Friday, October 3, 2025
দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা by মো. সাহাবুল হক
এ সম্মেলনে বিশ্বের ২০টি দেশের নেতা ও ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরা অংশগ্রহণ করেন। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি, মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
এসসিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০১ সালে। এর মূল লক্ষ্য ছিল সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ফোরামে পরিণত হয়েছে। এবারের সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল ‘সব পক্ষের ঐকমত্য গঠন ও সহযোগিতার গতিশীলতা সৃষ্টি করা’। এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন ও রাশিয়া নিজেদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমেরিকার শুল্কনীতি এবং অন্যদিকে এক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁর ভাষণে বলেন, ‘অস্থিরতার এই সময়ে বৈশ্বিক শাসন এক নতুন মোড়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অবশ্যই আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।’ তাঁর এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার প্রতি একটি পরোক্ষ চ্যালেঞ্জ ছিল।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, এসসিও ইউরেশিয়ায় একটি নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে। এই নতুন ব্যবস্থা পুরোনো ইউরোকেন্দ্রিক মডেলগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি এই সম্মেলনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তিনি পুতিনকে আলিঙ্গন করেন এবং সি চিন পিংয়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এটি দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তি এক মঞ্চে একত্র হতে পারে।
চীন, রাশিয়া ও অন্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলো একযোগে আমেরিকার একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। চীন এই সম্মেলনের মাধ্যমে এক নতুন বৈশ্বিক নেতৃত্বে নিজেদের শক্তিশালী ভূমিকাকে তুলে ধরেছে। এই সম্মেলন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এটি এমন একটি সময় ঘটেছে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অস্থিরতা ও উত্তেজনা রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।
একদিকে ভারত চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান ও চীন বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে, অন্যদিকে ভারত চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টায় রয়েছে। তবে এই সমস্যা সীমান্ত সমস্যার বাইরে গিয়ে আরও অনেক গভীরে বিস্তৃত এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে শুধু সীমান্তের প্রশ্নই প্রধান নয়। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এ ব্যাপারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এসসিও সম্মেলন একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে। এই সম্মেলনে চীন তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কগুলোকে আরও দৃঢ় করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। চীনের এই কৌশলের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন ভূরাজনৈতিক ধারণার সূচনা হতে পারে।
দেখা যাচ্ছে, চীন তার প্রভাব বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং এটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে, বিশেষ করে যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের চাপ রয়েছে।
শেষে বলা যায়, সাংহাই সম্মেলন চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত, যা শুধু চীন-ভারত বা চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপরে নির্ভরশীল নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর একটি কৌশলগত কাঠামো তৈরির একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়।
আর এটি যদি হয় তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে। এতে এ এলাকার প্রতিবেশী দেশগুলো মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলমান উত্তেজনার পরিবর্তে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই মুহূর্তে বড় প্রয়োজন।
এই সম্মেলন থেকে এটি স্পষ্ট যে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন একটি ধারা তৈরি হচ্ছে, যেখানে বহুপক্ষীয়তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তবে এটি অঞ্চলের শান্তি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে অনেকের প্রত্যাশা। তবে সেই পথে হাঁটতে গেলে প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তযোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। বহুপক্ষীয় সম্পর্কে রূপান্তরিত করতে হবে।
* ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| কথা বলছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে), ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (মাঝে) এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং (ডানে)। চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে। ছবি: রয়টার্স |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2357)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...