হিমালয়ের উজান-ভাটির রাজনীতি

নেপালের হড়পা বানঃ হিমালয় পর্বতমালা কেবল এশিয়ার জলবায়ু ও প্রধান নদীগুলোর উৎস নয়, এটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ভৌগোলিক সীমান্ত। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী হড়পা বান ও হিমবাহ ধস কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা হিমালয় অঞ্চলের তিনটি প্রধান অংশীদার—চীন (উজান), নেপাল (মধ্যবর্তী) ও ভারতের (ভাটি) মধ্যকার জটিল পানি-কূটনীতি ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

পানির প্রবাহ, স্যাটেলাইট তথ্য আদান-প্রদান এবং বাঁধ নির্মাণের মেগা প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক কৌশলে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে উজান বা আপস্ট্রিম দেশ চীন। তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলো (যেমন—ত্রিশূলি, কোশি, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র) নেপাল ও ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী আন্তঃসীমান্ত নদীতে নদীর পানির স্তর, হিমবাহের অবস্থা ও বন্যার আগাম সতর্কবার্তা ভাটির দেশকে জানানো জরুরি। কিন্তু কাঠমান্ডু ও দিল্লির দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ, বেইজিং সময়মতো হাইড্রোলজিক্যাল বা স্যাটেলাইট ডাটা শেয়ার করে না।

এ ছাড়া চীন তাদের তিব্বত সীমান্তে কঠোর তথ্য সেন্সরশিপ বজায় রাখে। এই তথ্যের অপ্রতুলতা নেপালের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা তৈরি করা অসম্ভব করে তোলে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ও নদী-সংক্রান্ত তথ্য গোপন বা নিয়ন্ত্রণ করা চীনের একটি কৌশলগত হাইড্রো-লিভারেজ বা পানি-কূটনীতির অস্ত্র, যা দিয়ে ভাটির দেশগুলোকে চাপে রাখা যায়।

নেপালের প্রাকৃতিক জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতি—ভারত ও চীন—তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে চীন নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোয় বিশাল জলবিদ্যুৎ ও টানেল প্রকল্প গড়ে তুলছে।

এদিকে ভারত নেপালের শত শত মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং নীতি গ্রহণ করেছে যে, যেসব প্রকল্পে চীনা ঠিকাদার বা অর্থায়ন থাকবে, সেই বিদ্যুৎ ভারত ক্রয় করবে না।

দুই পরাশক্তির এই অবকাঠামোগত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে নেপালের সংবেদনশীল হিমালয় অঞ্চলে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করেই একের পর এক বাঁধ ও টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই অতি-অবকাঠামো নির্মাণই পাহাড়ি অঞ্চলকে আরও বেশি ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে ফেলছে।

যে কোনো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি দৃশ্যমান মাধ্যমে পরিণত হয়। ভারত সাধারণত নেপালের দুর্যোগে প্রথম সাড়া দানকারী দেশ হিসেবে কাজ করে। বিমান, উদ্ধারকারী দল ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে দিল্লি নেপালি জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের সফট পাওয়ার জোরদার করতে চায়।

এদিকে চীন তাদের প্রকল্প ও অবকাঠামো রক্ষার অজুহাতে উদ্ধারকারী ও কারিগরি টিম পাঠায়। বেইজিং মূলত কাঠমান্ডুর সরকারি ও কৌশলগত পরিকাঠামোতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দেয়।

নেপালে সংঘটিত যে কোনো বন্যা বা হিমবাহ ধস ভারতের জন্যও একটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা। নেপালের কোশি ও গণ্ডক অববাহিকার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা অতিরিক্ত পানি একযোগে নামলে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা রাজ্যগুলোয় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নেপাল থেকে ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহের যে আঞ্চলিক গ্রিড গড়ে উঠছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ট্রানজিট নীতি হুমকির মুখে পড়ে।

হিমালয় অঞ্চলে নেপালের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো ভারত ও চীনের পানি-কূটনীতি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে স্যান্ডউইচ বা বাফার স্টেট হিসেবে আটকা পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বরফ ধস ও বন্যার মাত্রা বাড়ছে, তখন ডাটা গোপনীয়তা ও মেগা প্রকল্পের প্রতিযোগিতা পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি ভূরাজনৈতিক টাইমবোমে পরিণত হচ্ছে।

হিমালয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং মানবিক ট্র্যাজেডি এড়াতে ভারত, চীন ও নেপালের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় ‘হিমালয় নদী কমিশন’ বা যৌথ পানি-ব্যবস্থাপনা চুক্তি এখন সময়ের দাবি।

হিমালয়ের উজান-ভাটির রাজনীতি
হিমালয়ের উজান-ভাটির রাজনীতি