খোঁজার হিংসুক চশমা দিয়ে। যদিও বাস্তবে আইএসকে মুসলিম বলা যায় কি না, কিংবা কোনো বিচ্ছিন্ন মুসলিম ঘাতকদের দায় সমগ্র ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীর ওপর চাপানো যায় না। তারপরও যুক্তির কথা কে শুনবে? বাস্তবে ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মোট সন্ত্রাসী ঘটনার মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশে মুসলমান কেউ জড়িত ছিলেন। ইহুদিরা জড়িত ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে। তথ্যটা এফবিআইয়ের দেওয়া। তাহলেও ঘৃণা ও আতঙ্ক সত্য ও ন্যায়কে পরাস্ত করছে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, ইউরোপে কর্মরত মুসলমান অভিবাসী ও শ্রমিকদের নিয়ে বাংলাদেশকে দূরদর্শী ও মানবিক কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা তো কিছু জানতাম না, এ কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। যখন বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে শত শত বাংলাদেশির গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখনো সরকার কিছু না জানার ভান করেছিল। না জানা দোষ নয়, কিন্তু জানতে না চাওয়া অপরাধ; বিশেষত যেখানে দেশের নাগরিকদের জীবনের প্রশ্ন জড়িত। যাঁরা আবার সোনার ডিম পাড়া হাঁস, যাঁদের রেমিট্যান্স ছাড়া বাংলাদেশ এখনো চলতে সক্ষম নয়। এটা প্রতিদান বা দয়া নয়, এটা সরকারের জরুরি দায়িত্ব।
জাতিসংঘ শরণার্থী আইন সেকেলে। আমাদের জলবায়ু শরণার্থী, যুদ্ধতাড়িত শরণার্থী, অর্থনৈতিক অভিবাসীদের সেই সংজ্ঞায় সঠিকভাবে ধারণ করা হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনই বলি, যুদ্ধ-সন্ত্রাসই বলি, আর বলি অর্থনৈতিক বঞ্চনার কথা, এসবের কোনোটির দায় একসময়কার ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্য এবং বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলো এড়াতে পারে না। বুকার বিজয়ী লেখক মহসিন হামিদ আমাদের চিন্তাকে থমকে দেন এই বলে যে, ‘একদিন পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষ আমাদের যুগের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখবে এবং চিন্তা করবে, এরা স্বাধীনতার পূজারি হয়েও কীভাবে অভিবাসীদের বন্দী করা ও ফেরত পাঠানোকে আইন করে বৈধতা দেয়! সেই আগামীর মানুষ ঠিক সেই চোখেই আমাদের দেখবে, যেভাবে আমরা দেখি দাসপ্রথাকে আইনসম্মত করা সমাজকে।’
একদিকে বিশ্বের ধনী ও তাদের পুঁজি, পণ্য, অস্ত্র অসম্ভব গতিশীল, কোনো সীমান্তই তাদের আটকে রাখতে পারে না। অন্যদিকে দরিদ্র ও আশ্রয়প্রার্থীরা হয় অঞ্চলবন্দী ও স্থানীয়তার অনন্ত বাঁধনে আটক। যুদ্ধ, মন্বন্তর, জলবায়ু পীড়িত করলেও সীমান্তের কাঁটাতার পেরোনো তাদের জন্য নিষিদ্ধ। ক্রমেই শরণার্থী পরিচয় ভারাক্রান্ত হচ্ছে অপরাধী, সন্ত্রাসী, বিশৃঙ্খলাকারী ঊনমানব হিসেবে। ধনী দেশগুলোর নীতিনির্ধারকেরা ‘দুর্গ মানসিকতা’র পরিচয় দিচ্ছেন। আর কাঁটাতারের বেড়ার এপারে অপেক্ষমাণ যাঁরা, যাঁরা শরণার্থীশিবিরের অমানবিক-অসামাজিক ঘেরাটোপে আবদ্ধ, তাঁরা স্থায়ীভাবে ‘অস্থায়ী দশা’য় ঝুলে থাকছেন। এঁদের বলা যায় নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিক। এঁরা নেতিবাচক বিশ্বায়নের শিকার। এঁরা নিজ সমাজ হারিয়েছেন, কিন্তু নতুন সমাজেও তাঁদের অবস্থান মানববর্জ্য হিসেবে। কিন্তু এই দুর্ভাগ্যের জন্য তাঁরা কোনোভাবেই দায়ী নন। প্রশ্নটাও আর মানবিকতার নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। একদিকে শরণার্থীদের বলা হচ্ছে সম্ভাব্য শরণার্থী, সভ্যতার সুযোগের অযোগ্য, অন্যদিকে বহিরাগত আতঙ্ক সৃষ্টি করে শক্তিশালী হচ্ছে ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদ: ভারত থেকে ফ্রান্স অবধি।
এমন নয় যে ইউরোপের বাংলাদেশি শ্রমিক দরকার নেই। প্রচণ্ড দরকার আছে। বিশেষত, জার্মানির মতো বিরাট অর্থনীতির দেশের। আমাদের দরকার অসুবিধাকে সুবিধায় পরিণত করার পথে হাঁটা। জাতীয়ভাবেই এ বিষয়ে এখনই তৎপর না হলে আচানক বিরাট বিপদে পড়তে পারেন লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। অথচ পরিহাসের কথা, আশ্রয়ণ, প্রত্যাবাসন ও স্থানান্তর তো দূরের কথা, ১১ লাখ প্রবাসীর পাসপোর্ট অচল হতে বসেছে। কারণ, তাঁদের হাতে সেই পুরোনো পাসপোর্ট! আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (আইসিএও) ১৬ বছর আগে বাংলাদেশকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট, এমআরপি) চালুর নির্দেশনা দিলেও কাজটা হয়নি। দুনিয়া চলে রকেটগতিতে, আমরা চলি গদাইলস্করি চালে।
এ মুহূর্তে তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এটাই বলার আছে, ভাই, এভাবে হয় না, হবে না, হওয়ার নয়। প্রবাসীদের এসওএস বার্তা শুনুন।
গ্রিস-মেসিডোনিয়া সীমান্তে আটকা পড়া শরণার্থীরা গতকালও সহায়তার জন্য আকুতি জানান। এই শরণার্থীদের মধ্যে সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ছাড়াও বাংলাদেশের নাগরিক আছেন। ছবি: এএফপি

Sunday, November 15, 2015

আক্রান্ত প্যারিস: জঙ্গি হামলার দুই অভিশাপ by ফারুক ওয়াসিফ

প্রচলিত যুদ্ধের লক্ষ্যটা ঘোষিত থাকে, কিন্তু সন্ত্রাসী হামলার দুটি লক্ষ্য—একটি প্রকাশ্য ও অন্যটি লুকানো। সেই লুকানো উদ্দেশ্যটা সন্ত্রাসীদের সত্যিকার পরিচয়ের মতোই জানা কঠিন। প্যারিসে হামলায় সন্দেহভাজন সব জঙ্গি নিহত, তাদের সঙ্গে নিহত দেড় শ’শর মতো নিরীহ মানুষ। যারাই করুক, এই দেড় শ মানুষ হত্যা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়, তাদের উদ্দেশ্য বিশ্বকে আরও হানাহানির দিকে চালিত করা।
প্যারিস হামলার দুদিন আগে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে দুটি আত্মঘাতী বোমায় ৪৩ জনের প্রাণ গিয়েছে। প্রায় একই সময় আফগানিস্তানে নয় শিশুর মুণ্ডুহীন দেহ পাওয়া গেছে। তারও কিছু আগে মিসরের সিনাই উপত্যকায় রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ায় ২২৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। ঘটনাগুলো যখন ঘটছে, তখন সিরিয়ায় রাশিয়া বনাম ন্যাটো জোট (যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক) মুখোমুখি। সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা করেও সুবিধা পাচ্ছে না। এর সমান্তরালে চীন সাগরে আমেরিকা ও চীনা নৌবাহিনী পরস্পরকে হুমকিতে রাখছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার খেয়ে সিরিয়া-ইরাককেন্দ্রিক আইএস সন্ত্রাসবাদ ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত গবেষণা সংস্থা র‍্যান্ড করপোরেশনের নতুন এক প্রতিবেদন। জঙ্গি হামলা আর আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা কঠিন।
প্যারিস হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ‘অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাউকে দায়ী করছি না’ বললেও অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, সিরিয়ায় মার খাওয়া আইএস-ই রয়েছে এর পেছনে। লেবাননে হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে আইএস এর নামে। লক্ষ করার বিষয়, দেশে দেশে হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো প্রগতিশীল ও জঙ্গিবাদবিরোধী শক্তি ও প্রতীক। প্যারিসের হামলার শিকার এলাকাটি তরুণ ও প্রগতিশীলদের মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। লেবাননে হামলা হয়েছে শিয়া-অধ্যুষিত এলাকায়। লেবানন ইরানবান্ধব শিয়া হিজবুল্লাহর প্রভাবাধীন এবং উভয়েরই শত্রু আইএস। রাশিয়া একই সঙ্গে আইএস ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। চীন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি নীতির বিপক্ষে।
ধরে নেওয়া চলে, এসব সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্য আইএস ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলবিরোধীদের বিপর্যস্ত করা। যেমন রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর রুশ জনমতের মধ্যে সিরিয়ায় রাশিয়ার জড়ানো নিয়ে অস্বস্তি শুরু হয়েছে।
সিরিয়া নিয়ে ডামাডোলের মধ্যে দারুণ সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি ভূমি জবরদখলের আওতা বেড়েছে। পূর্ব জেরুজালেম থেকে আরবদের বিতাড়ন করে মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদের নিয়ন্ত্রণও তারা নিতে চাইছে। এর জবাবে স্বতঃস্ফূর্ত ফিলিস্তিনি প্রতিরোধে প্রতিদিনই আরব ও ইহুদিদের কেউ না কেউ নিহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি পেছনে রেখে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে বারাক ওবামার সঙ্গে দেখা করেছেন। রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক জানিয়েছে, ওবামার কাছে ১৯৮১ সালের যুদ্ধে দখল করা সিরিয়ার গোলান উপত্যকা ইসরায়েলের অংশ করে নেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েল এখন কোণঠাসা। বয়কট ইসরায়েল আন্দোলন জোরদার হচ্ছে, বিবেকি ইউরোপীয়রা ইসরায়েলের নিন্দা করছেন। মানবতাবাদীদের চাপে কোনো কোনো ইউরোপীয় সংসদে ইসরায়েলের নিন্দা উঠেছে। মনে হচ্ছে, সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা বেকায়দায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পশ্চিমা জনমতের সাম্প্রতিক কিছু উপলব্ধি। তালেবান-আল কায়েদা ও আইএস সৃষ্টিতে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর অবদান এখন সুবিদিত। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এগুলো বুমেরাং হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, এসব সংগঠন বিশ্ব নিরাপত্তার হুমকি। পরিণামে, পশ্চিমা ভোটারদের মধ্যে তাদের সরকারগুলোর ‘সাপ হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়া’র কৌশলের সমালোচনা বাড়ছে।
এমন সময়ই ফ্রান্সে বর্বরতম সন্ত্রাসী হামলা ঘটল। কিন্তু ফ্রান্স কেন? প্রথমত, ফ্রান্সেই রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বেশি মুসলমান। ফ্রান্স আলজেরিয়াসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে সরাসরি উপনিবেশ কায়েম করে রেখেছিল ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত। সেসব সাবেক কলোনির মুসলমানরা ফ্রান্সে বসত গাড়ে। দ্বিতীয়ত, লিবিয়ায় গাদ্দাফি আর সিরিয়ায় আসাদ সরকার উচ্ছেদের যুদ্ধে ফ্রান্স সরাসরি জড়িত ছিল। দৃশ্যপটে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ঢোকার পর ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা নিয়ে দোনোমনায় পড়ে। তৃতীয়ত, ফ্রান্সে মুসলিম-বিদ্বেষী ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে। ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদো আক্রান্ত হলে তারা আরও জনপ্রিয় হয়। মুসলমানদের ওপর হামলার মাত্রাও সমানতালে বাড়তে থাকে। যেকোনো জঙ্গি হামলা মুসলিম ও অমুসলিম উভয় চরমপন্থাকেই চাঙা করে।
এ অবস্থায় সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে গেল। জার্মানির মতো উদার দেশও এখন ভেতর ও বাইরের ডানপন্থীদের বাধার মুখে পড়বে। কী করুণ পরিহাস! যে সিরীয়রা আইএসের ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচতে ইউরোপে ছুটছিল, তাদেরই আবার আইএসপন্থী বলে দোষানো হচ্ছে। আইএসের সমর্থক হলে তো তাদের আর স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে এসে করুণা ভিক্ষা করতে হতো না। ভেতরে আইএস, বাইরে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আতঙ্ক: বিশ্বের মুসলমানরা দুদিক থেকেই আক্রান্ত।
এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সন্ত্রাসী হামলার দুমুখো লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়। সন্ত্রাসী হামলার তাৎক্ষণিক শিকার লোকদের হত্যা করে সন্ত্রাসীরা আসলে অন্যদের বার্তা দিতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য বৃহত্তর সমাজকে বিভক্ত, ভীত ও মারমুখী করে তোলা। ইসলামের নামে হামলা হলে মুসলমান বনাম বাকিদের শত্রুতা আরও বাড়ে। তারা এক ঢিলে মুসলমান ও অমুসলিম উভয়কেই চরমপন্থী করে তুলতে চায়। একদিকে থাকবে প্রগতিশীল মুসলমান ও ইউরো-মার্কিন জোট, অন্যদিকে থাকবে বিক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধকামী মুসলমান তরুণ। এরই আলামত দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। ইতিমধ্যে ফরাসি শহর ক্যালাইসে একটি মুসলিম শরণার্থীশিবিরে আগুন দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বলেছেন, ‘হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন যুদ্ধ চলবে।’ হামলাকারীদের নাম-পরিচয় জানার আগেই মুসলমানদের ওপর হামলা থেকে অনুমান করা যায়, কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ইউরোপে। একদিকে সিরীয়-লিবীয় শরণার্থীদের ঢল, অন্যদিকে ইউরোপীয় মুসলিম নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মৌলবাদী শ্বেতাঙ্গরা ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত। একসময় যেভাবে ডানপন্থীরা ইহুদিদের ইউরোপের অভিশাপ ঘোষণা করে বিতাড়ন করতে চেয়েছিল এবং সেই বিদ্বেষ পুঁজি করে হিটলারের নাৎসি পার্টি ইহুদি নিধনকে জায়েজ করতে লেগেছিল; ইউরো-মুসলিমদেরও সে রকম দশায় যে পড়তে হবে না, তা কে বলতে পারে? বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক মন্দার পরিস্থিতিতে মুসলিমদের সব নষ্টের গোড়া ভাবার লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। মুসলিম-অমুসলিমে এই বিভাজন যুদ্ধবাজ স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর ‘ভাগ করো শাসন করো’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মওকা এনে দেবে এবং পরিণামে শক্তিশালী করবে খোদ জঙ্গি ও তাদের রক্ষকদের।
প্যারিসে হামলার এক দিন আগে ফরাসি জরিপ সংস্থা আইএফওপির (IFOP) একটি জরিপের ফল প্রকাশিত হয় প্রখ্যাত লা ফিগারো পত্রিকায়। ওই জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আবশ্যকীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ফরাসিরা অগণতান্ত্রিক ধরনের সরকার মেনে নেবে কি না? ৬৭ শতাংশ অনির্বাচিত টেকনোক্র্যাটদের পক্ষে বলেছে। ৪০ শতাংশের পছন্দ অনির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী সরকার।
শার্লি এবদোর একটি সন্ত্রাসী ঘটনা ফরাসি জনমতকে কতটা বদলে দিয়েছিল, এই জরিপ তার ইঙ্গিত দেয়। নতুন নাশকতার প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হবে। ফরাসি মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় এবং ডানপন্থী বর্ণবাদীদের দমন-পীড়ন বাড়লে তাদের অনেকেই জঙ্গিবাদী দলে নাম লেখাবে। অথবা নিজেরাই আপনা থেকে হাতের কাছে যা পায়, তা নিয়ে ঘৃণার রাজনীতিতে জড়াবে। মনে রাখা দরকার, ফ্রান্সের বেকার ও দরিদ্র মুসলিম তরুণেরা কয়েক বছর আগে বঞ্চনার প্রতিবাদে প্যারিসে দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আইএস তাঁদের আরও ভয়ংকর পথে হাতছানি দিচ্ছে। সিরীয় যুদ্ধে যোগ দেওয়া ৩ হাজার ১০০ ইউরোপীয় নিজ নিজ দেশে নাশকতা শুরু করলে কী ভয়ংকর পরিস্থিতি হবে, কল্পনা করা যায়?
আইএস যতই রহস্যময় গুপ্তশক্তি হোক, আন্তর্জাতিক শক্তির মদদ, প্রশিক্ষণ ও রক্ষাকবচ ছাড়া তাদের পক্ষে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস চালানো সম্ভব নয়। সুতরাং আইএস দমনের নামে ইউরোপ অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবিরোধী পথ নিলে শুধু ইউরোপীয় সংহতিই নষ্ট হবে না, বিশ্বব্যাপী সাম্প্রদায়িক হানাহানি অভূতপূর্ব স্তরে উঠবে। আইএসের ষড়যন্ত্রের গোড়া রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা নীতিতে। আরেকটি গোড়া হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর প্রতি তাদের বৈরী আচরণ। তাই জঙ্গি মদদ ও জঙ্গিবাদ সহায়ক অসন্তোষের জমিন বানানো বন্ধ করতে হবে।
জঙ্গিবাদের অভিশাপ দ্বিমুখী। জঙ্গি হামলার পর অনেক ‘সভ্য’ মানুষও প্রতিহিংসায় অন্ধ হন। তেমনি নিপীড়িতদের মধ্যে জন্ম দেয় আরও বেশি জঙ্গি। এবং পরিণামে দুইয়ে মিলেই মানবিকতা, ন্যায় ও সত্যের সম্ভাবনা ধ্বংস করে।
বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার শিকার লেবানন ও ফ্রান্সের পাশে আমরা দাঁড়াব। বলব আমরাও লেবানন, আমরাও ফ্রান্স। পাশাপাশি আশা করব, ঐক্যবদ্ধ ফ্রান্স ‘জঙ্গিদের’ উসকানিতে পা দিয়ে তাদেরই অনুকরণে নির্বিচার আচরণ করবে না। অশুভ জঙ্গিবাদের শক্তিটা এখানেই যে, তা আক্রান্তকে যেমন চরমপন্থার পথে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি হতাশ ও বঞ্চিতদেরও জঙ্গিবাদের দিকে টানে। এই দুইয়ের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার দায় সবার। ইউরোপ কেবল যুদ্ধ ও বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি নয়; মানবতা, ন্যায়, স্বাধীনতা ও শান্তির বৃহত্তম খুঁটিও কিন্তু এই ইউরোপ। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ডাক দেওয়া প্যারিস কমিউনের বর্তমান উত্তরসূরিরা ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গি হিংসা ও জাতিবিদ্বেষ মোকাবিলা করবে, এটাই আশা। এই দুর্দিনে শুভবুদ্ধি ও শুভশক্তির জয় হোক।

Friday, November 13, 2015

বাঘের গুহার সামনে আমরা সবাই একা! by ফারুক ওয়াসিফ

সবাই মহাবিপদের ভয় করছেন। ভয়টা অমূলক নয়। নিহত প্রকাশক দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের পর এত ভয় আমি কখনো পাইনি।’ হয়তো এটাই মানুষের মনের কথা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত ২১ আগস্টে বলেছিলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ না থাকলে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সৈয়দ আশরাফের দায়িত্ব। কিন্তু দেশবাসীকে এক করবে কে? অধ্যাপক হক বিচার চান না, শুভবুদ্ধির উদয় চান। শুভবুদ্ধির উদয় বলতে তিনি জাতীয় ঐক্যের কথাই বলে যাচ্ছেন। সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে, শোকের জমিনে যে পিতা ঐক্যের বীজ বপন করেন, সেই বীজ ফেটে শান্তির উদয় হতে হলে শুধু দলীয় ঐক্য না, জাতীয় ঐক্যের কথা ভাবতে হবে। তাই শুধু দলীয় ঐক্যের ডাক দিলেই হবে না, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার রূপরেখাও দিতে হবে।
এত হিংসা ও বিভেদ এই দেশে বহুকাল দেখা যায়নি। মানুষ ভরসা ও ঐক্যের দিশা দেখতে চায়। অবিশ্বাসের দেয়াল উঁচু হচ্ছে প্রতিদিন। সমাজে বিশ্বাসে, পরিচয়ে ও মতামতে ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু এখন বিভক্তির পরিখা তৈরি হচ্ছে। তাতে ঢালা হচ্ছে হিংসার তপ্ত গরল। মানুষ খুন হচ্ছে অহরহ। একতা না থাকলে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হলে কী পরিণতি হয়, স্বাধীন দেশের তার অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।
বিপর্যয়ের লক্ষণগুলো দগদগে। একের পর এক লেখক-ব্লগার-প্রকাশক খুন হচ্ছেন অথবা হামলায় ক্ষতবিক্ষত হতে থাকছেন। এগুলো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। এগুলোর লক্ষ্য হিংসা ও বিভক্তির দাবানল লাগিয়ে দেওয়া। কোনো হত্যার পরই বলা যাচ্ছে না, এটাই শেষ। সেই ভরসা জাগাতে সরকার ব্যর্থ।
সন্তানের লাশ কাঁধে, শোকের জমিনে যে পিতা ঐক্যের বীজ বপন করেন, সেই বীজ ফেটে শান্তির উদয় হতে হলে শুধু দলীয় ঐক্য না, জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। তাই শুধু দলীয় ঐক্যের ডাক দিলেই হবে না, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার রুপরেখাও দিতে হবে লেখক ও সাংবাদিক, স্বদেশি ও ভিনদেশি, পুলিশ ও প্রশাসন, সরকারি ও বিরোধী, ডান বা বাম—কে নিরাপদ? কোনো মৃত্যু হয় চাপাতি অথবা গুলিতে, কোনো মৃত্যু হয় বন্দুকযুদ্ধ অথবা ক্রসফায়ারে। কোনো কোনো মৃত্যুর বায়বীয় দায় স্বীকার করার ঘোষণা আসে অনলাইনে। কোনো কোনো হত্যার দায় কেউই স্বীকার করে না। মৃত্যুর আগে কেউ নাস্তিক, কেউ আস্তিক, কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, কেউ বাংলাদেশি, কেউ বিদেশি, কেউ ভালো, কেউ মন্দ; কিন্তু হত্যার পরে যে লাশ পড়ে থাকে, তা মানবের। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে, নাগরিক হিসেবে তার হত্যার বিচার লাগবে, নিরাপত্তা দিতে হবে।
আশুলিয়ায় একজন পুলিশ সদস্য হত্যার পর আক্রান্ত হলেই পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশের চিন্তাটা আত্মরক্ষার দিকে; জননিরাপত্তার কী হবে? বিপদে তো সবাই! পুলিশের বন্দুকে গুলি থাকে না, মন্ত্রীদের কথা ও কাজে সত্য ও মানবিকতা থাকে না। একদিকে চাপাতি আরেকদিকে ৫৭ ধারা। কথা বলবে কে? ক্রসফায়ার-বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ করা কি মানবাধিকারের দাবি, নাকি আইনের শাসনের দাবি, অথবা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তার দাবি, তা নিয়ে ভাবার সুযোগই-বা কই? এই সম্মিলিত ভয়ের সঠিক নাম জাতীয় সংকট, অস্তিত্বের সংকট।
ভীত মানুষ সুস্থ চিন্তা করতে পারে না। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের গোলমালে সত্য শনাক্ত করাও কঠিন। অতীত ও ভবিষ্যতের সবকিছুর জন্য যদি ‘কেষ্ট ব্যাটাই’ দায়ী হয়, তাহলে সর্বময় ক্ষমতা নিয়েও কেন পরাস্ত হচ্ছে সরকার? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমুখে জামায়াতকে দায়ী করেন, আরেক মুখে বলেন জামায়াত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারকে অভিযোগের তোপের মুখে রাখাও বিরোধী দলের কৃতিত্ব হতে পারে না। অদূরদর্শী প্রতিরোধের ডাক দিয়ে যে জীবনের অপচয় হলো, তার জবাবদিহি তাদের করতে হবে। এখন কেউ বলছে জঙ্গি, কেউ বলছে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র, কেউ-বা কপাল চাপড়াচ্ছেন। মুশকিল হলো দুটি পক্ষই যার যার শত্রুকে ‘জাতীয় শত্রু’ আখ্যা দিয়ে বসছে। সাবেক এক কুখ্যাত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে: উই আর লুকিং ফর শত্রুজ! অতীতে এভাবে সত্যের বরখেলাপের ফল ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও হওয়ার নয়।
ভয়কে নাম দিতে পারলে তাকে মোকাবিলা করা যায়। শত্রু চিহ্নিত করা গেলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব। নির্ভরযোগ্য নেতা পেলে তাঁর পেছনে দাঁড়ানো যায়। কিন্তু কী সেই ভয়, কোন সে শত্রু, আর কে দেবেন আশা? বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণে শত্রুকে মোকাবিলার রাজনৈতিক দিশা ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-ননবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’
তখন শত্রুর চেহারা স্পষ্ট ছিল, জাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে একতাও গড়া গিয়েছিল। এখন যখন দেশ দুভাগে বিভক্ত এবং দেশের লোকই দেশের লোকের শত্রু, যখন প্রগতি ও ধর্মের নামে হিংসার আবাদ ছড়ানোর ডিপ পলিটিকস সক্রিয়, তখন ঐক্য আসবে না। যে আগুন জ্বলেছে, তা শিগগির নিভবে না। বদনাম যা হওয়ার হয়েছে, উঠতি বাংলাদেশকে জাগিয়ে রাখতে হলে এখনই যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছেড়ে সহযোগিতার পাটাতন তৈরি করতে হবে। গণতন্ত্র ও অধিকারহীন জাতি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কারও পক্ষেই দাঁড়াবে না। ভয় ও হিংসা সমান তালে বাড়বে। রাজনীতি পরিণত হবে অসামরিক যুদ্ধক্ষেত্রে। অবশ্য লুণ্ঠন-দুর্নীতির তাতে অসুবিধা হচ্ছে না। অসুবিধা হচ্ছে দেশের জীবন ও সম্পদ নিয়ে।
জঙ্গি জঙ্গি বলতে বলতে সত্যি সত্যি যদি আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ এসে যায়, তার মোকাবিলা কি একা করতে পারবে এই সরকার? ব্যর্থ আন্দোলন দিয়ে, গোঁজামিলের কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে আরও অসহিষ্ণুতার দিকে ঠেলে দিয়ে বিএনপিও পগারপার। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিএনপি বা আওয়ামী লীগের একচেটিয়া জয়-পরাজয়ের অংশ নয়। বরং বাংলাদেশ এক থাকলেই দলগুলো টিকবে। ভালো হোক মন্দ হোক, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের দুটি পা, দাঁড়িপাল্লার দুই পাল্লা। এক পা কাটা হয়ে গেলে কিংবা এক পাল্লা ছিঁড়ে পড়লে বিরাট রাজনৈতিক শূন্যতা ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে।
বিএনপি-লীগ পরস্পরের পাতা ফাঁদে নিজেরাই পড়ে গেছে। দেশভাগের সময় মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের শত্রুতা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে ২০০ বছরের দখলদার ব্রিটিশকেই তারা পরম বন্ধু ভেবেছিল। ব্রিটিশের তৈরি দুর্ভিক্ষ ও ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গায় কোটিরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। আজ আওয়ামী লীগের বড় শত্রু বিএনপি, বিএনপির বড় শত্রু আওয়ামী লীগ। দেশের মানুষের চেয়ে বিদেশিদের ওপরই বেশি ভরসা তাদের। এ দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘নিয়ন্ত্রিত’ জামায়াত নিশ্চয়ই মজা পাবে, আর খুশি হবে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়েরা। পরস্পরের জন্য যে খাদ তারা খুঁড়ে যাচ্ছে, তা ডিঙাতে পারবে তো তারা?
আমরা দেখেছি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এবং বিগত জরুরি অবস্থার সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রী একসঙ্গেই নির্যাতিত হয়েছিলেন। যে সমস্যা তাঁরা সৃষ্টি করেছেন, তার সমাধান তাঁদের হাত দিয়ে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এককভাবে কিছু করা খুবই কঠিন। মনের বাঘ বলি বনের বাঘ বলি, বিপদ একটা আছে। বাঘ শিকার নিয়ে একটা গল্প আছে। দুজন শিকারি বন্দুক নিয়ে বনে গেছে বাঘ শিকারে। তো একজন খাদে পড়ে আর নড়েচড়ে না। তখন অপর জন পুলিশে ফোন করে জানতে চাইল, ‘আমার সঙ্গী মনে হয় মৃত, আমি কী করব?’ পুলিশের উত্তর: ‘প্রথমে নিশ্চিত হোন যে আপনার বন্ধু মৃত না জীবিত।’ ফোনের অপর প্রান্তে ‘দুম’ শব্দ শোনা গেল। এবার ফোন কানে নিয়ে শিকারিটি বলল, ‘নিশ্চিত হয়েছি, এবার কী?’
সঙ্গীর মৃত্যু নিশ্চিত করতে গিয়ে শেষ গুলিটি খরচ করে ফেলেছিল শিকারিটি, আর বাঘের গুহার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একা!
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Sunday, November 8, 2015

সুন্দলীর সুন্দর বাঁচতে চায় by ফারুক ওয়াসিফ

ঢাকায় আশুরার রাতে হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলার ঠিক আগে, সন্ধ্যারাতে এক গ্রামীণ মেলায় দেখি, দেব-দেবী ও নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে কারবালার তিরবিদ্ধ দুলদুল ঘোড়ার ছবি। আশ্চর্য কাকতাল! পূজামণ্ডপ থেকে মেলা—সবখানেই মানুষের সরগরম সমাবেশ। অনেক রাত পর্যন্ত মাইকে গান, রাস্তায় চলাচল। সেই রাতেই হোসেনি দালানে হঠাৎ বিকট শব্দ। চিৎকার। তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর কোলাহল, আর্তনাদ। ছত্রভঙ্গ মানুষের পায়ের তলায় পড়ল মানুষ আর মানুষের শিশুরা। একটি মর্মান্তিক মৃত্যুতে বেলুনের মতো ফেটে গেল নিরাপত্তার আশ্বাস। হোসেনি দালান কিংবা রমনার বটমূল, কিংবা রামুর বৌদ্ধমন্দির, কিংবা সাঁথিয়ার হিন্দু গ্রাম; বোমা বা আগুন বা হামলার পরের দৃশ্য ও মানুষের মনোছবি সবখানেই এক।
কিন্তু সুন্দলীতে সেটা ছিল শান্তির রাত। বাজারের মোড় ছিল গমগম। ইজিবাইক আর ভ্যান লোক আনছে আর তুলে নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দিকে। নদীর পাড়ে কুচলিয়া বিদ্যালয়ের মাঠে ষাঁড়ের লড়াই হয়ে গেল বিকেলবেলায়। মাঠ ঘিরে বাঁশের বেড়া। চারকোনা একটু খোলা। সেখান দিয়ে লড়াকু ষাঁড় ঢুকবে বা পরাস্ত হলে লেজ তুলে পালাবে। প্রায় ২০ হাজার দর্শক, গোটা পঞ্চাশেক যোদ্ধা ষাঁড়, ধুলা, ভাজাপোড়ার দোকান—হুল্লোড় শেষে সবাই তখন ফেরার তালে। পরাজিত ষাঁড়গুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে; দেখে মায়া হয়। এদিকে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বিস্তর ইলিশ আর চুইঝাল। যষ্টিমধুর মতো কিন্তু বেশ চওড়া আর লম্বা চুইঝালের আঁশওয়ালা শাখা দিয়ে ইলিশ রান্না বেশ হয় এ এলাকায়।
উৎসবে যেভাবে পাশাপাশি ছিল হিন্দু আর মুসলমানে, কোনো সন্ত্রাস বা ভয় তাদের আলাদা করতে পারেনি। ঢাকা ও ঢাকাকেন্দ্রিক মিডিয়ায় যতই টেনশন বিরাজ করুক, সুন্দলী ও এর আশপাশের কোনো গ্রামে ভয়, উত্তেজনা, অবিশ্বাসের ছায়াটাও দেখা যায়নি। রাজধানী উত্তেজনা ও ভয়ের ডিপো, গণমাধ্যম দুঃসংবাদের ভগ্নদূত। কিন্তু সুন্দলী গ্রামের ওই উৎসব অমলিন অক্ষত সুন্দরই ছিল। হিংসার রাজনীতি নষ্ট করতে পারেনি এই সুন্দর: হরেনের মাটির পুতুল, রথীনের ঘরে ভাজা ঝাল চানাচুর, মোস্তফার চটপটি বিক্রির শেষ ছিল না। সস্তা গয়নার দোকানে হুলুস্থূল ভিড় ছিল মেয়েদের। অন্ধকার গ্রামপথ দিয়ে ছেলেমেয়েরা আসছিল–যাচ্ছিল। কোজাগরী পূর্ণিমা দেখাবে বলে আহ্লাদে ফুলে উঠছিল চাঁদ। পথে পড়ে ছিল জ্যোৎস্নার জালিকাটা আলো। বউ-জামাই, বন্ধু-বান্ধবীরা দল বেঁধে মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে ঘুরছিল। চেনা দুষ্কর কে হিন্দু কে মুসলমান।
এ এমন এক এলাকা, যেখানে গ্রামীণ মেলায় হাসিনা-খালেদা-তারেক-জয়-সালমান-সাকিব-গোলাপ-তাজমহল-দীপিকার ছবি শান্তিতে পাশাপাশি ঝোলে। ঠিক যেভাবে শান্তিতে বাস করে এখানকার মানুষ। জায়গাটা যশোরের নওয়াপাড়ায়।
এ এমন এক এলাকা, যেখানে শেষ কবে খুন বা ধর্ষণ বা রাহাজানি ঘটেছে, অনেকেই মনে করতে পারে না। এ এমন এক বসতি, যার নিরানব্বই ভাগ মানুষই নিম্নবর্ণের হিন্দু অথবা মতুয়া ধর্মাবলম্বী। এখানকার ৯৬টি গ্রাম যেন এক পরিবার। বাইরের মানুষের কাছে তারা জমি বিক্রি করে না। বাইরের সন্ত্রাসী বা চোর বা দস্যুরা এখানে উৎপাতের সাহসও করে না। এই ৯৬ গ্রামে হতদরিদ্র নেই আবার ধনীও বিরল। সবারই খণ্ড খণ্ড জমি আছে। আর আছে মাছ ধরার জন্য অবারিত জলাশয়। এখানে গ্রামের নাম সুন্দলী, ডহর, মহিষহাটি, ফুলেরগাতী, লেবুগাতী, লক্ষ্মীপুর; এখানে মানুষের নাম হীরামন বিশ্বাস, নদীর নাম মুক্তেশ্বরী। সরলতা এই জনপদের শক্তি।
সুন্দলীতে সেদিন দশমী পেরিয়েও উৎসব চলছিল। গান, নাটক আর শিশু-কিশোরদের পরিবেশনা। ষাঁড়ের লড়াইয়ের মাঠ থেকে যাঁর তিন চাকার ভ্যানে উঠে বসি, তিনি যুবক বয়সে ডাকাতি করতেন। নাম দিল্লিশ্বর হলেও পেশায় ভ্যানচালক। ষাটোর্ধ্ব মানুষটির কাছে পূজার খবর জানতে চাইলে ‘কাকা’ সম্বোধনে বললেন, ‘আগেরবারের চাইতে ভালো। আমাগের গ্রামে তো মণ্ডপ হয় না। তায় মোসলমানরা বেজায় খ্যাপা। কয়, পূজা করবি না মানে, আমরা চাঁদা দিতেছি। সে-ই পূজা হইল ধুমধামে।’ দিল্লিশ্বরের আঠারোপাইয়া গ্রামটা ব্যতিক্রম। এ গ্রামেই কিছু মুসলমানের বাস। এর বাইরে বাকি সব গ্রামের প্রায় শতভাগই হিন্দু।
যাঁরা বাংলাদেশের আত্মার শক্তি ও সৌন্দর্য জানতে চান, তাঁরা এখানে আসতে পারেন। এ যেন সর্বজনের সামাজিক তীর্থ। হিংসা আর লোভে জর্জরিত শহরে যাঁদের প্রাণ আনচান করে, তাঁরা এখানে দুদণ্ড শান্তি খুঁজতে পারেন। আগেকার দিনে রোগ-ব্যাধি সারাতে হাওয়া বদলে যেত মানুষ—সে রকম, যাঁরা দেশ ও দশ নিয়ে হতাশ, তাঁরা মন বদলে আসতে পারেন সুন্দলীতে। এটি সরকারিভাবে যশোর জেলার আদর্শ ইউনিয়ন। শিশুদের প্রায় সবাই বিদ্যালয়ে যায়।

Tuesday, November 3, 2015

বাংলাদেশ কোথায় আছে, কেমন আছে? by ফারুক ওয়াসিফ

বাংলাদেশ কেমন আছে? উটপাখি আর জিরাফরা বলতে পারবে না। একজন দেহ উবু করে মাথাটা বন্ধক দিয়ে রেখেছে মাটিতে। আর জিরাফ মহাশয় তো মগডালের ফুল-ফল মায় নক্ষত্র ছাড়া আর কিছু দেখবে না বলে ঠিক করেছে। তবে পিপীলিকারা কিছু জানলেও জানতে পারে। প্রকৃতিতে বন্যা বা ভূমিকম্পের আলামত নাকি তারাই আগাম পায়। বাংলাদেশের পিঁপড়ার মতো ব্যস্ত ও পরিশ্রমী জনগণ কিছু কি টের পাচ্ছে? এটা অন্তত দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর সহিংস, দুর্গতিময় দশায় অন্তত বাকি দেশ নেই। মফস্বল ও জেলা শহরে অপরাধ বাড়লেও, সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবন দিব্যি বয়ে যাচ্ছে। অবস্থাটা সেই সিরাজউদ্দৌলার বাংলার মতো। পরিবার ও সন্তানের বাইরে তারা রাজনীতি নিয়ে খুব পেরেশান বলে মনে হয় না। দেশভাবনার চেয়ে বড় ভাবনা হলো উন্নতির ভাবনা। এটা বুঝেই হয়তো সরকার একটানা ‘উন্নয়ন’ করে সবাইকে তাক লাগাতে চাইছে।
বড় সেনাপতি কেবল সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধ করেন না, জনগণের মতিগতির হিসাবও তাঁরা রাখেন। নিশ্চয়ই সিরাজউদ্দৌলার চেয়ে রবার্ট ক্লাইভ বেশি বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি খেয়াল করেছিলেন, বাঙালি জনসাধারণ রাজনীতি নিয়ে উদাসীন আর জমিদার-তালুকদারেরা জমি দখল আর ক্ষমতা-বিত্ত বাড়ানোর কাজিয়া নিয়েই ব্যস্ত। সুতরাং সিরাজের মন্ত্রী-অমাত্য আর সৈন্যদলকে বিভক্ত করা ক্লাইভের জন্য কঠিন কাজ ছিল না। এখনকার মতো তখনো কৃষক-শ্রমিক-জেলে-কারিগরেরাই ছিলেন এই দেশের মূল জনগোষ্ঠী। রাজনীতির চোটপাটের চেয়ে পেটের কারবারেই তাঁরা মন দিয়েছিলেন। কৃষকেরা যেমন সারা দিন মাটিতে উবু হয়ে কাজ করেন, এঁরাও তেমনি আত্মমুখী হয়ে দিন গুজরান করে যেতেন। এখনো মোটামুটি অবস্থাটা তেমনই আছে। তাই বাংলার স্বাধীনতা কোথায় কীভাবে অস্তমিত হলো, তা নিয়ে আসলেই সিরাজ ও তাঁর মতো কিছু দেশপ্রেমিক ছাড়া আর কারও বেদনা বিষয়ে সে সময়ের দলিলপত্র নীরব।
খেয়াল করার বিষয়, সিরাজের পূর্বসূরি আলিবর্দীর শাসনে বাংলার জনগণ ভালোই ছিল। তিনি মারাঠা ও মগদের দমন করেছিলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি এনেছিলেন। তাতেও কাজ হয়নি। সুতরাং প্রবৃদ্ধি ভালো হলেই যে জনগণ শাসকের পক্ষে জানবাজি করবে, তা ঠিক নয়। ২০০৭-০৮ সালে জিডিপি সাড়ে ৬-এর ঘরে ছিল, তবু অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনপ্রিয়তা পায়নি।
জনগণের মতিগতি না বুঝে যুদ্ধ ও নির্বাচন কোনোটাতেই জেতা যায় না। ২০০ বছর আগের কথা, নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেছেন। রাজধানী মস্কোও বেহাত হয়। রুশ সেনাপতি তখনো নির্বিকার। পিছু হটছেন তো হটছেনই। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ জেনারেলরা জবাবদিহি চাইলেন। সেনাপতি তাঁদের প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কৃষকেরা কী করছে?’ জেনারেলরা বললেন, তাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। ‘আর কী করছে?’ যাওয়ার সময় ফসলের গোলা, খেতখামার পুড়িয়ে দিচ্ছেন আর পানিতে ঢেলে দিচ্ছেন বিষ। সেনাপতি এবার গুমর ফাঁস করলেন। বললেন, ‘জনগণকে অনুসরণ করো। তারা এখন প্রতিরোধে সক্ষম নয়। তাই তারা শত্রুদের আরও ভেতরে আসতে দিচ্ছে। খাদ্যভান্ডার ধ্বংস আর পানি বিষাক্ত করে দিয়ে তারা ফরাসিদের ভাতে-পানিতে মারার বন্দোবস্ত করছে। আসল প্রতিরোধ হবে শীতে। তখন বরফে সব জমে যাবে আর নেপোলিয়নের বাহিনী শীতে ও ক্ষুধায় মরমর হবে। সেটাই আক্রমণের মোক্ষম সময়। দেখো, জনগণ ঘাস খায় না, শত শত বছর ধরে তারা এটা শিখেছে।’
সেই যুদ্ধে নেপোলিয়নের বাহিনী মস্কো পুড়িয়ে দিলেও জয়ী হয়নি। সাড়ে পাঁচ লাখ ফরাসি সেনার মধ্যে এক লাখ বন্দী হয় আর নিহত হয় ৩ লাখ ৮০ হাজার। জনগণকে শিক্ষক মেনে বুড়ো সেনাপতি ঠিক কৌশলই নিয়েছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সামরিক নেতারাও ঠিক এই কৌশলটাই নিয়েছিলেন এবং জয়ী হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত।
যখন ওপরতলা ফাঁপা হয়ে যায়, তখন জনগণই পথ দেখায়। রাজনীতির আঙ্গু বনাম মাঙ্গু কাবিলার যুদ্ধে না জড়িয়ে তারা উৎপাদন ও আয়ের কাজে নিয়োজিত আছে। পিঁপড়ার মতো একেকজন উপার্জনক্ষম তরুণ ও প্রবীণ সাধ্যের চেয়েও বেশি ওজন বহন করছেন। তাঁদের কাঁধে চড়েই কিন্তু সহায়সম্পদহীন বিপুল জনসংখ্যার এই ছোট দেশটা শত বিপদেও মুখ থুবড়ে পড়ছে না। এ বছরও ফসল ভালো হয়েছে, হরতাল-অবরোধ, পেট্রলবোমা ও তাজরীন-রানা প্লাজা সত্ত্বেও, বেতন ও মর্যাদার বৈষম্যে ভুগেও শ্রমিকেরা অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে গেছেন। প্রবাসীরা সাধ্যমতো রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এসবের জোরে সরকার ‘উন্নয়ন’ করছে, লুটেরারা দুর্নীতি-লুটপাট চালাচ্ছে, ভোগবাদীরা ভোগের মচ্ছব চালাতে পারছে। শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থায় নৈরাজ্য ঠেকানোর অবস্থায় জনগণ নেই, ফলে সে ব্যাপারে তাদের কাছে বেশি দাবি রেখে লাভ নেই।
মানা উচিত, বাংলাদেশ যতটা ভালো আছে, তা তলার মানুষের অবদান। আর খুনখারাবি ও নৈরাজ্য-দুর্নীতি উঁচুতলার উপহার। মুঘল সম্রাট আকবরের উপদেষ্টা আবুল ফজল বলেছিলেন, বঙ্গভূমি হলো বুলঘাখানা অর্থাৎ অশান্তি ও নৈরাজ্যের দেশ। আঠারো শতকে সৈয়দ গোলাম হোসেন তবাতবাঈ রচিত সিয়ার-উল-মুতাখ্‌খেরিন এর অনুবাদক হাজি মুস্তাফা (ইনি ফরাসি খ্রিষ্টান, পরে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন।) জানিয়েছেন, ভারতবর্ষে কাশ্মীরিরা বি-পীরী আর বেঙ্গলি জেঞ্জালি। অর্থাৎ কাশ্মীরিরা ধর্মহীন আর বাঙালিরা গোলমালপ্রিয়। গোলাম হোসেনও বলেছেন যে উচ্চশ্রেণির মানুষেরা মুখে এক আর মনে আরেক। ল্যুক স্ক্র্যাফটন লিখেছেন, ‘আনুগত্য ও দেশপ্রেম বাঙালির অজানা...বাঙালিরা অনুগত থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ তাদের মনে ভয় থাকে; ভয় গেলে আনুগত্যও উবে যায়। টাকা এখানে শক্তির উৎস...সুতরাং যার যত টাকা, সে তত শক্তিশালী।’ ব্রিটিশ বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসও মনে করতেন, উপমহাদেশে মারাঠা ছাড়া অন্য কোনো জাতির মধ্যে ঐক্যের বন্ধন নেই। কাশিমবাজার ফরাসি কুঠির প্রধান মঁশিয়ে লয়ের মতে, এ দেশীয় সেপাই-বরকন্দাজরা উর্দি আর বন্দুক হাতে পেলে নিজেকে অন্য মানুষ মনে করে। (ঊধ্বৃতিসূত্র: প্রাক্‌পলাশী বাংলা/সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়)
আঠারো শতকের মূল্যায়ন এই একুশ শতকেও কেমন খাপে খাপ মিলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উঁচুতলার রাজনীতি এখনো জয়-জিন্দাবাদ ঝগড়াপুরী রাজনীতি! বন্দুক, পোশাক, টাকা ও স্লোগানের জোরের কাছে জনগণ অসহায়। নীতির মা মারা গেছে, দুর্নীতি তার জায়গায় বসে সমাজ-সংসার চালাচ্ছে।
তার পরও ঝগড়া-ঝগড়ি নিয়ে ভালোই আছে বাংলাদেশ। সরকার রাজনৈতিক ঝগড়া-বিবাদকে রাজপথ থেকে উঠিয়ে টেলিভিশনের টক শো আর ফেসবুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে। একটা সময় ছিল, যখন সূর্যের চেয়ে বালুর তাপ বেশি দেখা যেত। বিরোধী দল যতটা না আন্দোলিত, তার চেয়ে বেশি আন্দোলন-বাগ্‌যুদ্ধ আর হাতাহাতি দেখা যেত টেলিভিশনের টক শোগুলোয়। এখন ৫৭ ধারার আগমনে দশ দিক শান্ত। এই শান্তির মধ্যে দু-চারজন বিদেশি হত্যা, কিছু মন্দির ভাঙচুর, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়নির্বিশেষে জমি দখলে শান্তি নষ্ট হচ্ছে না। বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ ছিল, এখন তা আরও ভীষণ রকম, কঠিন রকম সম্প্রীতির দেশ হয়েছে। দেশের ৮০ ভাগ ফৌজদারি তথা মারামারির মামলাই জমি নিয়ে। তবু বলতে হবে, সুশাসন বজায় আছে।
উন্নয়ন চলছে। খালেদা জিয়াসহ বিএনপির বড় নেতারা বিদেশে থাকায় এবং বাদবাকিরা কারাগারস্থ হওয়ায় আপাতত হরতাল-অবরোধের দিন আসছে না। উত্তেজনা, বিবাদ এখন কেবল ফেসবুকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থনীতি বিষয়টা জনগণের জানাবোঝার বাইরে। তারা জেনেছে যে দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের স্তরে প্রমোশন পেয়েছে। সুতরাং জীবনযাত্রা, বাসভাড়া, ভ্যাট, কর ইত্যাদি বাবদ আগের চেয়ে বেশি খরচ তো করতেই হবে।
কবি শঙ্খ ঘোষ নিদারুণ দুঃসময়ে লিখেছিলেন, ‘আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে।’ আমরাও বলতে পারি, আপাতত শান্তি চুপচাপ পড়ে আছে।

Friday, October 16, 2015

ক্ষমতার চুষনি মুখে রাগী যুবকেরা by ফারুক ওয়াসিফ

কী রাগী যুবকদের কাল এল রে বাবা। মানুষের ওপর কেউ খেলে গাড়ি নিয়ে, কেউ খেলে গুলিখেলা। কেউ লাঠি নিয়ে খেলতে খেলতে মেরে ফেলে খুঁটিতে বাঁধা শিশুকে। রাগী তরুণেরা কী দারুণ জোশে গাড়ি ছোটায় দুর্গতিময় ঢাকার রাস্তায়। ঠেকানোর নাইরে পুলিশ নাইরে রেড সিগন্যাল। মানুষ মরে বা আহত হয়। কত কত পারিবারিক অ্যালবামে দুঃসহ শোকের রং লাগে। কর্তারা পাষাণ, তাঁদের মন গলে না। দেশ তরতর করে তবু নাকি কোথায় এগিয়ে চলে।
গুলশানের রাস্তায় রেসিং কার ছোটাল যে ছেলে দুটি, তারা তো বেচারি, দুর্ভাগ্যের শিকার। তাদের গাড়ির ধাক্কায় যারা আহত হয়েছে, তারাও দুর্ভাগা। সবই দুর্ঘটনা, কপালের লিখন। ওই ছেলে দুটিরও দুর্ভাগ্য, কেন তাদের মতো মজারুদের আনন্দ-বিনোদনের অভয়ারণ্য করা হয়নি রাজধানীকে? ভিডিও গেমের মতো একটা বাস্তবতা পাওয়া গেলে কতই-না ভালো লাগত খেলতে?
সত্যিই তাদের দোষ দেওয়া চলে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে বড়জোর তাদের বয়সোচিত অজুহাতে কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধনাগারে পাঠানো হবে। যদি বিচারই না হয়, তাহলে তো তাদের ‘সংশোধনের’ দরকারই থাকল না। যুব বয়সে অপরাধ করে ছাড় পেয়ে বড় ক্ষমতাধর হয়েছেন, এমন নজিরের অভাব নেই সোনার বাংলাদেশে।
সুন্দরগঞ্জের বীর সাংসদ লিটনের গাড়ির সামনে পড়ে গিয়েছিল এক শিশু। তাঁরও বিরক্তি হয়েছিল। তাই তিনি সঠিক নিশানায় তার দুই পায়ে গুলি করেন। ভাগ্যিস নিশানা সঠিক, নইলে ‘ভুল’ করে বুকে লাগলে শিশুটি নির্ঘাত মারা পড়ত! ক্ষমতার বরপুত্রদের চলার পথে কেন কালা-কুৎসিত হাভাতে গরিবেরা পড়ে? এত স্বাধীনতা তাদের কে দিল? এঁদের চলার পথে কেন এত মানুষ ও যানবাহন থাকবে?
অতএব হাওয়া গরম করার কিছু নেই। আবহমানকাল থেকে এ দেশে এ রকমই ঘটে আসছে। আগে তো জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে জুতা-জামা পরে ছাতা মাথায় হাঁটাই যেত না। এখন একই রাস্তায় আমির ও ফকির একসঙ্গে চলতে পারে, এটাই কি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ নয়? সুতরাং যারা মরে, তাদেরই দোষ। কবি শঙ্খ ঘোষের ভাষায় বলা যায়, গরিবগুলো এত্ত খারাপ, একটুতেই মরে যায়!
হ্যাঁ, এসব রাগী তরুণ-যুবারা জানেন, দেশটাই তো টাকা ও ক্ষমতার লীলাখেলার ময়দান। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অক্ষয়-অটুট থাকলে তা ভাববেনই না কেন? রাগে-দুঃখে সাধারণ মানুষ কপাল চাপড়ায়, আর এঁরা মদ খেয়ে গাড়ি দৌড়ান বা গুলি ফোটান বা নারায়ণগঞ্জের ত্বকীর মতো নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করেন। সবই তো ফান। আর হাউ ফানি এই আমজনতা! কদিন আগে প্রতাপশালী যে সাংসদের পুত্র রাজপথে এলোপাতাড়ি গুলি করে প্রাণ হরণ করেছিলেন দুজনের, তাঁরও নিশ্চয় সবকিছু ফানি লেগেছিল! ক্ষমতার সামনে সকল স্পেসে অপমান আর আঘাত সয়ে চুপ থাকাই কি বাঁচার তরিকা হলো বাংলাদেশ?
গ্রামে বাঘ ঢুকে পড়লে মানুষ যেভাবে পালায়, রাস্তায় ছোট প্রাণী তথা রিকশা, সাইকেল কিংবা কেবল পদাতিক, তাদেরও উচিত বাঘের মতো গোঁ গোঁ করা গাড়ি দেখলে সভয়ে দূরে সরে যাওয়া। এ রকম ছুটন্ত বীরবাচক গাড়ির ভয়ে লাফ দিয়ে সরে যেতে যেতে ‘আরেকটু হলেই মরতাম’ ভেবে এত্তগুলা খুশি থাকা। অপমান, লাঞ্ছনার কথা নাহয় বাদ। এসব কি পথসন্ত্রাস নয়? মর্যাদাবোধের কথাও থাক, ছোট ও নির্ধন মানুষদের দেহে প্রাণ-মন থাকতে নেই? থাকতে নেই কানের পর্দা নামক নাজুক বস্তুটি। এই প্রাণ পিষ্ট হলে, গুলি খেলে মরে যায়; কানের পর্দা উৎকট আওয়াজে ফেটে যায় বা শোনার ক্ষমতা হারায়।
গতি নাকি নেশাময়, তার সঙ্গে মিশেছে তরল নেশার তাপ। আর এই উদগ্র আনন্দের সাক্ষী থাকে মোবাইলের সেলফি। গতির নেশা, তরলের নেশা, ফুর্তির নেশায় মত্তদের আসল নেশা হলো ক্ষমতা। ক্ষমতা মস্তিষ্কের এমন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়, তখন আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। ক্রিকেটার শাহাদাতও এমন এক রাগী তরুণ। রাগের বশে গৃহপরিচারিকা শিশুর পা ভেঙে দিয়েছেন। ব্যাধি শুধু রাজনীতিতে না, সবখানেই।
দিন আসলেই বদলেছে। এ ধরনের অন্যায় ক্ষমতার চুষনি মুখে বেড়ে উঠছে অনেক অনেক রাগী বাঘের বাচ্চা। এদের মুখ থেকে ক্ষমতার চুষনি না সরালে সাধারণ পদাতিকেরা বাঁচব কী করে এই বুধবারের প্রথম আলোর সংবাদ, ‘গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকার বিজয় সরণি উচ্চবিদ্যালয়ের ফটকে কবিতা রানী দাস (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগ প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় বিক্রম চন্দ্র সরকার নামের এক যুবক এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। পুলিশ বিক্রমকে আটক করেছে।’ বিক্রম তাঁর নামের সার্থকতা প্রমাণ করলেও শেষ পর্যন্ত আটক হয়েছেন, কিন্তু গুলশানের ধনীর দুলালেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজনীতিতে রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়াদের জীবন যায়, এদিকে বাঘের বাচ্চাদের আনন্দের খাতিরেও রক্ত ঝরে মানুষের বাচ্চার। এই রাগী তরুণেরা ছাত্র-যুব নেতা হয়ে খুনখারাবি নির্যাতন চালাতে কসুর করেন না। কী দেশ কী কালচার বানালাম আমরা?
দেশে এ রকম বীর সাংসদ, নেতা, ধনকুবের, খ্যাতিমান ব্যক্তি বিস্তর আছেন। আর এটা রাগী যুবকদেরও কাল। নো ভ্যাট আন্দোলনের এক সংগঠক আরিফ চৌধুরী আন্দোলনের অপরাধে দুই দফা পিটুনি খেয়েছেন। প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর যা–তা রাগ ঝেড়েছেন পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য। রাগীরাই এখন রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার। এঁদের সবাই যে ধনী ও বড় ক্ষমতার মালিক, তাও না। ক্ষমতার হাই ভোল্টেজ লাইনের সঙ্গে সংযোগ থাকলেই হলো। যেকেউ পূর্ণমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা দেখাবেন। তখন ১০০ হাত দূরে থাকাই নিয়ম।
গতিবেগ এঁদের আবেগ কেড়ে নিয়েছে, ক্ষমতার ছায়া এঁদের করেছে অমানুষ। গতিই নাকি সুখ, আরও সুখ অপরকে কষ্ট দিতে পারলে। বাংলাদেশের রাস্তাগুলো ক্ষমতা ও বৈষম্যের তুমুল প্রদর্শনী। কেউ সেখানে ছোটেন দ্রুতগতিতে; অন্যরা পিপীলিকা প্রায়। কেউ একাই বিরাট গাড়িতে ১০ জন বাসযাত্রীর জায়গা দখল করে থাকবেন, বাকিরা সরে তাঁকে জায়গা দেবেন। নো প্রবলেম।
একসময় ঢাকার সিনেমার নায়কেরা ছিলেন মৃদু ধরনের স্বপ্নবান যুবক। সাইকেল বা পায়ে হাঁটলেও তাঁদের নায়কই লাগত। নৌকার মাঝি হওয়া তো ছিল আরও রোমান্টিক। এরপর এল গোঁ গোঁ করে ছোটা মোটরসাইকেল। এখনকার নায়কদের বড় দামি গাড়ি থাকতে হয়। আর থাকতে হয় অনেক রাগ। তাঁরা হন অনেক পুরুষালি, অনেক রাগ-ক্ষোভ তাঁদের। এভাবে এখনকার বাণিজ্যিক অ্যাকশন ছবির নায়কদের রাগী ও দুর্ধর্ষ করে দেখিয়ে তরুণদের সামনে মডেল হিসেবে খাড়া করা হয়। এমনকি প্রেমের ছবির নায়কদেরও অনেক রাগ। কাহিনির প্রয়োজনে তাঁরাও নায়িকাদের দু-একটা চড়-থাপড় না মেরে পারেন না।
অথচ বিপ্লবের মহানায়ক ক্ষুদিরাম ও চে গুয়েভারা থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, নব্বইয়ের নূর হোসেনরাও কিন্তু রাগী ছিলেন। তাঁদের রাগ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আর আজকের ক্ষমতাবিত্তের জাতকদের রাগের প্রকাশটাই এক চূড়ান্ত অন্যায়। দিন আসলেই বদলেছে। এ ধরনের অন্যায় ক্ষমতার চুষনি মুখে বেড়ে উঠছে অনেক অনেক রাগী বাঘের বাচ্চা। এদের মুখ থেকে ক্ষমতার চুষনি না সরালে সাধারণ পদাতিকেরা বাঁচব কী করে?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Sunday, October 11, 2015

সিরিয়ায় পুতিনের অন্তিম খেলা by ফারুক ওয়াসিফ

১০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম পুতিন এলেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে। থাকলেন সাত ঘণ্টা। সিরিয়ায় পশ্চিমারা কী ভুল করেছে, সেটা লেকচার দিয়ে দুনিয়ার সামনে দেখালেন। চিনিয়ে দিলেন, আইএস আসলে মার্কিনি ঘাতক-পুতুল। হুমকিও দিলেন, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ‘আসল’ স্যাটেলাইট ভিডিও দেখিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জারিজুরি ফাঁস করে দেবেন। সাধের ‘আইএস’ ধ্বংসের দর্শক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকল না পেন্টাগনের জেনারেলদের। ইসরায়েল আর কী করবে? আরও কিছু ফিলিস্তিনি বাড়ি ভাঙল, কিছু প্রতিবাদী হত্যা করল। জবাবে আরেকটা ইন্তিফাদার ঘোষণা এল গাজা থেকে।
ওবামার সামনে রইল কেবল আলোচনার টেবিল। পুতিন তাঁকে বলিয়ে ছাড়লেন, আইএস দমনে মার্কিনিরা রাশিয়ার সঙ্গে আছে। আর ইউরোপ? নিজেদের তৈরি করা ভূমধ্যসাগরীয় শরণার্থীদের ধাক্কা সামলাতেই তারা ব্যস্ত। যুদ্ধে জড়ানো মানে ইউরোপীয় দুর্গের দেয়ালে আরও শরণার্থীর ঢল। তুরস্কের হঠাৎ সুলতান এরদোয়ানের উসমানিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার খোয়াবও খতম। ইয়েমেনের ঈদের জামাতে বোমা ফেলার তৃপ্তিতে ঢেকুর তুলতে গিয়ে হেঁচকি উঠল সৌদি বাদশাহরও। তাঁদের ছড়ানো ওয়াহাবি-সালাফি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রাশান অ্যান্টিভাইরাস ইজ ইন অ্যাকশন।
সিরিয়ায় রাশিয়ার উদ্দেশ্য কেবল বাশার আল-আসাদকে বাঁচানো না। আইএসকে দিয়ে বৈরী সরকার ও স্বাধীন সীমান্ত ধ্বংস করে পশ্চিমারা যে নতুন মধ্যপ্রাচ্য বানাতে চায়, তাতে রাশিয়া, চীন ও ইরানের ঘোরতর বিপদ। বিশ্বের তেলভান্ডার পশ্চিমা তেলকুবের কোম্পানিদের হাতে চলে গেলে রুশ অর্থনীতি ও চীনের উত্থান থামানো যেতে পারে। একদিকে ন্যাটো দিয়ে ঘেরাও হওয়া অবস্থা, অন্যদিকে রুশবিরোধী নতুন মধ্যপ্রাচ্য রাশিয়াকে থমকে দেবে। তাই ইউক্রেনের পর দ্বিতীয়বারের পশ্চিমাদের নাক কাটতেই হলো তাদের।
অন্যদিকে তুরস্ক চায় রাষ্ট্রহীন উত্তর সিরিয়াকে নয়া তুর্কি সালতানাতের অংশ করতে। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভেবে লাখো সিরীয় উদ্বাস্তু আশ্রয় দিয়ে রেখেছে তারা। পাশাপাশি দক্ষিণ তুরস্কে মার্কিন ঘাঁটিও আরও বড় হয়েছে, ন্যাটোর মদদ তো আছেই। এমন সময়ে এরদোয়ানের বাড়া ভাতে ছাই দিল রুশ বোমারু বিমান। পরপর তিনবার তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘন করে বুঝিয়ে দিল, সিরিয়ার দিকে নজর দিলে খবর আছে। যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে হবে তুরস্ককে। সিরিয়ার ওপর মার্কিন-তুর্কি নেতৃত্বে নো ফ্লাই জোন করার চিন্তাও বরবাদ। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে তুরস্কের কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সিরীয় শাখা। ইতিমধ্যে তারা সিরিয়ার ভেতরে মুক্তাঞ্চল গড়ে নিয়েছে। তুরস্কে অভিযান হলে এখন তারা সিরিয়া থেকে লড়তে পারবে।
মুখ পুড়ল ইসরায়েলেরও। সিরিয়ার পূর্ণ পতনের পরে লেবাননের প্রতিরোধ গুঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তাদের। আইএস নামক ফেউকে সামনে রেখে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে চাইছিল তারা। আর সৌদিরা তো ইয়েমেনকে তছনছ করে ইরানের ডানা ছাঁটছিলই। মোদ্দাকথা, মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগ-বাঁটোয়ারা করার পরিস্থিতি তৈরিই ছিল ‘ইসলামিক স্টেট’ লেলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য। আসল যুদ্ধে নামার আগে পুতিনকে তাই যুক্তির যুদ্ধেও নামতে হলো। বিশ্বদরবারে তিনি বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রায়ই আইসিসের হুমকির কথা বলেন। ভালো, কিন্তু কে তাদের সশস্ত্র করল? কে এই বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল? কে ওই এলাকায় অস্ত্র জোগাল? সিরিয়ায় কারা যুদ্ধ করছে, তা আপনারা সত্যিই জানেন না? তাদের বেশির ভাগই ভাড়াটে যোদ্ধা। টাকার বিনিময়ে তারা লড়ে। যে বেশি দেবে, তারা তাদের হয়েই কাজ করবে। আমরা জানি, কত টাকা তাদের দেওয়া হয়েছে...যুক্তরাষ্ট্র বলে, “সিরিয়ার গণতান্ত্রিক সভ্য বিরোধী পক্ষকে আমাদের সাহায্য করা উচিত। ” আর তারা সাহায্য করল, অস্ত্র দিল এবং তারা যোগ দিল আইসিসে। এর থেকে এক ধাপ এগিয়ে ভাবা কি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অসম্ভব? আমরা এ ধরনের কার্যকলাপ সমর্থন করি না। আমরা মনে করি, এগুলো ভুল।’
ইতিহাস এ মুহূর্তে পুতিনের পক্ষে। একদিকে মার্কিন-ইসরায়েলি-সৌদি-তুর্কি জোট, অন্যদিকে রাশিয়া-চীন-ইরান-সিরিয়া-হিজবুল্লাহ জোট। ইরান ও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারাও যোগ দিয়েছে আসাদের সেনাদের সঙ্গে। আসাদ বটেই দুঃশাসক, কিন্তু আসাদহীন সিরিয়ার অবস্থা হবে লিবিয়ার মতো, সেটা কারও চাওয়া হতে পারে? গাদ্দাফি হুঁশিয়ারি করেছিলেন, তাঁকে হত্যা করা হলে লিবিয়া দোজখ হবে। হয়েছেও তাই। কার্যত, সভ্যতার সূতিকাগার সিরিয়া ও ইরাক ধ্বংসের দায় যুক্তরাষ্ট্রের। গণতন্ত্র ও বিপ্লব রপ্তানিযোগ্য নয়, হোক তা লিবিয়ায় বা আফগানিস্তান ও চেকোস্লোভাকিয়ায়। মুক্তি কেউ কাউকে দিতে পারে না, তা স্থানীয় জনগণের নিজস্ব অর্জনের বিষয়।
ক্লিনটন ও বুশ মধ্যপ্রাচ্যে ‘সভ্যতার যুদ্ধ’ আর পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ‘গণতন্ত্রের যুদ্ধ’ উসকে দিয়েছিলেন। তার ফল যুদ্ধ ও জাতিগত গণহত্যায় লাখো প্রাণের অপচয়। এই দায় পশ্চিমারা এড়াতে পারে না। ইউক্রেনে এলিট বিপ্লব ঘটিয়ে রাশিয়াকে অপদস্থ করতে গেলে পুতিন রুশ ভালুকের থাবা চালালেন। ইউক্রেন থেকে কেটে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করলেন। সিরিয়ায়ও তারা দেখাল, তারা যা করে, ভেবেচিন্তে করে। আর তা নিরন্তর ও এবং অব্যর্থ। আফগানিস্তানের ভুল তারা এখানে করছে না, মাটিতে রুশ বুটের পাড়া পড়ছে না। মুফতে রুশ সমরাস্ত্রের বিজ্ঞাপনও করা গেল। অস্ত্র-ব্যবসায় কাজে লাগবে।
যাহোক, নতুন মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে দেখে সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজেনিস্কি সামাল সামাল আওয়াজ তুলছেন। বৈশ্বিক মার্কিন আধিপত্য কায়েমে ইসলামি মৌলবাদীদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের বুদ্ধিটা তাঁরই। এ জন্য তাঁকে বলা হয় জঙ্গিবাদের গডফাদার। গত রোববার পলিটিকো ম্যাগাজিনে তিনি লিখেছেন যে সিরিয়ায় মার্কিন ‘অ্যাসেটে’ রুশ হামলা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র যেন রাশিয়াকে প্রতিশোধের হুমকি দেয়। গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পরিভাষায় ‘অ্যাসেট’ বলা হয় অন্য দেশে সক্রিয় এজেন্টদের। এ এক দারুণ লুকোচুরি খেলা। সিরিয়ায় কালো মুখোশ পরা জঙ্গিরা মারা পড়ে, উহ্আহ্ করে আমেরিকা!
পুতিন এই প্রক্সি ওয়ার বা ছদ্মযুদ্ধকে সরাসরি করে তুললেন। মার্কিনি রাষ্ট্রের ভূরাজনীতি ধর্মযুদ্ধের মোড়কে আচ্ছাদিত ছিল। মুসলিমদের বিভক্ত ও শাসন করা হচ্ছিল। রুশ হস্তক্ষেপে সবার ছদ্মবেশ মায় গায়ের কাপড় পর্যন্ত খুলে পড়ল। ভালো সন্ত্রাসী আর খারাপ সন্ত্রাসীর মধ্যে তুলনা করার নিষ্ঠুর কৌতুক আর নয়। জেহাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চাতুরীর ঝালর খসে পড়ার পরে পৃথিবী আর আগের মতো থাকল না। পরাশক্তিদের এই মুখোমুখি অবস্থানে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ সহজ হবে বিশ্ববাসীর। জগতের লাঞ্ছিত-ভাগ্যহত মুসলমানদের এখন ভাবতে হবে, মন্দের ভালো নেবে নাকি ভালোর মন্দ? ওয়াহাবি-সালাফি জঙ্গিবাদ ভালো নাকি ইরান‍+হিজবুল্লাহ‍+আসাদ+পুতিন ভালো?
ছাগল তথা জঙ্গিরা নড়ে খুঁটির জোরে। মুক্তিযোদ্ধারা লড়ে জনতার অংশ হয়ে। আর পরাশক্তিরা লড়ে সম্পদ ও ক্ষমতার স্বার্থে। সিরিয়ায় আসাদ সরকার টিকে যাচ্ছে, আইএসের অবসান হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আধিপত্যের যুদ্ধে ধর্মের হিংসাত্মক ব্যবহার শেষ হবে কি?

Friday, October 9, 2015

বাংলাদেশের এক নির্মল মর্যাদা অর্জনের গল্প by ফারুক ওয়াসিফ

সবচেয়ে বড় আবিষ্কার মানুষের ভেতরের মানুষ আবিষ্কার। কিন্তু এ কেমন আত্ম-আবিষ্কার যে কেউ বলছে, ‘একে অন্যের গু খেয়ে আর এক দিনও থাকা যায় না!’
শুনে ধন্দ লাগে। কথাটা কে বলছেন? এক দরিদ্র গ্রামবাসী—পাটখেত বা সুপারি বনে যাঁদের দারা-পুত্র-কন্যাদের টাট্টি সারতে হয়। রিয়েলিটি শোর কায়দায় জনসমক্ষে টাট্টিকরায় জামাই রাজি না থাকায় এক মেয়ের তো বিয়েই ভেস্তে গেল। বেচারার হবু শ্বশুরবাড়িতে টাট্টিখানা নেই। মান্ধাতানামে যদি কেউ থেকে থাকেন, তাঁর আমল থেকে এ-ই চলছিল। লজ্জা ছিল না, রোগবালাইয়ের চিন্তা ছিল না, অসম্মানের হেতুও ছিল না। যা হয়ে আসছে, তা-ই তারা করে যাচ্ছিল। আর ডায়রিয়া হয়ে ছিল জাতীয় রোগ।
একদিন তাঁদের বলা হলো, আপনারা বাল-বাচ্চা-বৃদ্ধ-বনিতা যেসব স্থানে ইয়ে করেন, সেসব জায়গায় ছাই দিয়ে রাখুন তো! রাখা
হলে তাদের আক্কেলখানা গুড়ুম করে চুপসে গেল। দেখা গেল, গ্রামটাই ছাইময় তথা মলময় হয়ে আছে। তার মধ্যেই ঘর-সংসার, বাচ্চাদের বেড়ে ওঠা। সেই জিনিস হাতে-পায়ে লাগছে, খাওয়া-গোসলের যে পুকুর, তাতে ভাসছে। তার স্পর্শে বারবার অজু ভেঙে যাচ্ছে নামাজিদের।
১৯৯৯ সাল। রাজশাহীর বাগমারা থানার মসমইল গ্রামের মনসুরের সহ্য হলো না। চোখ খুলে দেওয়া মানুষটি কথা দিলেন, ‘দুই মাসের মধ্যে এসব বন্ধ করব।’ ৫৫ দিনের মাথায় খবর এল, গ্রামটি এখন সম্পূর্ণ নির্মল। এভাবে একের পর এক গ্রাম। তখন বাংলাদেশ বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের সারিতে। সেই থেকে মাত্র ১৬ বছর! সারা বাংলাদেশের গ্রামীণ মাঠঘাট ৯৯ শতাংশ নির্মল হয়ে গেছে। এদিকে আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ নিম্ন–মধ্যমে উঠেছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ করেছে। এতে মনসুরের মতো মানুষের উঠে দাঁড়ানোর অবদানও কম না। যা তাদের চালিত করেছিল, তা শুধু স্বাস্থ্যের চিন্তা না, মর্যাদাবোধও। মর্যাদাবান মানুষ অধিকারের জায়গায় আপস করে না।
উন্নতির সোপানে ওঠার নামে আমরা তৈলাক্ত লাঠি বাওয়ার কসরত করছি, আবার অতি উৎসাহে সেটা ভাঙতেও কসুর করছি না। ক্ষমতা ও অন্যায়ের বিষ্ঠায় মাখামাখি হচ্ছি প্রতিদিনই। কবে আমরা মসমইলের মনসুরের মতো করে বলে উঠতে পারব, ‘একে অন্যের গু খেয়ে আর এক দিনও থাকা যায় না!’
না, এই নির্মল বাসভূমি প্রচলিত সরকারি (জিও) বা বেসরকারি (এনজিও) পথে হয়নি পুরোটা। এটা হয়েছে সমাজের সম্মিলিত শক্তিতে। ছোট্ট একটা জাদুর কাঠির ঘষায় পরিবর্তনের জং ধরা চেরাগ জ্বলে উঠেছিল। যিনি এই আশ্চর্যের জাদুকর, তাঁর নাম কমল কর। ভারতভিত্তিক সম্প্রদায়চালিত সম্পূর্ণ শৌচব্যবস্থা ফা​উন্ডেশনের (সিএলটিএস) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি শেখাতে যাননি, শিখতে গিয়েছিলেন। মরমি কবি রশিদ উদ্দিনের গানের ‘মানুষের ভেতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন’ই যেন তাঁর আচরিত তত্ত্ব। তাঁর আবিষ্কারটা খুবই সরল: করুণা নয়, মর্যাদা; সাহায্য নয়, ক্ষমতায়ন।
তিনি দেখলেন, সরকার থেকে শুরু করে এনজিওগুলোর বিস্তর ব্যয়ে দেওয়া পাকা ল্যাট্রিন কাজে লাগছে না। মলকূপের ঢালাই রিংগুলো গরুকে খইল খাওয়ানোর পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাকার কোন ঠনঠনের এক রাজাকে তাঁর বন্ধু এক জোড়া জরি লাগানো দামি নাগরাই জুতা উপহার দিয়েছিলেন। রাজামশাইয়ের অভ্যাসও নেই, জানাও নেই এর ব্যবহার। তো একদিন তিনি নাগরাই জোড়ার একপাটি মাথার পাগড়ির সঙ্গে লাগিয়ে দরবারে দেখা দিলেন। লোকে যা বোঝার বুঝল। বিদেশে বসে তৃতীয় দুনিয়ায় দেওয়া অনেক উন্নয়ন-দাওয়াইয়ের হালও এমনই হয়েছে।
কমল কর সে সময় এসেছিলেন একটি এনজিওর হয়ে স্যানিটেশন কর্মসূচির মূল্যায়ন করতে। দেখলেন, শুনলেন এবং অন্যরা যা বুঝছিল না, সেটা ধরতে পারলেন। বুঝলেন, দান–খয়রাত করে মানুষের অভ্যাস বদলানো যাবে না। তাদের বর্তমান জীবন নিয়ে বিশ্লেষণের জরুরত বোঝাতে হবে।
ওপর থেকে উন্নয়নের জায়গায় তিনি জোর দিলেন তলার মানুষের জাগরণের ওপর। অর্থাৎ, উন্নয়ন যাদের দরকার, তাদের হাতেই এর দায়ভার দিতে হবে। তাঁর ক্ষমতায়ন তত্ত্ব রাষ্ট্র বা সাহায্য সংস্থার অভিভাবকত্ব মানে না, তা সম্প্রদায়ভিত্তিক। এই চিন্তার জোরেই প্রখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি ২০১০ সালে তাঁকে বিশ্বের সেরা ১০০ চিন্তকের মধ্যে ৮৪তম স্থান দিয়েছিল। এশিয়া ও আফ্রিকার সাতটি দেশ এ পদ্ধতি গ্রহণ করে, অনেক এনজিওর কর্মধারা বদলে যায়।
আমাদের জন্য বুনিয়াদি প্রশ্নটা এখানেই, মানুষ কখন বদলায়? যখন সে নিজেকে জানতে পারে, নিজের বা অপরের আয়নায় সত্যটা দেখতে পারে। তিনি ও তাঁর দল প্রথমে রাজশাহীর ওই মসমইল গ্রামের মানুষদের তাঁদের প্রাকৃতিক কর্মের দগদগে চিত্রটা দেখালেন। জাগিয়ে তুললেন পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি। মায়েদেরও হুঁশ জাগলো যে সন্তানদের কীসের মধ্যে ছেড়ে রাখছি?
মনসুর কথা দিয়েছিলেন, দুই মাসের মধ্যে গ্রামটিকে নির্মল করে তুলবেন, ৫৫ দিনের মাথায় তিনি সাফল্যের সংবাদ পাঠালেন। ওই গ্রামটি বিশ্বের নজর কাড়ল। বাংলাদেশে জন্মাল আরেকটি সামাজিক উন্নয়নের মডেল। যে ভারতের মানুষ কমল কর, সেই ভারত কিন্তু এখনো বিশ্বের মধ্যে মুক্ত মলত্যাগের শীর্ষ দেশ। অথচ হাজার কোটি রুপি খরচ হয়ে গেলেও মানুষ জাগেনি। কারণ, ​সে দেশের সরকার বাংলাদেশের মডেলটা আমলে নেয়নি।
সম্পূর্ণ নির্মল বাংলাদেশ হওয়ার প্রাক্কালে এবার ঢাকায় এক সম্মেলনে এসেছিলেন কমল। সেই সূত্রে প্রথম আলোয় আসা। কমল করের ভাষায়, ‘ক্ষমতায়ন হলে কেউ মানুষকে আটকাতে পরে না।’ আর কেমন সেই ক্ষমতায়ন? ‘তুমি, আমি একসঙ্গে’। আমাদের গ্রামদেশে এই ধারণা এজমালি বলে পরিচিত। বলছিলেন তিনি, ‘প্রতিটি দেশের গ্রামে গ্রামে এই সহযোগিতার সংস্কৃতি আছে। ডেভেলপমেন্ট এসে এই যৌথ সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগের ধারণাটা ভুলিয়ে দিয়েছে।’
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শহুরে প্রশিক্ষিত এনজিও–কর্মীরা গ্রামের বঞ্চিত মানুষের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলেন। যেন তার দুর্দশার জন্য সে-ই দায়ী। অথচ হাজার বছর ধরে এ ধরনের সহযোগিতার সংস্কৃতিই কৃষক সমাজের প্রধান সামাজিক পুঁজি। ধান কাটায়, বন্যা ঠেকানোয়, এমনকি বিদ্রোহ-সংগ্রামে এটাই তাদের প্রধান শক্তি। ব্রিটিশ নদীবিশেষজ্ঞ স্যার উইলিয়ম উইলকক্স কলকাতায় দেওয়া এক বক্তৃতায় (১৯৩০) বলেছিলেন, বাংলার মানুষের মধ্যে যে সহযোগিতার সংস্কৃতি দেখা যায়, তার উৎস লোকায়ত বন্যানিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা। এই শক্তি অসাধ্য সাধন করতে পারে।
মোটেই অবাক করার বিষয় নয়, কমল করের ধারণা যেন সেই পুরোনো সমবায়ী সমাজের আদর্শকেই প্রতিফলিত করে। এরই অবাক করা ফল ফলেছে আমাদের হাওরাঞ্চলে। সেটা যেন প্রকৃতির গামলা। সেই গামলায় শুষ্ক মৌসুমে অগাধ ধানের সমারোহ, আর বর্ষায় তা সাগরসমান জলরাশি। হঠাৎ বন্যায় কোটি কোটি টাকার ধান ভেসে যাওয়া ছিল সেখানকার অভিশাপ। ধান কাটার সময়টা পাহাড়ি ঢল আসারও সময়। সে সময় দু-এক দিনের মধ্যেই ধানের প্রান্তর হাওর বনে যেত। কিশোরগঞ্জের কেওড়াজুড়ি ইউনিয়নের মানুষ এই অভিশাপ দূর করেছিল এজমালি উদ্যোগে। ২০০৬ সালে, মাত্র পাঁচ দিনে ছয় হাজার মানুষ মিলে। এভাবে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ দেওয়া এক দারুণ মানবিক কর্মমেলা। পুরুষেরা বাঁধ ওঠাচ্ছে মাটি কেটে, তাদের পেছনে মেয়েরা উৎসবের আমেজে রান্না চড়িয়েছে, বাচ্চারা পেয়েছে হুল্লোড়ের আনন্দ।
এভাবে হাওরের পানিপ্রবাহ ঠিক রাখা ও ফসল বাঁচানোর পদ্ধতি বাংলার সনাতন উপচানো সেচব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। পরের বছরও এভাবে বাঁধ বাঁধা হয়। আশপাশের গ্রামের মানুষও যোগ দেয়। গাইবান্ধার বন্যা উপদ্রুত হোসেনপুর ও কিশোরগাড়ির গল্পটাও এমন। সেখানে গ্রামবাসী শুধু বাঁধ সংস্কারই করেনি, সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বাধ্য করেছিল দুই কিলোমিটারের বেশি এলাকার অসম্পূর্ণ বাঁধ পূর্ণ করতে। এতে করে ফসল বেঁচেছে প্রায় ১১ কোটি টাকার।
আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা সংক্রামক ব্যাপার। এই গ্রামগুলো শিক্ষা ও স্যানিটেশনেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এই এজমালি চর্চার জেরে উত্তরবঙ্গের বেশ কটি জেলায় নারী শ্রমিকেরা পুরুষ শ্রমিক ও জমির মালিকদের সঙ্গে বসে সমান মজুরি আদায় করে নিচ্ছেন। এটা শুধু জীবনের উত্তরণই নয়, সমাজের তলার মানুষের উঠে আসার গল্পও। এই সামাজিক নায়ক-নায়িকারা পরে নেতা হয়েছেন, কেউ কৃষিতে নতুন উদ্যোগ দিয়েছেন। যেখানেই এই জনশক্তির বিনিয়োগ হবে, সেখানেই দিন বদলে যাবে। ক্ষমতায়ন তাই শুধু স্লোগান নয়, তা এক রাজনৈতিক উত্থানের জ্বালামুখ। যখন কেবলই গ্রাম পতনের শব্দ শুনি, জাতীয় অবক্ষয়ের নৈরাশ্য দেখি; তখন দেশের তলানিতে সঞ্চিত এই শক্তির সহায় নিতে পারা যায় কিন্তু।
এবার নিজেদের দিকে তাকাই। উন্নতির সোপানে ওঠার নামে আমরা তৈলাক্ত লাঠি বাওয়ার কসরত করছি, আবার অতি উৎসাহে সেটা ভাঙতেও কসুর করছি না। অনৈক্য, হানাহানি, স্বার্থপরতা, লোভ ও হিংসার বিষ্ঠা প্রতিদিন ছড়াচ্ছি আমরাই। ক্ষমতা ও অন্যায়ের বিষ্ঠায় মাখামাখি হচ্ছি প্রতিদিনই। দেশটা আর বাসযোগ্য থাকছে না। কবে আমরা মসমইলের ওই মনসুরের মতো করে বলে উঠতে পারব, ‘একে অন্যের গু খেয়েআর এক দিনও থাকা যায় না!’ এমন অমর্যাদায় কে বাঁচতে চায়?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
 bagharu@gmail.com

Sunday, September 13, 2015

উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভ্যাট: ‘দুধ দেবে খামারিরা, গরু-ছাগল নয়!’ by ফারুক ওয়াসিফ

‘শিক্ষার্থীদের ভ্যাট দিতেই হবে’-এমন তেজস্ক্রিয় মন্তব্য থেকে সরে এসেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে প্রমাণিত হয় শিক্ষার্থীদের অবস্থানই যৌক্তিক ছিল। তবে মানলেনই যদি তাহলে আবার কেন বলেন, ‘আন্দোলনের যৌক্তিকতা পাই না।’ ভ্যাট বহাল রাখার কৌশলটাও নিদারুণ। এনবিআরের তরফে বলা হচ্ছে, ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থীরা নয়। ফেসবুকে সয়লাব হওয়া জবাব: ‘দুধ দেবে খামারিরা, গরু-ছাগল নয়!’ ভ্যাট যে পাত্র থেকেই নেওয়া হোক, তা আদায় করা হবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই।
ব্রিটিশ আমলে জমিদারদের ওপর শিক্ষা কর বসানো হতো। শিক্ষার ব্যয় মেটাতে সরকার নির্দিষ্ট আয়ের ওপরের ধনীদের ব্যাপারে সে রকম পদক্ষেপ নিতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন ও ফি সীমার মধ্যে রাখার বন্দোবস্ত করা যায়। বেসরকারি শিক্ষাকে নিরেট মুনাফামুখী হওয়া ঠেকানোর তদারকি তো সরকারি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঞ্চয়কে শিক্ষার অবকাঠামো ও মানের উন্নয়নে ব্যয় করাতে পারে কেবল সরকার। বিষয়টা হওয়ার কথা ছিল বাণিজ্যায়ন-বিরোধী; সরকারের দায়িত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার: মানবিক কারণে, শিক্ষা বিস্তারের স্বার্থে। অথচ যাঁদের আজ এভাবে রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হলো, তাঁরা সহজে ফিরবেন না। এভাবে বা অন্য কোনো ভাবে আবারও তাঁরা আসবেন।
এ রকম বাস্তবতা থেকেই জন্ম হয় প্রতিবাদের নতুন ভাষা ও দাবি: ‘নো ভ্যাট, করো গুলি’! গুলির কথা এসেছে, কারণ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার পরও তাঁরা মারমুখো হননি। তারা দেখালেন, একটা গাড়িও না ভেঙে আন্দোলন করা যায়। তাঁদের এই প্রতিবাদের ভাষাও কিন্তু অহিংসই। আইন মেনে চূড়ান্ত ‘না’ বলার প্রতিরোধ এটা।
শিক্ষা আন্দোলনের এই জমায়েত অনেকেরই অচেনা। এই শিক্ষার্থীরা প্রজন্ম হিসেবে নতুন। তাঁদের ভাষাও নতুন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের গৌরব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁরা যোগ করছেন নিজেদের নতুন গৌরব ও আত্মবিশ্বাস।
এই অসংগঠিত ও আনাড়ি আন্দোলনকারীদের ভাষা ও ভঙ্গি নিয়ে কারও আপত্তি থাকতেই পারে। তাই বলে, নারীর জন্য অবমাননাকর ভাষা প্রয়োগ করে তাদের আরও হেনস্তা করতে হবে? কথায় বলে, মড়ারে মারো কেন? বলে, লড়ে চড়ে কেন? হ্যাঁ, নিশ্চল এই সমাজকে তাঁরা কিন্তু ধাক্কা দিয়েছেন। তাঁরা যে যুক্তি দেখাচ্ছেন, যে দাবি তুলছেন, তার ভেতরে সত্য ও মানবিকতা উপস্থিত। একে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। পুরোনো ও প্রাজ্ঞদেরই তো বেশি দায় নতুনকে বুঝে তার বিকাশে কাজ করার। আমরা কি কখনো তাঁদের বুঝতে চেয়েছি, তাঁদের কাছে গিয়েছি, তাঁদের দুঃখগুলো নিয়ে ভেবেছি?
কর্তাসুলভ অনেকেরই জানা নেই, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মধ্য ও নিম্নবিত্ত ঘরের। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া, অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই এই চিত্র দেখা যাবে। নিজস্ব আবাসন নেই বলে বাসা ভাড়া করে মেস বানিয়ে থাকতে হয়। ঢাকার বাসা ভাড়া কত বেশি, তা তো সবারই জানা। এ জগদ্দল শহরে চলাচলের কষ্ট ও খরচের বহরও তো অজানা থাকার কথা না। আমি এমন কজন ছাত্রকে চিনি যাঁদের পড়ার খরচ জোগাতে নাভিশ্বাস ওঠে। অনেকে দিনে ছোটখাটো চাকরি করে সন্ধ্যার পরে উচ্চতর ডিগ্রির সাধনা করে যান চাকরির বেতনের টাকায়। অনেককে পরিবার চালাতে হয়। শ্রেণি ডিঙানোর আশা, ভালো জীবনের স্বপ্নে তাঁরা এই বাড়তি বোঝাটা বয়ে চলেন। আমাদের মোটামুটি সচ্ছল পরিবার সন্তানের পেছনেই যা আছে সব বিনিয়োগ করেন। হয়তো বড় ভাইকে পড়াতেই পরিবার কমজোরি হয়ে যায়। পরের ভাই-বোনদের কপালে থাকে হতাশা। জমি বেচা টাকা, পার্টটাইম চাকরি করা টাকা তাঁরা দুর্নীতি বা বাণিজ্যের ভোগে দিতে কেন রাজি থাকবেন?
সরকারকে সংবিধান-বর্ণিত শিক্ষার অধিকার প্রশ্নে নীতিগতভাবেই সেবামূলক থাকতে হবে। কেবল শিক্ষাই এই সম্পদহীন দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক পুঁজি, যা অর্জনে আমরা স্বাধীন। অথচ নিছক শিক্ষার অভাবেই, যথাযথ মানের অভাবেই দেশটা উঠতে উঠতে হোঁচট খাচ্ছে। এরপরও উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কৌশলপত্রের প্রতিটি সুপারিশ মেনে উল্টো যাত্রাতেই চলবে সরকার? ওই কৌশলপত্রের তৃতীয় পর্বে ধাপে ধাপে শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির সুপারিশ করা আছে—ছাত্র আন্দোলনকে প্রধান বাধা বলে বর্ণনা করা আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-ব্যয়ও তো বাড়ছে ধীরে ধীরে। এটা কি কৌশলে উচ্চশিক্ষার সংকোচন নয়?
শিক্ষার্থীরা তো সংবিধানের ভরসাতেই দাবি করছেন, শিক্ষা সুযোগ নয় অধিকার, শিক্ষা পণ্য নয় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ। আজকের সন্তানেরা লড়ছেন আগামীর সন্তানদের জন্য। আজ তাঁরা জয়ী হলে ভবিষ্যতে আরও অনেকে উচ্চশিক্ষায় আসতে পারবেন। বিকাশমান অর্থনীতির স্বার্থেই আমাদের অনেক স্নাতক লাগবে। সার্বিক উন্নতির স্বার্থে এ খাতে বিনিয়োগ করবে রাষ্ট্র। শিক্ষা থাকবে সমাজের হাতে, চলবে রাষ্ট্রের খাতে, এই বুনিয়াদি অবস্থানে সরকারকে আসতেই হবে। পাবলিকের হয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এটাই বলছে। রিকশা চালিয়ে পড়ালেখা করা যদি মহিমা পায়, তাহলে শ্রমজীবীর সন্তানের জন্য শিক্ষার সুযোগ খোলা রাখার দাবি কেন মহৎ নয়?

Thursday, August 13, 2015

নিষ্পাপ নিধনের কাল by ফারুক ওয়াসিফ

সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে পিছপা হন না কোনো মা-বাবা। নিজের সন্তানের লাশ থানা থেকে নিজেই চিনে নিয়েছিলেন রাজনের মা। হয়তো হত্যার ভিডিওটিও না দেখে উপায় নেই তাঁর। সন্তানের অন্তিম মুহূর্তের মরণ আর্তনাদ তিনি মনে রাখবেন, কোনো দিন ভুলবেন না। কিন্তু আমরা পারি না। আমরা ভুলে যেতে চাই। আমরা না পারি সইতে, না পারি কইতে। নিষ্পাপের মৃত্যুর উন্মত্ত মহড়া তবু আমাদের দেখে যেতেই হয়। পেছনে আবহসংগীত হিসেবে বাজে মধ্যম আয়ের মধুর বাঁশি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে...অধিকতর উন্নয়ন আর তুমুল অমানবিকতার দিকে।
বীর আর কসাইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? গুলি বা চাপাতি, জবাই, কাটা, ফাঁস, পেটানো, টুকরা টুকরা করা, পেট্রলে পোড়া, সামনে বা পেছনে কোপ, গুম, ক্রসফায়ার, লিচুতে বিষ, খাবারে ফরমালিনসহ হত্যার কত কত পদ্ধতি। হত্যার এই সব পদ্ধতি যুদ্ধে প্রয়োগ করলে বলে বীর। প্রায়ই যে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়, তাদের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার লোক অনেক। পিটিয়ে সাপ বা শিয়াল মারার মধ্যেও হিংস্রতা থাকে। সেই হিংস্রতা কখনো যখন মানুষ হত্যার খাতে বয়ে যায়, তখন আমরা চমকে উঠি। কিন্তু দাপটের উচ্চসিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ঘরের লোক, কাজের লোক, রিকশাওয়ালা-শ্রমিকসহ নিচের লোককে আমরা কি আহত করি না? আমি যখন মাস্টার, তখন বেতের ব্যবহার করি না কি শিশুর গায়ে? কাজের বুয়ার গায়ে আগুনের ছেঁকা দিই না কি, আমি যখন গৃহকর্ত্রী?
আমরা চোর বলে শিশু বা ভবঘুরেকে পিটিয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু ব্যাংকচোর, গমচোর, ভোটচোরদের জন্য রয়েছে লালগালিচা, সোনার পুত্তলিকা। আমাদের অদৃশ্য লেজটি তাদের সামনে ভক্তিতে হাতপাখার মতো দোলে। যাদের অবহেলায় ওয়াসার সুড়ঙ্গে পড়ে জিহাদ নামক শিশুটি মরে গিয়েছিল, তাদের কি যথাযথ শাস্তি হয়েছে? শাস্তি দাবির বেলায়ও আমরা এখন আগে দেখে নিই অপরাধী কোন দলের!
কাউকে রিমান্ডে নিয়ে বা গুম করে জেরার নামে নির্যাতন করা হলে কি বিচার হয়? জেরার নামে অত্যাচারের যেসব গল্প শুনি, তারাও তো নারায়ণগঞ্জের ত্বকীর খুনিদের মতো, রাজনের ঘাতকদের মতো। তারাও তো শরীরের নাজুক জায়গায় হাঁটুতে কষ্ট দিয়ে দিয়ে হত্যার বীভৎস আনন্দে হাসে। হত্যার আগে ত্বকীর অণ্ডকোষ থ্যাঁতলানো হয়েছিল! বিগত বছরগুলোতে মেঘনায়, গাজীপুরে, মুন্সিগঞ্জে যখন অহরহ অপঘাতের লাশ মিলত; সেসবের হত্যাকারীদের কে খুঁজেছে? আমাদের নেতা-নেত্রীরা জনসভায়, টেলিভিশনে, লিখিতভাবে প্রতিপক্ষকে বিনাশের হুমকি যখন দেন, তখন যে মুহুর্মুহু স্লোগান ও জয়ধ্বনি ওঠে, সেগুলো কারা দেয়? আমাদেরই কেউ কেউ নয় কি? ক্রমিক খুনি রসু খাঁরা আমাদের মধ্যেই বাস করে। ত্বকী থেকে বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ থেকে রাজন পর্যন্ত কেবলই নিরপরাধের মৃত্যু।
কোথায় আমরা দাঁড়িয়ে তা তো দেখবই, কিন্তু আমরাই বা কেমন, সেটা ভুলে থাকলে চলবে কী করে? প্রতি তিনজন শিশুর দুজনই মা-বাবার মারধরের শিকার (প্রথম আলো, ৬ জুলাই)। ভুললে চলবে কী করে দেশে (দশ বছর আগের জরিপে) কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৭৪ লাখ, আর সরাসরি শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৩৪ লাখ (সূত্র: ইউনিসেফ ও আইএলও)। এবং আমার-আপনার শিশুরা যখন কোমল শৈশব পার করছে, তখন এরা পড়ে থাকছে নির্যাতন-মৃত্যু আর যৌন সন্ত্রাসের হুমকির মুখে।
মানুষ অমৃতের সন্তান নয়। সেমেটিক ধর্মমতে ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুনই আদিতম হত্যাকাণ্ড। হিংস্রতা, জিঘাংসা, অসূয়া আমাদের সহজাত। তা সামলাতে আমরা আইন বানিয়েছি, রাষ্ট্র বানিয়েছি, সংস্কৃতির সাধনা করে আসছি, ধর্ম দিয়ে অধর্ম ঠেকাতে গিয়েছি। ভেবেছি, এগুলোই আমাদের ভেতরের শয়তানকে সামলাবে। সহজাত হিংস্রতাকে নীতি ও শাসনের শিকলে আটকে রাখবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে কেবলই বিষ। আজ আমাদের সৃষ্টিই কি আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নেই?
শিশু রাজনের হত্যার দুই দিন পরের সংবাদ: হিজড়াকে পিটিয়ে হত্যা, ডাকাত সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা, ঘুমন্ত বস্তিতে আগুনে দুই শিশু অঙ্গার, চরে যুবকের মাথাকাটা লাশ উদ্ধার ইত্যাদি। রাজনীতি থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত হিংস্রতার বান। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ চাই, ক্রিকেটে বিশ্বসেরা হওয়ার সাধ আমাদের, চেতনায় চেতে উঠে চিৎকার করি আমরা, কিন্তু মধ্যম মানের মানবিকতা অর্জনে কত দেউলিয়া, সেই হুঁশ নেই! এ এমন এক দেশ, যেখানে ঘটনা ঘটে চলে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া হয় বেছে বেছে। ভিডিও–বাস্তবতায় আমরাও হয়েছি এমন আসক্ত, সচিত্র না দেখলে আমরা নড়েচড়ে বসি না।
ইমানুয়েল লেভিনাস ফরাসি দার্শনিক। তিনি বোঝাচ্ছেন: কেউ কাছে এলে মানুষ মুখের দিকেই তাকায়। অচেনা সেই মুখ প্রথমেই তার মধ্যে জাগিয়ে তোলে আদিম ভীতি: ও কি আমার শত্রু, ঘাতক? কিন্তু ভালো করে তাকালে সে দেখে, প্রতিটি আনমনা মুখই কত নির্বিরোধী, কত সহজ। পাশবিকতাকে ঘুম পাড়াতে পারলে প্রতিটি মানুষই ঘুমন্ত মুখের মতো সরল ও সহজ। এই অনুভূতি থেকে তখন আমরা আবার মুখের দিকে দেখি, মায়া জাগে। আমাদের সভ্যতায় এই মায়া আজ গরহাজির।
নিষ্পাপের মৃত্যুর উন্মত্ত মহড়া তবু আমাদের দেখে যেতেই হয়। পেছনে আবহসংগীত হিসেবে বাজে মধ্যম আয়ের মধুর বাঁশি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে...অধিকতর উন্নয়ন আর তুমুল অমানবিকতার দিকে সবেরই কারণ আছে। মানুষের ভেতরের বীভৎস বীরের ছায়াটা যে বেরিয়ে আসছে বেশি করে, কারণ আইন-শাসন-নজরদারি-জবাবদিহি মারাত্মক শিথিল। অনেক ক্ষেত্রে রক্ষকেরাই ভক্ষণের পৈশাচিকতা চালায়। কেন এমনটা হচ্ছে, তার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটা সামাজিকভাবে দীর্ঘদিন ধরেই আছে—পোস্ট কলোনিয়াল (সদ্যস্বাধীন) সোসাইটিতে আগ্রাসী বা ধ্বংস করার মনোবৃত্তি থেকে মানুষের মধ্যে এ আচরণ দেখা যায়...জনগণের ভেতর যে হতাশা বা উন্মাদনা থাকে, তার প্রভাবে এই আগ্রাসী আচরণ বেরিয়ে আসে।...শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমনটা ঘটে। কিন্তু যে রাষ্ট্রে এসব আচরণ নিরুৎসাহিত করার কোনো প্রবণতা বা সিস্টেম থাকে না, সেখানে এসব আচরণ বেশি প্রকাশ পায়।’ বাংলাদেশের ঘটনাগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন গ্লোবালাইজেশনের একটা ট্রানজিশনাল পিরিয়ড পার করছে। সুতরাং এখানকার অনেক মানুষ এসব আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’ অন্যদিক থেকে একে বলা যায় ট্রানফার্ড অ্যাগ্রেশন বা স্থানান্তরিত ক্রোধ। এক জায়গার হতাশা আমরা আরেক জায়গায় প্রকাশ করি।
শুধু নৈতিকতার মাইক বাজিয়ে এই বিকার ঠেকানো যাবে না। বাজার অর্থনীতির তুমুল হাওয়ায় পাতলা মেঘের মতো ছিঁড়ে-ফুড়ে উড়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ। মানুষ এতই আত্মকেন্দ্রিক যে কেউ কাউকে মানেও না, ডাকেও না। আয়ের চাইতেও বেশি বাড়ছে জীবনযন্ত্রণা-অনিশ্চয়তা-ভয়। এসবে অস্থির মানুষ বোধবুদ্ধি হারিয়ে বিকারগ্রস্ত হয়। ঠিক যে, আইনের কঠোর প্রয়োগ লাগবে, বিচারে আস্থা আনতে হবে, পাশাপাশি সমাজের সংহতি ও বন্ধনও জাগাতে হবে। আমাদের আনন্দের জায়গা নিয়েছে বিনোদন। আর বিনোদন মানেই যৌনকাতর হিংসাত্মক সিনেমা, খেলা, ভিডিও ও টেলিবাস্তবতা। এসব না বদলিয়ে মানুষ বদলাবে কী করে?
একদিন সমাজের সামনে যে আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব ছিল, আজ সেগুলো সুবিধাবাদ ও স্বার্থপরতায় ভূলুণ্ঠিত অথবা অকেজো। ভালো মানুষ সব ক্ষেত্রে পরাজিত ও ভীত। দুর্বৃত্ত ও অপরাধীরা রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। নতুন আদর্শ ও নতুন অনুসরণীয় মানুষকে সামনে আনতে না পারলে, রাষ্ট্রটাকে অসুরবিনাশী করতে না পারলে আমাদের আশা নেই।
চরম পৈশাচিকতার মুখে আমরা বিহ্বল হয়ে পড়ি, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কিন্তু এই মুহূর্তেই প্রশ্ন করতে হবে, ঠিক এই সময়ে পরিকল্পিতভাবে শিশুকে হত্যা করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছিল কি না। কেন পুলিশপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও রাজনের মূল ঘাতককে সময় থাকতে পুলিশ আটক করতে পারল না? রাজনের মায়ের দাবি, পুলিশ ও ইমিগ্রেশন এড়িয়ে সে এখন দেশের বাইের।
এদিকে উন্মত্ত ক্রোধে অনেকে খুনিদের ফাঁসি চাইছেন, ক্রসফায়ার দাবি করছেন, পিটিয়ে মারতেও চাইছেন। তা-ই যদি হবে, তাহলে বিচার হবে কার? বিচার মানে দোষীকে শুধু ঝুলিয়ে দেওয়া না। আদালতের সওয়াল-জবাবের মধ্যে, উকিল ও বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুধু অপরাধই প্রমাণিত হয় না, অপরাধের কার্যকারণ ও মন-মানসিকতারও হদিস করা হয়। তা থেকেই প্রতিকারের পথেরও সন্ধান মিলতে পারে। তাই হত্যার জবাবে হত্যা নয়, হত্যার বিচারের মাধ্যমে সম্ভাব্য শিকার ও সম্ভাব্য হত্যাকারী উভয়কেই নিহত ও খুনি হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। এবং এসবকে দলীয় রংচশমায় রাঙানো যাবে না।
ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমরা এখন আমাদেরই মারছি ও মরছি। গভীর গভীরতর অসুখ এখন বাংলাদেশের। আমার মানুষ মরছে আগুনে, ভবন ধসে, ক্রসফায়ারে, গুম হচ্ছে, সাগরে ডুবছে, পায়ের তলায় থ্যাঁতলা হচ্ছে—দেশে-বিদেশে। মানুষই এখন মারছে মানুষকে। প্রতিটি অপঘাতের ক্ষত থেকে উঠে আসছে ডুবন্ত জাহাজের নাবিকের শেষ বার্তা: সেভ আওয়ার সোউলস (এসওএস); আমাদের প্রাণ বাঁচাও! বাংলাদেশ এখন চিৎকার করে বলতে চাইছে, ‘আমি মরি যাইয়ার, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা!’

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Friday, August 7, 2015

এক ভয়ার্ত সাঁওতালপল্লি থেকে বলছি... by ফারুক ওয়াসিফ

অনি​শ্চয়তার মুখে এ রকমই থতমত সমতলের আদিবাসীরা
মেয়েটির নাম অনীতা—অনীতা হেমব্রম। বাড়ির দাওয়ার মাটির থামের আড়াল থেকে লজ্জায় মুখ বের করতেই পারছিল না। তাদের উঠানের গাছের ডালিম সবুজাভ হলুদ, দেয়ালে আলপনা আঁকা; কেমন এক শান্তি শান্তি পরিবেশ। অনীতার প্রিয় তৃষ্ণার্ত কাকের গল্প, প্রিয় কবিতার নাম ‘শোভা’, প্রিয় গান ‘আমার সোনার বাংলা’। অথচ সোনার বাংলার বাঙালিরাই তাদের বিপদের সর্বনাম।
সবার চোখের জলই সমান নোনা, সবার রক্তই সমান লাল। কিন্তু তা হয়তো নয়। উত্তরবঙ্গের পার্বতীপুরের গহিন মেঠোপথের মাথায় যে গ্রামটির নাম চিড়াকুটা, সেখানকার মানুষের সবই কম। তাদের জমি কম, রক্ত কম লাল, চোখের পানি কম নোনা, অত্যাচার-নির্যাতনও যেন তাদের গা-সওয়া। কমই যদি না হবে, তাহলে এত সহ্য করে কীভাবে? বাঙালির পক্ষে বাঙালি, মুসলমানের ডাক আরেক মুসলমানে শোনে, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদেরও সহায়-শক্তি আছে এ দেশে—কিন্তু আদিবাসী সাঁওতালদের কিছুই নেই। চিড়াকুটার সাঁওতাল উচ্ছেদ হলে শিমুলজুড়ির সাঁওতালেরা তাদের আশ্রয় দিতে ভয় পায়। এত ‘নেই’-এর মধ্যেও খুব করে ‘আছে’ তাদের গায়ের রং, চেহারার ধাঁচ আর সাঁওতালি ভাষার বুলি। এই থাকাতেই মস্ত বিপদ। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তাদের পাতে কেউ খায় না। তাদের কোনো যুবকের স্বজাতির বাইরের কাউকে ভালোবাসা মানে মৃত্যু ডেকে আনা। তাদের মর্যাদা ও সম্পত্তি দুটোই যেন লুটপাটের বিষয়।
এ বছরের ২৪ জানুয়ারির ঘটনা। সকালবেলা চিড়াকুটার কৃষকেরা তাঁদের জমিতে গিয়ে দেখেন, পাশের গ্রামের জনৈক জিয়ারুল-জহুরুল ভ্রাতৃদ্বয় লোকজন নিয়ে হাল চষা শুরু করেছেন। বাধা দিলে তাঁদের একজন পিস্তল বের করেন। সাঁওতালি রক্তে সুপ্ত হুলের স্মৃতি জেগে ওঠে। সাঁওতালি তিরে এক বাঙালির প্রাণ যায়। যথারীতি পুলিশ এসে ২৩ সাঁওতালকে আটক করে। পুলিশ যাওয়ামাত্রই চারপাশের হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নামধারী হামলাকারী ‘পিঁপড়ার মতো আসি’ ঘরদোর লুট করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, ছিনিয়ে নেয় গবাদিপশুসহ অস্থাবর সব সম্পদ। তারপরও অটুট তাদের অপার্থিব সরলতা, সাঁওতালি ঐক্য আর আধুনিক হাহাকার।
এর প্রায় পাঁচ মাস পর ১ জুলাই চিড়াকুটায় গিয়ে পেলাম মধ্যবয়সী চ্যালচিউস হেমব্রমকে। কথা বলতে বলতে উত্তেজনায় তড়পাচ্ছিলেন। বলছিলেন ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর নেতা সিধো-কানো-চাঁদ-ভৈরব ভাই ও তাঁদের ফুলমণি বোনের কথা। কিন্তু যেই বললাম, ‘আপনারা তো সংখ্যায় কম, পারবেন কী করে?’ বাতাস–হারা পতাকা যেমন মিইয়ে পড়ে, লোকটার গলার স্বরও তেমনি নেমে যায়: ‘ওদিকে ভারত এদিকে বাংলাদেশ, কী করব, কোথায় যাব? সংখ্যায় তো আমরা কম! আমারও মারবা ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না!’
পার্বতীপুর থেকে রওনা দিলে মোটরসাইকেলে দুই ঘণ্টার পথ চিড়াকুটা। পথের মধ্যে অবিরত সবুজের সমারোহ, বৃষ্টিভেজা খেতগুলো ধান রোপার জন্য প্রস্তুত। মাটির বা পাকা রাস্তার ওপর ধানের খড় আর ভুট্টা শুকাতে দেওয়া। বৃষ্টিজমা খেতে বা খালে বাচ্চা-বুড়ো মাছ ধরছে। কোথাও কোনো বিপর্যয়ের চিহ্ন নেই। শুধু চিড়াকুটা গ্রামের জমিগুলো ফাঁকা, চাষবাস বন্ধ। পুরো গ্রামে সরকারি স্কুলঘরে পুলিশ ক্যাম্প। আরও এগোলে সাঁওতালপল্লির মাটির ঘরবাড়ি। পাঁচ মাস আগের আগুনের দাগ এখনো এদিকে-ওদিকে। কয়েকটি অঙ্গার হওয়া গাছ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা টিনের বেড়া, চালহীন কিছু ঘর সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাঁচ মাসেও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। সেদিনের পর এলিজাবেথ টুডুর রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে সেদিনের হামলার স্মৃতি।
মধ্যবয়সী বিমলা মুর্মুর চোখে এখনো ভাসে সেই সব দৃশ্য: ‘হিসাব ছাড়া লোক আসছে সেদিন আমার ঘরে। আমার দুই ড্রাম চাল, টিভি, সাইকেল, সেলাই মেশিন, হাঁড়িকুড়ি, জামা-কাপড়—সব নিয়ে গেছে।’ গ্রামের মধ্যে এটিই সবচেয়ে অবস্থাপন্ন বাড়ি। গ্রামের একমাত্র টেলিভিশনটাও তাদেরই ছিল। বিমলার দুঃখ, ‘সেলাই মেশিন আমার জান, সেটাও নিয়ে গেল! তারা আমার পায়ে বাড়ি দিল, গলায় টিপে ধরে কোমরে হাত দিয়ে মোবাইল নিতে গেল। আমি দৌড় দিলাম—এত পুরুষ আমার পেছনে। কেউ বলতেছে ম্যারা ফেল। তখন লালমাটি গ্রামের মোস্তফা চৌকিদার আমারে বাঁচাইল! কিন্তু মোবাইল আর পাইলাম না।’
৬৫ বছরের বৃদ্ধ লক্ষণ টুডুর হাহাকার লুট হওয়া পোয়াতি গরুটার জন্য। ‘এত দিনে গরুটা মনে হয় বিয়াইছে’ বলে হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করতে থাকেন। মেসেস টুডুর বিমারি স্বামী জেলখানায়, বাড়িটা মাটির সঙ্গে মেশানো, ওর মধ্যেই ছিল তাঁর খাসি বিক্রির ১০ হাজার টাকা—তা–ও পুড়েছে। ওদের ধারণা, এখন যারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছে তারা তাদের পুলিশ, আর যারা গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে গেছে তারা ‘ওদের পুলিশ’। ওদের ধারণা, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের ব্যাপার আর সিধো-কানো সংস্কৃতির ব্যাপার।’ ওদের ধারণা, ‘যা বলব সত্যই বলব, মিথ্যা বলব কেন?’ ওদের ধারণা, বউ পেটানো ছাড়া আর কোনো অপরাধ তারা করে না। ওরা মনে করে, সাঁওতালদের মধ্যে কানা-খোঁড়া, চোর-ডাকাত-ভিখারি কিছু নাই। ওদের ধারণা, মারামারি-লুটপাট করলে ‘নিজের জাতের ওপরই ঘিন্না লাগবে!’ ওদের বিশ্বাস, ‘আমরা জয় পাব, কারণ সরেজমিনে লড়াই করছি, আর ওরা তো ভূমিদস্যু।’
অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঁওতালেরা পাকিস্তানি মিলিটারি হটিয়ে রংপুরকে অল্প সময়ের জন্য স্বাধীন করেছিল। কিছুদিন আগেও গ্রামে ফুটবল খেলা হলে সাঁওতাল-বাঙালি মিলেমিশে ‘লাফাত’। জাত নিয়ে ছি ছি করত না! কিন্তু মাঝখানে চলে এসেছে ভূমি। সেই ইংরেজ আমল থেকে জমির অধিকার, অরণ্যের অধিকার, মর্যাদার অধিকার বাঁচাতে সাঁওতালেরা লড়ে যাচ্ছে।
দুই...
আগের দিন ছিল ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বছরপূর্তি। এ উপলক্ষে দিনাজপুর শহরে জমায়েত হয়েছিল কয়েক হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ-শিশু। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে বাসে করে, ভটভটিতে চড়ে তারা এসেছে রোদে পুড়তে পুড়তে। এর আয়োজন করে আদিবাসী পরিষদ ও দিনাজপুরের নাগরিক সমাজ। তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। সবার দাবি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন হোক। সেখানে যতজনের সঙ্গে কথা বলেছি, অধিকাংশেরই জমি নিয়ে হয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, নয়তো এলাকার প্রভাবশালী বাঙালিদের সঙ্গে বিরোধ চলছে। কোথাও সরকারের বন বিভাগ তাদের জমিকে বনাঞ্চল ঘোষণা করে দখলে নিচ্ছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাটকলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই সাঁওতালদের জমির ওপর নির্মিত।
এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী তাঁদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করলেন, ৮০ শতাংশ সাঁওতালি জমি নিয়েই গন্ডগোল চলছে। চিড়াকুটার যে ৪৩ একর ৩৩ শতক জমি নিয়ে বিবাদ, তার ১৯ একর ১৭ শতক জমিতে অনাদিকাল থেকে সাঁওতালেরাই চাষবাস করছিল। কিন্তু বিষয়বুদ্ধি নেই বলে, আর শিক্ষা-দীক্ষার অভাবে এসব জমির দলিল-রেকর্ড তারা করে উঠতে পারেনি। আর পারলেই-বা কী, ভূমি দপ্তর, সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নকল দলিলের ভিত্তিতে সেই সব জমি কেড়ে নেওয়া খুবই সহজ। আমেরিকায় একসময় স্বর্ণ শিকারিরা গোল্ড রাশের জন্ম দিয়েছিল, বাংলাদেশে এখন চলছে ভূমিদস্যুদের ল্যান্ড রাশ তথা ভূমিগ্রাসের ছিনিমিনি খেলা। এই খেলায় সাঁওতাল-আদিবাসীসহ প্রান্তিক হিন্দু-মুসলমান বাঙালির জেতার সম্ভাবনা খুবই কম।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা নিরসনে একটা ভূমি কমিশন সরকার গঠন করেছে। অনুরূপ কমিশন সাঁওতালদেরও দাবি। এর জন্য আইন লাগবে, লাগবে ভূমি প্রশাসনের দুর্নীতি বন্ধ করা। কিন্তু কে করবে?
তিন...
দিনাজপুর থেকে পার্বতীপুরে যাওয়ার পথে এক স্কুলের মাঠে দুজন মানুষকে ঘুরে ঘুরে ঢোল আর মাদল বাজাতে দেখে থামি। মাঠের প্রান্তে সাদা কাপড়ের প্যান্ডেলে প্রমাণ আকারের দুই যোদ্ধামূর্তি। হাতে তির-ধনুক আর পুরু গোঁফ দেখে চিনতে পারি, সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সিধো ও কানোর মূর্তি। পাশেই আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার। সেখানকার মণ্ডপে প্রতি সন্ধ্যায় বাতি দেওয়া হয়, ঢোল-মাদলের নাচে আর পুষ্পে সাঁওতালদের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। মাঠের দুই পাশে বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা দুটি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় ও কমিউনিটি সেন্টারের এত জমি কোথা থেকে এল? জটলার ভেতর থেকে জবাব দিলেন হাড্ডিসার প্রৌঢ় একজন। হাসতে হাসতে বুকে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমি দিসি।’
অবাক চোখে লুঙ্গি-শার্ট পরা ছোটখাটো মানুষটার ফোকলা মুখটায় তাকিয়ে থাকি।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ঢোল-মাদল নিয়ে ওরা উঠে দাঁড়াল। কোথায় যায়? বলে, নসিপুরে এক বাড়িতে বিয়া। সেখানে বাজনা বাজাব, নাচব। আর কী করব?
হারিয়ে ফেলার আগেই এই আদিবাসী দাতা হাতেম তাইয়ের নাম জানতে চাইলাম। আকাশি রঙের শার্টের বুক পকেটের কাছটায় আবারও হাত দিয়ে মানুষটা উত্তর করে, ‘আমার দাদা ডুলু মুর্মু, বাবা মঙ্গল মুর্মু আর আমি নরেশ মুর্মু। এই সব জমি আমাদের দান।’
এখন কত জমি আছে আপনার?
চলে যাওয়ার আগে অবলীলায় হা হা হা হেসে লোকটা বলে, ‘কিসসু নাই।’
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Saturday, July 11, 2015

পতন ঠেকানোর শক্তিটা এখনো তলাতেই by ফারুক ওয়াসিফ

এগারো তরুণ যা করে দেখালেন, এক হলে
কোটি কোটি তরুণও সব বদলে দিতে পারেন
একবার এক লোক মহা এক আবিষ্কার করে ফেলল: বিমান চলবে পানি দিয়ে। কোনো গ্যাস, তেল লাগবে না। কোনো দূষণ হবে না। ব্যয় কম। খালি এটাকে পানিতে ভরে ফেলো, তারপর দুনিয়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ওড়ো। সবাই তো মহা খুশি! লোকজন তখন জানতে চাইল তার কাছে, ‘কীভাবে বানাবে সেই প্লেন, পরিকল্পনাটা বলো!’
প্রতিভাধর লোকটা বিরক্ত, ‘পরিকল্পনা?’ আমি তো মহান একটা চিন্তা করেছি। এখন ইঞ্জিনিয়ারদের দায়িত্ব হলো কারিগরি দিকগুলো ঠিক করা, জিনিসটা বানিয়ে ফেলা!
এ ধরনের মহা প্রতিভাধর মানুষ চারপাশে বিস্তর আছেন। তাঁরা বিরাট বিরাট পদে আরোহণ করে নিত্যনতুন আইডিয়া নাজিল করেন। কেউ ডিজিটাল বিপ্লব করবেন, কেউবা রাতারাতি মধ্যম আয়ের দেশ বানিয়ে ফেলবেন কাগজে–কলমে, কেউবা ঢাকাকে তিলোত্তমা রাজধানী করবেন, কেউ গ্রামে গ্রামে অট্টালিকা তুলবেন ইত্যাদি আওয়াজ তোলেন। কিন্তু এক তরুণ, বেশি কথা না বলে নিজের কাজটা করে ফেললেন! সূর্য ওঠার মতো অবিসংবাদিত সেই আবির্ভাবে কারোরই সন্দেহ থাকল না।
তিনি যা করেছেন, ও রকম আইডিয়া অন্তত কয়েক হাজার তরুণের মনে ভাতের বলকের মতো অহরহ ফুটছে। কিন্তু নবীন ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমান কাজটা করে দেখালেন। তিন ম্যাচে ক্রিকেটীয় পরাশক্তি ভারতের ১৩টি উইকেট অবলীলায় তুলে নিলেন! দুনিয়ার ক্রিকেটভক্তরা তাঁকে অভিবাদন জানাল। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আরও গর্বিত হয়ে উড়তে থাকল লাল–সবুজ পতাকা। কিন্তু কী অসম্ভব বিনয় তার, কী সুন্দর সরলতা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সামর্থ্যবানের বিনয় থাকে। মুস্তাফিজুরের খেলার মতোই তাঁর বিনয়ও সবাইকে মুগ্ধ করল।
বাঙালি হুজুগ তোলে একসঙ্গে, কাজ পণ্ড করে ঝগড়াঝাঁটিতে। কিন্তু একজন ১৬ কোটি হৃদয়কে এক করলেন। গভীর নলকূপ থেকে পানি তোলার মতো সহযোদ্ধাদের ভেতরের শ্রেষ্ঠত্বকে টেনে তুলে জাদুকরি ঘটনা ঘটিয়ে দিলেন। বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, হোম সিরিজে পাকিস্তান-ভারতকে ছাপিয়ে ‘উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর!’ করে তুললেন দলটাকে। তিনি বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট দলের (পুরুষ) অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।
তরুণতর মাশরাফি শুধু তাঁর দলের এগারো বাঘের স্কোয়াডকেই শুধু নয়, ১৬ কোটি মানুষের হৃদয়কে এক তরঙ্গে উদ্বেলিত করতে পেরেছিলেন। যেন এক প্রাজ্ঞ অর্কেস্ট্রা পরিচালক, যাঁর হাতের ওঠানামায় সহস্র বাদক সুর তুলছে একই তানে একই সংগীতে। মহৎ চিন্তার পাশাপাশি মহৎ সাধনা তাঁর ছিল বলেই না! কিন্তু দেখুন, জয়ের চাইতেও তাঁর বড় অভীষ্ট দেশপ্রেম, যেখানে কোনো উগ্রতা নেই, বিদ্বেষ নেই। এর জন্য শুধু আবেগ হলে চলে না, সংকল্পও লাগে।
আমাদেরই আরেক বিশ্বসেরা খেলোয়াড় সিদ্দিকুর রহমান। তিনি এশিয়ান ট্যুর জিতে গলফ বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হওয়ার গরিমা অর্জন করেছেন। সাবেক ক্রিকেট তারকা মোহাম্মদ রফিকের মতো তাঁরও বেড়ে ওঠা বস্তির মাদক-সন্ত্রাস-দারিদ্র্যময় পরিবেশে। অভিজাত গলফ ক্লাবে বল টোকাতে টোকাতে তিনি খেলাটা শিখে নেন। সেই অভিজাতেরা টেকেননি, কিন্তু সিদ্দিকুর তলানি থেকে উঠে এসেছেন শীর্ষে—ঠিক মুস্তাফিজুরের মতো করেই। সংগ্রামী আত্মবিশ্বাস তাঁকেও বিনয়ী করেছে, ‘মুই কি হনু রে’ ভাব ধরতে যাননি।
আমাদের মফস্বল দেশকে দুই জাতের ‘প্রতিভা’ উপহার দিয়েছে: মাফিয়া ও নায়ক। গত এক দশকে প্রায় প্রতিটি জেলাতেই মাফিয়াদের উপর্যুপরি উত্থান দেখেছে বাংলাদেশ। তারা জোঁকের মতো দেশের দেহ থেকে রক্ত চোষণ করেই যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে। বিপরীতে শিক্ষা-দীক্ষায়, সংগীতে, সাহিত্যে, খেলাধুলায়, উদ্ভাবনায়, ব্যবসা–বাণিজ্যে আর শ্রমের উৎকর্ষে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠায় আরেক দল তরুণ তলানি থেকে চেষ্টার সিঁড়ি বেয়ে শীর্ষে আরোহণ করেছেন। বলা যায়, একপ্রকার হেঁটেই, অর্থাৎ পরিশ্রম আর কষ্ট সয়েই তাঁরা উত্তীর্ণ হয়েছেন সফলতার সোপানে। আমাদের চিরতরুণ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের মতোই নাটকীয়তায় ভরা এঁদের উত্থানপর্ব।
বারবারই হতাশাবাদীদের বিস্মিত করে দিয়ে, শত্রুদের হতভম্ব করে দিয়ে একেবারে তলা থেকে এমন এমন পথিকৃৎ তরুণ–তরুণীরা আসবেন, যঁাদের আমরা মাপতেই পারব না। ১৬ কোটির দেশে মজুত আছে এ রকম অনেক শক্তি। ক্রমেই তাঁরা একদিন ওই সব মাফিয়ার মুখোমুখি হয়ে দেশটাকে নিজেদের হাতে নিয়ে আসবেন, এই আশাকে তাই অলীক বলা যায় না।
আমাদের মানুষ অঢেল, দৃষ্টান্তও বিস্তর। যখন জলবায়ু দুর্যোগে উপকূলের বিরাট অংশ ডুবে যাবে বলে ভয় দানা বাঁধছে, তখনই খবর হলো, পলি জমে জমে সমুদ্রে নতুন বাংলাদেশ জাগছে। আমাদের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা, আমাদের পানি ব্যবস্থাপনাবিদেরা, আমাদের বাঁধে আসক্ত সরকারি লোকজন যখন পরিকল্পনা করেন, তখন সাধারণ মানুষকে বাদ রেখে হিসাব করেন। তো, জলবায়ু বিষয়েও সেটাই হলো। মানুষ তো বাদই, তাঁরা নদীবাহিত পলির কথাও বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠেকা যার বেশি, বুদ্ধির খোঁজ সেই মানুষই করে। নোয়াখালীর চরাঞ্চলের মানুষ সেই পলি ধরে রাখার নিজস্ব উদ্যোগ নিয়ে উপকূল জাগিয়ে তোলার ব্যবস্থা করে। পরে সরকার তাদের সঙ্গে শামিল হয়। যশোরের ভবদহের জলাবদ্ধতা মোকাবিলায়ও সাধারণ মানুষ শিক্ষা দেয় সরকারকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভুলে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতা দূর করার পথ দেখান এলাকার ভুক্তভোগী তরুণেরা।
আমি এমন কিছু গবেষক–তরুণকে চিনি, যাঁরা গ্রামের সন্তান বা বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের ঘরে জন্মেছেন। গবেষণার ক্ষেত্রে এঁদের কারও কারও অর্জন তাক লাগানোর মতো। এঁরা দেশেই থাকুন বা বিদেশে, বাংলাদেশের চিন্তার জগতে তাঁরা অবদান রেখে যাচ্ছেন এবং যাবেন।
এভাবে বারবার সমাজের একেবারে তলা থেকে, গ্রাম-মফস্বল থেকে মুস্তাফিজুরের মতো ‘আদর্শ’ এসেছেন। ঠিক যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম-মফস্বলের তরুণেরা এসে যুদ্ধের সামনের সারিতে থেকে দেশটাকে স্বাধীন করে গেছেন, সেভাবে এখনো সংগ্রামে, সংকটে তাঁরাই জোগান দিয়ে যান নতুন শক্তির, সম্ভাবনার আর প্রেরণার। ঠিক যেভাবে যুদ্ধের পরে ওই সব গ্রামীণ সেনানী ফিরে গেছেন খেত–খামারে, আর সংগ্রামের সোনা খেয়ে নিয়েছে একদল উটকো মানুষ, তেমনটা আজও ঘটছে বলে বাংলাদেশ জাগতে জাগতেও থমকে আছে। তারপরও এ এমন এক দেশ, যে হতাশার শেষ সীমানা থেকে আবার আশার দিকে মোড় ঘোরায়। আমরা তাই একেবারে তলিয়ে যাই না। তলানি থেকে কেউ এসে পতনটা ঠেকায়।
আমাদের ঐতিহাসিক যাত্রাটা সমুদ্রের ঢেউয়ের দোলার মতো। একবার উচ্চে, একবার নিম্নে। যেবার আমরা তলাতে থাকি, সেবারই পতনের নিম্নতম দাগ থেকে আবার ধাক্কিয়ে দেশটাকে ওঠানো শুরু করে সেই তলানির মানুষেরা।
ঢাকার জুরাইনে একদল তরুণ এলাকার জলাবদ্ধতা, নিরক্ষরতা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছেন এক যুগ ধরে। সম্প্রতি দেখলাম, এলাকার সাংসদ সেই তরুণদের সঙ্গে বসে সমস্যা সমাধানের চাপ মেনে নিচ্ছেন। কুড়িগ্রামের একদল তরুণ পুরোনো বাণিজ্যপোত চিলমারীর গৌরব ফিরিয়ে আনায় আন্দোলনের পর আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তাঁদের আন্দোলনের ফলে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ হয়েছে, জংধরা রেললাইনে আবার ট্রেন আসা শুরু করেছে, গড়ে উঠছে পাঠাগার আন্দোলন। রানা প্লাজা ধসের পর এ ধরনের তরুণেরাই তো কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে সেই মৃত্যুপুরী থেকে অনেক জীবন ছিনিয়ে এনেছিলেন।
গত বছর সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটলেই দেখেছি ‘আমরা’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ সহায়তার হাত নিয়ে ছুটে গেছে সেখানে। বরিশালে এক কিশোর সাংবাদিক বের করে যাচ্ছে লাল–সবুজ নামের পত্রিকা—বেশ কয়েক বছর যাবৎ। সারা দেশে খুঁজলে এ রকম অজস্র জন-উদ্যোগের খোঁজ মিলবে। সে জন্যই বিশ্বাস করি, আমাদের ওপরতলার অধিকাংশটাই দূষিত হয়ে গেলেও, তলায় এখনো সঞ্জীবনী প্রাণশক্তি আছে। ওই প্রাণশক্তির উদ্যম আর সাহসটাই বাংলাদেশের প্রাণভোমরা। এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় তরুণদেরই। ইতিহাস যতই নিষ্ঠুর হোক, তরুণের রক্ত আর সাধনার দাম তাকে দিতেই হয়।
আজ যে গ্রাম–মফস্বলের তরুণেরা প্রথমবারের মতো ডিগ্রি পাস করে শহরে আসছেন; মাতৃভাষা, ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে ক্ষমতা ও বিত্তের সঙ্গে দর–কষাকষি করছে; সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় লিখছেন নিজের অভিজ্ঞতা, তাঁরা নির্ঘাৎ বদলে দেবেন বাস্তবতা, যদি মাশরাফির মতো অধ্যবসায় আর মুস্তাফিজুরের মতো সারল্যের শক্তি থাকে।
আমাদের ইতিহাসে যাঁরা একবারের জন্য হলেও মহৎ উচ্চতায় উঠেছিলেন, তাঁরাও তো তরুণেরই প্রতিভূ। উত্থানের যুগে তাঁদের বেশির ভাগ প্রায় তরুণই ছিলেন। এঁরা কেউ বদলে গেছেন, কেউ নীতিতে অটল থেকেছেন, কিন্তু এঁদের সূচনাটা ছিল মহৎ। এবং এঁরা পেয়েছিলেন শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর মতো বটবৃক্ষের সস্নেহ ছায়া। আজকেও তরুণদের পথ আকীর্ণ করে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সরাতে অভিজ্ঞ প্রবীণদের আশ্রয়-প্রশ্রয় খুবই প্রয়োজন।
আজকের তরুণেরা সব জায়গায় পারছেন, পারছেন না কেবল রাজনীতিতে। যেখানেই রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চর্চা, যেখানে পদ-প্রতিষ্ঠার কামড়াকামড়ি, সেখানে তরুণ বিপর্যস্ত ও ব্যবহৃত হতে হতে ছিবড়া হয়ে যান। যেখানেই তাঁর যোগ্যতা দেখানোর সুযোগ ততটা বাধাগ্রস্ত নয়, সেখানেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন। গত কয়েক বছরে ক্রিকেটে বাংলাদেশের মুখচ্ছবি যে বদলে যেতে পেরেছে, তা হতে পেরেছে সুযোগের দরজাটা খোলা ছিল বলে। যেখানেই প্রতিভার পথে কাঁটা কম, সেখানেই বিস্ময়কর সাফল্য আসছে। ক্রিকেট-বিশ্বে লেখালেখি চলছে যে বাংলাদেশে এত প্রতিভাময় খেলোয়াড় আসে কোত্থেকে?
একবার সুযোগ পেয়েই এগারো তরুণ যে জাদু দেখিয়ে দিয়েছেন, এক হলে দেশের কোটি কোটি তরুণ কী করে ফেলতে পারেন, তা কল্পনা করে শিহরিত হতে হয়। দুর্বৃত্তদের বাধা সত্ত্বেও যদি আমরা এটা পারি, তাদের সরাতে পারলে আমরা কী করতে পারি, সেটা কি ভাবছি?
যাঁরা ভাবছেন, বাংলাদেশকে পদাবনত রাখা যাবে, তরুণদের হ্যামিলনের চতুর বাঁশিওয়ালাদের পিছে দৌড়িয়ে হয়রান করে ফেলা যাবে, নিশ্চয়ই তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে নতুন চমক। এই দেশ সংকটের কালে যত দিন তার সেরাটাকে সামনে আনতে পারবে, তত দিন আশা আছে। যে বিগ ব্যাং থেকে জগতের সৃষ্টি, তার সূচনা হয়েছিল কিন্তু ছোট এক বিন্দুর স্ফুলিঙ্গ থেকে। বিন্দু থেকেই বৃত্ত হয়, মুস্তাফিজ-তাসকিন-সৌম্যদের মতো হঠাৎ আলোর ঝলকানি থেকেই পরিবর্তনের লংমার্চ যে শুরু হবে না, তা কে বলতে পারে?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Wednesday, June 24, 2015

একটি ব্যর্থ রেসের ঘোড়ার আত্মহত্যার গল্প by ফারুক ওয়াসিফ

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঘোড়াটি ফিরে এসেছে। পিঠে পরাজিত সৈন্যের লাশ। রাজা ভাবছে প্রাণহানির কথা নয়, পরাজয়ের কথা। আরাফাত শাওন নামের ফেনীর যে ছেলেটি জিপিএ-৫ না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে, দেশের রাজরাজড়ারা এ ঘটনার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সংকটটি দেখুন, শোক আমাদেরই থাক। অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণের বেদনা জীবিতদের অসন্তুষ্ট করবেই। আরাফাত শাওনের আত্মহত্যা দুঃসংবাদ। তার পরিবারের জন্য, শিক্ষাব্যবস্থার জন্য, তারুণ্যের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য। প্রবাদ প্রচলিত, ‘দুঃসংবাদ দানকারীকে হত্যা করো না’। অথচ ছেলেটি নিজেকেই হত্যা করে দুঃসংবাদটি রটিয়ে দিয়েছে। সে এই টার্গেটমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, কর্তৃত্বকারী পারিবারিক সংস্কৃতি, গণবিরোধী রাজনীতি; সবাইকে একসঙ্গে দাঁড় করিয়েছে অভিযোগের কাঠগড়ায়। ছোট্ট একটি চিঠিও সে লিখে গেছে।
‘...আমি আদৌ জানি না যে আমি কী? এই পরিবারের বা আমার মা-বাবার সন্তান, তা না হলে সব সময় এ রকম শাসন আর কড়া শাসনের ওপর আমাকে রাখা হয়েছে। কোনো বাবা-মা তাঁর সন্তানকে পড়ালেখার খরচে খোঁটা দেয় না। কিন্তু আমার মা-বাবা সব সময় আমাকে বলে তোর জন্য মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করছি। এভাবেই প্রতিনিয়ত বকাঝকা করা হয়। সব সময় বাবার থেকে শুধু খারাপ ভাষার গালি আর গালি শুনতে হয়, যা আমার একটু ভালো লাগত না। কিন্তু আমি এত দিন সহ্য করে ছিলাম। কারণ, কোনো কিছু করার কথা ভাবলে মনে হতো এ দুনিয়ায় তো বাবা-মায়ের আদর-ভালোবাসা পেলাম না...তাই এখন আমার আর এসব কিছু সহ্য হচ্ছে না।...আমাদের ছাত্রদের কী দোষ বলুন, আমরা তো আমাদের মতো চেষ্টা করে যাই। তবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর কারণে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হাল। এর আগের বছর সরকার তার নিজের স্বার্থের জন্য শিক্ষার হার বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এবার হরতাল-অবরোধ দেওয়ার ফলে বর্তমান সরকার বিরোধীদলীয় সরকারকে গালি দেওয়ার জন্য পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে, যাতে দেশে ফেলের হার বেড়েছে। বলুন, আমরা আর কীভাবে ভালো রেজাল্ট করতে পারি!!!???’
মরার আগেই মরে গিয়েছিল সে। তার সাক্ষী এই কথাটি: ‘আমি জানি না আদৌ আমি কী?’। তার মানে পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি এবং প্রচলিত শিক্ষা নামক তিক্ত ওষুধ; কিছুই তার সহায় হয়নি। জানাতে পারেনি যে সে কে? কী তার জীবন? কী তার লক্ষ্য? প্রথম তারুণ্যেই সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সে ভয়ংকর একা হয়ে গিয়েছিল। সবার ভেতর থেকেই একজন বুঝতে পারে যে সে কে। এগুলো যেন পিচ্ছিল পাহাড়ের ঢালে গাঁথা আংটার মতো, পড়ে যেতে গেলে যা ধরে বাঁচা যায়। কিন্তু তার শেষ চিঠি সাক্ষী, বাঁচার প্রেরণার বদলে এসব কিছু বরং তাকে আত্মধ্বংসের তাড়নাই দিয়ে গেছে।
সে অভিযোগ করেছে রাজনীতিকে, সরকারকে, বিরোধী দলকে, শিক্ষাব্যবস্থাকে এবং খুবই মর্মান্তিক হলেও সত্য, বাবা-মাকে। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আবহসংগীত সন্তানদের নিয়ে ভয়ানক উদ্বেগ। সন্তান যেন ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। টাকা ঢালা হবে, সময় ব্যয় করা হবে, বিনিময়ে তারা চাঁদ পেড়ে আনবে আকাশ থেকে! তারা জীবনে কী চায়, কী তাদের সত্যিকার ক্ষমতা ও প্রতিভা, কিসে তাদের সুখ-দুঃখ, তার খোঁজ কজন রাখে? বাবা-মাই বা কীভাবে জানবেন? তাঁরাও তো জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত পদাতিক।
শাওনের চিঠি সাক্ষ্য দেয়, প্রেরণার বদলে চারপাশ থেকে হতাশাই পেয়েছে সে
ছেলেটি যাঁদের দায়ী করে গেছে, তাঁরা কি সেই দায় অস্বীকার করতে পারবেন? আমাদের পরীক্ষাগুলো শিক্ষণমুখী না, ফলমুখী। সনদ বাজারে বিকায়। ঈর্ষাকাতর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে থাকতে অনেকেই হিংসুক অথবা হীনম্মন্য হয়ে যায়। তারা যেন বাজির ঘোড়া, না জিতলে ‘চাকরি নট’!
অনেক ঘোড়াই শেষ দাগ পার হয়, কিন্তু আরাফাত শাওনের মতো কেউ কেউ পড়ে যায়। কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন: ‘তোমরা আমাকে নামিয়ে দিয়েছিলে খনির গহ্বরে আর আমি মুখে রত্নকোষ ভরে উঠে আসতে পারিনি বলে, আমার শরীর থেকে খুলে নিয়েছিলে রঙিন সোনার পাত।’
কবি আমাদের অব্যক্তকে ভাষা দেন। তাঁরই টিওটোরিয়াল কবিতায় পর্যুদস্ত অভিভাবকের আহাজারি বাজে: তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (বা নব্বইয়ের বেশি)। তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম। তার বদলে মাত্র পঁচাশি! পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম? এই জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আসি? এই জন্যে তোমার মা কাকভোরে উঠে সব কাজকর্ম সেরে ছোটবেলা থেকে যেত তোমাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে? তারপরে আঁচলে মুখ মুছে ঢুলত গিয়ে ভাপসা রান্নাঘরে? এই জন্যে?’ জ্বালাটা এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। জয়ের কবিতার সেই বাবা তারপর বলছে, ‘এখনো যে টিউটোরিয়ালে পাঠিয়েছি, জানিস না, কী রকম খরচাপাতি তার? ওখানে একবার ঢুকলে সবাই প্রথম হয়। প্রথম, প্রথম! কারও অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার। রোজ যে যাস, দেখিস না কত সব বড় বড় বাড়ি ও পাড়ায় কত সব গাড়ি আসে, কত বড় আড়ি করে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের নিতে যায়? আর ঐ গাড়ির পাশে, পাশে না পিছনে—ঐ অন্ধকারটায় রোজ দাঁড়াতে দেখিস না নিজের বাবাকে?’
পাঠক, বিশ্লেষণ, প্রতিকার, আচার-বিচার দরকার আছে। তার আগে দুঃখটা, হতাশাটা কেউ বুঝুক। অন্তত ভুক্তভোগীরা জানুক তারা একা নয়। এ রকম লাখ লাখ ভারবাহী অভিভাবক আর তাদের বাজির ঘোড়ারা এভাবে ধুঁকছে। দুঃখের মধ্যেই তো আমরা এক হই।
বাবা চান ছেলে তাঁর মুখ উজ্জ্বল করুক, মা চান দুঃখের দিন শেষ হোক একদিন। সবাই তাদের চিনুক। ছেলে বা মেয়েটির নাম পত্রিকার পাতায় উঠুক। সুখবরের পাশাপাশি কখনো তারা দুঃসংবাদও হয়ে যায়। অনেকেই এ চাপ সহ্য করে, কিন্তু কেউ কেউ পারে না। মাত্র কয়েকটি নম্বর কম পাওয়ার হতাশায় জীবনের চরম ভুলটি করে বসে। অথচ, জগতে কত কম নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়ে বিরাট বিরাট কীর্তি করেছে। কত সামান্য মানুষ চুপচাপ অসাধারণ জীবন যাপন করছে। কেবল ঈর্ষা, কেবল প্রতিষ্ঠার উদগ্র লোভ কমালেই হয়। কিন্তু যে সমাজ-অর্থনীতি, যে বাজারি মনোভাব এবং যে হৃদয়-বুদ্ধি ধ্বংসকারী আবহে আমরা বাস করি, তার তেজস্ক্রিয়তা আরও বেশি। এটা নিজেই এখন কৈশোর-তারুণ্যের প্রাণশক্তি শোষণকারী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দোষ ব্যবস্থার, দায় সমষ্টির কিন্তু ভুগতে হয় ব্যক্তি মানুষকে, এ কেমন কথা?
পরিহাস, এত এত জিপিএ–৫, কিন্তু শিক্ষার মানের কী নিদারুণ অবনতি। ২০১১-১৪ পর্যন্ত তিন বছরে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৮১ শতাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর পর্যন্ত তুলতে ব্যর্থ হয়েছে (ইত্তেফাক, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)। পরিসংখ্যানের শুভংকরের ফাঁকিটা সবাই যখন দেখতে পাচ্ছে, তখন শিক্ষাধ্বংসী ব্যবস্থাটা না বদলিয়ে শিক্ষা বা জীবনের জন্য মায়াকান্না করা অর্থহীন।
শাওন আরও লিখেছে, ‘A+ কি গাছে ধরে যে আমি পেড়ে আনব?’। এর উত্তর বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তকদেরই দেওয়া উচিত। আমি শুধু আফ্রিকার এক সুখী জনগোষ্ঠীর গল্প শোনাব। তাদের কেউ যদি কোনো ভুল করে, তাহলে তাকে নিয়ে আসা হয় গ্রামের একদম মাঝখানে। তারপর একে একে সবাই মিলে বলতে থাকে তার অতীতের সব সুকীর্তির কথা। দুদিন ধরে প্রতিবেশী-স্বজনদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে লোকটা সব লজ্জা আর দম্ভ ভুলে উঠে দাঁড়ায়, হয়ে ওঠে আগের চেয়েও সুখী ও সুন্দর এক মানুষ। তারা বিশ্বাস করে, কেউ ভুল করা মানে সে খুব বিপদে পড়েছে। তার এখন সবার সাহায্য দরকার। সবাই তখন তাকে দুষতে আসে না, বরং সেই ভুলের মধ্যে শুনতে পায় ‘আমাকে বাঁচাও’ আর্তনাদ। শাওনের আত্মহত্যার মধ্যে আমাদের সময়ের তরুণদের আকুল আর্তনাদ ধ্বনিত হচ্ছে, শুনতে কি পাও?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com