Tuesday, August 25, 2026
আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
ফলে আজকের আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইসরাইলের বিষয়ে নীরব থাকা। কারণ ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো মুসলমান ভিন্নমত পোষণ করলেই তার ওপর নেমে আসে অপবাদ, সন্দেহ ও একঘরে করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি। আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ইসলাম ও আরব বিদ্বেষের কারণে বৈষম্য এবং হয়রানির অভিযোগ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য এবং ভুল তথ্যের প্রচারণার কারণে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরলোকগত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী বারাক ওবামার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সে সময় তাকে তার এমন কিছু সমর্থককে সামলাতে হয়েছিল, যারা ছিল নির্লজ্জ বর্ণবাদী ও কট্টর ইসলামবিদ্বেষী। ম্যাককেইনের নিজের মধ্যেও গোঁড়ামি ছিল এবং তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল কট্টরপন্থি, যার জন্য তার কিছুটা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার ভোটারদের একাংশের চরম ও ভারসাম্যহীন আচরণ তাকে হতবাক করেছিল।
ম্যাককেইনের নির্বাচনি প্রচারণার এক সভায় শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক নারী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি ওবামাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি তার সম্পর্কে পড়েছি এবং তিনি আসলে... তিনি একজন আরব।’ কথাটি বলার সময় তার কণ্ঠস্বর ধরে আসে। একজন ‘আরব’ ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন এই চিন্তাই তাকে প্রায় কান্নার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তখন ম্যাককেইন ওই নারীকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ম্যাডাম, ওবামা একজন ভালো পারিবারিক মানুষ ও আমেরিকার নাগরিক। রাষ্ট্রীয় মৌলিক কিছু বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য রয়েছে এবং এই নির্বাচনি প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু সেটাই।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি প্রচারণায় মূলত সেসব বিষয়ই প্রাধান্য পায়, যা নিয়ে সেই নারী ২০০৮ সালেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদকে আক্রমণ করার জন্য রিপাবলিকান সিনেটররা শুধু তার নামের ওপরই বেশি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘মিশিগানের সমাজতন্ত্রী অবশেষে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করলেন। তার নাম আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সায়েদ।’ যদি একজন ‘আরব’ ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়া উদ্বেগের বিষয় হয়, তবে একজন ‘মোহাম্মদ’-এর প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চয়ই আরো ভয়াবহ কিছু হবে উগ্রপন্থি আমেরিকানদের কাছে।
নির্বাচনি প্রচারণাসহ সর্বক্ষেত্রেই আল-সায়েদের ওপর বিরোধীদের আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও তাকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিতে দ্বিধা করেননি। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স গর্ব করে বলেছিলেন, তিনি তার সারা জীবন ‘সন্ত্রাসীদের শিকার’ করেই কাটিয়েছেন। একই মনোভাব নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ন্যান্সি মেস আল-সায়েদ ও নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা কি আমেরিকায় সরকারি পদে ‘সন্ত্রাসীদের’ নির্বাচিত করা বন্ধ করতে পারি না?’ এরপর তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় সরকারি পদে আসীন প্রতিটি মুসলিমই হলো এক একটি ‘ট্রোজান হর্স’ (ছদ্মবেশী শত্রু) এবং তারা জাতীয় নিরাপত্তা ও আমাদের প্রজাতন্ত্র উভয়ের জন্যই হুমকি।’
আজকের দিনে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামকে তীব্রভাবে ঘৃণা না করলে কেউ আধুনিক ও প্রগতিশীল হতে পারে না। সিআইএর সাবেক পরিচালক মাইক পম্পেও এর মতো একজন ব্যক্তি যখন খুব অনায়াসেই আল-সায়েদকে ‘হামাস সমর্থক’ বলে অভিহিত করেন, তখন বোঝা যায় যে, মুসলিমবিদ্বেষের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এই বিদ্বেষ থেকে বাঁচতে হলে আমেরিকান মুসলিমদের বেশ কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো ইসরাইলের প্রতি আনুগত্য, যে শর্তটি পূরণ করতে আল-সায়েদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেনসের কোনো বেগ পেতে হয়নি। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি স্বপ্নেও ইসরাইল নিয়ে ভাবেন। এর বিপরীতে, গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার কঠোর সমালোচনা করে এসেছেন আল-সায়েদ। ফলে তিনি যে উগ্রপন্থি ও ইসরাইল সমর্থক আমেরিকানদের শত্রু হবেন তা বলাই বাহুল্য।
আমেরিকান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার সংজ্ঞা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ‘চরমপন্থা’ থেকে নিজেকে দূরে রাখলেই চলে না, বরং ইসরাইলের বিরোধিতা করা থেকেও বিরত থাকতে হয়। আমেরিকায় ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি আনুগত্যের এই যোগসূত্রটি মোটেও গোপন বিষয় নয়। দেশটির কট্টর নব্য-রক্ষণশীল (নিও-কনজারভেটিভ) চিন্তাবিদ রবার্ট কাগান সম্প্রতি বিষয়টি স্বীকার করেছেন, ‘আমেরিকা সামগ্রিকভাবে ইসলামবিদ্বেষী, তাই অনেক আমেরিকানের কাছে ইসলামের যেকোনো শত্রুই আমাদের বন্ধু। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ একটি বাস্তবতা এবং ইসরাইলকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে দেখা হয়।’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুক্তি শুধু মুসলিমদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসরাইলের সমালোচনা করলে একজন ইহুদিও ‘খারাপ ইহুদি’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।
ইসরাইলের পক্ষে সোচ্চার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যতম অ্যালান ডারশোভিটজ সম্প্রতি সেসব ‘বাজে ইহুদি’র সমালোচনা করেছেন যারা আল-সায়েদ ও মামদানির মতো প্রার্থীদের সমর্থন করার সাহস দেখান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আসল সমস্যাটা হলো ইহুদিরাই’ এবং ‘তারা আসলে কী করছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই।’
ডারশোভিটজের মতে, ‘যেকোনো ইহুদি যদি মামদানিকে ভোট দেন তবে তিনি আসলে নিজেকেই ঘৃণা করেন।’ তার এই অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও। একজন অ-ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওইসব ‘বাজে ইহুদি’র চেয়ে নিজেকে ‘অনেক বেশি কার্যকর ইহুদি নেতা’ হিসেবে দাবি করেন।’
এই প্রবণতাটি শুধু আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেহালাবাদক মাইকেল বারেনবোইম তার পর্যবেক্ষণ বলেছেন, ‘জার্মানিতে যেসব ইহুদি জায়নবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন তাদের আর প্রকৃত ইহুদি হিসেবে গণ্য করা হয় না।’ অন্যদিকে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘জুইশ ক্রনিকল’ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘এড মিলিব্যান্ড আসলে কতটা ইহুদি?’
পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এই বার্তাটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, একজন ‘ভালো মুসলিম’ বা ‘ভালো ইহুদি’ হওয়ার জন্য শুধু ইসরাইলের প্রতি অবিচল আনুগত্যই যথেষ্ট নয়, বরং যারা ইসরাইলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে সেসব মুসলিমের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করাও ইহুদিদের জন্য জরুরি। ফলে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে ‘ভালো’ মুসলিম হওয়ার সংজ্ঞা হচ্ছে তাকে অবশ্যই ইসরাইলের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
* ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

About: Kutubi Cox
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(2003)
-
▼
August
(340)
-
▼
Aug 25
(9)
- শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারো উত্তাল ভারত
- হিজাব পরা ইসলামে অপরিহার্য আচার নয়: ভারতের হাইকোর্ট
- যে ৩টি কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হার ...
- পথ হারিয়ে ফেলা সেই ইয়ামিই এখন...
- আমেরিকায় ‘ভালো’ মুসলিম নেই!
- খলিফা ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা by নাসরুল্লাহ...
- নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা
- খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী ...
- পুরুষ বন্ধ্যত্ব কেন হয়, সমাধান কী by ডা. অবন্তি ঘোষ
-
▼
Aug 25
(9)
-
▼
August
(340)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment