কুমির প্রজনন কেন্দ্র: ডিম পেড়েছে সখিনা by এম জসীম উদ্দীন

তালতলীর সোনাকাটা ইকোপার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রে
ডিমের পাশে সতর্ক পাহারায় সখিনা l ছবি: প্রথম আলো
লোনা পানির স্ত্রী কুমিরটির নাম সখিনা। আবাস বরগুনার সোনাকাটা ইকো পার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রে। জুনের শেষ সপ্তাহে ডিম পেড়েছে ২৫-৩০টি। বন বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, ডিম ফুটে প্রাকৃতিক উপায়েই জন্মাবে কুমিরছানা।
কুমির প্রজননকেন্দ্রটির অবস্থান বরগুনা তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি বনে। এটি সুন্দরবনের পরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল। সেখানকার সোনাকাটা ইকোপার্কে এই প্রথম কোনো কুমির ডিম পাড়ল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে সখিনাকে ডিমে তা দিতে দেখেন।
বন বিভাগ সখিনা বিটের কর্মকর্তা সজীব কুমার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, প্রাকৃতিক নিয়মে ডিমে তা দেওয়া এবং ছানা জন্মানোর সুবিধার্থে কুমির প্রজননকেন্দ্রে তাঁরা দর্শনার্থীদের প্রবেশ আপাতত বন্ধ রেখেছেন। এ ছাড়া সাতটি ডিম আলাদা করে বিশেষ ব্যবস্থায় (হিপ পদ্ধতি) বালু চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, যেন সেগুলো ঠিকমতো ফুটতে পারে। এবার যেহেতু প্রথমবার ডিম দিয়েছে, তাই কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফোটানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
বন বিভাগ সূত্র আরও জানায়, প্রাকৃতিক নিয়মে কুমিরের বাচ্চা না ফুটলে আগামী বছর থেকে ইনকিউবেটর যন্ত্রে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় (২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ডিম ফোটানোর ব্যবস্থা করা হবে।
ইকো-টুরিজমের সুযোগ বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সখিনা বিটে ২০১১-১২ অর্থবছরে সোনাকাটা ইকো পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর এখানে আটটি হরিণ, ২৪টি শূকর, আটটি চিতাবাঘ, দুটি অজগর ও দুটি শজারু অবমুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে এখানে বড় একটি দিঘি খনন করে সেখানে কুমির প্রজননকেন্দ্র স্থাপন করে তিনটি কুমির অবমুক্ত করা হয়। একটি বছর দেড়েক আগে মারা যায়।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাকাটা ইকো পার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রের দিঘির পাড়ে বালু খুঁড়ে শুকনো লতাপাতা দিয়ে তৈরি করা বাসায় পাড়া ডিমে তা দিচ্ছে সখিনা। খাবারের খোঁজে মাঝে মাঝে দিঘিতে নামলেও বেশির ভাগ সময় ডিমে তা দেয় এবং আশপাশে পাহারা দেয় সে।
সখিনার পাড়া ডিমের কয়েকটি।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণত কার্তিক থেকে পৌষ মাসে স্ত্রী কুমির ডাঙায় ৩০-৩৫টি ডিম পাড়ে। এ জন্য বালুতে ৪৫-৬০ সেন্টিমিটার গভীর গর্ত করে সেখানে ডিম রেখে বালু দিয়ে ঢেকে রাখে। কুমির দুটি সারি করে ডিম পাড়ে এবং বালু দিয়ে প্রতিটি সারি আলাদা রাখে। ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বেরোয় এবং কিচ কিচ শব্দ করে। সেই আওয়াজ শুনে স্ত্রী কুমির ছানাগুলোকে বের করে আনে এবং সঙ্গে করে পানিতে নিয়ে যায়। বরগুনা জেলা রাখাইন-বৌদ্ধ সমাজকল্যাণ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব খেমংলা তালুকদার বলেন, ‘সোনাকাটা ইকো পার্কের কুমির প্রজননকেন্দ্রের একটি কুমির মারা যাওয়ার পর আমরা কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। তবে সখিনা ডিম দেওয়ায় আশা করছি, এখানে কুমিরের বংশবিস্তার হবে।’
সুন্দরবনের করমজল কুমির প্রজননকেন্দ্রের গবেষক জাকির হোসেন বলেন, কৃত্রিম উপায়ে কুমিরের ডিম ফুটে ছানা বেরোতে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ দিন সময় লাগে। প্রাকৃতিক উপায়ে ছানা জন্মাতে ৯০ দিন পর্যন্ত খোঁজ রাখতে হয়। ছানা জন্মানোর পর সেগুলোকে আলাদা করে ফেলতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তিন প্রজাতির কুমিরের অস্তিত্ব ছিল। লোনা পানির কুমির, মিঠা পানির কুমির ও গঙ্গোত্রীয় কুমির বা ঘড়িয়াল। এর মধ্যে মিঠা পানির কুমির ও ঘড়িয়ালের বিলুপ্তি ঘটেছে বলে বলা হয়ে থাকে। এখন শুধু লোনা পানির কুমিরের অস্তিত্বই আছে। এরা সাধারণত ৬০-৬৫ বছর পর্যন্ত ডিম দিতে পারে আর ৮০-১০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
বরগুনা-পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মিহির কুমার দো বলেন, কুমির যাতে ডিমগুলো তা দিয়ে নির্বিঘ্নে ছানার জন্ম দিতে পারে সে জন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।