Sunday, February 10, 2019
‘নূরজাহান’ : সময়কে ছাড়িয়ে যায় যে গল্প by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
‘নূরজাহান’ : সময়কে ছাড়িয়ে যায় যে গল্প by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সিলেটের
মৌলভীবাজারের ছাতকছড়ায় একটি মেয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। সেই ‘অপরাধে’ তাকে
শাস্তি দিয়ে ফতোয়া দিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম। মেয়েটিকে বুক পর্যন্ত
মাটিতে পুঁতে পাথর ছোড়া হলো। পাথর তার মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করে দিল, কিন্তু
তার থেকে বেশি ক্ষতবিক্ষত করল তার আত্মসম্মানবোধকে, মানুষ হিসেবে তার
পরিচিতিকে এবং সমাজ, মানুষ ও ধর্মের ওপর তার বিশ্বাসকে। এক বিশাল অবিশ্বাস
এবং অপমানের ভার সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করল।
আমাদের সকলের মতো ইমদাদুল হক মিলনের মনেও ঘটনাটি গভীর দাগ কাটল। মেয়েটির জন্য তাঁর গভীর মমতা হলো; যে ইমামের ফতোয়া মেয়েটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল, তার প্রতি তাঁর ঘৃণা জাগল। কিন্তু মেয়েটিকে তাঁর সহানুভূতি, তাঁর ভালোবাসা যে জানাবেন, তার কোনো উপায় নেই। মসজিদের ওই ইমামকে তিনি হয়তো তাঁর ঘৃণার কথা জানাতে পারতেন, কিন্তু তাতে তার কোনো বিকার হতো, তার বিবেক আর অপরাধবোধ জাগত—তেমন সম্ভাবনা ছিল না। মিলন সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি একটি উপন্যাসে মেয়েটিকে আঁকবেন, পাঠকের মনে চিরকালের জন্য একটা জায়গা তাকে করে দেবেন। আর নিষ্ঠুর ইমামকে তিনি পাঠকের আদালতে হাজির করবেন দিনের পর দিন, তারা তাকে শাস্তি দেবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ যা, আমাদের চারদিকে প্রচুর বিপন্নতা নিয়ে বেঁচে থাকা বাস্তব জীবনের এ রকম মেয়েগুলোকে পাঠকরা সুরক্ষা দেবে, বাস্তবের বিবেকহীন হন্তারকগুলোকে তারা প্রতিরোধ করবে। একটি উপন্যাসের অনেক শক্তি, অনেক দূর সে যেতে পারে। পাঠককে জাগাতে পারে। তাকে শুদ্ধ করতে পারে।
মিলন তাঁর লেখার শক্তিতে বিশ্বাসী, সে জন্য তাঁর লেখা পাঠককে স্পর্শ করে। যেমন তাঁর ‘পরাধীনতা’ আমাকে স্পর্শ করেছিল, এবং আমি স্পর্শিত হওয়ার কথাটা লিখে বর্ণনা করেছিলাম। তাঁর ‘নূরজাহান’ও আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অনেক দিন পর এ বইটি নিয়ে লিখছি, যদিও মিলনের অনেক উপন্যাস আমি পড়েছি, নানা মাত্রায় সেগুলোর অভিঘাত আমি উপলব্ধি করেছি; কিন্তু ‘নূরজাহান’ এগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, যার প্রধান কারণ এর এপিক বিস্তার। তবে উপন্যাসটির প্রায় ১১০০ পৃষ্ঠার কলেবর এই বিস্তার তৈরি করেনি, করেছে মিলনের কল্পনার বিশালতা—এক সামান্য গ্রামের অসামান্য এক জীবনচিত্রকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সচল রাখার তাঁর ক্ষমতা; এক বিশাল ক্যানভাসে অসংখ্য চরিত্রকে তাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত আর সামষ্টিক জীবন নিয়ে হাজির করা, ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তের দিকে গল্পরেখাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া আর মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি আর ঋতুবদলের ভেতরের রসায়নগুলোকে সম্পৃক্ত করার তাঁর দক্ষতা। মিলন সংবেদী লেখক, তিনি একটা কোমল হাত রাখেন তাঁর অকিঞ্চিৎকর সব চরিত্রের পিঠে, তাদের আনন্দে হাসেন, তাদের দুঃখে কাঁদেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় এর প্রকাশ্য ছায়াপাত ঘটাতে দেন না। তিনি অনেক ঘটনায় নিজেকেও বিনিয়োগ করেন, তাঁর পক্ষপাতিত্ব আমরা টের পাই, তাঁর ক্রোধ অথবা পুলক আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু সেগুলো গল্পের একটা গভীরেই শুধু সক্রিয় হয়। গল্প বলায় তিনি একটা বস্তুনিষ্ঠতা মেনে চলেন। ফলে পাঠক একটি ঘটনার অনিবার্যতাকে যেমন বাস্তবের কার্যকারণ সূত্রে ফেলে মাপতে পারেন, তেমনি এর পেছনে লেখকের পক্ষগ্রহণের বিষয়টিও অনুধাবন করেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, উদাহরণটি ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের শেষ দিক থেকে নেওয়া (শুরুর থেকে উদাহরণ দিলে হয়তো যথাযথ হতো, কিন্তু শেষ দিকের উদাহরণটি এমনই প্রাসঙ্গিক আমার ওপরের বক্তব্যের সঙ্গে যে তা দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না)।
নূরজাহানকে ফতোয়া দিয়ে দুজন শাগরেদ লাগিয়ে তাকে একটা গর্তে পুরে মসজিদ বানানোর খোয়া—সুরকি ছুড়ে মাওলানা মান্নান তার প্রতিহিংসা মেটাল। নূরজাহানের মুখ ও মাথা রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হলো, সে একসময় টলতে টলতে উঠে বাড়ি গিয়ে অ্যানড্রিন খেল, এবং তার মারা যাওয়ার পর মেদিনীমণ্ডলের দৃশ্যপট বদলে গেল। পুলিশ এলো এবং মাওলানা মান্নানকে ধরে নিয়ে গেল কোমরে দড়ি দিয়ে, যে রকম দড়ি দিয়ে নিষ্পাপ মাকুন্দা কাশেমকে সে চোর সাজিয়ে গ্রাম থেকে বিদেয় করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের এক কর্তা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এবার রাজাকার মাওলানাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পিছু পিছু তাড়া করে আসা বাদলা নাদের হামেদ আলালদ্দি বারেকের মতো কিশোর তরুণরা পাষণ্ড মাওলানাকে যখন ঢিল ছুড়ে মারছে, সে কিছুই বলল না। মাওলানার মুখে-মাথায় ঢিল পড়তে দিল। মিলন এরপর লেখেন, “আর কথা নাই। হালটের পাশ থেকে তুমুল ক্রোধে বৃষ্টির মতন চাকা পড়তে লাগলো মান্নান মাওলানার মুখে। হাত তুইলা, মুখ নিচা কইরা, চিৎকার চেঁচামেচি কইরা নানানভাবে পোলাপানের চাকার হাত থেকে নিজেরে রক্ষা করতে চাইলো, পারলো না।” এই বর্ণনা কি কোনো চরিত্র দিচ্ছে? না, দিচ্ছেন লেখক। কিন্তু তিনিই তো এর অনেক আগে মান্নান মাওলানা আর তার ছেলে আতাহারের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার মাকুন্দা কাশেমের ভয়ার্ত আর্তনাদ এবং সেই আর্তনাদে তার শেষ হতে যাওয়া আয়ু কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখার নিষ্ফল চেষ্টার পর লিখেছিলেন, “মাকুন্দা কাশেমের বুকফাটা আর্তনাদে তখন স্তব্ধ হয়েছিল জেগে ওঠা মানুষ, ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল শীতরাত্রির নিস্তব্ধতা।” এই ভাষিক পরিবর্তন কেন? কিশোর-তরুণদের হাতে মান্নান মাওলানার শাস্তি পাবার দৃশ্যে কেন তিনি চলে গেলেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ভাষায়, ক্ষণিক ছুটি নিলেন সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর অবস্থান থেকে, হয়ে গেলেন বাদলা নাদের হামেদদের একজন?
উদাহরণটি আমি দিয়েছি লেখকের পক্ষগ্রহণের প্রসঙ্গে। রাজনীতিতে যেমন শেষ বিচারে নিরপেক্ষতা বলে কেউ নেই—যিনি একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যান না, তিনিও একটি পক্ষ নেন, হয়তো নির্বাচনের অসারতার বিপক্ষেই—লেখালেখিতেও নিরপেক্ষতা একটি আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। যাঁরা সমাজ নিয়ে লেখেন, সমাজের অসংগতি-অবিচার আর স্খলন-পতন নিয়ে লেখেন, তাঁরা ক্ষমতার আর বিত্তের বিপরীতে থাকা মানুষগুলোরই পক্ষ নেন। এই পক্ষগ্রহণ বেশির ভাগই প্রচ্ছন্ন; প্রায়ই তার আয়োজন থাকে না, উত্তেজনাও থাকে না। মিলনও অনেক উপন্যাসে এই পক্ষপাত প্রচ্ছন্নই রাখেন, কিন্তু ‘পরাধীনতা’ ও ‘নূরজাহান’-এ এটি অনেকটাই স্পষ্ট। ‘পরাধীনতা’য় দুই পক্ষ ছিল, অথবা দুটি পক্ষের অনেক রূপ ছিলÑদেশ-বিদেশ, মুক্তি-অন্তরিনতা, বস্তুর নিগড়-কল্পনার উড়াল, যন্ত্র-মানুষ। ‘নূরজাহান’-এ মিলন নিজে আছেন, এবং তাঁর যে সত্তার আড়ালে বর্ণনাকারী তার গল্প বুনে যায়, নিঃশব্দে জাল বুনে যাওয়া কোনো মাকড়সার মতো, সে নিজেই তো রক্তাক্ত। রূঢ় বাস্তব, বাস্তবের কল্পনা আর কল্পনার বাস্তব এমন অনিবার্যভাবে মিলে যায় এই উপন্যাসে যে, কোনো ঘটনাকেই আর কল্পিত মনে হয় না।
‘নূরজাহান’-এর গল্প জীবন পায় মিলনের চেনা অন্তরঙ্গ ভ‚গোলে, তাঁর নিজের উঠানে। এই উঠানে তাঁর অধিকার ষোলো আনা। এর চরিত্ররা তাঁর চেনা, এর গাছপালা বিছিয়ে থাকে তার করতলে। এই উঠানে যখন কোনো অপচ্ছায়া পড়ে, একটি দুরন্ত কিশোরীকে বেঁধে ফেলে তার অপরিষ্কার শেকলে, তখন তিনিও জেগে ওঠেন। ‘নূরজাহান’ এ জন্য এত টানে আমাদের। আধুনিক সাহিত্যের তাত্ত্বিকরা বলবেন, ওই পক্ষগ্রহণ গল্পের জন্য ক্ষতিকর; উত্তরাধুনিক তত্তের প্রবক্তারা বলবেন, এতে কোনো দোষ নেই—বস্তুত গল্পকে তা মানবিক করে। মিলন উত্তরাধুনিক লেখক নন, কিন্তু তিনি গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। সেই ঐতিহ্যে পক্ষগ্রহণ একটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বিষয়টা আরো গভীর—এবং তা হচ্ছে, পক্ষগ্রহণে গল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না!
মিলন দেখান, ক্ষতি নয়, তাতে লাভ হয়। একটা বিশাল ক্যানভাসের কাজ একটা জায়গা খুঁজে পায়। নূরজাহানের পুনজন্ম হয়, পাঠকের চেতনায়। পৃথিবীর সব মান্নান মাওলানা একজোট হয়েও তাকে আর মারতে পারে না।
‘নূরজাহান’-এর শেষ অংশটি আমার বিস্ময় জাগিয়েছে। মিলন যেভাবে ঋতু ধরে ধরে অগ্রসর হয়ে মেদিনীমণ্ডল গ্রামটির একটি চালচিত্র মেলে ধরেছেন, তাতে মান্নান মাওলানার চরিত্রটি অপ্রতিরোধ্য মনে হয়েছে। মাকুন্দা কাশেমকে পিটিয়ে মৃতপ্রায় করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পর তার অবস্থান আরো পোক্ত হয়েছে। এই উপন্যাসের খল চরিত্রগুলো প্রায় সবাই একটা অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে চলে যায়। আতাহার, সড়কের কন্ট্রাক্টর আলী আমজাদ এবং আতাহারের সাঙ্গোপাঙ্গকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে তেমন মনে হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের পরাজিত হওয়া তো দূরের কথা, তাদের কেউ বিপদে ফেলতে পারে, সে রকম ভাবারও কথা নয়। কিন্তু সবাই তারা হেরে যায়। মান্নান মাওলানার মুখে যেদিন নূরজাহান থুতু ছিটিয়ে দিল, সেদিন থেকেই তার সেই পরাজয়। ধূর্ত ও নিষ্ঠুর এই মাওলানা এরপর প্রতিশোধ নিতে নামল। তার পরিকল্পনা ধরে সে এগোল। দেলোয়ারার ভালোমানুষি এবং এনামুলের বদান্যতায় সে একটি মসজিদের ইমাম হলো। এর আগে সে নূরজাহানকে স্ত্রী হিসেবে অধিকারের চেষ্টা করে বিফল হলেও প্রতিশোধটা সে ঠিকই নিল। তার বিরুদ্ধে একটা ফতোয়া দিয়ে নিজেই বসল বিচারে। এইখানে এসে মিলনের জন্য দুটি পথ খোলা ছিল—তিনি বাস্তবকে মেনে নিয়ে মান্নান মাওলানাকে তার বিজয়মুহূর্তে ছেড়ে দিতে পারতেন, এবং নূরজাহানকে এক হতভাগ্য ও ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে তার করুণ পরিণতির কাছে সমর্পণ করতে পারতেন, যা পাঠককে একসময় একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলতে বাধ্য করত, “এ আর এমন কী, বাংলাদেশের নূরজাহানদের কপালে এই তো লেখা থাকে, আর বাংলাদেশের মান্নান মাওলানাদের এমনই তরক্কি হয়”; অথবা মান্নান মাওলানার পরাজয়টা দেখাতে পারতেন। তিনি দ্বিতীয় পথটা শুধু বেছে নেননি, এই পরাজয়কে একটা প্রতীকী মাত্রায় বাংলাদেশের জেগে ওঠা হিসেবেও দেখিয়েছেন। মাকুন্দা কাশেমের মৃত্যুর সময় জেগে ওঠা মানুষ স্তব্ধ হয়ে ছিল, মান্নান মাওলানার শাস্তি নিশ্চিত করার সময় জেগে থাকা মানুষ স্তব্ধতা ভেঙে সক্রিয় হয়েছে। সক্রিয় হয়েছে কিছু কিশোর—নতুন প্রজন্ম যারা, এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও, তবে সবচেয়ে বড় কথা, সক্রিয় হয়েছে মানুষের বিবেক, এমনকি প্রকৃতিও। সত্য যে, এই শাস্তি দেওয়াটা একটা রূপকথার আদল দিয়েছে গল্পটাকে, কিন্তু এটি জেগে ওঠা মানুষের রূপকথা, মিলন যার রূপকার। ‘নূরজাহান’-এর শেষে এসে সরাসরি পক্ষ নিয়েছেন মিলন, কিন্তু এই পক্ষ নেওয়ায় গল্পের আড়ালে জেগে থাকা ইতিহাসটা স্বস্তি পেয়েছে, সত্য জেগে উঠেছে।
ছাতকছড়ায় যে নূরজাহান ছিল, সেও মরেছিল ফতোয়ার আঘাতে। মেদিনীমণ্ডলের নূরজাহানও। মিলন একবার পক্ষ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিশ্রম করেছেন তাঁর অবস্থানটি সত্য, ন্যায় ও ধর্মের আলোকে উপস্থাপন করতে। এ জন্য ফতোয়াকে তিনি ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে পড়েছেন। অসংখ্য বই পড়েছেন। রীতিমতো গবেষণা করেছেন—যেন তিনি উপন্যাস নয়, একটি অভিসন্দর্ভ লিখেছেন। কত অভিনিবেশ নিয়ে তিনি ইসলামের নীতি ও বাণীগুলো খুঁটিয়ে পড়েছেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনী ও হাদিস পড়েছেন, ধর্মের ব্যাখ্যা এবং ইসলামে নারীর অধিকার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন। ধর্মের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল, কারণ তিনি সেই লোকজ ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছেন, যা ধর্মের সত্যিকার সারটুকু গ্রহণ করে, এবং করে সমৃদ্ধ হয়। তাঁর এই উপন্যাসে মান্নান মাওলানার এক বিপরীত চরিত্র আছেন, মাওলানা মহিউদ্দিন, যিনি ইসলামের মূল্যবোধগুলো ধারণ করে এক শীতল ছায়া মেলে ধরেন প্রতিটি মানুষের মাথায়। মান্নান মাওলানা গ্রামের ছনু বুড়ি মারা গেলে তার জানাজা পড়াতে অস্বীকার করল, যেহেতু ছনু বুড়ি টুকটাক চুরি করে, যদিও পেটের দায়ে। মাওলানা মহিউদ্দিন তার জানাজা পড়ালেন, তার ছেলেকে সান্ত্বনা দিলেন। তাঁকে দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।
মাওলানা মহিউদ্দিনের চরিত্র কি তাহলে একটা ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস, এ কথা প্রমাণ করতে যে মান্নান মাওলানারা ব্যতিক্রম, মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবরাই নিয়ম। না, এর কোনোটিই না। মিলন কোনো শ্রেণি নয়, মানুষ ধরে ধরে এগোন। তাঁর প্রতিটি মানুষই আলাদা। মাওলানা মহিউদ্দিন তেমনই এক মানুষ। প্রথমত তিনি মানুষ, ভালো মানুষ, যেমন দবির গাছি ভালো মানুষ, মরণি ভালো মানুষ, ফুলমতি ভালো মানুষ। তারপর তাঁর কিছু দায়িত্ব আছে, তিনি মসজিদের ইমাম। সেই দায়িত্ব তিনি সুচারুভাবে পালন করেন। দবিরও তার দায়িত্ব পালন করে, মরণিও। মানুষের অবস্থানেই এরা মর্মস্পর্শী।
একই কারণে মান্নান মাওলানার পরাজয়টা বাস্তবকে পাশ কাটিয়ে রূপকথার অঞ্চলে চলে গেলেও এক হিসাবে এই পরাজয়ের কারণটা তার মানুষ হিসেবে অকৃতকার্য হওয়ার জন্য। আতাহারও শক্তিশালী ছিল, কপট ও ভণ্ড ছিল; সে মদ খায়, বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গী করে সন্তানও উৎপাদন করে, এবং স্বার্থপরতার প্রয়োজনে বাবার কুকর্মকে সমর্থন করে। কিন্তু যেদিন তার মা তার মিথ্যাবাদিতার প্রমাণ পেয়ে (এবং একই সঙ্গে স্বামীর মিথ্যাবাদিতার নতুন কিস্তির সন্ধান পেয়ে) অবিশ্বাস ও ঘৃণা নিয়ে হৃদপিণ্ডের দুর্বলতায় মারা গেলেন, সেদিন আতাহারের মনুষ্যত্বের কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না। মাওলানাবাড়ির বঞ্চনায় পোড়া অতৃপ্ত পারুকে অনেক দিন আতাহার তার অধিকারে রেখে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে তার সঙ্গে। কিন্তু বাবার বাড়ি ফেরত যাওয়া পারু তাকে পথ দেখিয়ে দিল। তার শত অনুনয়েও পারুর মন গলল না, বরং আতাহার ও তার বাবাকে ‘গুয়ের পোকা’ অভিধা দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। আতাহার কাঁদল, কপাল চাপড়াল, কিন্তু পারুর অবস্থানের উনিশ-বিশ হলো না। গুয়ের পোকাই বটে, মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটা না থাকলে এ রকমই তো হওয়ার কথা।
ঠিকই পরাজিত হলো আলী আমজাদও। উপন্যাসের শুরুতে সেও ছিল অপ্রতিরোধ্য। নূরজাহান তাকে চিনেছিল, কিন্তু কিশোরী নূরজাহান তখনো তার জগৎটাকে দেখছে মাওয়া সড়কের মতো এক বিস্ময় হিসেবে—যেন দূরের জগতের সঙ্গে এক বিস্ময়কর যোগাযোগ অপেক্ষা করছে তার জন্যও। আমজাদেরও কুদৃষ্টি পড়েছিল নূরজাহানের ওপর, কিন্তু ভাগ্য মেয়েটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তবে আমজাদের নিষ্ঠুরতার বলি হতে হয়েছে বদর ও হেকমতকে এবং এক দুর্ঘটনায় তারই সড়ক নির্মাণের শ্রমিকদের ফেলা মাটিতে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মজনুর বাবা আদিলদ্দিকে। আদিল নামাজ পড়তে ঢালের দিকে বসেছিল। একসময় আমজাদের বাড়তে থাকা পাপ তাকে কাবু করেছে। সেও পরাজিত হয়েছে, নিজের লোভ ও ক্ষমতার নির্মমতার কাছে।
ইংরেজিতে যাকে ‘ক্যামিও’ বলে, সে রকম একঝলক দেখা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে আরেক অমানুষ, রিকশাচালক রুস্তম। গ্রামের পাগলি মেয়ে তছিকে সে ফুসলিয়ে রিকশায় চড়িয়ে নিয়ে গেছে এক বাজারে মুরলিভাজা কিনে দেওয়ার জন্য। সেখানে সে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে অরক্ষিত ওই মেয়েটিকে। কিন্তু তছি সাধারণ মানুষ নয়, তার অতিমানুষি কিছু শক্তি আছে, অমানুষ হতে থাকা একটি পাষণ্ডের জন্য যা ভয়ংকর। রুস্তম পরাজিত হয় তার লালসার কাছে, তছি হয় তার শাস্তির নিমিত্ত। তবে তছির জীবনও তারপর পাল্টে যায়। পাগল হোক যা-ই হোক, জীবনবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর একটি-দুটি অন্তত সে বুঝতে পারে, বাস্তবের আইন আর অপরাধ-শাস্তির দু-এক ধারা সম্পর্কেও তার ধারণা আছে। তবে আমার শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, তছি পুলিশের হাতে পড়বে না। কারণ তছি পুলিশের চালাক পৃথিবী আর আইনের ছোট-লম্বা হাতের মাপের বাইরের এক অস্তিত্বের নাম।
অবাক, নানা বয়সের নারীরাই এই উপন্যাসের মনুষ্যত্বকে জাগায়, প্রখর করে, তার বিপন্নতাকে নিজেদের জীবনের বিনিময়েও রক্ষা করে। নূরজাহান যখন থুতু ফেলল মান্নান মাওলানার মুখে, সে তার নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাকে ত্বরান্বিত করল। সেই মনুষ্যত্ব আমরা দেখলাম বাদলা নাদের এবং অন্যান্য কিশোরের মধ্যে। তছি স্বাভাবিক মানুষ নয়, তবু সে ওই অসমাপ্ত মানুষিতা দিয়েও মনুষ্যত্বকে ওপরে নিয়ে গেল। আর পারুর নিজের জীবনে ছিল এত অসম্পূর্ণতা, অনেক স্খলনও। তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোটাও একটু কঠিন। কিন্তু সেও এক অমানুষকে অরক্ষিত করে দিয়ে মনুষ্যত্বকেই জাগাল।
মনুষ্যত্ব ছিল মরণির, ফিরোজার, নূরজাহানের মা হামিদার, কিছুটা দেলোয়ারার, এমনকি মান্নান মাওলানার স্ত্রীরÑনিজের নিজের মতো মাপে। সন্দেহ নেই মিলনের নারী চরিত্রদের গভীরতা প্রচুর, তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যও অনেক। কে ভেবেছে নূরজাহানকে দুদণ্ড শান্তি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া রব্বানের প্রথম স্ত্রীও অনুশোচনা করবে নূরজাহানের জন্য, তার মনটা খারাপ হবে? বাস্তবের এই চরিত্রগুলোর হাত-পা এমনি বাঁধা, তারা প্রথা ও প্রচলের দাস হয়েই জীবন যাপন করে, পুত্রবধূ-শাশুড়ি সম্পর্কটা সমস্যাসংকুল, একান্নবর্তী বাড়িতে সংসারের জীবনটা তো আরো। আর এইসব সমস্যা ও অসুখ তৈরি করে পিতৃতান্ত্রিকতা। কিন্তু মিলনের কৃতিত্বটা এই—তাঁর নারীরা এসব সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেই একটা-দুটা মহিমার অবস্থানে চলে যায়, যাকে অন্যভাবে বললে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাও বলা যায়। ছনু বুড়ির পুত্রবধূ যে বানেছা—যার কাজ ছিল শাশুড়ির জীবনটা ভাজা ভাজা করা—একসময় সেও শাশুড়ির দুঃখে কাতর হয়, মেয়েকে বলে, শাশুড়ির সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করে সে অপরাধ করেছে।
‘নূরজাহান’-কে ঘনিষ্ঠভাবে পড়লে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, প্রথমত মিলন এটিকে একটি এপিকধর্মী ব্যাপ্তি দিতে চেষ্টা করেছেন। তিন খণ্ডে—এবং খণ্ডগুলোর মধ্যে সময়ের অনেক দূরত্ব—লিখলেও উপন্যাসটির ভেতর একটি ব্যাপক ঐক্য আছে, বিশালতা আছে। আমার মনে হয়েছে, এপিকধর্মী যেকোনো কাজের মতোই এ উপন্যাসটিকে তিনি একটি সুচারু চিন্তা, নীতিবোধ অথবা শ্রেয়বোধের একটি কাঠামোর ভেতর স্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। এ জন্য পাপ-নিষ্পাপতা, নীতি-নীতিহীনতা, পাশবিকতা-মনুষ্যত্ব, সংকীর্ণতা-উদারতার একটা ডায়ালেকটিক বা দ্বন্দ্বমানতা সক্রিয় থাকে পুরো উপন্যাসে। কিন্তু এই দ্বন্দ্বমানতা উপন্যাসটির কোনো সরল পাঠ উপহার দেয় না, যেহেতু এপিকধর্মী লেখার মতো এ উপন্যাসেও চরিত্রগুলো তাদের জীবনকে ছাপিয়ে ওঠে। পশ্চিমা এপিকধর্মী লেখায় সাধারণত ‘সাধারণ’—অর্থাৎ আটপৌরে, প্রান্তিক—মানুষজনের ভূমিকাটা থাকে সীমিত, কিন্তু মিলন এদেরকেই উপজীব্য করেন। এক এনামুল ছাড়া কেউই প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক নয়। তবে এনামুলের টাকা থাকলেও আভিজাত্য নেই, সে কুলীন শ্রেণিতেও পড়ে না। মেদিনীমণ্ডলের সামান্য সামাজিক ভূগোলে স্থাপিত মানুষগুলো যখন জীবনকে ছাড়িয়ে বড় হতে থাকে, তখন বুঝতে হয় এর পেছনে আছে কল্পনার ব্যাপ্তি। প্রকাশের শক্তি আর গল্প-কাঠামোকে টান টান রেখে পাঠককে ধরে রাখার লেখকের দক্ষতা।
তবে এর বাইরে যা আছে, যা উপন্যাসটিকে গতিশীল, পরিব্যাপ্ত করে, বাবুই পাখির বাসার মতো এক আশ্চর্য কাঠামো নিয়ে আমাদের মনে জেগে থাকে, তা হচ্ছে এর পেছনে মিলনের বিনিয়োগ। মিলনকে অমনোযোগী লেখক কেউ বলবে না, যদিও তাঁর দু-একটি উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে নিজেকে যথেষ্ট সময় দেননি, যেটুকু যত্নবান তিনি ভাষার প্রতি, চরিত্র সৃষ্টির প্রতি, ততটা যত্নবান হননি। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এ নিজেকে শতভাগ দিয়েছেন তিনি। আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস লিখেছিলেন, প্রতিটি লেখায় তিনি নিজেকেই পুনর্নির্মাণ করেন। ‘নূরজাহান’-এর ক্যানভাসজুড়ে আছে মিলনের সংবেদী সত্তা, কিন্তু এতে তিনি একটি গল্প শুধু নির্মাণ করেননি, করেছেন নিজের জানা পৃথিবীটাকেও, নতুন করে, এবং পুনর্নির্মাণ করেছেন নিজেকেও। উপন্যাসের শেষে ‘লেখকের বক্তব্য’ অংশে তিনি প্রকারান্তরে এটি স্বীকারও করে নিয়েছেন। নূরজাহান মেয়েটি তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, তৃতীয় খণ্ডে এসে তার হাত থেকে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা, কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি দেখতে পান, মেয়েটি তাঁর অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে। এ এক অপূর্ব রাসায়নিক সংবদল। লেখক যখন চরিত্রকে এতটা অন্তস্থিত করেন, চরিত্র তাঁকেও বদলে দেয়। নূরজাহানকে মিলন দেখেন বাইরে থেকেও, তাঁর সচল ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার অস্থির ছুটে চলা, তার নিষ্পাপ আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। ভেতরের আর বাইরের নূরজাহানের যোগফল এক অসাধারণ চরিত্র সৃষ্টি করে, যার বড় একটা শখ হচ্ছে ছুটে বেড়ানো। সেই নূরজাহানই শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ পড়ে থাকে, মানুষের আর অ্যানড্রিনের বিষে নীল, মিলন এ উপন্যাসে নিজেকে বিনিয়োগ করেছেন বলে এর বোধগুলো শুদ্ধ। বোধের প্রকাশগুলো শুদ্ধ। ভাষাটিও শুদ্ধ, মাটির কাছে। ‘নূরজাহান’-এর আগে একই উপন্যাসে কোনো বর্ণনাকারী তাঁর আখ্যানের জন্য একই সঙ্গে প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, তেমন নজির আমার স্মৃতিতে নেই।
মিলন বিনিয়োগ করেছেন মেদিনীমণ্ডলের ভ‚গোলে, সমাজে, এর নিত্যদিনের জীবনে। ফলে যত ভূদৃশ্য তিনি বর্ণনা করেন, শীত-বসন্ত-বর্ষার পালাবদলের চিত্র আঁকেন, তার প্রধান পরিচয় হয় বিশ্বস্ততা। সামাজিক সম্পর্ক, আচার এবং প্রতিদিনের কাজকর্ম ও পেশার বর্ণনাতেও থাকে বস্তুনিষ্ঠতা। তবে সবচেয়ে যা টানে পাঠককে, তা অত্যন্ত সামান্য, সীমাবদ্ধ ও সাদামাটা জীবন নিয়েও চরিত্রগুলোর জীবন্ত হয়ে ওঠা। এক গ্রাম চরিত্র আছে উপন্যাসটিতে, এবং তারা সবাই খুব সাধারণ। দবির গাছি অথবা আজিজ গাওয়ালি, কুট্টি অথবা আলফু, রাবি অথবা মোতালেব—এদের কী দাবি আছে সাহিত্যের কাছে, জীবনের কাছে? ছায়ার মানুষ তারা—এ রকম এক শজন আমাদের ঘিরে রাখলেও কি তাদের চোখে পড়ে আমাদের? কিন্তু মিলন শুধু তাদের দেখেনইনি, তাদের স্থান দিয়েছেন সাহিত্যের শুদ্ধ কল্পনায়।
-------২-------
‘নূরজাহান’ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে, জয়নুলের বড়মাপের স্ক্রলচিত্রের মতো, তা শুধু এর ব্যাপ্তি নয়, এর গভীরতার জন্যও। ধরা যাক কুট্টি ও আলফুর কথা। দরিদ্র কাজের মেয়ে কুট্টি, কাজের লোক আলফু। তাদের চোখে পড়ারই কথা নয় কারো। কিন্তু তাদের প্রেম হয়, প্রেমটাও একটু জটিল, যেহেতু আলফুর স্ত্রী-সন্তান আছে। মিলন এই প্রেমের বর্ণনা দেন এক প্রসন্ন রোমান্টিকতায়, যেন তারা কত কুলীন মানুষ, যেন তাদের জীবনে কত সংস্কৃতি আর শিক্ষা আছে, শুদ্ধ ভাষা চর্চা আছে! অথচ কত সীমাবদ্ধ তারা, এই গ্রামের বাইরের জগৎটা কুট্টির হয়তো দেখা হয়নি। যখন এ রকম দুই মানুষের প্রেমকে বর্ণনায়-বিশ্লেষণে নিয়ে আসেন মিলন, তাতে একটা গভীরতা আসে, যে গভীরতা অনুভবের, অন্তর্দৃষ্টির। দ্বিতীয় একটি কারণ হচ্ছে ‘নূরজাহান’-এর কাহিনী, কাঠামো এবং দর্শনগত ঐক্য। শুনতে অবাক লাগার মতো হলেও বলা দরকার, উপন্যাসটির একটি দর্শন আছে, নান্দনিকতার উদ্ভাস আছে, এবং তা জীবনকে ঘিরেই। নূরজাহানের অপমৃত্যু হয়, কিন্তু মৃত্যুতে সে শেষ হয়ে যায় না, বলা যায় পাঠকের চেতনায় তার পুনর্জন্ম হয়। মেয়েটিকে ঘিরে উপন্যাস, তার জীবনের এক সকালবেলা থেকে এর শুরু, এক অকালসন্ধ্যায় তার শেষ। নূরজাহানের জীবনটা যে রকম চলতে চলতে বদলে যায়, তাকেই মিলন সাক্ষী মানেন, আমাদের বলেন, জীবনের স্থায়িত্ব নেই, সুন্দরের আছে, সত্যের আছে। আর যে জীবন সুন্দরের, সত্যের, তার স্থায়িত্ব মহাজীবনের।
নূরজাহানের জীবনের সৌন্দর্য ও সত্যগুলোকে উদ্ঘাটন করেছেন, বর্ণনা করেছেন, সাজিয়েছেন মিলন। এ জন্য নূরজাহান এ রকম এক মোহ-ধরানো চরিত্র পাঠকের জন্য। তার খুব কাছে আসতে পেরেছিল মজনু নামের ছেলেটি, যাকে মেয়েটি ভালোবেসেও ছিল। কিন্তু মজনুর শক্তি নেই কোনো কিছু করার, কোনো কিছু বদলে দেওয়ার। সে গ্রামে থাকে না, যদিও শহরে থাকার সময় গ্রামটা থাকে তার ভেতরে। মজনুর সঙ্গে যে নূরজাহানের সম্পর্ক হবে না, বিয়েও হবে না, সেটি মনোযোগী পাঠক বুঝতে পারেন। এই গ্রামে মজনু থাকবে না, তার পেশা ও ভবিষ্যৎ শহরে, নূরজাহানও গ্রাম ছেড়ে বাইরে যেতে পারবে না। টমাস হার্ডির কয়েকটি উপন্যাসের পটভ‚মি ইংল্যান্ডের ওয়েসেক্স অঞ্চল, যা চরিত্রদের ধরে রাখে নিয়তির মতো। ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য নেটিভ’ উপন্যাসের ইউস্টাসিয়া ভাই নামের মেয়েটি পালাতে চায় এই জায়গা থেকে, যেখানে আশা বা ভবিষ্যৎ নেই। প্রেমিকের হাত ধরে পালায়ও সে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না, ওয়েসেক্স অঞ্চলেই সে অঘোরে মারা পড়ে। মেদিনীমণ্ডলও নূরজাহানের নিয়তি, যে নিয়তির সুতা ধরে টান দেয় মান্নান মাওলানার মতো লোকেরা। হার্ডির মতো ট্র্যাজিক বোধ মিলন জাগান ‘নূরজাহান’-এ। দেখান সময়, স্থান আর ইতিহাস কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। নূরজাহান সংগ্রাম করে তার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, কিন্তু পরাজিত হয়। মাওয়া সড়কটি তাকে টানে, কিন্তু সেও হয়তো জানে, এই সড়কটি তার জন্য নয়। এই সড়ক গিলে নেয় ছেলের জন্য কাতর আদিলদ্দিকে। আদিলদ্দিরও পথ শেষ হয় মেদিনীমণ্ডলে। এবং, মান্নান মাওলানারও।
‘নূরজাহান’-এর এক বড় শক্তি এর আকর্ষণীয় দৈনন্দিনতা। মিলন একে বর্ণনা করেন অনেক দৃশ্য-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শে; প্রতিদিনের গৃহস্থালি চর্চা থেকে নিয়ে টুকটাক আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী অথবা পেশার বিবরণে কোথাও আরোপিত কিছু নেই, কষ্টকল্পিত কিছু নেই। যেন কেউ নির্মোহ এক চলমান ক্যামেরায় ধরে রাখছে প্রতিদিনের জীবন। মিলন বর্ণনাও করেন খণ্ডে খণ্ডে। চার পৃষ্ঠা বানেছার গল্প তো তিন পৃষ্ঠা নিখিলের কথা। কিন্তু টুকরো টুকরো এসব গল্প এক অবাক মোজাইক শিল্পের মতো পাশাপাশি জোড়া লেগে তুলে ধরে একটি গ্রামের অসামান্য কিছু ছবি। একটি বা একজনের ঘটনা থেকে অন্য বা আরেকজনের ঘটনায় মিলন যান অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে। একটা সুবিধা অবশ্য তিনি আদায় করে নেন তাঁর গতিশীলতার গুণে : কোথাও ছন্দপতন হয় না, কার্যকারণ সূত্রে ছেদ পড়ে না, যেন একটাই গল্প তিনি বলছেন, এক টানে।
মিলন না জানালে আমাদের কাছে এই রহস্যটা অজানা রয়ে যেত যে তিনটি খণ্ড তিনি সমাপ্ত করেছেন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। শেষ খণ্ডটি তিনি নিজেকে নিয়ে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এর কাহিনীরেখাটি এতটাই টান টান যে এই যুদ্ধের কোনো ছায়া সেখানে পড়ে না।
--------৩-------
মিলনকে দু-একবার বলেছি ‘নূরজাহান’ নিয়ে লিখব। কিন্তু লিখতে গিয়ে এতটা উত্তেজনা আর আনন্দ অনুভব করব, ভাবতে পারিনি। এটি সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া একটি উপন্যাস, অথচ কী সাধারণ এর গল্প—প্রতিদিনের, অতিচেনা। এই চেনা গল্পটিই মিলন লিখেছেন এতটা দরদ, শক্তি আর অধিকার নিয়ে যে শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক অলডাস হাক্সলির কথাটাই উপন্যাসটি প্রমাণ করে ছাড়ে : জীবনে যা সাধারণ, তাকেই অসাধারণ করে তোলা সাহিত্যের কাজ। সব সাহিত্যিক তা পারেন না, কয়েকজন পারেন।
মিলন সেই কয়েকজনের একজন।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক
আমাদের সকলের মতো ইমদাদুল হক মিলনের মনেও ঘটনাটি গভীর দাগ কাটল। মেয়েটির জন্য তাঁর গভীর মমতা হলো; যে ইমামের ফতোয়া মেয়েটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল, তার প্রতি তাঁর ঘৃণা জাগল। কিন্তু মেয়েটিকে তাঁর সহানুভূতি, তাঁর ভালোবাসা যে জানাবেন, তার কোনো উপায় নেই। মসজিদের ওই ইমামকে তিনি হয়তো তাঁর ঘৃণার কথা জানাতে পারতেন, কিন্তু তাতে তার কোনো বিকার হতো, তার বিবেক আর অপরাধবোধ জাগত—তেমন সম্ভাবনা ছিল না। মিলন সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি একটি উপন্যাসে মেয়েটিকে আঁকবেন, পাঠকের মনে চিরকালের জন্য একটা জায়গা তাকে করে দেবেন। আর নিষ্ঠুর ইমামকে তিনি পাঠকের আদালতে হাজির করবেন দিনের পর দিন, তারা তাকে শাস্তি দেবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ যা, আমাদের চারদিকে প্রচুর বিপন্নতা নিয়ে বেঁচে থাকা বাস্তব জীবনের এ রকম মেয়েগুলোকে পাঠকরা সুরক্ষা দেবে, বাস্তবের বিবেকহীন হন্তারকগুলোকে তারা প্রতিরোধ করবে। একটি উপন্যাসের অনেক শক্তি, অনেক দূর সে যেতে পারে। পাঠককে জাগাতে পারে। তাকে শুদ্ধ করতে পারে।
মিলন তাঁর লেখার শক্তিতে বিশ্বাসী, সে জন্য তাঁর লেখা পাঠককে স্পর্শ করে। যেমন তাঁর ‘পরাধীনতা’ আমাকে স্পর্শ করেছিল, এবং আমি স্পর্শিত হওয়ার কথাটা লিখে বর্ণনা করেছিলাম। তাঁর ‘নূরজাহান’ও আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অনেক দিন পর এ বইটি নিয়ে লিখছি, যদিও মিলনের অনেক উপন্যাস আমি পড়েছি, নানা মাত্রায় সেগুলোর অভিঘাত আমি উপলব্ধি করেছি; কিন্তু ‘নূরজাহান’ এগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, যার প্রধান কারণ এর এপিক বিস্তার। তবে উপন্যাসটির প্রায় ১১০০ পৃষ্ঠার কলেবর এই বিস্তার তৈরি করেনি, করেছে মিলনের কল্পনার বিশালতা—এক সামান্য গ্রামের অসামান্য এক জীবনচিত্রকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সচল রাখার তাঁর ক্ষমতা; এক বিশাল ক্যানভাসে অসংখ্য চরিত্রকে তাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত আর সামষ্টিক জীবন নিয়ে হাজির করা, ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তের দিকে গল্পরেখাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া আর মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি আর ঋতুবদলের ভেতরের রসায়নগুলোকে সম্পৃক্ত করার তাঁর দক্ষতা। মিলন সংবেদী লেখক, তিনি একটা কোমল হাত রাখেন তাঁর অকিঞ্চিৎকর সব চরিত্রের পিঠে, তাদের আনন্দে হাসেন, তাদের দুঃখে কাঁদেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় এর প্রকাশ্য ছায়াপাত ঘটাতে দেন না। তিনি অনেক ঘটনায় নিজেকেও বিনিয়োগ করেন, তাঁর পক্ষপাতিত্ব আমরা টের পাই, তাঁর ক্রোধ অথবা পুলক আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু সেগুলো গল্পের একটা গভীরেই শুধু সক্রিয় হয়। গল্প বলায় তিনি একটা বস্তুনিষ্ঠতা মেনে চলেন। ফলে পাঠক একটি ঘটনার অনিবার্যতাকে যেমন বাস্তবের কার্যকারণ সূত্রে ফেলে মাপতে পারেন, তেমনি এর পেছনে লেখকের পক্ষগ্রহণের বিষয়টিও অনুধাবন করেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, উদাহরণটি ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের শেষ দিক থেকে নেওয়া (শুরুর থেকে উদাহরণ দিলে হয়তো যথাযথ হতো, কিন্তু শেষ দিকের উদাহরণটি এমনই প্রাসঙ্গিক আমার ওপরের বক্তব্যের সঙ্গে যে তা দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না)।
নূরজাহানকে ফতোয়া দিয়ে দুজন শাগরেদ লাগিয়ে তাকে একটা গর্তে পুরে মসজিদ বানানোর খোয়া—সুরকি ছুড়ে মাওলানা মান্নান তার প্রতিহিংসা মেটাল। নূরজাহানের মুখ ও মাথা রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হলো, সে একসময় টলতে টলতে উঠে বাড়ি গিয়ে অ্যানড্রিন খেল, এবং তার মারা যাওয়ার পর মেদিনীমণ্ডলের দৃশ্যপট বদলে গেল। পুলিশ এলো এবং মাওলানা মান্নানকে ধরে নিয়ে গেল কোমরে দড়ি দিয়ে, যে রকম দড়ি দিয়ে নিষ্পাপ মাকুন্দা কাশেমকে সে চোর সাজিয়ে গ্রাম থেকে বিদেয় করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের এক কর্তা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এবার রাজাকার মাওলানাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পিছু পিছু তাড়া করে আসা বাদলা নাদের হামেদ আলালদ্দি বারেকের মতো কিশোর তরুণরা পাষণ্ড মাওলানাকে যখন ঢিল ছুড়ে মারছে, সে কিছুই বলল না। মাওলানার মুখে-মাথায় ঢিল পড়তে দিল। মিলন এরপর লেখেন, “আর কথা নাই। হালটের পাশ থেকে তুমুল ক্রোধে বৃষ্টির মতন চাকা পড়তে লাগলো মান্নান মাওলানার মুখে। হাত তুইলা, মুখ নিচা কইরা, চিৎকার চেঁচামেচি কইরা নানানভাবে পোলাপানের চাকার হাত থেকে নিজেরে রক্ষা করতে চাইলো, পারলো না।” এই বর্ণনা কি কোনো চরিত্র দিচ্ছে? না, দিচ্ছেন লেখক। কিন্তু তিনিই তো এর অনেক আগে মান্নান মাওলানা আর তার ছেলে আতাহারের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার মাকুন্দা কাশেমের ভয়ার্ত আর্তনাদ এবং সেই আর্তনাদে তার শেষ হতে যাওয়া আয়ু কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখার নিষ্ফল চেষ্টার পর লিখেছিলেন, “মাকুন্দা কাশেমের বুকফাটা আর্তনাদে তখন স্তব্ধ হয়েছিল জেগে ওঠা মানুষ, ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল শীতরাত্রির নিস্তব্ধতা।” এই ভাষিক পরিবর্তন কেন? কিশোর-তরুণদের হাতে মান্নান মাওলানার শাস্তি পাবার দৃশ্যে কেন তিনি চলে গেলেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ভাষায়, ক্ষণিক ছুটি নিলেন সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর অবস্থান থেকে, হয়ে গেলেন বাদলা নাদের হামেদদের একজন?
উদাহরণটি আমি দিয়েছি লেখকের পক্ষগ্রহণের প্রসঙ্গে। রাজনীতিতে যেমন শেষ বিচারে নিরপেক্ষতা বলে কেউ নেই—যিনি একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যান না, তিনিও একটি পক্ষ নেন, হয়তো নির্বাচনের অসারতার বিপক্ষেই—লেখালেখিতেও নিরপেক্ষতা একটি আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। যাঁরা সমাজ নিয়ে লেখেন, সমাজের অসংগতি-অবিচার আর স্খলন-পতন নিয়ে লেখেন, তাঁরা ক্ষমতার আর বিত্তের বিপরীতে থাকা মানুষগুলোরই পক্ষ নেন। এই পক্ষগ্রহণ বেশির ভাগই প্রচ্ছন্ন; প্রায়ই তার আয়োজন থাকে না, উত্তেজনাও থাকে না। মিলনও অনেক উপন্যাসে এই পক্ষপাত প্রচ্ছন্নই রাখেন, কিন্তু ‘পরাধীনতা’ ও ‘নূরজাহান’-এ এটি অনেকটাই স্পষ্ট। ‘পরাধীনতা’য় দুই পক্ষ ছিল, অথবা দুটি পক্ষের অনেক রূপ ছিলÑদেশ-বিদেশ, মুক্তি-অন্তরিনতা, বস্তুর নিগড়-কল্পনার উড়াল, যন্ত্র-মানুষ। ‘নূরজাহান’-এ মিলন নিজে আছেন, এবং তাঁর যে সত্তার আড়ালে বর্ণনাকারী তার গল্প বুনে যায়, নিঃশব্দে জাল বুনে যাওয়া কোনো মাকড়সার মতো, সে নিজেই তো রক্তাক্ত। রূঢ় বাস্তব, বাস্তবের কল্পনা আর কল্পনার বাস্তব এমন অনিবার্যভাবে মিলে যায় এই উপন্যাসে যে, কোনো ঘটনাকেই আর কল্পিত মনে হয় না।
‘নূরজাহান’-এর গল্প জীবন পায় মিলনের চেনা অন্তরঙ্গ ভ‚গোলে, তাঁর নিজের উঠানে। এই উঠানে তাঁর অধিকার ষোলো আনা। এর চরিত্ররা তাঁর চেনা, এর গাছপালা বিছিয়ে থাকে তার করতলে। এই উঠানে যখন কোনো অপচ্ছায়া পড়ে, একটি দুরন্ত কিশোরীকে বেঁধে ফেলে তার অপরিষ্কার শেকলে, তখন তিনিও জেগে ওঠেন। ‘নূরজাহান’ এ জন্য এত টানে আমাদের। আধুনিক সাহিত্যের তাত্ত্বিকরা বলবেন, ওই পক্ষগ্রহণ গল্পের জন্য ক্ষতিকর; উত্তরাধুনিক তত্তের প্রবক্তারা বলবেন, এতে কোনো দোষ নেই—বস্তুত গল্পকে তা মানবিক করে। মিলন উত্তরাধুনিক লেখক নন, কিন্তু তিনি গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। সেই ঐতিহ্যে পক্ষগ্রহণ একটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বিষয়টা আরো গভীর—এবং তা হচ্ছে, পক্ষগ্রহণে গল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না!
মিলন দেখান, ক্ষতি নয়, তাতে লাভ হয়। একটা বিশাল ক্যানভাসের কাজ একটা জায়গা খুঁজে পায়। নূরজাহানের পুনজন্ম হয়, পাঠকের চেতনায়। পৃথিবীর সব মান্নান মাওলানা একজোট হয়েও তাকে আর মারতে পারে না।
‘নূরজাহান’-এর শেষ অংশটি আমার বিস্ময় জাগিয়েছে। মিলন যেভাবে ঋতু ধরে ধরে অগ্রসর হয়ে মেদিনীমণ্ডল গ্রামটির একটি চালচিত্র মেলে ধরেছেন, তাতে মান্নান মাওলানার চরিত্রটি অপ্রতিরোধ্য মনে হয়েছে। মাকুন্দা কাশেমকে পিটিয়ে মৃতপ্রায় করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পর তার অবস্থান আরো পোক্ত হয়েছে। এই উপন্যাসের খল চরিত্রগুলো প্রায় সবাই একটা অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে চলে যায়। আতাহার, সড়কের কন্ট্রাক্টর আলী আমজাদ এবং আতাহারের সাঙ্গোপাঙ্গকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে তেমন মনে হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের পরাজিত হওয়া তো দূরের কথা, তাদের কেউ বিপদে ফেলতে পারে, সে রকম ভাবারও কথা নয়। কিন্তু সবাই তারা হেরে যায়। মান্নান মাওলানার মুখে যেদিন নূরজাহান থুতু ছিটিয়ে দিল, সেদিন থেকেই তার সেই পরাজয়। ধূর্ত ও নিষ্ঠুর এই মাওলানা এরপর প্রতিশোধ নিতে নামল। তার পরিকল্পনা ধরে সে এগোল। দেলোয়ারার ভালোমানুষি এবং এনামুলের বদান্যতায় সে একটি মসজিদের ইমাম হলো। এর আগে সে নূরজাহানকে স্ত্রী হিসেবে অধিকারের চেষ্টা করে বিফল হলেও প্রতিশোধটা সে ঠিকই নিল। তার বিরুদ্ধে একটা ফতোয়া দিয়ে নিজেই বসল বিচারে। এইখানে এসে মিলনের জন্য দুটি পথ খোলা ছিল—তিনি বাস্তবকে মেনে নিয়ে মান্নান মাওলানাকে তার বিজয়মুহূর্তে ছেড়ে দিতে পারতেন, এবং নূরজাহানকে এক হতভাগ্য ও ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে তার করুণ পরিণতির কাছে সমর্পণ করতে পারতেন, যা পাঠককে একসময় একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলতে বাধ্য করত, “এ আর এমন কী, বাংলাদেশের নূরজাহানদের কপালে এই তো লেখা থাকে, আর বাংলাদেশের মান্নান মাওলানাদের এমনই তরক্কি হয়”; অথবা মান্নান মাওলানার পরাজয়টা দেখাতে পারতেন। তিনি দ্বিতীয় পথটা শুধু বেছে নেননি, এই পরাজয়কে একটা প্রতীকী মাত্রায় বাংলাদেশের জেগে ওঠা হিসেবেও দেখিয়েছেন। মাকুন্দা কাশেমের মৃত্যুর সময় জেগে ওঠা মানুষ স্তব্ধ হয়ে ছিল, মান্নান মাওলানার শাস্তি নিশ্চিত করার সময় জেগে থাকা মানুষ স্তব্ধতা ভেঙে সক্রিয় হয়েছে। সক্রিয় হয়েছে কিছু কিশোর—নতুন প্রজন্ম যারা, এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও, তবে সবচেয়ে বড় কথা, সক্রিয় হয়েছে মানুষের বিবেক, এমনকি প্রকৃতিও। সত্য যে, এই শাস্তি দেওয়াটা একটা রূপকথার আদল দিয়েছে গল্পটাকে, কিন্তু এটি জেগে ওঠা মানুষের রূপকথা, মিলন যার রূপকার। ‘নূরজাহান’-এর শেষে এসে সরাসরি পক্ষ নিয়েছেন মিলন, কিন্তু এই পক্ষ নেওয়ায় গল্পের আড়ালে জেগে থাকা ইতিহাসটা স্বস্তি পেয়েছে, সত্য জেগে উঠেছে।
ছাতকছড়ায় যে নূরজাহান ছিল, সেও মরেছিল ফতোয়ার আঘাতে। মেদিনীমণ্ডলের নূরজাহানও। মিলন একবার পক্ষ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিশ্রম করেছেন তাঁর অবস্থানটি সত্য, ন্যায় ও ধর্মের আলোকে উপস্থাপন করতে। এ জন্য ফতোয়াকে তিনি ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে পড়েছেন। অসংখ্য বই পড়েছেন। রীতিমতো গবেষণা করেছেন—যেন তিনি উপন্যাস নয়, একটি অভিসন্দর্ভ লিখেছেন। কত অভিনিবেশ নিয়ে তিনি ইসলামের নীতি ও বাণীগুলো খুঁটিয়ে পড়েছেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনী ও হাদিস পড়েছেন, ধর্মের ব্যাখ্যা এবং ইসলামে নারীর অধিকার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন। ধর্মের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল, কারণ তিনি সেই লোকজ ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছেন, যা ধর্মের সত্যিকার সারটুকু গ্রহণ করে, এবং করে সমৃদ্ধ হয়। তাঁর এই উপন্যাসে মান্নান মাওলানার এক বিপরীত চরিত্র আছেন, মাওলানা মহিউদ্দিন, যিনি ইসলামের মূল্যবোধগুলো ধারণ করে এক শীতল ছায়া মেলে ধরেন প্রতিটি মানুষের মাথায়। মান্নান মাওলানা গ্রামের ছনু বুড়ি মারা গেলে তার জানাজা পড়াতে অস্বীকার করল, যেহেতু ছনু বুড়ি টুকটাক চুরি করে, যদিও পেটের দায়ে। মাওলানা মহিউদ্দিন তার জানাজা পড়ালেন, তার ছেলেকে সান্ত্বনা দিলেন। তাঁকে দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।
মাওলানা মহিউদ্দিনের চরিত্র কি তাহলে একটা ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস, এ কথা প্রমাণ করতে যে মান্নান মাওলানারা ব্যতিক্রম, মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবরাই নিয়ম। না, এর কোনোটিই না। মিলন কোনো শ্রেণি নয়, মানুষ ধরে ধরে এগোন। তাঁর প্রতিটি মানুষই আলাদা। মাওলানা মহিউদ্দিন তেমনই এক মানুষ। প্রথমত তিনি মানুষ, ভালো মানুষ, যেমন দবির গাছি ভালো মানুষ, মরণি ভালো মানুষ, ফুলমতি ভালো মানুষ। তারপর তাঁর কিছু দায়িত্ব আছে, তিনি মসজিদের ইমাম। সেই দায়িত্ব তিনি সুচারুভাবে পালন করেন। দবিরও তার দায়িত্ব পালন করে, মরণিও। মানুষের অবস্থানেই এরা মর্মস্পর্শী।
একই কারণে মান্নান মাওলানার পরাজয়টা বাস্তবকে পাশ কাটিয়ে রূপকথার অঞ্চলে চলে গেলেও এক হিসাবে এই পরাজয়ের কারণটা তার মানুষ হিসেবে অকৃতকার্য হওয়ার জন্য। আতাহারও শক্তিশালী ছিল, কপট ও ভণ্ড ছিল; সে মদ খায়, বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গী করে সন্তানও উৎপাদন করে, এবং স্বার্থপরতার প্রয়োজনে বাবার কুকর্মকে সমর্থন করে। কিন্তু যেদিন তার মা তার মিথ্যাবাদিতার প্রমাণ পেয়ে (এবং একই সঙ্গে স্বামীর মিথ্যাবাদিতার নতুন কিস্তির সন্ধান পেয়ে) অবিশ্বাস ও ঘৃণা নিয়ে হৃদপিণ্ডের দুর্বলতায় মারা গেলেন, সেদিন আতাহারের মনুষ্যত্বের কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না। মাওলানাবাড়ির বঞ্চনায় পোড়া অতৃপ্ত পারুকে অনেক দিন আতাহার তার অধিকারে রেখে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে তার সঙ্গে। কিন্তু বাবার বাড়ি ফেরত যাওয়া পারু তাকে পথ দেখিয়ে দিল। তার শত অনুনয়েও পারুর মন গলল না, বরং আতাহার ও তার বাবাকে ‘গুয়ের পোকা’ অভিধা দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। আতাহার কাঁদল, কপাল চাপড়াল, কিন্তু পারুর অবস্থানের উনিশ-বিশ হলো না। গুয়ের পোকাই বটে, মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটা না থাকলে এ রকমই তো হওয়ার কথা।
ঠিকই পরাজিত হলো আলী আমজাদও। উপন্যাসের শুরুতে সেও ছিল অপ্রতিরোধ্য। নূরজাহান তাকে চিনেছিল, কিন্তু কিশোরী নূরজাহান তখনো তার জগৎটাকে দেখছে মাওয়া সড়কের মতো এক বিস্ময় হিসেবে—যেন দূরের জগতের সঙ্গে এক বিস্ময়কর যোগাযোগ অপেক্ষা করছে তার জন্যও। আমজাদেরও কুদৃষ্টি পড়েছিল নূরজাহানের ওপর, কিন্তু ভাগ্য মেয়েটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তবে আমজাদের নিষ্ঠুরতার বলি হতে হয়েছে বদর ও হেকমতকে এবং এক দুর্ঘটনায় তারই সড়ক নির্মাণের শ্রমিকদের ফেলা মাটিতে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মজনুর বাবা আদিলদ্দিকে। আদিল নামাজ পড়তে ঢালের দিকে বসেছিল। একসময় আমজাদের বাড়তে থাকা পাপ তাকে কাবু করেছে। সেও পরাজিত হয়েছে, নিজের লোভ ও ক্ষমতার নির্মমতার কাছে।
ইংরেজিতে যাকে ‘ক্যামিও’ বলে, সে রকম একঝলক দেখা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে আরেক অমানুষ, রিকশাচালক রুস্তম। গ্রামের পাগলি মেয়ে তছিকে সে ফুসলিয়ে রিকশায় চড়িয়ে নিয়ে গেছে এক বাজারে মুরলিভাজা কিনে দেওয়ার জন্য। সেখানে সে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে অরক্ষিত ওই মেয়েটিকে। কিন্তু তছি সাধারণ মানুষ নয়, তার অতিমানুষি কিছু শক্তি আছে, অমানুষ হতে থাকা একটি পাষণ্ডের জন্য যা ভয়ংকর। রুস্তম পরাজিত হয় তার লালসার কাছে, তছি হয় তার শাস্তির নিমিত্ত। তবে তছির জীবনও তারপর পাল্টে যায়। পাগল হোক যা-ই হোক, জীবনবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর একটি-দুটি অন্তত সে বুঝতে পারে, বাস্তবের আইন আর অপরাধ-শাস্তির দু-এক ধারা সম্পর্কেও তার ধারণা আছে। তবে আমার শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, তছি পুলিশের হাতে পড়বে না। কারণ তছি পুলিশের চালাক পৃথিবী আর আইনের ছোট-লম্বা হাতের মাপের বাইরের এক অস্তিত্বের নাম।
অবাক, নানা বয়সের নারীরাই এই উপন্যাসের মনুষ্যত্বকে জাগায়, প্রখর করে, তার বিপন্নতাকে নিজেদের জীবনের বিনিময়েও রক্ষা করে। নূরজাহান যখন থুতু ফেলল মান্নান মাওলানার মুখে, সে তার নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাকে ত্বরান্বিত করল। সেই মনুষ্যত্ব আমরা দেখলাম বাদলা নাদের এবং অন্যান্য কিশোরের মধ্যে। তছি স্বাভাবিক মানুষ নয়, তবু সে ওই অসমাপ্ত মানুষিতা দিয়েও মনুষ্যত্বকে ওপরে নিয়ে গেল। আর পারুর নিজের জীবনে ছিল এত অসম্পূর্ণতা, অনেক স্খলনও। তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোটাও একটু কঠিন। কিন্তু সেও এক অমানুষকে অরক্ষিত করে দিয়ে মনুষ্যত্বকেই জাগাল।
মনুষ্যত্ব ছিল মরণির, ফিরোজার, নূরজাহানের মা হামিদার, কিছুটা দেলোয়ারার, এমনকি মান্নান মাওলানার স্ত্রীরÑনিজের নিজের মতো মাপে। সন্দেহ নেই মিলনের নারী চরিত্রদের গভীরতা প্রচুর, তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যও অনেক। কে ভেবেছে নূরজাহানকে দুদণ্ড শান্তি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া রব্বানের প্রথম স্ত্রীও অনুশোচনা করবে নূরজাহানের জন্য, তার মনটা খারাপ হবে? বাস্তবের এই চরিত্রগুলোর হাত-পা এমনি বাঁধা, তারা প্রথা ও প্রচলের দাস হয়েই জীবন যাপন করে, পুত্রবধূ-শাশুড়ি সম্পর্কটা সমস্যাসংকুল, একান্নবর্তী বাড়িতে সংসারের জীবনটা তো আরো। আর এইসব সমস্যা ও অসুখ তৈরি করে পিতৃতান্ত্রিকতা। কিন্তু মিলনের কৃতিত্বটা এই—তাঁর নারীরা এসব সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেই একটা-দুটা মহিমার অবস্থানে চলে যায়, যাকে অন্যভাবে বললে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাও বলা যায়। ছনু বুড়ির পুত্রবধূ যে বানেছা—যার কাজ ছিল শাশুড়ির জীবনটা ভাজা ভাজা করা—একসময় সেও শাশুড়ির দুঃখে কাতর হয়, মেয়েকে বলে, শাশুড়ির সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করে সে অপরাধ করেছে।
‘নূরজাহান’-কে ঘনিষ্ঠভাবে পড়লে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, প্রথমত মিলন এটিকে একটি এপিকধর্মী ব্যাপ্তি দিতে চেষ্টা করেছেন। তিন খণ্ডে—এবং খণ্ডগুলোর মধ্যে সময়ের অনেক দূরত্ব—লিখলেও উপন্যাসটির ভেতর একটি ব্যাপক ঐক্য আছে, বিশালতা আছে। আমার মনে হয়েছে, এপিকধর্মী যেকোনো কাজের মতোই এ উপন্যাসটিকে তিনি একটি সুচারু চিন্তা, নীতিবোধ অথবা শ্রেয়বোধের একটি কাঠামোর ভেতর স্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। এ জন্য পাপ-নিষ্পাপতা, নীতি-নীতিহীনতা, পাশবিকতা-মনুষ্যত্ব, সংকীর্ণতা-উদারতার একটা ডায়ালেকটিক বা দ্বন্দ্বমানতা সক্রিয় থাকে পুরো উপন্যাসে। কিন্তু এই দ্বন্দ্বমানতা উপন্যাসটির কোনো সরল পাঠ উপহার দেয় না, যেহেতু এপিকধর্মী লেখার মতো এ উপন্যাসেও চরিত্রগুলো তাদের জীবনকে ছাপিয়ে ওঠে। পশ্চিমা এপিকধর্মী লেখায় সাধারণত ‘সাধারণ’—অর্থাৎ আটপৌরে, প্রান্তিক—মানুষজনের ভূমিকাটা থাকে সীমিত, কিন্তু মিলন এদেরকেই উপজীব্য করেন। এক এনামুল ছাড়া কেউই প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক নয়। তবে এনামুলের টাকা থাকলেও আভিজাত্য নেই, সে কুলীন শ্রেণিতেও পড়ে না। মেদিনীমণ্ডলের সামান্য সামাজিক ভূগোলে স্থাপিত মানুষগুলো যখন জীবনকে ছাড়িয়ে বড় হতে থাকে, তখন বুঝতে হয় এর পেছনে আছে কল্পনার ব্যাপ্তি। প্রকাশের শক্তি আর গল্প-কাঠামোকে টান টান রেখে পাঠককে ধরে রাখার লেখকের দক্ষতা।
তবে এর বাইরে যা আছে, যা উপন্যাসটিকে গতিশীল, পরিব্যাপ্ত করে, বাবুই পাখির বাসার মতো এক আশ্চর্য কাঠামো নিয়ে আমাদের মনে জেগে থাকে, তা হচ্ছে এর পেছনে মিলনের বিনিয়োগ। মিলনকে অমনোযোগী লেখক কেউ বলবে না, যদিও তাঁর দু-একটি উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে নিজেকে যথেষ্ট সময় দেননি, যেটুকু যত্নবান তিনি ভাষার প্রতি, চরিত্র সৃষ্টির প্রতি, ততটা যত্নবান হননি। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এ নিজেকে শতভাগ দিয়েছেন তিনি। আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস লিখেছিলেন, প্রতিটি লেখায় তিনি নিজেকেই পুনর্নির্মাণ করেন। ‘নূরজাহান’-এর ক্যানভাসজুড়ে আছে মিলনের সংবেদী সত্তা, কিন্তু এতে তিনি একটি গল্প শুধু নির্মাণ করেননি, করেছেন নিজের জানা পৃথিবীটাকেও, নতুন করে, এবং পুনর্নির্মাণ করেছেন নিজেকেও। উপন্যাসের শেষে ‘লেখকের বক্তব্য’ অংশে তিনি প্রকারান্তরে এটি স্বীকারও করে নিয়েছেন। নূরজাহান মেয়েটি তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, তৃতীয় খণ্ডে এসে তার হাত থেকে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা, কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি দেখতে পান, মেয়েটি তাঁর অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে। এ এক অপূর্ব রাসায়নিক সংবদল। লেখক যখন চরিত্রকে এতটা অন্তস্থিত করেন, চরিত্র তাঁকেও বদলে দেয়। নূরজাহানকে মিলন দেখেন বাইরে থেকেও, তাঁর সচল ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার অস্থির ছুটে চলা, তার নিষ্পাপ আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। ভেতরের আর বাইরের নূরজাহানের যোগফল এক অসাধারণ চরিত্র সৃষ্টি করে, যার বড় একটা শখ হচ্ছে ছুটে বেড়ানো। সেই নূরজাহানই শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ পড়ে থাকে, মানুষের আর অ্যানড্রিনের বিষে নীল, মিলন এ উপন্যাসে নিজেকে বিনিয়োগ করেছেন বলে এর বোধগুলো শুদ্ধ। বোধের প্রকাশগুলো শুদ্ধ। ভাষাটিও শুদ্ধ, মাটির কাছে। ‘নূরজাহান’-এর আগে একই উপন্যাসে কোনো বর্ণনাকারী তাঁর আখ্যানের জন্য একই সঙ্গে প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, তেমন নজির আমার স্মৃতিতে নেই।
মিলন বিনিয়োগ করেছেন মেদিনীমণ্ডলের ভ‚গোলে, সমাজে, এর নিত্যদিনের জীবনে। ফলে যত ভূদৃশ্য তিনি বর্ণনা করেন, শীত-বসন্ত-বর্ষার পালাবদলের চিত্র আঁকেন, তার প্রধান পরিচয় হয় বিশ্বস্ততা। সামাজিক সম্পর্ক, আচার এবং প্রতিদিনের কাজকর্ম ও পেশার বর্ণনাতেও থাকে বস্তুনিষ্ঠতা। তবে সবচেয়ে যা টানে পাঠককে, তা অত্যন্ত সামান্য, সীমাবদ্ধ ও সাদামাটা জীবন নিয়েও চরিত্রগুলোর জীবন্ত হয়ে ওঠা। এক গ্রাম চরিত্র আছে উপন্যাসটিতে, এবং তারা সবাই খুব সাধারণ। দবির গাছি অথবা আজিজ গাওয়ালি, কুট্টি অথবা আলফু, রাবি অথবা মোতালেব—এদের কী দাবি আছে সাহিত্যের কাছে, জীবনের কাছে? ছায়ার মানুষ তারা—এ রকম এক শজন আমাদের ঘিরে রাখলেও কি তাদের চোখে পড়ে আমাদের? কিন্তু মিলন শুধু তাদের দেখেনইনি, তাদের স্থান দিয়েছেন সাহিত্যের শুদ্ধ কল্পনায়।
-------২-------
‘নূরজাহান’ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে, জয়নুলের বড়মাপের স্ক্রলচিত্রের মতো, তা শুধু এর ব্যাপ্তি নয়, এর গভীরতার জন্যও। ধরা যাক কুট্টি ও আলফুর কথা। দরিদ্র কাজের মেয়ে কুট্টি, কাজের লোক আলফু। তাদের চোখে পড়ারই কথা নয় কারো। কিন্তু তাদের প্রেম হয়, প্রেমটাও একটু জটিল, যেহেতু আলফুর স্ত্রী-সন্তান আছে। মিলন এই প্রেমের বর্ণনা দেন এক প্রসন্ন রোমান্টিকতায়, যেন তারা কত কুলীন মানুষ, যেন তাদের জীবনে কত সংস্কৃতি আর শিক্ষা আছে, শুদ্ধ ভাষা চর্চা আছে! অথচ কত সীমাবদ্ধ তারা, এই গ্রামের বাইরের জগৎটা কুট্টির হয়তো দেখা হয়নি। যখন এ রকম দুই মানুষের প্রেমকে বর্ণনায়-বিশ্লেষণে নিয়ে আসেন মিলন, তাতে একটা গভীরতা আসে, যে গভীরতা অনুভবের, অন্তর্দৃষ্টির। দ্বিতীয় একটি কারণ হচ্ছে ‘নূরজাহান’-এর কাহিনী, কাঠামো এবং দর্শনগত ঐক্য। শুনতে অবাক লাগার মতো হলেও বলা দরকার, উপন্যাসটির একটি দর্শন আছে, নান্দনিকতার উদ্ভাস আছে, এবং তা জীবনকে ঘিরেই। নূরজাহানের অপমৃত্যু হয়, কিন্তু মৃত্যুতে সে শেষ হয়ে যায় না, বলা যায় পাঠকের চেতনায় তার পুনর্জন্ম হয়। মেয়েটিকে ঘিরে উপন্যাস, তার জীবনের এক সকালবেলা থেকে এর শুরু, এক অকালসন্ধ্যায় তার শেষ। নূরজাহানের জীবনটা যে রকম চলতে চলতে বদলে যায়, তাকেই মিলন সাক্ষী মানেন, আমাদের বলেন, জীবনের স্থায়িত্ব নেই, সুন্দরের আছে, সত্যের আছে। আর যে জীবন সুন্দরের, সত্যের, তার স্থায়িত্ব মহাজীবনের।
নূরজাহানের জীবনের সৌন্দর্য ও সত্যগুলোকে উদ্ঘাটন করেছেন, বর্ণনা করেছেন, সাজিয়েছেন মিলন। এ জন্য নূরজাহান এ রকম এক মোহ-ধরানো চরিত্র পাঠকের জন্য। তার খুব কাছে আসতে পেরেছিল মজনু নামের ছেলেটি, যাকে মেয়েটি ভালোবেসেও ছিল। কিন্তু মজনুর শক্তি নেই কোনো কিছু করার, কোনো কিছু বদলে দেওয়ার। সে গ্রামে থাকে না, যদিও শহরে থাকার সময় গ্রামটা থাকে তার ভেতরে। মজনুর সঙ্গে যে নূরজাহানের সম্পর্ক হবে না, বিয়েও হবে না, সেটি মনোযোগী পাঠক বুঝতে পারেন। এই গ্রামে মজনু থাকবে না, তার পেশা ও ভবিষ্যৎ শহরে, নূরজাহানও গ্রাম ছেড়ে বাইরে যেতে পারবে না। টমাস হার্ডির কয়েকটি উপন্যাসের পটভ‚মি ইংল্যান্ডের ওয়েসেক্স অঞ্চল, যা চরিত্রদের ধরে রাখে নিয়তির মতো। ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য নেটিভ’ উপন্যাসের ইউস্টাসিয়া ভাই নামের মেয়েটি পালাতে চায় এই জায়গা থেকে, যেখানে আশা বা ভবিষ্যৎ নেই। প্রেমিকের হাত ধরে পালায়ও সে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না, ওয়েসেক্স অঞ্চলেই সে অঘোরে মারা পড়ে। মেদিনীমণ্ডলও নূরজাহানের নিয়তি, যে নিয়তির সুতা ধরে টান দেয় মান্নান মাওলানার মতো লোকেরা। হার্ডির মতো ট্র্যাজিক বোধ মিলন জাগান ‘নূরজাহান’-এ। দেখান সময়, স্থান আর ইতিহাস কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। নূরজাহান সংগ্রাম করে তার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, কিন্তু পরাজিত হয়। মাওয়া সড়কটি তাকে টানে, কিন্তু সেও হয়তো জানে, এই সড়কটি তার জন্য নয়। এই সড়ক গিলে নেয় ছেলের জন্য কাতর আদিলদ্দিকে। আদিলদ্দিরও পথ শেষ হয় মেদিনীমণ্ডলে। এবং, মান্নান মাওলানারও।
‘নূরজাহান’-এর এক বড় শক্তি এর আকর্ষণীয় দৈনন্দিনতা। মিলন একে বর্ণনা করেন অনেক দৃশ্য-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শে; প্রতিদিনের গৃহস্থালি চর্চা থেকে নিয়ে টুকটাক আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী অথবা পেশার বিবরণে কোথাও আরোপিত কিছু নেই, কষ্টকল্পিত কিছু নেই। যেন কেউ নির্মোহ এক চলমান ক্যামেরায় ধরে রাখছে প্রতিদিনের জীবন। মিলন বর্ণনাও করেন খণ্ডে খণ্ডে। চার পৃষ্ঠা বানেছার গল্প তো তিন পৃষ্ঠা নিখিলের কথা। কিন্তু টুকরো টুকরো এসব গল্প এক অবাক মোজাইক শিল্পের মতো পাশাপাশি জোড়া লেগে তুলে ধরে একটি গ্রামের অসামান্য কিছু ছবি। একটি বা একজনের ঘটনা থেকে অন্য বা আরেকজনের ঘটনায় মিলন যান অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে। একটা সুবিধা অবশ্য তিনি আদায় করে নেন তাঁর গতিশীলতার গুণে : কোথাও ছন্দপতন হয় না, কার্যকারণ সূত্রে ছেদ পড়ে না, যেন একটাই গল্প তিনি বলছেন, এক টানে।
মিলন না জানালে আমাদের কাছে এই রহস্যটা অজানা রয়ে যেত যে তিনটি খণ্ড তিনি সমাপ্ত করেছেন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। শেষ খণ্ডটি তিনি নিজেকে নিয়ে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এর কাহিনীরেখাটি এতটাই টান টান যে এই যুদ্ধের কোনো ছায়া সেখানে পড়ে না।
--------৩-------
মিলনকে দু-একবার বলেছি ‘নূরজাহান’ নিয়ে লিখব। কিন্তু লিখতে গিয়ে এতটা উত্তেজনা আর আনন্দ অনুভব করব, ভাবতে পারিনি। এটি সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া একটি উপন্যাস, অথচ কী সাধারণ এর গল্প—প্রতিদিনের, অতিচেনা। এই চেনা গল্পটিই মিলন লিখেছেন এতটা দরদ, শক্তি আর অধিকার নিয়ে যে শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক অলডাস হাক্সলির কথাটাই উপন্যাসটি প্রমাণ করে ছাড়ে : জীবনে যা সাধারণ, তাকেই অসাধারণ করে তোলা সাহিত্যের কাজ। সব সাহিত্যিক তা পারেন না, কয়েকজন পারেন।
মিলন সেই কয়েকজনের একজন।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1427)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
-
▼
2019
(6282)
-
▼
February
(329)
-
▼
Feb 10
(11)
- উইঘুর মুসলিমদের প্রতি সম্মান দেখাতে চীনের প্রতি তু...
- গরুর দুধ ও দইয়ে কীটনাশক, অণুজীব ও সিসা!
- বাংলাদেশি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লব...
- মুসলিম নারীরা কেন হিজাব পরেন? by কেইতলিন কিলিয়ান
- ‘নূরজাহান’ : সময়কে ছাড়িয়ে যায় যে গল্প by সৈয়দ মনজু...
- উগেৎসু : যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের মহাকাব্য by জাহিদ সোহাগ
- মিতু কারাগারে
- থাই প্রিন্সেসকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক
- খালেদা জিয়া: রাজনৈতিক যত সফলতা এবং ভুল -বিবিসি বাংলা
- ২০ বছরের শিশু! by আমিনুল ইসলাম লিটন
- ক্যামেরার সামনে পুরো নগ্ন ৪ নারী
-
▼
Feb 10
(11)
-
▼
February
(329)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ইরান
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
কালবেলা
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
রাশিয়া
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
হিন্দু
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
স্বাস্থ্য
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
জীবনযাপন
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কলকাতা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
মসজিদ
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ইয়েমেন
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
Exclusive
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
জনস্বাস্থ্য
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জোহরান মামদানি
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment