Tuesday, March 3, 2026
বেলুচিস্তান যে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে by ওসামা বিন জাভাইদ
বেলুচিস্তান যে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে by ওসামা বিন জাভাইদ
সম্প্রতি টানা ৪০ ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক হামলা চালিয়েছে নিষিদ্ধঘোষিত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। সংগঠনটি কয়েক দশক ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই করছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হিসাবে, এসব হামলায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক। ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। আর ১৪৫ জন বিদ্রোহী যোদ্ধা। শুধু শনিবারই মারা গেছে শতাধিক মানুষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি ছিল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অন্যতম বড় ও দুঃসাহসী হামলা। বিদ্রোহীদের দাবি, এই হামলায় তারা ৮৪ জন নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যা করেছে।
প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় এখনো বহু বছরের সংঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। পুলিশ একাডেমি, আদালত ভবন ও বাজার এলাকাজুড়ে সহিংসতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। এখানেও সরকারের বার্তা একই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। এক ডজনের বেশি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে। সাধারণ মানুষ পড়েছে গোলাগুলির মাঝখানে। শক্তি প্রদর্শনের যে চেষ্টা চলছে, তা দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই বাস্তব শক্তির চেয়ে বেশি দেখানোর প্রয়াস।
বেলুচিস্তানে হামলার জবাবে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া এখন অনেকটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহীদের নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ফিতনা আল হিন্দুস্তান। যার অর্থ ভারতের উপদ্রব। এ বিষয়ে অবশ্য এখনো নয়াদিল্লি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
‘বিদেশি হাত’তত্ত্ব এখন পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা বয়ানের মূল স্তম্ভ। প্রায় প্রতিটি হামলাকেই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে বেলুচদের স্থানীয় ও বাস্তব ক্ষোভের বিষয়গুলো আড়ালে চলে যায়। তার জায়গা নেয় সহজ ও দায় এড়ানোর একটি গল্প। অতীতেও সরকার দাবি করেছে, প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প নস্যাৎ করতে চায়।
এই বয়ানের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একটি পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করার বদলে দেশের অখণ্ডতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
২০১৬ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবকে পাকিস্তান এই ‘বিদেশি হাত’তত্ত্বের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখায়। কুলভূষণকে মৃত্যুদণ্ড দেয় একটি পাকিস্তানি আদালত। পাকিস্তান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল, যেখানে যাদবকে বেলুচিস্তানে হামলা সংগঠনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন।
কোয়েটার চায়ের দোকানগুলোতে রাজনৈতিক বঞ্চনা আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের গল্প শোনা যায়। মানুষের প্রশ্ন, বিপুল খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের দারিদ্র্য থেকেই যাচ্ছে?
৪৬ বিলিয়ন ডলারের চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের প্রতিশ্রুতি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আশীর্বাদ বলে মনে হয় না। বিশেষ করে গওয়াদার বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে তাদের সন্দেহ প্রবল। অনেকের ধারণা, এই প্রকল্পের সুফল পাবে বেইজিং ও ইসলামাবাদ। বেলুচের জেলে কিংবা রাখালদের ভাগ্যে তেমন কিছু জুটবে না।
বেলুচ বিদ্রোহীরা প্রায়ই খনিতে হামলা চালায়। অন্য প্রদেশ থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের হত্যা করে। বেলুচিস্তানের অনেক জায়গায় পরিস্থিতি ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মতো। কোনো নিয়ম নেই। প্রকৃত অর্থে কারও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও নেই।
আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড় বেলুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ইরানের রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। ভারতের শত্রুর শত্রুনীতি। আফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর একজন বলছিলেন, সেনাবাহিনী একজন যোদ্ধাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু একটি ক্ষোভকে হত্যা করতে পারে না। রাষ্ট্র তাদের সন্ত্রাসী মনে করে। অনেক স্থানীয় মানুষ তাদের নিজেদের সন্তান ও ভাই হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ১৮ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এই বিভাজনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সেই মানুষদেরই গ্রাস করছে, যাদের নিরাপত্তার জন্যই ছিল বিদ্রোহ।
বেলুচিস্তান বৈপরীত্যে ভরা এক ভূমি। এখানে রয়েছে গওয়াদারের মতো ঝকঝকে বন্দর। আবার আছে এমন দুর্গম উপত্যকা, যেখানে সংঘাত শুরু হলে প্রথমেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ছিদ্রপথের সীমান্ত বিদ্রোহীদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। পাকিস্তানের কাছে এই প্রদেশ তাই এক স্থায়ী উদ্বেগের উৎস।
এই সংঘাতের মানবিক মূল্য ছড়িয়ে আছে ভূমি ও স্মৃতিতে। ২০১৩ সালে হাজারা টাউনে হামলার পর এক বাসিন্দা বলেছিলেন, আহত ব্যক্তিরা এখানে–ওখানে পড়ে ছিল। কার কী পরিচয়, তা বোঝা যাচ্ছিল না। ২০১৬ সালে কোয়েটা পুলিশ একাডেমিতে হামলার পর এক ক্যাডেটের প্রশ্ন ছিল, ‘কেন আমাদের অস্ত্র ছাড়া ভেতরে থাকতে বলা হয়েছিল?’
এই কথাগুলো দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও ভেঙে পড়া সামাজিক চুক্তির সাক্ষ্য দেয়। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে জনসমর্থনের দাবি অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষার মতো শোনায়।
বেলুচিস্তানের এক সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মতে, স্থানীয় প্রশাসনের সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করতে চাননি। বেলুচিস্তান প্রদেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপী। ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবা অনেকের কাছে পৌঁছায় না। আর নিরাপত্তা তো অনেকের কাছেই বিলাসিতা।
সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান পাকিস্তানের কঠোর শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা দেখিয়েছে। আকাশে ড্রোন আর মাটিতে টহলের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি উচ্ছেদ করা হয়েছে।
প্রতিটি বড় হামলার পর জাতীয় কর্মপরিকল্পনা আবার নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকার নানা অঙ্গীকার করে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই অঙ্গীকারের গতি থেমে যায়। নিরাপত্তা অভিযান চললেও সহিংসতা পুরোপুরি থামে না। অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, কিন্তু বিদ্রোহীদের প্রচারণা থেকে নতুন সদস্য আসার গতি তাতে খুব একটা কমে না।
আয়তনে জার্মানির চেয়েও বড় বেলুচিস্তান আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ইরানের রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। ভারতের শত্রুর শত্রুনীতি। আফগানিস্তানের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই বাইরের চাপ সামলানো। একই সঙ্গে ভেতরের ক্ষতগুলো সারানো, যা এই প্রদেশকে এতটা অস্থির করে রেখেছে। শেষ ৪৮ ঘণ্টা আবারও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আগের মতোই ইসলামাবাদের ক্ষমতাকেন্দ্র ও গণমাধ্যম বেলুচিস্তানকে ভুলে যাবে। দূর থেকে বিশ্লেষণ চলবে। কিন্তু এই নীরবতা কি স্থায়ী শান্তির দিকে যাবে, নাকি পরবর্তী ঝড়ের আগের বিরতি হবে, তা নির্ভর করবে পরের অধ্যায় কে লিখছে, তার ওপর।
বেলুচিস্তানের প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও কার্যকর আঞ্চলিক কূটনীতি। তবেই হয়তো এই প্রদেশ চিরস্থায়ী সংঘাতের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।
* ওসামা বিন জাভাইদ, কাতারের দোহাভিত্তিক সাংবাদিক এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ। কোয়েটা, বেলুচিস্তান, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি |
About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1404)
-
▼
March
(202)
-
▼
Mar 03
(7)
- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ধাক্কা খেল দুবাইয়ের বিল...
- যে কারণে ইরানের একজন খামেনি লাগবেই by মোহাম্মদ রেজ...
- বেলুচিস্তান যে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে by ওসামা বিন জ...
- ইসরায়েলিরা যুদ্ধের বিষাক্ত নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে by ...
- ট্রাম্প কি খামেনির আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনীকে খাটো ...
- যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ: এখন পর্...
- স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কি ইরানে হামলা করলেন ট...
-
▼
Mar 03
(7)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment