স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন ভারাল্লো

শতবর্ষ পেরোলেন এই সেদিন। ঝাপসা হয়ে এসেছে চোখের দৃষ্টি। জড়িয়ে যায় কথা। কিন্তু ফ্রান্সিসকো ভারাল্লোর স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল ১৯৩০ বিশ্বকাপ। এখনো তাঁর স্পষ্ট মনে আছে চামড়ার ভারী একটা বল দিয়ে হয়েছিল খেলা। শরীরে আঘাত নিয়েও খেলতে যেতে হয়েছিল মাঠে, কারণ বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম চালু হয়নি তখনো। আর সবচেয়ে বেশি মনে আছে, ২-১ গোলে এগিয়ে থেকেও প্রথম বিশ্বকাপটা জেতা হয়নি তাঁর আর্জেন্টিনার। উরুগুয়ের কাছে হেরে গিয়েছিল ৪-২ গোলে।
ভারাল্লো, ১৯৩০ বিশ্বকাপে খেলা একমাত্র জীবিত খেলোয়াড়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন করলেন তাঁর শততম জন্মবার্ষিকী। ফিফার পক্ষ থেকেও জানানো হলো বিশেষ সম্মাননা। আবেগে ভেসে যাওয়া ভারোল্লো অশ্রু আর কণ্ঠে খানিকটা শ্লেষ মেখে জানালেন, ‘আমার সারা জীবনে কখনোই এভাবে সম্মান পাইনি।’
বুয়েনস এইরেসের লা প্লাটায় আয়োজন করা হয়েছিল সম্মাননা অনুষ্ঠানের। শুরুতেই বড় পর্দায় ভেসে উঠছিল সাদা-কালো স্থির সব ছবি। ১৯৩০ বিশ্বকাপের স্মৃতি আঁকা যেগুলোর পটে। ইউরোপের খেলোয়াড়েরা ১৫ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে পৌঁছেছিলেন মন্টেভিডিওতে। সবার মাথায় হ্যাট, পরনে ব্লেজার। পর্দায় ভেসে উঠল ছবি: ট্যাঙ্গো কিংবদন্তি কার্লোস গারদেল আর্জেন্টিনা দলকে অনুপ্রাণিত করতে ফাইনালের দিন হাজির ড্রেসিংরুমে। ভেসে উঠল ২০ বছর বয়সী ভারাল্লোর ছবিও।
ফুটবল ক্যারিয়ারটাই শুরু করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে। নিজের শহরের ক্লাব জিমনাসিয়া ডি লা প্লাটার হয়ে। তাঁর সময়েই ১৯২৯ সালে ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র হয়ে থাকা লিগ শিরোপাটি জিতেছিল। পরের বছর ভারাল্লো চলে আসেন বোকা জুনিয়র্সে। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত খেলেছেন এখানে। বোকার হয়ে গোল করেছিলেন ১৮১টি। যে রেকর্ড ২০০৮ সাল পর্যন্ত অটুট ছিল।
১৯৩০ বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ও ছিলেন। ডান পায়ে গোলার মতো শট নিতে পারতেন বলে তাঁকে ডাকা হতো ‘লিটল ক্যানন’ নামে। বিশ্বকাপ চলার সময় চিলির বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেমিফাইনালটা খেলা হয়নি তাই। অবশ্য ফাইনালে ঠিকই ফিরেছিলেন এই স্ট্রাইকার।
প্রথমার্ধে এগিয়ে থেকেও শিরোপা জিততে না পারার পেছনে আজও ভাগ্যকেই দোষ দেন ভারাল্লো, ‘চোটের কারণে আমরা ১০ জনের দল হয়ে পড়েছিলাম। এর পর আরও একজন মাঠের বাইরে চলে গেল, তার পরও আরও একজন। আমি চোট পেয়েছিলাম বারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে। হাঁটতেই পারছিলাম না। তখন থেকেই ওরা (উরুগুয়ে) ম্যাচে দাপট দেখাতে শুরু করল। অবশ্য আমার সতীর্থদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সেদিন আমরা যথেষ্ট সাহস নিয়ে খেলতে পারিনি। ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর আমি খুব কেঁদেছিলাম।’
ওই বিশ্বকাপে একটি মাত্র গোল করেছিলেন ভারাল্লো। কিন্তু তার পরও ফুটবলে তাঁর অবদানের জন্য ফিফার সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিফা অর্ডার অব মেরিট দেওয়া হলো তাঁকে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হুলিও গ্রন্ডোনা এদিন তাঁকে আকাশি-সাদা জার্সিও উপহার দিয়েছেন। জার্সির নম্বর—১০০!
বিশ্বকাপে আর খেলা হয়নি। শিরোপাও জেতা হয়নি তাই। এক বুক আশা নিয়ে ২০১০-এর দিকে তাকিয়ে আছেন ভারাল্লো। উত্তরসূরিরা যদি জেতে, তাতেই তৃপ্তি তাঁর!