যে প্রকল্পে বদলে গেল ওদের জীবন by রোকনুজ্জামান পিয়াস

নরসিংদীর সোহেল মিয়া। সৌদি আরবে এসি লাগাতে গিয়ে উঁচু বিল্ডিং থেকে পড়ে মারাত্মক আহত হন। কিন্তু কোম্পানি তার চিকিৎসা না করিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। দেশে ফিরে তিনি রেইজ প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর প্রকল্প থেকে নগদ প্রণোদনা ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বীমা দাবির ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি পোলট্র্রি ফার্ম করেন। ওই ফার্ম থেকে বর্তমানে তার মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জের সুলতানা সংসারে সচ্ছলতা আনতে ২০১৪ সালে লেবাননে যান। কিন্তু ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হয়নি। ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। দেশে ফিরে গৃহকর্মীর কাজ করেন। এই অবস্থায় রেইজ প্রকল্পের কথা জানতে পারেন। সেখান থেকে কাউন্সেলিং নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। প্রকল্প থেকে নগদ প্রণোদনাও দেয়া হয়। ওই টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন এবং কিছু কাপড় কিনে নিজ গ্রামে চালু করেন ছোট্ট একটি টেইলার্স। এখন তার মাসিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। শুধু সোহেল মিয়া বা সুলতানা নয়, রেইজ (রিকভারি অ্যান্ড এডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট) প্রকল্পের আর্থিক, মানসিক ও টেকনিক্যাল সহায়তায় নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছেন স্বর্বস্ব হারানো ও কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রায় দুই লাখ কর্মী। এরমধ্যে প্রায় দেড় লাখ কর্মীর স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া নির্ধারিত বাজেটে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মীকে সেবা দেয়ার পরও অর্থ উদ্বৃত্ত রয়েছে। এ অর্থে অতিরিক্ত আরও অর্ধলক্ষাধিক কর্মীকে প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। সফল এ প্রকল্পটিকে ইতিমধ্যে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে মনে করা হচ্ছে। স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়েছে। যা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

জানা যায়, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ কর্মী চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত আসেন। এসব প্রত্যাগত কর্মী তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব-অনটনে নিদারুণ কষ্টে দিনানিপাত করছিলেন। এ সময় তাদের কর্মক্ষম করে তোলার জন্য গ্রহণ করা হয় বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় রিইন্টিগ্রেশন কর্মসূচি। নানা প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যাত্রা শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিইন্টিগ্রেশন প্রকল্পের। বস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডকে।
২০২৩ সালে ৩০শে জুলাই মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মেয়াদ ধরা হয় ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে ৪২৭ কেটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকার এ প্রকল্পে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে শেষমেশ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫১৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২ কোটি ৩০ লাখ ৩৫০০০ টাকা সরকারের তহবিল থেকে এবং অবশিষ্ট ৫১৬ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংক সহজশর্তে ঋণ দেয়। প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তা, আত্মকর্মসংস্থান, পুনরায় বিদেশ গমন এবং চাকরি প্রাপ্তিতে প্রকল্প থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। সারা দেশে বিদেশফেরত কর্মীদের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি ২৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে করে কর্মীরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে  হতে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তাসহ তাদের কাঙ্খিত সেবা সহজেই পায়। একটি রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে এসব সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া নিবন্ধিত সেবাগ্রহীতা কর্মী ও তার পরিবারের সদস্যরা স্বনামধন্য হাসপাতাল থেকে স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাচ্ছেন।

সূত্রমতে, ৩৫টি জেলায় স্থাপিত ‘প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার’-এর মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং ও পরামর্শ নিয়ে প্রত্যাগত অসহায় অভিবাসী কর্মীরা নানাখাতে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্রোসারি শপ, কাপড়ের ব্যবসা, ড্রাইভিং, পোলট্রি, ডেইরি, ছাগল ও গরু পালন, বিফ ক্যাটারিং, ফলের বাগান, বাণিজ্যিক কৃষি ও মৎস্য চাষ ইত্যাদি। এছাড়া মেশন, টেইলারিং অ্যান্ড ড্রেস মেকিং, ইলেকট্রিশিয়ান, কন্সট্রাকশন, কার্পেন্টার, পেইন্টার, ওয়েলডিং, গোল্ড স্মিথ, রড বাইন্ডিং, মোবাইল সার্ভিসিং, টাইলস ফিটিং, ইন্ডাস্ট্র্রিয়াল, অটো মেকানিক, কাটিং মাস্টার,  প্লাম্বার, সেলুন, ইলেকট্রিক, ফার্নিচার, কনফেকশনারি, স্যানিটারি, গার্মেন্টস পণ্য, ফর্মেসি, হার্ডওয়্যার, জুতা, অটো পার্টস, থাই গ্লাস, রাইস মিল, মিষ্টি, স্টেশনারি, হোটেল,  চায়ের দোকান, ভেজিটবল, ফলসহ নানা ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। শুধু ব্যবসা নয়, প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশিসংখ্যক কর্মী। প্রকল্প থেকে উপকারভোগীদের অনেকে ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষক, বাবুর্চি, ইমাম, মুয়াজ্জিন, শেফ, গ্রাম্য চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ারসহ নানা পেশা বা কাজে যুক্ত হয়েছেন। তথ্য বলছে, রেইজ প্রকল্পটিকে বিশ্বব্যাংক অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল হিসেবে দেখছে। তাদের নিজস্ব সমীক্ষায় এটিকে সবচেয়ে ভালো প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি এ প্রকল্পকে বিশ্বব্যাংকের মর্যাদাপূর্ণ ‘বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এ ভূষিত করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক, ড. এটিএম মাহাবুব-উল করিম বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ বেকার কর্মীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া অতিরিক্ত ৫৩০০০ ফেরত প্রবাসীকে উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আরও ২০ হাজার জনকে দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। ৩৫টি প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার স্থাপন করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সারা দেশে কর্মীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পেরেছি। ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া এসব কর্মীরা এখন স্বাবলম্বী হয়ে পরিবার নিয়ে ভালো আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র প্রকল্প হিসেবে ‘রেইজ প্রকল্প’ বিশ্বব্যাংকের এওয়ার্ড পেয়েছে। যা জাতি হিসেবে গর্বের। প্রকল্পটি অব্যাহত থাকলে আরও বিদেশফেরত কর্মীরা জীবিকা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত হবে লাখও কর্মী।

mzamin