ইরান যুদ্ধে জড়ালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপদ কেন বাড়তে পারে

মিডলইস্ট আইঃ দক্ষিণ কোরিয়া যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে যোগ দেয়, তাহলে তেহরান দেশটিকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে তেহরান হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ মারানদি।

লেবাননভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল মায়াদিনের ‘দ্য গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডঅফ’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় মারানদি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন করার প্রচেষ্টায় দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হলে ওই অঞ্চলে দেশটির সম্পদ ও স্থাপনা ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। ইরান সেগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে।

তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যবস্তু সব সময় সামরিক স্থাপনাই হবে, এমনটা না–ও হতে পারে। সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

মারানদি বলেন, ‘তাই ইরানের সামনে কোরীয়রা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইরান তাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম।’

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল পুনরায় অবাধ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়া সেখানে নিজেদের নৌবাহিনী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে। হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ।

এ বিষয়ে গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে বলা হয়, সামরিক সহায়তার বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ, যুদ্ধবহির্ভূত ভূমিকা এবং অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনার মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিউল ওই অঞ্চলে সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিবেচনায় থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পি-৮ পোসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান এবং রসদ সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি জাহাজ পাঠানো।

দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে, নৌবাহিনীর একটি বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ দলও এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, সামরিক সদস্যদের নতুন কোথাও মোতায়েনের যেকোনো সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে পর্যালোচনা করতে হবে। এরপর মন্ত্রিসভার একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে তা অনুমোদিত হতে হবে। সবশেষে জাতীয় পরিষদের অনুমোদন নিতে হবে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিভিন্ন প্রচেষ্টায় যোগ দিতে ওয়াশিংটন থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিউলের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং এই বিরোধকে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের বৃহত্তর টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

নিজেদের জ্বালানি সরবরাহের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত বছর দেশটির আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬১ শতাংশ এবং ন্যাফথার ৫৪ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এসেছে।

ন্যাফথা হলো পেট্রোলিয়াম শোধনের সময় পাওয়া একটি হালকা তরল হাইড্রোকার্বনজাত পদার্থ। এটি এক ধরনের জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এটি। বিশেষ করে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও অন্যান্য পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ন্যাফথা ব্যবহার হয়।

মারানদি বলেন, (দক্ষিণ কোরিয়ার) সম্ভাব্য এই সহায়তা যুদ্ধে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার মতো সামরিক সক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়ার খুব বেশি নেই বলেও তাঁর মত।

মারানদি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার একটি-দুটি জাহাজ কী-ই বা করতে পারবে? এটা নিছকই বোকামি।’ তবে দক্ষিণ কোরিয়া যদি সত্যি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে এর পরিণতি মারাত্মক হবে বলে সতর্ক করেছেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘ইরান শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সরঞ্জাম বা স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে না, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোও ইরান সহজেই ধ্বংস করতে সক্ষম।’

ওয়াশিংটনের চাপে দক্ষিণ কোরিয়া ২০১৯ সালে সোমালিয়া থেকে জলদস্যুবিরোধী নৌবাহিনীর একটি ইউনিটের মোতায়েন হরমুজ প্রণালির আশপাশের জলসীমা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্চ মাসে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ওই ইউনিটের দায়িত্বে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে হলে সংসদের অনুমোদন নিতে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ং থেকে একটি সামরিক শিবিরে মার্কিন সেনাবাহিনীর এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। ২১ আগস্ট ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ং থেকে একটি সামরিক শিবিরে মার্কিন সেনাবাহিনীর এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। ২১ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এএফপি