Saturday, June 13, 2026
মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী by সীমান্ত আকরাম
মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী by সীমান্ত আকরাম
তার পিতা আবদুল হালিম জামালী নাট্যকার, নাট্য প্রযোজক এবং কুশীলব ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেছেন। উল্লেখ্য, তার পিতার নাট্যচর্চা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার অংশগ্রহণ, মুজাহিদীকে যথাক্রমে সাহিত্যচর্চা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে বলেই আমাদের মনে হয়। বহুরৈখিক সাহিত্য আঙ্গিকের প্রতি আকর্ষণবোধ আল মুজাহিদী অন্তঃশীলভাবে তার পৈতৃক সাহিত্যচর্চাসূত্রে লাভ করে থাকতে পারেন। তার পিতৃরক্তেই শুধু সাহিত্যচর্চা ছিল না; তার মা সাখিনা খানও গীত-রচয়িতা এবং সমাজসেবিকা ছিলেন। তার মা নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার চর্চাই শুধু করেননি; সে সমস্ত জ্ঞানের প্রচারও তিনি করেছেন। আল মুজাহিদী তার শিল্পবোধের নৈতিক পরিশীলন তার মাতৃরক্তসূত্রে জন্মগতভাবেই লাভ করেছেন বলে মনে করা যায়।
আল মুজাহিদী ষাটের দশকের স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ছয়বার কারাবরণ করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকই শুধু নন; তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্বও। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাঙালির গেরিলা যুদ্ধতত্ত্বের তিনি একজন ব্যাখ্যাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিকতার ব্যাখ্যাকারও তিনি।
কবি আল মুজাহিদীর সাহিত্যশৈলী মূলত ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তার লেখার ভাষা যেমন সংবেদনশীল, তেমনই তার ভাবনার জগৎ অত্যন্ত গভীর ও বিশ্বজনীন। সমাজবিজ্ঞানে তার ভালো দখল থাকার কারণে নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় কাব্যের শিল্পনৈপুণ্যের সঙ্গে সাজাতে সমর্থ হয়েছেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান তার কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘কবি আল মুজাহিদী প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকা বোধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’। নামটিতে বোঝা যায় গ্রিক জীবনদর্শন তাকে কত প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি চাঁদকে ছুঁয়ে দেখেছেন, নক্ষত্রকে স্পর্শ করেছেন এবং নীহারিকাপুঞ্জকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কখনো মৃত্তিকাকে ভুলতে পারেননি।’
মৃত্তিকাই কবির বোধের জায়গায় আশ্রিত ও ভাবনায় প্রোথিত। তিনি একটি কবিতায় বলেছিলেন—
‘আমরা পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষের নীচে সান্ধ্য মানব-মানবী।’
এ পঙ্ক্তিতে প্রকৃতি, সময় এবং অস্তিত্বের একটি গভীর কাব্যিক ছোঁয়া রয়েছে। ‘পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষ’ যেন আমাদের আদি উৎস, প্রকৃতি এবং ইতিহাসের প্রতীক। আর ‘সান্ধ্য মানব-মানবী’ বলতে হয়তো গোধূলি লগ্নে প্রকৃতির মাঝে আশ্রিত, চিন্তাশীল বা দার্শনিক মানবসত্তাকে বোঝানো হয়েছে।
অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—
‘কৃষ্ণ গূঢ় অন্ধকারে জন্মাক মানুষ
পবিত্র আগুন
দেখো, পৃথিবী কেমন উর্বর ধ্বংসহীন
দেখো মৃত্তিকার ভালোবাসা কেমন প্রোজ্জ্বল,
ধ্বংসহীন-নারী
তুমি চলে এসো স্বর্ণমৃত্তিকার দেশে দ্রাবিড় বাংলায়, নারী।
অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—
‘পৃথিবীর জনপদ-জোর আমার অস্তিত্ব’
অপর একটি কবিতায় বলেছেন—
‘প্রাণবন্ত করে তোল পৃথিবীর
প্রত্নবিম্ব : পোড়া বাড়ি।’
আদিম মৃত্তিকা দিয়ে এ পৃথিবী গড়া হয়েছিল গৌড় নগরীর সোনালি তোরণ এবং সভ্যতার চিলেকোঠা। তিনি কখনো নক্ষত্রের স্তূপে বসবাস করার কথা বললেও চূড়ান্তভাবে বলেছেন যে, মৃত্তিকায় ফিরে আসেন। কবি তার কাব্যগ্রন্থ ‘মৃত্তিকা, অতি মৃত্তিকা’, আর এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার নাম সুমৃত্তিকা। কবিতাটির শুরুতে তিনি বলেছেন—
‘সুমৃত্তিকা, জানো পৃথিবীর সব থেকে বেশি দরকার
সুশীতল হাওয়ার
তুমি খুলে দেবে খিল সেই ঝরোকার?’
এ কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতায় মৃত্তিকাকে আবেদন জানিয়েছেন যেন সে চিরকালীন সংগীতের স্তবক উপহার দেয়। কেননা, সে হচ্ছে গোটা মানবজাতির অস্তিত্বের স্পন্দন। কবি তার শেষ আবেদন জানিয়েছেন—
‘তুমি গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব স্পন্দন
আমি আজ তোমার কাছেই ফিরে আসি
পদ্মা-মেঘনা-যমুনাবিধৌত পলল ভূমিতে
তুমিই আমার
আমি তোমার অখণ্ড গতির
মহাকাব্য।’
রোমান্টিক আত্মনিমজ্জন, তীব্র সমাজচেতনা, গ্রিক মিথোলজির ব্যবহার এবং মাটির কাছাকাছি থাকা—এই চার উপাদানের মিশ্রণই হলো আল মুজাহিদীর নিজস্ব লিখনশৈলী। আল মুজাহিদীর সাহিত্যশৈলীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে—
ক. গ্রিক জীবনদর্শন ও মৃত্তিকাবোধ : আল মুজাহিদীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ নামটিতেই প্রাচীন গ্রিক জীবন-দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট। তিনি তার কবিতায় মহাজাগতিক উপাদান (চাঁদ, নক্ষত্র, নীহারিকাপুঞ্জ) ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও সবসময় নিজের মাটির কাছে ফিরে এসেছেন। আদিম মৃত্তিকা বা আদি মাটি দিয়ে গড়া এই পৃথিবী এবং মানবসভ্যতার আদি রূপকে তিনি তার কবিতার মূল উপজীব্য করেছেন।
খ. লোকায়ত ঐতিহ্য ও স্বভূমি-চেতনা : তিনি মূলত স্বভূমি, স্বদেশ এবং সমতটের লোকায়ত ঐতিহ্যের বন্দনায় আত্মমগ্ন এক কবি। বাংলার চিরন্তন লোকজ রূপকল্প, লোকগাথা এবং গ্রামীণ জীবনধারা তার কবিতার ছত্রে ছত্রে নতুনভাবে নান্দনিকতায় রূপ পেয়েছে।
গ. সমকালীন বাস্তবতা ও বিশ্ববীক্ষা : আল মুজাহিদী একাধারে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সমাজসচেতন কবি। তাই তার লেখার শৈলীতে সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং সমাজবিকাশের রূপরেখা ফুটে ওঠে। ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’র মতো কাব্যে তিনি কেবল বাংলার কবি থাকেননি, বরং বিশ্বমানবতার বিপর্যয় ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
ঘ. ভাষাভঙ্গি এবং অন্তর্লোকের অনুভূতি : তার কবিতার ভাষা সাধারণত সহজ, সাবলীল এবং সংবেদনশীল। তিনি মানুষের অন্তর্লোকের অনুভূতি, আত্মঅনুসন্ধান, প্রেম, ব্যক্তিগত মনস্তাপ এবং তীব্র সামাজিক প্রতিবাদকে একই সুতোয় বাঁধতে পারতেন।
কবি আল মুজাহিদীর কবিতায় সময় ও কাল কেবল ঘড়ির কাঁটার পরিমাপ নয়; বরং তা ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মানবসভ্যতার আদি-অন্তের এক প্রগাঢ় প্রকাশ। তিনি সময়কে দেখেছেন একজন ইতিহাস-সচেতন রাজনৈতিক যোদ্ধা এবং বিশ্বনাগরিকের দৃষ্টিতে। তার কবিতায় সময় ও কালের বহুমাত্রিক রূপ আমরা দেখতে পাই—
ক. ষাটের দশকের উত্তাল কাল ও রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত : কবি আল মুজাহিদী নিজেই তার কবিতার একটি সময়কালকে ‘ফেরারি সময়’ বলে উল্লেখ করেছেন। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, রাজবন্দি হওয়া এবং রাজনৈতিক ফেরারি জীবনের অস্থিরতা তার কবিতায় তীব্রভাবে মূর্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার কাব্যিক সময়ের একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধ, হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ এবং স্বাধীনতার রক্তিম লগ্নকে তিনি তার কবিতায় যন্ত্রণাদগ্ধ কিন্তু আশাবাদী এক কালখণ্ড হিসেবে ধারণ করেছেন।
খ. ইতিহাস ও সভ্যতার কালানুক্রম : তিনি বর্তমান সময়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। গ্রিক মিথোলজি ও বাংলার প্রাচীন লোকঐতিহ্যের কালকে তিনি বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার কবিতায় ‘পিতৃপুরুষের ফসিল’ বা ‘শতাব্দীর ঝরাপাতা’র মতো শব্দবন্ধের মাধ্যমে অতীতকাল বর্তমানের সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়। তিনি সভ্যতার উত্থান ও পতনের বিশাল কালখণ্ডকে কবিতার ফ্রেমে বন্দি করতে ভালোবাসেন।
গ. বৈশ্বিক সময় ও যুদ্ধবিদ্ধ কাল : কবি কেবল নিজ দেশের গণ্ডিতে আটকে থাকেননি; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমকালীন রক্তঝরা সংঘাত ও যুদ্ধবিদ্ধ সময়কে তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেছেন। ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাব্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অভিশপ্ত কাল এবং তার পরবর্তী বৈশ্বিক ক্ষতকে তিনি মানব ইতিহাসের এক অন্ধকারতম সময় হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
ঘ. আদিম বা শাশ্বত কাল : আল মুজাহিদী প্রায়ই মানুষকে মহাবিশ্বের প্রথম সৃষ্টিলগ্নে নিয়ে যান। কবি বর্তমানের যান্ত্রিক কাল ছেড়ে মানুষকে এক আদিম, শাশ্বত ও পবিত্র প্রাকৃতিক সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করান। মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবন, প্রতিটি মুহূর্তের নিঃশ্বাস এবং তার বিপরীতে প্রকৃতির অনন্তকাল ধরে বয়ে চলার দ্বন্দ্ব তার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
ঙ. ভবিষ্যৎ ও আশাবাদের কাল : ধ্বংস, যুদ্ধ আর ক্ষয়িষ্ণু সময়ের বিবরণ দিলেও আল মুজাহিদীর কালচেতনা শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্ধকার সময়ের বুক চিরে একদিন নতুন ভোর আসবে, যা পৃথিবীকে আবার উর্বর ও বাসযোগ্য করে তুলবে।
বলা যায়, আল মুজাহিদীর কবিতায় সময় ও কাল হলো এক চিরপ্রবাহমান নদীর মতো, যা একাধারে অতীতে আদিম মাটির কাছে ফিরে যায়, বর্তমানে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে দগ্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়।
কবি আল মুজাহিদীর কালজয়ী দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ এবং ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’-র কবিতা ও পঙ্ক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার ‘সময় ও কালচেতনা’ আরো গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়। তিনি ‘হেমলকের পেয়ালা’ (১৯৮৪) কাব্যগ্রন্থে সময়কে দেখেছেন এক আদিম, মহাজাগতিক এবং চিরন্তন প্রেক্ষাপটে। গ্রিক দর্শনে সক্রেটিসের হেমলক পানের অনুষঙ্গকে তিনি মানুষের শাশ্বত সত্য অনুসন্ধান এবং সময়ের নির্মমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
‘আমরা যেন পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আদিম মানব-মানবী,
যেখানে আধুনিক সভ্যতার কৃত্রিম ঘড়ি এখনো এসে পৌঁছায়নি।’
এখানে ‘সময়’ কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের এক অবিচ্ছেদ্য শাশ্বত বন্ধন। কবি ক্ষণস্থায়ী বর্তমানের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এক অনন্ত ও আদিম সময়ের আশ্রয় খোঁজেন।
‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাব্যগ্রন্থে আল মুজাহিদীর কালচেতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। এখানে সময় কোনো শান্ত বা আদিম রূপ নয়, বরং তা মানবইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এবং রক্তক্ষয়ী এক আধুনিক ক্রান্তিকাল। ১৯৪৫ সালের পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের সময়কালকে তিনি কবিতার ফ্রেমে জীবন্ত করেছেন।
‘যে সময়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছিল আগুনের বৃষ্টি,
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকির সমস্ত সৃষ্টি।’
এখানে কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে বিজ্ঞানের আগ্রাসন মানুষের স্বাভাবিক ‘সময়’ বা জীবনকে এক নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এখানে তিনি সমকালীন সময়ের যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে এক তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।
আল মুজাহিদী একাধারে ইতিহাসের প্রাচীন পাতায় এবং সমকালের জ্বলন্ত বাস্তবতায়—উভয় কালেই সমানভাবে বিচরণ করতে পারতেন। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ এবং ‘যুদ্ধ নাস্তি’ কাব্যগ্রন্থে তার ‘সময় ও কালচেতনা’ আরো ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ কাব্যে কবি সময়কে পরিমাপ করেছেন বাংলার ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং পোড়ামাটির শিল্পের (টেরাকোটা) দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্য দিয়ে। ‘ধ্রুপদ’ (শাস্ত্রীয় বা ক্ল্যাসিক) এবং ‘টেরাকোটা’ (লোকজ শিল্প)—এই দুইয়ের মিলনে তিনি এমন এক কালখণ্ড তৈরি করেছেন, যা হাজার বছরের প্রাচীন।
‘টেরাকোটার অবয়বে জমা হয়ে আছে শতাব্দীর ধুলো,
ধ্রুপদি সুরে জেগে ওঠে আমাদের অতীত দিনগুলো।’
এখানে সময় স্থবির নয়। পোড়ামাটির ফলকে যেভাবে ইতিহাস হাজার বছর ধরে জীবন্ত থাকে, কবি তার কবিতায় বাংলার লোকজীবন ও ঐতিহ্যকে সেই চিরন্তন কালের রূপ দিতে চেয়েছেন।
‘যুদ্ধ নাস্তি’ কাব্যে আল মুজাহিদীর সময়চেতনা ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত। সমকালীন যুদ্ধবিদ্ধ অস্থির কালকে পেছনে ফেলে তিনি এক শান্তিময় ও যুদ্ধহীন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কালখণ্ড বিনির্মাণ করতে চান। কবি হিংসা ও হানাহানির সময়কাল পার হয়ে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা করেন। তিনি লিখেছেন—
‘অস্ত্রের গর্জন থেমে যাক, মুছে যাক রক্তের দাগ,
পৃথিবীতে আসুক এবার এক শান্তির অনুরাগ।’
এখানে কবি বর্তমানের সংঘাতময় সময়কে অস্বীকার করে এক মানবিক ও অহিংস ভবিষ্যৎ কালের আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই সময়চেতনা অত্যন্ত আশাবাদী এবং বিশ্বজনীন।
কবি আল মুজাহিদী বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রাচীন গ্রিক জীবনদর্শন, ইতিহাসচেতনা এবং মাটির গভীর মমত্ববোধকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি শুধু মাটির গভীর অনুরাগীই নন, বরং বাংলা সাহিত্যে একজন অন্যতম প্রধান কাল ও সমাজসচেতন বিশ্ববীক্ষণের কবি। তিনি তার সুদীর্ঘ কাব্যযাত্রায় সময়, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিশ্বরাজনীতির সমকালীন প্রেক্ষাপটকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কবিতায় ধারণ করেছেন।
বাংলা কবিতার প্রাগ্রসর পাঠকদের কাছে আল মুজাহিদীর কবিতা আনন্দের পাঠ হয়ে ওঠে। কবিতার ঐতিহ্যকে অনন্যপূর্বতায় সংস্থাপিত করার এক সুদক্ষ কারুকার তিনি। কবিতায় তার স্বভূমি-স্বদেশ প্রবলভাবে মূর্ত; মানবসম্প্রীতির সমুজ্জ্বল সম্ভাষে স্ফূর্ত। তার কবিতা সহজ-সম্ভোগে অধিকার করে নেয় পাঠকের হৃদয়। শিল্পে পুরাণ, মৃত্তিকা ও জীবনের মর্মভূমে প্রোথিত শেকড়সন্ধানী পুরুষ। প্রাতিস্বিক চেতনাভাষ্যে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে তার কবিতার প্রতিটি ছত্র। ধ্রুপদি ব্যঞ্জনা এবং ভাষার প্রগাঢ় স্বকীয়তায় প্রদীপ্ত আল মুজাহিদীর কবিতাপৃথিবী।

About: Kutubdia News
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1402)
-
▼
June
(267)
-
▼
Jun 13
(15)
- আরব শাসকেরা তলেতলে যেভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত কর...
- ইরানের সংবাদমাধ্যমে চুক্তির ফাঁস হওয়া শর্তগুলোকে ‘...
- ট্রাম্পের সমর্থক ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের বড় অংশ...
- মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত টাকা, চাঁদে ২০০ বার ...
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির সম্ভাবনার মধ্যেই হরম...
- সমুদ্রের মাঝে রহস্যময় ‘শীতল পিণ্ড’, বিজ্ঞানীরা হতবাক
- মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী by সীমান্ত আকরাম
- ইরান ইস্যুতে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা ট্রাম্পের
- হোয়াটসঅ্যাপ আসার আগে মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য অ্য...
- ২০২৬ সালের সবচেয়ে নিরাপদ ৫ দেশ
- কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি তরুণ নিহত
- পরিচয় থাকার পরও ‘বেওয়ারিশ’ দুলালী, রেখে গেলেন অনেক...
- ইরানি অভিবাসীদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো...
- তরুণদের ফ্যাশন জগতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ক্ল...
- ‘অন্ধকারে’ নেতানিয়াহু, জানতেন না কিছুই
-
▼
Jun 13
(15)
-
▼
June
(267)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment