Thursday, April 9, 2026
খলিফার পরিকল্পনা ও চার সেনাপতির অগ্রযাত্রা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
খলিফার পরিকল্পনা ও চার সেনাপতির অগ্রযাত্রা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
আবু বকর (রা.)
চারজন সুদক্ষ সেনাপতিকে নির্বাচন করেন এবং প্রত্যেককে শামের নির্দিষ্ট
অঞ্চলে অভিযানের দায়িত্ব দেন। এটি ছিল খলিফার অত্যন্ত সুচিন্তিত রণকৌশল। এর
মাধ্যমে তিনি বাইজেন্টাইন বাহিনীকে বিভক্ত করে ফেলেন, ফলে তারা সম্পূর্ণ
শক্তি নিয়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর একযোগে আক্রমণ করতে অক্ষম হয়। খলিফা
সেনাপতিদের এইভাবে পাঠানÑআমর ইবনুল আসকে ফিলিস্তিনে, ইয়াজিদ বিন আবু
সুফিয়ানকে দামেস্কে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে হোমস ও মধ্য সিরিয়ায়,
শুরাহবিল বিন হাসানাহকে জর্ডানে।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধের নৈতিক নীতিমালা
মুসলিম
বাহিনী যখন মার্চ করে মদিনা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, খলিফা আবু বকর (রা.)
তখন চার ফ্রন্টের একটির সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পাশেপাশে
হাঁটছিলেন। এ সময় খলিফা ইয়াজিদকে কয়েকটি উপদেশ ও যুদ্ধের কিছু নীতিমালা
উল্লেখ করে দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের নৈতিক নীতিমালা হিসেবে যা এখনো
অমর হয়ে আছে।
ইয়াজিদকে দেওয়া খলিফার কয়েকটি অমর নির্দেশনা—
১. নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা : কোনো অবস্থাতেই বয়োবৃদ্ধ, নারী বা শিশুকে হত্যা করা যাবে না। এটি ছিল তৎকালীন অমানবিক যুদ্ধনীতিকে পরিশোধনের নতুন উদ্যোগ।
২. প্রকৃতির সুরক্ষা :
যুদ্ধের সময়ও প্রকৃতির প্রতি সংযম দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কোনো
ফলদার গাছ কাটা যাবে না এবং শস্যক্ষেত বা বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ
ছিল। যুদ্ধের ময়দানেও যেন পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে খলিফা আবু বকর
(রা.) বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
৩. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা : সন্ন্যাসী বা ধর্মগুরু, যারা উপাসনালয়ে নিভৃতে উপাসনা করে, তাদের বিরক্ত করা যাবে না এবং কোনো গির্জা ও মন্দির ধ্বংস করা যাবে না।
৪. নিষ্ঠুরতা বর্জন : শত্রুদের মৃতদেহ বিকৃত (Mutilation) করা যাবে না এবং কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা বা বর্বরতা প্রদর্শন করা যাবে না।
৫. সম্পদের সুরক্ষা
: প্রয়োজনীয় খাদ্য ছাড়া কোনো গবাদি পশুÑযেমন উট, গরু বা ছাগল জবাই করা
যাবে না। মালে গনিমত খেয়ানত বা লুটপাট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
বিজয়ের ঝান্ডাবাহিরা
খলিফা
আবু বকর (রা.)-এর এই সাহসী পদক্ষেপ শুধু আরবের জন্যই নয়, বরং পুরো পৃথিবীর
জন্য ছিল নতুন ভোরের সূচনা। চারটি সুশৃঙ্খল বাহিনী যখন ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে
উত্তরের দিকে যাত্রা শুরু করল, তখন মদিনার ধূলিধূসরিত আকাশে লেখা হতে থাকল
ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। একদিকে আমর ইবনুল আস (রা.) গাজার উপকূল ধরে
এগোচ্ছিলেন, অন্যদিকে আবু উবাইদাহ ও ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) তাবুক ও
জর্ডান উপত্যকার মধ্য দিয়ে শামের হৃৎপিণ্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এটি
শুধু সামরিক সংঘাতের সূচনা ছিল না, ছিল এক জরাজীর্ণ ও শোষণমূলক ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে এক নতুন ও ইনসাফভিত্তিক জীবন দর্শনের লড়াই।
শাম অভিযানের
প্রথম ধাপটি ছিল পরবর্তী বড় বিজয়গুলোর ভিত্তি। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব,
কীভাবে এই ক্ষুদ্র বাহিনীগুলো বিপুল শক্তিধর পরাশক্তি বাইজেন্টাইন
সাম্রাজ্যের প্রাচীরে ফাটল ধরিয়াছিল।
বাজে রণডঙ্কা
মদিনার
উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ‘জুরফ’ নামক স্থানে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।
আবু বকর (রা.)-এর জন্য এই অভিযান ছিল অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। একদিকে
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পর ক্লান্ত এক সেনাবাহিনী, অন্যদিকে বিশ্বের
শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। কিন্তু মদিনার পরিবেশে তখন
ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল খোদার প্রতি নিবেদন ও আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস
তৈরি হয়েছিল নবীজি (সা.)-এর সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যদ্বাণী এবং উসামা ইবনে জায়দ
(রা.)-এর সফল অভিযানের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে।
জুরফের সামরিক
ক্যাম্পে তাঁবু খাটিয়েছেন আরবের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা। আবু বকর (রা.) নিজে
তদারকি করছিলেন প্রতিটি বাহিনীর প্রস্তুতি। মদিনায় সবার মুখে মুখে এই
যুদ্ধের আলোচনা। বাইজেন্টাইন সীমান্ত অভিমুখে অভিযানের অর্থ ছিল ইসলামের
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বপরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া। এই সিদ্ধান্ত
বাস্তবায়নের মুহূর্তটি ছিল খেলাফত রাষ্ট্রের জন্য সন্ধিক্ষণ, যা পরবর্তী
শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল।
চার সেনাপতি নির্বাচন ও কৌশলগত পরিকল্পনা
আবু
বকর (রা.)-এর সামরিক প্রজ্ঞার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল, শাম অভিযানের
জন্য একাধিক ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে চারজন আলাদা ব্যক্তিকে সেনাপতি নির্বাচন
করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শাম অঞ্চলটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে খুব
বৈচিত্র্যময়। এই বিশাল ভূখণ্ড জয় করতে হলে এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন, যারা
রণকৌশলে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি ও ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কেও সম্যক
জ্ঞান রাখেন বা দ্রুত সময়ে তা অর্জন করতে পারবেন।
সেনাপতি নির্বাচনে খলিফার দৃষ্টিভঙ্গি
ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান
: ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী নেতা আবু
সুফিয়ানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করলেও তার একাগ্রতা ও
সামরিক নিষ্ঠা আবু বকর (রা.)-এর নজর কেড়েছিল। তাকে ইসলামের ইতিহাসে
‘ইয়াজিদ আলখায়র’ বা কল্যাণময় ইয়াজিদ বলা হয়। নবীজি (সা.)-এর যুগে তিনি
হুনাইনের যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং পুরস্কার হিসেবে ১০০ উট
পেয়েছিলেন।
শাম অভিযানের জন্য তাকে মনোনীত করার প্রধান কারণ ছিল,
তার পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা। কুরাইশদের সঙ্গে
সিরিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ইয়াজিদ সেখানকার ভূ-প্রকৃতি এবং গোত্রীয়
বিন্যাস সম্পর্কে জানতেন। তার ব্যক্তিত্ব ছিল গম্ভীর ও ধীরস্থির, যা
দামেশকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত শহর দখলের অভিযানে অত্যন্ত প্রয়োজন
ছিল। আবু বকর (রা.) তাকে দামেস্ক ফ্রন্টের দায়িত্ব দেন।
শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ
: শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের সাহাবি।
তিনি হাবশায় দ্বিতীয় হিজরতের সময় দেশত্যাগ করেছিলেন এবং পরে নবীজি (সা.)-এর
ওহি লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্দাহ গোত্রের এই সন্তান ছিলেন
অত্যন্ত মেধাবী এবং সংযত। ধর্মদ্রোহ বিরোধী যুদ্ধে তিনি খালিদ (রা.)-এর
অধীনে ইয়ামামার যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন।
শুরাহবিলের
বিশেষত্ব ছিল, ধৈর্য, সংযত আচরণ ও সামরিক শৃঙ্খলাবোধ। জর্ডানের রুক্ষ ও
পাহাড়ি এলাকায় অভিযানের জন্য আবু বকর (রা.)-এর প্রথম পছন্দ ছিল দক্ষ
সেনাপতি।
আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ : আবু উবাইদা (রা.)-এর নাম
শুনলে মদিনার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। নবীজি
(সা.) তাকে ‘আমিনুল উম্মাহ’ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত
করেছিলেন।
আবু উবাইদা ছিলেন খেলাফত রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ।
চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিনয় এবং উচ্চ নৈতিকতা তাকে অন্য সেনাপতিদের চেয়ে আলাদা
মর্যাদা দিয়েছিল। আবু বকর (রা.) জানতেন, যদি কোনো কারণে চার বাহিনী সমবেত
হওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে আবু উবাইদার মতো একজন সর্বজনমান্য নেতাই হতে পারেন
তাদের প্রধান সমন্বয়ক। তাকে সিরিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল হোমস অভিমুখে প্রেরণ
করা হয়।
আমর ইবনুল আস : আমর ইবনুল আস (রা.) ছিলেন সেই সময়ের
আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি কুরাইশদের হয়ে
বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে সফল হয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি (সা.) তাকে
‘জাতুস সালাসিল’ অভিযানে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন, যেখানে আবু বকর
(রা.) এবং উমর (রা.)-এর মতো বড় বড় সাহাবি তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলেন।
আমরের
সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব
বোঝার ক্ষমতা। ফিলিস্তিন মতো মাল্টিপল ফ্রন্ট ও অত্যন্ত কৌশলগত এবং
সংরক্ষিত এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য আমর ইবনুল আসের বিকল্প কেউ ছিল না।
শাম অভিযানে অংশ নেওয়া চার বাহিনীর সম্মিলিত সৈন্য সংখ্যা ছিল সাত থেকে আট হাজারের মধ্যে।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment